Friday, June 12, 2015

জ্বরগ্রস্ত

বৃষ্টি, জ্বর আর একাকিত্ব নিয়ে আমার বেড়ে উঠা। বৃষ্টিকে আমরা মেঘ বলি। মেঘের পর মেঘ আমাকে ভিজিয়েছে আশৈশব, বালকবেলা থেকে মেঘে ভিজতে ভিজতে পেরিয়ে এসেছি একাকী তারুণ্য, এসে দাঁড়িয়েছি চালসে সময়ের সামনে...
এত বেশি জ্বর হতো, কেউ আর সেটাকে গুরুত্ব দিতো না। মা-ও না। একবার জ্বরে গা পুড়ে যায়, নানা বাড়ির পুরনো আমলের পালঙ্কে আমার চে বয়েসে বড় রেজাইর নিচে শুয়ে দেখি মা শহরে চলে গেলেন। ডাক্তার দেখাতে হবে যে। জন্মের দাগ রেখে এসেছি মায়ের জরায়ুতে, সে-ও তো আর ভালো থাকে না। সেবার জ্বর ছিলোনা শুধু, সন্ধ্যার আগে আগে সারা শরীর লাল হয়ে হাম এলো! নানী তখন কানে শুনতে পাননা ভালো করে। দুদুমইর বাড়ি থেকে কীসব শিকড় বাকড় আনালেন। একটু পর পর নানী শরীরে হাত বুলিয়ে দেন, আহ্ প্রশান্তি...
চিঠি লিখি। রোল টানা বাংলা খাতার পাতা ছিঁড়ে। ভেতরে অনেক গরম, দই খেতে ইচ্ছে করে, মা বাড়ি নেই... সব লিখে দেই, সব। লোকটার নাম ভুলে গেছি। একটা বড় ঝোলা থাকতো কাঁধে। চোখে মোটা কাচের চশমা। নাকের উপর সুতো পেঁচিয়ে রাখা। চিঠি থাকুক আর না থাকুক এপাশটায় এলে নানাবাড়িতে একবার তিনি আসতেনই। সেই একই খাতার পাতা ছিঁড়ে খাম বানিয়ে ভাত দিয়ে আঠা লাগিয়ে তাঁর হাতে তুলে দেই। প্রাপকের নামে লিখি আব্বা। তিনি আমাকে টিকিটের কথা বলেন, আমি বলি আব্বার কাছে অনেক টিকিট, তিনি নিজে লাগিয়ে নেবেন, আপনি বাক্সে ফেলে দেবেন। তিনি মাথা নেড়ে বিদায় নেন।
ডাক্তার চাচা কোনোদিন আস্তে কথা বলেছেন মনে পড়ে না। পাশে বসে স্টেথোটা বুকে চেপে চোখ বুঁজে, শ্বাস... ছাড়ো... শ্বাস... এই শব্দগুলোই শুধু একটু রয়েসয়ে বলা হয় তাঁর। প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো ঔষধ দেয়ার নাম গন্ধ নাই, শুধু পানি খেতে বলেন। তাতেই আমার জ্বর সেরে যায়। একবার কী হলো কে জানে, রক্ত প্রস্রাব টেস্ট করতে পাঠালেন। মনে হলো এবার তবে ওষুধ মিলবে। রিপোর্ট হাতে নিয়ে চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বিকট আওয়াজ করে বললেন, ‘ফানি খাওনা খেনে!!!’ এবার জগ মেপে ঠিক করা হলো কতটুকু পানি রোজ খেতে হবে। সেটার তদারকিও তিনি নিজে করেন।
হাসমত ভাই সাতবার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। বোর্ডের লোকজন ফেলের লিস্টে হাসমত আলী... হাসমত আলী... হাসমত আলী... দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে তাকে পাস করিয়ে দিয়েছিলো এমনটাই তার বিশ্বাস। দ্বিতীয়বার মাথা ফাটালাম যখন, তিনি দেখতে এলেন ছোট্ট একটা শিশি নিয়ে। ছোট ছোট সাগুদানার মতো মিষ্টি ওষুধ। আম্মা বললেন, ‘ও হাসমত ইতা কিতা দেও? তারনু এলোপ্যাথি চলের...’ হাসমত ভাই হাসতে হাসতে বলে, ‘কুন্তা ওইতনায়, খারে ভাই, তুই খা, আমি হাসমত আলী ডিএইচএম’র ওষুধর লাখান মজা আর কুন্তাত পাইতেনায়!’ হাসমত ভাই থাকতে থাকতেই সেই শিশির অর্ধেকটা গিলে ফেলি, যাবার আগে বলে যান, ‘যতবার বাজারো যাইবে, গুল্লি খাইয়া আইবে, তর লাগি সব ফিরি...’ একেবারে ছোটবেলায় কল্যাণ ডাক্তার নামের একজনের কাছ থেকেও হোমিওপ্যাথির ঔষধ আনতেন আব্বা। অনেক অনেক বছর পরে সেই কল্যাণ ডাক্তারের ছেলে আমার বন্ধু হয়ে এলো! উজ্জল ধর। কথায় কথায় বাবার নাম বলতেই বললাম, এই নামের একজন ছোটবেলায় আমার চিকিৎসা করতেন, সে চোখ পিট পিট করে বলে, ঐ তুই গোয়ালাবাজার থাকছতনি কুনুসময়? আমি হ্যাঁ বলতেই বলে, তাইলে ওই কল্যাণ ডাক্তারই আমার বাপ!
