Monday, July 9, 2012

চিঠি: বাবাইকে


এভাবে বেড়ে উঠলে বাবাকে ছাড়িয়ে তুমি
বুক টান করে দাঁড়াতে শিখে যাবে আর
কটা দিন পরেই। তোমার সদ্য কাটা চুল
হাত গুটিয়ে পরা সাদা শার্ট, নাবিকের নীল
প্যান্ট, কালো পলিশ করা জুতো… আমি
কিযে মুগ্ধতায় তোমারে দেখি… বাবার
কথা মনে পড়ে শুধু। আমি বুঝতে পারি,
বাবা কেমন চোখে দেখতেন আমারে…

তোমার সাথে কথায় পারি না এখনই,
তোমার মতো মানবিকবোধও নাই আমার
আমি শুধু মুগ্ধ হতে জানি, তোমার ফড়িং
বন্ধুর মতো আমি তোমার আরেকটা বন্ধু
হতে চাই, এ্যাকুরিয়ামে রাখা সোনালী মাছের
মতো নিয়ত সাতরাতে চাই তোমার মনে!
জানি সেসব সম্ভব নয় আমার জীবনে…

তুমি জানবে, তোমাকে জানানো হবে
এক ব্যর্থ পিতার সন্তান তুমি।

পিতাকে নিয়ে অহংকারী কোন
উচ্চারণ তোমার থাকবে না বাবাই
শুধুমাত্র একটা ঘোষনা তুমি
বুক উচিয়ে দিতে পারো চৌরাস্তার
সড়কদ্বীপে দাঁড়িয়ে- ‘তোমার
বাবা, কালো বোকা মানুষটা
ভীষণ ভালোবাসতো তোমায় …

Thursday, July 5, 2012

বাড়ি ফেরা



আজ গরম খুব বেশি। শ্রাবণ মাসের তপ্ত রোদ। এই মাসটা বৃষ্টির মাস। বৃষ্টি মানেই একটা কোমল ভাবনা, কোমল সময়। রবীন্দ্রনাথ বৃষ্টি নিয়ে কতো রকম আমোদে কাব্য রচনা করেছেন। কিন্তু সব কিছুই এখন উল্টে গেছে। গত তিনদিন ধরে টানা রোদ দিচ্ছে। আকাশে একফোটা মেঘ নেই। এরকম রোদ আরো কয়েকদিন হয়তো চলবে। অবশ্য এই মাসটার কোন তাল নেই। কোন ফাকে দেখা যাবে কোত্থেকে টেনে হিচড়ে মেঘ নিয়ে এসেছে, তারপর ঝুম...

রাহাত চিন্তা করে দেখেছে, প্রকৃতি সবসময় তার সাথে বৈরি আচরণ করে। যখন একটু ছায়া দরকার তার, তখন দেখা যাবে আকাশে এক টুকরা মেঘও নেই। আর যখন তার রোদ দরকার তখন দেখা যাবে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। তিন রাস্তার মোড়টাতে দাড়িয়ে রিকশা খুজতে খুজতে ঘামে প্রায় গোসল হয়ে যাচ্ছে তার। না পাচ্ছে রিক্সা না পাচ্ছে ছায়া।

ফোন বাজে প্যান্টের পকেটে। ময়নাবাবু নিশ্চয়। হ্যা, দাদুর ফোন থেকে রিং করেছে। ইদানিং এই এক মজা হয়েছে তার। বাবার নাম্বারটা মুখস্থ করেছে। তাই যখন ইচ্ছে তখন যারতার ফোন থেকে কল করে ফেলে। সেদিন স্কুল থেকে ফোন দিয়েছে। ক্লাস টিচারের ফোন থেকে। বিষয়টা ভাবতেই বিব্রত হতে হয়। আজকে এই নিয়ে তিনবার হলো। ফোন ধরেই এক কথা, বাবা ফুলঝরি বাতি কিনছো? হ্যা, হ্যা বলেও পার পাওয়া যাচ্ছে না। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে বলছে, আনবে কিন্তু, আনবে কিন্তু। এখন ফুলঝরি বাতির সাথে যোগ হয়েছে এক প্যাকেট আগর বাতি। এটা দাদুর জন্যে। রাহাত হাসে। মা নিশ্চয় পাশে থেকে ইশারা দিয়ে বলে দিচ্ছে। আজকে শবে বরাত। মা সন্ধ্যার পর থেকেই এবাদতে বসবে। তাই আগর বাতির অর্ডার। ফোন রেখে আবার দোকানে ফিরে যায় রাহাত।

