Monday, November 30, 2009

কয়েকছত্র প্রান্তিকপত্র

প্রান্তিক নিয়ে এতো লেখা হয়! ঘুরে ফিরে এই জায়গাটার কথা আসে। আসে স্বপনের চায়ের দোকানের কথা। সুনামগঞ্জের উদার হাওর আমার জীবনে যেমন জড়িয়ে আছে জননীর ওমের মতো, প্রান্তিকও বুঝি তেমনটাই!

বালক বয়েসে মেলায় যেতাম। কৈশোরে গেলাম নাটকের ঘরে। স্কুলঘরের মতো টিনের চালের ঘরটা কোন ফাঁকে এমন মায়ায় জড়ালো? কোন ফাঁকে মিশে গেলো এমন জীবনের গল্পে?

সেভাবে আমার সাথে প্রান্তিকের সম্পর্ক হওয়ার কথা ছিলো না। নিতান্তই এক কর্মী হিসাবে আমি সেখানে ছিলাম। কোনো গরম গরম ভাবনা ছিলো না মাথায়। দেশ সমাজ পাল্টে দেয়ার ধারণা নিয়ে সেখানে যাইনি। মঞ্চে উঠে কাঁপিয়ে দেবো, ফাটিয়ে দেবো তেমনটাও মাথায় ছিলো না। সম্ভবত জেনেটিক কারণে গিয়েছিলাম সেখানে! (এই জিন জিনিসটা কি???) বাপ এইসব করতেন বলে শুনেছি। ভাই আমার ঠিক আগে আগে সেখানে গিয়েছে।

এই জিন ভূত ছাড়া আর কি ছিলো তবে? সম্ভবত আড্ডা। সম্ভবত মানুষের টান।

প্রান্তিকের ভাঙা টিনের চালের নিচে এ নাটক করছে, তো ও করছে আবৃত্তি, আরেকজন হয়তো গান তুলছে গলায়... কী সরগরম সেখানে। তুমি যাও, মিশে যাও। মিশে যাও আনন্দ নগরে।

রাস্তার একদিকে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল, আরেকদিকে প্রান্তিক। প্রথম-প্রথম হোস্টেলের সামনের দোকান থেকে চা আনতে হতো। নাট্যকর্মী হওয়ার কঠিনতম পরীক্ষা শুরু হতো এই চা এনে। ফ্লাস্ক হাতে নিতে নিতে অনেকদিন শুনতে হয়েছে, যাও, এখনতো ফ্লাস্ক পাচ্ছো, আমরা কেটলি দিয়ে রিকাবীবাজার থেকে চা আনতাম! তবে সেই পরীক্ষা বেশিদিন দিতে হয়নি। স্বপন একটা চা এর দোকান খুলে বসলো বারান্দায়। প্রান্তিক তার পূর্ণতা পেলো বুঝি এই চায়ের দোকানের মাঝ দিয়ে।

নাটকের ঘরে কী হত? কথাকলি শুধু নাটক করতো না। কবিতা, গান সবকিছুই ছিলো সেখানে পাঠ্য। আমি নিতান্তই বেসুরা মানুষ। বাপ কি সাধে অসুর বলে ডাকে? আমি বসে বসে সেইসব জিনিসপাতি দেখি। গানের দলে লোকজনের পেছনে বা কবিতার কোরাসে মাঝে মাঝে শেষ মানুষটা হয়ে বসে থাকি। এ এমনি এক বসে থাকা যে, না বসলেও কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না কারো। এই করে করে আধা যুগ পার করেছি হে...

আমি এ ঘরে যাই, ও ঘরে যাই। প্রান্তিকের উঠানে পাঠক ফোরাম পরে বন্ধুসভার আড্ডা হয়। সেখানে গিয়ে বসি। কেউ চা খেলে, পাশে বসে থাকলে এক কাপ জুটে যায়। এই করে করে বেশ ছিলাম।

প্রান্তিকে যাওয়ার আরেকটা কারণ হলো, পাকে চক্রে যে কয়টা বন্ধু জোগাড় হয়েছিলো (এইটাও একটা আজব ঘটনা, অন্তত আম্মার কাছে, আমার বন্ধু হতে পারে এটা তিনি এখনও সেভাবে বিশ্বাস করেন না) সবকটাই এখানে আসতো। এক ঢিলে আসলে অনেক পাখিই মারা হতো সেখানে। নাটক হলো, কবিতা হলো, আড্ডা হলো, বন্ধু হলো, গুল্লি হলো, মাল হলো, কুলখানি হলো... কতো কতো হলোরে!

প্রান্তিকে আমরা কেউ সাইকেল চালিয়ে যেতাম, কেউবা মোটর সাইকেল করে। কেউ যেতো রিক্সা চড়ে আর কেউ কেউ পায়ে চড়ে। রাতে বাড়ি ফিরতে গেলে এ তাকে ও একে দিয়ে আসতো বাড়িতে। পরিচিতরা কোন কারণে আমাদের দরকার পড়লে সোজা প্রান্তিকে চলে আসতেন। এমনকি একবার আমার মা, অসুস্থ মামাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার আগে সোজা চলে এসেছিলেন প্রান্তিকে। কথাকলির রুমে একটা ইম্প্রোভাইজেশনের কাজ চলছিলো। সেখানে কোরাস থেকে প্রশ্ন আসছে কেমন আছেন... কেমন আছেন... বাইরে থেকে উত্তর আসলে, তোমরা কেমন আছো জানি না, তোমাদের মা ভালো নাই!!! মামাকে ডাক্তার দেখানো থেকে হাসপাতাল সবকিছুই করা হলো, করে দিলো কথাকলি'র মানুষজন। আমাদের জননীরা এমনি নিশ্চিত থাকতেন প্রান্তিক নিয়ে, এমনি নির্ভরতা ছিলো কথাকলি নিয়ে। (এখনও আছে)। আবারো বলি বেশ ছিলাম আমরা।

গত মাসে একজন রক্ত দরকার বলে ফোন করলো। টুকুদাকে ফোন দিলাম আমি। মিনিট পনেরোতে ব্যবস্থা হয়ে গেলো। রক্তের এই ব্যাংকটা প্রান্তিক থেকেই গড়ে উঠেছে। বিষয়টা এমন পর্যায়ে ছিলো যে, অনেকেই জেনে গিয়েছিলো সেটা। রক্তের দরকার হলে সন্ধানীর কাছে না গিয়ে প্রান্তিকে হাজির হতো!

এইভাবে টুকরো টাকরা গল্প বলতে থাকলে বিশাল একটা কিছু দাঁড়িয়ে যাবে। সেটা করে লাভ কি? নাই, কোনো লাভ নাই। তাই একদিন হুট করে প্রান্তিক ভেঙে পড়ে, না ভেঙে পড়ে না, তারে চুরমার করে দেয়া হয়। ইঁট-কাঠের নির্মাণটা টুকরো টুকরো হয় আর সাথে আমাদের হৃদয়।

এই একটা ঘটনা সিলেটের সাংস্কৃতিক আন্দোলনরে কতটা নিয়ন্ত্রণ করেছে আর কতোটা পিছিয়ে দিয়েছে তার হিসাব দেয়ার ক্ষমতা আমার নাই। আমি শুধু আমারটাই জানি। আমি জানি এরপর থেকে রোজ বিকালে বসার একটা জায়গার জন্যে আমরা হন্যে হয়ে ঘুরেছি। নাটকের রিহার্সালের জন্যে একটা ছোট্ট খুপড়ি খুঁজতে খুঁজতে সিনিয়াররা ক্লান্ত হয়ে গেছেন। আমরা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়েছি, বিচ্ছিন্ন হয়েছি, একজন আরেকজনের কাছে শুধুই পরিচিত একজন হয়েছি...

