Tuesday, July 24, 2007

:: বৃষ্টি পিয়াসি আমি আর শাহানা ::

বৃষ্টির দিন ছিল, রাতেও ছিল বৃষ্টি। আমাদের মাঝে যাদের বৃষ্টি প্রীতি ছিল তারা ছাড়া আর সবাই বিরক্ত। টানা বৃষ্টি কারইবা ভালো লাগে।
আমি বৃষ্টি পিয়াসি মানুষ। মেঘ আমায় মাতাল করে। আমি মেঘের ছায়ায় দাঁড়াতে পছন্দ করি। বৃষ্টিতে ভিজি বালক বেলার উল্লাসে।
শাহানার সাথে দেখা হয়। সেও বৃষ্টিময় দুপুরে। আমি হাটছিলাম কংক্রিটের রাস্তায়। মানুষের সাথে মানুষের সহজে ঘেষাঘেষি হয়না এমন রাস্তা। তবু হঠাৎ কেউ একজন আমার শরীরে হামলে পড়ার মতই আচরণ করে। সামলে নিয়ে তাকাই। শাহানা! বদলে যাওয়া শরির নিয়ে দাড়িয়ে আছে আমার সামনে।
শাহানা, আহা শাহানা। আমার নিঃশ্বাসের মত প্রিয় ছিলে তুমি। আমার বুকে তোমার জন্যই জমে আছে গাঢ় এক বেদনা।
শাহানাদের পুকুরে শানবাঁধানো ঘাট ছিল, তাদের তিন মহালা বাড়ি ছিল। আমি সেই বাড়িতে কতবার গিয়েছি। গ্রাম থেকে উঠে আসা নিতান্ত এক কিশোরের জন্য সে বাড়ি ছিল আরামদায়ক নিঃশ্বাসের মত। সে বাড়িতে শাহানা ছিল।
শাহানার সাথে দেখা হলে মেঘ মেঘ দুপুরে সে আমাকে নিয়ে পাশের ষোলতলা বাড়িটার দিকে হাঁটা দেয়। আমি কোন কথা না বলে তাকে অনুসরণ করি। আর অবচেতন মনে চাপা ফুলের ঘ্রাণ খুঁজি। শাহানার কাছে গেলে সেই কৈশোরে আমি চাপা ফুলের ঘ্রাণ পেতাম। মূলত এই ঘ্রাণের লোভেই আমি তার পাশে পাশে থাকতে চাইতাম। মূলত এই ঘ্রাণের খোঁজেই আজও আমি শাহানার সাথে হাটতে থাকি।
কোন ফাকে এগার তলায় উঠে এলাম টেরই পেলামনা। কৃত্রিম গাছ ও লতাপাতা জড়ানো দরজা খোলে শাহানা আমায় ডাক দেয়, আয় ভেতরে আয়।
এয়ারফ্রেশনারের ঝাজালো গন্ধময় একটা ঘর। আমাকে বসতে বলে চঞ্চল পায়ে ভেতরের ঘরে চলে যায় শাহানা। আমি দেয়ালে চোখ ফেলি। ঝা চকচকে একটা প্রাসাদের সামনে দাড়িয়ে শাহানা। ইউরোপিয়ান পোষাকের শাহানাকে আমার দুরাগত এক রাজকুমারী বলে ভ্রম হয়। পাশে আরেকটা ছবি। সোনালী চুলের পুতুল পুতুল মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে শাহানা। আমি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখি। কখন যে শাহানা এসে পেছনে দাড়িয়েছে টের পাইনা। বলে, আমার মেয়ে, বাপের সাথে থাকে। শাহানার দিকে তাকাই, কি এক বিষণ্নতা দেখি তার চিবুকে।
কলেজের বেড়া ডিঙানোর আগেই শাহানার বিয়ে হয়েছিল। হাওর পারের না কিশোর না তরুণ আমি সেই বিয়েতে ছিলাম স্পেশাল গেস্ট। কনের বন্ধু বলে কথা। বিয়ের আসরেই শাহানার বড়ভাই আমার সাথে দুধে আলতা রঙের হিমায়িত মাছ কারবারি শাহানার বরের পরিচয় করিয়ে দেন। তার আগে আমার মহাজন বাবার পরিচয়টা দেয়া হয়। মুক্তোর মত দাঁত বের করে শাহানার বর হাসে। আমি তার পাশে মিনিট পাঁচেক বসি। আর বেদনায় নীল হই। আহা শাহানা সেদিন আমি তোমার জন্য বেদনাহত হয়েছিলাম, তুমি কি তা বুঝেছিলে...
এক মাসের মাথায় বরের সাথে উড়াল দেয় শাহানা। তারও পনের দিন পরে আমার কাছে রয়্যাল মেইলের চিঠি আসে। সেই প্রথম কেউ আমাকে চিঠি লিখে। শাহানার চিঠি। আমি ভালো, তুই কেমন আছিস? এর বেশি কিছু ছিলনা সে চিঠিতে। তবু আজো সে চিঠি আমি যতন করে রেখেছি। চারটা চিঠি লিখেছিল শাহানা। সবগুলোই আছে আমার কাছে। যক্ষের ধনের মত আগলে রেখেছি আমি শাহানার চিঠি।
