Posts

বিহঙ্গ হয়েছে অন্ধ, বন্ধ করেছে পাখা

চল্লিশ পেরুলে বয়েস পরস্পরের আলাপের বিষয় হয় ওষুধের তালিকা। কোন কবি বলেছিলেন এই কথা? কোন কবিতায় আছে এই কথা? নাকি কোন গদ্যে? কথাটা মিথ্যে নয়। নির্দিষ্ট বয়েস পেরুলে পরে বন্ধুদের আলাপেও ঢুকে পড়ে সাম্প্রতিক স্বাস্থ্যবার্তা। আমরা সিনেমা নিয়া কথা বলি। তত্ত্ব বা তথ্য থাকেনা সেখানে। নিজেদের মধ্যে কার হৃদয়ে ছুরি চিকিৎসা হলো তার গল্প করতে করতে মান্নাদা বলে, সিনেমাটা খারাপনা। দেখতে পারিস। আমরা তরল সিনেমার তালিকা করতে থাকি। কঠিন বাস্তবতার গল্পগুলো এড়িয়ে যাবার পদ্ধতি নিয়ে আলাপ করি। এ এক প্রাত্যহিক গল্প বলা। সিনেমার দৃশ্যান্তরে ধারাবাহিকতা নিয়ে আলাপ হয়। গল্পের সময়কাল নিয়ে চিন্তা না করা পরিচালককে আমরা গাধা নাম দেই। মান্নাদা বলে, তুই যেমন ভাবছিস, তেমন না আসলে। অন্ধ একটা মানুষ এই সমাজে যেমন অবিচারের শিকার হয়, তেমন না, বরং প্রতিশোধ নিতে পারার এক সুপারম্যানিয় ঘটনা। সিনেমাটা সিনেমাই। অন্যকিছু না। কম টাকায় তৈরি হওয়া সিনেমার তালিকা করি আমরা। ভালো সিনেমার জন্য টাকা কোন বিষয় না। কম টাকা দিয়ে বিস্তর ভালো সিনেমা তৈরি হয়েছে। অন্ধ হলেই বিহঙ্গ পাখা বন্ধ করেনা, সিনেমাটা সেই সূত্রেই হয়তো তৈরি। কিন্তু হিন্দিওয়ালারা রবী...

ম্লান আলোয় দেখা টুকরো শৈশব ০২

ফুপু বছরে একবারই আসতেন। বাক্স পেটরা বোঁচকা বুচকি নিয়ে। তখন আমরা বিশ্বনাথে থাকি। লাল ইটের একটা বাড়ি। খোলা উঠান। বড় খেলার মাঠ। বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়, মসজিদ, প্রাইমারি স্কুল। ফুপু এলেন রোজার আগে। এসেই আমাদের সবাইকে জড়িয়ে ধরে এক প্রস্ত কান্নাকাটি করলেন। বিলাপ দিয়ে কান্না। আব্বা বল্লেন, কান্নাকাটি শুনলে মানুষ ভাববে, পোস্ট মাস্টার মারা গেছে... ফুপু এ কথা শোনে আরো জোরে কাঁদতে শুরু করলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আব্বা সুড়ুৎ করে বেরিয়ে গেলেন। হয়তো রনজিত কাকার সাথে আড্ডা দিতে। কাকা তখন রামসুন্দর স্কুলের শিক্ষক। দীর্ঘ বছর পর দুই বাল্যবন্ধুর দেখা হয়েছে তখন। তারা চুটিয়ে সেই সময়টা উপভোগ করেছেন। কান্নাকাটি এবং আমার কেউ নাই বিলাপ শেষ করে ফুপু ব্যাগের ভেতর থেকে ছোট একটা কাঁথা বের করে সেলাই করতে শুরু করলেন! এটা এতই ছোট ছিলো যে, তখনকার পিচ্চি হাসানের কাঁথাও এরচে বড় ছিলো! আমাদের ঘরে তখন সকাল বিকেল লুডু খেলা হতো। বলতে গেলে লুডুর বোর্ডের মাপের সেই কাঁথা। বিস্ময় নিয়ে কাথা তৈরি দেখতে থাকলাম। ফুপু অসাধারণ সব সেলাইয়ের কাজ জানতেন তখন। দেখতে দেখতে কাথাটা আস্ত একটা নকশায় পরিণত...