আবার যখন ২০০৮ এ কথাকলি হাঁটি হাঁটি পা পা করে পুনর্যাত্রা করলো, তার আগে আমাদের অনেক কিছু বদলে গেছে। আমাদের কেউ এখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড়কর্তা, কেউ বড় ব্যাংকার, শেয়ারের বাজারে কারো কারো দেদার ইনকাম, শহরের কেউকেটা ঠিকাদার সেও আমাদেরই ঘরের মানুষ। বিকাল চারটায় রিহার্সাল, তাই সবকিছু ফেলে রেখে, সে হোক চাকরি, দোকানদারী বা প্রেমিকার সাথে ডেটিং... সব ফেলে রেখে আসতে হতো। চারটার পরে ২/১ মিনিট দেরি হলেও রুমে ঢোকা যেতো না। কোনদিন ঢুকে পড়লেও চোরের মতো বসে থাকতে হতো। সেইসব দিন আর নাই। এখন রিহার্সালের সময় দিতে হলে আগে কথা বলে নিতে হয়। আমাদের কেউ যাই সাতটায়, কেউ যায় সাড়ে সাতে আর কেউবা আটটায়। তাও সেটা যে নিশ্চিতই হবে তাও নয়। পাঁচ মিনিট আগে কিংবা একেবারে না জানিয়েও এখন আমরা অনুপস্থিত থাকতে পারি! ডিরেক্টর বসে থাকেন, আমরা আসি না! জীবন আমাদের এমনই ভাড়ুয়া বানিয়েছে অথবা নাটক আমাদের আর সেভাবে বুঝি টানে না!

পায়লট এর আসল নাম কি? না কেউ বলতে পারবে না। প্রান্তিকের কোন মানুষই সেটা জানে বলে মনে হয় না। যে কথাকলির মেম্বার সে, তারাই জানে না! হ্যা পায়লটের নাম আমরা কেউ জানি না, তাকে সবাই পায়লট ডাকে। স্টেডিয়াম মর্কেটের একটা ফ্রিজের দোকানের ঠেলা চালাতো সে। বয়েসী মানুষ। মাঝে মাঝে তাকে দিয়ে সেট বা এটা সেটা টানানো হতো। এখনও আমার চোখে ভাসে, পায়লটকে টানা হ্যাচড়া করছে শিপন, অডিটোরিয়াম নিয়ে যাবার জন্যে। আগের রাতে নাটক হয়েছে। সেট পড়ে আছে, সেগুলো প্রান্তিকে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু পায়লট যাবে না। নাটকের মাল টেনে পয়সা বেশি পাওয়া যাবে না। রিতিমতো চিল্লা ফাল্লা করছে সে। স্টেডিয়ামের দিকে পেতে রাখা স্বপনের বেঞ্চে বসে বসে আমরা মজা দেখছি। ফোড়ন কাটছি, জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে শিপন আর পায়লট আরো চেতছে। সম্ভবত ঠেলা ড্রাইভার হিসাবে তাকে পাইলট বলে ডাকা হতো ঢং করে, পরে সেটা পায়লট হয়ে যায়। এই কাজটা প্রান্তিকেরই করা অসংখ্য পুঙগাম্যানশনের একটা। তো সেই পায়লট কোন ফাঁকে ফ্রিজের দোকান ছেড়ে কথাকলির রুমে ঢুকে গেলো সেটা আমি অন্তত খেয়াল করিনি। আমাদের বাড়িতে কিভাবে সে ঢুকেছে তাও খেয়াল করিনি কেউ। শহর থেকে ৮ কিলোর বেশি দুরের গ্রামে থাকা আমার বাড়ি অব্দি সে এসে পড়ে। আব্বা, আম্মা সবার সাথে তার প্রবল খাতির। নাটক করতে লন্ডন যাওয়ার মতো অসম্ভব স্বপ্নের কথাও সে আব্বার সাথে গল্প করে!

প্রান্তিক ভেঙ্গে গেলে, তারও পরে স্বপন শহর সিলেট থেকে গ্রামে চলে গেলে কিংবা মরে গেলেও সেভাবে আমরা চায়ের অভাব অনুভব করি না। কারণ পায়লট আমাদের সাথেই থাকে। এখন যারা নাটক করতে আসে তাদেরকে ঘর ঝাড় দেয়ার কথা বা চা আনতে বলার মতো অবস্থা আর নাই। তাছাড়া আমাদের স্থায়ী কোন বসারই যায়গা নাই। তাই এসব কাজের জন্যে আমাদের আছে পায়লট। সে জানে কে কোন পান খাবে, চায়ের রং জানে সে, জানে সিগারেটের ব্র্যান্ড।

রিহার্সাল থাকুক বা না থাকুক প্রান্তিকের রুমগুলো সরগরম থাকতো। এখন সেরকম কিছু নেই। আমার মতো একেবারেই একলা মানুষ যারা আছে দু একজন। যাদের শেষ পর্যন্ত কোন বন্ধুতাই আর টিকে থাকে না। তারা সন্ধ্যার আবছায়া মিলিয়ে গেলে জড়ো হই পংকী ভাইর দোকানে। সে দোকানের কয়েকটা চেয়ার আমরা দখল করে চা গিলি, পান চিবুই, সিগরেট টানি। আর মাঝে মাঝে রিহার্সাল থাকলে চেয়ে চিন্তে ভিক্ষে করে পাওয়া মদন মোহন কলেজ কিংবা স্টেডিয়ামের কোন রুমে বসে গেজাই।

মাঝখানে কিছুই ছিলো না। এখন একটা দুটো করে সংসার আবার জুড়ছে আমাদের। হারমোনিয়ামটা টিকে ছিলো। নতুন করে বানাতে হয়েছে নাল, ঢোল আর একেবারেই নতুন যোগ হলো নাকাড়া। কর্তাল, মন্দিরাও জোগাড় হয়েছে। সবকিছু টানা হ্যাচড়া করে আমরা একবার যাই মদনে, তো আরেকবার যাই স্টেডিয়ামে। দু যায়গাই যখন হাতছাড়া হয়, তখন পায়লট সেসব নিয়ে যায় লিটন ভাইর বাসায়, আর আমরা আবার আসর পাতি পংকী ভাইর দোকানে। রিকাবী বাজার পয়েন্টে আবার হৈ হৈ জমে উঠে। যে আমরা চেয়ে চিন্তে চায়ের বিল জোগাড় করতাম, সেই আমরাই এরে তারে চা গিলাই। আর বিল দেয়ার সময় অবাক হয়ে দেখি আমাদের মাঝে সবচে ছোট যেজন, নয়ন (কলেজে সবে ভর্তি হয়েছে), সে বিলটা আগেই দিয়ে দিয়েছে!!!

কথাকলি কিংবা প্রান্তিকের রুমে ম্যাট বিছানো থাকতো। সেখানে ছড়িয়ে বসে, শুয়ে আমরা তাল ঠুকতাম আর অন্য কেউ একজন ধরতো গান। এখন সেটা হয় না। আমরা চেয়ারে সাহেব হয়ে বসি। আমাদের নরোম কাপড়ের দামি প্যান্ট যাতে নষ্ট না হয়, জুতোর পালিশটা যাতে ঠিক থাকে সেটা সবসময় খেয়াল রাখি। শামীম ভাই মুড ভালো থাকলে গান ধরে। চেয়ারে বসে বসে আমরা মাথা দুলাই, মাঝে মাঝে গলা মিলাই। মোবাইল ফোনে কথা বলি, এস এম এস পড়ি... আমাদের বিন্যস্ত করে কাটা চুল, আমাদের পরিপাটি শার্ট, তার কলারের নিচে বাঁধা টাই...। মাথা দুলাই তবু আর সেই ভাব আসে না।

প্রিয় প্রান্তিক, আমরা আর ভালো থাকি না সম্ভবত...


Tuesday, November 24, 2009

বড় লোভ হে ...

বাবার সাথে উপজেলা সদরে ঘোরার কালে আমি নিতান্তই বালক ছিলাম। থানার ভেতরে ছিলো সেসব বাড়ি।

সফেদ পাঞ্জাবী পরা পোষ্টমাস্টার বাবার ছেলে আমি অনেকবার থানার বাবুদের বাড়ির রঙিন উৎসব দেখেছি। দাদা কিংবা মা বলেছে, এবার নভেম্বরে আমাদের বাড়িতেও এমন উৎসব হবে। আমি খুশি হয়েছি, কিন্তু প্রতিবারই কোন না কোন ঝামেলায় ভেসে গেছে সেইসব নভেম্বর। পরের নভেম্বরের জন্যে আবার আমি মন বেঁধেছি।

মফস্বলি মধ্যবিত্তদের অনেক স্বপ্ন থাকে, তারচেয়ে বেশি থাকে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। প্রাপ্তিযোগের চে বেশি হয় অপ্রাপ্তির ফিরিস্থি।

নিতান্তই স্মৃতিভুক এক মানুষ। ভেতরে ভেতরে পুষে রাখি এক প্রত্ন মন। কবেকার কোন বেলাদি, প্রতিভোরে আমারে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিরাতে মহাদেব এসে স্বপনে গল্প বলে। নলজুর নদীর জন্যে তার মন কেমন করে, আমারেও সে সেই বেদনায় ভাসায়, আমি নলজুর থেকে পাল তুলে পাড়ি দেই কালনীর ঢেউয়ে। নলুয়ার হাওয়ের প্রবল আফাল উঠে আমার বুকে...