দ্বিতীয় চিঠিতে শাহানা লিখেছিল, ওর বর মদ খায়। রাতে বাড়ি ফেরেনা প্রায়ই। শাহানা ভালো নেই এই বিষয়টা রাস্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়ুয়া তরুণের না বুঝার কথা নয়। সে রাতে আমি মেসে ফিরিনি। সারা রাত রাস্তায় রাস্তায় হেটেছি। সেরাতে বৃষ্টি ছিল। আমি বৃষ্টিতে ভিজে শীবগঞ্জের মেসে ফিরেছি।
তৃতীয় চিঠিতে শাহানা লিখেছিল, সে স্কটল্যান্ড চলে যাচ্ছে। তার ছোটমামার কাছে। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ির খবরও ছিল সে চিঠিতে। শেষ চিঠিটা তারও বছরখানেক পরে লেখা। আবার লন্ডনে ফিরছে। মাঝবয়েসি এক সাদাচামড়াওয়ালা মানুষ শাহানাকে জড়িয়ে ধরা এমন একটা ছবি ছিল সেবারের খামে! এর পর আর শাহানা চিঠি লিখেনি।
দশ বছর পর শাহানা আর আমি পাশাপাশি বসি। আমার হাত নিয়ে খেলতে থাকে শাহানা। সেই আগের মত। পারমিতার কথা বলে। পারমিতা, শাহানার মেয়ে। ৮ বছর বয়েস। বলে, শেষ পর্যন্ত বিলেতি স্বামীর ঘরেও না টিকতে পারার বেদনার কথা। মেয়েটাকে ইচ্ছে করেই ফেলে এসেছে। থাকুক সেখানে। ইচ্ছেমত বেড়ে উঠুক। আর কিছু হোক আর না হোক না বোঝার বয়েসে বিয়ে অন্তত কেউ দেবেনা!
এক এক করে পরিচিত মানুষের কথা জানতে চায় শাহানা। আমি তাকে কোন খবরই দিতে পারিনা। বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের মত আমার জীবন। এ দ্বিপে কেউ আর তার খবরের পায়রা পাঠায়না এই সত্য জেনে কেমন বেদনায় ভরে উঠে শাহানার অবয়ব। আমি চাপা ফুলের ঘ্রান পাই।
শাহানা আমার মাথায় বিলি কেটে দেয়। যেন তাদের পুকুরঘাটে বসে আছি আমরা। আমার কেমন অস্বস্তি হয়। বিয়ে করলামনা কেন? জিজ্ঞেস করে। উনত্রিশ খুব বেশি বয়েস নয় বলে আমি পাশ কাটাই। শাহানা দৌড়ে আবার উঠে যায়। আমার জন্য খাবার রেডি করতে। আমি না না করি। বলি খেয়েছি একটু আগেই। কে শুনে কার কথা। বলি, যাওয়া দরকার। বলে, বৃষ্টির মধ্যে যাবি কিভাবে? খেয়াল হয় আমার। ভারি পর্দা তুলে বাইরে তাকাই। ঝুম বৃষ্টি। এইসব বাড়িগুলো সবকিছু থেকে আগলে রাখে! এরা রোদ পোহাতে দেয়না, বৃষ্টিতেও ভিজতে দেয়না। আমি পর্দা সরিয়ে বৃষ্টি দেখতে থাকি, নিঃশব্দ বৃষ্টি। এই প্রথম আমি শব্দহীন বৃষ্টির স্বাদ নিই।
দুপুরটা গড়িয়ে যায়। আবারও রাস্তায় নামার নামার তাড়না বোধ করি। শাহানা আবারও কথার প্যাঁচে ফেলতে চায়। এবার আর পারেনা। হঠাৎ শাহারা আমার মুখোমুখি দাড়ায়। চোখে চোখ রাখে, আমি টিকতে পারিনা। চোখ নিচে নামাই। শাহানার পায়ে চোখ আটকে যায়। আশ্চর্য সুন্দর সেই তিলটা এখনও শাহানার পায়ে তারার মত জ্বলজ্বল করছে। আমার হাতটা শক্ত করে ধরে শাহানা বলে, তুই একবার আমার কাছে কি চাইবি বলেছিলি, চাওয়া হয়নি। সেই চাওয়াটা ফুরিয়ে গেছে? আমি শাহানার পা থেকে চোখ তুলিনা। শাহানা আমাকে শক্ত করে ঝাকুনি দেয়, কি হল? আমার কাছেনা তোর কি একটা পাওনা বাকি রয়ে গেল অপু, চাইবিনা? আমি আশ্চর্য সুন্দর তিলটার দিকে তাকিয়েই থাকি...

