Sunday, December 8, 2013

লজ্জা

প্রশ্ন কমে যাচ্ছে এখন। আগে যেমন প্রতিটা ঘটনায় হাজারটা প্রশ্ন শুনতে হতো এখন সেরকম না। একটা দুটা প্রশ্ন, তার সাথে মানানসই উত্তরেই কাজ হয়ে যায়। বলছিলাম আমার ছেলের কথা। বড় হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারি। নিজেই উত্তর খোঁজতে শিখে যাচ্ছে।
লাল মোটর সাইকেলটা সড়কের ঠিক মাঝ বরাবর পড়ে থাকতে দেখে সে প্রশ্ন করে, বাবা এটা এভাবে পড়ে আছে কেনো, পাশের মেকানিকের দোকানটা দেখিয়ে বলি, ওরা মনেহয় ফেলে রেখেছে। আগে এভাবে বল্লে পাল্টা প্রশ্ন হতো, রাস্তায় কেনো? এখন সেটা হয় না। মোটর সাইকেলটা পাশ কাটিয়ে আসার সময় পিচে পড়ে থাকা রক্তের ছোপটা তার চোখ এড়িয়ে যাবে সেটা আশা করি না। ওর চোখ এখনও অনেক প্রখর। কিন্তু তবু কথা বাড়ায় না। এর আগে আরেকদিন, ছোট জটলাটা পার হবার সময়, অন্ধকারে ওর চোখে পড়ে হাতে থাকা কিছু একটাতে। আমি অবলীলায় বলে দেই, এটা হকি খেলার ব্যাট। দু’দিন পর ও ঠিকই গল্প বলে তার মায়ের কাছে, বাবা বুঝতে পারেনি ওটা লম্বা লম্বা দা ছিলো, সে এগুলোরে হকির ব্যাট মনে করেছে... আমি একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ি, যাক ছেলে বোকা ভেবেছে, মিথ্যুকতো আর বলেনি।
বাড়িতে খবর শুনিনা, খবরের চ্যানেল থেকে দুরে থাকি। কাবাব হয়ে যাওয়া মানুষ, কব্জি উড়ে যাওয়া হাত কিংবা বারবিকিউ চুলা বনে যাওয়া বাসের খবর শুনলে যেসব প্রশ্ন শুনবো সেটার কোন উত্তর আমার কাছে নেই। তবু সেসব খবর আড়াল করতে পারি না। আগে পত্রিকার পাতার ছবি দেখিয়ে নিচে কি লেখা আছে সেটা জেনে নিতো, এখন নিজেই বানান করে করে পড়ে নেয়। কঠিন শব্দ দেখলে সেটার উত্তর মাঝে মাঝে জানতে চায়, তখন বুঝি ছেলে আমার বড় হচ্ছে, তখন বুঝি ছেলে বড় হচ্ছে এক অরাজক সময়ে।
৮৭ নভেম্বরে আমার যে বয়েস ছিলো তার চে বছর খানেকের ছোট আমার ছেলে। সেবছর আমি মিছিলে ছিলাম, সেই মিছিল থেকে আমাদের বের করে দেয়া হয়েছিলো, তারপরও হেমিলনের শিশুদের মতো আমরা অনেকে সেই মিছিলের পেছন পেছন হেটেছি কালনী পারের ছোট্ট শহরে। নূর হুসেন যেদিন শহীদ হলেন সেদিন বিকালে মুখস্থ হওয়া স্লোগান জপতে জপতে আনমনে ঢুকে গেছি খেলার মাঠে। বেডমিন্টনের র‍্যাকেট লেগে মাথা ফেটে গেছে, যারা মিছিল থেকে বের করে দিয়েছিলো তারা দেখতে এসে বলেছে, দেখেছো, বাচ্চাদের মিছিল দিতে নেই। মিছিল দিলে মাথা ফাটে... আর এখন শিশুদের হাতে রামদা তুলে দেওয়া হয়। সেই ছবি আসে পত্রিকার পাতায়, আমার ছেলে সেই ছবি দেখিয়ে বলে, বাবা এদের হাতে এতো বড়ো দা কেনো? আমি মিথ্যা বলি আবার, গরু জবাই করবে বলে দিয়েছে মনে হয়...
রোজ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে নয়তো এম্নিতেই বেরুলে আমাকে এখন গাদা গাদা মিথ্যা বলতে হয়। মাঝে মাঝে কর্কশ কণ্ঠে ধমক দেই, কেনো এতো প্রশ্ন করে! অথচ তাকে প্রশ্ন করা শিখিয়েছি আমি। কিছুদিন আগেও প্রশ্ন শুনে আহ্লাদিত হয়েছি, আর এখন সবচেয়ে বেশি ভয় পাই সেই প্রশ্নকেই। মাঝে মাঝে বলি, দুষ্টু লোকের কাজ, তখন আবার উল্টা প্রশ্ন, এদেরকে পুলিশ ধরেনা কেনো... মিথ্যার পিঠে মিথ্যা বাড়তেই থাকে।
আর মাত্র কটা মাস/বছর। এরপর এই ছেলেটা সব বুঝে যাবে, সে জেনে যাবে তার বাবা কত মিথ্যা বলেছে তাকে, জেনে যাবে এক ভয়ঙ্কর মিথ্যার মাঝে তাকে বড় করেছে তার মা! সেই বুঝতে পারার দিনটার মতো লজ্জার দিন আর হতে পারে না। লজ্জা... লজ্জা... লজ্জা...