হাতের তালুর মতই পরিচিত আমার শহর সিলেট। এই শহর আমারে আগলে রাখে, এই শহর আমারে পোড়ায়, এই শহর আমারে অশ্লিল করে। তবু এই শহরেরই পথে পথে আমি ঘুরি, এই শহরের সব মোড়ে, সব সড়কে ছড়িয়ে আছে আমার তরুণ প্রভাত, উচ্ছল বন্ধুতা, সজিব বিকেল...

সৃষ্টিছাড়া মানুষ হতে চেয়েছি, তবু সেই পথে যাওয়া হয়নি আমার। গানের দলের সাথে মাইলের পর মাইল হেটেছি, তারপর ধুলোমাখা পা নিয়ে ফিরেছি বাড়ি। পুকুরের জলে ধুয়ে গেছে সেইসব ধুলো-বালি-কাদা। বুকের ভেতরে তবু রয়ে গেছে এক বাউল মন। আমি ঘরে ফিরি প্রতিবার এই তিরিশ পেরুনো সময়ে, ঘরেই ফিরি আমি, তবুও আমি ফিরি না ঘরে কিংবা আমি রয়ে যাই বাসুদেব বাড়ির বারুনির মেলায়।

জানি সকলি তবে ভন্ডামী আর আমিও বেজায় ভন্ড, তাই জনারণ্যে ভালো লাগে না আমার, তবু তিল তিল করে শুষে নেই জনারণ্য...
মানুষে বিশ্বাস হারায়েছি কবে তার নেই কোন নিকাশ, তবু মানুষেরই ভালোবাসায় ভিজতে ভিজতে পার করতে চাই এইসব রতিজাগা রাত।

০২.

পরশু একটা মেইল এলো। ফেইসবুকের নোটিশ ছিলো তাতে। বন্ধু গৌরীশ লিখেছে আমার চিকিৎসা দরকার। তার অভিযোগ, আমি শুভেচ্ছার কাঙাল, তাই নভেম্বর আসতেই ফেইসবুকে ঘন ঘন যাতায়াত করি! হাসি সেই অভিযোগ কিংবা খোচা খেয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে স্বিকার করে নেই, তুই ছাড়া আর কে এমন বুঝেছে আমায়...

০৩.

একবার চাচিআম্মা হুলস্তুল বাধিয়ে দিলো। মিষ্টি এলো, হালুয়া রাধা হলো। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে মানুষজন এলো। আব্বা বাজারে গেলেন... নতুন প্যান্ট আর শার্ট পরে শীতের বিকালটা ঘুরছি কালনীর পাড় ধরে... বড়ো বেশি উজ্জল ছিলো সে বিকেল। এখনও সেই বিকেলের উত্তাপ পাই বুকের ভেতর।

সেইসব হুলস্থলি বিকেল পেরিয়ে এসেছি কবে। ভালোবাসায় ভিজতে ভিজতে পার করে এসেছি দুরন্ত উনিশ। তবু নভেম্বর এলেই আমি বদলে যাই। লোভ এসে বাড়ি বাধে আমার ভেতরে। ভালোবাসার লোভ, বড় তীব্র নেশা জাগানিয়া লোভ...

শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেলে, জানলা খুলে দিই। দেখি নজরুল ভাই, দেখি হিমু। ঘুম জড়ানো চোখ আরো ঝাপসা হয়ে আসে। এমন লেখা পড়লে হাসি আসে, যার আসে না তার মানষিক স্বাস্থ্য প্রশ্নের মুখে পড়বে। হায় আমি কি সত্যি তবে হয়েছি বিভ্রান্ত? মনোবৈকল্য দেখা দিয়েছে আমার? সারাদিনমান আমি শুধু আপ্লুতই হলাম। এইসব রঙ ঢঙ এ কতোটা দুলে বুকের ভেতর, আলবাব ছাড়া আর কে বুঝেছে কবে?

অপ্রাপ্তির খাতায় টুকে রাখা শৈশবরে আজ সত্যি সত্যি ভেংচি কাটি, দেখ বেটা এখন, আজ কেমন ভালোবাসায় উপচে পড়ে আমার জীবন। এই যে মগ্ন সময় ভরে উঠে ভালোবাসায়, তবু মন ভরে না! লোভ বাড়ে, ভালোবাসার লোভ...

আজ, তারিখের ঘরে যখন বসেছে চার, বয়েস বেড়ে গেছে একদিন, তখন সবারে জানাই কৃতজ্ঞতা। আনত হই শুধু হে বন্ধুরা, আপ্লুত হই, লোভি হই। সকলি তোমাদের তরে, এতো ভালোবাসা দিতে হয় বুঝি?

আমি এক ক্ষুদ্র মানুষ। তুচ্ছ মানুষ। গৌণ মানুষ আমি। আমারে এতো ভালোবাসা দিতে নাই বন্ধুরা। ভালোবাসার বদলে ভালোবাসাও যে ফেরত দিতে পারি না আমি...

...................................
বিষণ্ণ মেঘের গান

স্থবির বিষণ্ণ এক মেঘখন্ড
বসে আছি, একা

চারপাশে দাড়িয়েছে দেয়াল অন্ধ বন্ধ
আমি নিঃশ্বাসে নিয়েছি বিষ মৌনতার

রাত, দিন, আলো ও অন্ধকার সবকিছু
একাকার হয়ে চেপে ধরেছে আমারে
আমারে নিংড়ে নিয়েছে বিষণ্ণ বাতাস

আমি বসে আছি, স্থবির হয়ে আছি, অপেক্ষায় আছি দমকা বাতাসের,
ঝরে পড়তেই জন্মেছিলাম, এই সত্য জেনেছি বলেই জলে দিয়েছি মন...


Monday, November 16, 2009

সপ্তাহান্তের কোমল ক্লাসরুম

তুমি রুটিন বেঁধে দিয়েছো। স্কুলের ধর্ম শিক্ষা ক্লাশের মতো।
সপ্তাহের ঠিক একটা দিন, আমরা একটা ক্লাশে ইচ্ছেমতো
হৈ হৈ করতে পারতাম, নিজেদের মতো গল্প হতো। তুমিও
ঠিক সপ্তাহান্তের এক কোমল ক্লাশরুম, যেমন ইচ্ছে তেমন।

এইসব নিয়ম, কথার মারপ্যাঁচে ফেলে গিলিয়ে দেয়া সময়
আমারে বিষণ্ণ করে, এ বিরহ বড়ো বেশি বুকে বাজে
আমাকে উদভ্রান্ত করে। মগ্ন কিশোরের মতো আমি রুটিনের
দিকে তাকিয়ে থাকি, হিসেব করি, আয়ুষ্কাল গুনি, দেখি
মাঝখানের ঘন্টাগুলো জীবন থেকে উধাও হয়ে যায়

তুমি কথা বল্লেই মনে হয় বেঁচে আছি, নিরবতায় নেমে আসে মৃত্যুর শীতলতা।


Monday, November 9, 2009

ভ্রমণ (আনন্দময়) হয়েছে (শেষ)

১০.

সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয় হয় এমন একটা সময়ে পৌঁছে গেলাম হিরণ পয়েন্টে। বিখ্যাত স্পট। বনবিভাগের বিশাল অফিস সেখানে। আছে নৌ-বাহিনী আর মংলা বন্দরের দুটো আস্তানা। আগেরবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা সুন্দরবন নিয়ে কি একটা প্রজেক্ট আর রামসার এরিয়া ঘোষণার জন্যে সেখানে গিয়েছিলেন। বিশাল একটা ফলক লটকে আছে সেখানে। আছে এই এলাকার একমাত্র মিঠাপনির পুকুর। জেটিতে বোট বেঁধে আমাদেরকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। যথেষ্ঠ মানুষের আনাগোনা সেখানে। তবু হরিণ দেখতে পেলাম। ঘুরছে রাতের আলোতে। শুনলাম বাঘও আছে আশেপাশে। বনকর্তা জানালেন একাধিক বাঘ নাকি সেখানে আছে। প্রচুর খাবার পাওয়া যায় বলেই হয়তো এটা ঘটেছে। কারণ এর আগে শুনেছি একটা নির্দিষ্ট এলাকায় কয়েকটা বাঘ সাধারণত থাকে না। খাবার পানির পুকুর পাড়ে বসে আছি। শান বাঁধানো ঘাট। বনবিভাগের এক অফিসার গল্প করছেন। নানান কিসিমের গল্প। এইবার আর মুস্তাফিজ ভাইকে বলতে হলো না। আমি নিজেই বুঝে গেলাম, চাপা... সবটা না হলেও অনেকটাই চাপা। (জেনারেল স্যার, আমি কি কিছু শিখলাম? চোখ টিপি )

টানা চারদিন কি দুদিনও আমি মাছ খেয়েছি কোন জনমে, এটা কেউ বল্লে, আমার মা বলবেন, আপনে ভুল করতেছেন। সে আমার ছেলে না, অন্যকেউ! কিন্তু ঘটনাটা ঠিকি ঘটেছে। টানা চারদিন মাছ খেয়েছি এই ভ্রমণে। এমনতরো নানা ঘটনাই আছে। মিহি মিহি সেইসব ঘটনা একটু একটু করে মনে পড়ে। বিচ্ছিন্নভাবে মনে পড়ে।

রাতে চাঁদ নেমে এসেছিলো হাতের তালুতে। হ্যাঁ, হাতের তালুতে, শরীরে জলের ধারার মতো টুপ টুপ করে পড়েছে চাঁদের আলো। নিলকমলের জেটিতে বসে ভিজতে ভিজতে আমাদের স্বাদ মেটে না। নৌকার ছাদে বসি। সেখানে আলোর সঙ্গে যোগ হয় কুয়াশা। আমরা ভিজতেই থাকি। যতক্ষণ না খলিল ভাতের গামলা ঠেলে দেয় ততক্ষণ চন্দ্রাহত হয়ে থাকি আমরা।

শেষ কবে নায়ে ঘুমিয়েছি ভুলে গেছি। বালক বেলার সেসব ঘটনা। আমাদের নানাবাড়ির টিলার মাঝখানে ছোট্ট একটা হাওরের মতো। পুব সিলেটের ভাষায় এরকম জায়গাকে গোল বলে। বর্ষায় সেসব গোলে পানি জমে। পাশের সুরমা নদীর সাথে মিশে যায় সেই পানি। আমরা শৈশবে সেই হাওরের মতো জলায় দাপাদাপি করতাম। সেই জলে কেউ কেউ নৌকা ভাসাতো। ছোট মামা রাত জেগে সেখানে মাছ ধরতো। তার সাথে এক দুবার আমি কিংবা আমরা গিয়েছি। সেই যাওয়ার সুবাদে রাত্রিযাপনও হয়েছে। হাতের আঙুল গুনে পায়েরও শেষ হয় তবু সেই পেছনের হিসাব করতে পারি না। আমি আবার নৌকায় ঘুমালাম। বাপ্পিদা যত্ন করে বানিয়েছেন তার এই বোট। আতিয়ার ভাই সেখানে বিছানা পেতে দেন। আমরা একজন আরেকজনের মাথায় মাথা লাগিয়ে শুয়ে পড়ি। জেনারেল থেকে আবার ভাইয়ে পরিণত হন বুড়াভাই। গল্প ঘুরতে থাকে সুন্দরবন থেকে স্পেন অব্দি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টেরও পাইনি।
পায়ের দিকের একটা জানালা খুলে রেখেছিলাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সেই জানলা গলে আসা কোমল রূপালী আলোকে খেলতে দেখি আমারই পায়ে! আস্তে আস্তে উঠে বসি। দরোজা খুলে বেরিয়ে আসি। বায়ে তাকাই, ডানে তাকাই... শিরশিরে বাতাসে শরীর কাঁপে। বনের ঘ্রাণ পাই। নীলকমলের আশেপাশে হালকা পায়ে ঘুরে বেড়ায় হরিণ। আবছায়াতে তাদের দেখি আবার দেখি না। মাথার উপর উদার আকাশ... নিজেরে বড়ো ক্ষুদ্র, বড়ো বেশি তুচ্ছ মনে হয়... আমি ছৈয়ের ভেতর ফিরে আসি। গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ি...

১১.

শনিবার সকালটা একটু আগেই শুরু হলো অরূপ এর জন্যে! এম্নিতে ওরে দুপুর ১২টায়ও হাতি লাগিয়ে টেনে তুলতে হয়। হিরণ পয়েন্টে সেটা হয়নি। হলে ভালোই হতো। হরিণ দেখতে পারতাম আরো নিবিড় ভাবে। বেটা যে ভাবে থপ্ থপ্ করে হাঁটে... পাতার নড়াচড়াতেই যে প্রাণী দৌড়ে পালায়, সে এহেন থপথপে কি করতে পারে চিন্তা করেন।

কেওড়াশুটি খালের পাড় থেকে কাঠের একটা ব্রিজ চলে গেছে বনের ভেতর। সামনে এমদাদুল ভাই, পেছনে রেজাউল। রাইফেল হাতে সাবধানী হয়ে হাঁটছেন। মাঝখানে আমরা ফিস ফিস করে কথা বলছি। হাত দশেক এগিয়েছি হয়তো, ব্রিজের পাশ ঘেঁষে ভেজা মাটিতে ভেসে উঠা বাঘের পায়ের ছাপ চোখে পড়লো। সেই পায়ের ছাপ ধরে হাঁটতে থাকি, একেবারে টাটাকা স্পর্শ... একসময় দেখা যায় মামুজি ব্রিজেও চড়েছেন! রেলিং এর পিচ্চি ফাঁক দিয়ে কেমনে ঢুকিলো?? এমদাদ ভাই প্রশ্ন শুনে বলেন, বনের সবচে বড়বাঘটাও নাকি আধা ফুট উঁচু বনের ঝোপে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে!!!

আমরা আরো এগোই। সামনে থেকে হাত তুলে থামতে বলেন এমদাদুল। তার পর ব্রিজের একপাশে সরে দাঁড়ান... ব্রিজ শেষে যে হালকা উঁচু রাস্তার মতো আছে, সেখানে দাড়িয়ে আছে একটা চিত্রল হরিণ... ফটুরেদের ক্যামেরা সচল ছিলো প্রথম থেকেই। বাঘের পায়ের ছাপ তুলে রাখা হয়েছে, এবার ক্যামেরায় জায়গা করে নেয় হরিণ। কিন্তু সময় বড়ো অল্প। মিনিটেরও কম সময় আমাদের দিকে তাকিয়ে, দ্রুত সরে যায় তরুণী চিত্রল।

কেওড়াশুটির ছবি দিয়েছেন মুস্তাফিজ ভাই। তার ফ্লিকারে আরো ছবি আছে, অরূপও চমৎকার কিছু ছবি তুলেছে। সুন্দরবনের এই অংশটাকে আমার সাজানো গুছানো পরিপাটি বলে মনে হয়েছে। মনে হয়েছে আমার গ্রামের বাড়ির আধা ঘন জঙ্গলের মতো। গাছ, গাছের ফাঁকে-ফাঁকে বেশ বড়ো বড়ো খালি যায়গা। মাঝখানে মিঠাপনির একটা পুকুর মতো আছে। কিন্তু খুবি অল্প সময় সেখানে থেকেছি আমরা। আমার তৃপ্তি মেটেনি। কথা ছিলো পরে আরেকবার যাবো সেখানে, কিন্তু আর যাওয়া হয়নি। কেওড়াশুটি থেকে ফিরে হিরণ পয়েন্টেও আরো কিছুক্ষণ ঘোরা হলো। তারপর দুপুরের ভাটা শুরু হতেই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এবারের গন্তব্য দুবলার চর।

১২.

