Saturday, July 27, 2019

ম্লান আলোয় দেখা টুকরো শৈশব

রোজাটা ৩০ দিনের হলে সবকিছু নিয়ম মতোই হয়। আগেও হতো। কিন্তু যদি হয় ২৯, তাহলেই বিরাট ভজঘট। অবশ্য ২৯ বিরাট একটা রোমাঞ্চকর বিষয় ছিলো। ২৮ তম দিনেই আমাদের মাঝে একটা চঞ্চলতা চলে আসতো। পরশু কি ঈদ হবে? নাকি আরেকদিন বেশি অপেক্ষা করতে হবে? যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা বাটার জুতোটা কি পরা হবে পরশু নাকি আরেকদিন অপেক্ষা করতে হবে?
এটা সেসময়ের কথা, যখন আমরা কোন এক প্রত্যন্ত থানা সদরে থাকি। জগন্নাথপুর- দিরাই। নদী ও হাওরের উদার ভূমি। রোজার শেষ কয়েকটা দিন আম্মা শুধু ব্যাগ গোছাতেন। আমাদের তিনতলা ব্যাগ ছিলো একটা। নিচে গোপন তিনটা কুঠোরি। কাপড় চোপড় ভরা শুরু হলে, যখন সেটা উপচে পড়তো তখন আম্মা একটা করে চেইন খুলে ব্যাগটা বড় করে দিতেন। আর আব্বা বলতেন, ''ইয়া! ওতোতা কিতা নিতায়! একদিন আর দুইদিনর লাগি ওতোতা নেওয়া লাগেনি?'' আম্মা হয়তো বলতেন, ''হুরুতা দুগুর খতো কাপড় লাগে ইতা আপনার হিসাব আছেনি?''
আমরা তখন বিশ্বনাথে। বাসার ঠিক সামনে বড় রাস্তা। বিকালে, সময় টময় জানিনা তখন। সকাল, দুপুর, বিকাল আর রাত চিনতাম শুধু। আব্বা হঠাৎ এসে বল্লেন, কালকেই ঈদ। আম্মা দৌঁড়ে দৌঁড়ে ঘর গোছালেন। বাসার সামনে থেকেই একটা বাসে উঠা হলো। ভিড়ে ভর্তি সেই বাস। কেউ একজন চিৎকার করে বল্লেন, ''মাস্টর সাবরে সিট দেওবা।'' দুটো সিট বের হলো। আম্মা আব্বা বসলেন। আব্বার কোলে আমি। দাদাভাই পেছনের দিকে পরিচিত আরো কেউ একজনের পাশে বসলেন। সিলেটে গিয়ে আবার বাস বদলাতে হতো। তখন বাস টার্মিনাল নামের কোন বস্তু ছিলো না সম্ভবত। ক্বিন ব্রিজের আশেপাশে আসলেই শোনা যেতো ''গোলাফগইনজ-জকিগইনজ'' কিংবা বিয়নীবাজার বলে কন্ট্রাক্টররা চেঁচাচ্ছে। তেমন একটা ভিড়ের বাসে ওঠা গেলো। আমি যথারিতি আব্বার কোলে। যদিও আম্মার কোলে বসার আগ্রহটাই বেশি ছিলো। জানলার বাইরে তাকানো যেতো। মাঝখানের ফাঁকা যায়গাটায় ভাঁজ করা একটা ছোট সিট থাকতো। দাদাভাই সেটাতে বসলো। আমার ভেতরটা একদম জ্বলে গেলো। না বসলাম জানলার পাশে, না বসলাম সিটে।
হেতিমগঞ্জ বাজারে যেতেই সেই বাসটা থেমে গেলো। ইফতারের সময় হয়েছে। ছোট ছোট প্লাস্টিকের প্লেটে করে অল্প কিছু ছোলা ভাজা, দুটো মনেহয় পিয়াজু আর কটকটে হলুদ রঙের খিচুড়ি। আম্মা কখনো এতো মজার খিচুড়ি রাঁধতে পারেননি!
বর্ষায় গোলাপগঞ্জের থানার ঘাট থেকে নৌকা যেতো। একদম নানা বাড়ীর টিলার নিচে। সেই ঘাটে যখন খালামনি আমার ঘুম মুখে মায়া দিতে দিতে সজাগ করলেন তখন কতো রাত ছিলো জানিনা। কিন্তু এখন বুঝি সেটা সন্ধ্যা রাতই ছিলো। অতটুকুন পথ যেতে গভীর রাত হবার কথা নয়। আমার নানাবাড়ী। আমার জন্মমাটি। সোজা বিশ তলা ভবনের মতো খাড়া হয়ে ওঠা টিলা। শৈশব বলি আর ঈদ বলি সবটুকু স্মৃতি জুড়ে এই একটা বুনো গন্ধওয়ালা বাড়ী। তার এক পাশে উদার হাওর। অন্যপাশে গা ছমছম করা টিলার পাশ দিয়ে রেখার মতো হাঁটাপথ। উত্তরের আকাশে লেগে থাকা দুরের জাফলং কিংবা মেঘালয়ের পাহাড়...