Monday, August 5, 2013

এইসব মৃতকথামালা

জগন্নাথপুরে আমাদের স্কুলের ঠিক পাশেই ছিলো একটা দিঘি। সেই দিঘির পারে সারবাধা আম গাছ। স্কুলের আশেপাশের বাড়িতেও বিস্তর আম গাছ। আমের বোল থেকে ছোট ছোট আম বের হতে শুরু করলেই আমাদের অভিযান শুরু হতো। সেকালে মানুষ অনেক সহনশীল ছিলো, তাই গাছের উপর ইচ্ছামতো নির্যাতন চালাতাম আমরা। এখানে আমরা বলাটা হয়তো ঠিক হচ্ছে না। বেটে গাব্দা গোব্দা আমার পক্ষে গাছে চড়া কিংবা ঢিল ছোড়ে আম পাড়া হয়ে উঠতো না কখনই। তবু আমার কাছে আমের অভাব হয়নি কখনো। কবির নামের মহা দস্যি ছেলেটা না চাইতেই ইচ্ছামতো আম নেবার পারমিট দিয়ে রেখেছিলো আমাকে।
কবিরের সাথে প্রায়ই আমি স্কুলে যেতাম। বাড়ির পাশের রাস্তায় দাড়িয়ে কবির আমার নাম ধরে ডাকতো। এর আগে প্রায় ২০ মিনিট হেটে আসতে হতো তাকে। সে একা আসতো না। একটা বিরাট দল ছিলো তার। আমি সেই দলের সাথে যোগ দিতাম। স্কুলে একসাথে গেলেও ফেরা হতো না একসাথে। কবির স্কুল ছুটির অনেক আগেই ফুড়ুৎ করে স্কুল পালাতো। এই বিষয়ে সে একটা প্রতিভা বিশেষ। আমার জীবনে এমন এক্সপার্ট ক্লাস ফাঁকি দেনেওয়ালা আর ২ টা পাইনি। ফেরার পথে বেশিরভাগ দিনই থাকতো মহাদেব। টিংটিঙা লম্বা মহাদেব। তার বেয়াড়া পা হাফ প্যান্টের বাইরে বেমানানভাবে লটকে থাকতো যেনো। ডাকাবুকো কবিরের একেবারে বিপরিত ছিলো মহাদেব। শান্ত, নির্জন।
ঝিনুকের পেট ঘষে ঘষে ধারালো ছুরির মতো একটা কিছু বানাতো স্কুলের ছেলেরা। সেটা প্রায় সবার পকেটেই থাকতো। কায়দা করে আম ছিলে খেতো ওটা দিয়ে। আমি ঝিনুক দিয়ে আম ছিলতে পারতাম না। মহাদেব একদিন ছোট্ট একটা দা নিয়ে এলো। দুই বা আড়াই ইঞ্চি ছিলো সম্ভবত সেটা। কাঠের বাট লাগানো। দেখেই মুগ্ধতা জেগেছিলো। আমি প্রচন্ড অবাক হলাম, যখন মহাদেব সেটা আমাকে দিয়ে দিলো! ঝিনুক দিয়ে আম ছিলতে পারি না দেখে মহাদেব নিজে এটা বানিয়ে এনেছে। জগন্নাথপুর বাজারে মহাদেবদের একটা কামারের দোকান ছিলো। স্কুল থেকে ফিরে সেখানে কাজ করতো মহাদেব। অদ্ভুদ একটা হাতেটানা যন্ত্র ছিলো সেখানে। লটকে থাকা দড়ি ধরে মহাদেব টানতো। শো শো বাতাস বেরুতো একটা পাইপ দিয়ে, তাতে টকটকে লাল আগুন জ্বলতো কালো