শুভ হালখাতা

নববর্ষ বলে কিছু চিনতাম না তখন। চিনতাম হালখাতা। স্মৃতির ছড়ানো মুড়ি মুড়কি জড়ো করতে গেলে যে উজ্জল সময়টা সামনে আসে, সেটা সম্ভবত ৯৩/৯৪ সাল হবে। ইংরেজি ৮৬/৮৭। জগন্নাথপুর বাজারে কাকাবাবুর দোকানে নতুন খাতা খোলা হতো। একদম সকালে হাড়িতে করে মিস্টি চলে আসতো। এরপর আব্বার হাত ধরে চলে যেতাম বাজারে। দোকানের ভেতর থেকে ডাক আসতো, ' ও মাস্টসসাব, আউক্কাতে...' আব্বা হাত নেড়ে বলতেন, 'থুড়া চক্কর দিলাই আগে...' আব্বার চক্কর বলতে লম্বা কোন দৌড় ছিলোনা। নির্দিষ্ট কয়েকটা দোকান ঘুরে তিনি কাকাবাবুর গদিতে এসে বসে যেতেন। ততক্ষণে মিস্টিতে আমার পেট টইটুম্বুর হয়ে যেতো। আব্বা মাথা নাড়লে আমি হাফপ্যান্টের কোমরে ধরে দিতাম দৌড়! ( হাফপ্যান্টের কোমর ধরা বিষয়ে নিজের কোন স্মৃতি নাই। আমার শৈশব বেঁচে আছে যাদের স্মৃতিতে, তারা বলেছেন এই গল্প!) আম্মা ভালো দেখে শাড়ি পরতেন। পোলাও রান্না হতো। এসবই আসলে বিচ্ছিন্ন বৈশাখের স্মৃতি। ফুফুত ভাই করিম, আমাদের বাড়িকে শিন্নি বাড়ি বলতো, তার কারণ মনেহয় এই যে, এমন কোন দিনে সেও ফুফার সাথে মাদানে খেতে এসেছিলো আর আম্মা তাকে মুরগির মাংসের সাথে পোলাও তুলে দিয়েছিলেন পাতে। করিম অভিমানে সব ছেড়ে...

আত্মজ শোনো, বলি

আমি সেইসব সাধারণের একজন যার জীবন মূলতঃ নিস্তরঙ্গ। মাদানর খানির পরে নানাবাড়ীর উঠোনে নেমে আসা অবাক দুপুরের মতো একা। উত্তরের টিলার এষনায় অজানা অচেনা গাছের মতো, পাতার স্পর্শে যাদের ছোঁয়া যায় তারাও প্রজাতিতে ভিন্ন, অনাত্মীয়। আমার কোন খ্যাতি নাই। চৌরাস্তায় দাঁড়ালে হঠাৎ আহ্লাদে কেউ বলবেনা, 'কেমন আছো?' কাঁচাবাজারে তরুণী লাউ এগিয়ে দিয়ে সব্জিওয়ালা কখনই বলেনি, 'বাইসাব নেউক্কা, আপনার লাগি আগলাইয়া রাখছিলাম'। পাশের গায়ের লোকটাও জানেনা আমার ঠিকানা। পেছনের বেঞ্চে বসে কাটিয়ে দিলাম জীবনের ইশকুল। তুই বলার কোন সহপাঠী নাই আমার। কেউ কোনদিন আঁকেনাই আমার ছবি, তুলিতে রেখায়। সবাই দাঁড়িয়ে যখন হেসেছে, একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরেছে লাস্যে, আমি ছিলাম ক্যামেরায়। স্থিরচিত্রে পাবেনা আমায়। ১২/০৪/২০২১ সোনাজাদুরা আমার, তোমাদের বুকের ভেতর মন পকেটে আলতো করে এই আমাকে রেখে দিও। মাঝে মাঝে স্মৃতি ফেলার সময় হলে ফেলতে গিয়েও সাদাকালো এই বাবাটার আবছায়াটা তুমি যখন রেখে দেবে আবার জমা। বাবা তখন অনেক দুরে মুচকি হাসবে। এই পৃথিবী অবাক হবে, জানবে তখন সকল সময় সকল মানুষ গৌন না। ভালোবাসা মৌনতা

