Tuesday, August 18, 2015

বেয়াইপ্রজাতন্ত্র এবং একজন প্রবীর সিকদার

প্রবীর সিকদারকে জেলহাজতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ দশ দিনের রিমান্ড চাইলে সেই আবেদনের শুনানীর তারিখ নির্ধারণ করে তাঁকে জেলে পাঠান আদালত। আজ এই শুনানী হবে।
ইতোমধ্যে অনলাইনচারী সবাই প্রবীর সিকদারকে চিনে ফেলার কথা। ১৬ আগস্ট তাকে আটক করেছে ঢাকার ডিবি পুলিশ। আটক করার কয়েক ঘন্টা পর ফরিদপুরে দায়ের করা হয় মামলা। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আটক হওয়া সাংবাদিক প্রবীর ফেসবুক স্টেটাসের মাধ্যমে মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেনের সম্মানহানি করেছেন! এখানে লক্ষণীয় হলো, আমাদের দেশে যখন মামলা করেও আসামি গ্রেপ্তার করানো যায় না, যখন প্রকাশ্যে ব্লগাররা খুন হবার পরও খুনিদের না ধরে উল্টো ব্লগারদেরই দোষ খোঁজা হয়, ঠিক সেই সময়ে আগেভাগে আসামি আটক করে মামলা দায়ের একটি অভিনব ঘটনা।
প্রবীর সিকদার কে? তিনি একজন সাংবাদিক, এই তার পরিচয়। কিন্তু এসব ছাড়িয়ে গেছে যুদ্ধাপরাধ নিয়ে প্রবীরের আপোসহীন কর্মকাণ্ড। ব্যক্তিজীবনে তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাবাসহ পরিবারের ১৪ জনকে হারিয়েছেন প্রবীর। এমন একজন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ হয়ে কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তাই। টানা সেনাশাসন, জামায়াত-বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সময়ে যে কয়জন হাতেগোনা মানুষ যুদ্ধাপরাধ এবং অপরাধী নিয়ে বড় গলায় কথা বলেছেন, প্রবীর তাদের একজন। ফরিদপুরের মতো ছোট এক শহরে থেকেও তাই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন পুরো দেশে। মুসা বিন শমসের নামের আড়ালে যে এক কুখ্যাত রাজাকার নুলা মুসা লুকিয়ে আছে এই তথ্যটি সবার সামনে নিয়ে এসেছিলেন প্রবীর সিকদার। কিংবা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নামে টিভিতে ধর্মের বুলি আওড়ানো ভণ্ডটা আদতে বাচ্চু রাজাকার ছাড়া আর কেউ নয়, সেই সত্যটাও দেশের মানুষ জেনেছে উনার মাধ্যমে।
নুলা মুসা আর নুলা নাই। সে এখন আন্তর্জাতিক কেউকেটা। দুই টাকার কলম পেষা সাংবাদিককে সে সহ্য করবে কেন? তাই ২০০১ সালেই আক্রান্ত হন প্রবীর। বোমার আঘাতে হারান একটি পা। একটি হাতের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যায়। তখন ক্ষমতায় ছিলো আওয়ামীলীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ সহায়তায় বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে কৃত্রিম পা সংযোজন করেন প্রবীর সিকদার। কিন্তু নিজের শহর ফরিদপুরে আর ফেরা হয়নি। ঢাকাতেই থাকছেন গত ১৫ বছর ধরে। নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সোচ্চার আছেন। প্রতিদিন জ্যামিতিকহারে ক্ষমতাবান হতে থাকা মুসার বিরুদ্ধে, রাজাকারপুত্র এবং বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেনের নানা অপকর্ম নিয়ে খবর প্রকাশ করছিলেন। উল্লেখ্য মোশাররফ হোসেন ফরিদপুর থেকে নির্বাচিত সংসদসদস্য। এই মন্ত্রী ফরিদপুরের কুখ্যাত রাজাকার খোন্দকার নুরুল হোসেনের (নুরু রাজাকার) পুত্র। নিজে রাজাকার না হলেও মন্ত্রী হবার পর থেকেই পিতৃঋণ পরিশোধ করে চলেছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি-জমি দখল থেকে শুরু করে নানা প্রতিষ্ঠানে নিজের রাজাকার বাবার নাম সেঁটে দিচ্ছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এসবের প্রতিবাদ করছিলেন প্রবীর। পাচ্ছিলেন হুমকি। কিন্তু যে মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিবারের ১৪ জনকে হারিয়েছেন, রাজাকারদের মুখোশ খুলে দিতে গিয়ে যে মানুষটা পঙ্গু হয়েছেন, তাকে তো আর হুমকি দিয়ে আটকানো যাবে না। যায়ও নি।

নুরু রাজাকারের নামে ফরিদপুরে রাস্তার নামকরণ হয়েছে
হুমকি পেয়ে প্রবীর সিকদার থানায় গিয়েছেন, অভিযোগ জানাতে গিয়ে ফিরে এসেছেন। পুলিশ সে অভিযোগ নেয়নি। সেই কথা তিনি ফেসবুক স্টেটাসে জানিয়েছিলেন। সেই স্টেটাসে উল্লেখ করেছেন, তার যদি কিছু হয় তাহলে এর জন্য মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, রাজাকার নুলা মুসা ওরফে মুসা বিন শমসের এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক বাচ্চু রাজাকার ওরফে আবুল কালাম আজাদ দায়ি থাকবে।
১৬ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ঢাকায় প্রবীর সিকদারের অফিস থেকে সেই বিষয়ে কথা বলার জন্যই থানায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলো পুলিশ। অন্তত তাই বলেছিলো তারা। পরে আর থানায় যায়নি, গিয়েছে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে। মধ্যরাত পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি।
প্রবীর সিকদারের একটি পা নেই। তিনি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে বা একঠায় বসে থাকতে পারেন না। এই তথ্য জানিয়ে বাবার জন্য একটু ভালো বসার জায়গা চেয়েছিলেন সুপ্রিয় সিকদার। যাতে মাঝে মাঝে তিনি গা এলিয়ে দিতে পারেন। দেয়া হয়নি। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে টানাহ্যাচড়ার মধ্যে থাকা প্রবীরকে মধ্যরাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ফরিদপুরে। সকালে কোর্টে নিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালত যার ফয়সালা করবেন আজ।

কুখ্যাত রাজাকার, দণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীকে ছাতা মাথায় জামাই আদরে নেওয়া হয়, আর শহীদপুত্র, বেয়াই অপমানের মামলায় অভিযুক্ত প্রবীর সিকদারের আহত হাতে থাকে হাতকড়া
বেয়াইপ্রজাতন্ত্রী দেশ
ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশাররফ হোসেন সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম কোনো রাজনৈতিক সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, যিনি দলের কোনো পদে নেই। যার সাথে সারা দেশের আওয়ামীলীগ কর্মীদের যোগাযোগ থাকা তো দূরের কথা, নিজের জেলার আওয়ামীলীগের সাথেই কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ শান্তিকমিটির সদস্য, নুরু রাজাকারের ছেলে খোন্দকার মোশাররফকে ধারণ করার জন্য ফরিদপুর আওয়ামীলীগ রাজি ছিলো না কখনো। কিন্তু দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজের এই তুতো ভাইকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে কঠিন শপথ নিয়েছিলেন। আর সবচে বড় কথা হলো পুরনো সম্পর্ক ছাপিয়ে উঠেছিলো নতুন সম্পর্ক। খোন্দকার সাহেব প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই হন যে! একমাত্র কন্যা সায়মা ওয়াজেদের শশুর হলেন এই মন্ত্রী।
মুসা বিন শমসের। বিতর্কিত এই ব্যবসায়ী এবং রাজাকারও শেখ পরিবারের পরমাত্মীয়। আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী শেখ সেলিমের বেয়াই! শেখ সেলিমের আরেক বেয়াইও বিখ্যাত মানুষ। বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিদ্যুত মন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু।
অবাধ্য প্রবীর সিকদার এই দুই বেয়াই-এর বিরুদ্ধেই একের পর এক নিউজ করে যাচ্ছিলেন। সর্বশেষ ফেইসবুকে স্টেটাস দিয়ে সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ করলেন।
বেয়াই বিষয়ে আরো দু একটা তথ্য দেওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর চাচাত ভাই শেখ হেলাল। তিনি দলীয় এমপিও। সোহেল তাজ এর মন্ত্রীত্ব ছাড়ার পেছনে যাকে দায়ি করা হয়। এই শেখ হেলালের বেয়াই হলেন, পতিত স্বৈরশাসক এরশাদের চোর ক্যাশিয়ার নাজিউর রহমান মঞ্জু। জি, ঠিক ধরেছেন, ব্লগারদেরকে প্রকাশ্যে পেটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন যিনি, যিনি এই সেদিন আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে পেটানো জায়েজ বলে ফতোয়া দিয়েছেন, যিনি বিএনপি-জামায়াত জোটের অন্যতম শরীক বিজেপির চেয়ারম্যান, সেই আন্দালিভ রহমান পার্থ জাতীর পিতার নাতিন জামাই হন! এরকম বেয়াই আরো খুঁজে বের করা যাবে।
উচ্চ ভাসুরের নাম নিতে মানা
আর কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রবীর সিকদারকে আদালতে নেয়া হবে। ফরিদপুরের কোনো আইনজীবী প্রবীরকে আইনি সহায়তা দেবেন না। স্বপন কুমার পাল নামের যে আওয়ামী উকিল মামলা করেছেন, তিনি আবার ফরিদপুর বারের আইনজীবী। নিজেদের উকিলের দায়ের করা মামলায় সেই বারের উকিলরা মামলা লড়েন না! এরপরেও কেউ কেউ প্রবীর সিকদারের পক্ষে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। ক্ষমতাধর মন্ত্রীর চ্যালারা তাতেও বাধা দিয়েছে। আইন ও সালিসকেন্দ্র আইনজীবী পাঠাবে বলেছে। দেখা যাক কী হয়। ভয়ঙ্কর সিকদারকে আদালত কতদিনের জন্য রিমান্ডে পাঠান দেখার বিষয়।
ইদানীং নানা বিষয়ে ফতোয়া দেখা যায়। স্বপ্রণোদিত হয়েও মাঝে মাঝে ফতোয়া আসে। কিন্তু কেনো যেন প্রবীর টাইপ বিষয় তাঁরা দেখেন না। আমরাও ভয়ে কথা বলি না। কখন আবার কোন বিপদে পড়ি। “উচ্চ ভাসুরের নাম” মুখে নিতে তো মানা আছে।
কাক কাকের মাংস খায় না
একবার শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম জরিপ করতে। জামায়াতের আব্দুর রবকে সেখানকার ভিসি করার পাঁয়তারা চলছিলো। এটা নিয়ে প্রশ্ন করছিলাম কয়েকজন মিলে। হঠাৎ সেখানে উদয় হলো ইত্তেফাকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নুরুল আমিন। সে ডেকে নিয়ে আসলো শিবিরের চ্যলা চামুণ্ডা। জোর করে কাজ করা যেত, কিন্তু অফিস সেটা চাইলো না। সিলেটে ইত্তেফাকের নিজস্ব প্রতিবেদক ছিলেন আব্দুল মালিক চৌধুরী। নির্বিরোধী মানুষ। টেক্সটবুক ধরে রিপোর্ট লিখেন। লাশ দেখেন ১০টা, ডিসিকে জিজ্ঞেস করলে জানা যায় ৮টা লাশ। তিনি খবরে ৮টা লিখেই পাঠিয়ে দেন! তো সেই মালিক ভাইকে আমাদের সম্পাদক ফোন করে বল্লেন পুরো ঘটনা। তিনি আবার একটু গুন্ডা প্রকৃতির সম্পাদক, বল্লেন নুরুল আমিনকে শহরে দেখলেই পেটাবেন! মালিক ভাই হায় হায় করে উঠলেন, না না, এটা করতে হয় না। কাক কখনো কাকের মাংস খায় না...!
হ্যা, কাক কখনো কাকের মাংস খায়না। মিথ্যাচারের বরপুত্র মাহমুদুর রহমানকে আটক করার পর সেই সত্যতা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সব বড় বড় সাংবাদিক এর প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছে। এখনও দেয়। কিন্তু প্রবীর সিকদারের বিষয়ে অল কোয়ায়েট অন দ্যা সাম্বাদিক ফ্রন্ট! সম্ভবত প্রবীর সিকদার ভালো কাক হয়ে উঠতে পারেন নি।
এবং ৫৭

