Saturday, August 25, 2007

সংসারি মানুষরা সব স্বার্থপর হয়। খুব খুব স্বার্থপর...

মঙ্গলবার সন্ধায় যখন ভাবি বলেন, তুলি চল ঢাকা থেকে ঘুরে আসি। আমি সামনে বসা। ভাবছি, আর মানুষ পায়নি... শেষ করতে পারিনি সেই ভাবনা, আমাকে অবাক করে রাজি হয়ে যায়! সে যাবে... এমনকি আমি যাব এই ঘোষনাটাও দিয়ে দেয়! প্রচণ্ড ঘরকুনো তুলির এই আচরনে বেশ মজাই পাই। জিজ্ঞেস করি, কিভাবে? ছুটি নিলেনা... আমারওতো ছুটি নিতে হবে। বেশ একটা ঝামটা খেলাম। তারটা সে সামলাবে। আমার যেহেতু ছুটি নাই তাই অফিসে এমন ব্যবস্থা করি যাতে ফোন দিয়ে কাজ সারা যায়!

সন্ধায় অফিসে চলে আসি। তাদের পরিকল্পনা আর আমার জানা হয়না। মধ্যরাতের আগে আগে ঘরে ফিরে দেখি ব্যাগ গোছানো শেষ। আমাকে জানানো হল, আমার কাপড়ও ঢোকানো হয়েছে সেই ব্যাগে! কি পাগলামি বলে উড়িয়ে দিতে চাই। মান অভিমানের গন্ধ পেয়ে কথা বাড়াইনা। আর খুব ভেতরে, মনের ভেতরে একটা লোভও হয়। কতদিন ছুটি কাটাইনা। এতদিনেও ছেলেটাকে নিয়ে কোথাও বেড়ানো হলনা।

বুধবার ভোরে ছেলে আমাকে ডাক দেয়, বাবা উঠ... আমরা ঢাকাত যাই... সেজ ভাইয়ায় গাড়ি আনছে... ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলি, তুমি যাও বাবা। বিকালে আসব আমি। সে বায়না ধরে, না এখন... আমি তাকে মানাতে পারিনা। আম্মা আসেন। বলেন, দাদু চল আমরা যাই। বাবা বিকালে আসবে। ছেলে আমার কি বুঝে জানিনা। তবে আমাকে আর ডাকেনা।

বৃষ্টির মাঝে দাদার কোলে চড়ে মাইক্রোতে চড়ে বসে বাবাই। আম্মা তার দুই বউ আর দুই নাতি নিয়ে ঢাকা রওয়ানা দেন। দশটার দিকে অফিসে চলে আসি। ম্যানেজার সাহেবকে খবর দিই। এই সময়টায় উনি ঘুমে থাকেন। ভোরে পত্রিকা বাজরে দিয়ে ঘুমাতে যান। তবুও ডাকি। খবর পেয়ে দ্রুত আসেন। বলি স্বপন সাহেব আমার ছেলেটাতো ঢাকায় চলে গেছে। এবার আমাকে যেতে হবে। আপনি অফিসটা একটু সমঝে নেন। আমি মামাকে বলে যাব। ( মামা= ইকবাল সিদ্দিকী, আমাদের উপদেষ্টা সম্পাদক।) কথা বলতে বলতে টিভি ছাড়ি। সি এস বি নিউজে যাই। ওমা একি। ঢাকাযে রণত্রে। দ্রুত কম্পিউটার অন করেই বিডি নিউজ, ব্লগ সবকটা উইন্ডো খুলে দেই... সবখানে একি খবর। খবরের মানুষ। এসবে কখনই ঘাবড়াইনা। বরং একটা উল্লাসই খেলা করে মনের ভেতর বুঝিবা। নিউজের গন্ধে এমনটা মনেহয় অনেকেরই হয়। কিন্তু আজ কেমন ঘাবড়ে গেলাম। ফোন করি ভাবির ফোনে। তুলিকে এসব বলা ঠিক হবেনা। ঘাবড়ে যাবে। তারা তখন উজানভাটি পাড়ি দিচ্ছেন। জিমেইলে পিয়াল ভাই যেসব কথা বলেছিলেন সেটুকু পাচার করি। তাদেরকে টঙ্গি দিয়ে শহরে ঢুকার কথা বলি। যদিও সেই রাস্তাটা কতটা নিরাপদ সেটা জানিনা। তবু আন্দাজে ধরি। কারন খবরতো সব শহরের।

এরিমাঝে সিলেটের খবরও আসতে শুরু করেছে। শাবিতে মিছিল। আমি বেশি পাত্তা দিইনা। এমসি কলেজের খবরটা জরুরি। সিলেটে কিছু হলে সেখানেই হবে। মদনকেও হিসাবে ধরি। একটু পরেই খবর আসে। এমসি কলেজে মিছিল চলছে। কিন্তু র‌্যাব-৯ হেডকোয়ার্টার কলেজের খুব পাশে থাকায় ছাত্ররা বেশি সুবিধা করতে পারেনি। খুব দ্রুত তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। নিজের কাজগুলো খুব দ্রুত সামলে নিই। এই প্রথম পেশার প্রতি টানহীন হয়ে পড়ে নজমুল আলবাব... বার বার মনে হতে থাকে, আহা ছেলেটা এভাবে বল্ল, কেন গেলামনা সাথে। সেইতো বিকালে যাব, তবে কেন কয়েক ঘন্টা আগেই গেলামনা... মুহুর্ত যায়না আমি ফোন করি। এখন কোথায়? উত্তর শুনে মনে হয় মাইক্রোর ড্রাইভার হারামজাদাকে জোরে একটা থাপ্পড় দেয়া দরকার। সে এমন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চালায় কেন... ভাবি আমাকে শান্তনা দেন। নিশ্চিন্ত থাকতে বলেন। তুলি আমাকে আবারও অবাক করে বলে, আমি যেন চিন্তা না করে বিকালে বাসে উঠার ব্যবস্থা করি। আগে আগে টিকেট না কাটলে ভাল যায়গায় সিট পাবনা এটাও মনে করিয়ে দেয়।

ওরা ঠিক মতো দুপুরের পরেই মীরপুরে পৌছে যায়। ঘরে ঢুকেই আম্মা ফোন করেন। আর চিন্তা করনা।

ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকি। জরুরি কাজ গুলো স্বপন সাহেব বুঝে নেন। টিকিটের জন্য বাসের কাউন্টারে ফোনটাও তিনি করেন।


টিভি চলছে। খবর দেখছি... কেমন একটা দুলোনি টের পাই রক্তে... কিন্তু সেই দুলোনিটা বেশিন আমাতে স্থায়ি হয়না। কারন আমি জেনে যাই অনির্দিষ্টকালের কার্ফিউ জারি করেছেন ‘সরকার বাহাদুর’! আমি বুঝে যাই বাবাইটা আমার একাই কাটাবে ঢাকায় বন্দি জীবন। এবারও তুলির বেড়ানো হলনা... বিকাল পাচটার দিকে ফোন করি। দেখা যায়না তবে অনুভব করি তুলি কাদছে... তবে সে কান্নায় যতটানা কষ্ট তারচে অনেক বেশি ক্ষোভ... বাবাই আমায় বলে বাবা তুমি আওনা খেনে... আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে... বলি, বাবা তুমি ভাইয়াকে নিয়ে ঢাকার নানার সাথে বেড়াতে যেও। ছেলে আমার আর কিছু বলেনা, বলতে পারেনা... ধাতব শব্দ বাজে খুব হালকা সুরে... লাইনটা কেটে যায়... আমি আবারও ফোন করার চেস্টা করি, পারিনা। অনেক্ষন লেগে যায় আমার, মোবাইলের নেট বন্ধ এই কথাটা বুঝতে...


Sunday, August 12, 2007

:: এক হাতে আর তালি বাজাবনা ::

আর ভাল্লাগেনা, পেছনের বেঞ্চে বসে বসে আমি ক্লান্ত।
মনোযোগহীন হয়ে থাকতে আর ভালো লাগেনা,
একদম ভাল্লাগেনা, একদম...

মিছিলের পেছনে আর কত হাটব?
এবার আমি সামনে আসতে চাই।
আর কত অন্যের তোলা সুরে গলা মেলাব?

এক হাতে তালি বাজাতে বাজাতে হাত
তার স্বতস্ফুর্ততা হারিয়েছে। সে এখন
সঙ্গি খোঁজে। এবার আমি শীতঘুমে যাব
দেখি কেউ আমার ঘুম ভাঙ্গাতে আসে কিনা

Thursday, August 9, 2007

:: কাল ঘুম নেমে আসে তার দু'চোখ জুড়ে ::