পলিথিনের ছোট্ট ব্যাগটাতে এখন এক প্যাকেট আগরবাতি, এক প্যাকেট মশার কয়েল আর এক প্যাকেট ফুলঝরি বাতি।

ছোট বেলায় এমন দিনে বাবা তাদের জন্যে ফুলঝরি বাতি নিয়ে আসতেন। লাইন ধরে তারা ভাইবোন মিলে ফুলঝরির বাতি ধরিয়ে আকাশে ছুড়ে দিতো। কারটা কত উপরে উঠে আর কত বেশি জ্বলে সেই প্রতিযোগীতা চলতো। মায়ের ছিলো প্রবল আগ্রহ। ছেলে মেয়ের সাথে তিনিও থাকতেন। রাহাতের সেইসব আগ্রহ এখন মরে গেছে, কিন্তু মা আগের মতোই আছেন। আজ সন্ধ্যায় এবাদতের ফাঁকে ঠিকই নাতির সাথে ফুলঝুরির বাতি জ্বালবেন তিনি।

রিক্সা পেতে হলে রাস্তাটা পাড়ি দিতে হবে। রাহাত দু পাশ দেখে রাস্তা পাড়ি দেয়। টেলিফোনের থামটার পাশে দাড়িয়ে রিক্সা ডাকতে থাকে। না, রিক্সা নেই। যাও দু’একটা খালি আসছে তারা কেউই যেতে চায় না।

ঠিক তখনই রাহাতকে অবাক করে দিয়ে আস্তে আস্তে আবছায়া করতে থাকে। আকাশে তাকিয়ে দেখে কয়েক টুকরো মেঘ জমছে তার মাথার উপর। রাহাত হাসে, আস্তে আস্তে মেঘ জমতে থাকে। আবাছায়াটা কালো হতে হতে একসময় ঝুপ করে নেমে আসে বৃষ্টি।


কোনমতে বাঁচানো গেছে হাতের প্যাকেটটা। পলিথিনটার মুখে শক্ত করে গিট্টু দিয়ে পানি আটকানো গেলো। কিন্তু শরীরটা আর বাঁচানো গেলো না। অবশ্য রাহাত চেষ্টাও করেনি। ভিজতে তার ভালই লাগছিলো। টানা তিনদিনের প্রচন্ড গরম শেষে এই বৃষ্টি। পাশের দোকান থেকে আরেকটা পলিথিনের ব্যাগ চেয়ে নিয়ে সেটাতে মানিব্যাগ আর মোবাইল পুরে রাহাত হাটতে থাকে রাস্তায়। লোকজন তাকে অবাক চোখে দেখে, সেদিকে খেয়াল নেই তার। সে হাটছে। এখন আর রিক্সার অপেক্ষা করে লাভ নেই। ড্রাইভারগুলো এখন যেকোন দোকানের সামনে রিক্সা দাড় করিয়ে বৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে।

রাহাত হাটতে হাটতে ময়নাবাবুর কথা ভাবে। আজ ফুলঝরি নিয়ে কি ধুন্দুমার হবে। ছোটখাটো বিষয় থেকেও মায়নাবাবু আনন্দ খুঁজে পায়। তার অপার বিস্ময় পৃথিবীর সকল কিছুতেই। মা নিশ্চয় এই তারাবাতির কথা বলেছে। আর সেই থেকেই বায়না, তাকে কিনে দিতে হবে। এম্নিতে সে তেমন বায়না ধরা টাইপ বাচ্চা নয়। বড় কোন চাহিদা ওর নেই। দোকানে গিয়ে কোন কিছুর জন্যে জেদ ধরাও ওর মধ্যে নেই। তবু মাঝে মাঝে এমন কিছুর জন্যে হামলে পড়ে। রাহাতের এতে খারাপ লাগে না। ভালই লাগে। হাতে যখন পছন্দের জিনিসটা পাবে তখন ফোঁকলা দাত বের করে যে হাসিটা দেবে আর গলা জড়িয়ে ধরে যখন আদর করবে তখন পুরোটা দুনিয়া প্যাকেট করে ওকে দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।

রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রায় সব রাস্তাই ভেঙ্গে একসার। রাস্তার মাঝখানে ইয়া বড় বড় গর্ত। একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। একেকটা যেনো ছোটখাটো পুকুর। সেইসব পুকুর থেকে বাঁচতে গাড়িগুলো ফুটপাতে উঠে আসে। রাহাত হাটছে আর সেইসব পাশকাটানো গাড়ি তাকে পেছনে ফেলে যাচ্ছে। বৃষ্টির মাঝে তাদের গতি যেনো বেড়ে গেছে। আশেপশের কোন কিছুকেই  আমলে আনছে না। চাকায় লেগে পানির ঝাপটা এসে কয়েকবার পড়েছে রাহাতের গায়ে। সাথে সাথেই সেই ময়লা ধুয়ে নিয়েছে বৃষ্টি। তাই রাগ করতে গিয়েও রাগ করেনি সে। বরং ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে আনমনে হাটছিলো। বৃষ্টি হওয়াতে ভালই হলো। আজ হাটতে হাটতেই বাড়ি যাওয়া যাবে। এমনিতে রাস্তাটা খুব লম্বা নয়, তবু হাটা হয় না কখনও।

প্রায় পৌছে যাবার আগে, বড় রাস্তার শেষ মোড়টাতে এসে দাড়ায় রাহাত। এখন রাস্তা পাড়ি দিতে হবে। এরপর একটু এগিয়ে বায়ে ঢুকে পড়তে হবে তাদের গলিতে। মাত্র পাচটা বাড়ি তারপরই ময়নাবাবু। বুয়া দরজা খুলে দিলে দেখা যাবে সামনে দাড়িয়ে আছে ফোঁকলা দাত নিয়ে। হামি দেবার নাম নেই, প্রথমেই হাত পেতে তার জিনিস চাইবে। আজ অবশ্য অন্যরকমও হতে পারে। ভিজে জুবোথুবো বাপকে দেখে কিছুটা অবাক হতে পারে সে। কিংবা নিজেও বৃষ্টিতে ভিজবে বলে লাফ দিয়ে বাবার কোলে উঠে যেতে পারে। রাহাত কল্পনায় ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে, ঘুরতে থাকে, ময়নাবাবু দু-হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে দেয়, রাহাতও আকাশ দেখে, দরজায় দাড়ানো মা চিৎকার করে বলেন, রাহাত না... না... ভিজিস না, ওর জ্বর আসবে... না... না... না... অনেক কণ্ঠে সেই না শুনতে পায় রাহাত, শুনতে পায় তীব্র ব্রেক কষার ধাতব শব্দ, মাঝ রাস্তায় জমে থাকা এক ঝাপটা পানি এসে পড়ে তার চোখে মুখে, হাত থেকে ছিটকে পড়ে পলিথিনের জড়ানো ব্যাগ... রক্তে মাখা মাখি হতে হতে রাহাতের শুধু মনে পড়ে, ব্যাগটা ছিড়ে গেলে ফুলঝরি বাতিগুলো পানিতে নেতিয়ে যাবে, আর জ্বলবে না। সে ছুটে গিয়ে প্যাকেটটা তুলে আনতে চায়, পারে না।



আগস্ট, ২০১০

Tuesday, May 22, 2012

আয়ুষ্কাল


আমিনুল ভাই তখন  আটত্রিশ বছরের যুবক। কিন্তু দেখলে মনে হয়  কমপক্ষে পঞ্চাশ তার বয়েস। লম্বা পানজাবী, মাথায় টুপি, তার সাথে মিল রেখে গালে পাতলা দাড়ি। তাবলিগের চিল্লা দিয়ে বেড়ায়। উত্তরের কোন এক জেলা থেকে লম্বা তাবলিগী সফর দিয়ে সে আমাদের বাড়িতে এলো। তখন দুপুর, মার্চ মাসের হালকা গরমের দুপুর। তার গাল  ভেঙ্গে বেশ ঢুকে গেছে। চোখের নিচে কালি। ঝোলার মতো ব্যাগটা কোন মতে দরজার কাছে রেখেই সে সটান শুয়ে পড়লো মেঝেতে। বাড়িতে হট্টগোল শুরু হলো। আমিনুল ভাই এর গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। সে কোনমতে বাড়ি পর্যন্ত এসেছে, আর কোলাতে পারছে না।

আব্বা বিকেলে বাড়িতে ফিরেই শুরু করলেন গালাগালি। তাবলিগীর গোষ্ঠি উদ্ধার করতে লাগলেন। আমিনুল ভাই চিচি করে মিহি কণ্ঠে শুধু চাচার হেদায়েত কামনা করছিলো। কিন্তু সেটা এমনভাবে, যেনো আব্বার কানে না পৌছে। আব্বা পারেনতো তখনই বাড়ি থেকে তারে বের করে দেন। তাবলীগের মতো বেকার কাজে যে জোয়ান ছেলে সময় কাটায় তার কোন দরকার নাই। আম্মা নানান চেষ্টায় আব্বারে সামলালেন সে যাত্রায়।