৫৭ ধারা
 নিয়ে আলোচনা চলছে ২০১৩ থেকে। নতুন করে যুক্ত হতে চলেছে “সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০১৫”। ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি করছেন মুক্ত মত প্রকাশের পক্ষের মানুষেরা। বাংলাদেশে আরেকটি ধারা কিন্তু আছে। সেটা হলো ৫৪ ধারা। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই ধারাটি কার্যকর। রাষ্ট্রযন্ত্র ইচ্ছামতো এই ধারার ব্যবহার করেছে। সেখানে ৫৭ কিংবা সাইবার নিরাপত্তা আইন নতুন পালক হিসাবেই যুক্ত হয়েছে। আর কিছু নয়। তো এই আইন বাতিল করলে আসলে কোনো লাভ নাই। রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিকই আপনাকে আটক করতে পারবে, লটকে দিতে পারবে যদি চায়। শাসকের মাথার ভেতর থেকে ৫৪, ৫৭ নামের ধারাগুলো যতদিন বিলুপ্ত না হবে, যতদিন বেয়াইপ্রজাতন্ত্রী থেকে প্রকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ গড়ে না উঠবে ততদিন “আকাশের যত তারা পুলিশের তত ধারা” মেনে নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।
প্রথম ছবিটি সাংবাদিক উজ্জ্বল দাশ এবং দ্বিতীয়টি ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের ফেসবুক পোস্ট থেকে।