জ্বর উঠলেই চোখ দুটো ফেটে বেরিয়ে আসতে চায়। লাল টকটকে। দেখতে যদি বড়সড় হতাম, অন্তত সাড়ে পাঁচ ফুট হলেও লোকে ভয় পেতো নিশ্চিত। আব্বার একই ধাত। কোনোদিন অসুখ করেনি, মাঝে মাঝে জ্বরজারি হতো। চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে, রক্তজবার মতো লাল সেই চোখ... বাবাইরও এমন হয়!
এমনিতে স্বপ্ন দেখিনা, বা দেখলেও সেটা মনে থাকে না। কিন্তু জ্বর হলেই স্বপ্ন দেখি। সেই একই স্বপ্ন বুঝতে শেখার পর থেকে দেখে আসছি। একটা আকাশ, মেঘলা আকাশ। মেঘ ভাসছে, আমি ভাসছি... মাঠ, ঘাট, প্রান্তর সীমানা ছাড়িয়ে যায়, আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে থাকি। এর বাইরে আর কিছু মনে থাকে না।
প্রতিবার তিন বা চারদিন পরে ভালো হয়ে যায় শরীর। অসুখ সেরে গেলে বিকেলের দিকে আস্তে আস্তে আব্বার কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম। আব্বার হাতলওয়ালা চেয়ারে হেলান দিয়ে। কাজ করতে করতে আব্বা বলতেন, কিতারে বিলাইর বাইচ্চা, কমছেনি? প্রতিবার একই ভঙ্গি, একই প্রশ্ন...। শহর সিলেটে আসার পর আর সেরকম হয়নি। বিকাল হলে আমি অপেক্ষায় বসে থাকতাম, কখন আব্বা আসবেন, কখন কপালে হাত দেবেন... আব্বার হাত এত নরম ছিলো...
জ্বর হলে লাকী আপা মাথার কাছে বসে কখনও কখনও গল্পের বই পড়ে শুনাতো। মনোয়ারা মঞ্জিলের খালাম্মা গ্লাস ভর্তি মাঠা নিয়ে এসে বলতেন, ‘ওই মাস্টরর পুয়া, কিতা ভঙ্গি ধরছত! সারা বাড়ি নিরাই ওই গেছে! জলদি ওঠ’। জেঠু নিয়ে আসতেন ছোট ছোট রসগোল্লা। সুধীর কাকাবাবু একবার দুটো কমলা নিয়ে দেখতে এলেন, অমৃতের মতো সেই কমলার স্বাদ এখনও লেগে আছে ঠোঁটে।
যে বিকেলে জ্বর সেরে যেতো। আস্তে আস্তে গিয়ে আব্বার চেয়ারের পাশে দাঁড়াতাম। কাজ শেষে আব্বা হাঁটতে বেরুতেন আমাকে নিয়ে। সবুজ উলের মাফলার জড়ানো থাকতো গলায়। কখনো নলজুড় কখনো কালনী নদীর পাড় ধরে হাঁটতাম। হাতের মুঠোয় আমার হাত নিয়ে আব্বা হাঁটতেন আস্তে আস্তে। খেলার মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় বন্ধুরা হাত তুলে ইশারা করতো। শেষ বিকেলের নরম আলো লেগে সেইসব মুখ জ্বলজ্বল করতো তখন। আমি হাসতাম। দূর থেকে রোদের বিপরীতে সেই হাসি দেখতে পাবার নয়, তবু তারা হাত নাড়তো... হাত নাড়া সেইসব বন্ধুদের বেশিরভাগের নামই আমার মনে নাই। জানা নাই তাদের ঠিকানা। জ্বর হলে এখনও তাদের কথা মনে পড়ে। এখনও সেই মাঠের পাশ দিয়ে, নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকি। আমার বুড়ো হাত আব্বার হাতের ভেতর চুপটি করে পড়ে থাকে। বন্ধুরা হাত নাড়ায়...