জগন্নাথপুরে তখন গাড়ি যায়না। ভবের বাজার থেকে হেঁটে যেতে হয়। সেবার আমরা রোজা শুরুর আগেই নানা বাড়ী গেলাম। নানা বাড়ী যাবার আনন্দে প্রজাপতির মতো উড়তে উড়তে সেই পথ পেরিয়ে গেলাম। নানা বাড়ীর রোজা ছিলো একদম অন্য রকম। সেখানে রোজা রাখা যেতো। অনেক গুলো কলস সার বেঁধে রাখা মাচানের ওপর। মাটির কলস। আমরা লাইন ধরে দাঁড়াতাম। মাসী কায়দা করে একেক জনের মুখ থেকে রোজা নিয়ে টুপ করে সেসব কলসে ঢুকিয়ে রেখে ঢেকে রাখতেন। খেয়ে দেয়ে, ইচ্ছে হলে তখনই সেটা আবার নিয়ে নেয়া যেতো। নয়তো ফুটবল মাঠের মতো বিশাল উঠানে হুটুপুটি খেলে-টেলে তারপর আস্তে ধিরে আবার রোজাটা ফেরত নেয়া যেতো। মাঝে মাঝে খালাম্মা আসতেন। তখন আপা, দাদাভাই বোকাদের মতো কলসে রোজা না ঢুকিয়েই সারাদিন শুকনো মুখে হেঁটে বেড়াতো। বিকাল হলে কায়া লেগে শুয়ে থাকতো কোথাও। এমদাদ ভোন্দার মতো থাকতো। সে না যেতো খেলতে না রাখতো রোজা। আমি একদম পছন্দ করতামনা ওরে। তখন আবার তারে আমার ভাই বলতে হতো! অথচ সে আমার তিন মাসের বড়ো মাত্র।
আব্বা চিঠি লিখলেন। ঈদের আগের রাতে তিনি আসবেন। অধীর আগ্রহ নিয়ে সেই দিনের অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। কিন্তু দিনগুলো একদম আস্তে আস্তে যাচ্ছিলো। বড় মামা রোজ দুপুরেই তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন। আর ফিরতেন রাতে। হাত ভর্তি থাকতো বাজারে। একেকদিন একেক যায়গায় ইফতার করতেন তিনি। কোনদিন খালাম্মার বাড়ীতে, কোনদিন তার কোন বন্ধুর বাড়ীতে কিংবা রিয়াজ মামার দোকানে।
রোজ ইফতারের সময় বড় পাটি বিছিয়ে আমরা সবাই বসতাম। আম্মা বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকতেন। মাসী আমাদের দেখাশোনা খাবার দাবার করানো সব করতেন। আমাদের মা খালাদের চেয়ে বেশি বয়েসী একেকটা প্লেটে করে ইফতারি সাজিয়ে দিতেন তিনি। শুধুমাত্র এই সময়টাতে কলসে রোজা ঢুকানো যেতোনা। চুপটি করে বসে থাকতে হতো। ছোট একটা রেডিও ছিলো। সেখানে একটা অনুষ্ঠান হতো এক নানা তার নাতনীদের নিয়ে সম্ভবত গল্প স্বল্প করতেন। তারপর মনেহয় তেলাওয়াত হতো বা সরাসরি আজান। সাথে সাথে সেই রেডিও বন্ধ হয়ে যেতো।
সেদিন আজানের পর রেডিও বন্ধ হলো না। নানা সাহেব বল্লেন, আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে পাশে সরিয়ে রাখতে। ছোটমামা আওয়াজ কমাতে গিয়ে বন্ধ করে দিলো, তারপর আর ছাড়তে পারে না! অনেক কসরত করে, ইফতারি ফেলে যখন সেটা চালু করলো তখন গান হচ্ছে- 'ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে...' এই একটা গান জীবনের সাথে মিশে গেছে যেনো। না শুনলে মনেই হয়না ঈদ এসেছে। পরে যখন আমাদের টিভি হলো, শেষ রোজার বিকেলে টিভির সামনে বসে থাকতাম গনটার জন্য। আমারই বয়েসি ছেলে মেয়েরা লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে পুরো শরীর মোচড় দিয়ে দিয়ে গানটা গাইছে সে এক অসম্ভব ভালো লাগার দৃশ্য। যেদিনের কথা বলছি, সেদিন