১.
কাল রাতেও ঘটনাটা ঘটল। আমি খেতে বসতেই অনন্যা এসে হাজির। হিস হিস করে বলে, ‘ ভাবী তোমার লজ্জা করেনা? নিজের বুঝ ঠিকই বুঝ, আর অন্যের কিছু পেলে হুলস্তুল বাঁধিয়ে দাও!’ আমি আর খেতে পারলামনা। গলায় কষ্ট দলা পাকিয়ে ব্যাথা শুরু হল। চব্বিশ ঘন্টা আগের ঘটনাটা বলতে গিয়েও রুপার গলাটা ধরে আসে। কেঁদে ফেলে। জহির বউকে শান্তনা দেয়। আহা কেঁদনাতো। ঠিক হয়ে যাবে সব। কালই আমি বকে দেব অনন্যাকে। রুপার মন অন্যদিকে ফেরাতে চেস্টা করেন। তবু সে ফুঁপাতে থাকে। বলে যায়, মা-ও কিছু বল্লেন না। যেন আমি মহা অন্যায় করেছি। তারইতো মেয়ে। কিছু যদি হয়, আমার থেকেতো তারই বেশি কষ্ট হবে। কিন্তু তার ভাব দেখে মনে হল অনন্যা যা করছে ঠিক করছে। আমি এ নিয়ে কথা বলে অন্যায় করেছি! আর এমন কি আছে যেটা আমি আগলে রাখি। কি এমন অপরাধ আছে আমার...
রুপার হয়ত আরও কিছু বলার ছিল। পিয়ারি সেটা হতে দিলনা। রাত একটায় তার একবার খাবারের দরকার হয়। বুকের দুধ পায়না বলে সময় ভাগ করে ফিডার দিতে হয়। রুপা ব্যস্ত হয়ে পড়ে পিয়ারিকে নিয়ে। জহির হাপ ছেড়ে বাঁচে। মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলে রুপা অন্যভূবনে চলে যায়। জহির মুগ্ধ চোখে রুপার সন্তান সেবা দেখতে থাকে। তার চোখ বুজে আসতে চায় ঘুমে। তবু সে জেগে থাকেন। পিয়ারিকে দেখে। রুপাকে দেখে...।
সামলে নিয়েছে রুপা। জহিরের দিকে তাকিয়ে বলে, কি হল তুমি আজ দেখি বড় জেগে আছ। ঘটনা কি? নির্দোষ হাসি হেসে জহির বলে, কাল শুক্রবার না? সকালেতো আর দৌড় নাই। রাত জাগলে সমস্যা কি। সে রুপার দিকে তাঁকিয়েই থাকে। রুপার কেমন মায়া হয়। এই মানুষটা এমন কেন। মাটি মাটি ভাব নিয়ে এই জামানায় এসে সে কিযে ভূল করেছে এই ব্যাপারটাও সে বুঝেনা। শুধু নিজেই নয় সাথে তার মত অতি সাধারন মেয়েটাকেও বিপদে ফেলেছে। আর রুপাও কেমন মেয়ে। এমন ছেলেদের বউ হতে হলে একটু ডাকাবুকো হতে হয়! একজন মেনমেনা হলে আরেকজন হবে গরমাগরম। যাতে সব কিছু পুষিয়ে নেয়া যায়। তা না রুপা জহিরের চেয়ে আরও কয়েকগুন বেশি নরম সরম। কোন কিছুই সামলাতে পারেনা। রাতে শুধু বালিশ ভেজায় আর বেচারা জহিরকে কষ্ট দেয়।
দেড়টা বেজে যায় পিয়ারিকে সামলাতে সামলাতে। জহির তখনও জেগে আছে। মেয়ের নরম নরম গালে একটু পর পর গাল ঘসে দেয়ার চেস্টা করছে। রুপা তাকে বার বার বলছে, এমন করোনা প্লিজ। ঘুম ভেঙ্গে যাবে ওর। কে শুনে কার কথা! জহির এই যদি হাত বাড়ায় তো পরনেই মুখ বাড়ায়। ফেরাতে গেলে সে রুপার দিকে ঠোট বাড়িয়ে দেয়। কি এক যন্ত্রনা... পিয়ারিকে কোন মতে বিছানায় রেখে যুদ্ধ ঘোষনা করে রুপা। বলে আস দেখি, আমার সাথে আস। দেখি কত শক্তি তোমার। জহির ফিস ফিস করে বলে, এভাবে উসকানি দিতে নাই। জাননা আমার ভেতর বারোশ বাঘ ঘুমিয়ে থাকে! তাকে জাগাতে যেওনা... রুপা তার রাজহংসির মত কন্ঠ উচিয়ে বলে, আহারে কি আমার বাঘ পুষনেওয়ালা!
সকালে ঘুম ভাঙলে জহির দেখে সে একা বিছানায় পড়ে আছে। রুপা, পিয়ারি কেউ নেই। চোখ কচলে ঘড়িতে তাকায়, সাড়ে এগারটা। লাফ দিয়ে উঠে। আজ বাজারে যেতে হবে। জুমআর নামাজ পড়তে হবে। আর এখনও সে ঘুমে...
জুমআর পর বাসার সবাই এক সাথে বসে খাওয়ার নিয়ম। টেবিলে বসেই টের পায় জহির, আজ কেমন যেন এক গুমোট ভাব। কি যেন এক বাধা সবার মুখে থমথমে ছাপ একে দিয়েছে। মা’ই প্রথম কথাটা তুলেন। জহির কাল তোর বউ কি করেছে শুনেছিস। কি করেছে? কি করেনাই সেইটা বল আম্মা, বলে খাকারি দিয়ে উঠে অনন্যা। অনেক দিন পর জহিরের রাগ উঠে, ধমক দিয়ে উঠে, মাকে কথা বলতে দে অনন্যা। অনন্যা সেই কথায় কান দেয়না, আরও জোরে চেচিয়ে বলে, কেন, আমি বলবনা কেন? তোমার বউ আমাকে নিয়ে উল্টা পাল্টা বলবে আর আমি কিছু বলতে পারবনা। জহির ঠান্ডা গলায় বলে, কি বলেছে রুপা? অনন্যা সপ্তমে চড়ানো গলায় বলে, আমাকে নিয়ে তোমার বউ মায়ের কাছে বিশ্রি বিশ্রি কথা বলেছে কাল বিকেলে। সে বলেছে, আমি নাকি সুমনের সাথে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াই। সুমন একটা বাজে ছেলে। তার সাথে থেকে আমিও বাজে হয়ে যাব... জহির ক্ষেপে গিয়ে চিত্কার করে উঠে, ঠিকই বলেছে রুপা।
এবার কথা বলেন মা। জহির তুই যদি তোর বউয়ের কথায় লাফ দিস তাহলে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু ঘরের বউ হয়ে সে যদি আমার মেয়ের বিরুদ্ধে এমন কথা বলে সেটা সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া সুমনতো খারাপ ছেলে নয়। এই বয়েসে অনেকেরই অনেক সমস্যা থাকে। সব ঠিক হয়ে যাবে। জহির অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মাথায় মায়ের কথাগুলো ঠিক ঢুকেনা। কয়েক মূহুর্তের জন্য বেশ বড় গলায় কথা বল্লেও আবার সে চুপসে যায়। গলায় খাবার আটকে যায়। হাত ধুয়ে ফেলে। আর খেতে মন চায় না। রুপা তার মতো উঠতে পারেনা। টেবিলে বসে তাকে অনন্যার অশ্রাব্য কথামালা হজম করতে হয়।
মন খারাপ করে জহির ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পিয়ারিকে নিয়ে অন্য বন্ধের দিনে এই সময়টায় সে খেলা করে। আজ আর তাতে মন উঠলনা। ঘরটাই তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। সুমনের মত একটা বাজে ছেলের জন্য মা কথা বলবেন এটা ভাবতেই তার মাথায় টনটন করছে। রুপা আগেও বলেছে, অনন্যার চালচলন ভাল ঠেকছেনা। তাছাড়া সুমনের সাথে তার সম্পর্কের কথা দ্রুত সবার মুখে ছড়িয়ে পড়ছে। এটা থামানো দরকার। রুপা কাল বিকেলে অফিস থেকে ফেরার সময় অনন্যাকে সুমনের বাড়ি থেকে বের হতে দেখেছে। সুমনের বাবা-মা দুজনেই দেশের বাইরে থাকেন। ভাই, বোনও তাই। খালি একটি বাড়িতে এভাবে যাওয়া শোভন নয় সেই কথাটাই সন্ধায় শাশুড়িকে বলেছিল রুপা। তার জের ধরেই এতকিছু।
২.
অনন্যার মুখে খই ফুটছে যেন। রুপা তার ভাইটার মাথা চিবিয়ে খেয়েছে। সহজ সরল পেয়ে যা ইচ্ছা তাই করছে। চাকরির নামে সারদিন বেশ্যাগিরি করে বেড়ায় আর ঘরে এসে মহিয়সি ভাব ধরে। মা’ও বলেন তার ইচ্ছামত। নিজের ইচ্ছেমত ছেলেটার বিয়ে দিতে পারলেননা। কোত্থেকে এক আকামের মেয়েকে ছেলে জোগাড় করে আনল আর আজ সেই মেয়ে তার ঘরের ইজ্জত নিয়ে কথা তুলে! এইসব প্যাচঘোচের কথায় রুপার মাথা ঝিমঝিম করে। সে ভেবে পায়না তার অপরাধটা কোন যায়গায়। পালিয়ে আসুক আর যাই করুক সেতো এই ঘরের বউ। তারকি কোন অধিকার নেই ঘরের ভাল মন্দ কিছুতে মত দেবার। আর এটাইবা কেমনতরো আক্রমন। তার চরিত্র নিয়ে কুত্সা রটানোর মত রুচি এরা কোত্থেকে পেল। জহিরের উপর তার রাগ হতে থাকে। এই সময় কেমন সে পালিয়ে গেল। তার উপর দিয়ে এত অশ্লিল ঝড় বয়ে যাচ্ছে আর জহির কিনা বাইরে বাতাস খেয়ে বেড়াচ্ছে!
কথার তুবড়ি এখন জমেছে রুপার চরিত্র আর চাকরির উপর। বস্তিতে ঘুরে বেড়ানোর কাজ কোন ভদ্র বাড়ির মেয়ে করে বলে কোনদিন শুনেনি অনন্যা। তার মা’ও শুনেননি। আর সেইরকম একটা মেয়ে তাদের ঘরের বউ হয়ে এলো!
৩.
অনেকক্ষন ধরে রুপার কানে আর কোন কথা ঢুকছেনা। তার পুরোটা মাথা যেন ফাঁকা হয়ে গেছে। বারবার জহিরের কথা মনে পড়ছে। এভাবে তাকে এই ঘরে একা ফেলে সে চলে যেতে পারল? এভাবেইকি সে সব যুদ্ধে তাকে অসহায়ের মত ফেলে যাবে! তার চরিত্র আর পেশা নিয়ে এরা বারবার বকে যাচ্ছে আর সে কিছুই বলতে পারছেনা! তাকে যে আগলে রাখতে পারতো এসব থেকে সেই মানুষটাও কাপুরুষের মত পালিয়ে গেল...