সুন্দরবনে এই মনে হয় একমাত্র চর, যেখানে ইচ্ছেমতো হাঁটা যায়। জেনারেল মুস্তাফিজ রুলিং দেন না, বা এমদাদুল রেজাউলরা বন্দুক নিয়ে পাহারা দেন না। অসম্ভব কর্মব্যস্ত একটা দ্বীপ। পাঁচ মাসের জন্যে জেলেরা এখানে থাকতে আসেন। তাই অস্থায়ী ছাপড়া ঘরে ঠাসা। আমরা যেদিন গেলাম, তার ১৫/২০ দিন আগে থেকে জেলেরা আসতে শুরু করেছেন। তখনও ঘরদোর তৈরির কাজ চলছে। এরিমাঝে ট্রলার ভর্তি করে আসছে মাছ। শিশু কিশোরদের বেশ বড় একটা অংশ সেখানে কাজ করে। তাদের মাঝে একজনের সাথে কথা হলো। আব্দুল আহাদ নাম। বাপ আর ভাই এর সাথে এসেছে চরে। খাতির হয়ে গেলো। ঘুরতে ঘুরতে তাদের ডেরায় গেলাম। তিন মাথাওয়ালা একটা লাঠি দিলো সে আমাকে। পরের দুদিন যেটা অনেক কাজে এসেছে।

আমরা হাঁটতে হাঁটতেই শুনলাম, একজনকে সাপে কেটেছে। তাকে ওঝা ঝাঁড়ফুক দিচ্ছে। দ্রুত সেখানে গেলাম আমরা। ২০/২২ বছরের এক তরুণ। আগের রাতে সাপে কেটেছে। এরপর থেকে চলছে টোটকার চিকিৎসা। দুবলার চরে বেশ কয়েকজন ডাক্তারের পতাকা দেখেছি! হ্যা পতাকা। নিজেদের নাম লিখে ডেরার সামনে লম্বা বাঁশে সেটা টাঙ্গিয়ে রেখেছেন তারা। দেখে ভারি মজা পেয়েছি। তাদেরই একজন বাক্স হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখানে। কিন্তু চান্স পাচ্ছিলেন না। মুস্তাফিজ ভাই এক প্রকার জোর করেই সেই ডাক্তারকে কাজে লাগালেন। বিষক্ষয়ের ইনেজকশন পুশ করা হলো। আমরা আবার ঘুরতে গেলাম। ফেরার সময় দেখি সেই লোক আরেকজনের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। মুস্তাফিজ কবিরাজ কিছু পথ্য বাতলে দিলেন এইবার। হাসি

পূর্ণিমার আগের রাত, তাই সে রাতে চাঁদ আরো বেশি মোহনীয়তা নিয়ে জেগে ছিলো আমাদের সাথে। মধ্যরাত পর্যন্ত বোটের ছাদে আড্ডাবাজি হয়েছে। তবে গতভ্রমনের মতো আমরা কেউ কিছুই হারাইনি। সবার সবকিছু ঠিকমতোই ছিলো। হাসি

আগের রাতের মতো এ রাতেও ঘুম ভাঙলো। তবে মাঝরাতে নয়, শেষরাতে। জেগেই বুঝলাম, কেমন একটা অস্বাভাবিক অবস্থা। বাইরে বেরিয়ে দেখি ধারণা ঠিকি আছে। বাপ্পিদা সমানে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করছেন। আতিয়ার ভাই আর ওহাব ঠান্ডা কনকনে জলে দাপাদাপি করে সে গাল হজম করছে। ভাটির কারণে চরে উঠে পড়া বোট নিচে নামানোর চেষ্টা করছেন। অপূর্ব একটা চাঁদ আকাশে, তার আলো কুয়াশার চাদর মেখে আমাকে ডাকে। কিন্তু বাপ্পিদার চেচামেচির কারণে সে ডাকে সাড়া দেয়া হয় না।

সারারাত মাছ ধরে ভোরের আলোর সাথে সাথে ফিরে আসে সারি সারি ট্রলার। নির্জনতা খান খান হয়ে যায়। মানুষের কণ্ঠের নিচে চাপা পড়ে সমুদ্রের গম্ভীর গর্জণ। ফটুরেরা ফটুক তুলেই যাচ্ছেন। নিঃসঙ্গ আমি হাটতে থাকি সৈকত ধরে। আব্দুল আহাদকে খুঁজি। পাই না। হঠাৎ দেখি আতিয়ার ভাই লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্বীপের ভেতরের দিকে যাচ্ছেন। আমি সৈকত ধরে তেরছাভাবে হেঁটে হেঁটে তাকে ধরার চেষ্টা করি। পেছন পেছন হেটে প্রায় ধরে ফেলি। লম্বা মানুষ, ছ'ফুটের ওপরে হবে উচ্চতা। চোখের লেবেল ধরে তাকালে আমি তার বুকটাই দেখি শুধু। সেদিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করি, কই যান...? উল্টা প্রশ্ন আসে,- 'কি দিয়া আইছেন? নৌকা না নঞ্চ?' ধাম করে আমার মাথা উপর দিকে উঠে যায়। ঘাড় উচিয়ে মুখটা দেখেই বলি, 'নৌকা'... আমার কথা তার কানে যায় বলে মনে হয় না। মেলায় যাইবেন? ঘাড় নাড়ি, তার সাথে যাবার কথা বলে... আমি পিছিয়ে আসি। ফিরে আসি পাড়ে। দেখি রিফাত-১ এর ছাদে বসে আছেন আতিয়ার ভাই!

ফটুরেরাও ফিরে আসেন। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে আমরা দ্বীপের আরো ভেতরে ঢুকি খাল বেয়ে। মেজর জিয়া উদ্দিনের লিজ নেয়া অংশে যাই। সেখানে রাস উপলক্ষে মেলা বসেছে। দুর থেকেই দেখতে পাই কর্পোরেট দানব সেখানেও পৌঁছে গেছে। যে দ্বীপে ফোনের নেটওয়ার্ক নাই সেখান ফেস্টুনের মাধ্যমেই সেবা পৌছে দিচ্ছে মোবাইল ফোন কোম্পানি। মেলা ঘুরে দ্বীপের আরো ভেতরে চলে গেলাম। নিউমার্কেট নামের এক যায়গার কথা শুনছি তো শুনছিই। সেখানে যাওয়া হলো। হাঁটছি সবাই। ফটুক খিচা হচ্ছে। হঠাৎ দেখি আমার আতিয়ার ভাই শুয়ে আছেন এক দোকানে।

দুবলার চরের মেলা আমাকে হতাশ করেছে। এটা দেখে মনে হয়েছে,বাণিজ্য করার প্রাণান্তকর চেস্টা করছে কিছু মানুষ। তাই ফুলিয়ে ফাপিয়ে নানান কথা ছড়িয়ে দিচ্ছে মেলার ব্যাপারে। তবে রাশ উপলক্ষে হওয়া স্নানটা হয়তো অন্যরকই হবে। সেটা দেখিনি, তাই কিছু বলতে পারছি না। কারণ আমরা দুপুরেই ফিরে আসি দুবলার চর থেকে। আবার গন্তব্য হিরণ পয়েন্ট। যে বর্ণনা ইতিমধ্যে দিয়ে ফেলেছেন মুস্তাফিজ ভাই। আমি শুধু অরূপ কাগুর জন্যে একটু চোখের পানি ফেলি এখানে। বেচারা, এতো কাছে গিয়েও কিছুই দেখতে পেল না। শালার বস্তার মতো পেটই এইজন্যে দায়ী। এইটার জন্যেই এখন পর্যন্ত 'তোমরা বন বিড়ালের ডাক শুনে পালিয়ে এসেছো' এই কথা বলে মনে শান্তি পেতে চাইছে।

১৩.

রোববার রাতে হিরণ পয়েন্টে থেকে, মাঝরাতেই আমরা চলতে শুরু করেছি। জোয়ারের সাথে সাথে ডাঙ্গায় ফিরতে থাকে বাপ্পিদার বোট। কিন্তু চলতে যেনো তার সমস্যা হচ্ছিল। একসময় ঘড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড় করে অদ্ভুৎ এক ধাতব শব্দ করে থেমে গেলো ক্ষরস্রোতা নদীতে। ততক্ষণে ভাটা শুরু হয়ে গেছে। অসিত গেরাফি (নোঙর) ফেলেও বোট আটকাতে পারে না। এরিমাঝে শুনি বাপ্পিদা কাকে যেনো বলছে, ট্রলার নিয়ে আসতে। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি তার কানে মোবাইল, পকেট থেকে বের করি সবাই প্রায় একসাথে... আবার শুরু হয় তবে যন্ত্রের জীবন।