আমরা অধীর আগ্রহে বসে আছি সন্ধ্যার পর থেকে। আব্বা আসবেন। অপেক্ষা করতে করতে আমি কখন ঘুমিয়ে গেলাম টেরই পেলাম না। আব্বা এলেন সেটা আর দেখা হলো না। পরের ভোরে আব্বা আমার গয়ে শুড়শুড়ি দেন! আমি চোখ মেলে আব্বাকে দেখি, দেখি দিনের আলো ফুটে উঠেছে! আমি বুঝে যাই আব্বা আরো অনেক আগে এসেছেন আর আমি তখন ঘুমে ছিলাম! কাঁদতে শুরু করি, কেনো আমাকে রাতেই ডাকা হলো না সেজন্য রাগ করি। আব্বা আমাকে নিয়ে বাঘা হাওরের জলে নাইতে যান। ছোট মামা কোলে করে একদম তার গলা পানি অব্দি গিয়ে একেবারে আমাকেসহ টোপ করে একটা ডুব দিয়ে গোসল করে ফেলে!
সেবার ঈদে নানাবাড়ী খুব জমাট ছিলো। বিকেল খালাম্মা এলেন, তার আগে এসেছিলেন আমাদের আরেক খালু। মাসি আগে থেকেই ছিলেন সেখানে। আমার নানার ভাগ্না ভাগ্নিদের কেউ কেউ এসেছিলেন। উঠানে পাটি বিছিয়ে গল্পের আসর বসলো সন্ধ্যার পর। বড় খালু একটার পর একটা কিচ্ছা বলে যাচ্ছেন। মাসি একটু পর পর চা বানিয়ে নিয়ে আসছেন। পুরো বাড়ি গমগম করছে। বড় মামা একটা হ্যাজাকও জ্বালিয়ে দিলেন এক সময়। হ্যাজাকের সেই আলোতে বসেই আমাদের রাতের খাবার হয়ে গেলো, তবু কিচ্ছা আর শেষ হয় না। বড় খালু চলে গেলেও ছোট মামা একটার পর একটা কিচ্ছা বলেই যাচ্ছে, তার কোন মুক্তি নেই। অলৌকিক সেইসব গল্পমালা শুনতে শুনতে একজন একজন করে আমরা ঘুমের রাজ্যে ঢলে পড়ি।
রাত তখন ঠিক কতটা গভির জানিনা, অদ্ভুদ শব্দ শুনে ঘুম ভাঙ্গে। নিজেকে আবিস্কার করি বারান্দায়, আব্বার কোলে। আব্বা বিলাপ করে কাঁদছেন আর সবাই তাকে শান্তনা দিচ্ছেন। আমি ভয় পেয়ে যাই। কাঁদতে শুরু করি। আব্বা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন, তার কান্না থামেনা। নানাসাহেব আর নানী আব্বাকে নানান কথা বলে বুঝাতে থাকেন সেসবের কিছুই আমি বুঝিনা। আম শুধু বুঝি আব্বার অনেক কষ্ট...
পরের দিন আপা আমারে বলে, রাতে আব্বার ঘুমের মাঝে আমার দাদী এসেছিলেন আব্বাকে দেখতে, আব্বা ঘুম থেকে কাঁদতে কাঁদতে জেগে উঠেছেন। সবাই তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলো কিন্তু আব্বা থামছিলেন না। মাসি আমাকে নিয়ে এসে আব্বার কোলে তুলে দিলে আস্তে আস্তে আব্বা শান্ত হলেন।
অল্প অল্প করে লিখছিলাম। এরমাঝে খবর পেলাম বড়খালু মারা গেছেন। টুপ করে আমাদের শৈশবের একটা রঙিন দরোজা বন্ধ হয়ে গেলো খবরটা শুনে। খালুর আসর জমানো গল্প আজ এই চল্লিশের চালসে সময়েও মুগ্ধতা নিয়ে মনে করি। আমাদের শৈশব বৈচিত্র্যময় হয়েছিলো এমনসব মানুষের জন্য। এরা একজন একজন করে চলে যাচ্ছেন।
আর লিখতে ভালো লাগছে না...
বাইসাইকেল দুপুরে ঠিক ঠিক যখন
ঘুমিয়ে পড়ে মায়ের পাঠশালা। আলো
হেলে পড়েনা তখনও, তখনও মন্দিরে
টুংটাং বাজতে থাকে বাতাসের বাজনা।
তুমি তখন ঝরাপাতা বনে হেঁটেছিলে।
আজ কোন স্মৃতি নেই, ছড়ানো ঝিঙে লতা
বিরান উঠোন, ধুলো উড়ছে আমাদের নিরবতা
খসে পড়া তারাদেরও থাকে গন্তব্য
ঝরে পড়ে মেঘ হয় তুমুল বৃষ্টি
ভাসতে থাকা আলবাব, আব্বা ছাড়া
তোমার আর কোন গন্তব্য নাই

