Tuesday, December 23, 2014

পূনর্জীবনের ইসলাম

ইসলাম পূনর্জীবন লাভ করে প্রতিটি কারবালার পর। এরকম একটা কথা বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে খুব প্রচলিত এবং জনপ্রিয় বটে। এবং সেটা উর্দুতেই বলা হয়ে থাকে সবসময়। সে হিসাবে এটি সম্ভবত উর্দু থেকেই এসেছে।
কারবালা ইসলামের ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। নিষ্ঠুরতা, শঠতা, প্রবঞ্চনার ইতিহাস এই কারবালা। তো কারবালার কথা যখন এভাবে বলা হয়, তখন আম মুসলমানের মনে এটাই খেলা করে যে, ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ভাষায় বিধর্মীদের আরেকটা মহা ষড়যন্ত্র এই কারবালা। কিন্তু আদতেতো তা নয়। কারবালা মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরই যুদ্ধ। এবং এটা প্রথম যুদ্ধ নয়। এর আগে ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.) নিহত হয়েছেন স্বজাতির হাতে। চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) যুদ্ধ করেছেন স্বয়ং নবী (স.) এর প্রিয়তম পত্নী আয়শার (রা.) বিরুদ্ধে। এই দুটি বড় ঘটনার বাইরেও যুদ্ধ অথবা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি আরও তৈরি হয়েছে কারবালা পুর্ববর্তী নাতিদীর্ঘ সময়ে। কিন্তু সেসবকে ছাপিয়ে কারবালা অন্য মহিমায় স্থান করে নেয় ইতিহাসে। এর পেছনে সম্ভবত মুসলিম নৃশংসতার একটা বড় অবদান আছে। মুসলমানদের উপর মুসলমানদের সবচেয়ে নৃশংস কর্মকান্ড এই যুদ্ধের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে।
কারবালার ঘটনার পর ইসলামের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সময় শুরু হয়। উমাইয়া এবং আব্বাসীয় খেলাফত এর পরের প্রায় ৬ শ বছর টিকে ছিলো। অন্যান্য সকল রাজবংশের মতো এই দুই বংশেও খুনাখুনি, হানাহানি, কামড়াকামড়ি সবই ছিলো। তারপরও এই সময়টাকে সুসময় হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সম্ভবত এই কারনেই ইসলাম প্রতিটি কারবালার পর পূনর্জীবন লাভ করে এই রকম কথার প্রচলন হয়েছে।
তো ঘটনা হলো মুসলমানরা মুসলমানরে মারে। এটা নতুন কোন ঘটনা নয়। ইসলামের শুরু থেকেই এটা হয়ে আসছে। মারামারি, কাটাকাটির লম্বা ইতিহাস বয়ান করে লাভ নাই। গত কয়েক দশকের ঘটনাগুলো ঘাটলেই এর সত্যতা মিলবে। আর গত দশ বছরের বিষয়গুলোতো আর ইতিহাস খুঁজে দেখতে হবে না। ঘটনা হিসাবে নিজের মনেই সব স্মৃতি হয়ে আছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে আরবের মরুভূমি পর্যন্ত যেতে যেতে রক্তের সমুদ্রে ডুবে মরতে হবে।
ধরে ধরে বর্ণনা করলে মাথা গুলিয়ে যাবে। আফগানিস্থানে একবার স্কুল ভর্তি শিশুদের উড়িয়ে দেয়া হলো বোমা মেরে, কারণ এরা কম্পিউটারের তালিম নিচ্ছিলো। কম্পিউটার নাসারাদের বস্তু। এর চর্চ্চা যারা করবে তাদেরকে মেরে ফেলতে হবে। সিরিয়ায় প্রতিদিন গণ্ডায় গণ্ডায় মুসলমানদের মারছে তাদেরই ভাই-বেরাদরে। পাকিস্তানের কথা আলাদা করে আর কি বলার আছে। প্রতিষ্ঠার মাত্র ২৪ বছরের মাথায় এই বর্বর রাষ্ট্র আমাদের উপর যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলো তাওতো এক অর্থে মুসলমানের উপর মুসলমানেরই হত্যাযজ্ঞ। যদিও এর আগে আমাদেরকে তারা হিন্দু-মালাউন-ভারতের দালাল উপাধি দিয়ে গুলির গায়ে হালাল শব্দটা সেটে দিয়েছিলো। আর এটাকে তারা জিহাদ হিসাবেই প্রচার করেছিলো পুরো মুসলিম বিশ্বে। সেই অর্থে এইটারে কারবালার সাথে তুলনা করা যাবে না। অন্তত আমাদের দেশের পাকিপ্রেমি হুজুরদের হিসাবে সেটা হবার নয়। বরং অধিকতর সাচ্চা মুসলমানদের হাতে দুর্বল ইমানের মুসলমানের মৃত্যুর সাল হিসাবে ১৯৭১ কে চিহ্নিত করলে তারা খুশি হবেন। উনারা সেটা করেও থাকেন। আর এইসব ঘটনাপ্রবাহকে ইহুদী নাসারাদের ষড়যন্ত্র হিসাবে উপস্থাপনেরও একটা জনপ্রিয় ধারণা বিদ্যমান। সেটা শুধু আমাদের বাঙ্গাল মুসলমানদের মধ্যেই বিরাজিত ধারণা নয়।
পৃথিবীর নানা প্রান্তের মুসলমানের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমার। এদের মাঝে যাদের যাদের সাথে এসব বিষয়ে আলাপ হয়েছে তারা এটাই বিশ্বাস করেন! তাদের কথার ভাবটা এমন, মুসলমানরা সবাই দুধের শিশু, ইহুদি নাসারারা এদেরকে কু পথে টেনে নিয়ে নানা অপকর্ম করিয়ে নেয়!
ইন্টারনেটের কল্যানে নৃশংসতার চিত্র এখন সহজেই পাওয়া যায়। ইউটিউবে একবার একটা ভিডিও কয়েক সেকেন্ড মাত্র দেখতে পেরেছিলাম। এর পর সহ্য হয়নি। পাকিস্তান অথবা আফগানিস্তানের তালেবানরা কাটা মাথা নিয়ে ফুটবল খেলছে! এখন যদি কোন মুসলিম বলেন, এই নিষ্ঠুরতাটা ইহুদিরা শিখিয়েছে, নয়তো কোন মুসলমান এটা করতে পারে না। এভাবে কাটা মুন্ডু নিয়ে খেলা করার মতো বর্বরতা মুসলমানদের কাজ না। তাদেরকে আবার কারবালায় ফিরিয়ে নিতে চাই। নবীদৌহীত্র হোসেন (রা.) এর কাটা মাথার কথা স্মরণ করুন। সেই কাটা মাথা নিয়ে মুয়াবিয়াপুত্র ইয়াজিদের উল্লাসের কথা মনে করুন। আল্লায় বাচাইছে তখন ভিডিও করার জামানা ছিলো না, থাকলে হয়তো হোসেনের মাথা নিয়ে ঠিক কি করা হয়েছিলো তা ইউটিউবে তুলে দিতো কেউ। আর সেটাতে হাজারে হাজারে লাইক পড়তো, যেমন এখন সিরিয়ার জিহাদীদের গলা কাটার ভিডিওতে পড়ে। এই লাইকগুলো ইহুদি খ্রিস্টানরা দেয় না, মুসলমানরাই দেয়। জিহাদ জিন্দাবাদ বলে।