অলৌকিক বৃষ্টির পর

কথা হয়েছিলো, বসন্তের মাঝামাঝি যখন এ শহর সবুজ হয়ে উঠবে, যখন সড়ক দ্বীপ থেকে হাত বাড়াবে নানান রঙের ফুল, আমরা তখন হাঁটতে বেরুবো। শীত লেগে জমে থাকা সাইকেলের প্যাডেল আবার ঘুরবে দারুন জোরে। বাতাসের ঝাপটায়, ভুল করে রয়ে যাওয়া পুরনো পাতাটি টুপ করে ঝরে পড়বে গাছ থেকে। বিগত শীতের চিহ্ন ধরে রাখা ভোরে, পাতলা শাল জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লে আম্মা তোমাকে একটা সোয়েটার এগিয়ে দেবেন। দরগার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে আব্বা মুচকি হাসবেন। আমাদের ছেলেরা লাল চায়ের কাপ সামনে নিয়ে বসে থাকবে। বাড়ি ফিরে গেলে অভিমানে গাল ফোলাবে। দেরি হলো বলে তুমি কিশোরীর মতো লজ্জা পাবে। ইমাম সাহেব বাড়ীর সামনে দিয়ে যেতে যেতে হাক দিয়ে বলবেন, 'ও কারীব আইজ মাদানে তুমাতান বাড়ীত খাওয়াত আইমু।' তিন শিশু দৌড়ে শিউলি তলায় গিয়ে হাত নাড়বে। হাজেরা গরম গরম রুটি নিয়ে এসে বলবে, মামা 'জলদি খান, পরে শক্ত ওইযাইবো।' আম্মা বলবেন, 'ও ফুড়িন আইজনু শুক্কুরবার, ভালামন্দ রান্দার ব্যবস্থা করো।' হঠাৎ নেমে আসা অলৌকিক বৃষ্টিতে সব ধুয়ে মুছে যাবার পর যে টলটলে রোদ আসবে। আকাশ যখন আরো বেশী নীল হবে, জল হবে আরো স্বচ্ছ, তখন যে ফাগুন আসবে প্রথম, তুমি আমার তিন ছেলেকে...

হাসপাতালের দিনগুলো

Image
তখন পাতলা ঝোলের মুরগির মাংস আর আলু দিয়ে একটা তরকারি থাকতো, সাথে ডাল আর মোটা চালের ভাত। বড় বড় সসপ্যান ভর্তি করে ট্রলিতে ঠেলতে ঠেলতে ওয়ার্ডের মাঝ বরাবর এসে দাঁড়াতেন মাসি অথবা ওয়ার্ডবয়। ওসমানী হাসপাতালে গাইনি ওয়ার্ডের সেইসব দিনে, আমার শৈশবে ফিরে গেলে অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন আর আন্তরিকতার দেখা পাই। এলুমিনিয়ামের টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে সেখানে যারাই যেতেন, দুরন্ত ক্ষ্যাপা আমাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা তাদের কারো ছিলোনা। সাদা বিছানায় পা তুলে গুটিসুটি মেরে বসে থাকার নিয়ম ছিলো। খাবারের ট্রলিতে আসা ঘ্রাণের দিকে আড়চোখে তাকাতাম। একদিন আম্মা বলেন, "খাইতায়নি"? আত্মবিশ্বাসহীন কণ্ঠে হ্যাঁ বলি। আম্মা প্লেটে করে অল্প একটু ভাত, হলুদ রঙের ছোট্ট এক টুকরা মাংস আর আলু নিয়ে আসেন। আমি বিছানায় বসে পা দোলাতে থাকি, আম্মা ভাত মুখে তুলে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করেন, "মজা"? আমি মাথা নাড়ি শুধু। আবার জিজ্ঞেস করেন, "আম্মারটার চেয়ে বেশি"? আবারও মাথা নাড়ি। আম্মা হাসেন। এরপর যতদিন খাবারের সময় হাসপাতালে গেছি, আমি না চাইলেও ট্রলিওয়ালা মাসি খাবার দিয়ে যেতেন আমার জন্য। বলতেন, "পুয়ায় মজা করি খাইন দিদি, খাওয়া...