কয়লায়। সেই কয়লায় লোহার পাত দিয়ে আরো বেশি লাল করে ফেলতো মহাদেব। তারপর সেই লাল লোহা পিটিয়ে নানা যন্ত্র বানাতেন মহাদেবের বাবা। কত বিকেল আমি সেই দোকানে, মাহাদেবের পাশে বসে এইসব কারিকুরি দেখতাম... মহাদেব দু একবার তার হাতের দড়ি আমার কাছে দিয়েছে, আমি শরীরে সব শক্তি দিয়ে টেনেছি সেই দড়ি, এক ফোটা ফুলকিও তুলতে পারিনি কোনোদিন, কোনদিন না।
আব্বা বদলি হয়ে গেলে বাক্সোভর্তি স্মৃতি নিয়ে আর পৃথিবীজোড়া স্মৃতি হারিয়ে আমি জগন্নাথপুর ছেড়েছি। দুই যুগের বেশিকাল পর, আমার সেই বাক্সোটাও অনেক ফাঁকা এখন। স্মৃতি নাই, চুরি হয়ে গেছে সেই ভেজা ভেজা স্মৃতিগুলো। মরে গেছে তারা। শুধু দীর্ঘ বালুতটে সকালের রোদে কিংবা প্রবল জোৎস্নায় চিকচিক করে ওঠা অচেনা কনার মতো জ্বলজ্বলে হয়ে আছে মহাদেব, কবির, সোহেলের মতো মানুষের মুখ, বন্ধুর মুখ...
আমার কাছে বন্ধু বলতে মুড়ি-মুড়কির মতো ছিটকে পড়া কিছু প্রিয়মুখ ছাড়া আর কিছু নয়। আমার কাছে বন্ধু মানে হারিয়ে যেতে যেতে, মরে যেতে যেতে বেঁচে যাওয়া কয়েক টুকরো স্মৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। আমি বিপর্যয়ের কালে দেখি, অসুস্থ ভাইকে নিয়ে দিন-রাত উজাড় করে দেয়ার সময়ে হঠাৎ কেউ একজন হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে সস্থা চায়ের দোকান থেকে আমাদের মতো সস্তা মানুষের জন্য বানানো এক টুকরো কেক মুখে গুজে দিয়ে বলছে, কি অবস্থা হয়েছেরে তোর, এরকম মর্কটের মতো হয়ে গেছিস কেনো? এভাবে চল্লেতো হাওয়ায় মিশে যাবি... এই স্মৃতিই আমার কাছে বন্ধুতা। আমাদের মাঝে সবচে নরোম মানুষটা পোষাকী জীবন বেছে নিলে, মে মাসের শেষ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শহর ঘুরে বেড়াবার নাম বন্ধুতা। আমাদের চিঠিযুগে, একটা দুলাইনের চিঠির নির্দেশে রেলস্টেশনে বসে থাকার নাম বন্ধুতা। বন্ধুতা মানে ট্রেনে তুলে দিতে এসে শেষ মুহূর্তে লাফিয়ে উঠে পড়া! তারপর সারারাত কু... ঝিকঝিক, কু... ঝিকঝিক নিয়ে শীতে জমতে থাকা।
বন্ধুতা মানে একরাশ মৃতকথামালা, যারা খুব একা সময়ে প্রাণ ফিরে পায়, গলায় দলা পাকায়, উচাটন করে মন, আর চোখে জমে কুয়াশা...