পকিস্তানের তালেবানরা স্কুলে ঢুকে নির্বিচারে বাচ্চাদের খুন করেছে। এরকম খুনের ঘটনা পশ্চিমা দুনিয়ায়ও ঘটেছে। আমার পরিচিত কয়েকজন ঘটনাটা ঘটার ঠিক পরপরই এটাকে ইসলামের বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র বলে ঘোষনা দেবার পাশাপাশি সেসব ঘটনাও মনে করিয়ে দেবার চেস্টা করেছেন। এরকম যারা করেন, তাদের সাথে কথা বলে সময় নস্ট করিনা কখনো। এক দুইটা কথা বলি খুব বেশি হলে। কিন্তু কখনই তর্ক করি না। ছাগলদের সাথে তর্ক করার অভ্যাস নাই আমার। তাই তাদেরকে শুধু মনে করিয়ে দিয়েছি, যুক্তরাস্ট্র বা ইংল্যান্ডে স্কুলে হামলার যেসব ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোই প্রায় সামাজিক সমস্যা, মানসিক সমস্যা। ধর্মের কারণে এমনটা ঘটেনাই। হয় কোন অসুস্থ মানুষ গুলি চালিয়েছে, নয়তো সামাজিক দুরাচারের কারণে অস্বাভাবিক (সেও অসুস্থই) মনের কেউ এটা করেছে। তাদের কেউ মহান যিশু, কিংবা মুসা নবী জিন্দাবাদ বলে শিশুদের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি ছুড়েনি।
প্রতিটা কারবালার পর ইসলাম পূনর্জীবন লাভ করে বলার মাধ্যমে স্বীকার করে নেওয়া হয়, ইসলামে বারবার কারবালার মতো ঘটনা ঘটবে। সেই কারবালা কোনটা? সিরিয়াকে ধরবো? আফগানিস্তান নাকি পাকিস্তানকে ধরবো? ধরে নিলাম সবকটাই। যেহেতু কারবালার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে। তো এতসব কারবালার পর ইসলাম কোথায় জিন্দা হচ্ছে? সেই পূনর্জীবন লাভকারী ইসলামরে কোথায় গেলে পাওয়া যাবে? বি গ্রেডের কারবালা বাংলাদেশ ছাড়াতো (এইখানে উচা জাতের মুসলমানরা নিচা জাতের মুসলমানরে প্যাদাইছে আর লগে প্রচুর মালাউন ছিলো হিসাবে এটারে বি গ্রেডে ধরে নিলাম) আর কোনখানে ইসলাম জাগ্রত হইলো না। তাওতো ইসলামী বিশ্বের মতে, এই দেশ সেই হিসাবে পড়বে না। (সামজিক উন্নয়নের সূচক আর কিছুমিছু টেকাটুকার হিসাবে দেশটা এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝাচ্ছি।) আমি ফেলতেও চাই না। তবু মুসলমানিত্বের শান্তনা হিসাবে এই একটা দেশ ছাড়া আর কোন পূনর্জীবন লাভকারী দেশ খুঁজে পাই না। অবশ্য জিহাদিরা সিরিয়া পাকিস্তানরেই হয়তো জাগ্রত ইসলামের দেশ বলে বিশ্বাস করে।
কিন্তু এইসব জিহাদীর বাইরে যাদের অবস্থান। যারা ইসলামরে শান্তির ধর্ম বলে প্রচার করেন। যারা বলেন নাইজেরিয়ার বোকো হারেম যা করছে তা প্রকৃত ইসলাম না, তারা তাদের প্রকৃত ইসলাম বগলে নিয়ে বসে থাকেন কেনো? জাগ্রত ইসলামের ননী খাইবার আগ্রহ আছে সবার, কিন্তু রক্তারক্তি হইলে চোখে পট্টি বাঁধেন আবার সারা দুনিয়ায় ইহুদি নাসারারা মুসলমানদের শেষ করে দিচ্ছে বলে হা হুতাস করেন। তারা কেনো মুসলমানরা মুসলমানদের কাচা কাচা চাবায়া খেয়ে ফেল্লেও কথা বলেন না, সেটা বড় আজব বিষয়। যেই পাকিস্তানের এতগুলো শিশু নৃশংসভাবে খুন হলো, সেখানকারই এক বড় মোল্লা, তালেবানদের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে। লাল মসজিদের সেই লাল ইমামের লাল রক্তের প্রতি আগ্রহ থাকতেই পারে। পাকিস্তানি বলে কথা। কিন্তু এর বাইরে যত মুসলমান আছে, তারা কি করছে? কতিথ হালাল যৌনতায় রাজি না হওয়ায় ইসলামিক স্টেট এর মহান জিহাদিরা যখন দেড়’শ নারীকে হত্যা করে তখন যেমন এরা চুপ থাকে। নিরপরাধ শিশুদের বেলাতেও তাদের সেই একই ভূমিকা। এরা শুক্রবারের বিশেষ দোয়ায় আল্লার দরবারে ফরিয়াদ জানায়, বাচ্চাগুলোর পরলৌকিক মুক্তির দোয়া করে, তাদের বেহেস্ত প্রার্থনা করে। শোকাহত পরিবারের জন্য প্রশান্তি কামনা করে। কিন্তু যারা এই ঘটনা ঘটালো তাদের শাস্তি দাবী করে না! একটাবারও বলে না, হে মহান পাক পরওয়ার দেগার, তুমি এদের উপর গজব নাজিল করো। বরং বলে, হে আল্লাহ, যাদের মনে শয়তান বাসা বানাইছে, তুমি তাদেরকে দ্বীনের পথে ফিরাইয়া দেও!!! আবারও ইহুদী-নাসারাদের গাইল দেয়, বলে মুসলমানের ভেতর ঢুকে গেছে ইহুদী নাসারা, এদেরকে ধ্বংশ করে দাও...
প্রতি রোজায় ইসরাইলের নিষ্ঠুরতা যখন নিয়ম মেনে নতুন করে শুরু হয়, তখন যতো মুসলমান মিলে পথে ও প্রান্তরে, তারা কারবালা এলেই কেনো যে মুখে তালা মারে বুঝি না। রক্ত, রক্ত আর রক্ত। ধর্ম লাল হয়ে গেছে। তবু ইসলাম পূনর্জীবন লাভ করবে এই আশায় হয়তো এরা চোখে ঠুলি পরে আছে। কত কারবালা হলে এর শেষ হবে আল্লায় জানে।