Monday, March 25, 2019

এলেবেলে দিনলিপি


দশ দিন আগে...

শীত চলে যাচ্ছে। দিন লম্বা হচ্ছে, রোদ উঠছে নিয়মিত তবু ঠান্ডা কমছে না। কারণ তীব্র বাতাস। সকালে উঠেই সেই বাতাসের আক্রমনে পড়লাম বাপ ছেলেতে। আবহাওয়া নিয়ে বাবাইর নিজের অনেক মতামত আছে। সিরি নামের এক মহিলার সাথে তার ব্যাপক খাতির। ওর কাছ থেকে এ বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করে তারপর নিজের মতামত যোগ করে। বেশিরভাগ সময় সেগুলো ঠিক হয়। মাঝে মাঝে বাঙ্গাল সূলভ বেশি কথা যদিও বলে, আমিও বাঙ্গাল সূলভ পিতাভাব ধরে সেগুলো এড়িয়ে যাই। গাড়িতে উঠতে উঠতে বলে, বাবা আজকে অনেক মেঘ হবে। ঝুম ঝুমায়া মেঘ পড়বে। তুফানও হবে। ওর কথা সত্যি হয়ে যায় মিনিট কয়েকের মাঝে। চারদিক ঝাপসা করে আসে, সাথে ঝড়ো বাতাস। বাবাই বলে, দেখলায়তো বাবা আমার কথা সত্যি হলো। আমি বলি, হু, তুমি হইলা আবহাওয়াবাবা। মাথায় একটা পাগড়ি বাইন্ধা দেই...

