Sunday, June 16, 2013

আমাদের একা বাড়ি

বাড়িটা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে গেলো। বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ। গরমের ছুটি। বউগুলো ছানাপোনা নিয়ে তাই বাপের বাড়ি চলে গেলো। দাদাভাইও বাড়ি নেই। রাত ১০ টার পর ভাত খাবো কীনা জিজ্ঞেস করলেন আম্মা। বল্লাম একটু পরে খাবো। আম্মা ঠিকাছে বলে সাথে এও বল্লেন, ‘আজকে আমরা মা-পুত। একলগে খাই চলো!’ তখনই মনে পড়লো, এই শুনশান বাড়িটাতে, একা বাড়িটাতে আর কেউ নেই, আমি আর আম্মা শুধু! একটা অন্যরকম অনুভূতি। অনেক বছর পর, এরকম একা বাড়ি...
টেবিলের দু’পাশে বসে আছি আমি আর আম্মা। টুকটাক কথা বলছি। বেশিরভাগই খাবার নিয়ে। কোনটা নিচ্ছি, কোনটা নিচ্ছি না, সেটা দেখছেন আম্মা। বছর দেড়েক আগে আমি আর আম্মা মাসখানেক প্রবাসে ছিলাম। একসাথে বসে বসে মা ছেলে খেতাম। আমি কখনো দেশের বাইরে যাইনি। আম্মা আমাকে আগলে রাখার চেস্টা করতেন! তখন কিছুটা মনে হয় অস্বাভাবিকও ছিলাম আমি। মাথাটা ফাঁকা ছিলো... আজকে আবার বছর দেড় পর, আবার আমরা মা-ছেলে। দাদাভাইর খবর বলেন আম্মা, খুব বিখ্যাত কোন এক পাহাড়ের না উপত্যকার মাঝ দিয়ে বেড়াচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে কথা বলি আমরা, বউরা একসাথে বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেলো, সেটা নিয়ে আলাপ করি, গ্রামে রাতের পাহারা কিছুটা কম হচ্ছে সেটাও আসে আমাদের আলাপে। ইমাম সাহেব প্রায়ই রাতে ভাত খেতে আসেন না, আম্মা সেটা নিয়ে চিন্তিত।
এতো গরম পড়েছে, শরীর জ্বালা করে। বারান্দায় ফ্যান দাড় করিয়ে জানলায় দিয়ে ঘরের ভেতর ঠান্ডা বাতাস ঢুকালে বেশ শান্তি লাগে। প্রায় মাঝরাতে খেয়াল করি, আম্মা ঘুর ঘুর করছেন আমার আশেপাশে! আমি ঘুম ঘুম চোখে প্রশ্ন করি ঘটনা কি? জানালা দেখিয়ে বলেন পর্দাটা তুলে দিলাম। বাতাসের ঝাপটায় সেটা হয়তো পড়ে গিয়েছিলো। তুলে দিতে এসেছেন...
রাত জেগে থাকার অভ্যাসটা এসেছে সম্ভবত বই পড়া থেকে। তারপর ৭/৮ বছর পত্রিকায় কাজ করেছি। রাত জেগে থাকতে হয়েছে। এখন আর সহজে ঘুম আসে না। জেগে থাকি, জেগেই থাকি। তেমন আরেকটা অভ্যাস সোফায় শুয়ে থাকার। আগে পড়তে পড়তে একসময় সেখানে ঘুমিয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে দুস্টামিও করতাম। ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকতাম। আব্বার ঘুম ছিলো খুব পাতলা। শুয়ে পড়লেই ঘুমিয়ে পড়তেন, আবার মশা মারার শব্দে সেই ঘুম ভেঙে যেতো। রাতে একটু পর পর এ ঘর ও ঘর করাও ছিলো অভ্যাস। কে কেমন করে ঘুমালো, মশারী টানানো হলো কী না এসব দেখতেন। মাঝরাতে আব্বা ঘুম ভাঙিয়ে কাউকে দিয়ে মশারী টানাচ্ছেন, কাউকে দিয়ে কয়েল জ্বালিয়ে নিচ্ছেন... নিয়মিত ঘটতো এসব। ব্যতিক্রমটা শুধু আমার বেলায়। টেনে হিচড়ে কোলে করে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে চাকরী পাবার পরও। কতদিন বিছানায় শুইয়ে দেবার পর বিকট হাসি দিয়েছি, আব্বা কপট রাগ দেখিয়েছেন। তবু মন খারাপ করেননি। কলেজে পড়ার সময়ও অনেকদিন মনে আছে, ঘুমিয়ে গেছি ভেবে আব্বা কোলে নিয়েছেন আমাকে, পাজাকোলে শুয়ে আমি আব্বাকে বলছি, আজকে আপনার কাছে ঘুমাই আব্বা, আব্বা হয়তো বলতেন, আহা বিলাইর বাচ্চারে... তারপর নিজের বিছানায় শুইয়ে দিলেন... আমি আব্বার বুকের ভেতর ঢুকে বাকি রাত কাটিয়ে দিলাম।
তার অনেক বছর পর, ডিসেম্বরের কোন এক শীতে, হাসপাতালের সিসিইউ'র ছোট্ট বিছানায়, আমরা বাপ-ছেলে বিড়ালের মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকি। পাশের বেডের কেউ একজন চলে গেলে, সে খবর যাতে টের না পায় আমার বুড়ো শিশু, আমি মুখটা বুকে চেপে ধরি। কানের উপর আলতো করে হাতটা চেপে রাখি... সোফা থেকে বিছানায় যাবার পথে আমি চোখ মেলে জানিয়ে দিতাম ঘুমাইনি... আব্বা বাড়ি ফিরে সেরকমই সবাইকে জানিয়ে দেন, সব টের পেয়েছেন তিনি! তারপরও পরেরবার, আরও দু’তিনবার আমাদের হাসপাতালবাসে আব্বা রাতভর আমার বুকে মুখ গোজে থেকেছেন। আর বাড়ি ফিরে আমি সোফায় শুয়ে পড়লে কাছে এসে বলেছেন, ‘ও ফুয়া, উঠতে, বাফেনু আর কুলো নিতাম পারি না, উঠো... আও বাপ-পুত ঘুমাইযাই একলগে...
আম্মার কতো অভিযোগ। আমি তারে ভালোবাসি না। আমি আগে বাইরে গেলে ঘন্টায় ঘন্টায় আব্বার সাথে কথা বলতাম। এখন তার সাথে বলি না। রাগ করি সেসব কথা শুনে। আম্মার মনের ভুল বলি। তারে বলি এতো বয়েস হলে আর বাড়িতে বার বার ফোন করতে হয় না। আমি আর বাচ্চা নই, বাচ্চার বাপ... কিন্তু আম্মাকে বলা হয় না, আব্বা এতো বেশি ছায়াময় ছিলেন, আব্বা এতোবেশি জড়িয়ে রাখতেন, অসুস্থ দুর্বল আম্মার পক্ষে সেটা অতিক্রম করা সম্ভব না। এই যে, মাঝরাতে, আম্মা এসে জানালার পর্দা তুলে দেন বাতাস ঢুকবে বলে, আমার যে তখন আব্বার কথা মনে পড়ে যায়। খাবার টেবিলে এখন আর কেউ হাজার চেনা মাছটার ঠিকুজি বলে সেই মাছ পাতে তুলে দেয় না আম্মা। মাছ আমি খাইনা, এটা সবাই মেনে নিয়েছে, আর একটা মানুষ ৩৫ বছর ধরে যে কোনভাবে মাছ খাওয়াবার চেস্টা করেই গেলো... এমনকি শেষদিনে, শেষবেলাতেও...
আমার কোন দোষ নাই আম্মা। সব দোষ সেই কালো গাব্দা গোব্দা লোকটার