Wednesday, July 8, 2015

নামাবলী

১৯৯১ সালে ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে বীর পূজারী মুসলিমদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষে পরিণত হন সাদ্দাম হোসেন! আরবের শাসকরা যতই সাদ্দামের বিরুদ্ধে থাকুক না কেনো, কিংবা আমাদের মতো দূরবর্তী দেশগুলোর শাসকরাও যুদ্ধে কুয়েতের পক্ষে অংশ নিক, সাধারণ মুসলমানদের মাঝে এই লোকটা ছিলো অসম্ভব প্রিয়। তখনকার বাংলাদেশে অনেক নবজাতকের নাম রাখা হয়েছে সাদ্দাম। আমার পরিচিত একজন শিক্ষিকা তার ছেলের নাম রাখেন সাদ্দাম!
ধর্মকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া উপমহাদেশীয় মুসলমানরা ভেবেছিলেন মুসলমানদের কথিত হারানো গৌরব আবার বুঝি ফিরে আসবে সাদ্দামের হাত ধরে! সম্ভবত আরবেও এরকম একটি ধারণা ছিলো। তারা আমাদের মতো হয়তো মুসলমান কেন্দ্রিক চিন্তা করতো না। সাদ্দামের মাধ্যমে আরব পূণর্জাগরণের একটা প্রচ্ছন্ন স্বপ্ন ছিলো আম আরবীয়দের। আমাদের মসজিদে তবলিগ করতে আসা কোন এক আরবদেশীয় তরুণ ভাঙা ভাঙা বাংলাতে সেই স্বপ্নের কথা আমাদের বলেছিলেন। যতটা মনে করতে পারি, তিনি একটিবারের জন্যও মুসলমানদের কথা বলেননি। বার বার বলছিলেন আরবের কথা। বাংলাদেশেই ডাক্তারি পড়তে থাকা সেই আরব বাগদাদের প্রাচীন সভ্যতার কথা বলেছিলেন, বাদশাহ হারুনুর রশিদের গল্পের ছলে যার অনেকটাই আমরা জানতাম। যতটা জানতে পেরেছি, সাদ্দাম শব্দটার অর্থ হলো যে বেশি বেশি আঘাত করে! অবশ্য এটা কিছুই না, আমরা হিটলার, ভুট্টো এসব নাম রাখতেও বেশ আগ্রহী!
ধুরন্ধর সাদ্দাম দেশের বাইরে যেতেন খুব কম। সেসময় সেটা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। তার হয়ে জাতিসংঘে গরম গরম বক্তব্য দিয়ে তখন সামনে চলে এলেন তারিক আজিজ। তখনকার ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যুদ্ধ নয় শান্তি চাই টাইপ বাণী আওড়ে যেসব ধর্মপ্রাণ সাদ্দাম বিষয়ে মিউ মিউ করতেন, ভাব নিতেন তারা এরকম যুদ্ধবাজকে পছন্দ করেন না, তারা নৃশংস সাদ্দামকে পাশে ঠেলে দিয়ে তারিক আজিজকে নিয়ে মেতে উঠলেন। দিনে দিনে মুসলিম সমাজে তারিক আজিজ সুশীল ভাবমূর্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেন।
তারিক আজিজকে প্রিয় তালিকাতে স্থান দেয়াদের মন ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিলো কিছুদিন পরেই। যখন আবিষ্কৃত হলো, এতো চমৎকার একটি নাম, গৌরবময় স্পেন বিজয়ের মহান সেনাপতির নামে যার নাম, সেই তারিক আজিজ আসলে মুসলিম নয়! তিনি খ্রিষ্টান। খ্রিষ্টান হবার আগে তিনি একজন গর্বিত আরব, তাই তার নামটাও আরবিতেই হয়েছে।
প্রথম ইরাক যুদ্ধ যখন শেষ হলো। স্বাধীন কুয়েতে গেলেন তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াকার বুশ। কুয়েতের শেখ সাবা আরবিয় কায়দায় বুশের গালে চুম্মা দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বুশকে দেয়া হলো ব্যাপক সম্মান। কুয়েতের নাগরিকত্ব দেওয়া হলো। বুশকে এজন্য একটি আরবিয় নামও দেওয়া হলো, আব্দুল্লাহ।
কুরাইশরা যখন ক্বাবা’র সংস্কার করেন, তাদের কাছে পুরো ঘর নির্মাণের মতো টাকা ছিলো না। ক্বাবার মূল সীমানা চিহ্নিত করে অপেক্ষাকৃত ছোট মাপের ঘর তৈরি হয়। বাড়তি যে অংশটা রয়ে গেলো, সেটুকুকে হাতিম বলা হয়। মুসলমানদের কাছে খুবই সম্মানিত এই অংশ। মূল ক্বাবায় রাজা-বাদশাহ ছাড়াতো কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। সাধারণ মানুষ এই হাতিমে নামাজ আদায় করেন। হাতিম মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি প্রচলিত নাম। আমাদের সিলেটে একজন আওলিয়া ছিলেন, হাতিম আলী। বিশাল মাজার আছে এখনও। উনার নামে স্কুল আছে, একটা পাড়ার নাম হাতিমবাগ। দাতা হাতিম তায়িতো প্রবল জনপ্রিয় এক চরিত্র। আরবের এই দানশীল ব্যক্তিকে সম্মান করা হয়। তায়ি গোত্রের নেতা এই মানুষটি কবিও ছিলেন। আরব্য রজনীর গল্পেও আছে হাতিমের কথা। ইনি খ্রিষ্টান ছিলেন।
মহা নবীর বড় দুঃখগুলোর একটি ছিলো প্রিয় চাচা আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণ না করা। তিনি পৌত্তলিক হিসাবেই মৃত্যুবরণ করেন। আমার দুঃসম্পর্কের এক বন্ধুর নাম ছিলো তালেব। ক্লাস নাইনে রেজিস্ট্রেশনের সময় সেই নামকে তালিব বানিয়ে দিলেন ধর্মশিক্ষা স্যার। বললেন, নবীর চাচার নাম, অশুদ্ধ করে কেনো লিখো? আমরা এরপরেও ওকে তালেব বলেই ডাকতাম।
সিলেটে পীর আওলিয়াদের ছড়াছড়ি। এক শাহজালালের সাথেই এসেছেন ৩৬০ জন। বেশিরভাগেরই আরবি নাম। কিন্তু কাজল শাহ, সুন্দর শাহ কিংবা শাহ পরাণের নাম নিয়ে খটকা লাগে। ইয়েমেনে এই নাম কেমন করে গেলো? বিশেষ করে কাজল নামের খাঁটি ‘মালাউনি’ নাম! সুন্দর, পরাণ এসবও-তো বাংলা নাম, যেটাকে হিন্দুয়ানী বলতেই লোকজনে পছন্দ করে। আরবি ভাষা-সাহিত্য নিয়ে পড়ালেখা করা একজন শাহ পরাণের নামের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এটা নাকি পরাণ নয়। উনার নাম ছিলো ফারহান বা ফরহান। সিলেটী বাংলার প্রভাবে ফরহান একসময় ফরাণ এবং পরে পরাণ হয়ে যায়। (এটা হওয়া সম্ভব। শাহ পরাণ সিলেটের যে দিকটায় আছেন, মানে শহর সিলেটের পূর্বদিক। এই দিকের মানুষ নাম বিতলানোতে উস্তাদ। আমার জন্ম এর পাশাপাশি এক এলাকায়, সেই গ্রামে সিরাজ নামের এক লোককে সিরাই বলা হতো। একজনের নাম রুবেল, রু উচ্চারণের পর হালকা একটু থেমে বাকিটা বলার যে স্টাইল... আর কোথাও সেটা শুনিনি।) প্রথমে ভাষাতাত্বিক উত্তর ভেবেছিলাম। উনি বললেন তার বলাটাই সত্যি। যেহেতু ইনি শাহজালালের ভাগ্নে ছিলেন, তাই উনার নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। যেমন নাসিরুদ্দিনের পরিচয় পুরোটাই পাওয়া যায়। বাকি অনেকেরই সেভাবে পাওয়া যায় না। তাই কাজল বা সুন্দর শাহর আসল নামগুলো আর জানা হয় না। অবশ্য এমনও হতে পারে, এরা আদতে ভারতীয়। সিলেটে আসার পথে কোন একসময় শাহজালালের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। আরবের শাহজালাল তাদের নাম বদলানোর প্রয়োজন মনে করেননি। যেমন করে মহানবীও এসব নিয়ে মাথা ঘামাননি। তাই মক্কা বিজয়ের পরে কুখ্যাত আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহন করলেও তার নাম বদলানো হয়নি। নামটাও খারাপ কিছু না। আমাদের কলেজে শিবিরের এক নেতার নাম ছিলো সুফিয়ান। ইসলামের সৈনিক নিশ্চয় খারাপ নাম হলে সেটা বদলে ফেলতো। আমার আপন মামার নাম একেবারে খাপে খাপে আবু সুফিয়ান। উনারে মাঝে মাঝে সুফিয়ানের বাপ বলি আমরা। তিনি হাসেন। অবশ্য আমার সব মামা কারো না কারো বাপ হন। সবার নামের আগে একটা করে আবু লাগানো!
আবু’র কথা আসাতে মনে পড়লো ইবনের কথা। ইবনে মিজান নামের একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন। তখন রেডিওতে নাজমুল হোসেইন আর গাজী মাজহারুল আনোয়ার সিনেমার বিজ্ঞাপন করতেন। তারা গমগমে গলায় বলতে ইবনে মিজানের সম্পূর্ণ রঙ্গিন সিনেমা... সেটা ইকো করতো। ধুন্ধুমার অবস্থা। আমাদের ক্লাসের মিজান সেসব শুনে তার নামের আগে একটা ইবনে লাগিয়ে নিলো! হাফিজুর স্যার ওরে জিজ্ঞেস করলেন, ওই, তোর বাফর নাম কিতা? সে বলল আব্দুল কুদ্দুস। স্যার সবার খাতা দেখা শেষ করে ওর খাতাটা তুলে নিয়ে বললেন, তোরে যদি আল্লায় ছেলের বাপ বানায়, তাইলে সেই ছেলের নাম হবে ইবনে মিজান, মানে মিজানের পুত্র। কিন্তু তুই হবি ইবনে কুদ্দুস... স্যার এরপরে আর কি বলছেন মনে নাই, আমরা ব্যাপক বিক্রমে মিজানরে এরপর থেকে চান্স পেলেই ইবনে কুদ্দুস ডাকতাম।
ইবনে শব্দটার মাঝে মুসলমান গন্ধ নিয়া পুলকিত হবার কিছু নাই। এটা আরবিয় রীতি। তারা অমুকের পুলা তমুক বলে পরিচিত হতে এবং দিতে পছন্দ করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ উহুদের যুদ্ধে কুরাইশদের হয়ে মুসলমানদের কি মাইরটাইনা দিলেন। পরে মুসলমান হয়ে সেই খালিদ বিন ওয়ালিদই রয়ে গেলেন তিনি। নাজরানের খ্রিস্টানদের সাথে মহানবী যে চুক্তি করেছিলেন তাতে উনার নাম লেখা ছিলো মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব আর বিপক্ষের নাম ছিলো সাইদ ইবনে হারিত ইবনে ক্বাব। আরবদেশে গিয়ে উমর কিংবা ওসমান বললে কেউ চিনবে না। উমর বিন খাত্তাব আর ওসমান বিন আফ্ফান বলতে হবে। আলীর নামের সাথে উনার পৌত্তলিক পিতা আবু তালিবের নাম জুড়ে দেয়া থাকে সবসময়।
আমার নিজের একটা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি টাইপ নাম ছিলো। বৃত্ত ভরাটের ঝামেলা আর পরে লেখক জশোন্মুখতায় সেসব কালের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছে। আম্মার এক চাচাতো ভাইয়ের নামও লেখক হবার ফেরে পড়ে হারিয়ে যায়। তিনি পরে সাংবাদিক হন। প্রেসক্লাবের আড্ডায় উনারে তার হারানো নাম বলতে বললাম, অনেক কসরত করেও সেটা মনে করতে না পেরে বললেন, দুঃখজনক!
পাশের বাড়ির ‌‌‍'নাজমার'মা' চাচীরে আমাদের ছেলেরা 'নাজমার'মা' দাদী ডাকে। আম্মা ডাকেন 'নাজমার'মা'... উনার নামটা জানা হলো না কোনদিন!