ম্লান আলোয় দেখা টুকরো শৈশব ০১

মোবারক তখনও কারিম হয়ে উঠেনি। আলগা আভিজাত্যের রামাদ্বানের সাথেও পরিচয় হয়নি তখন। তখন রোজা আসতো। আসতো প্রবলভাবে। নানাবাড়ির টিলা থেকে আমরা দৌড়ে নেমে যেতাম বাঘা হাওরে, পেন্সিলের টানের মতো একটা চাঁদ দেখলাম কী দেখলামনা, উল্লাসের তাতে উনিশবিশ হতোনা। এই একই ভূমিকায় অভিনয় করেছি কখনো নলুয়ার হাওরের পারে, কখনও রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে অথবা কালনী নদীর পারে। আমার শৈশব ছিলো উল্লাসে ভরপুর। শহর সিলেটে তখনও অনেক দোকানের সামনে ছিলো কাঠের দরোজা! একটা একটা করে কাঠের তক্তা খুলে রাখলে আম্মার তেরছা করে লেখা লিস্টি ধরে ডাল তেল ছোলা আর কালিজিরা চালের খুশবো নিয়ে রোজা আসার জানান দিতো তখন। আর নানাবাড়িতে ছিলো বাইংগন বিচি চাউল। উপজেলা সদরের দিনগুলোতে বাজারের খবর আসলে রাখা হতোনা। তাজপুরে বাড়িতে মাইক লাগাতেন ঢাকা টেইলার্সের মালিক। মাঝরাতে শুরু হতো 'সেহরি সুবুর, ওঠো ওঠো, ফতার সময় ওই গেছে' বলে হুলস্থূল। সুহুর পার্টি করা এই সময় বুঝবেনা লতা দিয়ে ফতা খাবার সেইসব সময়ের মায়া। আম্মার পাশে বসে একটার পর একটা পিয়াজু খেতাম। মনোয়ারা মনজিলের খালাম্মা বিকালে মাঠা বানানোর জন্য আসতেন। সময় হবার আগেই আম্মা সবকিছু প্রস্তুত ...

আমাকে আগলে রাখো, রাখো তুমি মায়ায়...

Image
তখন ঘুরতাম। অনেক ঘুরতাম। ঠিক ঠিকানা ছিলোনা এবং সেসব কোন দ্রষ্টব্য স্থানও ছিলোনা। আমারই মতো অনুল্লেখ্য কোন গ্রাম-বাজার কিংবা প্রান্তর। এই ছবিটা ছাতকের। নদী পেরিয়ে আমরা হেঁটেছিলাম। কয়েক মাইল। সাথে আমার এক বন্ধু ছিলেন। প্রণবেশ উনার নাম। আমরা এমন হারিয়ে যাওয়া হাঁটা অনেকবারই হেঁটেছি। একটা ভুল হলো, সাথে আরো দুজন ছিলেন। দুজনেই প্রণবেশের বন্ধু। সেদিনই পরিচয়। আর কোনদিন দেখা হয়নি, সম্ভবত আর হবেওনা। একজন আজাদ, অন্যজনের নামটা আজ আর মনে নেই! অসাধারণ একটা হাঁটাপথ ছিলো সেটা। ছবিতে ধারণ করার মতো নয়। গোপাট, *গোল, ধানি জমিন, টিলার পাশ দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ, স্বচ্ছ জলের ছড়া। এ হলো সেইসব গ্রামেদের একটি যেখানে এখনও মানুষ অপরিচিত কাউকে পেলে হেসে কথা কয়। যেকোন বাড়ীর উঠোনে দাঁড়ালে তেষ্টার জল মেলে। যেখানে শিশুরা পরম বিস্ময়ে, অসঙ্কোচে মানুষের দিকে তাকাতে পারে। আমার মনে আছে, মাটির উঁচু ঢিবির ওপর একটা বাড়িতে গেলাম আমরা। পাহাড়ের ঢল থেকে বাঁচতে এখানে বাড়ি গুলো এমন উঁচুতে তৈরি হয়। মৃদুভাষী এক শিশু সবুজাভ কাচের গ্লাসে করে পানি এনে দিলো। চকচকে সেই গ্লাস থেকে তখনও ফোটা ফোটা পানি ঝরছে। অতিথিকে দেওয়ার আগে সেটা ধোয়া হয়েছে। আ...

