Sunday, September 18, 2011

গল্প সংক্রান্ত অভিমান


বাবা অসম্ভব মজা করে কথা বলে। যে শুনে সেই হাসে। হাসতে হাসতে পেট ফুলে যায়। আমাদের বাড়িতে যেই আসে সেই বলে, বাবার মতো মজার মানুষ কোনদিন সে দেখেনি। বাবা এতো চমৎকার সব কৌতুক জানে, মুখ এমন ভেংচি কাটতে পারে, না দেখলে না শুনলে কেউ সেটা বিশ্বাস করবে না কিংবা বুঝতে পারবে না।

বাবার অনেক রাগ, সেটা কিন্তু কেউ তেমনভাবে বুঝে না। আমরা বুঝি, বড় চাচা বুঝে। আমার এখন বাইশ বছর বয়েস, বন্ধু ছাড়ারই সাহস নেই, কিন্তু বাবা সেই বাইশ বছর বয়েসে ঘর ছেড়েছে, আর যায়নি। চাচার সাথে কক্ষনো কথা বলেনি। চাচা প্রতি বছর রুটিন করে দু'বার আমাদের দেখতে আসে, কান্নাকাটি করে, বাবা সেটা আমলেও নেয়না। বাবা আর কোনদিন বাড়ি যাবে না। কী তীব্র অভিমান!

ছোটবেলা থেকে সবাই বলে আমি নাকি বাবার মতো। আসলেও তাই। বাবা মাত্র সাড়ে পাঁচ ফুটি একটা মানুষ। আমিও তাই। বাবা দেখতে মোটামতো, আমিও তাই। তবে লোকজন এসব কারনে আমাদের বাপ বেটার মিল খুজে না। তারা আমার মজা করে কথা বলার ক্ষমতাটার কথা বলে। আমি এটা ঠিক জানি না, বুঝি না বা সচেতনভাবেও করি না। এম্নিতেই আমার কথা কিরকম মজা মজা হয়ে যায়। এক দিক দিয়ে আমি বাবার চে এগিয়ে। শরীর দুলিয়ে, গলা মিলিয়ে আমি নানান অভিব্যক্তি করতে পারি। অবিকল না হোক মোটামোটি কাছাকাছি নকল করতে পারি যে কাউকে। সেটা সম্ভবত অনেক উপভোগ্য হয়। আমি দেখেছি লোকজন আমাকে এ ওর বিরুদ্ধে উসকে দেয়, চেষ্টা করে নকলামি দেখতে। ক্রিকেট খেলা হোক বা না হোক, আমাকে ক্রিকেটের ধারাভাষ্য দিতেই হয়! হরতাল না হলেও বিটিভির হরতালের খবর পড়ে শোনাতে হয়। আমর মজাই লাগে।

এম্নিতে আমাদের কোন অনুষ্ঠান থাকলে বাড়ির কিংবা বন্ধুদের, জমানো কিছু করতে হলে সবাই আমাকে মনে করে। আর কিভাবে কিভাবে যেনো আমি জমিয়েও তুলি আসর। এইতো সেদিন নাচের অনুষ্ঠানটায় যেতে পারলাম না। কাজ ছিলো। অনুষ্ঠান শেষ হতেই ফোন আর ফোন। এ একবার তো সে একবার। ভাংগা অনুষ্ঠানে গেলাম। জুইকে নিয়ে একটার পর একটা ফাজলামি করলাম। সে চেয়ারে বসে বসে হাসতেই থাকলো। নড়তে চড়তে পারে না। পেটে হাত দিয়ে বলে, ওই তুব থামবি! আমারতো ব্যাথা শুরু হয়ে যাচ্ছে... আমি দৌড়ে দরোজায় চলে এলাম, তরপর থেমে বল্লাম, নারে বাবা আর থাকা যাবে না, শহরের সব লেডি ডাক্তার ক্ষেপে যাবে। এভাবে অপারেশন ছাড়া বাচ্চা পয়দা হতে থাকলে তারা আমারে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে দেবে! মোটর সাইকেল স্টার্ট দিতে দিতে আমি শুনি, ভেতরে হাসির চোটে গমগম করছে, সবকিছু উড়ে যাচ্ছে।