Sunday, July 22, 2007

:: মেঘ মেঘ দিনে বেলাদি ::

মেঘ মেঘ দিনে আমি আবারও ফিরে যাই হাওরপারের শৈশবে,আমি তখন আমি ছিলামনা ছিলাম জলের সন্তান এক, আমার পায়েরসীমানায় ছিল কোমল পলির বিস্তার, চোখের ছিল অবাধ স্বাধীনতা,আমি তখন আমি ছিলামনা ছিলাম মাটির সন্তান।

বৃষ্টি ধোঁয়া সকাল ও দুপুরে আমি বারবার বেলাদির কাছে ফিরে যাই বেলাদির মেঘবর্ন চুলের আশ্চর্য ঘ্রান আমায় আচ্ছন্ন করে আমি সারি সারি কদমের ভেজা শরিরে শৈশব খুঁজে পাই, আমি আমার লাটিম খুঁজে পাই

বৃষ্টির বিকেলে আমি চোখ খোলা রেখেও বিভোর হই। বেলাদির হাত আমার আবিন্যাস্ত চুলে বিল কেটে বলে, যা অপু নলুয়ার হাওরের জলে মিশে যাওয়া আকাশের কার্নিশে জেগে ওঠা রঙধনু থেকে সিঁদুরের মত একটুকরো লাল রং নিয়ে আয়, আমি কপালে পরব...