পদ্য

সফল পুষ্পের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। অনেকের মাঝে হারিয়ে যাই। আগুনে ঝাপ আমাদেরও দেওয়া হয়। আমরাও সাতরাই উত্তাল নদী। আয়োজন শেষ হলে, উচ্ছন্নে যাওয়া মঞ্চে শেষ মানুষটা হই আমি, তুমি, সে... নাম পড়া শেষ হলে কান পাতি, চোখ রাখি 'প্রমূখ' শব্দটায়। বড় প্রিয় একটা শব্দ। নজমুল আলবাবরা ওখানে লুকিয়ে থাকে।

প্রিয় ময়না ভাই

Image
যে শহর ছিলো হাতের তালুর মতো পরিচিত। যে শহরে অনাত্মীয় ছিলোনা কেউ। সেই শহর আর আগের মতো নেই। তারপরও শহরটায়, ছায়া প্রচ্ছায়ায় কিছু মানুষ আছেন, ছিলেন। ময়নাভাই আছেন থেকে ছিলেন হয়ে গেলেন! আমাদের ছোট্ট শহরের উজ্জ্বলতম বাতিঘর নিভে গেলো অবেলায়। অবিরাম আলোর জোনাক ছড়ানো মানুষটি চলে গেলেন। ময়নাভাই, যার অপার্থিব আস্তিন ধরে ঝুলে থাকতো আলো প্রত্যাশি কিশোর তরুণ। সেই আস্তিন গুটিয়ে চলে যাবার আগে তিনি মুঠো মুঠো স্মৃতি ছড়িয়ে গেলেন। ময়নাভাইয়ের সাথে পরিচয়ের কোন আনুষ্ঠানিক স্মৃতি কী আমাদের কারো আছে? সুরমার সাথে শহর সিলেটের যে সরল সম্পর্ক, ময়না ভাইর সাথেতো আমাদের তেমন সম্পর্কই ছিলো। কখন, কেমনভাবে আমরা তার সাথে জুড়ে গেলাম আর কখন কেমনভাবে তিনি আমাদেরকে চিনে নিলেন তার কোন নির্দিষ্ট দিন তারিখতো নাই। ময়নাভাই অনেক কথা বলতেন। প্রতিটি কথা ছিলো প্রয়োজনীয়। তিনি যতো কথা বলতেন তারচে বেশি কথা থেকে গেছে না বলা, কারণ আমরা সেই কথাগুলো বলাতে পারিনি। মহীরুহের ছায়ায় লতাগুল্মের মতো ভীড় করা সব মানুষ আমরা। আমাদের ওতো জানার সময় কোথায়? তাই ময়নাভাই তার জ্ঞান বৃক্ষ নিয়ে চির প্রস্তানে চলে গেলেন। মুক্তোদানার মতো কোমলসব স্মৃতি, দুপুরের রোদ...

পথে পথে পড়লাম ছড়াইয়া...

Image
ছুটিবারের লক্ষ্যহীন ঘুরাঘুরিতে মাঝে মাঝে অচেনা সড়কে ঢুকে পড়া যায়। ছুটতে ছুটতে এ পথ থেকে সে পথ ঘুরে আবার চেনা সড়কে ফিরে আসা। গ্রামে বিচ্ছিন্ন কচুরিপানার মতো একেকটা বাড়ি, মনেহয় ভাসছে যেনোবা। কিন্তু না, এরা স্থির। একা, নির্জন। বিন্যস্থ এই দেশে সবকিছুতেই নাম্বার সাটা আছে। কিন্তু অবাক করা একেকটা বাড়ি, এদের কোন নাম্বার নেই! বরং নাম আছে। আমাদের যেমন উত্তরের বাড়ি, কিংবা নয়া বাড়ি থাকে প্রতিটা গ্রামে, তেমন করে এদেরও আছে। মেনর হাউজ, উডভিল কটেজ, ব্রুম ক্রফট, বেলস এনড... বাহারি সব নাম। বেশিরভাগই কৃষকদের বাড়িঘর এসব। বাড়ির সামনে মাঝে মাঝে হাতে লেখা এক টুকরো কাগজ কিংবা বোর্ডের দেখা মেলে। কেউ লেটুস বিক্রি করেন। কেউ লিখে রেখেছেন ডিমের জন্য বড় ঘন্টায় টোকা দাও। কেউ টমেটো, মুলোটা, লাউটা বিক্রির জন্য রেখে দিয়েছেন। পাশে ছোট একটা বাক্স নয়তো বাটি রাখা। নিজ দায়িত্বে টাকা রেখে জিনিস নিয়ে যাও। এটাই ব্যবস্থা। "শেয়াল বনের" ছবির মতো এক বাড়ির সামনে খুব কারুকাজ করা একটা বোর্ড লাগানো ছিলো। ওতে লেখা, 'বিশুদ্ধ মধু পাওয়া যায়'। পাশেই কার্ড বোর্ড কেটে মোমবাতি বানিয়ে লিখে রাখা হয়েছে, হাতে বানানো মোমবাতি বিক...