Thursday, October 2, 2014

হিঙ্কলি রোড কর্নার

মোড়ের পাশের ফুলের দোকানটা বন্ধ হয়ে গেল।
ফুলের দোকান, তারপর একটা চিকেন এন্ড চিপসের দোকান, এরপর নাপিতের দোকান তারপর টনি পাপটের অফ লাইসেন্স। এর ঠিক লাগোয়া বাসস্টপ। বাসস্টপে সারাদিন হুইল চেয়ার নিয়ে বসে থাকে ডেভিড। সামনে দিয়ে যে-ই যাক, নিচু গলায় ভাংতি পয়সা চায়। কেউ দেয়, কেউ দেয় না। সে বসেই থাকে। পাশ দিয়ে কোনো বাচ্চা যদি বাবার সাথে যায় তখন শুধু একটু উঁচু গলায় বলে, বাবাকে আঁকড়ে ধরো, জাপটে ধরো, দুনিয়ায় এই একটাই বাবা তোমার! রোজ যারা হাঁটে এই পথে তারা ছাড়া, নতুন বাচ্চারা একটু ভয় পায় আর বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে। যারা জেনে গেছে ডেভিডকে, তারা আগে থেকেই ধরে থাকে হাত আর একটু সাহসী যারা তারা হাতটা একটু উঁচু করে ডেভিডকে দেখিয়ে দেয়। ডেভিড কখনো বাচ্চাদের কাছে পয়সা চায় না। বাচ্চা থাকে যেসব বাবা মায়ের সাথে তাদের কাছে পয়সা চায় না।
রাত আটটায় টনি তার দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় সস্তা বিয়ারের একটা ক্যান ধরিয়ে দেয় ডেভিডের হাতে। তারপর নির্জন হতে থাকা বাসস্টপে ডেভিড বসে থাকে। টনি অফলাইসেন্সের নিয়ন সাইনটা একবার জ্বলে আর একবার নিভে, বাড়ি ফিরে যাবার আগ পর্যন্ত ডেভিডের মুখে খেলা করে সেই আলো।
ফুলের দোকানের উপরে একটা দুই কামরার ফ্ল্যাট। ইউসুফ তার আট বছরের ছেলে ইজ্জত আর বউ এলিয়নাকে নিয়ে থাকে এখানে। ইউসুফ পাকিস্তানি, এলিয়না বসনিয়ান মুসলমান। ইজ্জতের সাথে ডেভিডের খুব খাতির। রোজ দুপুরে, স্কুল থেকে ফেরার পথে একবারের জন্য হলেও ডেভিডের সাথে তার গল্প করা চাই-ই চাই। ইউসুফ কখনোই চিকেন এন্ড চিপসের দোকানটায় ঢোকে না। সে কমপক্ষে আধা মাইল দূরের একটা দোকান থেকে ছেলের জন্য প্রতি শুক্রবার চিকেন এন্ড চিপস নিয়ে আসে। সেই দোকানের সাইনবোর্ডে হালাল লেখা থাকে। তারপর টনির দোকান থেকে ভদকার বোতল নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ে।
রোজ বিকেলে মায়া প্যাটেল তার টিঙটিঙা শরীরকে আরও টিঙটিঙা করার আশায় কানে ইয়ারফোন গুঁজে রিন্ডলি স্ট্রিট থেকে দৌড়ে আসে মোড় পর্যন্ত। আবার ভেতরে যায়, ফিরে আসে, আবার যায়... বিশ নাম্বার চক্করের সময় ডেভিড গলা খাঁকারি দেয়, মায়া ফুলের দোকানের সামনে থেকে আস্তে আস্তে হেঁটে আসে, বাসস্টপের খাড়া বেঞ্চে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে কথা বলতে থাকে ডেভিডের সাথে। কোনো আগামাথা নেই সেসবের, এই হয়ত কেনিয়াতে মায়ার ফেলে আসা বাড়ির কথা হচ্ছে আবার একটু পরেই সেটা টেসকোর ডিম নয়ত হালাল বুচারের বাখারকে নিয়েও হতে পারে।
ব্রোনস্টোন রোডের ক্যারিবিয়ান উইন্ড প্রতি শুক্রবারে প্রাণ পায় যেন। মাঝরাত অব্দি চলে হুল্লোড়। বাসস্টপের ঠিক উলটোদিকে একটা ক্যাশ মেশিন। রাত যত বাড়তে থাকে সেই মেশিনের সামনে লাইন তত বড় হয়। লাইন বড় হয়, খিস্তিখেউড় বাড়তে থাকে। মারামারি, হাতাহাতি, প্রেম সবকিছুকে অভিনীত হয় ক্যাশ মেশিনকে ঘিরে। ডেভিড তখন থাকে না এখানে। শুক্রবার বিকেল থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ডেভিডকে দেখা যাবে না। এই সময়টাতে সে যে কী করে তাও কেউ জানে না। সোমবার সকালে মাসগ্রোভ ক্লোজ থেকে আস্তে আস্তে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে ডেভিডকে আসতে দেখা যায়। ফুলের দোকানের পাশে লোহার একটা সিঁড়ি, ইউসুফের ঘরে ওঠার, সেই সিঁড়িতে মাঝে মাঝে বসে থাকে এলিয়না। ডেভিড একটু থমকে দাঁড়ায় সেখানে। এলিয়নাকে জিজ্ঞেস করে কেমন আছে, ইচ্ছে হলে সে উত্তর দেয়, ইচ্ছে না হলে নাই। এলিয়নার দেওয়া চুরুট টানতে টানতে টনি অফলাইসেন্সে ঢুকে যায় ডেভিড। ল্যাস্টার কিংস এর জার্সি পরা কেইভেন হয়ত তখন বাস থেকে নামে, তার চিকেন এন্ড চিপসের দোকান খুলবে বলে।
সিঁড়িতে বসে চুরুট টানতে টানতে এলিয়না বলে, ফ্লাটটা ছাড়ছে তারা। শ্যাফ্টবারি রোডে, ইজ্জতের স্কুলের পাশের একটা বাড়িতে উঠবে দুই সপ্তাহ পর। অন্যদিনের মতো আর চুরুটের জন্য হাত বাড়ায় না ডেভিড। আস্তে আস্তে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে বাসস্টপের দিকে এগিয়ে যায়।
সোমবার সকালে বাসস্টপে একটা নোটিশ সেঁটে দেয়া হয়, সেখানে লেখা থাকে ‘ফ্লোরিশ ফিউশন’ নামের দোকানটায় একটা টার্কিশ কাবাবের দোকান করার প্রস্তাব করেছেন দোকান মালিক। সেখানে বড় চুলা বসানো হবে। মাংসপোড়া গন্ধ আসতে পারে বাতাসের ঝাপটায়। খাবারের দোকান তৈরিতে এবং বড় চুলা বসানো নিয়ে কারো কোনো আপত্তি থাকলে ৭ দিনের মধ্যে কাউন্সিল অফিসে জানাতে হবে।