Saturday, July 21, 2007

:: সন্যাসে তোমাদের এতই ভয়, আতিপাতি করে বুকে আমার জন্য ভালবাসা ::


সেইযে বালিকা ছিল এক, দুই বিনুনি ছিল চুলে তার। আমি কতকতবার তারে মন থেকে মুছে ফেলি আর সে বারংবার থেকে যায় আমার মনে। আমার শুধু চোখে ভাসে মনে ভাসে রমনীর সিঁথির মত মাঠের বুকে জেগে ওঠা হাটাপথে দুজনে আমারা দুজনকে আলতো পায়ে পেছনে রেখে হাটতে শুরু করলে হঠাৎ হঠাতই সে পেছন ফিরে প্রশ্ন করেছিল, কোথায় যাবে এখন...


মনে অমন তোফানতোলে এমন প্রশ্ন আমায় কেউ আর কোনদিন করেনি তবে কেন আমি সেই দুই বিনুনির কথা ভুলে যাব তবে কেন আমি সেই রমনীয় সিথির সবুজ মাঠকে ভুলে যাব তবে কেন আমি সেই মায়াময় চোখ থেকে পালিয়ে বেড়াব


নদীবর্তি সেই করুনা আমায় আর কতবার পোড়াবে যতটা না পোড়ালেই নয় ততটাতো আমি আগেই পুড়েছি তবে কেন আজ এইসকল পাথুরে আয়োজন! আজ কেন সকল প্রিয় মানুষ ভালবাসা নিবেদিতে আমারে এমন করে তুলে উচাটন। আজ কেন আমি আর আগের মত পুরনো সেই নদীবন্দরের খেয়াঘাটে বসা ছোট দাদার মত সাদা চোখ মেলে সন্যাসের কথা বলতে পারিনা

:: অর্না বন্ধু আমার ::



সে বড় মায়াবতী ছিল।


সে ছিল ছায়াময় বৃক্ষের মত।




আমার যত অপরাধ কতদিন


আগলে রেখেছে বন্ধু আমার।




আমার কত নাঁকি কান্না মুছে


দিয়েছে মমতায়।




আমি আর কত কাঁদতাম


যতটা কাঁদিয়েছি তারে!




আমাদের শৈশবে কত বেলীফুল আর গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো ছিল উঠোনে উঠোনে।


আমরা হেটেছি ছায়ায় ঢাকা কত কত পথ। আমরা মায়ায় বেধেছি আমাদের কত কত শৈশব।




এখনও আমাদের পথগুলো আগেরই মত আছে, আমরা তবু হাটি


অন্য পথে, অন্য আগুনে পুড়ি আর দুর থেকে বলি ভাল থাকিস।

:: তখনও ঝরেনি পাতারা, বেলাদি ছিল ::


বেলাদির মাথায় একরাশ ঘনকালো চুল ছিল। রাজের বিস্ময় মাখানো একজোড়া চোখ ছিল তার। তখন অবশ্য অতটা বুঝতামনা। শুধু চোখ গুলো দেখতে আমার ভিষন ভালো লাগত।

আমাদের বাড়ির উত্তর সীমানায় ছিল একসারি কদম গাছ। তার পরই শুরু বেলাদিদের বাড়ি। সীমানা থেকে ঘর অবধি যেতে বেশ লম্বা একটা ফাঁকা যায়গা ছিল। মখমলের মত বিছানো সবুজ সবুজ সেই ঘাসের মাঝখানে ছিল বেশ বড় একটা পাথর। অনেকটা বেদীর মত। সাদা রঙের সেই পাথরে বসে রোজ বিকেলে বেলাদি রবীন্দ্রনাথের বই পড়ত। মাঝে মাঝে সুনীল।

রোজ বিকেলে আমরা সব বালকের দল সেই ফাঁকা যায়গায় খেলা করতাম। গোল্ল্লাছুট খেলা হত। পাথরের সেই বেদীটাকে কেন্দ্র ধরে আমরা ঘুরে ঘুরে ছড়া বলে একসময় দিতাম ভু দৌড়। আমরা আসলে বেলাদিকে ঘিরেই ছড়া কাটতাম।