পদ্য

ফুলঝুরি কেনার সরব বিকেল মিলিয়ে গিয়েছে বাতাসে। আকাশে লেপ্টে থাকা মেঘ চলে গেছে কোন অচেনায়, কেউ রাখেনি খবর। ঝুপ করে নেমে আসা অন্ধকারে নাই জোনাকির কোলাহল। বিলাপের জন্য অবশিষ্ট কেউ নাই আর। কান্নাকে খুন করে টাকায় কেনা শিৎকার।

ঝিঁঝি পোকার বাড়ি

মাথার ভেতর শ'য়ে শ'য়ে ঝিঁঝি পোকা বাসা বেঁধেছে। দিনমান চেঁচিয়ে যাচ্ছেতো যাচ্ছেই। কোন বিরাম নেই। প্রতি মুহূর্তে এরা বাচ্চা দিচ্ছে মনে হয়। কারণ শব্দটা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। 𑂽 মোবাইলের স্ক্রিণ নেশার মতো হয়ে গেছে। স্ক্রিণটাইম দেখার অপশনে গিয়ে ছেলে নসিহত দেয়। নিজের কাছেও মনেহয়, বেশি হয়ে যাচ্ছে। এপস ফেলে দিলাম। প্রথম দিন একটু কষ্ট হলেও দ্বিতীয় দিন থেকেই বেশ নির্ভার লাগছে। রাতে বা একদম সকালে কম্পিউটারে আপডেট জানতে কিছু সময় ঘুরাফেরা। মোবাইল এপসের যে মজা, সেটাতো আর কম্পিউটারের ব্রাউজারে পাওয়া যায়না। মিনিট কয়েক চোখ বুলিয়েই পরিশ্রান্ত মনে হয়! তবে, ফলটা ভালো হয়েছে। আজন্ম লাল চোখটা যথেষ্ঠ বিশ্রাম পেয়ে একটু একটু সাদা হয়ে গেছে (মনের ভুল)। হাতে বাঁধা রক্তচাপ মাপার ব্যান্ডটাও বেশ সহনশীল ডিজিট দেখাচ্ছে। খবর বেঁচে খাওয়ার পুরনো অভ্যাস থেকে এখনও নানা খবর আন্দোলিত করে। কোন কোন খবর একটু আগে জানা হয়ে যায়। জানাজানির একটা প্রধান উৎস হলো ফেইসবুক আর চেইন মেইল। ফেসবুক এপস ফেলে দেয়ায় নানান ধরণের মাথা খারাপ, মন খারাপ করা খবর সময়ের চেয়ে পরে জানতে পারছি। এবং আশ্চর্য হয়ে দেখছি, প্রতিক্রিয়ায় অনেক সহনশীল এবং চাপহী...

হারাবার কথা

হারিয়ে যাবারই কথা ছিলো। দুরের কোন গ্রামে, হঠাৎ জেগে ওঠা কোন বাজারের কোলাহলে আমার হারিয়ে যাবার কথা ছিলো। প্রতি রাতে আমি বাড়ি ফিরি। নয়া বাজার থেকে  হাঁটতে হাঁটতে । প্রতি রাতে বাড়ি ফিরি, রিকাবী বাজার থেকে। দরগাহর কবরখানা থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির সামনের তিনমাথা রাস্তায় গিয়ে হাপিয়ে উঠি। হাঁসফাস করে তখন ঘুম ভাঙে, বরফে সাদা হয়ে থাকা এক দুরের দ্যাশে। কতটা স্টেশন পেরিয়ে এলাম, জানিনা। আব্বা, আমি হারিয়ে ফেলেছি ঠিকানা। মুছে গেছে বুক পকেটে রাখা কাগজের সবকটা রেখা।

