Tuesday, December 23, 2014

পূনর্জীবনের ইসলাম

ইসলাম পূনর্জীবন লাভ করে প্রতিটি কারবালার পর। এরকম একটা কথা বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে খুব প্রচলিত এবং জনপ্রিয় বটে। এবং সেটা উর্দুতেই বলা হয়ে থাকে সবসময়। সে হিসাবে এটি সম্ভবত উর্দু থেকেই এসেছে।
কারবালা ইসলামের ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। নিষ্ঠুরতা, শঠতা, প্রবঞ্চনার ইতিহাস এই কারবালা। তো কারবালার কথা যখন এভাবে বলা হয়, তখন আম মুসলমানের মনে এটাই খেলা করে যে, ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ভাষায় বিধর্মীদের আরেকটা মহা ষড়যন্ত্র এই কারবালা। কিন্তু আদতেতো তা নয়। কারবালা মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরই যুদ্ধ। এবং এটা প্রথম যুদ্ধ নয়। এর আগে ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.) নিহত হয়েছেন স্বজাতির হাতে। চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) যুদ্ধ করেছেন স্বয়ং নবী (স.) এর প্রিয়তম পত্নী আয়শার (রা.) বিরুদ্ধে। এই দুটি বড় ঘটনার বাইরেও যুদ্ধ অথবা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি আরও তৈরি হয়েছে কারবালা পুর্ববর্তী নাতিদীর্ঘ সময়ে। কিন্তু সেসবকে ছাপিয়ে কারবালা অন্য মহিমায় স্থান করে নেয় ইতিহাসে। এর পেছনে সম্ভবত মুসলিম নৃশংসতার একটা বড় অবদান আছে। মুসলমানদের উপর মুসলমানদের সবচেয়ে নৃশংস কর্মকান্ড এই যুদ্ধের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে।
কারবালার ঘটনার পর ইসলামের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সময় শুরু হয়। উমাইয়া এবং আব্বাসীয় খেলাফত এর পরের প্রায় ৬ শ বছর টিকে ছিলো। অন্যান্য সকল রাজবংশের মতো এই দুই বংশেও খুনাখুনি, হানাহানি, কামড়াকামড়ি সবই ছিলো। তারপরও এই সময়টাকে সুসময় হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সম্ভবত এই কারনেই ইসলাম প্রতিটি কারবালার পর পূনর্জীবন লাভ করে এই রকম কথার প্রচলন হয়েছে।
তো ঘটনা হলো মুসলমানরা মুসলমানরে মারে। এটা নতুন কোন ঘটনা নয়। ইসলামের শুরু থেকেই এটা হয়ে আসছে। মারামারি, কাটাকাটির লম্বা ইতিহাস বয়ান করে লাভ নাই। গত কয়েক দশকের ঘটনাগুলো ঘাটলেই এর সত্যতা মিলবে। আর গত দশ বছরের বিষয়গুলোতো আর ইতিহাস খুঁজে দেখতে হবে না। ঘটনা হিসাবে নিজের মনেই সব স্মৃতি হয়ে আছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে আরবের মরুভূমি পর্যন্ত যেতে যেতে রক্তের সমুদ্রে ডুবে মরতে হবে।
ধরে ধরে বর্ণনা করলে মাথা গুলিয়ে যাবে। আফগানিস্থানে একবার স্কুল ভর্তি শিশুদের উড়িয়ে দেয়া হলো বোমা মেরে, কারণ এরা কম্পিউটারের তালিম নিচ্ছিলো। কম্পিউটার নাসারাদের বস্তু। এর চর্চ্চা যারা করবে তাদেরকে মেরে ফেলতে হবে। সিরিয়ায় প্রতিদিন গণ্ডায় গণ্ডায় মুসলমানদের মারছে তাদেরই ভাই-বেরাদরে। পাকিস্তানের কথা আলাদা করে আর কি বলার আছে। প্রতিষ্ঠার মাত্র ২৪ বছরের মাথায় এই বর্বর রাষ্ট্র আমাদের উপর যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলো তাওতো এক অর্থে মুসলমানের উপর মুসলমানেরই হত্যাযজ্ঞ। যদিও এর আগে আমাদেরকে তারা হিন্দু-মালাউন-ভারতের দালাল উপাধি দিয়ে গুলির গায়ে হালাল শব্দটা সেটে দিয়েছিলো। আর এটাকে তারা জিহাদ হিসাবেই প্রচার করেছিলো পুরো মুসলিম বিশ্বে। সেই অর্থে এইটারে কারবালার সাথে তুলনা করা যাবে না। অন্তত আমাদের দেশের পাকিপ্রেমি হুজুরদের হিসাবে সেটা হবার নয়। বরং অধিকতর সাচ্চা মুসলমানদের হাতে দুর্বল ইমানের মুসলমানের মৃত্যুর সাল হিসাবে ১৯৭১ কে চিহ্নিত করলে তারা খুশি হবেন। উনারা সেটা করেও থাকেন। আর এইসব ঘটনাপ্রবাহকে ইহুদী নাসারাদের ষড়যন্ত্র হিসাবে উপস্থাপনেরও একটা জনপ্রিয় ধারণা বিদ্যমান। সেটা শুধু আমাদের বাঙ্গাল মুসলমানদের মধ্যেই বিরাজিত ধারণা নয়।
পৃথিবীর নানা প্রান্তের মুসলমানের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমার। এদের মাঝে যাদের যাদের সাথে এসব বিষয়ে আলাপ হয়েছে তারা এটাই বিশ্বাস করেন! তাদের কথার ভাবটা এমন, মুসলমানরা সবাই দুধের শিশু, ইহুদি নাসারারা এদেরকে কু পথে টেনে নিয়ে নানা অপকর্ম করিয়ে নেয়!