Monday, September 29, 2014

বাফর ঠিক্নাই

আমার শিশু বয়েস থেকেই আব্বারে তার ঢং সম্পর্কের লোকজন বুড়া বলে ডাকতো। আমারে বলতো বুড়ার পোলা! আমিতো চেইত্যা মেইত্যা শেষ... ক্যান আমার আব্বারে বুড়া বলবে, ক্যান আমারে বুড়ার পোলা বলবে। তারা বলতো, তোর বাপের ইয়া বড়ো দাড়ি আছে, মাথায় কিস্তি টুপি পরে!!! এইটা ঠিক, আব্বার ইয়া বড়ো দাড়ি, টুপি, সাথে সার্বক্ষণিক পাঞ্জাবি। বুড়া না বলে করবে কি লোকে? কিন্তু আমার উত্তর একটা ছিলো তখনও, বলতাম, আব্বার মাথার চুল গুলো হঠাৎ করে সরে গিয়ে মুখের দিকে চলে আসছে বলে দাড়ি হয়ে গেছে, আর মাথার চুল সরে যাওয়ায় সেটা ঢেকে রাখার জন্যই টুপি পরে! এইটা একটা বাস্তব সম্মত যুক্তি হিসাবেই আমি বলতাম। কিন্তু আমার পুংটা মামুরা সেইটা মানতো না। তারা বিতিকিচ্ছরি কাণ্ড করতো, অন্তত যতক্ষণ না আমি নানাবাড়ির উঠানের ঠিক মাঝখানে হাত পা ছড়িয়ে কানতে শুরু করতাম, কিংবা চ্যালা কাঠ নিয়ে ধাওয়া দিয়ে তাদেরকে নানাবাড়ির ১০ তলা সমান টিলা থেকে নিচে নামিয়ে না দিতাম, ততক্ষণ চলতে থাকতো। বেশিরভাগ সময় নানীর কঠোর হস্তক্ষেপে আমি উদ্বার পেতাম। তখন রাগ হতো আব্বার উপর, কি দরকার ছিলো এতো তাড়াতাড়ি দাড়ি রেখে ফেলার! কই আবুল হায়াততো দাড়ি রাখে নাই!
তো সময় যত যেতে লাগলো আব্বার চেহারা আরো বুড়ো হতে থাকলো। সুপারসনিক গতিতে তার দাড়ি পেকে গেলো। অবস্থা এমন দাড়ালো যে, আব্বা তার ক্লাসমেটদের পাশে দাড়ালে মনে হতো চাচা-ভাতিজা দাঁড়িয়ে আছেন একসাথে! সবচেয়ে বড় কথা আব্বার চেহারার মাঝে কেমন একটা জামাত গন্ধ ফুটতে থাকলো! হ্যা, একদম সত্য বলছি। সুজন্দা একবার আব্বার একটা ক্যারিকেচার করলেন, সেইটা দেখে এমনকি আব্বা নিজেও বল্লেন, এইটাতো গোলাম আজমের মতো লাগেরে!!!
আমরা বড় হয়েছি এক বিচিত্রকালে। তৎকালে প্রেমকে লাইন বলা হইতো। ছাদে, পানির ট্যাংক এর আড়ালে আবডালে থেকে লাইন মারলে সেইটারে টাঙ্কি মারা আর ছোট বড় মাঠ বা ফিল্ড এর আশেপাশে থেকে যদি লাইন মারা হতো, তাহলে বলা হতো ফিল্ডিং মারা। লোকজন আলু পটলের সাথে কিংবা পুস্তকের ভেতরে উল্টা অক্ষরে লাইনের চিঠি লিখে দিতো, যেটা আয়নার সামনে ধরে পড়তে হতো। সেই বই গুলোতে আবার উল্টো ইতিহাস লেখা থাকতো। যেমন সেখানে লেখা থাকতো হানাদার বাহিনী পঁচিশে মার্চের কালো রাতে আক্রমন চালাইলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালিন মেজর (পরে বাংলাদেশের মহান রাষ্ট্রপতি) জিয়াউর রহমান স্বাধিনতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা শুনে বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে, আর নয়মাসের যুদ্ধে দেশ হানাদারমুক্ত হয়। হু, যারা হানা দেয় তারাতো হানাদারই, কিন্তু তারা কই থিকা আইসা হানা দিছিলো, সেই কথা আর বলা নাই কোথাও। আর হঠাৎ করেই কেন এই হানা সেইটাও স্পষ্ট ছিলো না। তারপর তখণ স্লোগানও শোনা যেতো, হাসিনাগো হাসিনা, তোর জ্বালায় নাচিনা, তোর বাপের কথায় নাচিয়া দেশ দিছিলাম বেচিয়া...
এই স্লোগানের কথায় আরেকটা স্লোগানের কথা মনে আসলো, ‘স্বৈরাচারের দালালাররা, হুশিয়ার সাবধান’ স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’ এই দুইটা স্লোগান তখন খুব কমন। রোজই শুনি। এমনকি মাঝে মাঝে আমরাও সেই স্লোগান দিতে দিতে স্কুলের সামনে থেকে মিছিলে ঢুকে আবার বাড়ির সামনে এলে টুপ করে মিছিল থেকে বেরিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়তাম। কিংবা না ঢুকলে মিছিল থেকেই নেতাগোছের কেউ এসে মুরগি তাড়ানোর মতো করে আমাদেরকে মিছিল থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বলতো, এই যা যা, বাড়ি যা, বড় হলে মিছিলে আসিস। তো এরকম এক মিছিল থেকে একবার বাজারের একটা দোকানে দিলো আগুন জ্বালিয়ে। তখন বুঝলাম সেইটাই হইলো স্বৈরাচারের গদি, কিন্তু ওই দোকানটাতো আমাদের স্কুলের একটা ছেলের বাবার বলে জানতাম। সে প্রায়ই স্কুল থেকে বাড়িতে না গিয়ে আমাদের সাথে আসতো, বলতো বাজারে যাবে, তার আব্বার গদিতে। তাইলে তার আব্বাই স্বৈরাচার, আর তার গদিতেই আগুন দিতে এতো মিছিল,স্লোগান!! এই টাইপ একটা সিদ্ধান্তে যখন প্রায়ই পৌছে যাবো করছিলাম, তখনই আব্বার অফিসের আরজু ভাই দিলো ভেজাল লাগিয়ে। সে অফিসের হুশিয়ার আলী ভাইকে ক্যাক করে ধরে বল্লো, এই মিয়া বাজারে আগুন দিলা কেনো? হুশিয়ার আলী ভাই হুঙ্কার দিয়ে বল্ল, কিতা আবোল তাবোল মাতছ, আমি খেনে আগুন দিতাম? আরজু ভাই বল্ল, মিছিল দিতে দিতে বলে গেলো হুশিয়ার হুশিয়ার, তারপর আগুন জ্বালো আগুন জ্বালো, আর একটু পরেই বাজারে আগুন লাগলো, তোমার নাম বল্লো, আগুনও লাগলো, এরপরেও বলবা যে তুমি আগুন লাগাও নাই! হুশিয়ার আলী ভাই চরম উত্তেজিত হয়ে কি কি যেনো বলতে শুরু করলো, রেগে গেলে সে বহু উল্টা পাল্টা কাজ করে ফেলে, এখন প্রায় লাফাতে লাগলো, সে যত লাফায় আরজু ভাই তত তারে আগুন লাগাইছে বলে অপবাদ দেয়। বলে, তোমার ফাড়ে (লুংগির কোমরের ভাজ) সবসময় ম্যাচ থাকে। তুমিই আগুন দিছো, তারপর বিড়ি খাওয়া নিয়ে দিলো ঝাড়ি। হুশিয়ার ভাই চরম পাগল হয়ে গেলো তখন, সে আমার মতো বয়েসেরে হলে নির্ঘাৎ হাত পা ছড়িয়ে আমাদের পুকুর পাড়ে কাঁদতে শুরু করতো, নয়তো রান্নাঘরের পাশে জমানো চ্যালা কাঠ নিয়ে আরজু ভাইকে দৌড়ানো শুরু করতো, কিন্তু তারতো সে বয়েস নেই। তাই সে টান মেরে লুংগির গিট খুলে লাফাতে লাফাতে বলতে থাকলো, খই মেছ, মেছ খই, দেখা মেছ, তার চিৎকার চেচামেচিতে আব্বাসহ অফিসের অন্যরা দৌড়ে বের হয়ে আসায় আমার আর হুশিয়ার ভাইয়ের লাল আন্ডু সেদিন দেখিনাই। নয়তো পরের স্টেজে হুশিয়ার ভাই লুংগি ছেড়ে দিতো। ধুর কি বলতে কি বলা শুরু করলাম। আমি হানাদারে ফিরে যাই।