ম্লান আলোয় দেখা টুকরো শৈশব ০০

রোজাটা ৩০ দিনের হলে সবকিছু নিয়ম মতোই হয়। আগেও হতো। কিন্তু যদি হয় ২৯, তাহলেই বিরাট ভজঘট। অবশ্য ২৯ বিরাট একটা রোমাঞ্চকর বিষয় ছিলো। ২৮ তম দিনেই আমাদের মাঝে একটা চঞ্চলতা চলে আসতো। পরশু কি ঈদ হবে? নাকি আরেকদিন বেশি অপেক্ষা করতে হবে? যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা বাটার জুতোটা কি পরা হবে পরশু নাকি আরেকদিন অপেক্ষা করতে হবে? এটা সেসময়ের কথা, যখন আমরা কোন এক প্রত্যন্ত থানা সদরে থাকি। জগন্নাথপুর- দিরাই। নদী ও হাওরের উদার ভূমি। রোজার শেষ কয়েকটা দিন আম্মা শুধু ব্যাগ গোছাতেন। আমাদের তিনতলা ব্যাগ ছিলো একটা। নিচে গোপন তিনটা কুঠোরি। কাপড় চোপড় ভরা শুরু হলে, যখন সেটা উপচে পড়তো তখন আম্মা একটা করে চেইন খুলে ব্যাগটা বড় করে দিতেন। আর আব্বা বলতেন, ''ইয়া! ওতোতা কিতা নিতায়! একদিন আর দুইদিনর লাগি ওতোতা নেওয়া লাগেনি?'' আম্মা হয়তো বলতেন, ''হুরুতা দুগুর খতো কাপড় লাগে ইতা আপনার হিসাব আছেনি?'' আমরা তখন বিশ্বনাথে। বাসার ঠিক সামনে বড় রাস্তা। বিকালে, সময় টময় জানিনা তখন। সকাল, দুপুর, বিকাল আর রাত চিনতাম শুধু। আব্বা হঠাৎ এসে বল্লেন, কালকেই ঈদ। আম্মা দৌঁড়ে দৌঁড়ে ঘর গোছালেন। বাসার সামনে থেকে...

এলেবেলে দিনলিপি

Image
দশ দিন আগে... শীত চলে যাচ্ছে। দিন লম্বা হচ্ছে, রোদ উঠছে নিয়মিত তবু ঠান্ডা কমছে না। কারণ তীব্র বাতাস। সকালে উঠেই সেই বাতাসের আক্রমনে পড়লাম বাপ ছেলেতে। আবহাওয়া নিয়ে বাবাইর নিজের অনেক মতামত আছে। সিরি নামের এক মহিলার সাথে তার ব্যাপক খাতির। ওর কাছ থেকে এ বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করে তারপর নিজের মতামত যোগ করে। বেশিরভাগ সময় সেগুলো ঠিক হয়। মাঝে মাঝে বাঙ্গাল সূলভ বেশি কথা যদিও বলে, আমিও বাঙ্গাল সূলভ পিতাভাব ধরে সেগুলো এড়িয়ে যাই। গাড়িতে উঠতে উঠতে বলে, বাবা আজকে অনেক মেঘ হবে। ঝুম ঝুমায়া মেঘ পড়বে। তুফানও হবে। ওর কথা সত্যি হয়ে যায় মিনিট কয়েকের মাঝে। চারদিক ঝাপসা করে আসে, সাথে ঝড়ো বাতাস। বাবাই বলে, দেখলায়তো বাবা আমার কথা সত্যি হলো। আমি বলি, হু, তুমি হইলা আবহাওয়াবাবা। মাথায় একটা পাগড়ি বাইন্ধা দেই... গতবার কপাল যদি কারো থাকে সেইটা আমার পাশের বাড়ির মুহাম্মদের। রাস্তায় কাজ চলছিলো গতবার। বলা নেই কওয়া নেই কাউন্সিলের একটা গাড়ী এসে রাস্তার পাশে রাখা তিনটা গাড়িতে দিলো ঘষা। প্রথমে আমারটা, তারপর আরেকটা শেষটা মুহাম্মদের। শব্দ শুনে বাইরে আসতেই ড্রাইভার আগে থেকেই দুঃখ প্রকাশ করতে ক...

হাসপাতালের দিনগুলো...