Friday, June 12, 2015

জ্বরগ্রস্ত

বৃষ্টি, জ্বর আর একাকিত্ব নিয়ে আমার বেড়ে উঠা। বৃষ্টিকে আমরা মেঘ বলি। মেঘের পর মেঘ আমাকে ভিজিয়েছে আশৈশব, বালকবেলা থেকে মেঘে ভিজতে ভিজতে পেরিয়ে এসেছি একাকী তারুণ্য, এসে দাঁড়িয়েছি চালসে সময়ের সামনে...
এত বেশি জ্বর হতো, কেউ আর সেটাকে গুরুত্ব দিতো না। মা-ও না। একবার জ্বরে গা পুড়ে যায়, নানা বাড়ির পুরনো আমলের পালঙ্কে আমার চে বয়েসে বড় রেজাইর নিচে শুয়ে দেখি মা শহরে চলে গেলেন। ডাক্তার দেখাতে হবে যে। জন্মের দাগ রেখে এসেছি মায়ের জরায়ুতে, সে-ও তো আর ভালো থাকে না। সেবার জ্বর ছিলোনা শুধু, সন্ধ্যার আগে আগে সারা শরীর লাল হয়ে হাম এলো! নানী তখন কানে শুনতে পাননা ভালো করে। দুদুমইর বাড়ি থেকে কীসব শিকড় বাকড় আনালেন। একটু পর পর নানী শরীরে হাত বুলিয়ে দেন, আহ্ প্রশান্তি...
চিঠি লিখি। রোল টানা বাংলা খাতার পাতা ছিঁড়ে। ভেতরে অনেক গরম, দই খেতে ইচ্ছে করে, মা বাড়ি নেই... সব লিখে দেই, সব। লোকটার নাম ভুলে গেছি। একটা বড় ঝোলা থাকতো কাঁধে। চোখে মোটা কাচের চশমা। নাকের উপর সুতো পেঁচিয়ে রাখা। চিঠি থাকুক আর না থাকুক এপাশটায় এলে নানাবাড়িতে একবার তিনি আসতেনই। সেই একই খাতার পাতা ছিঁড়ে খাম বানিয়ে ভাত দিয়ে আঠা লাগিয়ে তাঁর হাতে তুলে দেই। প্রাপকের নামে লিখি আব্বা। তিনি আমাকে টিকিটের কথা বলেন, আমি বলি আব্বার কাছে অনেক টিকিট, তিনি নিজে লাগিয়ে নেবেন, আপনি বাক্সে ফেলে দেবেন। তিনি মাথা নেড়ে বিদায় নেন।
ডাক্তার চাচা কোনোদিন আস্তে কথা বলেছেন মনে পড়ে না। পাশে বসে স্টেথোটা বুকে চেপে চোখ বুঁজে, শ্বাস... ছাড়ো... শ্বাস... এই শব্দগুলোই শুধু একটু রয়েসয়ে বলা হয় তাঁর। প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো ঔষধ দেয়ার নাম গন্ধ নাই, শুধু পানি খেতে বলেন। তাতেই আমার জ্বর সেরে যায়। একবার কী হলো কে জানে, রক্ত প্রস্রাব টেস্ট করতে পাঠালেন। মনে হলো এবার তবে ওষুধ মিলবে। রিপোর্ট হাতে নিয়ে চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বিকট আওয়াজ করে বললেন, ‘ফানি খাওনা খেনে!!!’ এবার জগ মেপে ঠিক করা হলো কতটুকু পানি রোজ খেতে হবে। সেটার তদারকিও তিনি নিজে করেন।
হাসমত ভাই সাতবার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। বোর্ডের লোকজন ফেলের লিস্টে হাসমত আলী... হাসমত আলী... হাসমত আলী... দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে তাকে পাস করিয়ে দিয়েছিলো এমনটাই তার বিশ্বাস। দ্বিতীয়বার মাথা ফাটালাম যখন, তিনি দেখতে এলেন ছোট্ট একটা শিশি নিয়ে। ছোট ছোট সাগুদানার মতো মিষ্টি ওষুধ। আম্মা বললেন, ‘ও হাসমত ইতা কিতা দেও? তারনু এলোপ্যাথি চলের...’ হাসমত ভাই হাসতে হাসতে বলে, ‘কুন্তা ওইতনায়, খারে ভাই, তুই খা, আমি হাসমত আলী ডিএইচএম’র ওষুধর লাখান মজা আর কুন্তাত পাইতেনায়!’ হাসমত ভাই থাকতে থাকতেই সেই শিশির অর্ধেকটা গিলে ফেলি, যাবার আগে বলে যান, ‘যতবার বাজারো যাইবে, গুল্লি খাইয়া আইবে, তর লাগি সব ফিরি...’ একেবারে ছোটবেলায় কল্যাণ ডাক্তার নামের একজনের কাছ থেকেও হোমিওপ্যাথির ঔষধ আনতেন আব্বা। অনেক অনেক বছর পরে সেই কল্যাণ ডাক্তারের ছেলে আমার বন্ধু হয়ে এলো! উজ্জল ধর। কথায় কথায় বাবার নাম বলতেই বললাম, এই নামের একজন ছোটবেলায় আমার চিকিৎসা করতেন, সে চোখ পিট পিট করে বলে, ঐ তুই গোয়ালাবাজার থাকছতনি কুনুসময়? আমি হ্যাঁ বলতেই বলে, তাইলে ওই কল্যাণ ডাক্তারই আমার বাপ!
জ্বর উঠলেই চোখ দুটো ফেটে বেরিয়ে আসতে চায়। লাল টকটকে। দেখতে যদি বড়সড় হতাম, অন্তত সাড়ে পাঁচ ফুট হলেও লোকে ভয় পেতো নিশ্চিত। আব্বার একই ধাত। কোনোদিন অসুখ করেনি, মাঝে মাঝে জ্বরজারি হতো। চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে, রক্তজবার মতো লাল সেই চোখ... বাবাইরও এমন হয়!
এমনিতে স্বপ্ন দেখিনা, বা দেখলেও সেটা মনে থাকে না। কিন্তু জ্বর হলেই স্বপ্ন দেখি। সেই একই স্বপ্ন বুঝতে শেখার পর থেকে দেখে আসছি। একটা আকাশ, মেঘলা আকাশ। মেঘ ভাসছে, আমি ভাসছি... মাঠ, ঘাট, প্রান্তর সীমানা ছাড়িয়ে যায়, আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে থাকি। এর বাইরে আর কিছু মনে থাকে না।
প্রতিবার তিন বা চারদিন পরে ভালো হয়ে যায় শরীর। অসুখ সেরে গেলে বিকেলের দিকে আস্তে আস্তে আব্বার কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম। আব্বার হাতলওয়ালা চেয়ারে হেলান দিয়ে। কাজ করতে করতে আব্বা বলতেন, কিতারে বিলাইর বাইচ্চা, কমছেনি? প্রতিবার একই ভঙ্গি, একই প্রশ্ন...। শহর সিলেটে আসার পর আর সেরকম হয়নি। বিকাল হলে আমি অপেক্ষায় বসে থাকতাম, কখন আব্বা আসবেন, কখন কপালে হাত দেবেন... আব্বার হাত এত নরম ছিলো...
জ্বর হলে লাকী আপা মাথার কাছে বসে কখনও কখনও গল্পের বই পড়ে শুনাতো। মনোয়ারা মঞ্জিলের খালাম্মা গ্লাস ভর্তি মাঠা নিয়ে এসে বলতেন, ‘ওই মাস্টরর পুয়া, কিতা ভঙ্গি ধরছত! সারা বাড়ি নিরাই ওই গেছে! জলদি ওঠ’। জেঠু নিয়ে আসতেন ছোট ছোট রসগোল্লা। সুধীর কাকাবাবু একবার দুটো কমলা নিয়ে দেখতে এলেন, অমৃতের মতো সেই কমলার স্বাদ এখনও লেগে আছে ঠোঁটে।
যে বিকেলে জ্বর সেরে যেতো। আস্তে আস্তে গিয়ে আব্বার চেয়ারের পাশে দাঁড়াতাম। কাজ শেষে আব্বা হাঁটতে বেরুতেন আমাকে নিয়ে। সবুজ উলের মাফলার জড়ানো থাকতো গলায়। কখনো নলজুড় কখনো কালনী নদীর পাড় ধরে হাঁটতাম। হাতের মুঠোয় আমার হাত নিয়ে আব্বা হাঁটতেন আস্তে আস্তে। খেলার মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় বন্ধুরা হাত তুলে ইশারা করতো। শেষ বিকেলের নরম আলো লেগে সেইসব মুখ জ্বলজ্বল করতো তখন। আমি হাসতাম। দূর থেকে রোদের বিপরীতে সেই হাসি দেখতে পাবার নয়, তবু তারা হাত নাড়তো... হাত নাড়া সেইসব বন্ধুদের বেশিরভাগের নামই আমার মনে নাই। জানা নাই তাদের ঠিকানা। জ্বর হলে এখনও তাদের কথা মনে পড়ে। এখনও সেই মাঠের পাশ দিয়ে, নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকি। আমার বুড়ো হাত আব্বার হাতের ভেতর চুপটি করে পড়ে থাকে। বন্ধুরা হাত নাড়ায়...
৮৮ সালের বন্যায় আমাদের নদী, পাড় ভেঙে বাড়িতে ঢুকে গেলো। টলটলে জলে সাঁতার কাটতে কাটতে দাদাভাই জ্বর বাঁধালো। ফ্লাড লেভেলের অনেক উপরে থাকা বাড়িটায় দুই আঙুল মাপের পানি। কোত্থেকে দুটো টাকি মাছ এসে ঢুকে পড়লো ঘরে। গার্লস স্কুলে বানানো রিলিফ ক্যাম্পে, কিংবা জলাধার হয়ে যাওয়া খেলার মাঠে মধুদার নৌকা নিয়ে এন্তার ঘুরাঘুরি শেষে বাড়ি ফিরে এলে দাদাভাই সেইসব মাছের নানা খেলার গল্প করতো। লেবুর পাতা দেওয়া জাউ খাবার গল্প করতো। আশ্চর্য, জ্বর হয়নি বলে আমার তখন রাগ লাগতো! তারপর, স্কুল থেকে মাখন স্যার খবর পাঠালেন ক্লাস করার। আশিক ভাই কোলে করে থানার পাকা উঠানে নিয়ে দিলে, জ্বরের উপর তীব্র অভিমান হয়। দাদাভাইর সাথে আমার একটু জ্বর হলে কী এমন ক্ষতি হতো! পানি ঠেলে ক্লাস না করে আমিও তো দুধ দেয়া সাগুদানা খেতে পারতাম শুয়ে শুয়ে!
হাম হলো বলে, সেবার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়। এম, ভি সাজু কিংবা কালনীর কাঠের সরু সিঁড়ি বেয়ে নামার আগেই দেখতে পাই আব্বা ঘাটে দাঁড়িয়ে। সাদা পাঞ্জাবি, চমৎকার করে লুঙ্গি পরা। মাথায় কিস্তি টুপি। ডিউটিতে থাকা পুলিশ কনস্টেবল বলেন, কী কাকা? শরীর ঠিক হইছে? মাস্টার সাহেব তো আলাইর ঘরের সব দই তুলে আনছে... আব্বার হাতের মুঠোতে হাত নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি মাথাটা তাঁর দিকে হেলিয়ে দেই। সন্ধ্যার পরে চাচী আম্মা দেখতে এসে বলেন, ‘তুমি এমন চিঠি লেখলা, ভাইসাবে কান্তে কান্তে চউখ ফুলাইলাইছইন!’ আম্মা অবাক চোখে তাকিয়ে বলেন, তুই চিঠি লেখলে কুনসময়?!?
জুতো খুলতে খুলতে বাবাই হাঁক দেয়, ও বাবা, জ্বর ছাড়ছেনিগো? ফ্যাসফ্যাসে গলায় জবাব দেই, এখন নাই। সিঁড়ি বাইতে বাইতে বলে, আবার উঠবো, প্যারাসিটামল খাইছনি? কপালে হাত রাখে। ছোট্ট একটা হাত, তুলতুলে নরম। পণ্ডিতের মতো বলে, অরেঞ্জ জোসটা খাও, ভিটামিন সি আছে। আমি হাসি... বাবাইকে বলা হয় না, ‘মধুমিতার দই খাইলে আমার জ্বর ছাড়ি দেয়। আমার আব্বায় অফিস থাকি বারইয়া আটি আটি চৌহাট্টা আইয়া দই কিনতা, এরপরে রিক্সাত উঠিয়া বাসাত আইতা...’