তো আমরা যখন হানাদারের গল্প শুনতেছি, আর স্বৈরাচারের মিছিল শুনতেছি তখন আয়না হয়ে আসলেন আব্বা। ওইযে উল্টা ইতিহাস লেখা বইয়ের ভেতর উল্টা করে লেখা প্রেমপত্র পড়ার জন্য যেভাবে আয়নার সামনে ধরতে হতো, সেরকম। আব্বা হলেন আয়না। আব্বা বল্লেন, হানাদার মানে পাকিস্তান, হানাদার মানে রাজাকার, আলবদর, আল শামস, জামাত, মুসলিম লীগ, হানাদার মানে গোলাম আযম, আব্বাস আলী খান, হানাদার মানে জগন্নাথপুর বাজারের সরবতের দোকানদার আহমদ আলী।
আমাদের আয়নায় বইয়ে লেখা উল্টো ইতিহাস ঠিক হয়ে যেতে থাকলো। হঠাৎ করে মার্চের কালো রাত আসেনি, তার আগে আরও ইতিহাস আছে সেটা আব্বা বলে যান। ৪৮, ৫২, ৬৫, ৬৯, ৭০, ৭ ই মার্চ, ২৭ মার্চ, ১৭ এপ্রিল সব গল্প একে একে জেনে যাই আমরা। আব্বা বাজারের কালা বাচ্চুকে দেখিয়ে বলেন, এ এখন খারাপ হয়ে গেলেও বিরাট মুক্তিযোদ্ধা। দাস পার্টির কমান্ডার ছিলো। দাস পার্টি মানে দাদার বাড়ির পাশের গ্রামের জগৎজ্যোতির করা মুক্তির দল। গল্পের ছলে আব্বা আমাদের এইসব বলতে থাকেন। জুম্মার নামাজে গিয়ে আহমদ আলীকে দেখিয়ে একদম চোখে চোখ রেখে বলেন, এইযে দেখছো আহমদ আলী, এই উনি হইলেন রাজাকার কমান্ডার। ভ্যাবাচেকা খাওয়া আহমদ আলীরে আবার শান্তনাও দেন, আরে বাচ্চাদেরকেতো চেনাতে হবেরে ভাই, ব্যারিস্টার সাহেবরে দেখাইলাম মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে, এখন আপনারে দেখাইয়া রাজাকার চিনাইলাম!
তো, যখন যা জানার সেটা আমরা জেনে গেছি। আব্বা সেই ব্যবস্থাটা করে দিছেন। জোর করে গিলিয়ে দেবার বিষয় ছিলো না সেটা। যেনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভাত খাও, পানি খাও, নাটক দেখো, খালি পায়ে শহীদ মিনারে যাও, যাতে ভুল করে শহীদ মিনারে জুতা নিয়ে উঠে না পড়ি, তাই ২১ এর সকালে বাড়িতেই জুতা রেখে যাওয়ার নিয়মটা এম্নি এম্নিই আমাদের ভেতর গড়ে উঠেছিলো।
হানাদার হানাদর বলে গলা ফাটিয়েও পাকিস্তান চেনানো থেকে আমাদের ফেরানো যায়নি। মহান জেনারেল আর তার প্রিয়দর্শীনীর গলাবাজিও স্বাধিনতার ঘোষক জিয়া লও লও লও সালামে বিশ্বাস স্থাপন করাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু একটা ১৪ নম্বরি লোক, তাই দেশপ্রেমিক সেনাবাহীনি তারে মেরে ফেলছে এই পাশবিক মিথ্যাচার আমাদেরকে কেউ গেলাতে পারেনি। খোনকার, মুনকার যেই হোক, নতুন নতুন তত্ব আনুক, ওইসব জিয়ে পাকিস্তান/ জয় পাকিস্তান/ জিন্দাবাদ পাকিস্তান, আমরা বিশ্বাস করি না। কমব্যাট পরা, সুশীল লেবাসে মিথ্যাচার করে যাওয়াদের জন্য জবাব মাথার ভেতর পুতে দিয়ে একেবারে শক্তপোক্ত করে দিয়ে গেছেন, পাজামা-পাঞ্জাবী, টুপি পরা, দাড়িওয়ালা মুসল্লি আব্বা। হু আব্বা।
তো, আব্বার মুখটা আলগা ছিলো। চটাস চটাস কথা বলতেন। এবং সেটা সত্য কথা। তার একটা গাইল টাইপ বুলি ছিলো, ‘বাফর ঠিক্নাই’ (বাপের ঠিক নাই)। নানা বিষয়ে, নানা সময়ে উল্টা পাল্টা আচরণ করা লোকদের জন্য এই বাক্যবন্ধ বরাদ্দ ছিলো। তার মতে সব দোষ বাপের। বাপ আদব শেখায়নাই, তাই বেয়াদব হইছে পোলা, সুতরাং বাপের ঠিক্নাই। পোলা মিথ্যা বলে, কারণ বাপ সত্য বলা শিখায় নাই, সুতরাং বাপের ঠিক্নাই। পথে ঘাটে চুতিয়ামি করে, মারামারি করে, ইতর, সুতরাং বাপের ঠিক্নাই... খুব অনায়াসে এইটা বলতেন। আব্বার সব গুনতো পাইনাই। কিছু কিছু পাইছি। এরমাঝে একটা হইলো এইটা। তাই বলি, এইযে ইতিহাস নিয়া বেঘোরে থাকা। নতুন গজানো যে কোন গল্প পাইলেই, সেইটারে কোলে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়া গেদা শিশুদের মতো গুয়ে লেপ্টে যাওয়া, এসবের পেছনে আর কিছুনা, বাপের সমস্যা বিদ্যমান। বাপ ইতিহাস ঠিকমতো শেখায় নাই। হানাদার পড়ে পড়ে বড় হইছে, সেইটাই দিলের ভিত্রে মোহর মেরে বসে আছে। বাপ যদি ঠিক থাকতো তাইলে এমন হইতো না। একেবারেই না।
ফুটনোটে আক্ষেপ
আব্বার লেখার হাত ভালো ছিলো। কিন্তু আরামপ্রিয় ছিলেন। পুরাটা শিশুকাল কষ্টের ভেতর, শ্রমের ভেতর পার করেছেন, তারপর মেশিনের মতো দীর্ঘ বছর সংসারের ঘানি টানা। তাই সুজোগ পেলেই শুয়ে বসে কাটাতে চাইতেন। হয়তো অধিক পরিশ্রম, টানা মনোবেদনা এইসবই তার শারীরিক শক্তি শুষে নিয়েছিলো, আর তাই বয়েসেরে আগে মুরব্বি হওয়া, লাইনের একদম সামনে চলে গিয়ে ঝপাৎ করে ঘুমিয়ে পড়া...
গল্প করতে ভালোবাসতেন, কিন্তু লেখার মতো শ্রমসাদ্ধ কাজ কারবারে নাই। তবুও প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারি আব্বাকে লিখতে বলতাম। রাজি হতেন না। তারপরও ২০০৯ এর শেষদিকে, সম্ভবত ডিসেম্বরেই বল্লেন, ২০১০ আর ১৯৭১ এর ক্যালেন্ডার একই। একটা ডায়রি নিয়ে তারিখ ধরে ধরে পুরনো কথাগুলো লিখে রাখা যায়... কেনযে সেই কথাটা গুরুত্ব দিয়ে শুনলাম না, কেনযে সেই কথাটা আমলে নিলাম না। যদি নিতাম, হয়তো ছোটখাটো একটা আয়না পেতাম ছড়িয়ে দেবার জন্য।