রাত এগারোটায় হাসপাতাল থেকে ফোন আসলো, আপনি মি. তুলি? হ্যাঁ বলতেই বল্লো, মাত্র ফোন পেলাম। আপনার স্ত্রীকে পোস্ট অপারেটিভ থেকে নিয়ে আসবে ১৫ মিনিটের মাঝে। আসতে চাইলে আসুন। বল্লাম, আধা ঘন্টা লাগবে কমপক্ষে। উত্তরে হ্যাঁ সূচক জবাব পেলাম। আবার আব্দার করলাম, ছেলেকে নিয়ে আসবো... তাতেও হ্যাঁ। গত ৩/৪ ঘন্টা ধরে এই মহিলাকে ১৫/১৬ বার ফোন করেছি। গলা শুনে অনেক বয়েসী কোন মানুষ মনে হয়। ছেলেকে নিয়ে ছুটলাম। রাস্তা একদম ফাঁকা, তবু জোরে চালানো যাবেনা। মোড়ে মোড়ে ক্যামেরা। লাইসেন্সে এমনিতেই তিন পয়েন্ট জমা হয়ে আছে। আর কিছু হলে ব্যান করে দেবে। বাবাই লম্বায় সেই কবেই আমাকে ছাড়িয়েছে। এখন মনেহয় বুঝতে পারাতেও... বারবার বলে, বাবা চিন্তা করোনা। মা ঠিক আছে। তুমি ঠিক থাকো। ভেতরে ভেতরে আরো গলে যাই, ছেলেটা ভেতরে বিষ চাপা দিতে শিখে যাচ্ছে। যা ভেবেছিলাম তাই। আম্মার বয়েসি নার্স। ওয়ার্ডের দরোজায় দাঁড়িয়ে। "দেখো বাবা, এটা একদম নিয়মের বাইরে। তোমার বার বার ফোনের কারণে আমি সুযোগটা দিচ্ছি। আস্তে আস্তে যাবে। কথা বলবেনা। লম্বা অপারেশন হয়েছে। এটা সবচে বড় অপারেশন গুলোর একটি। মেয়েটা এখন ঘুমুচ্ছে। শুধু চোখের দেখা দেখবে।...

লক্ষ্মী সরস্বতী দীপাবলী

দক্ষিণের জানালায় দাঁড়ালে হিমেল হাওয়ার ঝাপটা লাগে। শীত এলো বলে। আগে এমন সময় শীত প্রায় চলেই আসতো। দূর্গা পূজার সময় থেকেই হালকা কুয়াশা আর শেষরাতে ঠান্ডা ভাবটা শুরু হতো। রাতে পূজো দেখার কিংবা পাড়া ঘুরার সময় সেটা টের পাওয়া যেতো। এখন আর সেরকম হয় না। মাঘ মাসেই শীত আসে কী আসে না। দীপালির একটু একটু গরম লাগে। অস্বস্তি হয়। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে শরীরটা জুড়ানোর চেষ্টা করে। সন্ধ্যা আরতী সেরে এলো। বারান্দার এক কোনে ছোট্ট ঠাকুর ঘর। ধূপ জ্বেলে প্রণাম ঠেকিয়েই শেষ করে আরতী। শরীরে এর বেশি সহ্য হয়না ইদানিং। পরিশ্রান্ত লাগে। এ পাশটায় আগে একটা ছোট্ট পুকুর ছিলো। তারপর ধানি জমিন। জমিনের লাগোয়া বড় রাস্তা। পুকুর আড়াল করা গাছের ফাঁক দিয়ে সেসব দেখা যেতো। বিয়ের পর পর, দীপালি সেই ফাঁকফোকর দিয়েই দেখে ফেলতো নিজের বাপ-ভাইকে। বাজার থেকে উত্তর পাড়ায়, তাদের বাড়িতে যাবার এই একটাই রাস্তা। শীতের সময় মাঠ শুকিয়ে খটখটা হয়ে গেলে মহাদেব বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে কোনাকোনি দৌঁড়ে আসতো বোনের কাছে। নাড়ু, মোয়া ধরিয়ে দিয়ে যেতো। দেখতে দেখতে সব বদলে গেলো। এই ধানি জমির বেশিরভাগই ছিলো ওর শ্বশুর বাড়ির জ্ঞাতি গোষ্ঠির। এখন কিচ্ছু নাই। কেউ...