Tuesday, May 12, 2015

অনন্ত বিজয়

আপনার সাথে দেখা হয়েছে অনেকবার
অফিসে, রাস্তায়, ছাপাখানায়, মিছিলে
আপনি কথা বলতেন নির্ভয়ে, স্থিরতায়
আমার অপরিসর খুপড়িতে লাল চা
হয়েছিলো কোন একদিন, বাঁধাই ঘরের
সামনে দাঁড়িয়ে খুনসুটি করেছি, কার
কাজ আগে করানো যায় তার জন্য
তাড়া দিয়েছি মলাট মাল্লারকে
মিছিলে মিশে যাওয়া মুখে আপনি
ছিলেন, ছিলাম আমিও। চিৎকারে
অনভ্যস্থ আমাদের গলা ভেঙে গেলে
ফুটপাতের আদা চা’য়ে ভাগ বসিয়ে
সুমন’দার ঘাড়ে বিলের দায় চাপিয়েছি
সকলই গৌণ স্মৃতি, আমরা গৌণ মানুষ
আপনি বেঁচে থাকলে কোনদিন মনে হতো
না, এখন সেইসব মূখর সময়কেই বড় বেশি
মৌন মনে হচ্ছে। ভালো থাকবেন অনন্ত...

Monday, May 11, 2015

বুচ্ছি, আপনে কে সেইটা বুচ্ছি

কয়েকটা ছবিতে সয়লাব হয়ে গেছে ফেসবুক। এখানে একটা তুলে দিলাম। হু বিষয়টা দুঃখজনক। একটা মেয়েকে এভাবে পুলিশ নির্যাতন করতে পারে না। এর নিন্দা জানাই। কিন্তু এটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করার কোন মানে নাই। ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে, পুলিশকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের জন্যই কঠোর হতে হয়। আপনার এই ছবিটা দেখার পর কস্ট লাগবে, রাগ উঠবে, সেটাই হওয়া উচিত। আমারও হয়েছে। কিন্তু ইউ হ্যাভ টু এ তুকাতুকি মাইন্ড। আপনাকে তুকাতুকি, মানে খুঁজাখুঁজি করতে হবে।
ঘটনা কী ঘটেছিলো সেটা বের করতে হবে। তখন আপনারও, আমার মতো রাগ কমে যাবে। যেমন এই ছবিটার আগের ছবি। হ্যা ওটা আপনাকে খুঁজে বের করে দেখতে হবে। সেই ছবি এম্নি এম্নি আপনাকে কেউ দেখাবে না। এটাই হয়ে আসছে এখন। সবাই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। এজন্য এই মেয়েটি মার খাবার ঠিক আগে কী করেছিলো সেটা আপনার কাছ থেকে আড়াল করা হবে। আপনি জানেন এ কি করেছিলো? হু, এইবার ২য় ছবিটা দেখুন। এই অসভ্য মেয়ে পুলিশের গাড়িতে ফুলের টব ছুড়ে মেরেছিলো! একবার চিন্তা করেনতো বিষয়টা! এভাবে রাস্ট্র চলতে পারে বলেন? একটা মেয়ে, ফুলের টব ছুড়ে মারে পুলিশের গাড়িতে! এর পরেও পুলিশকে বসে থাকতে হবে? আপনি যদি সেটা বলেন তখন আপনার অবস্থান নিয়েই আমি সন্দেহ করবো। নিশ্চিতভাবেই আপনার মনের ভেতর কালা আছে।
আমার বুঝে আসে না, এক মুখে আপনারা কেমন করে দু রকম কথা বলেন। এই আপনারাই অভিজিৎ খুন হবার পর, পুলিশ কোন একশন করেনি বলে মাঠ গরম করে ফেল্লেন। এই আপনারাই পহেলা বৈশাখে কেনো পুলিশ কিছু করেনি বলে তাওয়া গরম করে ফেল্লেন। আর এখন, আপনাদেরই কথা মেনে যখন শান্তিপ্রিয় পুলিশ আজ, নিজেদের উপর হামলা ফেরাতে মৃদু বেত্রাঘাত করলো তখন হাউকাউ শুরু করলেন! নাহ আপনাকে নিয়ে, আপনাদের নিয়ে আমার ভেতরে একটা খটমটো তৈরি হয়ে গেলো আজ। আপনারা দেশের ভালো চান না, চাইতে পারেন না। আচ্ছা, গতবার কাকে ভোট দিয়েছিলেন বলেনতো, সত্যি করে বলবেন...
তারপর, এই যে আন্দোলন হচ্ছে, এটা নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন আছে। এই আন্দোলন কেনো হচ্ছে বলেনতো? পহেলা বৈশাখের সেই ঘটনার জন্যতো? ভাই, একটা প্রশ্নের উত্তর দেনতো, সরকার এই বিষয়ে তার অবস্থান জানাইছে কীনা বলেন? সরকার সেদিনের সেই ঘটনারে সাপোর্ট করছে বলে মনে করেন? এই ঘটনার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করেনাই? সেই খবর আপ্নে পান নাই? যদি পেয়ে থাকেন তাইলে কেনো এইসব আন্দোলন খেলা বলেনতো? সবকিছু নিয়া রাজনীতি না করলে হয় না? সরকার যদি এই বিষয় নিয়া কিছু না করতো, তখন আমিও আন্দোলনে নামতাম, সব বিবেকবান মানুষই আজ মাঠে থাকতো। কিন্তু সেটাতো হয়নাই। এইসব বেকামা দলের কাজই হইলো সুন্দর সুন্দর স্লোগান দেওয়া, কায়দা করে ব্যানার বানানো আর একটা অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করা। যদিও সেইটা তারা পারে না। তারপরেও ফালতু বিষয় নিয়া লাড়ালাড়ি করে। আরে ভাই, একটু সময় দিলে কী হয় আপনাদের? সরকারতো আসমানী শক্তি নিয়া দেশ চালায় না। তারে সিস্টেমেরে মাঝে চলতে হয়। সরকারের নানা কাজ আছে। কই কোন ভিড়ের মাঝে কয়কেটা মেয়ের শরিরে একটু ডলা লাগছে, সেইটা নিয়া যদি পড়ে থাকে সরকার তাইলে দেশ চলবে কেমন করে বলেন? মাঝে মাঝে বুঝলেন, খুব অবাক লাগে আপনাদের দেখলে, শত শত মানুষ পুড়ে মরে যায়, আপনারা কিছু বলেন না। আর একটামাত্র অভিজিৎ এর জন্য হায় হায় করে উঠেন। সাইধা গিয়া মেয়েগুলা ভিড়ের মাঝে ঢুকে সেইটা আপনারা দেখেন না।কোনখানের কে সেইটার সুযোগ নিছে, সেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়া দুনিয়া গরম করে ফেলেন। পুলিশ মাইয়ারে পিটাইতাছে সেই ছবি ফেইসবুকে শেয়ার করেন, অথচ এই মাইয়াটাই ফুলের টব ছুড়ে মারে পুলিশের গাড়িতে সেইটা বেমালুম চেপে যান।
ওহ, আরেকটা কথা, বিএনপি জামাত পুলিশে তাদের কয় হাজার ক্যাডার ঢুকায়া রাখছে এই হিসাবটা কখনো করছেন? জানি করবেন না। আফসুস...