শোনা যায় বাঘে নিয়ে যাওয়া এক মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে সেই ট্রলারের মাঝি, তাই আমাদের উদ্ধারে দেরি হচ্ছে। আমরা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা আসছে বলে বাপ্পিদাকে ক্ষেপাই একদিকে, আরেকদিকে এমদাদ ভাই মোবাইল ফোনে জানা ঘটনা যখন বর্ণনা করে, তখন ঝিম মারি। এমন সময় দুরে খুব দুরে দেখা যায় একটা বিন্দু। আমাদের দিকেই তাক করা তার মুখ। দ্রুত সেই বিন্দুটা রূপ নেয় একটা স্পিডবোটে। বনবিভাগের এসিএফ রাজেশ চাকমা এসে স্পিডবোট ভেড়ান। আগের দিনে ধুবলার চলে তার সাথে পরিচয় হয়েছিলো। দুর থেকে মনে হয়েছে আমরা কোন সমস্যায় পড়েছি, তাই এসেছেন। রিফাত নামের বোটে শেষবার খাবার খেলাম আমরা। ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছে অন্য ট্রলার। বাঘের ফেলে যাওয়া মাংশের টুকরা লুংগিতে পেচিয়ে হতভাগ্য পরিবারের কাছে পৌছে দিয়েছেন বনপ্রহরীরা। তাদের কাছ থেকে সেই গল্প শুনেছি, মোবাইলে তোলা ভিডিও দেখেছি, কিন্তু সেসব বলার ইচ্ছা আমার একেবারেই নাই।

শেষ

এসিএফ আমাদেরকে শ্যামনগরে পৌছে দেবেন বল্লেন, তিনি থাকলেন বোটে। তার স্পিডবোট আমাদের নিয়ে ছুটলো। পেছনে ফেলে এলাম চমৎকার কিছু মানুষকে। একেবারেই অন্যরকম কয়েকটা জীবন। বড়ো সরল, বড়ো বিশাল তাদের মন। সুন্দরবনের বিশালতাকে আমি ছুতে পেরেছি হয়তো, এইসব মানুষের পারিনি। মানুষ এমনই মনে হয়। কাছে গেলেও যায় না চেনা, ছোয়ে দিলেও হয় না ছোঁয়া...

Saturday, November 7, 2009

ভ্রমণ (আনন্দময়) হয়েছে

১.
আমাদের শহরে, নিজেদের লোক যারা আছে, এরা কথায় কথায় এই দেশ সেই দেশ মারে। আমরা দু ভাই। দাদাভাই দেশ শেষ করেছে তাও দেড় যুগ আগে। এখন ইউরোপ শেষ করার ধান্দায় আছে। আর আমার পাসপোর্টই নেই।

বালক বেলায় আমি অবাক হয়ে দেখতাম, দাদা ক'দিন পর পর এখানে যাচ্ছে, সেখানে যাচ্ছে। গাট্টি-বোচকা নিয়ে চলে যাচ্ছে জঙ্গলে থাকবে বলে। আমি লোভাতুর হয়েছি। কিন্তু কি এক মায়ার টানে ঘর ছাড়িনি। শহর ছাড়িনি। অথচ বছর দশেক আগেই আমার হয়ে গেছে স্লিপিং ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগসহ ভ্রমণের নানান জিনিসপাতি। দাদাভাই সেসব দেদারছে ব্যবহার করেছে। একবার হলো কি, সিলেট স্টেশনে এসে ঢাকার ট্রেন থামলো। আমি, দাদাভাই, আরিফ ভাই, রনি ভাই আর রাজু নামলাম ট্রেন থেকে। স্টেশনে নেমে দেখি বিরাট আয়োজন নিয়ে তাদের বন্ধুরা দাঁড়িয়ে। তাবু, লেপ-তোষক, ডেগ-ডেকচি। তারা ক্যাম্প করতে যাচ্ছে লাউয়াছড়া বা আরো কোন নির্জন জঙ্গলে। আমার বানর টুপি, মাফলার, স্লিপিং ব্যাগ মুহুর্তের মাঝে তিন বন্ধু ভাগ করে নিলো।

তখনতো মোবাইল ছিলো না। দাদাভাই স্টেশন থেকে ফোন করলো বাসায়। জিজ্ঞেস করলো আমি বাসায় পৌঁছেছি কী না। আম্মা না বলাতে, বল্লেন, পৌঁছে যাবো। রাজু আর আমি এক ট্রেনে যাচ্ছি, ইত্যাদি ইত্যাদি। আরিফ ভাইও একি কাজ করলো। শুধু আমার নামের যায়গায় রাজু আর রাজুর নামের যায়গায় আমার নামটা বসিয়ে দিলো। বাসার সবাই জানলো ওরা ঢাকায় রয়ে গেছে। কিন্তু তারা জঙ্গলবাসে চলে গেলো। আমরা দুই বন্ধু এক রিক্সায় বাসায় ফেরার সময় ওদের পুরা দলটারে অভিশাপ দিতে থাকলাম। তালতলায় নেমে যাবার আগে রাজু এমনভাবে কথা বল্লো, যেটার মর্মার্থ হলো, দেখিস একদিন আমরাও... আমাদের দেখা হয়নি কিছুই। আমরা বন্ধুরা মুড়ি মুড়কির মতো ছড়িয়ে পড়েছি সময় হওয়ার অনেক আগেই।

২.
এই বর্ষায় যখন মুস্তাফিজ ভাই সুন্দরবনে গেলেন, সে যাত্রার খবরে আমার ভারি লোভ হলো। ইশ আমিও যদি যেতে পারতাম...। আমার সেভাবে বেড়ানো হয়নি কখনো। সিলেটের বাইরে ঢাকাতেই যাওয়া হয় শুধু। তাও কাজের জন্যে যাই। সমুদ্রে গিয়েছিলাম বালক বেলায়, অথচ সমুদ্র ছোঁয়া হয়নি আমার। আরেকবার দাদা জোর করে নিয়ে গিয়েছিলো শহর চাঁদপুরে। বেড়ানো বলতে এই। তাই লোভে আর জেদে গলতে থাকি, পুড়তে থাকি। ঢাকায় ফিরে প্রথম আলাপেই মুস্তাফিজ ভাই বলেছিলেন, আরেকবার গেলে তোমাকে নিয়ে যাবো। কথা রেখেছেন আমার প্রিয় বুড়াভাই। আমি সুন্দরবন গিয়েছিলাম। দারুণ আনন্দময় এক ভ্রমণ শেষে ফিরে এসেছি নিজের শহরে।

৩.
এস এম এসটা এসেছিলো রাতে। সেটা দেখিনি। সকালে দেখলাম। ২৯ তারিখ রাতে যাত্রা, ফেরা হবে নভেম্বর ২ এ। সেই যাত্রা দুবার বাতিল হয়েও ঠিক থেকে গেলো। আর আমিও ২৯ তারিখ দুপুরে বাসে চেপে বসি। তার আগে আমাদের টিলার উপর সোলায়মান মিয়া যখন বেবিটেক্সি নিয়ে হাজির হয় তখনও বাড়ির কেউ হয়তো বিশ্বাস করেনি আমি চলেছি। চলেছি বনবাসে। তারা ভেবেছে কোন কাজে হয়তো ঢাকা যাচ্ছি। মোটা জ্যাকেট হাতে টেক্সিতে উঠার আগে ভাবী দৌড়ে এলো, তুমিতো ঢাকায় যাচ্ছো না, অন্যকোথাও! কই যাও! আমি হাসতে হাসতে বলি বনবাসে...

৪.
বাস সময়মতো পৌঁছলে সন্ধ্যা সাতটাতেই শ্যামলি যাবার কথা। কিন্তু বিশ্রি ঢাকা সেটা হতে দেয়নি। সাড়ে দশটার ঘর পেরোলে শ্যামলিতে গেলাম। তখনও মূল বাহিনী সেখানে যেতে পারেনি। একটু পর পর মুস্তাফিজ ভাই খোঁজ নিচ্ছেন, আমি বাস কাউন্টার খুঁজে পেলাম কি না। তিনিও আটকে ছিলেন যানজটে। রাত এগারোটায় সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস এর বাস ছাড়ার আগে আমরা সবাই দৌড়ে ঝাপটে পৌঁছে গিয়েছিলাম কাউন্টারে। আমরা বলতে, মুস্তাফিজ ভাই, অরূপ, ইউসুফ তুষার এবং জুবায়ের লোদি। শেষের দুজন দেশের দামি দুই তরুণ ফটুরে। আর প্রথম দুজনকেতো সবাই চিনেন। সাথে গ্যাটিস এবং শুধুই ভ্রমণের জন্য যাওয়া একমাত্র মাল, এই আমি ভ্যামতালা অপু।

বাস কাউন্টারের সামনে দাড়িয়ে আছি। মুস্তাফিজ ভাই আসলেন। তার পেছন পেছন দেখি লাল টি শার্ট পরা মধু পাগলা আসে। মধু পাগলার কথা কি মনে আছে আপনাদের? সেই যে আমাদের বালকবেলায় বিটিভিতে নাটক হতো, সময় অসময় নাম ছিলো। সেই নাটকে একটা পাগল ছিলো। নাম মধু পাগলা। সেই মধু পাগলা দেখেতো আমি প্রায় ভয়ই পেতে যাচ্ছিলাম। এই পাগলাকে কেন বুড়াভাই সাথে নিয়ে আসলো, সেটা মাথায় ঢুকছে না আমার। কাছে আসতেই ভুলটা ভাঙলো। এই জিনিস মধু পাগলা না। এটা হলো অরূপপাগলু। দেঁতো হাসি চুল কাটতে গিয়েছিলো। নাপিত নামের মহামানব এই অবস্থা করে দিয়েছে। না দেখা সেই নাপিতের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম। এই বেটা সমানে আমারে পাগল বলে যায়। অচেনা একটা নাপিত সেই সাজা তারে দিয়েছে। হে নাপিত তুমি মহান!