Monday, July 29, 2013

প্রবল বাবাভাব

বাবা ডাক শোনার জন্য আমার মনে হয় একটা ব্যপক আকুলি-বিকুলি ছিলো সেই গেদাকাল থেকে। অথবা আমার মাঝে বাবাভাব প্রবল! খালি বাপ হইতে মঞ্চায়। নিজের পোলা, ভাইয়ের পোলা মিলে ৩ টা শিশু সারাদিন আমারে বাবা-বাবা-বাবা বলে অস্থির করে ফেলে তবু আমার বাপ ডাক শুননের শখ মিটে না!!! এর বাইরে আরও কয়েকহালি বাবা ডাকনেওয়ালা আমি ফিটিং দিয়ে রেখেছি। এরা আমারে বাবা ডাকে, আমি মুগ্ধ হয়ে সেই ডাক হজম করি...
বাপ হওনের একটা সহজ পদ্ধতি আমার আছে। শিশুদের সাথে যেকোনভাবে দ্রুত খাতির করে ফেলতে পারি। (ইদানিং এটা করতে সমস্যা হচ্ছে, শরীরটা বাচ্চা হাতির মতো যবে থেকে হতে শুরু করেছে, শিশুরা ততো দুরে সরে যাচ্ছে, শিশুরা সম্ভবত দুর থেকেই হাতি দেখতে ভালোবাসে, কাছে আসে না।) তো খাতির হবার পর গল্প শুরু হয়। আমরা একে অপরের নাম জিজ্ঞেস করি, আর এই নাম জানাজানির সময়ই আমি বাবা বনে যাই! ৯ মাস ১০ মাস না, মাত্র ৯/১০ মিনিটে।
: নাম কি?
: মাটি
: বাহ সুন্দর নাম
: তোমার নাম কি?
: আমার নাম বাবা
: বাবা!
: হ্যা আমার নাম বাবা
: ...
: আসলেই আমার নাম বাবা
: তুমারে বাবা কাকু বলবো?
: নাহ্, কাকু বলার দরকার কি? তুমি আমারে নাম ধরেই ডাকো
: !!!
: হ্যা, তুমি আমারে বাবা বলবে, আমি বলবো মাটি
এর পর অনেকক্ষন আমার আর মাটির গল্প চলতে থাকলো। মাটি তার ছোট ছোট বই দেখায়, পুতুল দেখায়, গল্প করে, কুট কুট করে করা সেসব গল্পের লাইনে লাইনে সে বাবা ডাকে। সম্ভবত এত বড় একটা লোককে নাম ধরে ডাকার মজাটা নিতে চায়। মাটির তখন সাড়ে ৩ বছর বয়েস সম্ভবত। পাশের ঘর থেকে পলাশ (পলাশ দত্ত, মাটির বাবা, আমার বন্ধু) সেটা খেয়াল করে। তার ঘুম ভেঙে যায় কটাশ করে। হিড়িম্বার মতো খিকড়ানো চুলে দরজায় এসে দাড়ায়, এই তুই আমার মেয়েরে কি শিখাইছস? আমি উদাস হয়ে জানালার বাইরে তাকাই... পলাশ রেগে-মেগে বলে, হারামজাদা তোরে আইজ খাইছি...
নজরুল ইসলাম, মানে নজুভাই তেমন না। তাই নিধির সাথে সেই পদ্ধতিটা কাজে লাগালে তিনি রাগ করেন না। কিন্তু বিপদে পড়ে নুপুর বেগম। নিধি যখন বলে, ওই বাবাটা খুব বোকা, কিচ্ছু চিনে না... অবাক হবারও চান্স পাওয়া যায় না তখন।