Sunday, April 26, 2015

লড়কে লেংগে পাকিস্তান ও প্রথমালো

পাকিস্তান ও প্রথম আলো নিয়ে বিরক্তির শেষ নেই। বাংলাদেশ-পাকিস্তান এর চলমান ক্রিকেট সিরিজ নিয়ে পাকিস্তানপন্থী এই দৈনিক আর এর খেলার পাতা যেভাবে নগ্ন পাকিপ্রেম দেখাচ্ছে সেটা নিয়ে এই লেখাটা তৈরি করার পর দেখি সচলায়তনে ইয়ামেন এ বিষয়ে লিখে ফেলেছেন। এখন এই লেখাটার করবো কী? ফেলতেও মন চাইছে না। তাই নিজের ব্লগে টুকে রাখলাম।
পাকিস্তানপন্থী প্রথম আলো নিয়ে সচলায়তনে বিস্তর লেখা আছে। এরমাঝে সবচেয়ে বেশি মনেহয় এর খেলার পাতা নিয়ে লেখা। প্রথম আলোর খেলার পাতায় তাদের দেশ পাকিস্তান নিয়ে যত ম্যাৎকার করা হয় এই মাপের ম্যাৎকার সম্ভবত পাকিস্তানের কোন দৈনিকেও করে না।
সংবাদপত্রে খবর তৈরি করার একটা বিষয় আছে। এইটারে মলা বলতাম আমরা। মলা মানে ঘোটা। আটা-ময়দা দিয়ে খামির বা কাই বানানোর সময় ঘোটা দেওয়াকে সিলেটে মলা বলে। কখনও ভালো নিউজের সংকট হলে, পুরনো কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধরে একটা রিপোর্ট নামানোরে মলা বলতাম। টেবিলমেইড রিপোর্টও বলে সম্ভবত। প্রথম আলোর খেলার পাতার পাকিস্তান প্রেম এতই প্রবল যে, যখন পাকিস্তানের কোন খবর থাকে না, তখন এরা মলা দিয়ে খবর তৈরি করে। যেমন, মোহাম্মদ আমির বিলাত ভ্রমণে। বাবা হচ্ছেন শোয়েব মালিক... এরকম।
প্রথম আলোর পাকিস্তানপন্থী হবার মিছিলে যেমন যোগ্য নেতার মতো নেতৃত্ব দেন তাদের সম্পাদক মতিউর রহমান। খেলার পাতাতেও আছেন যোগ্য নেতা। তিনি সেই বিভাগের সম্পাদক, উৎপল শুভ্র। এই মানুষটার পাকিপ্রেম অসুস্থতার পর্যায়ে পড়ে। সে এতটাই অসুস্থ যে, নিজের দেশের বিপক্ষে খেলা থাকলেও সে পাকিস্তান পাকিস্তান বলে গলায় রক্ত বের করে আনে। চলমান সিরিজে সঙ্গত কারণেই যেটা মাতমে রুপান্তরিত হয়েছে।
এবারকার সিরিজ শুরুর আগে এরা যে প্রতিবেদন ছাপে সেটাতে আফ্রিদি, মিসবাহ, ইউনুস দলে নেই বলে যে মাতম করা হয়েছে এর সাথে তুলনা করতে হলে ইউটিউবে গিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট নিয়ে আপ করা সেদেশের ভিডিও দেখতে হবে আপনাকে। তারপরও সাচ্চা পাকিস্তানিদের মতো এদের আশাবাদের শেষ নেই। প্রথম আলো আশা করে, প্রতিভা প্রসবা দেশ পাকিস্তান দলে যারাই আছে তারাতো আর এমনি এমনি দলে আসেনি। এরপর প্রতিদিন এরা খুজে খুজে বের করেছে তাদের তুরুপের তাসদের। মাশরাফি কতবার আউট হয়েছেন সাইদ আজমলের বলে। কতটা বল খেলেছেন তখন। এমনকি মাথায় মাথায় যুদ্ধে জিতে গেলেও রক্ষা নেই। তাই অপরাজিত সেঞ্চুরি করার পরও মোহাম্মদ হাফিজ এর আগে কতবার কতো অনায়াসে আউট করেছেন তামিমকে, সেই গল্পটা শুনতে হয় পাঠককে।
আহা উহুর মাত্রাটা কত উপরে পৌছালে জয়ি দেশের সাংবাদিক হয়েও এরা, যেকোন স্কোরকেই বড় করতে পারার পৌরানিক গল্প মনে করে হা হুতাশ করে লিখে, পাকিস্তানের সেই সুনামটা ধুয়ে মুছে দিয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। আহারে সুনাম...
বাংলাদেশের খেলোয়াড়কে নিয়ে করা ফিচারে লাইনে লাইনে আসে তুলনা। সেটা সেই পাকিস্তান নিয়েই। ভাষাটা এমন, যেনো যতযাই হোক এর মতো নয় এরমতো নয়। তাহলেকি এরা তুলনা প্রতিতুলনা ছাড়া কিছু লিখতে পারে না? উহু, পারে। সেটার জন্য আফ্রিদী হতে হবে। তখন দেখবেন ওয়ানডেতে এই মহান ক্রিকেটার না থাকায় ওয়ানডে ক্রিকেটটা আর খেলাই থাকেনি! দেখবেন ওয়ানডে নিয়ে করা প্রতিবেদনে ধান ভানতে শীবের গীতের মতো টিটুয়েন্টির গল্প আসবে, আশাবাদ আসবে ২০১৬ এর টিটুয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে। কারণ ওটাতে যে আফ্রিদী খেলবেন, যেটাতে আবার তারা চ্যাম্পিয়নও হবে! হু প্রথম আলো সেই স্বপ্নই দেখে, দেখায়।
আগেই বলেছি পাকিলেহনের এই উৎসবের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন খেলার পাতার সম্পাদক উৎপল শুভ্র। তার প্রতিটি লেখায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। পাকিস্তানের সাথে টিটুয়েন্টি ম্যাচ জেতার পর এই শুভ্র যে লেখাটা লিখলেন, এর প্রতিটা লাইন পাকিবন্ধনায় ঋদ্ধ। লাইন ধরে ধরে কোট করতে গেলে পুরোটাই তুলে দিতে হবে। এই লেখাটা পড়ার পর আপনার মনে হতে বাধ্য যে, বাংলাদেশ ভুল করে জিতে গেছে। একেবারে অনুচিত, হিসাবের বাইরে একটা ঘটনা ঘটে গেছে। স্কিল টিল কিচ্ছু না, শুধু মনের জোর দিয়ে বাংলাদেশ জিতে গেছে। আর বলবেইনা কেনো? এতো জোর দিয়ে যখন তারা আগেভাগে বলে দেয় ‘আগামিকাল ভিন্নকিছু ঘটবেই’ আর তারপর যখন সেরক কিছু ঘটে না তখনতো এরকম কিছুই বলতে হবে। এই লোকটা কতবেশি পাকিস্তান প্রেমি তার এই লেখার একটা অংশ পড়লেই বুঝতে পারবেন... একটা অংশ বলছি কি? পুরাটাইতো সেরকম। একটা যায়গায় দেখা যায় এক কিশোর তাকে ফোন করেছেন খেলার বিষয়ে। সেখানে উৎপল শুভ্র বলছেন, বাংলাদেশ জিতবে এটা আশা করা যায় না, কারণ এই দলটা টিটুয়েন্টি খেলতেই পারে না! উৎপল শুভ্র লিখেন, "এই ম্যাচের আগের দিন দুপুরে একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর অনেক কথাই মনে গেঁথে আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এটি: আমরা পারব—ভেতরে এই বিশ্বাস থাকাটা খুব জরুরি। কথাটাকে শুধু ওয়ানডের জন্যই প্রাসঙ্গিক মনে করেছিলাম। মাশরাফির সঙ্গে কাটানো ঘণ্টা দেড়েক সময়ে সাক্ষাৎকারের বাইরেও কত কিছু নিয়ে কথা হয়েছে..."
হ্যা, পাকিস্থানপন্থী দৈনিক প্রথম আলোর ক্রিড়া সম্পাদক নির্লজ্জ পাকিলেহক উৎপল শুভ্র খেলার আগেরদিন প্রায় দেড় ঘন্টা আমাদের ক্যাপ্টেনের সাথে ছিলো। ছাপানো সাক্ষাৎকারের বাইরেও আরো অন্য অনেক কিছু নিয়ে সে কথা বলেছে। এই লোকটা চমৎকার লিখে। সম্ভবত সে কথাও বলে ভালো। সাথে আছে প্রথম আলোর মার্কেট ভ্যালু। তাই তার সাথে সব খেলোয়াড়েরই আলগা খাতির।
তো এরকম একটা মানুষ, যে বাংলাদেশ একটা দলকে হোয়াইট ওয়াশ করার পরও সেই দলটাকে নিয়েই বুদ হয়ে পড়ে থাকে। টিটুয়েন্টিতে বাংলাদেশ পারবেনা বলে শতভাগ নিশ্চিত লোকটা সারা দিনমান আফ্রিদি আফ্রিদি ম্যাৎকারে, লালায় নিজের লেখাগুলো পিচ্ছিল করে রাখে। আর শেষ মুহূর্তকাল পর্যন্ত আশা করে পাকিস্তানই জিতবে, এই যেমন ১৪১ করার পরও সে আশা করে বাংলাদেশকে ১০০ পেরুতে দেবে না তার পেয়ারা পাকিস্তান। তারে এভাবে বাংলাদেশ অধীনায়কের সাথে অবাধে কথা বলা নিষেধ করাকি উচিৎ না? এর মাধ্যমে দলের ভেতর ঋনাত্বক ভাবনা প্রবেশ করার শতভাগ সম্ভাবনা নিয়ে কেউ ভাববে না ক্রিকেট বোর্ডে? চোর-দুর্নীতিগ্রস্থ পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সাথে দহরম মহরম থাকা প্রভাবশালী এই সাংবাদিকের মাধ্যমে এমনকি পাকি জুয়াড়ির অনুপ্রবেশওতো হতে পারে!
দেশের স্বার্থে, ক্রিকেটের স্বার্থে, উৎপল শুভ্র নামের পাকিস্তানপন্থী সাংবাদিকটিকে বাংলাদেশ দল থেকে দুরে রাখার দাবী জানাচ্ছি।