Wednesday, August 8, 2007

:: নাতাশার নানীর গাড়ীতে ::

আহা আলবাব তুমি আর কত বেচাইন হবে!
নাতাশার নানীর গাড়ীতে বসে বসে তুমি
এইসব উকিল মুহরির দৌড় দেখেই আগামী
দিন কাটানোর জন্য প্রস্তুতি নাও...

আহমেদ নূর বেটা চাঁদাবাজ বটে!
তার আছে আরও অনেক জারিজুরি
তুমি তার কত পাশ টানবে?
তোমার আর কতটুকুনই আছে ক্ষেমতা?

নাতাশার নানী এই গাড়ী কিনেছিল বলে,
তার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দরকার বলেই
আজ এই কাচারির উঠানে তুমি আরামে
বসে আছ আর গেজাতে গেজাতে গিলছ
আমের আচার, গোপালের পান।

বিকেলের নীল প্রিজনভ্যানে দাগী অপরাধীর ভিড়ে
ভাঙ্গা পা টানতে টানতে মৌলির বাবা যখন মিশে
যান, তার আগে পত্রিকায় মোড়ানো মিহিদানা মিস্টি
হাতে পেয়ে লোকটার চোখ কেমন জ্বলজ্বল করে উঠে...

আহা আলবাব তুমি আর কত বেচাইন হবে...
এইসব উকিল মুহরির দৌড় দেখেই আগামী
দিন কাটানোর জন্য প্রস্তুতি নাও...

:: বৃষ্টির গান ::

এপাশে বৃষ্টি ওপাশে বৃষ্টি
জারুল বৃক্ষের শিয়রে সংসার
তুমি যোগীনী...
ধ্যানে মগ্ন...

আদম কী ইভ'কে এভাবে কখনো
জড়িয়ে ধরেছিল বৃষ্টির শিয়রে...
আলবাব...
যোগীনীর নিঃশ্বাস...

ইভের ঠোঁট এতটা
কোমল ছিলনা নিশ্চিত।

:: সে রাতে পূর্ণিমার সাথে আমি তোমাকেও দেখেছি ::

১.

তখনও বুঝিনি আকাশে অতটা উজ্জলতা ছিল। হঠাত করেই ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। মুমু বল্ল সে ছাদে যাবে। বন্ধ ঘরে তার ভাল লাগছেনা। দম বন্ধ হয়ে আসছে। বাধ্য হয়ে তাই বেরিয়ে আসি। মোমের আলোয় যতটা দেখা যায় ততটা দেখে সিড়ি বাইতে থাকি। একহাতে মোম অন্য হাতে ধরে রাখি মুমুকে।
সিড়িটা বেশ খাড়া। অন্যবাড়ির দেড় সিড়ি সমান এর একেকটা সিড়ি! মুমুকে বলি, কষ্ট হচ্ছে উঠতে। ম্লান হাসি হেসে বলে, তুমি জিজ্ঞেস করতেই উধাও হয়ে গেল! আমি দাঁড়িয়ে যাই। ওর চোখে চোখ রাখার চেস্টা করি। মোমের আলোয় কেমন এক মায়ার খেলা দেখতে পাই। বিষন্নতার মাঝে খেলা করে যেন অন্যরকম এক আলোর ছটা।
সিড়ি ঘরের দরজাটা খুলতেই আমি চমকে উঠি। বিস্ময়ে উল্লাস করে উঠে মুমু। কতদিন পর মুমু এমন বিস্মিত হয়! আশ্চর্য রুপালী আলোর কেমন এক ঘোর লাগা সময়ে আমরা প্রবেশ করি। মুমু মাদক জড়ানো কন্ঠে বলে, আজ কী পূর্ণিমা! আমি বলতে পারিনা। কতদিন হল পূর্ণিমার খোজ নিতে পারিনা।
ছাদে ছড়িয়ে আছে ছোটবড় বেশকটা ফুলের টব। বাগান বাগান একটা ভাব আনার চেস্টা করা হয়েছে। তিনতলার মিতা ভাবীর কাজ। সিমেন্ট দিয়ে দুটি বেঞ্চও বানানো হয়েছে। তারই একটাতে বসি। আসলে আমি বসি। মুমু দাড়িয়ে থাকে বেশ কিছুন। চাদের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। কয়েক মিনিট পর, কোমরের পেছনে একটা হাত আর আরেক হাতে তলপেটটা হালকা তুলে ধরে এক অনুপম ভঙ্গিতে মুমু বসার চেস্টা করে। আমি হাত বাড়িয়ে ওকে একটু ধরতে চেস্টা করি। মুমু মানা করে, বলে দেখিনা বসতে পারি কিনা... বলতে বলতে বসেও পড়ে। তারপর হেসে বলে, দেখলে, বসে পড়লাম!
বেশিক্ষন আর বসা হয়না।প্রথমে মাথাটা আমার কাধে হেলিয়ে দেয়... তারপর পুরোটা শরির। একসময় বলে পা’টা একটু তুলে দাওতো...। আমার কোলে মাথা রেখে আধশোয়া হয়ে পড়ে থাকে। কস্ট হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করলে বলে, নাহ... অনেকদিন ধরে এমন ভাল লাগেনা... কেমন চাদ উঠেছে দেখ আকাশে।
পূর্ণিমা নিয়ে আমার অত রোমান্টিকতা ছিলনা কোনকালেই। মুমু আমাকে কোন ফাঁকে চাঁদকে ভালবাসা শেখালো জানিনা। আমিও এখন মুগ্ধতা নিয়ে চাঁদ দেখতে পারি সারাটা রাত!
কেমন এক কস্টের শব্দ উঠে মুমুর গলা থেকে। আমার সকল ভূবন কেঁপে উঠে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই আমার হাতটা ধরে নিয়ে তার পেটে হালকা ভাবে রেখে দেয়! সেখানে তখন উথাল পাথাল ঢেউ উঠেছে। বলি, কস্ট হচ্ছে তোমার? মুমু বলে, হ্যা, আবার না। আমি ধ্বন্দে পড়ে বলি, কি বল।
তখনও চলছে উথাল পাতাল ঢেউ। আমি বলি কি দিয়ে এমন ঢেউ তুলে? হাত? না বলে মুমু... এটা হল পা। আঁতকে উঠি! পা! তাহলেতো খুব শক্তি নিয়ে নাড়াচ্ছে। আমাকে আশ্বস্ত করে বলে, নাহ। বরং না নড়লেই কষ্ট। মনে ভয় হয়, কী হল সোনাটার? ওর কি কোন সমস্যা? নড়াচড়া করা মানে ও সুস্থ আছে! আমি কোন কথা বলিনা, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি।
মুমু জিঙ্গেস করে, আজ কত তারিখ। জানুয়ারির বিশ। আঙ্গুলে গুনতে গুনতে বলে, তাহলেত আর দশ দিন। আমি কেঁপে উঠি। ওর হাতটা শক্ত করে ধরি। মুমু বলে, কি হল। তুমি এমন করছ কেন? কই আমাকে একটু সাহস দেবে! না উল্টো নিজেই ঘাবড়ে যাচ্ছ। আমি হাতটা আরও শক্ত করে ধরি। বলি, না ঠিক আছে।