জোর করেও বাপ ডাকাই মাঝে মাঝে! তুলির অফিসের এনাম ভাই এর মেয়েরে বলি, এই মেয়ে, বাপ ডাক, নয়তো তোর আব্বুর পেট ফাটায়া দেবো। সে ভয় ভয় চোখে একবার নিজের বাপরে দেখে আরেকবার দেখে হুমকিবাপরে। এনামভাই তারে বুঝায়, ডাকো মা, বাবা ডাকো। নয়তো আব্বুরে মারবে... সে বাবা বলে, সেটা শুনে বাকিরা হেসে উঠলে সেও কস্ট করে হাসে। কিন্তু বাবাই একদম খুশি হয় না। সে ঠোট ফুলাতে থাকে!
লুবাবা আমার তালতো বোনের মেয়ে। ইটালিতে ওর জন্ম। ৫ বছর পর্যন্ত সেখানেই ছিলো। বাবাই আর ও সমবয়েসি। দেশে আসার পর বাড়ির অন্য দুই পিচ্চির দেখাদেখি সেও বাবা ডাকতে শুরু করলো। আহা, না চাইতেই বৃষ্টির মতো বিষয়। ওর মা’তো গেলো ক্ষেপে, সে আমারে বলে, ওই বদ, তুই আমার মেয়েরে বাবা ডাক শিখাইলি ক্যান। আমি বলি তুমি না চিনলেও সে ঠিকই চিনতে পারে। দেঁতো হাসি
আব্বারও অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে ছিলো। মানে অফিসিয়ালি আমার আর দাদাভাই এর বাইরে। ধরে-বেধে-ঘুষ দিয়ে নানা কায়দায় আব্বা তার পুত্র-কন্যার সংখ্যা বাড়াতেন। এর মাঝে সবচে ছ্যাচড়া ছিলো ডালিম নামের একটা ছেলে। সে ডাক টিকিটের লোভে অ্যব্বা অ্যব্বা ডেকে পাড়া মাথায় তুলে ফেলতো। আমি তখন খুবই ছোট, গাব্দা গোব্দা নিরিহ। ডালিমরে দেখতে পারতাম না আব্বার উপর ভাগ বাসাবার জন্য, কিন্তু কিছু করার ছিলো না। শুধু আব্বার সাথে অভিমান করা ছাড়া। কিন্তু দাদাভাইর সেসব ছিলো না। ডালিমের মতো ছ্যাচড়ারে চান্স পেলেই সে আচ্ছা করে প্যাদাতো। যদিও ছ্যাচড়া ডালিমের মধ্যে বিড়ালভাব ছিলো প্রবল। বিড়াল যেমন ব্যথার যায়গা জিহ্বা দিয়ে চেটে-চুটে মারের কথা ভুলে যায়, সেও তেমন। আগের বিকালে মার খেলো, পরের সকালেই দেখা গেলো আব্বার চেয়ারের পাশে দাড়িয়ে অ্যব্বা অ্যব্বা ডেকে নতুন কোন ডাক টিকিট নিয়ে খুশি মনে বাড়ি যাচ্ছে।
দাদাভাইর মারে কাজ না হলেও আমারটা খুবই কার্যকর হতো। মানে যখন থেকে আমি গুন্ডামি শিখে ফেল্লাম, তখন থেকে আব্বার আলগা সন্তানলাভ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো। সুব্রত নামের একটা ছুকড়ারে খুব করে পেদাইছিলাম একবার। আমার কয়েক হালি মামাতো ভাই-বোন আব্বারে আব্বু ডাকতে শুরু করলো। কি যন্ত্রনা। কিছু বলতে পারি না। আবার সহ্যও করতে পারি না। দু-একবার হালকা ধুলাই দিয়েছি, যেমন কান ধরে উঠবস করানো। কাজ হয়নি। সাইকেল দিয়ে দুরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, চকলেট খাওয়ানোর মতো অনৈতিক কাজ দিয়েও এদের সামলানো যায়নি। এরা এখনও আব্বাকে আব্বু ডাকে। মন খারাপ সম্ভবত আব্বার কাছ থেকেই বাবা হবার এই গুনটা আমি পাইছি।