Wednesday, April 1, 2015

প্রতিক্রিয়াসমূহ

০.
বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর। নাজিম হিকমতের কথা। হয়তোবা মানুষ ভুলে যায় এক বছরের মাথায় তার শোকার্ত সময়কে। কিন্তু একুশ শতকে শোকের আয়ু কত বছর, কত দিন? এই ফেসবুক জামানায়, যখন মিনিটে মিনিটে বদলে যায় হোম পেইজ, নিজের দেয়াল!
১.
আমাদের দেশে মানুষের জীবন কচু পাতার পানির মতো। টুপ করে ঝরে যায়। ক্ষমতার জন্য, শুধুমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্র দখলের জন্য রাজনীতির সাথে যোগাযোগহীন মানুষকে পুড়ে মরতে হয়। বিষয়টা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ সেটা মেনে নিয়েছে যেনবা।
২.
দল বেঁধে মানুষ যখন পুড়ে মরে। কিংবা আস্ত একটা ভবন যখন মানুষকে নিয়ে মাটিতে মিশে যায়, ডুবে যায় আস্ত একটা লঞ্চ। আমরা বেদনাহত হই। মানুষ হিসাবে মানুষের জন্য কেঁদে ওঠে আমাদের মন। কিংবা অজানা কোনো কারণে যখন খুন হয়ে যান সাগর-রুনি তাতেও মানুষের ভেতর প্রশ্ন তৈরি হয়, প্রতিবাদ তৈরি হয়।
৩.
দল বেঁধে এই মৃত্যুর মিছিলের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে ব্লগারের মৃত্যু। সাধারণ মানুষের সাথে বুঝিবা এর কোনো সম্পর্কই নেই। যেনবা এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মানুষ। এরা হঠাৎ করে মরতে শুরু করেছে। এদের কেউ প্রকৌশলী, কেউ ছাত্র, কেউ বেকার। এরা মরছে, আহত হচ্ছে খবর হচ্ছে। খবর হচ্ছে সে ব্লগার, তাই সে মরেছে, মরবে। ব্লগাররা মানুষ না।
৪.
৫৭ ধারার বলে আমি যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারি। আমার বন্ধুকে যেকোনো সময় আটক করা হতে পারে। এটি হয়েছে, হবেও। হত্যার হুমকি ফৌজদারি আইনে অপরাধ। ৫৭ ধারার প্রয়োগ আছে কিন্তু হত্যার হুমকি দিলে কিছুই হয় না। তাই আহমদ শফী ঘোষণা দেয় নাস্তিকদের মেরে ফেলা যাবে। নাস্তিকরা খুন হতে থাকে। এর আগে এই শফী মাওলানাই বলে দিয়েছে ব্লগাররাই হচ্ছে নাস্তিক। আমাদের দেশে তাই ব্লগার ও নাস্তিক এখন একটি সমার্থক শব্দ। মরতে থাকো।
৫.
রাষ্ট্রকে তার নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু মন্ত্রী অনেক আগেই বলে দিয়েছেন শোবার ঘরে গিয়ে কাউকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। এর আগে অন্য মন্ত্রী বলেছিলেন, আল্লার মাল আল্লায় নিয়া গেছে... যদিও রাস্তায় কোপ খেয়ে মরে যাবার বিষয়ে কিছু বলা হয় নাই, তবু সমীকরণ মিলিয়ে ঝিম মারতে হবে। মানুষ মরুক। মরতে থাকুক।
৬.
আওয়ামীলীগ আমার ভোটে সরকার গঠন করেছে। প্রগতিশীল মানুষ এই দলকে সমর্থন দেন। দলটি এবং এর নেতৃত্বাধীন সরকার সেই ভোটের অবমাননা করেছে। বিশ্বাসকে নষ্ট করেছে। মুক্তচিন্তা এবং প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে তাদের নানা পদক্ষেপের দায়ভার দলটিকে নিতে হবে। এবং সবচে বেদনার হলো, মুক্তবুদ্ধির মানুষদেরকেই এই দলটির অপ-রাজনীতির খেসারত দিতে হবে।
৭.
মানুষ মরবেই। কোপ খাবেই। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। বাবু নামের স্বল্প পরিচিত ব্লগারটি মরে এই সত্য প্রমাণ করে দিয়ে গেলেন। আপনি চলমান প্রক্রিয়ার বাইরে চিন্তা করেন। আপনার বলবার অনেক কথা আছে, মাঝে মাঝে সেটি বলেও ফেলেন তাহলেই হলো। মৃত্যুর জন্য, খুন হবার জন্য আপনি যোগ্যতম ভেবে নিন নিজেকে। তাই বলি, মরতেই যখন হবে, ভালো করে মরি। যা বলার, যেটুকু বলতেই হবে, বলে যাই। এই সময়ে হয়তো এর কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না। কে বলবে, আগামী পৃথিবীতে হয়তো এই বলে যাওয়া কথাটা মূল্য পেলেও পেতে পারে। আর নাইবা যদি পায়, তাতেই কী? বল্লাম তো...
৮.
আপনি মানুষ হলে আর কখনো হিজড়াদের নিয়ে ফাইজলামি করবেন না আশা করি।