২.

উনত্রিশ তারিখ বিকেলে হাসপাতালে যেতে হয়। মুমুর শরিরটা তেমন ভালনা। ডাক্তার আগেই বলেছেন অপারেশন লাগবে। তাছাড়া আরও সমস্যা হতে পারে। তাই আগে থেকেই হাসপাতালে থাকতে হবে। আগের রাত পর্যন্ত আমরা একসাথে ছিলাম। বিচ্ছিন্নতা। কেমন খালি খালি লাগে সব কিছু। লেবার ওয়ার্ডে পুরুষদের যেতে দেয়না। আমার তবু যেতে ইচ্ছে হয়। আমি করিডোরে পায়চারি করি। মা আমাকে বলেন, তুই বাড়িতে চলে যা। অন্যবেলাতে আসিস। আমি হ্যা না কিছুই বলিনা। মাথা নেড়ে আবার পায়চারি করতে থাকি।

৩.

সন্ধা তখনও নামেনি। অথবা রাত হয় হয়। সাদা সাদা চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকায় মুমু। আমি কোন চোখে তাকাই তার কোন বর্ণনা নিজের কাছে নেই। একবার ছুতে মন চায় মুমুর কোমল গাল। ওর কাঁধে হাত রেখে বলতে ইচ্ছে করে, এইতো আমি আছি। বলা হয়না। চেনা অচেনা কতজন তাকে ঘিরে ধরেন। আমি আর এগুতে পারিনা। চোখে শুধু চোখ রাখা হয় মুহুর্তের জন্য। দরজা পেরিয়ে নিঃশব্দের ওপাশে চলে যায় মুমু। মিনিট পাঁচেক পর সেই দরজায় জ্বলে ওঠে লাল রঙের বাতি... আমি দাড়িয়ে থাকি... আমি হাটতে থাকি...

:: আমাদের ক, খ, গ, ঘ, এবং ঙ ::

ক.
বাড়ির সামনেই কবরটা। সাদা মার্বেল দিয়ে বাঁধিয়ে রাখা। আগে ছিল লাল রংএর ইটের দেয়াল। তিন বছর আগে দাদা যখন সার্টিফিকেটধারী রাজমিস্ত্রি হল তখন মার্বেল দিয়ে বাঁধিয়ে দিল। এতে নাকি তার মেধার উন্নতি হবে। আগামিতে সে হবে ফাঁটাফাঁটি ইঞ্জিনিয়র। এমনই আমাদের বিশ্বাস। আমরা সবাই বিশ্বাস করি। যতকিছু আছে আমাদের ভালো সবই তার দোয়ায়। আমরা বিশ্বাস করি আমাদের বিপদ আপদ সবই হয় যখন তিনি রেগে যান।
খ.
আমাদের মূলত নির্ভেজাল জিবনযাপন। আমদের বাড়ির ছেলে মেয়েরা পড়ালেখায় ভাল। পাশ করার আগেই তারা কাজ পেয়ে যায়। ভালো ভালো সব চাকরি। ভালো সব ব্যবসা। সবই আছে আমাদের।
গ.
রোজ স্কুল, কলেজ অথবা অফিস যাওয়ার পথে আমরা শান বাঁধানো কবরটার সামনে দাড়াই। নতজানু হই। আমরা নিজেদের জন্য সুভসময় নিশ্চিত করে সেই কবরের সামনে থেকে যার যার গন্তব্যে রওয়ানা দেই। বাবা বলেছেন, মা-ও বলেছেন কবরের সামনে নতজানু হই বলেই আমরা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারি।
ঘ.
শাহানা একবার স্কুলে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছিল। কিভাবে তা জানিনা। তবে মা বলেছিলেন, সেদিন নাকি ওর কবরের কাছে যাওয়া নিষেধ ছিল। তবুও গিয়েছে তাই এই শাস্তি। এভাবে প্রতি মাসে নিয়মিত শাহানার উপর কবরে যাওয়ার ব্যপারে নিষেধাজ্ঞা থাকে! সেই কবরের এমনই অলৌকিক মতা! তাকে মেনে চলতেই হয়। তার কথা না মানলে নিশ্চিত শাস্তি। যখন বেঁচে ছিলেন তখন তা আরও কঠিন ছিল। ছোট চাচা তার কথা না শুনায় কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছেন কেউ জানেনা।
ঙ.
৭১ সালে দাদাজান বলেছিলেন, মহান ইকবাল আর কয়েদ এ আজমের স্বপ্নের দেশ কখন্ও ব্যর্থ হতে পারেনা। কাফেরদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে। ছোটচাচা সেটা মানেননি। তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। সে খবর শুনে ক্ষেপে গিয়েছিলেন দাদাজান। অভিশাপ দিয়েছিলেন। ছোট চাচা সেই অভিশাপ কাটাতে পারেননি। তিনি ফিরে আসেননি। বড়চাচা ভাইয়ের পক্ষে কথা বলেছিলেন। তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। তিনি আর এ বাড়িতে ঢুকতে পারেননি। আব্বা দাদাজানের কথা শুনেছিলেন। আমাদের সময় এখন সবসময় সূর্যরাঙা। আমরা ভাল আছি, ভাল থাকি...