আমিনুল ভাই বাড়িতে আসার পর পরই মা বাড়ির পুরনো লোক মনতেরার বাপকে গ্রামের বাড়িতে পাঠালেন। সে সন্ধ্যার ঠিক লাগোয়া সময়ে বড় চাচীরে নিয়ে এলো। আব্বা আবারও রেগে গেলেন। ছেলেকে কেনো বাড়িতে তালা দিয়ে রাখলেন না, এমন পাগলরে ঘরে দড়ি দিয়ে বেধে রাখা দরকার এমন কথার উত্তর দেয়ার সাহস চাচীর ছিলো না। আব্বা শুধু টানা গজ গজ করে গেলেন। আমিনুল ভাই তখন অনেকটা সামলে নিয়েছে। হান্নান ডাক্তার তাকে দেখে গিয়েছে ইতিমধ্যে। পেটে দানাপানির সাথে ঔষুধও পড়েছে। সে আস্তে আস্তে তার দুস্টামি মাখা কথাও শুরু করেছে। আমরা গোল হয়ে তার চারপাশে বসে আছি। সে তাবলিগের গল্প করছে। লোভাতুর নানা বর্ণনা দিচ্ছে রাজশাহী অঞ্চলের। আমের বোল দেখে এসেছে। মে মাসের শেষ দিকে সে আবার যাবে, আল্লার রাস্তায় সফরের সাথে সাথে আম-লিচুও খাওয়া হবে বিস্তর। তার বর্ণনা ভঙি ছিলো অসাধারণ। মিন্টুভাই সেই ভঙিতেই ঠেসে গেলো। বায়না ধরলো তাকেও সাথে নিতে। আমিনুল ভাইতো কোনমতেই রাজী না। বার বার বলছে, নারে ভাই, ছোটচাচা আমারে বাড়ি থেকে বের করে দেবে তাইলে। মিন্টুভাই বল্ল সে নিজে আব্বারে বুঝাবে। তাছাড়া তখন তার স্কুল বন্ধ থাকবে। তখন একটু সায় দিলো আমিনুল ভাই। কিন্তু সাথে অদ্ভুত একটা কথাও বল্ল, কঠিন গলায় বল্ল, 'তোর এইসব মিন্টু ফিন্টু সেখানে চলবে না কিন্তু।' আমরা না বুঝে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এটা আবার কেমন কথা। তখন সে বুঝিয়ে দিলো। মিন্টু নামটাতো ভদ্রস্থ না, আর যেহেতু মিন্টুর একটা ইসলামী না আছে, সেহেতু সেই নাম, মানে মুনতাসির নামেই সেখানে তাকে পরিচয় দিতে হবে। তাছাড়া জামাতের নায়েবে আমীরের ভাই এর নাম মিন্টু হওয়া নাকি শোভন না। আমরা তখন জানলাম আমিনুল ভাই সেই তাবলীগ জামাতের নায়েবে আমীর, যার অর্থ সহ-সভাপতি।

আমিনুল ভাই ৩/৪ দিনের মাথায় সেরে উঠলো। লম্বা যাত্রার ধকল, ঘুম-খাবারের অনিয়মের জন্যই তার শরীর খারাপ হয়েছিলো। ডাক্তার-আব্বা-আম্মা-চাচী সবারই সেই মত। কিন্তু আমিনুল ভাই সেটা মানতে নারাজ। সে বল্ল তার আসলে অন্য সমস্যা। সেটা সময় হলেই বলবে। আব্বা দিন সাতেক পরে তাকে ডেকে নিলেন। তার সমস্যা কি সেটা জিজ্ঞেস করলেন। প্রথমে আমতা আমতা করলেও একসময় সে বল্ল, তার নাকি পানি খেতে ভালো লাগে না, তিতা তিতা লাগে। আব্বা একটুক্ষণ থম মেরে গেলেন, তারপর বল্লেন, জ্বরের জন্যই এমনটা হয়েছে। আমিনুল ভাই মাথা নাড়তে নাড়তে বল্ল, না। মাস খানেক ধরেই তার এমন হচ্ছে। আব্বা এবার বেশ অসহিষ্ণু হয়ে পড়লেন। ধমক দিয়ে বল্লেন কি যা ইচ্ছা তাই বলিস। তিরিশ বছর হয় নাই বয়স তর আবার পানি তিতা লাগবো ক্যান? আমিনুল ভাই শুধরে দিয়ে বল্ল তার বয়েস আটত্রিশ। আব্বা ধমক দিয়ে তারে সরিয়ে দিলেন। বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারলাম না আমরা। পানি তিতা লাগাতো রাগ করার মতো বা ভয় পাবার মতো কোন বিষয় না। জ্বর হলেতো সবারই এমন লাগে। আমিনুল ভাই সে কথা আমাদের বুঝাতেও চায় না। তবু আমরা নাছোড় হয়ে তারে ধরি।