Wednesday, March 25, 2015

অপ্রস্তুত ব্লগরব্লগর

কয়েকদিন আগে ফেসবুকে কেউ একটা গান শেয়ার দিলেন। চকমকে শাড়ি পরা এক নারী গান গেয়ে, মোবাইলে রেকর্ড করে আপ করেছিলেন। সেই গান ঘুরছে এর তার দেয়ালে। গানের গুণে নয়। শিল্পী এখানে মূল লক্ষ্য। মজা হচ্ছে সেটা নিয়ে। মিনিটখানেক শুনে নিজেও তাতে যোগ দিলাম। আমার এক বোন তার ‘প্রেন্ড’ হবার আগ্রহ জানিয়ে স্টেটাস দিলো। শব্দটা দেখে বুঝলাম এরকম কিছু একটা উচ্চারণ করেছেন তিনি। তার ফেসবুক একাউন্ট বের করলাম। তারপর হু হু করে উঠলো ভেতরটা...
খুব কাছের মানুষজন বিদেশে থাকেন। সিলেটি হিসাবে বিলাতে থাকেন বড় একটা অংশ। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে। যারাই যেখানে থাকুন, বিলাতের নতুন প্রজন্ম ছাড়া প্রায় সবাই শ্রমিক। কারখানা-রেস্টুরেন্ট হয়ে সেখানকার প্রজন্ম মোটামুটি একটা স্থির অবস্থানে পৌঁছেছেন। কিন্তু যারা মধ্যপ্রাচ্যে আছেন, তাদের কষ্টের জীবন।
খুব কাছে থেকে সেইসব মানুষদের দেখেছি। কঠিন, কঠোর পরিশ্রম করা একেকটা প্রিয় মুখ আমার। তাঁদের চিঠির ভেতরের দীর্ঘশ্বাস, তাঁদের বাড়ি ফেরার আকুতি, দীর্ঘ বছর কষ্টের কাজ করে বিধ্বস্ত শরীর এবং মন নিয়ে ফিরে আসা সেইসব মানুষকে নিয়েই আমাদের পরিবার। এই জীবনের কথা, কষ্টের কথা জানা ছিলো। একটা ধারণা তৈরি হয়েছিলো গল্প শুনে, পত্রিকা বা টিভি দেখে। কিন্তু সেই জানা আর গল্প যে কিছুই না। বাস্তব যে আরো কঠিন, কঠোর সেটা জেনেছি অনেক পরে।
বাহরাইনের মানামা বিমানবন্দরের ভেতর নির্মাণকাজ চলছিলো। সবকিছু উল্টাপাল্টা অগোছালো হয়ে আছে। মধ্যরাত। আম্মা চা-কফি কিছু একটা চাইলেন। কোথায় পাবো সেটা বুঝতে পারছি না। কোনো সাইন নেই, কাউকে জিজ্ঞেস করবো সেটাও পাচ্ছি না। হঠাৎ একজন ছোটখাটো মানুষ সামনে এলেন। হাতে মেঝে পরিষ্কার করার সরঞ্জাম। দেশি সম্বোধন করে আধা আঞ্চলিক উচ্চারণে তিনি বললেন, কোনো সাহায্য লাগবে কি না। সেই প্রথম গরিব বাংলাদেশ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। দেশি, ছোট্ট একটা শব্দ। কথিত শহুরে মানুষের জন্য আনস্মার্ট হয়তবা। কিন্তু বুকে টোকা দিলো। পরের প্রায় মাসাধিককাল এই শব্দটা ঘুরেফিরে শুনেছি। আপ্লুত হয়েছি, বেদনায় নীল হয়েছি, আক্রান্ত হয়েছি তীব্র লজ্জায়।
বড় বিপণীবিতানের মেঝে মোছা, ডাস্টবিন পরিস্কার করা কিংবা অন্য যেকোনো কাজ, যাকে শিক্ষিত প্রবাসীরা অড জব বলেন, সেটা দেশের বিশাল সংখ্যক মানুষই করেন। বাড়িতে, অফিসে, রাস্তায়। রিকশা নামের পাশবিক একটা যানবাহনে চড়ে আমরা অভ্যস্ত। আলাদা কোনো ভাবনা তৈরি করে না। কিন্তু মধ্যরাতের সেই দেশি ভাই আমাকে কাতর করেন। যদিও এর ঘণ্টাকয়েকের মাঝেই তাকে অনেক বেশি ভাগ্যবান বলে মনে হয়েছে আমার। সপ্তা পেরুবার আগেই মনে হয়েছে তিনিই প্রবাসে সবচেয়ে ভালো থাকাদের একজন। ততদিনে আমি দেখে ফেলেছি হলুদ কাপড় পরা সৌদি আরবের বলদিয়া বা পৌর কর্তৃপক্ষের কর্মীদের। যাদের সবচে বড় অংশ আমারই ভাই, বন্ধু, পরিজন।
সব মানুষের কিছু অক্ষমতা থাকে। বেদনাকে বোনের মতো যদিও ভালোবাসি, সাথে রাখি বন্ধুর মতো। কিন্তু সবকিছু বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নাই। আমার দেশকে পরিশ্রমে নুয়ে পড়তে দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরমে, সৌদি আরবের বর্বরদের নির্যাতনে কাতর বাংলাদেশকে দেখেছি সেখানে। মক্কায় একে সত্তুর নেকি মেলার গল্প জানি। তার হিসাব আমি রাখি না। রাখা হয় না। কিন্তু তার পথে ও প্রান্তরে ছড়ানো ছিটানো দেখি খাবারের স্তূপ। যাতে আমার ভায়ের শ্রম লেগে আছে, লেগে আছে তার রক্ত। আনোয়ার নামের এক পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সাথে পরিচয় হয়। প্রায় প্রতি বিকালে দেখা হয়েছে। খাবার ভাগ করে খেয়েছি। কখনোই মনে হয়নি, মধ্যবিত্তসুলভ এসব খাবার তিনি নিয়মিত খেতে পারেন।
হোটেলের বেয়ারা ছিলেন একজন। আলাউদ্দিন ভাই। সুনামগঞ্জে বাড়ি। ভয়ঙ্কর সব গল্প করতেন। অবলীলায় বলে যাওয়া সেসব গল্প শুনে আম্মার সে কী কান্না। ফেসবুকে-ইউটিউবে সৌদি শেখদের হাতে নির্যাতনের যেসব ভিডিও মাঝেমাঝে দেখতে পাই আমরা, সেইসকল গল্প। কী অমানবিক-পাশবিক সেইসব ঘটনা। মানুষ হিসাবে নিজেরে বড় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ মনে হতো তখন। কান্না পেতো দেশের জন্য।
ঢাকার বস্তি দেখে অভ্যস্ত চোখ। তবু শিউরে উঠেছি শ্রমিকদের থাকার জায়গা দেখে। বস্তিতে যেকোনো সময়, যে কেউ ঢুকতে পারে। থাকতে পারে। এই স্বাধীনতাটুকুও নাই সেখানে। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে সেখানে যাবার জন্য। লম্বা লম্বা শেড। একেকটা রুমে তিনতলা খাট পাতা রয়েছে ৪টা করে। মাঝখানে হয়ত কোনোমতে দুটো টি-টেবিল রাখার মতো জায়গা আছে। আশেপাশের রুম থেকে দেশি কুটুমের সাথে বুক মেলাতে আসে একেকটা বাংলাদেশ। আমি নুয়ে পড়ি, লজ্জিত হই, অক্ষমতায় কুঁকড়ে যাই। বাটি ভরে একেকজন একেকটা তরকারি নিয়ে আসেন। মোটা চালের ভাত বলে নয়, বেদনায় ভারী হয়ে সেই খাবার আমার গলায় দলা পাকায়... রাতে ফিরে এলে আম্মা জিজ্ঞেস করেন, কী দেখে এলে? উত্তর দিতে পারি না। নবী হোসেনের কণ্ঠ কানে লেগে আছে, ভাই, বাড়িত গিয়া এইসব গল্প বইলেন না। আম্মায় কষ্ট পাইবো...
পারভীনের গান শুনতে গিয়ে যতটা মজা লাগে, গানের শেষে তার বলা কথায় সেইসব ধুয়ে মুছে যায়। ৩ বছর আগের সেই হুহু করা সময়টা ফিরে আসে আবার। পারভীন বলেন, তিনি সৌদি আরবে থাকেন। তার গান গাওয়ার বড় শখ ছিলো। পরিবার সামলাতে গিয়ে সেই শখ ডানা মেলেনি। কাজ করে অবসর সময়ে তাই গান গেয়ে ফেসবুকে দেন। আট বছর ধরে তিনি দেশে আসেননি। মন খারাপ হলে গান করেন। যারা তার গান শুনেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানান... তার কোনো ক্ষতি যাতে কেউ না করেন সেই নিবেদন করেন। সহজসরল তার বাক্যগঠন। শহুরেদের জন্য একটু ভদ্রস্থ করতে গিয়ে সেই ভাষা হয়ত কিছুটা হাস্যকর হয়ে উঠে। নীল সামিয়ানার নিচে বসে তিনি গাইছেন, কথা বলছেন। খেয়াল করে দেখি সেটা সামিয়ানা নয়, শাড়ি। দোতলা খাটের রেলিংয়ে শাড়ি বেঁধে তার নিচে বসে গাইছেন। এ কোনো আয়োজন নয়। খাটের কোনায় জমে থাকা পুঁটলিটা, মেলে দেয়া কাপড়টা আড়াল করেছেন এই শাড়ি দিয়ে। আমি দেখে এসেছি তার ঘরে এই খাট ছাড়া, খাটের মাপের বাইরে আর কোনো নিজের জায়গা নেই নিজের জন্য। সিথানে মূল্যবান যা কিছু, হয়ত দুটো টাকা, কিছু গহনা, সেসবের পোঁটলা। গাট্টি বানিয়ে কাপড়চোপড় রেখেছেন পায়ের কাছে... সবই আমার দেখা...
শেষাংশ
উপরের লেখাটুকুন গান শোনার পরপর লিখেছিলাম, আগাতে পারিনি। এসব লেখার জন্য যে শক্ত মন দরকার, কলমের যে জোর দরকার, তার কোনটাই আমার নাই। এটা ব্লগে দেবারও কোনো ইচ্ছা ছিলো না। আজ হঠাৎ করে দেখি তৃষিয়া ইউটিউব থেকে উনার গান আবার শেয়ার করেছে। পারভীনের সাথে আলাপ করতে চাচ্ছে। তাকে ফেসবুক লিংক দিতে গিয়ে আর খুঁজে পাই না। মনে হলো, তিনি আর ফেসবুকে নেই। বাঙ্গাল ফেসবুকারদের মাঝে টিকে থাকা হয়ত সম্ভবও হয়নি। পরে দেখলাম, উনি ফেসবুকে আছেন। তার যে গানের লিংকটা কপি করে রেখেছিলাম, সেটা কোনো কারণে হয়তো মুছে দিয়েছেন। তাই পাচ্ছিলাম না। আধা ঘণ্টা পরে, এখন ডেস্কটপ থেকে সার্চ দিয়ে পেলাম। সম্ভবত আমার ল্যাপটপে কোনো সমস্যার কারণে সার্চ করে পাইনি।
আপনি ভালো থাকবেন পারভীন। ক্ষমা করবেন আমাদের।

Friday, February 27, 2015

কসাইদের করতলে নিজেদের সঁপে দিলাম

জানি, নিশ্চিত করেই জানি এখানেই থেমে যাবে সবকিছু। কিচ্ছু হবে না। কিচ্ছু হয়না এখানে। এই অন্ধকারে, বদ্ধ আবহে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো অবশিষ্ট থাকবে না আর কোনো বিশুদ্ধ বাতাস। প্রতিবার কিছু বোকা মানুষ তড়পাবে, কাঁদবে, মুষ্টবিদ্ধ হাত উপরে তুলে প্রতিবাদ করবে... তারপর সেই যুথবদ্ধ কণ্ঠের মাঝ থেকে সবচেয়ে তীব্র কণ্ঠটাকেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে।
অমোঘ কোনো গাণিতিক নিয়মের মতো। রক্তপিপাসু মধ্যযুগ বারবার আঘাত হানবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, মতিহারে। শত্রুর ঠিকানা জানবে মানুষ। চিনবে শত্রুকে। তারপরও সেই শত্রু থেকে যাবে অধরা। নিয়মিত তার কাজ করে যাবে, রাষ্ট্র তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না।
২০০৪-এর ২৭ ফেব্রুয়ারির সাথে ২০১৫'র ২৬ ফেব্রুয়ারির কোনো পার্থক্য নেই। ২০১৩’র ১৫ ফেব্রুয়ারির সাথে একাকার হয়ে আছে ২০০৪-এর ২৪ ডিসেম্বর। প্রতিটি ঘটনার একই কায়দা। খুন হয়ে যান হুমায়ুন আজাদ, অধ্যাপক ইউনুস, রাজীব হায়দার, অধ্যাপক শফিউল, অঞ্জলী দেবীরা। পত্রিকা, উড়ো চিঠি আর ভার্চুয়াল পৃষ্ঠায় তালিকা টানিয়ে আমার ভাই-বন্ধুর মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়। সেই তালিকা ধরে খুন হই আমরা। তবু উল্টো পক্ষের কোনো তালিকা হয় না। কেউ ধরা পড়ে না। কেউ কেউ ধরা পড়ে বুক চিতিয়ে কসাইবৃত্তির কথা বলেও থেকে যায় বহাল তবিয়তে। আমাদের লেখা বই নামিয়ে দেওয়া হয় দোকানের তাক থেকে। বইয়ের দোকান বন্ধ করে দেয় বাংলা একাডেমী। ফারাবীদের কথায় ওঠে-বসে বাংলাদেশ। ফারাবীর জন্য ৫৭ ধারা নাই, রাসেল পারভেজদের জন্য আছে।
আমাদের বহুল পঠিত পত্রিকা প্রথম আলো পাকিস্তানকে ভালোবাসে। আমাদের চিন্তকেরা দুর্বৃত্ত ফরহাদ মজহারকে দার্শনিকের আসনে বসিয়ে পূজো করে। বাতিল হয়ে যাওয়া নষ্ট আল মাহমুদ তাদের প্রিয়তম পদ্যলেখক।
সঙ্কুচিত হয়ে আসছে বাঙালির চিন্তার ক্ষেত্র। দেশে দেশে গড়ে ওঠা কালো পতাকা আর মুখোশের মুখ ঘন হয়ে উঠছে আমাদের জনপদে। আমরা পেছনে হাঁটছি। আমরা হাঁটছি মধ্যযুগের পথে। আমাদের কোনো অভিজিৎ চাইনা। আমাদের দরকার নেই কোনো হুমায়ুন আজাদের। মুক্তবিশ্বে এখন থেকে আমাদের পরিচয় হয়ে ভেসে উঠবে রক্তাক্ত হুমায়ুন আজাদের ছবি। বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে অভিজিৎ-এর লাশ। কসাইদের করতলে নিজেদের সঁপে দিলাম।