আমাদের নাটকের দলে বাঘা বাঘা সব অভিনেতা। এরা মানুষকে হাসায়, কাঁদায়, রাগায়। একবার একটা নাটকে আমাকে দেয়া হলো ভাড়ের চরিত্রটা। নাটকের শুরু থেকে শেষ অব্দি নেচে গেয়ে ধুন্দুমার বাধিয়ে দিলাম। ডিরেক্টর বল্লেন ওরতো অভিনয় করতে হয়নি, ন্যাচারাল, একেবারে চাচার সবকিছু পেয়েছে। হয়তো সত্যি, কিন্তু আমি আসলে অভিনয়টা মন দিয়েই করেছি, সবচে বেশি রিহার্সাল করেছি আমি, নাটকটা নিয়ে আর সবার চেয়ে বেশি ভেবে থাকলে সেও আমিই ভেবেছি। এর পরের নাটকটাতে আমার একটা ছোট্ট চরিত্র। মিনিট কয়েক। খুব কষ্টের সেটা। রিহার্সালে মোটামোটি চালিয়ে নিলাম। সবাই বল্ল এতেই চলবে। যেদিন নাটক হলো, সেদিন জানি না কি হলো আমার, এর আগে একদিনও রিহার্সেলে যা হয়নি, সেদিন না চাইতেই সেটা হয়ে গেল। আমার চোখ দিয়ে কখন কিভাবে টপ টপ করে পানি আসলো সেটা নিজেই জানি না। নাটক শেষ হবার পরও আমি কাঁদছিলাম। কিন্তু নাটক শেষে গ্রুপের মূল্যায়ন সভায় বিষয়টা সবাই বেমালুম এড়িয়ে গেলো। একজন বরং বল্লেন, আগের নাটকে দীর্ঘ ভাড়ের চরিত্রটা আমার ভুলে যাওয়া উচিত, তাহলে এই নাটকে আরো ভালো কাজ করতে পারবো।

ভাড় তকমাটা লেগে গেলে মানুষের এমনই হয়। সবাই ভাবে এরে দিয়ে সিরিয়াস কিছু হবে না। সবাই ভাবে এর ভেতর কোন রাগ নেই, কোন অভিমান নেই। এর ভেতর জেদ বলতে কিছু নেই। মানুষটা খুবি সহজ, জলের মতো। হয়তো তাই। সবাইতো আর বাবাকে ভালো করে চিনে না। আমি জানি আমার বাবাকে, তাই জানি এই যাওটাই শেষ যাওয়া, আমি আর দেশে ফিরবো না। কোনদিন না...

Friday, September 2, 2011

শূন্যতার ঈদ যাপন


চাঁদের খবর নিতে হয় না। চাঁদ এসে নিজেই ঢুকে পড়ে মোবাইলে, ফেসবুকে, ই-মেইলে। ঈদ আসছে টের পাই তাই চাঁদ ওঠার অনেক আগে। তখনও রাস্তায়। আকাশটা যথেষ্ট ফরসা, তবু আজান শোনা যায়। ফোনে মেসেজ টোন শুনি, রিং টোন নেই। এই যে ইফতার হলো, রাস্তায় পড়ে আছি, তবু ফোনটা বাজে না। বাজবে না। আর বাজবে না। কখনই বাজবে না। সে তুমি রাত তিনটাতেই বাড়ি আসো, ইফতার পেরিয়ে যাক, তবু ফোন বাজবে না সেই পুরনো নাম্বার থেকে। এই হলো নিয়ম, এভাবেই সব পাল্টে যায়।

কনফু একটা এস এম এস দিলো। ইংরেজী দুইটা অক্ষর সেখানে। ই এবং এম। ইহজনমে এমন কিপ্টামি সমৃদ্ধ শুভেচ্ছা আমি পাইনি। এটা শুভ বার্তার মাঝ প্রহরের কথা। তার আগে প্রথম এস এম এস টা আসলো রুমনের কাছ থেকে। আমরা এক সাথে এক অফিসে কাজ করতাম। আমাদের চে অনেক নিচের সারিতে ছিলো তার অবস্থান। সেই অফিসে আমার খুব কাছের লোকজন ছিলো। তারা আর এখন খোঁজ নেয় না। আমিও নেই না। শুধু রুমন নিয়ম করে আমাকে দেখতে আসে খুপড়িতে। এস এম এস পাঠায়। ভালোবাসা বড় বিচিত্র জিনিস।