দাদাজানের তখন পয়তাল্লিশ বছর বয়েস। আব্বা মাত্র দশ বছরের। গ্রামের ভারতের ইশকুলে পড়েন। সেই বয়েসে দাদাজান বলতে লাগলেন তার মরণের সময় উপস্থিত, কারণ তিনি পানির স্বাদ পাচ্ছেন না। তিতা তিতা লাগে। এই অসুখেই দাদাজানের বাপ দাদা মারা গেছেন! তারপর সত্যি সত্যি দাদাজান সেই বছরটা না ঘুরতেই মারা গেলেন! গল্পটা ভয় ধরানোর। আমরা ভয় পেলাম, কিন্তু সেটা অল্প সময়ের জন্য। মিন্টুভাই আমাদের ভয় কাটিয়ে দিয়ে বল্ল, আমিনুল ভাই হিসাব মতো আরো সাত বছর বাঁচবে। পয়তাল্লিশ হতে নাকি আরো সাত বছর বাকি। তবুও সুরটা যেনো কোথায় কেটে গেলো। চাচী কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেল্লেন, আর পরের সকালে জোর করে আমিনুল ভাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন তিনি। আব্বা কিংবা আম্মা তেমন উচ্চবাচ্চ করলেন না। আমিনুল ভাই যাবার আগে  মিন্টুভাইকে বলে গেলো জুন মাসের জন্য রেডি হতে। কিন্তু সেই জুনে আমিনুল ভাই আর রাজশাহী যেতে পারলো না। কাঠফাটা গরমের এক দুপুরে সে কোন কিছু জানান না দিয়ে মরে গেলো। আমাদের ভাইদের মাঝে ধাম করে একটা ড্যাশ চিহ্ন একে দিয়ে আমিনুল ভাই সত্যি সত্যি মরে গেলো।


মানুষের গড় আয়ু নিয়ে আব্বা খুব কথা বলতেন। বাংলাদেশের মানুষ গড়ে পঞ্চান্ন বছর বাঁচে এমন একটা তথ্য দিয়ে তিনি বলতেন তার নাকি এক্সট্রা লাইফ চলছে।  কিন্তু সেটা বেশি টেনে নিতে পারলেন না। তেষট্টি বছর বয়েসে বুকের হাল্কা ব্যাথায় আব্বা চলে গেলেন। কিন্তু তার বছর খানেক আগে থেকেই আব্বা প্রস্তুত হচ্ছিলেন চলে যাবার জন্যে। প্রথম দিকে সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। যখন বুঝলাম, তখন উড়িয়ে দিতে চাইলাম বিষয়টা। কিন্তু তবু মনের ভেতর খট-খট, খট-খট করতেই থাকলো। পারভিন তখন মাত্র বি,এ পাশ করে একটা স্কুলে ঢুকেছে। সে তার বেতন পেয়ে কয়েক ডজন পানির বোতল নিয়ে এলো। আব্বা প্রবল আগ্রহে সেটা খাওয়ার চেষ্টা করলেন, হলো না। ডাব খেলেন কিছুদিন, তারপর সেটাও তিতা লাগতে শুরু করলো। এসব করতে করতে মাস ছয়েক হয়তো গেলো, আব্বা হাল ছেড়ে দিলেন। তারপর সেই চুড়ান্ত দিন। আমরা শুধু অসহায়ের মতো আব্বার চলে যাওয়া দেখলাম।