Friday, September 26, 2014

শিরোনামের সঙ'বাদ, সংবাদের শিরোনাম

সিলেটে একসময় বন্দরবাজারে গেলে আজব কিছু পত্রিকা পাওয়া যেতো। মাঝে মাঝে সেসব পত্রিকা মাইক দিয়ে ডেকে ডেকেও বিক্রি হতো। সম্ভবত দেশের অন্য অঞ্চলেও এটা হতো। কারণ পত্রিকাগুলো ঢাকা থেকে বের হতো। বিচিত্রসব খবর, তারচেয়ে অধিক বিচিত্র শিরোনাম ছিলো সেসবের। যেমন একদিন প্রধান শিরোনাম ছিলো 'অবৈধ সন্তানের মা হতে চলেছেন খালেদা'! সেটা আবার মাইকে বলা হচ্ছে, একেবারে গাজী মাজহারুল আনোয়ার স্টাইলে। আমাদের বদর মামা বিরাট রসিক লোক। সারাদিন টো টো করে সিলেট শহর ঘুরে বেড়ান। পায়ে হেঁটে। তিনি একটা পত্রিকা কিনলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সেটা নিয়ে হুলস্থুল। যতরকমভাবে মজা করা যায় সেটা করে তারপর জানা গেলো কোন এক প্রান্তিক জনপদের খালেদা নামের এক তরুণী, প্রেম করেছিলেন। এখন মা হবেন, কিন্তু প্রেমিক সটকে পড়েছে। তখন ধর্ষিতা বা নির্যাতিতার নাম প্রকাশে নিষেধ ছিলো না। তাই নাম দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিষয় সেটা নয়, বিষয় হচ্ছে 'খালেদা' নামটি। খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী। মাত্রই তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। সাধারণ মানুষের ব্যাপক আগ্রহ তাকে নিয়ে। বিশেষ করে গ্রামের মানুষ, যাদের কাছে দেশের শাসক হিসাবে নারী বিষয়টাই অদ্ভুত। তো সেই মানুষরা হঠাৎ শুনলেন খালেদা মা হচ্ছেন! তারা জানেন খালেদা নামের মানুষটা দেশের শাসক, তার স্বামী নেই, তিনি কেমন করে মা হতে পারেন! এই কৌতুহলকে কাজে লাগাতেই এমন শিরোনাম! আমি কল্পনায় দেখতে পাই, গ্রাম থেকে চাল কুমড়া বিক্রি করতে আসা পড়ালেখা না জানা মানুষটা ব্যাপক কৌতুহলে কিনে নিলেন পত্রিকাটা। সন্ধ্যার অন্ধকারে গ্রামে ঢুকেই বাড়িতে না গিয়ে ছুটে গেছেন ছোট্ট মুদি দোকানে। সেখানে পরিচিত দোকানী প্রদীপের আলোয় সেই পত্রিকা পড়ে জানাচ্ছেন সেই নাম না জানা খালেদার খবর, যার সাথে রাস্ট্র ক্ষমতার দুরতম কোন সম্পর্কও নাই।
এইযে ঘটনা, এটাকে কী বলা হবে? আমার হিসাবে বাটপারি। সাংবাদিকতার হিসাবে অপ-সাংবাদিকতা। মানুষকে বিভ্রান্ত করে, চটকদার খবর, শিরোনাম তৈরির এই প্রবনতাটাই সাংবাদিকতার দুর্বৃত্তায়ন, যা চলে আসছে দীর্ঘকাল থেকে।
এই অশালীন চর্চ্চা চলছে যুগে যুগে। সম্ভবত এই ২৪ বা ৪২০ এর জামানায় এই প্রবণতার বিস্ফোরণ ঘটেছে। একদম প্রথমে যে পত্রিকার কথা বল্লাম, সেটির একটি পরিচিত চরিত্র ছিলো। পত্রিকার বেশিরভাগ পাঠক সেটা জানতেন, বুঝতেন। তাই অনেকেই এড়িয়ে যেতেন। কিন্তু এখন সেটা কেমন করে এড়ানো যাবে? এখনতো আর চিহ্নিত সেইসব পত্রিকাই শুধু নয়, প্রতিষ্ঠিত মূলধারার দৈনিক, বিশ্বাসযোগ্য ওয়েব দৈনিকও সেখানে যোগ দিয়েছে।
এখন এরা খবরের সাথে দুরতম সম্পর্ক খোঁজে বের করে তৈরি করে শিরোনাম, সেই অদ্ভুত শিরোনামে বলা হয় মন্ত্রীর মৃত স্বামীর ভাগনা আত্মহত্যা করছেন! আত্মহত্যা একটি খবর, সেটি প্রকাশিত হবে, যে আত্মহত্যা করলো তার পরিচয়ও আসতে পারে, সেখানে হয়ত এটাও আসতে পারে যে, আত্মহত্যাকারী মন্ত্রীর আত্মীয়। কিন্তু সেটাকে একেবারে শিরোনামে নিয়ে যাওয়া এটা কেমন ধারা?
আজকেরই একটা শিরোনাম, ঘুমের ঔষধ খেয়ে আঁখি আলমগীরের আত্মহত্যা! কী বুঝলেন? এটা দেখার পর আমি অন্তত ভেবেছি খ্যাতিমান সঙ্গীত শিল্পী আঁখি মারা গেছেন। একটু হলেও শিহরিত হয়েছি। কিন্তু খবর পড়ে জানলাম সিলেটে এক ছাত্রী মারা গেছেন। তিনি নার্সিং ইনস্টিটিউটের ছাত্রী, নাম আখিঁ আলামগীর। সেই হিসাবেতো ঠিক আছে, শিরোনামতো মিথ্যা নয়। তাহলে কেনো আমার জ্বলে? জ্বলে সেই বিভ্রান্তির জন্য। এবং এটা ইচ্ছা করেই করা হয়েছে বলে একটু বেশিই জ্বলে। আমি যখন খবরটা পড়ি, প্রায় ২ হাজারের উপরে পেইজ ভিউ। সেটা দেখে বিশ বছর আগের সেই কৃষকের মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। কমপক্ষে ১৯ শ বিভ্রান্ত মানুষকে দেখতে পেলাম।
এটাতো একমাত্র ঘটনা নয়। রোজ ঘটছে এরকম। প্রমানিত একটা সত্য হলো, বাংলাদেশে খবরের সবচেয়ে বড় উপাদান এখন যৌনতা। যেকোনভাবে এর লেশমাত্র পাওয়া গেলে সেটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলাটাই যেনো সাংবাদিকতা। আর অনলাইন দৈনিকগুলোতো বেঁচেই আছে এই নিয়ে। আমার কেনো যেনো ধারণা হয়, এর সাথে জড়িত যারা, তারা সম্ভবত প্রতি মূহুর্তে ধর্ষণ, খুন বা এমনতরো শব্দ দিয়ে গুগলে সার্চ দিতে থাকেন আর সেই সার্চে বান্দরবান থেকে বুয়েন্স আয়ার্স, আলম নগর থেকে আদ্দিস আবাবা যেখানেরই খবর আসুক, সেটাকে নিজেদের মতো করে অনুবাদ করে দিয়ে দেন। কোনমতে একজন অনুবাদ করে ফেল্লেই অবশ্য কেল্লাফতে, তারপর সেটা ভূত থেকে ভূতে হয়ে সকল ২৪/৪২০ পোর্টালে চলে যায়। বাপের হাতে কন্যা ধর্ষিত টাইপের খবরের লিংক ঘুরে বেড়ায় ফেসবুকের হোমফিডে। আমি নিশ্চিত আপনি সেই খবরটা পড়ে শেষ করার আগ মূহুর্তে জানতে পারবেন ওটা এদেশের খবর নয়। দেশীয় কায়দায় খবরটা পরিবেশন করে একদম শেষে বলে দেবে আমাজনের ডায়রী থেকে সংগৃহিত। এরকম উদাহরণ দিতে বসলে শেষ হবে না। লিংক দিতে আরম্ভ করলে সেগুলোতে ক্লিক করতে করতে আপনি পরিশ্রান্ত হয়ে যাবেন। এবং আপনার মুখ ক্রমেই লবনাক্ত হয়ে উঠবে।
কিন্তু এই ঘটনাগুলোকি শুধুমাত্র ২৪/৪২০ রাই ঘটাচ্ছে? এতক্ষণে হয়তো এটাই ভেবে বসেছেন অনেকে। কিন্তু না। এই শিরোনাম, এই সংবাদ দেশের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, সবচেয়ে বেশি প্রচারিত, সুশীলতার মোড়কে আটকানো প্রতিষ্ঠানেও পাবেন। এরা মুত্রত্যাগ কোন দিকে মুখ করে করা হচ্ছে সেটা নিয়ে খবর ছাপাবে। এরা অপেক্ষাকৃত বেশি অশ্লিল শব্দটাকে আমাদানি করবে। বিকল্প শব্দ থাকার পরেও এদের কেউ শিরোনামে স্বর্ণের বদলে 'সোনা' শব্দটা ব্যবহার করবে। যেমন আজকের প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করনেই আছে ' ৪ রানের জন্য ফসকে গেলো সোনা'