ইন্টারনেটের কল্যানে নৃশংসতার চিত্র এখন সহজেই পাওয়া যায়। ইউটিউবে একবার একটা ভিডিও কয়েক সেকেন্ড মাত্র দেখতে পেরেছিলাম। এর পর সহ্য হয়নি। পাকিস্তান অথবা আফগানিস্তানের তালেবানরা কাটা মাথা নিয়ে ফুটবল খেলছে! এখন যদি কোন মুসলিম বলেন, এই নিষ্ঠুরতাটা ইহুদিরা শিখিয়েছে, নয়তো কোন মুসলমান এটা করতে পারে না। এভাবে কাটা মুন্ডু নিয়ে খেলা করার মতো বর্বরতা মুসলমানদের কাজ না। তাদেরকে আবার কারবালায় ফিরিয়ে নিতে চাই। নবীদৌহীত্র হোসেন (রা.) এর কাটা মাথার কথা স্মরণ করুন। সেই কাটা মাথা নিয়ে মুয়াবিয়াপুত্র ইয়াজিদের উল্লাসের কথা মনে করুন। আল্লায় বাচাইছে তখন ভিডিও করার জামানা ছিলো না, থাকলে হয়তো হোসেনের মাথা নিয়ে ঠিক কি করা হয়েছিলো তা ইউটিউবে তুলে দিতো কেউ। আর সেটাতে হাজারে হাজারে লাইক পড়তো, যেমন এখন সিরিয়ার জিহাদীদের গলা কাটার ভিডিওতে পড়ে। এই লাইকগুলো ইহুদি খ্রিস্টানরা দেয় না, মুসলমানরাই দেয়। জিহাদ জিন্দাবাদ বলে।
পকিস্তানের তালেবানরা স্কুলে ঢুকে নির্বিচারে বাচ্চাদের খুন করেছে। এরকম খুনের ঘটনা পশ্চিমা দুনিয়ায়ও ঘটেছে। আমার পরিচিত কয়েকজন ঘটনাটা ঘটার ঠিক পরপরই এটাকে ইসলামের বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র বলে ঘোষনা দেবার পাশাপাশি সেসব ঘটনাও মনে করিয়ে দেবার চেস্টা করেছেন। এরকম যারা করেন, তাদের সাথে কথা বলে সময় নস্ট করিনা কখনো। এক দুইটা কথা বলি খুব বেশি হলে। কিন্তু কখনই তর্ক করি না। ছাগলদের সাথে তর্ক করার অভ্যাস নাই আমার। তাই তাদেরকে শুধু মনে করিয়ে দিয়েছি, যুক্তরাস্ট্র বা ইংল্যান্ডে স্কুলে হামলার যেসব ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোই প্রায় সামাজিক সমস্যা, মানসিক সমস্যা। ধর্মের কারণে এমনটা ঘটেনাই। হয় কোন অসুস্থ মানুষ গুলি চালিয়েছে, নয়তো সামাজিক দুরাচারের কারণে অস্বাভাবিক (সেও অসুস্থই) মনের কেউ এটা করেছে। তাদের কেউ মহান যিশু, কিংবা মুসা নবী জিন্দাবাদ বলে শিশুদের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি ছুড়েনি।
প্রতিটা কারবালার পর ইসলাম পূনর্জীবন লাভ করে বলার মাধ্যমে স্বীকার করে নেওয়া হয়, ইসলামে বারবার কারবালার মতো ঘটনা ঘটবে। সেই কারবালা কোনটা? সিরিয়াকে ধরবো? আফগানিস্তান নাকি পাকিস্তানকে ধরবো? ধরে নিলাম সবকটাই। যেহেতু কারবালার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে। তো এতসব কারবালার পর ইসলাম কোথায় জিন্দা হচ্ছে? সেই পূনর্জীবন লাভকারী ইসলামরে কোথায় গেলে পাওয়া যাবে? বি গ্রেডের কারবালা বাংলাদেশ ছাড়াতো (এইখানে উচা জাতের মুসলমানরা নিচা জাতের