আম্মার চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। অস্বাভাবিক কিছু না। এ বয়েসে সবারই কম বেশি চোখের সমস্যা হয়। কিন্তু আম্মা তার সমস্যাটা বাড়িয়ে দিয়েছেন নিজে। তিনি চশমা পরতে পারেন না। চশমা পরলে নাকি সবকিছু দোতলা হয়ে যায়। প্রথম প্রথম চশমা পরলে এটা হয় সবার। সময়মতো সেটা কেটেও যায়। কিন্তু সেই সময়টাই দিচ্ছেন না। তার জীবনটা স্থবির হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ঘরের পরিচিত বলয় ছাড়া তিনি বেরুচ্ছেন না। আন্দাজে যা যা করা যায় সেটাই করে যাচ্ছেন। তবু খাবার টেবিলে তার রোজ বসতেই হবে। আমার খাবার দাবার ঠিকমতো হচ্ছে কী না এই  দায়িত্ব আর কারো উপর ছেড়ে দিতে তিনি নারাজ। আমার বউ এ নিয়ে ঠাট্টা করে, আগে সেটা অভিমান ছিলো। মেনে নিয়েছে এখন। কিন্তু ঠাট্টাটা আর ছাড়েনি। আম্মা কঠিনভাবে আমাকে খাওয়াবেন বসে বসে। কি খাচ্ছি, কতটুকু খাচ্ছি সেটা দেখার সময় তার চোখে কোন সমস্যা থাকে না। তাই ফাকিঁবাজি করা যায় না। কয়েকদিন ধরেই তার হিসাব মতো আমি পানি কম খাচ্ছি। প্রতিবার খাবারের সময় সেটা বলছেন। আমার সমস্যা কি সেটা জিজ্ঞেস করছেন। আমি প্রবলভাবে তাকে বুঝাতে চেষ্টা করছি, আমার কোন সমস্যা নেই। যতটা পানি খাবার দরকার, ততটা আমি খাচ্ছি। তবু তার সন্দেহ দুর হয় না। আজ খুব ধীর গলায় তিনি বল্লেন- টিটন, সত্য করে বলতো বাবা, তোর কি পানি খেতে সমস্যা হয়, তিতা তিতা লাগে? আমি জোর গলায় হেসে উঠি। মাকে বলি, তুমি কি ভাবছো মা? আমি মরে যাবো এটা ভাবছো নাকি? নিশ্চিত থাকো সেইটা হবে না। আমি তোমারে কবরস্থ করবো, এইটা একটা পাক্কা কথা। মা কিছু বলেন না। তিনি আবারও আগের মতোই জিজ্ঞেস করেন, সত্য করে বল টিটন, আমারে ফাঁকি দিস না। আমি বলি, না মা, সত্যি বলছি, আমার তিতা লাগে না। মা নিশ্চিত হোন। আমি উঠে পড়ি। মায়ের সাথে মিথ্যা বলে আমি অফিসের পথে হাটি...

Sunday, April 8, 2012

ফোন বিল


ফোন বিল এলো, একাশি টাকার
গতমাসে এসেছিলো, তার আগের
মাসে, তারও আগের মাসে, প্রতিমাসে
একটা করে, প্রতিবারই একাশি টাকা...

মূলত, একা মানুষের ফোন থাকতে পারে
হয়তো, কথা বলার কেউ থাকে না

Saturday, March 10, 2012

না কবিতা


আমি কবি হতে চেয়েছি সবসময়। কবিতায় যাপন করতে চেয়েছি জীবন। বাউল হতে চেয়েছি। নগ্ন পায়ে হেটে যেতে চেয়েছি খোলা প্রান্তরে, রাত আর চাঁদকে নিয়ে পাড়ি দিতে চেয়েছি আমার সারাটা জীবন। সেসব কিছুই হয় নি। কারন নিজের ভেতরের আমিকে আমার বাইরের আমি কখনই ছাড় দেয়নি। সংসার ভালো লাগে না আমার তবু গৃহেই বসবাস। এই বৈপরিত্ত অথবা ভণ্ডামী নিয়েই আমার নিত্যদিন।

কবিতা লেখার এবং কবিতা যাপনে ব্যর্থ হলে মানুষটা আর মানুষ থাকে না। আর যে মাঝামাঝি আটকে থাকে সে একটা কিম্ভুতে পরিণত হয়। সম্ভবত আমিও একটা কিম্ভুত। জোর জবরদস্তি করে আমি প্রায়শঃ এটা সেটা লিখে ফেলি এবং পদ্য বলে ভান করি। সেসবে নেমে আসা কিছু পদ হয়তো থাকে, বাকিটা ইট-সিমেন্টের কারিকুরির মতো।