সিলেট শহরটা অলস। সন্ধ্যাতেই ঘুম জড়ো করে চোখে আর এগারোটা বাজার আগেই সব সুনশান করে দেয়। ব্যতিক্রম শুধু ঈদের সময়। রোজার শেষ দশটা রাত সে ঘুমায় না। আমরা বড় হয়েছি জিন্দাবাজারকে ঘিরে। ঈদের আগের রাতে মাঝরাত না হলে বাড়ি ফেরা হতো না। বাড়ি থেকেও কিছু বলা হতো না। সবাই সবাইক চিনি, সবাই সবার পরিচিত এমন একটা ভাব ছিলো। স্কুলের বড় ক্লাসে পড়ার সময় জিন্দাবাজারে একটা নিয়মের মতো ছিলো মারামারি। আমাদের পাড়ার ছেলেরা গিয়ে একেবারে শহরের মাঝখানটাতে ধাম ধুম করে এই সেই ফুটিয়ে ভু ভু করে ফিরে আসতো। এখন সেসব হয় না। জিন্দাবাজার পয়েন্টে দাড়িয়ে দল বাধারও কোন সম্ভাবিলিটি নেই এখন। ঈদের বাজার ছড়িয়ে পড়েছে। কুমারপাড়া আর নয়াসড়কের নিস্তরঙ্গতা ভেদ করে জেগে উঠেছে শপিং মল। মির্জাজাঙ্গালের অপ্রশস্থ সড়কেও এখন কাপড়ের বিকিকিনি। তবু জিন্দাবাজার তার কৌলিন্য হারায়নি। এখনও সেখানে রাজ্যের ভিড়, হট্টগোল। রাত দুটোয় যখন জিন্দাবাজর পয়েন্ট পাড়ি দিচ্ছি, বিস্তর ভিড় সেখানে। তবু কি এক শূন্যতায় হাহাকার করে উঠে বুকের ভেতরটা। এ শহরে আমার আর কোন বন্ধু নেই। আমি আর দল বেঁধে এ শহরে ঈদের বাজার করি না। আমাদের সঙ্ঘ ভেঙে গেছে, এখন আমরা নিতান্তই কাটা ঘুড়ি একেকজন। কেউ উড়ি ওয়াশিংটনে কেউ লন্ডনের স্যাতস্যেতে বাংলা টাউনে, ঢাকা কিংবা চট্টলার ভিড়ে মিশে আছে কেউ কেউ। আর কেউ আরো দুরের স্কটল্যান্ডে। এই-ই নিয়ম। আমরা নিয়মকে মেনে নিই নিয়তি বলে।

সড়কবাতিগুলো ঠিকমতো জ্বলে না। খানাখন্দকে ভর্তি রাস্তা। আমাদের গ্রামে বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোতে টিম টিম করে জ্বলে কম ভোল্ডেজের বাতি। বাকিটা ভরে থাকে নিকষ অন্ধকার। বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা হয়ে গেছে পুরোটা গ্রাম। পকেটে রাখা চাবিটা ঘুরিয়ে গেট খোলার সময় এ বাড়িটাও ঘুমিয়ে আছে। ঘুম… ঘুম… ঘুম… রাত তিনটায় গভীর ঘুম...

তিনি কখন ঘুমাতেন আর কখন জেগে থাকতেন তার কোন হিসাব আমি পাইনি। একসময় যখন আরো বেশি মফস্বলে ছিলাম, যখন বাড়িতে কিংবা বাড়ির পাশেই একটা পুকুর থাকতো, নয়তো নদী। তখন অন্ধকার মিলিয়ে যাবার আগে উঠতে হতো। সেই ঘুম ভাঙানোর মজাটা মিইয়ে গিয়ে বিরক্তি ভর করেছে কতবার। এবার সেখানে শুধুই শূন্যতা। কেউ ডাকেনি, কেউ ডাকবে না। কেউ বলেনি গরম পানি আছে, কেউ আর বলবে না, কোনদিন না। আমি শাওয়ার ছেড়ে ভিজতে থাকি, ভিজতেই থাকি। তারপর, যখন সফেদ হবে হবে করছে আকাশ, স্টোভে পানি গরম করতে দিয়ে ডাকি, বাবাই ওঠো, গরম পানি আছে…