:: আমার কোনদিন দুধ চা খাওয়া হবেনা ::

বেশি সময় কারও লাগেনা। বুঝে ফেলে। আমার দৌড়টা তাদের জানা হয়ে যায়। এর জন্য আমি নিজেই আসলে দায়ী। ভাব ধরাটা শিখতে পারলামনা। তাই খুব সহজেই সবাই বুঝে ফেলে আমি মূলত অন্তজ শ্রেনীর মানুষ।
আমি নাকি ঠিক মানানসই নই এই সময়ের জন্য। পরিচিতরা সবাই বলে। এমনকি মাও বলেন, তুই বুঝিসনা দিনদুনিয়া কোন তালে চলে এখন! আমি কোন উত্তর দিতে পারিনা। মাথা চুলকাই।
কাদির মিয়া আমাকে কেন যেন খুব পছন্দ করে। জেলখাটা দাগী আসামী। নামের শেষের মিয়াটা উধাও হয়ে সেখানে ডাকাত শব্দটা ঠেসে ছিল অনেকদিন। কি করে যেন সে আমাদের অফিসে এসে জুটে গেল আর আজব কোন এক কারনে আমার সাথে তার খাতির হয়ে গেল। কাচের মগে লাল চা দিতে দিতে বলত, স্যার আপনার জীবনে কোনদিন দুধ চা খাওয়া হবেনা। আমি অবাক হয়ে বলতাম, মানে? সে বলত, এইত রোজ রোজ লাল চা খাবেন। দুধ কেনার টাকা হবেনা! আমি ঠাঠা মারা হাসি দিয়ে তাকে লাল চার গুনাগুন বুঝাতে চাইলে সে শুধু মিট মিট করে হাসত। সব কথা শেষ হলে মাথা নাড়তে নাড়তে সামনে থেকে বিদায় হত। মাথা নাড়াড় ভঙ্গিটায় স্পস্ট বুঝা যেত তার মনের কথা... আপনেরে দিয়া কিছুই হবেনা টাইপ মাথা নাড়ানো।
অফিসে ওই কাদির মিয়া ছাড়া আর কেউ আমারে পাত্তা দেয়না। এমনকি যারা আমারে পাত্তা না দিলেই নয় তারাও না। সেলসে যারা কাজ করে তাদের প্রতিদিনকার কাজের হিসাব নেয়ার দায়িত্বটা আমার। ওদের লগবুকে আমার সই না থাকলে বেতন হয়না তাদের! সেই অর্থে আমি তাদের কাছে বিশাল মতাবান কিছু একটা হওয়া উচিত। কিসের কি, আমার কাছ থেকে তারা প্রতিদিন এমনভাবে সই নেবে, ভাব দেখে মনে হয় কারো খাতায় যদি আমি সই না দিই তাহলে আমার এমাসের বেতন আটকে দেয়া হবে!
আমাদের অফিসের সবারই প্রায় আরামের জীবন। আমাদের বাড়ির প্রায় সবারই আরামের জীবন। আমি শুধু সেখানে বাগড়া। ফেলনা টাইপের কিছু একটা। কোন কিছুতেই আমার প্রবেশাধিকার নেই। অফিসের আর সবাই মিলে অনেকধরনের ধরনের মজা করে। আমি তাতে কোনদিনই সুজোগ পাইনা। কাদের মিয়া না থাকলে সেসবের খবরই আমি পেতামনা। তবে একবার আমিও গিয়েছিলাম সেরকম এক আয়োজনে। আসলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেদিন পাচটা না বাজতেই অফিসটা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। আমার আবার রোজ রোজ দেরি হয় অফিস থেকে বেরুতে। প্রায়ই সেলসের ওরা ফিরতে দেরি করে ফেলে। সাড়ে পাচটার দিকে ফোন আসল। মহিউদ্দিন সাহেব ফোন করেছেন।
- কি খবর মোকাম্মেল ভাই, এখনও আপনি অফিসে।
আমি বলি, কাজ শেষ করতে দেরি হয়ে গেল মুহিভাই।
-সেতো আপনার রোজই হয় বলে তিনি কাদির মিয়ার খোজ করেন। আমি বলি ওতো চলে গেছে। আমার রুটিন জানতে চান তিনি। আমি বলি বাসায় চলে যাব মুহি ভাই। মুহিভাই আজব এক কথা বলেন এর পর। তিনি আমাকে তার বাসায় যাওয়ার প্রস্তাব দেন। আমি অবাক হয়ে যাই। ধাতস্ত হয়ে বলি, না ভাই আজ না আরেকদিন। তিনি নাছোড়বান্দা। বলেন, আরে আজই আসেন। ১০ মিনিটের জন্য হলেও আসেন। কি আর করা। রাজি হতে হয়। মুহিভাই তার বাড়ির নাম্বার দিয়ে আমাকে বলেন, একটা কস্ট করতে হবে কিন্তু মুকাম্মেল ভাই, আমার টেবিলের তলায় ছোট একটা বাক্স আছে একটু কস্ট করে ওইটা নিয়া আসতে হবে। আমি বাড়ির পথের উল্টা পথের রিক্সায় চড়ে বসি। প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের বাক্সটা হাটুর ওপর শক্ত করে ধরে রাখি।