কাগজে, কিংবা কম্পিউটারে মাঝে মাঝে একটা-দুটো লাইন কেমন করে যে আসে... আমি সেসবের সুরাহা করতে পারি না অনেক সময়। প্রবল আলস্য আমার, চেষ্টাও খুব বেশি করি না। টুকরো টাকরা কাগজ একসময় উড়ে যায়, হারিয়ে যায়। কিন্তু জিমেইলের ড্রাফ্ট কিংবা কম্পিউটারে হঠাৎ খোলা কোন ওয়ার্ড ফাইলে টোকে রাখা কিছু লাইন মাঝে মাঝে খুলে যায়। আমি সেসব দেখি, পড়ি, কিন্তু তাদের আর কোন গতি হয় না। ফেলে দিতে চাই, তাও পারি না। কেমন মায়া লাগে। মাঝে মাঝে অবাক হই, মানুষ মানুষকে অবলীলায় ছুড়ে ফেলে দিতে পারে, আমিও হয়তো দেই, কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন লাইনগুলোকে কেনো ফেলতে পারি না? মানুষ কতো বিচিত্র সেটা আমি নিজেরে দিয়েই বুঝতে পারি। বড় বিচিত্র মানুষ, তারও চে বেশি বিচিত্র তার যাপিত জীবন‌‌ ...



১.
এইসব কথার মারপ্যাচে তুমি কি বলো?
তা কি জানে তোমার মন?
আঙুল প্রত্যহ মানবিক চাওয়াকে করে গোপন,
তুমি কি নিজেরে ফাঁকি দাও মেয়ে?

২.
এইসব রতিহীন রাত, কবিতার রাত,
রাতের নিরবতা, জলজ বিষণ্নতা আর
তার স্থিরতায় তুমি একবার ভাসো।
ডুববেনা জেনে রাখো, প্রশান্তি

৩.
কত রাত হলে ভাসবো বলো?
কতো রাত হলে হবে রাধা?

৪.
দুঃখের কথায় রমণী তবে ভয় পায়!
নিয়ম ভাঙার অনিয়মে এত ভয়!

৫.
স্রোতের আছে রকমফের, মানবিক সম্পর্কের মতো।
কতটা স্রোতস্বিনি হবে আর কতটা সম্পর্কে জড়াবে
লীলাবতী, তার কতটাইবা জানে বাউল?

৬.
এইসব কবিতার রাত, রতিহীন,
কি সত্য বহন করে? নাকি
সকলই মিথ্যা, অনুযোগ, সন্তাপ…

৭.
স্থির কোন ভাবনায় আটকে থাকতে পারে মানুষ?
যোগীনির কি আছে কোন বিশেষ আবরণ?

নেই যদি বলে লোকে, তবে কেনো প্রশ্ন তোলে শান্ত স্থিরতার?

৮.
এতো হিসাব করো কেনো? কেনো এতো নিয়ম মানা?
তুমি শেখোনি কেনো, বুকের ঘ্রাণ না দিয়েও ভরসার
ওম দেয়ার গোপণ কোশলতা?
এতো ভয় করে, এতো ভয়, এই বুঝি দুর্বল সম্পর্কের
সুতো কেটে উড়ে যায় লীলাবতি ঘুড়ি, ভোকাট্টা…

৯.
আলবাব, তুমি নিজেই তোমার বন্ধু নও
লীলাবতী সেতো বহুদুর, তবু আজ আকাশ
ঢেকে গেলে কালো মেঘে, তোমার কেনো
ইচ্ছে করে বৃষ্টি খেলবার? হবে না, না।

১০.
সীমান্তে দাড়ালেই চোখে পড়ে পাহাড়ের সারি,
মাঝে মাঝে কানে আসে ঝর্ণার পতনের শব্দ।
আমি মন খারাপ করি, মন খারাপ
যে পাহাড় আমি ছুতে পারি না, যে ঝর্ণায়
আমি ভিজতে পারি না, সে পাহাড়ে সে ঝর্ণায়
নাই আমার মুগ্ধতা, আমি হিসেব করি
সমৃদ্ধির শেষ আর শুরু হলো আমার।

তুমি এক দুরের মানুষ, আমি ছুতে পারি না
আমি দেখতে পারি না তোমায়, তবু তোমারে
আমার বড় বেশি আপন মনে হয়, সীমান্তের
হিসাব এখানে মিলে না, এ বড় মানবিক হিসাব
লীলাবতি, এ তুমি বুঝবে না।


১১.
এই বিশ্রি শহরে তুমি কি করো?
এই শহরতো তোমার নয়, আমারও নয়।
এখানে বড্ড বেশি ভীড়, এখানে বড্ড কোলাহল
হারিয়ে যাওয়ার মতো অচেনা শহর।