এটা একেবারেই আমার বালক বেলার কথা। ওই বয়েসে আমরাতো আর দুরে কোথাও যেতে পারতামনা। তবে আস্তে আস্তে আমাদের দৌড় বড় হতে থাকে। বেলাদিকে ঘিরে ছড়া বলার সময় ফুরুতে থাকে। গ্রামের শেষে যে মাঠ, তারও পরে যে পরিত্যাক্ত জমিদার বাড়ি। সেইসব গলিঘুপচিতে ভাগ হতে থাকে আমাদের শৈসব।

কনক, নিলু, রাজু সবাই খুব সহজেই রোজ রোজ চলে যেত সেইসব অচেনাকে চিনতে। আমার যাওয়া হতনা। কি এক পিছুটানে আমি রোজ বেলাদির উঠোনে ঘুর ঘুর করতাম। আমার শুধু মনে হত আবার আমার বন্ধুরাসব ফিরে আসুক সবুজ এই মখমলে। আমরা লোকুচুরি খেলায় মাতি। হাতের বইটা পাশে রেখে বেলাদি আমাদের মাঝে যে চোর হল তার চোখটা চেপে ধরুক। (হাতের ছোঁয়া পাব বলে আমিই হতাম নিয়মিত চোর।) অথবা আমরা তাকে ঘিরে আবার ছড়া আউড়াতে থাকি। কেউ সে মনোডাকে সাড়া দেয়না! আমি থাকি সেই ছোট্ট মাঠে।

আমাকে ঘুরতে দেখে বেলাদি মাঝে মাঝে বলে, কিরে তোর খেলা নাই? আমি মাথা নাড়ি। বেলাদি হাসে। মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকি। হাত ইশারায় কাছে ডাকে বেলাদি। আস্তে আস্তে এগিয়ে যাই। মাথার চুলগুলো বিন্যস্ত করতে করতে বেলাদি বলে, যা খেলতে যা। সন্ধায় ঘরে যাওয়ার সময় আমাকে দেখে যাবি!

আমি দৌড় দিই। বেলাদি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই আমি আতরের ঘ্রান পেয়েছি। সেই ঘ্রানটা সঙ্গি করে আমি দৌড়াই।

:: সময়, ইদানিং ::


সময় বড় সংক্ষিপ্ত এখন
বামুন-বনসাই জামানা।
উদ্যানে বিপনী বিতান
পেটের ভেতর মিনি চিড়িয়াখানা।


প্রকৃতির উৎসবে মুঠোফোন
বাণিজ্য। শর্ট ম্যাসেজ;
ঘন্টা বাজে: চিঠির মৃত্যু।

এখন আধুনিক রিমিক্স হাছন,
কান ঝালাপালা করে ডিজিটাল ফিউশন।

:: সেইসব সময় অথবা তুমি বিষয়ক অথবা কিচ্ছুনা ::


আমার তখন না ঢাকা না সিলেট অবস্থা! আরিফ ভাই, নিজের ভাই, রনি ভাই এমনতর ভাই এবং সঙ্গিয় গৌরী, চেরী, রাজুরা প্রায় প্রতিদিন টানছেন মহানগরের দিকে। সেখানে নাকী আছে আমার জন্য অবারিত প্রান্তর। আমার সকল প্রতিভা(!) বিকষণে সেই নগরীই হবে প্রকৃষ্ট স্থান!

এদিকে প্রাণের শহরে আছেন জননী আমার, আছেন শিশুমনের পিতা। আছে আমার প্রান্তিক। আছে সবুজ ঘনবন, জাফলং টাঙ্গুয়া...। আছে অর্ণা নামের এক মানবী!!! সাথে সাথে আমারই মত বিষয় বুদ্ধিহীন একদঙ্গল বালক বালিকা!!!