৮৮ সালের বন্যায় আমাদের নদী, পাড় ভেঙে বাড়িতে ঢুকে গেলো। টলটলে জলে সাঁতার কাটতে কাটতে দাদাভাই জ্বর বাঁধালো। ফ্লাড লেভেলের অনেক উপরে থাকা বাড়িটায় দুই আঙুল মাপের পানি। কোত্থেকে দুটো টাকি মাছ এসে ঢুকে পড়লো ঘরে। গার্লস স্কুলে বানানো রিলিফ ক্যাম্পে, কিংবা জলাধার হয়ে যাওয়া খেলার মাঠে মধুদার নৌকা নিয়ে এন্তার ঘুরাঘুরি শেষে বাড়ি ফিরে এলে দাদাভাই সেইসব মাছের নানা খেলার গল্প করতো। লেবুর পাতা দেওয়া জাউ খাবার গল্প করতো। আশ্চর্য, জ্বর হয়নি বলে আমার তখন রাগ লাগতো! তারপর, স্কুল থেকে মাখন স্যার খবর পাঠালেন ক্লাস করার। আশিক ভাই কোলে করে থানার পাকা উঠানে নিয়ে দিলে, জ্বরের উপর তীব্র অভিমান হয়। দাদাভাইর সাথে আমার একটু জ্বর হলে কী এমন ক্ষতি হতো! পানি ঠেলে ক্লাস না করে আমিও তো দুধ দেয়া সাগুদানা খেতে পারতাম শুয়ে শুয়ে!
হাম হলো বলে, সেবার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়। এম, ভি সাজু কিংবা কালনীর কাঠের সরু সিঁড়ি বেয়ে নামার আগেই দেখতে পাই আব্বা ঘাটে দাঁড়িয়ে। সাদা পাঞ্জাবি, চমৎকার করে লুঙ্গি পরা। মাথায় কিস্তি টুপি। ডিউটিতে থাকা পুলিশ কনস্টেবল বলেন, কী কাকা? শরীর ঠিক হইছে? মাস্টার সাহেব তো আলাইর ঘরের সব দই তুলে আনছে... আব্বার হাতের মুঠোতে হাত নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি মাথাটা তাঁর দিকে হেলিয়ে দেই। সন্ধ্যার পরে চাচী আম্মা দেখতে এসে বলেন, ‘তুমি এমন চিঠি লেখলা, ভাইসাবে কান্তে কান্তে চউখ ফুলাইলাইছইন!’ আম্মা অবাক চোখে তাকিয়ে বলেন, তুই চিঠি লেখলে কুনসময়?!?
জুতো খুলতে খুলতে বাবাই হাঁক দেয়, ও বাবা, জ্বর ছাড়ছেনিগো? ফ্যাসফ্যাসে গলায় জবাব দেই, এখন নাই। সিঁড়ি বাইতে বাইতে বলে, আবার উঠবো, প্যারাসিটামল খাইছনি? কপালে হাত রাখে। ছোট্ট একটা হাত, তুলতুলে নরম। পণ্ডিতের মতো বলে, অরেঞ্জ জোসটা খাও, ভিটামিন সি আছে। আমি হাসি... বাবাইকে বলা হয় না, ‘মধুমিতার দই খাইলে আমার জ্বর ছাড়ি দেয়। আমার আব্বায় অফিস থাকি বারইয়া আটি আটি চৌহাট্টা আইয়া দই কিনতা, এরপরে রিক্সাত উঠিয়া বাসাত আইতা...’