মুসলমানরে প্যাদাইছে আর লগে প্রচুর মালাউন ছিলো হিসাবে এটারে বি গ্রেডে ধরে নিলাম) আর কোনখানে ইসলাম জাগ্রত হইলো না। তাওতো ইসলামী বিশ্বের মতে, এই দেশ সেই হিসাবে পড়বে না। (সামজিক উন্নয়নের সূচক আর কিছুমিছু টেকাটুকার হিসাবে দেশটা এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝাচ্ছি।) আমি ফেলতেও চাই না। তবু মুসলমানিত্বের শান্তনা হিসাবে এই একটা দেশ ছাড়া আর কোন পূনর্জীবন লাভকারী দেশ খুঁজে পাই না। অবশ্য জিহাদিরা সিরিয়া পাকিস্তানরেই হয়তো জাগ্রত ইসলামের দেশ বলে বিশ্বাস করে।
কিন্তু এইসব জিহাদীর বাইরে যাদের অবস্থান। যারা ইসলামরে শান্তির ধর্ম বলে প্রচার করেন। যারা বলেন নাইজেরিয়ার বোকো হারেম যা করছে তা প্রকৃত ইসলাম না, তারা তাদের প্রকৃত ইসলাম বগলে নিয়ে বসে থাকেন কেনো? জাগ্রত ইসলামের ননী খাইবার আগ্রহ আছে সবার, কিন্তু রক্তারক্তি হইলে চোখে পট্টি বাঁধেন আবার সারা দুনিয়ায় ইহুদি নাসারারা মুসলমানদের শেষ করে দিচ্ছে বলে হা হুতাস করেন। তারা কেনো মুসলমানরা মুসলমানদের কাচা কাচা চাবায়া খেয়ে ফেল্লেও কথা বলেন না, সেটা বড় আজব বিষয়। যেই পাকিস্তানের এতগুলো শিশু নৃশংসভাবে খুন হলো, সেখানকারই এক বড় মোল্লা, তালেবানদের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে। লাল মসজিদের সেই লাল ইমামের লাল রক্তের প্রতি আগ্রহ থাকতেই পারে। পাকিস্তানি বলে কথা। কিন্তু এর বাইরে যত মুসলমান আছে, তারা কি করছে? কতিথ হালাল যৌনতায় রাজি না হওয়ায় ইসলামিক স্টেট এর মহান জিহাদিরা যখন দেড়’শ নারীকে হত্যা করে তখন যেমন এরা চুপ থাকে। নিরপরাধ শিশুদের বেলাতেও তাদের সেই একই ভূমিকা। এরা শুক্রবারের বিশেষ দোয়ায় আল্লার দরবারে ফরিয়াদ জানায়, বাচ্চাগুলোর পরলৌকিক মুক্তির দোয়া করে, তাদের বেহেস্ত প্রার্থনা করে। শোকাহত পরিবারের জন্য প্রশান্তি কামনা করে। কিন্তু যারা এই ঘটনা ঘটালো তাদের শাস্তি দাবী করে না! একটাবারও বলে না, হে মহান পাক পরওয়ার দেগার, তুমি এদের উপর গজব নাজিল করো। বরং বলে, হে আল্লাহ, যাদের মনে শয়তান বাসা বানাইছে, তুমি তাদেরকে দ্বীনের পথে ফিরাইয়া দেও!!! আবারও ইহুদী-নাসারাদের গাইল দেয়, বলে মুসলমানের ভেতর ঢুকে গেছে ইহুদী নাসারা, এদেরকে ধ্বংশ করে দাও...
প্রতি রোজায় ইসরাইলের নিষ্ঠুরতা যখন নিয়ম মেনে নতুন করে শুরু হয়, তখন যতো মুসলমান মিলে পথে ও প্রান্তরে, তারা কারবালা এলেই কেনো যে মুখে তালা মারে বুঝি না। রক্ত, রক্ত আর রক্ত। ধর্ম লাল হয়ে গেছে। তবু ইসলাম পূনর্জীবন লাভ করবে এই আশায় হয়তো এরা চোখে ঠুলি পরে আছে। কত কারবালা হলে এর শেষ হবে আল্লায় জানে।