ঘরে আবার মাঝে মাঝে কানাঘুষা হয়। সাতসমুদ্র তের নদীর পারের নিকটজনেরা বলেন, চলে আস জাদুধন, পাবে সফেদ স্নেহ আর স্নো...।

এমন এক সময় শহর সিলেটে কতিপয় মানুষ দাড় করাতে চায় পত্রিকা। আমাদের টুকুদা তখন যে কোনভাবেই আমাকে ধরে রাখতে চান শহর সিলেটে! আমি বলি তাইলে একটা চাকরি দেন। বেকার হয়েত আর থাকতে পারিনা! তিনিই খবর জানান সেই পত্রিকার। বিজ্ঞাপনও জোগাড় করে নিয়ে আসেন তখনকার ঘরবাড়ি প্রান্তিকের টিনশেড বারান্দায়।

অর্ণাতো মহা খুশি। আমাকে বুঝায়, সবাই চলে যাক, আমরা দুই বন্ধুতে এই শহরকে আগলে রাখব!!! সেই বালিকা এখন নগর ছেড়ে বৈদেশের পথে পথে ঘুরে ইচ্ছেমত!!!

চাকরিটা হয়ে যায়। আমিও পড়ি সৃষ্টির মায়ায়! ২০০১ সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখে প্রবেশ করি চেনা জগতের অচেনা বন্দরে।

সব নতুন ছেলেপিলে। মেয়েও আছে। আমার তখন প্রেমহীন সময়। অর্ণা ছাড়া আর কোন মেয়ের সাথে পারতে কথা বলিনা! আমার যত বন্ধু আছে তাদের প্রায় সবাই তখন শহর ছাড়া। যারা আছে তাদের সাথে কোন এক আজিব কারনে আমার আর তখন খাতির নাই! আজীবন ঝগড়াটে আমি তখন আক্ষরিক অর্থেই খবিশ প্রকৃতির মানুষ। প্রায় প্রতিদিনই কোননা কোন ভাবে মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করে চলেছি! ঘরে মা আগলে রাখেন আর বাইরে অর্ণা।

নতুন অফিসে আমার পুরনো বন্ধু পলাশ দত্ত আছে। এছাড়া পুরনো পরিচিত কয়েকজন। তিন বালিকার কাউকেই চিনিনা। চেনার কোন গরজও নাই। আমি আছি আমার কেশরাশি সামলানোতে ব্যাস্ত! প্রায় খোপা করা যায় এমন চুলের মালিক আমি লাল চোখে ধুন্দুমার ঝগড়ায় মাতি সারাদিন। এমন বালকের সামনে কোন বালিকাই সহজে কথা বলতে আসবেনা। আসেনিও।

আমাদের মাঝে ছিল শিপলু। তোতলাতে তোতলাতে সেই আমার সাথে কথা বলিয়ে দেয়, মনিকা, সালমা আর তুলির। আমি কাষ্ট হাসি দিই। এর বেশি প্রেমভাব তখন আমার নাই! আমি শুধু মনে মনে ভাবি কি করবে এই বালিকাগুলো! এরা সাজবে কখন আর কাজ করবে কখন! ( যদিও পরে দেখেছি, এখনও দেখছি এই বালিকাদের ওতে আছে প্রবল আপত্তি )

শিপলু, চয়ন, তুলি, মনিকা মিলে যখন আড্ডায় মাতে আমি তখন আমার কাজে ব্যাস্ত। ভুলেও মুখ তুলে তাকাইনা। তাচ্ছিল্যই করি কিছুটা। সুজোগ পেলে দুই পান্ডারে গাইল দেই, মাইয়া পাইলে আর কিছুই বুঝি মনে থাকেনা। তারা আমাকে সহকর্মীদের সাথে ভালো ব্যবহারের গুনাগুন বর্ণনা করলে আমি এ বিষয়ে গ্রন্থ লেখার পরামর্শ দেই!

এরপর আছে অনেক কথা। খুটিনাটি সেসবের আর নাইবা হল বর্ণন...