বাস ছাড়ার ঠিক আগ মূহুর্তে আমাদের এক বন্ধু ফোন করলেন। অরূপের সাথে তার কথা হলো। না যেতে পারার দুঃখ ছিলো তার কণ্ঠে। অরূপ বিষন্ন হলো। সেই বিষন্নতাটা আমার মাঝেও ছড়িয়ে দিলো সে। এইটা আমাদের সাথে ছিলো পুরো ভ্রমণের সময়টাতেই।

এই রাস্তায় সাভার পর্যন্ত গিয়েছি এর আগে। এরপরেই অচেনা সড়ক। রাতের বাস। আমাদের ঘিরে রেখেছে অন্ধ এক আলো। মাঝে মাঝে অন্যগাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো আমাদের চমকে দিচ্ছে। আমরা গল্প করছি টুকটাক। সুন্দরবন, সচল আর মানুষের কথা বলছি আমরা।

ফেরিঘাটে পৌছে বাস থেকে নামলাম। সুনামগঞ্জের হাওড় জনপদে কেটেছে আমার সোনালী শৈশব। আমি জল কাদার মায়ায় বেড়ে উঠা মানুষ। ডাবর এর ফেরিঘাট জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। ফেরিঘাট আর ফেরি, সেখানকার মানুষ আমার বড়ো প্রিয়। আমি মুগ্ধতা নিয়ে মানুষ দেখতে থাকলাম। ইতিমধ্যে অন্য দুই ফটুরের সাথে আলাপ হয়েছে। মানুষের সাথে সম্পর্ক হতে বেশ সময় লাগে আমার। এখানেও তাই লাগতো হয়তো। কিন্তু জুবায়ের ভাই সেটা হতে দিলেন না। আমার সাথে তিনিও হাঁটছেন। ছোট ছোট দোকান দেখছি আমরা। ব্যস্ততা দেখছি। বিজলি বাতির আলোয় সবকিছু চকমক করছে। তারপরও অন্যরকম একটা আলো খেলছে চারদিকে। সেই মায়াবী আলো আমাদের মুড়ে রেখেছে পরের চারটা দিন। আলোটা ছড়াচ্ছিল আকাশ থেকে। সে আলো ছিলো চাঁদের আলো।

৫.
শ্যামনগরে কয়েককটা দোকান আছে। ছাপটা দোকান। সকালে বাস থেকে নেমেই দেখি সেরকম এক দোকানের অপরিচ্ছন্ন কাচের শো-কেসে ডিশ ভর্তি করে রেখেছে ছোট ছোট মিষ্টি দিয়ে! আহা, এ যে আমার প্রিয় গুলগুলা মিষ্টি। (এই নামটা আমি দেই নাই। টুটুল ভাই দিছে)। মিষ্টির দিকে যখনই এগুচ্ছি, তখনই জেনারেল মুস্তাফিজ হুঙ্কার দিলেন। এই মিষ্টি না খাওয়ার দুঃখ আমি সারজীবনেও ভুলবো না। যদিও পনের মিনিট পরেই অন্য আরেকটা দোকানে গিয়ে আমাকে মিষ্টি খাওয়ানো হয়েছে। হাসি

সেই যে গফফটুরের দল গেলো সুন্দরবনে। ভিজতে ভিজতে আর হাগতে হাগতে তারা ফিরে এলো। আসা অব্দি বার বার শুনছি একটা নাম, বাপ্পিদা। সালাউদ্দিন বাপ্পি। আমাদের ট্যুর অপারেটর। বুড়ি গোয়ালিনীর ঘাটে গিয়ে তাকে পাওয়া গেলো। বিশাল মোটাশোটা লোক। এর অনেক গুন। কিন্তু জেনারেল মুস্তাফিজের কাছে সে নিতান্তই শিশু। তাকে দেখেই জেনারেল একটা ভেটকি দিলেন। এই মিয়া... হ্যান ত্যান বলে ছেড়াবেড়া অবস্থা। সেও দেখি মুহুর্তেই নেতিয়ে পড়লো। খুব অল্পক্ষনের মাঝেই রিফাত-১ নামের ছোট্ট বোটটাতে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থান হলো। জেনারেল সাহেব স্থলবাহিনী ছেড়ে জলবাহিনীতে চলে গেলেন। তিনি বোটের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব নিলেন। আমাদের সুন্দরবন যাত্রা শুরু হলো।

৬.
প্রবল মুগ্ধতায় আমি বোবা হয়ে যাই। আমার জীবনের সবচে রঙিন মুহুর্তগুলোর কথা আমি লিখতে পারিনি। দু একবার চেষ্টা করে পরাস্ত হয়েছি। এক আশ্চর্য সুন্দর বিকেলের কথা লেখা হয়নি। হবে না। ভয়, রোমাঞ্চ আর আকাঙ্খার এক সন্ধ্যায় বাবাই প্রথম কেঁদেছিলো। সেই মূহুর্তকে কোনভাবেই আঁকতে পারিনি আমি। এইটা এক ব্যর্থতাই হয়তো। তবু এই পরাস্ত হওয়াতে মজা আছে।

বোট চলতে শুরু করলে আমাকে সেই মুগ্ধতা চেপে ধরে। ক্রমশ পিছিয়ে যায় বুড়ি গোয়ালীনির ঘাট। পরিচিত হয়েছি ইতিমধ্যে আতিয়ার ভাই, ওয়াহাব ভাই, অসিত এবং খলিল এর সাথে। আমাদের সাথে আছেন বনপ্রহরী রেজাউল করিম। কলাগাছিয়া থেকে আরেকজন বনপ্রহরী আমাদের সাথে যোগ দেন। তিনি হলেন এমদাদুল। এদের সবার কথা এখানে বলে ফেলি। এরা এক কথায় চমৎকার মানুষ। খুবি চমৎকার। সারাজীবন মনে রাখার মতো একেকটা মানুষ।

আমার নামধাম মনে থাকে না। (লেখার সময় এদের নাম মনে করিয়ে দিলেন মুস্তাফিজ ভাই।) একটু পর পর তাদের নাম জিজ্ঞেস করেছি পরের চার দিন। এটাতে তারা খুবি মজা পেয়েছে। আর আমি পেয়েছি শরম! আমাদের এক ছোটভাই আছে। নাটক করে। এখন আমেরিকায় থাকে। করিম ওর নাম। ওর বন্ধুরা ওকে ডাকতো এল করিম বলে। পরে সবাইই তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করে। আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম এই 'এল' টা কি রে? সে আমার কাছে বসা ছিলো। দাঁড়ালো, একটু দুরে গেলো। আমি তাঁকিয়ে আছি তার দিকে। বল্লো, অপুভাই এল এর মানে কি বলতে পারি। তার আগে বলো, তুমি আমারে মারবা না। এই বানরগুলারে আমি অনেক বেশি আদর করি। তবু কোন এক আজব কারণে এরা আমারে খান্ডাল টাইপ কিছু একটা ভাবে। তাদের অনেকেই তুলিরে বুবু বলে ডাকে! ছোটভাইরা শ্বশুরবাড়ির লোক হয়ে গেলে কেমন কষ্ট হয় সেটা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। আমি বল্লাম, ঠিকাছে মারবো না, বল কি হয় এল দিয়ে। সে বল্লো এল দিয়ে লুচ্চা হয়... বলেই দৌড়, আমি স্বপনের দোকানে মুখ হা করে বসে থাকলাম। রেজাউল করিম এর নাম আমি ভুলিনি এই এল করিম এর সূত্র ধরে। তাকে করিম ভাই বলে ডেকেছি।