Friday, August 22, 2014

শুক্কুরবার, বাবা, আমি

শুক্কুরবার রাত থেকেই আসলে মজা শুরু। বাবা সেদিন একটু দেরি করে ফেরে যদিও, কিন্তু মজা হয়। এম্নিতে রোজ বিকালে প্লে-গ্রাউন্ডে যাই। অনেক্ষন থাকি সেখানে। কিন্তু শুক্কুরবারে আগে আগে চলে আসি। যদিও সেদিনই বাবা দেরি করে বাড়ি ফিরে, তবুও। আমাদের বসার ঘরের জানলা দিয়ে তাকালে উঠোন পেরিয়ে একেবারে বাস স্টপ পর্যন্ত দেখা যায়। আমি ঘরে ফিরেই সেই জানলার ধারে বসে পড়ি। অন্যদিন বাড়ি এসে হাত ধোয়া, মুখ ধোয়া, ঘামে ভেজা কাপড় বদলানো কতো কিছু করতে হয়, কিন্তু শুক্কুরবারে সেসব নেই। আগে মা জোরাজুরি করতো, এখন আর করে না। জানে বাবা না আসলে শুক্কুরবারে সেসব কিছুই হবে না।
আমি জানলার ধারে বসে বসে দেখি বাবা কখন আসে। বাবার দুহাত ভরে থাকে ব্যাগ, সারা সপ্তার বাজার সেখানে। অফিস শেষে বাজার করে, তারপর বাড়ি ফেরে। বাজারের ভারে বাবা নুয়ে পড়ে যেনো। কাঁধটা ঝুলে থাকে, মাথা নিচু। তবু বাবা একটু পর পর চোখ তুলে তাকাবে আমাদের জানলায়, দেখবে আমাকে দেখা যায় কীনা। এর আগে জানলার ধারে বসা থাকলেও ঠিক তখন আমি লুকিয়ে যাবো। জানালার পাশের দেয়ালে নিজের শরীরটা আড়াল করে শুধু চোখটা পর্দার ফাঁকে দিয়ে দেখছি বাবা হাঁটছে আর আমাকে দেখার চেস্টা করছে। কিযে মজা লাগে আমার… তারপর বাবা যখন গেটে চলে আসে, আমাদের উঠোনের ওপাশের কাঠের গেটটাতে বাবা হাত দেবার আগেই লাফ দিয়ে আমি দরজার কাছে চলে যাই, বাবা গেট খোলার আগেই দরজা খুলে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ি বাবার কোলে। দরোজা খোলার শব্দ পেয়েই বাবা হাত থেকে সবগুলো ব্যাগ তাড়াতাড়ি করে রেখে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে, আমি উড়ে গিয়ে বাবার কোলে পড়ি। মা দৌড়ে বের হয়ে আসে। আমরা বাপ ছেলে অনেক্ষণ ধরে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে থাকি। মা একটা দুটা ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে যায়, বাকিগুলো বাবার হাতে। আমার জন্য কোন ব্যাগ বাকি থাকে না, তবু আমার একটা নিতেই হবে, বাবা বেছে বেছে হালকা ওজনের ব্যাগটা ধরিয়ে দেয় আমার হাতে।
আটটা বাজলেই ঘুমিয়ে পড়ার নিয়ম। কিন্তু শুক্কুরবারে সেটা হবে না। সে রাতে বাবার সাথে আমার সিনেমার রাত। শুক্কুরবার মানে গল্প শোনার রাত। বাবা অদ্ভুদ সব গল্প জানে। একটা হাঁস তার সাথে কেমন করে একটা সঁজারুকে জুড়ে দেয়া যায়, সেই গল্পটা বাবা সুরে সুরে বলে, তারপর বাবা একটা নদীর গল্প বলে, খুব স্বচ্ছ জলের কথা বলে, লাল একটা গরুর গল্প বলে, খুব রাগ সেই গরুর, দুধ দিতে দিতে সে রেগে যেতো আর ইয়া জোরে একটা লাথি দিতো, সেই লাথি খেয়ে বাবার মধু’দার একবার দাঁত ভেঙে গেলো! সেই গল্প শুনে কি যে হাসি পেয়েছিলো আমার।
শনিবার মহা স্বাধীনতা। বাবা আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সকাল থেকে। আমরা নদীর ধারে রোজ হাঁটতে হাঁটতে অনেক দুর চলে যাই। একই নদী, একই আঁকাবাকা পাড় তবু কতোবার যে আমরা সে পথ দিয়ে গিয়েছি তার হিসাব নেই। নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা খেলার মাঠ পাওয়া যায়, সেই নদীতে অনেক সাদা সাদা রাজহাঁস খেলা করে। ছোট ছোট মাছ ভাসে নদীতে। বাবা বলে এরকম মাছ নাকি আমাদের বাড়ির পুকুরেও পাওয়া যায়। সেই পুকুরে নাকি আরও অনেক রকমের মাছ আছে। আর দু’বছর পর আমাকে নিয়ে সেখানে যাবে বাবা। এই বাড়ির গল্প শুরু হলেই বাবা কেমন আনমনা হয়ে যায়। তবু গল্প করতেই থাকে। আমারও শুনতে ভালো লাগে। সেই বাড়িতে নাকি বৃষ্টি হলে ঘরের চালে ঝুম ঝুম শব্দ হয়। এই বিষয়টা আমি বুঝতে পারি না। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর থেকে ঝুম ঝুম শব্দ শোনা যাবে কেমন করে? বাবা বলেছে টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে শব্দ হয়… কি জানি। বৃষ্টিতো আমার ভালোই লাগে না। কিন্তু বাবার খুব পছন্দ।
নদীর পাড় থেকে ফেরার পথে বাবা আমাকে কোক কিনে দেয়। গুনে গুনে চারটা চুমুক দেই সেটাতে। এটা আমার আর বাবার সবচেয়ে গোপন বিষয়। মা যদি কোনদিন এটা শুনতে পায়, আমাকে বাবার সাথে আর বেরই হতে দেবে না হয়তো। মা বলেছে বড় হবার আগে কোক খাওয়া একদম নিষেধ। বাবাও সেটা বলে, কিন্তু মাঝে মাঝে খেতে মন চাইলে খাওয়া যায়, কিছু হয় না, এটাও বলেছে সে! আমার বন্ধু স্টুয়ার্ট এটা শুনে বলেছে, এতো ভালো বাবা তার হলে, সেও কোক খেতে পারতো। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই, স্টুয়ার্টের বাবা কখনই ভালো হবে না। লোক্টা এমন নিষ্ঠুর, একবার আমার দাঁতে ব্যাথা হয়েছিলো, স্টুয়ার্টের বাবা সেই দাঁতটা ঠোনকা মেরে ফেলে দিলো! আমি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে অনেক্ষণ কেঁদেছিলাম। আমার বাবা সেরকম না। বাবা কখনো কাউকে কষ্ট দেয় না। কারো সাথে ঝগড়া করে না, আর আমি যা চাই, বাবা তাই করে।
শুক্কুরবার রাত থেকে রোববার বিকেল পযর্ন্ত পুরো সময়টা বাবা আর আমার। এই সময়ের ভেতর বাবা আমাকে নিয়ে পার্কে যাবে, খেলনার দোকানে নিয়ে যাবে, তারপর গানের স্কুলে নিয়ে যাবে। গানের স্কুলে একটা মিস আমাদের গান শেখায়, কিন্তু আমাদের স্কুলের মিসের মতো করে উনাকে আমরা মিস বলি না, বলি খালামনি। উনি দাদুমনির মতো করে কাপড় পরেন। এর নাম শাড়ী। তার মাথায় একটা টিপ থাকে। কোনদিন সেটা লাল, কোনদিন নীল, কোনদিন সবুজ… খালামনিকে আমার খুব পছন্দ, আমাকে গাল টিপে আদর করে দেন তিনি। কিন্তু মা এসব একদম পছন্দ করে না। আমাকে বলেছে, ভালো মুসলমানরা এভাবে মাথায় টিপ দেয় না। শুধু বাবার জন্যই মা কিছু করতে পারে না, নয়তো আমাকে গানের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতো। এই যেমন আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে গানটা ঘরে গাইতেই দেয় না মা। কিন্তু কি সুন্দর গান… নিজেকে রাজা ভাবতে কতো ভালো লাগে।
আজ আরেকটা শুক্কুরবার। কিন্তু বাবা আজ আসবে না। গত তিনদিন থেকেই বাবা বাড়ি ফিরে না। মা বলেছে বাবা আর কোনদিনই এখানে আসবে না। আমার সাথে মাঝে মাঝে দেখা হবে হয়তো, হয়তো বেড়াতেও নিয়ে যাবে বাবা, কিন্তু মাঝখানে অনেক ঝামেলা আছে, সেসব শেষ না হলে বাবার সাথে আর দেখা হবে না আমার। একথা শুনে আমার বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। আমার কান্না আসে, হুহু করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কাঁদতে পারি না। মা বলে, মর্দলোককে কাঁদতে হয় না! কিন্তু বাবাতো সেইরাতে অনেক কাঁদলো, আমাকে জড়িয়ে ধরে কি কান্না… এরপর মাঝরাতে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। তার আগে আমি ঘুমে ছিলাম। ধুম করে কিছু একটা পড়লো, আর আমার ঘুমটাও ভাঙলো। ভয়ে ভয়ে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে দরোজার ফাঁক দিয়ে দেখি সিড়ির সামনে বাবার কম্পিউটারটা পড়ে আছে। আর মা খুব জোরে জোরে কথা বলছে, সেসব কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। বাবা মাকে শান্ত করতে চাইছে, কিন্তু পারছে না, তারপর মা একবার বলে উঠলো, রেন্ডিকা আওলাদ… এটা মনে হয় একটা গালি, বাবা চিৎকার করে উঠলো, সামনে রাখা বড়ো ফুলদানিটা মাথার উপর তুলে আছাড় মারলো। ভয়ে আমি পর্দা জড়িয়ে ধরলাম। বাবা কখনো এতো জোরে কথা বলে না। কিন্তু তারা কি নিয়ে কথা বলছে সেটাও বুঝতে পারছি না। বাবা বাংলায় কথা বলছে, আর মা বলছে উর্দুতে। এসবের কিছু কিছু আমি বুঝি, কিন্তু তারা এতো দ্রুত কথা বলছিলো, সেটা আমার পক্ষে বুঝা সম্ভব না। তাদের ঝগড়ার মাঝখানেই দরোজায় বেল বাজলো। বাবা গিয়ে দরোজা খুলে দিলো। তারপর পুলিশ এসে বাবা আর মায়ের সাথে অনেকক্ষণ ধরে আলাদা আলাদা কথা বল্লো, আমি এইসময়টাতো একটাবারের জন্যও রুমের বাইরে বের হইনি। অনেকক্ষণ পরে বাবা আমার কাছে এলো। হাঁটুমুড়ে আমার সামনে বসে জড়িয়ে ধরলো। অনেকক্ষণ ধরেই থাকলো, কাঁদলো। তারপর কপালে একটা চুমু এঁকে বাবা বেরিয়ে গেলো। মাঝরাতে। তখন অনেক বৃষ্টি হচ্ছিলো বাইরে…

Sunday, August 3, 2014

এবং বন্ধুতা...