Friday, June 7, 2013

মেঘবাড়ির মানুষেরা সব মেঘেতে লুকাই

তারপর ঝুম ঝুম করে মেঘ নেমে আসে। আমাদের ঘিরে ধরে। পর্দার পর পর্দা পড়তে থাকে। চোখের সীমানা ছোট হয়ে আসে। একটা হালকা স্বচ্ছ চাদরে ঢাকা পড়ে আমাদের চারপাশ। মেঘবাড়ির মানুষ আমরা, মেঘেতে হই মশগুল...
তারও আগে, ভোর হবার আগে আকাশ ভেঙে পড়ে বাড়ির ছাদে, পাশের টিলায়, ঝুম ঝুম শব্দ হয়। বারান্দায় দাড়িয়ে রাতের আলোয় দেখি সেই জলধারা। জঙ্গলযাত্রা শুরু করবো, অপেক্ষা।
এই পথে এর আগে যখন গিয়েছি, সেদিন রানা ছিলো। মাঝখানের দশকধরা বিচ্ছিন্নতার পর সেটা আমাদের লম্বাযাত্রা। এই সড়কটা প্রিয় আমার। দুপাশে বিস্তির্ন ধানক্ষেত, বর্ষায় জলে টইটম্বুর। সবুজ। একটা রেলপথ এই আসে, এই দুরে সরে যায়। সবুজ বাড়তে থাকে। ছোট ছোট টিলা, ঘন সবুজ, মাটির ঘ্রাণ, নাম না জানা বুনো ফুলের ঘ্রাণ, অচেনা মানুষের মুখ। মনে হয় এই বুঝিবা হারিয়ে যাচ্ছি, অথচ হারানো হয় না। পালাতে চাইলেও পালানো যায় না, তবু কিছুটা সময় গোপন থাকা যায় নিজের খোলসে। এবার এই পথে আমার সঙ্গি শাওন, সায়েম, শান্ত আর আরেকটা শাওন।
বাবাইকে নিয়ে আমি আর তুলি এই পথে ভুল করে একবার ঢুকে পড়েছিলাম বছর তিনেক আগে। হারাচ্ছি, হারাচ্ছি কিন্তু হারাচ্ছি না এমন একটা পথ, আঁকাবাঁকা। চায়ের ঘ্রাণ, ছায়া, প্রচ্ছায়া। অনেকটা পথ আমরা গিয়েছিলাম সেদিন। একেবারে ঘড়ি ধরে ২ ঘন্টা। হিসাবটা এমন, ২ ঘন্টায় যতটা যাওয়া যায় যাবো, তারপর আবার ফিরে আসবো... ভেতরে হারিয়ে যাবার তীব্র বাসনা তবু সংসারী মানুষের প্রগলভতা হয়তো। হাজার দিন পেরিয়ে গেছে তারপর। তবু আমরা এখনও সেই ৪ ঘন্টাকে প্রায়ই মনে করি। বাবাই বলে, বাবা আরেকদিন আমরা হারিয়ে যাবো... হয় না। কতকিছু যে হয়না...
এবার ঠিক উল্টোপথ ধরে সেই সবুজের কাছে ফিরে যাওয়া। সকালটা শুরু হয়েছে সিলেটের প্রেমময় ‘মেঘ’ দিয়ে। তারপর ঠান্ডা বাতাসে এগিয়ে চলা। আকাশে জমে থাকা কালনীর ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ে, সেই কালনী ভাসতে ভাসতে নিচে নেমে আসে, ঝর ঝর, ঝরে পড়ে...
আদিবাসী লোকটা চায়ের কাপগুলো ধুতে থাকে, ধুতে থাকে। একবার, দুবার, বার বার। কি যে যত্ন। মায়া হয়। লজ্জা হয়। আমরা এভাবে কারো যত্ন নিতে পারি না। আমরা গ্রামদেশ থেকে কত্তো দুরে চলে গেছি... তারপর সেই মানুষটা কেটলিতে প্রণাম ঠুকে ঢেলে দেয় অমৃত... আহ...
বন ঘন হবার মুখে, একটা ছোট্ট দোকান আগলে থাকেন আরেক আদিবাসী। শরীর থেকে পানির ছাট মুছতে মুছতে যখন প্রশ্ন করি, বসি এখানে? প্রান্তবর্তী সেই নারী সম্মতি জানান। অভ্যস্থ চোখে আমাদের দেখেন। নির্জনতার মানুষদের নির্জনতা আমরা ভেঙে দিচ্ছি রোজ। এখন আর তারা অবাক হন না। মনে মনে বিরক্তই হন হয়তোবা।
বন শেষে বন, চায়ের বাগান, তারপর ধান। বাঁক খেয়ে, পাক খেয়ে, কখনো সিথির মতো একহারা হয়ে রাস্তাটা শুধু এগিয়েই চলে। তারপর ঝুম-ঝুম, ঝুম-ঝুম, ঝুম-ঝুম... আমাদের ঘিরে ধরে। পর্দার পর পর্দা পড়তে থাকে। চোখের সীমানা ছোট হয়ে আসে। একটা হালকা স্বচ্ছ চাদরে ঢাকা পড়ে আমাদের চারপাশ। মেঘবাড়ির মানুষ আমরা, মেঘেতে হই মশগুল... আমাদের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে একটা যুবতি কদম্ববৃক্ষ। তার পাতার পরতে পরতে মখমলের মতো মোলায়েম পুষ্প ফুটিয়া আছে। অঝোরধারায় সেই পুষ্পের গায়ের ঘ্রাণ নেমে আসে মাটিতে। তার ছাট পড়ে চোখে, কেমন পাগল পাগল লাগে তখন...
এখানে মেঘ ইচ্ছে হলেই দলা পাকায়, এপাশ থেকে ওপাশে সরে যায়। ঝুপ করে নেমে আসে মাটিতে। ভেজা সড়ক ধরে এগুতে থাকি। আরও আরও সামনে যেতে হবে, হারিয়ে যেতে যেতে বাড়ির পথ ধরবো গৃহি মানুষেরা...
*আমরা, সিলেটের মানুষরা বৃষ্টি বলি না। বলি মেঘ। বলি ঝুম-ঝুম করে মেঘ পড়ে, তার আগে আকাশে জমে কালনি...