ওহাবকে সচলের সবার চেনার কথা। মাহবুব লীলেন সুন্দরবন থেকে ফিরে একটা গল্প লিখেছিলেন। বাঘ শিকারের গল্প। এর নায়ক সম্ভবত এই ওহাব। ওর সাথে কথা বলে সেই গল্পের অনেক টুকরো টাকরা জেনেছি আমি। ওহাব সুন্দরবনের সেইসব সাহসী মানুষদের একজন, যিনি বাঘের সাথে লড়াই করেন। আতিয়ার ভাইকেও আপনাদের চেনার কথা। তার ছবিও আছে সচলে। এই যে নামগুলো বলছি, এরা এমনই ব্যাপক জীবন ধারন করে আছে, যে এদের প্রত্যেককে নিয়ে কয়েকটা করে ব্লগ নামানো যাবে। আমি নিতান্তই এক ক্ষুদ্র মানুষ। তারচেয়ে ক্ষুদ্র এক লেখক। সেই দুঃসাহসের কাজটা আমি নাইবা করি। আমি বরং নিজের কথাই বলি, যেটা করে আসছি এতোকাল ধরে।

৭.
প্রজাপতি কতোটা রঙিন হয়? কতোটা মুগ্ধতা কেড়ে নিতে পারে সে? ছোট ছোট পাখায় কতো পথ পাড়ি দেয়ার শক্তি আছে তার? নদীতে ভাসার পর সবার আগে আমাকে অবাক করেছে সুন্দরবনের বর্ণিল প্রজাপতি। এরা নদীর এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে যাচ্ছে। মুস্তাফিজ ভাই বল্লেন, প্রজাপতিগুলো নাকি আত্মহত্যা করছে। আমি তর্কে মাতলাম। আমাকে সমর্থন দিলেন জুবায়ের ভাই। অরূপ নিয়ত করেই যাত্রা শুরু করেছিলো সবকিছুতেই আমার বিরুদ্ধে থাকবে, উল্টা পথে হাঁটবে। তাই সে আমার বিরোধীতা করলো। যদিও এজন্যে তাকে পরে পস্তাতে হয়েছে। আমি একদৃষ্টিতে প্রজাপতি দেখতে থাকলাম। একটাকে টার্গেট করলাম। সেটা যাচ্ছে... যাচ্ছে... যাচ্ছে... বিন্দু হয়ে টিকে আছে আমার চোখে। ধারাবর্ণনা দিয়ে যাচ্ছি। শেষ মুহুর্তে এসে আমার চোখটা ফিরিয়ে দিলেন জেনারেল মুস্তাফিজ। প্রজাপতিটা আর খুজে পেলাম না। মন খারাপ জেনারেলরা যে কতো বদ হয়...

বোট এগিয়ে যাচ্ছে। বাপ্পিদা নানান কিসিমের গল্প করছে। তার গল্পের প্রতিটা টার্নিং পয়েন্টে একবার করে ঝাড়ি দিচ্ছেন মুস্তাফিজ ভাই, বলছেন চাপা... চাপা... বাপ্পিদা চরম ধৈর্য্যের সাথে সেটা মোকাবেলা করে গল্প চালিয়ে যাচ্ছেন। হাত তুলে দেখালেন একটা সাদা কাপড় লটকে আছে। ১০/১৫ দিন আগে এখান থেকে একজনকে বাঘ তুলে নিয়ে গেছে। বছর পাঁচেক আগেও লোকটাকে বাঘ ধরেছিলো। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে রক্ষা পায়। তাকে উদ্ধার করেন বাপ্পিদা। এরপর সে বিয়ে করেছে, তার সংসার হয়েছে, সন্তানের পিতা হয়েছে সে। তারপরও নিয়তিকে হার মানাতে পারেনি। তার বউ এর আঁচল কিংবা ফুটফুটে দুই কন্যার মায়াবি হাতের বাঁধন তাকে ধরে রাখতে পারেনি। দুদিন পর গামছায় বেধে তার লাশ নামের অবশিষ্ঠ মাংশের খণ্ড গভীর বন থেকে নিয়ে এসেছেন বাপ্পিদা! সুন্দরবনের অসীম সাহসী লোকটাকে গল্প করতে করতে বেদনাহত হতে দেখি, দেখি তার চোখে ঝিলিক দেয়... তার সাথি আতিয়ার, যে কী না ভাবলেশহীন মুখে পরের চারটা দিন শুধু গালই খেয়ে গেছে, তাকেও দেখে মনে হয় বেদনায় আহত এক মানুষ। তবে সেটা মুহূর্তের জন্যই বুঝিবা। এক গল্প থেকে আরেক গল্পে দ্রুতই ঘুরে ফেরে বাপ্পিদার কণ্ঠ। আমি মুগ্ধ হই। মুস্তাফিজ ভাই মজা করেন।

৮.
নদীর জল কেটে এগিয়ে চলে বোট। গভীর বনে প্রবেশ করছি আমরা। দুপাশে সবুজ আর সবুজ। সেইসব গাছ কোথাও কোথাও একি মাপে নিচ থেকে ছেটে রাখা। মনে হয় কোন যত্নশীল মালি গাছগুলোকে সাজিয়ে রাখছে। না, সেরকম কেউ নেই এখানে। কাজটা করেছে হরিণ! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাছের যতটা উঁচুতে গলা তোলা যায় ততটাই সাবাড় করে দিয়েছে। তাতেই একরেখায় থেমে আছে পাতার সীমানা। সেইসব গাছের ফাঁকে হাঁটতে দেখা যায় হরিণের পালকে। যারা মাঝে মাঝে করুনা করে আমাদের দিকে তাকায়, নয়তো দৌড়ে ঢুকে যায় আরো গভীর বনে।

একের পর এক নদী খাল পেরোচ্ছি আমরা। সেসবের নামেরও নানা বাহার। কখন কোনটা পেরিয়েছি মনে নেই। একটু আগে মুস্তাফিজ ভাইর কাছ থেকে লিস্ট নিলাম সেসবের। নামগুলো দিয়ে দিই, বুড়ি গোয়ালনী, খোলপুকুর, শাকবাড়ীয়া, হংসরাজ, মাইট্যাভাড়ানী, কেওড়াশুটি আর বালির গাঙ। এরমাঝে দু একটা খালও আছে। তবে আমার সবগুলারেই নদী বলে মনে হয়েছে।

৯.
সূর্যটা প্রথম দিন কোন নদীতে ডুবলো? সে যে নদীই হোক, অপূর্ব ছিলো সেই দৃশ্য। সূর্য ডোবার নানান কিসিমের বর্ণনা আছে। ধপ করে ডুবে যাওয়া, যাচ্ছি যাবো করেও অনেকক্ষণ থেকে তারপরে ডুবে যাওয়া। আসলে এসব দৃশ্য এতো বেশি একরকম যে নতুন করে বলার কিছু নাই হয়তো। তবু সুন্দরবনে রোজ রোজ এমনভাবে সূর্য ডুবতো আর উদয় হতো সেটা শুধু দেখতেই হয়। কিছু বলা যায়না। বর্ণনা দেয়া যায় না। বর্ষায় সুন্দরবন থেকে ফিরে এল নজরুল ভাইরে জিগাইলাম কেমন দেখলেন, সে মহা উত্তেজিত হয়ে বল্লো, - 'এইটা বলা যাবে না। বলার মতো না। বলে কেউ শেষ করতে পারবে না। খালি অনুভব করতে হয়। আপনে না গেলে এইটা বুঝাইতে পারবো না।' তার কথাটা যে কতো সত্য সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে আমায় সুন্দরবনের জল ও প্রকৃতি। চাঁদ ও সূর্য। সূর্যের লালিমা দেখে আমি একটা এস এম এস লিখলাম। সেন্ড করলাম। অনেক্ষণ লাফালাফি করে মোবাইল একটা মেসেজ দিলো উল্টা, মেসেজ সেন্ড ফেইল্ড! স্ক্রিনে তাকালাম, সেখানে লেখা লিমিটেড সার্ভিস... এইবার তবে বনবাসই হলো আমার...

(চলবে)