ঝুমুর বয়েসে বড় ছিলো আমাদের, তাই নামের শেষে দাদা যোগ করে সে আমাদের বন্ধু হয়ে গেলো। ঝুমুরদা। মূলত এটা একটা নামই শেষ পর্যন্ত। ওসব দাদাগীরি কি আর চলতো! দীর্ঘ বছর আমরা আড্ডা দিয়েছি। উদ্দাম তারুণ্য বলতে যে সময়টা থাকে, ঠিক সেই সময়ের বন্ধুদের একজন ঝুমুর।
এই বয়েসে একটা দলের সাথেতো আর সময় কাটানো যায়না। নানা ধরণের বন্ধু বান্ধব জুটে যায়। তারপর বয়েস বাড়ার সাথে সাথে যেকোন একজন, দুজন অথবা বিশেষ একটা গ্রুপের সাথে যোগাযোগ হয়তো বেশি থাকে, অন্যদের সাথে সেটা কমে। কোন কোন ক্ষেত্রে বন্ধই হয়ে যায়। স্টেডিয়াম পাড়ার সৈকত রেস্তোরাতে বসে আমরা যারা আড্ডাবাজি করতাম, সেটা খেলাধুলাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিলো। সেই গ্রুপে কেউ ক্রিকেট খেলতো, কেউ হকি, কেউ ফুটবল। কোন ধরণের খেলাধুলা না করেও আমি আর শামীম সেই গ্রুপে কেমন করে ঢুকে গিয়েছিলাম সেটা আর মনে নাই। কিন্তু টানা ৪/৫ বছর সেই আড্ডাটায় ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়েছি আমরা। আর সেই আড্ডার মধ্যমনি ছিলো এই ঝুমুরদা। বিচিত্র কাণ্ডকারখানা, মজার মজার কথা দিয়ে আড্ডা মাতিয়ে রাখতো। সৈকত রেস্টুরেন্টের টেবিল কিংবা স্টেডিয়ামের যে কোন একটা গ্যালারী দখল করে প্রতিদিনের আড্ডার আজান দিতো এই ঝুমুর।
শামীমের বাবা মারা গেলেন হঠাৎ। বাড়ির বড় ছেলে হিসাবে সংসারের হাল ধরলো সে। বাবার ব্যবসায় যোগ দিলো। আমি আস্তে আস্তে নাটকের কাজে জড়িয়ে গেলাম। সৈকতের সেই আড্ডায়ও যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো একসময়। অন্যরাও এদিক সেদিক চলে যেতে লাগলো, রেস্টুরেন্টের টেবিলতো ফাঁকা থাকেনা। সেখানে নতুন আড্ডারুরা এসে যোগ দেয়। আমার সেসব খবর নেয়া হয় না। স্টেডিয়াম পাড়ায় যদিও যাওয়া হয়। একদিন সেখানেই পাকড়াও করলো ঝুমুরদা। ব্যপক হাউকাউ, টানতে টানতে নিয়ে গেলো সৈকতে। একটা টেবিল ঘিরে বসে আছে জুনিয়র কয়েকটা ছেলে, মুখ চিনি কারো, কাউকেবা নামে চিনি, ঝুমুর টুপ করে সেখানে বসে গেলো, তখনও সমানে খিস্তি করছে। তার খিস্তি, সামনে আমি এসব নিয়ে বসে থাকারা যেমন বিব্রত, আমিও ততটাই। মিনিট দশেক সেখানে বসে ফিরে এলাম। আমাকে আবার এগিয়ে দিতে এলো ঝুমুরদা, মন খারাপ করে বল্ল, তোমরা কেউ আসোনা, এই বাচ্চা বাচ্চা পোলাপানের সাথে আমি এখন আড্ডা দেই! কিছু বলার ছিলো না আমার, কাজের দোহাই দিলাম শুধু।
ম্যালাদিন পরে, সম্ভবত বছর দশেক হবে, আমাদের পাশের পাড়াতেই ওর সাথে আবার দেখা। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইয়া আলী বলে কোলাকুলি... মুখে কাচাপাকা দাড়ি! কি অবস্থা, কেমন আছো এসব আটপৌরে কথাবার্তা হয়। হাতের ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট মোম বের করে দিলো ঝুমুরদা! ‘লোকনাথ মোমবাতি’। এই মোম ফ্যাক্টরির মালিক সে। আমাদের পাশের পাড়াতে বাড়ি করেছে তারা। সেই বাড়িতেই এই মোম ফ্যাক্টরি। দেখে খুব ভালো লাগে। প্রশংসা করি। ভালো চলছে তার, সে কথা শুনে আনন্দিত হই। কিন্তু ঝুমুরদা বেশ মন খারাপ করে বলে, কারো সাথে যোগাযোগ হয় না আর। সময় পায় না! আমি বলি জীবনের নিয়মই এই। কিন্তু ঝুমুর সেটা মানতে নারাজ। তার কথা হলো, রোজ যদি বন্ধুদের সাথে আড্ডাই না দিলো, তাহলে আর কিসের জীবন! সেই শেষ দেখা। আর কখনো দেখা হয়নি ওর সাথে।
ফেসবুকে একটা ছবি পেলাম আজ, এক অচেনা সন্ন্যাসীর। এরকম ছবি দেখলে কোন আগ্রহবোধ করিনা। পরিচিত কেউ পোস্টও করেনি, ফেসবুক কোন এক বন্ধুর বন্ধুকে আমি বন্ধু বানাতে আগ্রহী কীনা সেটা জানার জন্য এই ছবি লটকে দিয়েছে। চোখের কোনায় আটকে গেলো ঝুমুর শব্দটা। পড়ে দেখি এই আমাদের ঝুমুর!!! যিনি ছবিটা দিয়েছেন, তিনিও আমারই মতো ঝুমুরের আরেক ছোটভাই বন্ধু, তার সাথেও ঝুমুরের অনেকদিন দেখা নেই। হঠাৎ করেই পেয়ে গেলেন এই সন্ন্যাসীকে, আর অবাক হয়ে আবিস্কার করলেন এ আর কেউ নয়, প্রিয় ঝুমুরদা!
ফেসবুকে অচেনা জঞ্জাল এড়িয়ে চলতে চলতে এইযে মনের খুব ভেতর থেকে কিছু একটা উকি দিয়ে ঝুমুরের নামটা দেখে ফেল্ল। এইযে ঝুমুর এসে টেনে হিচড়ে ষোল, সতেরো, আঠারো, উনিশ কিংবা বিশ বছরের আমাকে আবার নিজের সামনে দাড় করিয়ে দিলো, সম্ভবত এরই নাম বন্ধুতা!

Wednesday, July 16, 2014

নির্বাসনের পদ্য

এই প্রত্ন শহরে সকলই বিন্যস্ত।
পরিপাটি ঘর, শোভন উদ্যান।
আলো ঝলমল বিপণী বিতান।

এ শহরে মানুষের শাসিত, শৃঙ্খলিত
নদী আছে এক, সোয়ার...
আছো নির্বাসিত আলবাব।

প্রত্ন শহর। অনাত্মীয় শহর।
অপরিচিত মানুষের মুখ
৯৯৯ এর পরমাত্মীয় কণ্ঠ
ছাড়া আর কেউ নেই তোমার