বাসায়ও এমন অনেককিছু হয় যার পাত্তাই আমি পাইনা! সেসব আমি গায়েও মাখিনা। অভ্যাস হয়ে গেছে। শুধু একবার, রাতে বাসায় ফিরে যখন মা মিস্টির বাটিটা এগিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বল্লেন নে মিস্টি খা, আমাদের মিনার বিয়ের মিস্টি। আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। মা বলেন, আগামী শুক্রবার মিনার বিয়ে। জামাই লন্ডনে থাকে। ছয়মাসের মধ্যে মিনাকে লন্ডন নিয়ে যাবে। আমার মিস্টি খেতে ইচ্ছে হয়না। মন খারাপ করে। আমার বোনটার বিয়ে হবে সেই খবরটাও আমি জানতে পারিনা। চোখটা ভিজে আসতে চায়।
মোসাদ্দেক বেশ বুঝদার ছেলে। আমার দুবছর পরে দুনিয়ায় আসলেও আদতে সে আমার বড়ই হবে। সব কাজেই সে পাক্কা। কন্ট্রাক্টরি করে। সব কন্ট্রাক্টই সে নেয়। সে বাড়ি বানানোই হোক আর কাগজের বাক্স বানানো হোক। একেবারে শুন্য থেকে শুরু করেছে। প্রথম কাজটা পেল বড়ভাইয়ার শালার কাছ থেকে। ইউনানী ঔষধ কোম্পানির বোতল সাপ্লাইয়ের কাজ। বড়ভাইয়া শুনে হেভি ক্ষেপা। কোনদিন করেনি কাজ। কি বুঝে নিল। টাকা ওড়ানোর ফন্দি। মাও তাতে যোগ দিল। মোসাদ্দেক তাদের পাত্তাই দিলনা। সোজা চলে গেল ঢাকা। তিন চারদিন পর ফিরে এল। পনের দিনের মাথায় মিস্টি নিয়ে ঘরে হাজির। বিল পেয়ে মিস্টি কিনেছে!
আমি মোসাদ্দেককে জিজ্ঞেস করি কিভাবে। সে বলে সিস্টেম। এরচেয়ে বেশি কিছু বলেনা। তবে আমি বুঝে যাই তিনমাসের মাথায়। যখন আমাদের অফিসের প্রিন্টিং এর কাজটা ও বাগিয়ে নিল। বড় স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন, আপনার ছোটভাইতো বেশ কাজের ছেলে। আপনার মত নয়। দিন দুনিয়া বুঝে। আমি কিছুই বুঝিনা। দাড়িয়ে থাকি। তিনিই খোলাসা করেন। আরে আজ সে এসেছিল। আপনার পরিচয় দিয়ে বল্ল, কাজ চায়। দিয়ে দিলাম প্রিন্টিং এর কাজটা। আমি বেশ অবাক আর খুশি হই। রাতেই মোসাদ্দেক আমায় বলে, তুমার বসরে আইজ ফিট দিলাম। টেন পার্সেন্ট সাথে তুমি। আমি টেন পার্সেন্ট বুঝি কিন্তু সাথে আমিটা আর বুঝিনা। একবছরের মধ্যে মোসাদ্দেক আমাদের অফিসপাড়ায় পরিচিত একজন হয়ে যায়। আমার ভাইকে দেখি সবাই চিনে।
আমার দিয়া আসলেই কিছু হবেনা... এটা মোসাদ্দেকও বুঝে ফেলে যখন অফসেটে ছাপানোর অর্ডারটা আধাআধি টিকেতে ছাপিয়ে দেয়। আর সেটা আমি আটকে দেই তখন। আমি বুঝিনা কিভাবে তবু তার বিলটা পাস হয়ে যায়। আর মা কেন আমাকে এনিয়ে আমাকে বকা দেয় তাও আমার বুঝে আসেনা। আমার বৌও বলে, তুমি কি? নিজের ভাইয়ের সাথে আইন দেখাও!
মোসাদ্দেক একটা অফিস করেছে। খুব সুন্দর অফিস। লাল নীল কাচ বসানো অফিস। সে অফিসে সারাদিন বাতি জ্বলে। মা কয়েকদিন ধরে আমাকে খুব করে বকছেন। আমার দোষটা যে খুব বড় তা নয়। মোসাদ্দেক বলছিল আমি যেন রোজ তার অফিসে এক ঘন্টা করে সময় দিই। সন্ধার দিকে দিলেই হবে। ওর সারাদিনের হিসাবটা আমি দেখে দিলেই হবে। এটা এমন কোন আব্দার নয়। ওই সময়টায় আমি স্বপনের দোকানে বসে আড্ডা দিই। সময়টা কাজে লাগল। টাকাও নাকী দেবে। আমি যে বেতন পাই তারচেয়ে ডাবল! তবু আমার ভাল লাগেনি। মোসাদ্দেকের ঘাপলা আছে এই কথাটা অন্তত আমি বুঝতে পারি। তার সেই ঘাপলায় যোগ দিতে আমার ভাল লাগেনা। তাই না করে দিয়েছি। তাতেই মা ক্ষেপেছেন। বড়ভাইয়া ক্ষেপেছেন। বাবা থাকলে তিনিও নিশ্চয় ক্ষেপতেন।
আমার বৌও ক্ষেপেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, যে লোক বৌয়ের রিক্সাভাড়া দিতে পারেনা তার আবার এত লম্বা কথা কেন?

:: মৌলীর বাবার চোখ ::



গাদাগাদি ভিড়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। আমার ঠিক পাশেই দাঁড়ান জননী


এক। পিঞ্জরায় বন্দি পাখি তার চোখ ভরা জলে তাকায় শীর্ন জননীর মুখে।


বড়ই আকুলি তার যদি ছুঁয়া যেত জননীর হাত, যদি সেই হাত একবার


আদরে আদরে তারে মায়ায় ভরিয়ে দিত...




মানুষের মুখ গুলো বড় অসহায় আর আমিও যেহেতু মানুষ তাই শুনি


তেলের লিটার আশি টাকা... চাল কেনাও বড় কষ্ট... তুই কেমন আছিস


বাপ... আব্বা রোজ রাতে কারা যেন ঘরের চালে ঢিল ছুঁড়ে...