দুনিয়াটা নাকি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। মানুষের মাঝে নাকি দুরত্ব কমছে দ্রুত। কে বলে এ কথা? যত্তসব ফাইজলামি। আমরা ভাই-বোনরা একসাথে বেড়ে উঠেছি যারা, তারা কেউ আর দেশে থাকে না। দুনিয়ার এ মাথা ও মাথায় ছড়িয়ে গেছে। এবার তাদের একজন এসেছে বিয়ে করবে বলে। আমেরিকায় থাকতে ওর সাথে প্রায় রোজই কথা হতো ফেইসবুকে। দেশে আসার পর সেটাও আর নেই। ঈদের সকালে সে ফেইসবুকে আমারে ঈদ মোবারক বলে, আমি বলি তুই কই? আসলি না যে? আমি না দেখেও দেখতে পাই, আড়মোড় ভাংতে ভাংতে সে বলছে, ভাই সন্ধ্যার পরে আসি… এখন শহরে বন্ধু বলতে কাছের জন হলো শাওন। পাশাপাশি বিল্ডিং এ আমরা বসি। পুরা রোজার মাস গেলো, ওর সাথে আমার মাত্র একদিন দেখা হলো। বাদ বাকি সবদিন ফেসবুকে। পাশাপাশি রুমে বসি আমি আর মনির ভাই। ষাটোর্ধ যুবক। মুক্তিযোদ্ধা। ফেসবুকে ঈদ শুভেচ্ছা দিলেন। দুনিয়া আসলে কাছে আসছে না বা ছোটও হচ্ছে না। সে ভার্চুয়াল হচ্ছে আর আদতে আমরা দুরেই সরে যাচ্ছি পরস্পরের, দুরে, দুরে এবং দুরে…

ঈদে বেড়ানো হলো না। সকাল থেকে পিচ্চিরা আসছেতো আসছেই। প্রথমদিকে তুলি গুনতে চেষ্টা করতো। এখন আর করে না। আমাদের গ্রামটা ছোট। কয়েকটা মাত্র বাড়ি। কিন্তু এ গ্রামের মেয়েদের রি-প্রোডাক্টিভ হেলথ্ ইর্ষা করার মতো। একেকটা ঘর থেকে ৪ জন ৫ জন করে আসছে! কেউ কেউ সালামী নেবার সময় বলছে, তার আরেকটা পিচ্চি ভাই আছে বাড়িতে, তার জন্য সালামী দিতে হবে! এবার তাদের সালামী কমে গেছে। এ বাড়ি থেকে আগে আরেকজন সালামী দিতেন, এবার সেটা নেই।

ঈদের আগের রাতে অরূপের সাথে কথা হলো, অনেকক্ষণ। ঈদের রাতে আবার। দেশে থাকলে ফোনে কথা বলাটা অন্তত হয়। যেমন ঈদের আগের রাতে, মাঝরাত তখন, বুড়াভাইকে ফোন দিতে পারলাম। প্লেনের অপেক্ষায় তখন। কি করছেন জিজ্ঞেস করতেই বল্লেন, ওরা কান্নাকাটি করে এখন শান্ত… তিনি কি করছেন সেটা বল্লেন না, বলার প্রয়োজন নেই। ঢাকা আমার জন্য অনাত্মীয় একটা শহর। মুস্তাফিজ ভাই সে শহরটাকে আরেকটু বেশি অনাত্মীয় করে চলে গেলেন।

এক বন্ধু ঈদের বিকেলে এস এম এস পাঠালো। বাবা ছাড়া প্রথম ঈদটা যেনো অন্যদের নিয়ে ভালোভাবে কাটানোর চেষ্টা করি। একটা জীবন কাটিয়ে দিলাম বাবাকে ঘিরে, আরেকটা জীবন কেমন করে কাটবে জানি না। মানুষ মূলত একা এই সত্য জানি, তবু কেন যে এইসব সঙ্ঘপ্রীতি আসে, কেন যে নিজের ভেতর গড়ে উঠে ভালোবাসা, নির্ভরতা। কেন বিচ্ছেদে বিষণ্ণতা ভর করে জীবনে, কেন উৎসবের রং বারবার ফিঁকে হয়ে যায়। জানি না, কিচ্ছু জানি না। প্রকৃতি আমাদের সবকিছু জানতে দেয় না।