সাবধানে থেকো লীলাবতী, তৈরি করো পরিচিত বলয়

১২.
আমি জানি, তুমি ভাবছোনা আমার কথা
তোমার প্রাত্যহিকে আমি নেই, থাকি না
তোমার অভ্যাসে, আনন্দে, অভিসারে…

Tuesday, March 6, 2012

রেনুকা


শান্ত, স্নিগ্ধ, স্রোতময় জলধারা তুমি
নীলাকাশ যেনো মিশেছে নতজানু হয়ে
তোমার পায়। আমি মুগ্ধ কিশোরের মতো
তোমারে দেখি, আমি তোমার কোমলে ভাসাই নিজেরে...
আর বড় অসহায় লাগে, যখন দেখি তোমার ষোল আনার
দখল নিয়েছে পাইক-পেয়াদাতে, আমি এক বোকালবাব, জলকাতর,
ভালোবাসারও যার নাই অধিকার। তবু তুমি জেনে রাখো রেনুকা,
তোমারে ভালোবাসবে না আর কেউ আমার মতো, আমি ছাড়া আর
নাই কোন যোগ্য প্রেমিক তোমার...

রেনুকা, জলবতী আমার, ভালোবাসতে দেবে?

Tuesday, February 28, 2012

সন্তাপ ০২


০৯.০৭.১২

প্রথম ঘন্টায় হিসেবে মিলেছে গত ঘন্টার কণ্ঠস্বর
দ্বিতীয় দিনে বলেছি গতকাল, এভাবে প্রতিদিন
পূর্ববর্তি দিনকে টেনে এনেছি …
অষ্টম দিবসে এসে আর 'গত' বলতে পারি না
বলতে হয় গত বৃহস্পতির আগের বৃহস্পতিবার!
হায়, এত দ্রুত তুমি দুরে সরে যাও
হায়, এত দ্রুত তুমি স্মৃতি হও!


শূন্যতা

কল লিস্ট থেকে তোমর নামটা উধাও
শেষবার দেখেছি ১৩৪ টা মিস্ড কল
৩২ টা কল আর ডায়াল লিস্টে কিছুই নেই!

হু, কিছুই নেই, আমি তোমাকে ফোন করিনি
ইদানিংকালে, কোনদিনই না মনে হয়, ঘন্টায়
ঘন্টায় উল্টোদিক থেকে কথা বলা হলে এপাশ
থেকে কি সেরকম টান থাকে? থাকে না বোধয়

১৩৪ টা মিস্ড কল মানে কমপক্ষে তিরিশটা সকাল,
বিশটা দুরের যাত্রা, কমপক্ষে বিশবার তোমাকে উপেক্ষা!
সবকিছু মনে পড়ে না, মনে পড়বে না। শুধু শেষবার,
জীবনের শেষবার, চলে যাবার ঠিক আগে আগে একেবারে
স্বাভাবিক কণ্ঠে যখন বল্লে, ‘শরীরটা খারাপ লাগছে
একটু আয়,’ এই কথাটা ভুলবো না। কল লিস্ট থেকে
তোমার নাম মুছে গেছে, আরো অনেক লিস্ট থেকে কাটা
পড়বে তোমার নাম, শুধু খুব গোপনে গভীরে আমার কানে
বাজবে, শরীরটা খারাপ লাগছে, খারাপ লাগছে, খারাপ লাগছে…

কি অপার শূন্যতায় ফেলে গেলে আমায়, তা কি বুঝ তুমি?

Sunday, January 1, 2012

ইজা...

বাবার শরীরে একটা ঘ্রাণ ছিলো। ঘাম জমে জমে সম্ভবত ঘ্রাণটা তৈরি হতো। মায়া মায়া একটা ঘ্রাণ। বাবার কাপড় চোপড়ে সেই ঘ্রাণ। বাবার বিছানায় সেই ঘ্রাণ... আর কেউ সেই ঘ্রাণ পেতো কী না জানি না। আমি পেতাম। বাবার গামছায় লেগে থাকা ঘ্রাণ নিতে রোজ সকালে আমি মুখ ধুয়ে তার রুমে ঢুকতাম। বাবা সম্ভবত সেটা জানতেন। ভোরে ওঠা ছিলো বাবার অভ্যাস। ওজু পড়ে গামছায় হাত মুখ মুছে আলনার একটা পাশে সেটা মেলে দিতেন। আমি সেই গামছায় মুখ মুছতে মুছতে বাবার সাথে কথা বলতাম। গুরুত্বহীন আলাপ সেসব। আমি আলাপের আড়ালে ঘ্রাণ গিলতাম। বাবার ঘ্রাণ...