গতবার

কপাল যদি কারো থাকে সেইটা আমার পাশের বাড়ির মুহাম্মদের। রাস্তায় কাজ চলছিলো গতবার। বলা নেই কওয়া নেই কাউন্সিলের একটা গাড়ী এসে রাস্তার পাশে রাখা তিনটা গাড়িতে দিলো ঘষা। প্রথমে আমারটা, তারপর আরেকটা শেষটা মুহাম্মদের। শব্দ শুনে বাইরে আসতেই ড্রাইভার আগে থেকেই দুঃখ প্রকাশ করতে করতে এগিয়ে এলো। আমাকে কিছুই করতে হবে না। সে এরই মাঝে কাউন্সিলে ফোন করেছে, একজন অফিসার স্পটে আসছেন তিনি সবকিছু সামলাবেন।
গাড়ীটা যথেষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মুখে কিছু না বল্লেও মনে মনে কষ্ট পাচ্ছিলাম। আমি এবং অন্যজন তখন সেখানে ছিলাম কিন্তু মুহাম্মদের খবর নেই। বিকালে দেখলাম সে কোথায় গিয়েছিলো, গাড়ি পার্ক করছে এসে। জিজ্ঞেস করলাম, কাউন্সিলে ফোন করেছিলো কীনা? চোখ মুখ কুঁচকে প্রশ্ন করে, কেনো? আমিতো অবাক! গাড়ি চেক করেন নাই? আরো অবাক হয়ে বলে, কেনো? গাড়ির পেছনটা দেখালাম, এইযে দেখেন, সকালে কাউন্সিলের গাড়ী ধাক্কা দিয়েছিলো, সামনে টেপ দিয়ে কার্ড লাগিয়ে গেছে দেখেন নাই? সে যেনো সপ্তম আসমান থেকে মাত্রই দুনিয়ায় পতিত হয়েছে এমন একটা ভাব করতে থাকলো। দুপুরের পর থেকে গাড়ি চালাচ্ছে একটাবার খেয়াল করেনি আস্ত একটা কাগজ সাঁটা আছে সামনের কাঁচে! আমি তব্দা লেগে ঘরে ফিরে এলাম।
কাউন্সিল থেকে গাড়ী ঠিক করিয়ে বা টাকা দিয়ে দেবার প্রস্তাব এলো। আমি প্রথমটা নিলাম। দৃশ্যত গাড়িটা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও এটা চালালে কোন সমস্যা নেই বলে জানালো তদন্তে আসা লোকটা। এদিকে মুহাম্মদ কাউন্সিলের লোকটাকে পাত্তাই দিলো না। দুর থেকে দেখলাম হাত নেড়ে হাউকাউ করে ভুস করে কোথায় যেনো বেরিয়ে গেলো।
আমার গাড়ী যেদিন ঠিক করতে নিয়ে গেলো, সেই রাত থেকেই শুরু হলো প্রবল তুষারপাত। সবকিছু থেমে গেলো টাইপ অবস্থা। স্কুল বন্ধ, কাজ বন্ধ। আমরা ঘরে বসে বসে তিনদিন সিনেমা দেখলাম আর খিচুড়ি সাটালাম। এই তিনদিনে মেকানিকের ওখানে লাগলো লম্বা লাইন। ফোন করে বলে দিলো কমপক্ষে পনেরো দিন লাগবে। এটা অবশ্য কোন বিষয় না। ওরা এমনিতেই একটা গাড়ি দিয়েছে। সেটা আমারটার চেয়ে ভালো। গাড়ি আসতে দেরি হবে বলে আবহাওয়া ভালো হলে আমরা লন্ডনিস্তানে বেড়াতে যাবো বলে ঠিক করে ফেল্লাম। এরমাঝে মুহাম্মদের সাথে একবার দুর থেকে চোখাচোখি হয়েছে। গাড়ির দিকে ইশারা করে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছে।
সময়মতো গাড়ি ফেরত আসলো। পরেরদিন সকালেই মুহাম্মদ দৌড়ে আসলো, চোখে মুখে ‘ওই মিয়া করছটা কি ভাব’ নিয়া বলে আপনে গাড়ি বদলাননাই? আমি বল্লাম না, বদলাবো কেনো? আমার গাড়িটাতো ভালো। ওরা ঠিক করে দিয়েছে। সে বলে, ভাবলাম নতুন গাড়ি নিছেন, এখন দেখি আপনে একটা ভুদাই! সে নাকি আড়াই হাজার পাউন্ড নিয়েছে রাইটঅফ করে। তারপর আবার একশ পাউন্ড দিয়ে সেই গাড়িটাই কিনে নিয়েছে! আমারে ভুদাই বানায়া মাথা নাড়তে নাড়তে কোথায় যেনো চলে গেলো।
কপালের কথা ফেলে এখন বত্রিশ দাঁত নিয়া কিছু বলি। শুনেছি বত্রিশ দাঁত ওয়ালা মানুষ যা চায় ঠিক তাই হয়। সেলিনা তুলি তেমন একটা গোপন বত্রিশ দাঁত ওয়ালা মহিলা। সে যা যা বলে তাই হয় টাইপ অবস্থা। আড়াই বছর আগে যখন এখানে এলাম, একদম প্রথম দিন থেকে বাড়ির সামনের বড় দুইটা গাছ সেলিনা বেগমের দুই চোখের বিষ। এই গাছের কারণে ঘরে রোদ আসেনা, আলো পাওয়া যায়না এই হলো অভিযোগ। প্রতিদিন কমপক্ষে একবার করে হলেও সে গাছ গুলারে গালি দেয়!
আবার মুহাম্মদের কথায় ফিরে আসি। ওই ঘটনার পর থেকেই সে আমার দিকে নিয়মিত ‘ভুদাই লুক’ দিয়ে তাকায়। এরমাঝে এক রাতে কেউ একজন এসে আমার গাড়ীর কাঁচ ভেঙ্গে রেখে গেলো। মুহাম্মদ সেটা দেখেই বল্লো এটা টিলার উপরের যে পাব আছে সেই পাবের কারণেই হয়েছে। আমি যেনো পুলিশকে রিপোর্ট করি এটা। পাব কেমন করে মাঝরাতে গাড়ী ভাঙবে? সে বলে, ওই পাব থেকে মাতালরা বের হয়ে এসব মাতলামি করে, এই সুযোগে পুলিশ এবং ইন্স্যুরেন্স দুইটারেই আমার ধরা উচিত বলে সে মত দিলো। আমি বল্লাম, ইন্স্যুরেন্সওয়ালারা এসে গ্লাস বদলে দিবে বলেছে। পুলিশ বলেছে যেহেতু মাঝরাতের কান্ড, সিসি ক্যামেরা নেই, বৃষ্টি বাদলাও ছিলো, না আছে কোন ফুটেজ, না পাওয়া যাবে হাতের ছাপ তাই তারা খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। আমি যেনো সাবধানে থাকি। ওরাও নজর রাখবে। মুহাম্মদ এসব শুনে খুবই উত্তেজিত। আমার এপ্রোচে নাকি সমস্যা আছে। এই সুযোগে পাবটা বন্ধ করার একটা এপ্লিকেশন করা যেতো বলে তার ধারণা। সে আমার পূণঃভূদাইগিরিতে অত্যন্ত বিরক্ত হলো।