এক দাগী আসামীর সাথে দুর্বল শরিরে ধাক্কাধাক্কি করে আমার


সামনে এসে দাড়ান আরেক ভয়ঙ্কর চাঁদাবাজ! মৌলী


ফোনে বাবাকে খোজ করে কীনা জানতে চান...

:: দুধ ভাত খেয়ে রোজ রাতে চাঁদ দেখি ::

সর্বত্রই নাকি ইদানিং বহে শান্তির সুবাতাস, ইদানিং নাকি

হররোজ পূর্নিমা ভর করে আমাদের আকাশে আর আমরা নাকি

প্রতিদিন করি কুর্নিশ মহামান্যকে, বলি বড় ভাল কাটে আমাদের

দিবারাত তোমারই রাহে হে মহান।


আমরা কেউ কেউ স্বপ্নবাজ হয়েছি, জেগে জেগেই দেখি

দুধভাতে ভরে গেছে আমাদের থালা আর আমরা চিমটিও

কাটিনা নিজের শরিরে সত্য যাচাই করতে হয়না।


বেহেস্তি পোষাকের রঙ নাকি সবুজ আর দোজখের কালো!

কবে কোন মোল্লা শিখিয়েছে এমন বচন!


মোল্লারাও আর এখন তমদ্দুনের গান গায়না।

সকল রঙের পোষাকেই নাকি শান্তি আছে, আছে বেহেস্তের ছটা

অচিরেই জারি হবে এমন ফতোয়া।

Tuesday, August 7, 2007

:: আমার এখন আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে করে ::

তোমার মত আমারও এখন যখন তখন ভালবাসতে ইচ্ছে করে
যখন তখন হাত বাড়িয়ে আকাশ থেকে
মেঘের ভেলা সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।

এই আমার আর আগের মত মিছিল নিয়ে সামনে যেতে মন টানেনা।
মানুষ ডাকার কাজগুলোতো আগের মত জোর পাইনা।

কে মরলো কে বাঁচলো কার জন্যে কার কপাল পুড়লো
এসব নিয়ে ভাবতে আমার মোটেই ভালো লাগেনা
মানুষ আমি গড়পড়তা, এমন ভাবনায় সময়দিতে একটুও আর ভাল্লাগেনা

তুমি আমার মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিলে একটা আকাশ
আমি এখন এই আকাশের তারা গুনি, ফেলে আসা সময়
নিয়ে আর ভাবিনা। দুনিয়া গেলে যাকনা চুলোয়
আমার ভেতর জ্বলছে আগুন সে আগুনে কাউকেই আর ভাগ দেবনা।

Thursday, August 2, 2007

:: বুকের উপর সাপের রাস্তা... ::

ক.

ইশপের গল্প টাইপের একটা গল্প বারবার আমার মনে পড়ে। একবার এক লোকের বুকের উপর দিয়ে সাপ চলে গেল। লোকটার সেকি কান্না। কেউ একজন বলে, আরে ভাই কাদেন কেন? সাপটাতো কামড়ায়নি। সেই লোক বিষন্ন হয়ে বলে, আরে ভাই কামড়ানোটাইতো ভালো ছিল, এতো এখন রাস্তা বানিয়ে ফেল্লরে ভাই! মানুষের বুকের উপর দিয়ে সাপের রাস্তা... লোকটা আবার বিলাপ শুরু করে।

খ.

মঙ্গলবার রাতের ঘটনা। রাত দেড়টা পৌনে দুইটা হবে। বাড়ির সামনে যেতেই বুঝে গেছে তুলি। বাড়িটা ছোট একটা টিলার উপর। সেটা উঠতে উঠতে ও বেরিয়ে এল। আমার বেগে চাবি থাকে। সেটা দিয়েই গেট খুলি।
বাবাই ঘুমে। ওর ফিডার রেডি করতে করতে ভাত খাবো কিনা জিজ্ঞেস করে তুলি। বলি, খাবনা। কয়েকটা কাজ জমে গেছে। দ্রুত কম্পিউটার খুলে বসি। লো-ভলিউমে গান ছেড়ে ঠুকে ঠুকে ইলাসট্রেটর সামলাই। টুকটাক কথা হয় দু'জনে। গরম পড়েছে প্রচন্ড। জানালা খুলা। ফিডারটা পাশে রেখে মা ছেলে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। মিনিট পনের হবে। চিৎকার। চোখ মুখ কি রকম যন্ত্রনামাখা, কোলে বাবাইকে নিয়ে কাপতে থাকে। কি হয়েছে, কি করব কিছুই বুঝিনা... কিংকর্তব্য শব্দটা খুব কাছে এসে টোকা দেয় আমায়। ততক্ষনে বাবাই ফর্মে চলে এসেছে। সে ভেবেছে আমি তার মাকে গভির কোন যন্ত্রনা দিয়েছি, সে এর প্রতিবাদে আমাকে যাহ্ যাহ্ বলে বিদায় করার চেস্টা শুরু করল। তিন মিনিট পেরিয়ে গেছে প্রায়। তুলি কোনমতে বলে কার গলা থেকে চেনটা নিয়ে গেছে! কি বলে এইসব!? বিস্ময় চেপে ধরে। আব্বা আম্মা চলে এসেছেন। চোরের পিছে দৌড়ানোর সময় আর নেই। প্রায় পাচ মিনিট সময় তাকে দেয়া হয়ে গেছে।
রাতের বাকিটা সময় আমরা আর ঘুমাতে পারিনা। বাড়ির সবাই সজাগ।

ক.

ইশপের গল্প টাইপের একটা গল্প বারবার আমার মনে পড়ে। একবার এক লোকের বুকের উপর দিয়ে সাপ চলে গেল। লোকটার সেকি কান্না। কেউ একজন বলে, আরে ভাই কাদেন কেন? সাপটাতো কামড়ায়নি। সেই লোক বিষন্ন হয়ে বলে, আরে ভাই কামড়ানোটাইতো ভালো ছিল, এতো এখন রাস্তা বানিয়ে ফেল্লরে ভাই! মানুষের বুকের উপর দিয়ে সাপের রাস্তা... লোকটা আবার বিলাপ শুরু করে।

আমাদের কিশোর বেলায় ৯০-এ কারা কারা যেন মরে গিয়েছিল গনতন্ত্রের জন্য! কেমন আছে তারা এখন?