দশদিন আগে

বাবাইকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে বাড়ির সামনে এসে চক্ষু চড়ক গাছ। একটু আগের ঝড়ে বাড়ির সামনের গাছ দুটোর একটার বড় ডালটা ভেঙ্গে রাস্তায় পড়েছে। রাস্তা ব্লক। ডালের একটা অংশ খুবই হালকাভাবে মুহাম্মদের গাড়ীতে ছুঁয়ে দিয়েছে। সেসব দেখার সময় নেই, দৌড়ে বাড়িতে এলাম। তুলি ঘুমে ছিলো। গাছ পড়ার শব্দে ভয়টয় পেলো কিনা... ওমা সে দেখি বিছানায় হেলান দিয়ে বিগলিত জাহ্নবি হয়ে স্যুপ খাচ্ছে! হাসি হাসি মুখ নিয়ে বল্লো, দেখো গাছের ডাল পড়ে যাওয়ার ঘরে কেমন সুন্দর আলো আসছে!
মিনিট বিশেকের মধ্যে ডোরবেল বাজলো। কাউন্সিলের লোকজন চলে এসেছে। তারা গাড়ীর ড্রাইভার খুঁজছে! (যথারীতি মুহাম্মদ জানেওনা তার সোনার ডিম পাড়া গাড়ীর ঘটনা।) মুহাম্মদ সোমালিয়ান লুঙ্গি পরে উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে এলো। গেলোরে গেলো টাইপ একটা ভাব। গাছের ডাল লেগে তার বিশাল ক্ষতি হয়েছে সেটা বের করে ফেল্লো মিনিটের ভেতর। যে লোকটা আমাকে ডাকতে এসেছিলো তাকে জিজ্ঞেস করলাম এখন কী হবে। সে খুব সিরিয়াসলি বল্লো, কাউন্সিল অবশ্যই মুহাম্মদের বিষয়টা দেখভাল করবে আর এই গাছটাও কেটে ফেলবে যাতে আর কোন দূর্ঘটনা না ঘটে!

সপ্তাহান্তে

মুহাম্মদ তার সিলভার কালারের টয়োটা আজো চালাচ্ছে। এদিকে সেলিনা বেগম তুলি বিছানায় বসে বসে রোজ রোদ পোহায় আর এসপ্যারাগাসের স্যুপ টানে। মাঝখান থেকে আমার গাছটা গায়েব...