এইসব বাবা ডাকাডাকিতে বাবাই অবশ্য অভিমান করে, কিন্তু সেটা সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু আবির, মানে আমার ভাতিজা বেশ এটাকিং মোডের জিনিস। বাবাই মাঝে মাঝে এরে কাজে লাগায়। যেমন লুবাবার সাথে ঝগড়া হলেই, আবির ‘থ’ এর উপর বিশাল চাপ দিয়ে থাবড়া মেরে সব দাত ফেলে দেবার হুমকি দিয়ে বলবে, আমাদের বাবাকে বাবা ডাকলে একটা দাতও থাকবে না। এর বাইরে আমাকে বাবা ডাকতে পারে এমন শিশুদের বিষয়েও সে নির্দয়। বাবাইকে বলে দিয়েছে, কেউ যদি বাবারে বাবা ডাকে, সেইটারে সে থাবড়া দিয়ে বসায়া দিবে একদম!!!
আমার ছোট মামার ছেলে, বাবাইর বছর খানেকের ছোট হবে। একই গ্রামে থাকি। দু বাড়ির মাঝখানে ছোট একটা টিলার আড়াল। সরাদিনই এ বাড়ির পিচ্চিরা ও বাড়ি, ও বাড়ির পিচ্চিরা এ বাড়ি ঘুরে। আমাদের বাড়ির রাস্তাটা পাকা। বাচ্চারা সুপারির খোলে বসে ছড়-ছড় করে সেখান দিয়ে নেমে যায়, খেলে। ইদানিং দুই চাকার স্কুটি নিয়েও দৌড় হয়। সেদিন শুনলাম মামাতো ভাইটা বাবাইকে বাবা-বাবা ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে! ঘটনা জানতে গিয়ে দেখি বিরাট রাজনীতি। স্কুটি করে বাড়ি থেকে রাস্তা পর্যন্ত নামতে দেবে, এই শর্তে আমার পুত্রসাহেব ওরে বাবা ডাকতে বাধ্য করেছেন...
শালার ছিটগ্রস্থ পরিবার দেখি, সবকয়টায় বাপ হইতে চায় খালি

Tuesday, July 16, 2013

তিনি বৃদ্ধ ছিলেন

চোখে ছানি পড়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। সে বছর দশেক হবে কম করে হলেও। চোখেরইবা কি দোষ। বয়েসতো কম হলো না। বড় মেয়ের ঘরের নাতির বিয়ে হয়েছে ৭ বছর আগে। আর বড় ছেলে তার মেয়ের বিয়ে দিয়ে ৩ নাতির নানা বনে গেছে। চোখের ছানি নিয়ে তাই কোন অভিযোগ নেই তার।
এখানে, এই সবুজ গ্রামের পাশে যে নদী বয়ে গেছে, সেই নদীর পাড়, শান্ত মাঠ, সবই তার চেনা। তিনি ছানিপড়া চোখে সেই নদীর পাশ দিয়ে অবলীলায় হাঁটতে পারেন। নদীর সাথে লাগোয়া মাঠ, সেই মাঠের এক পাশে দাড়িয়ে থাকা মেন্ডা গাছ, সব তার মুখস্থ। তিনি তার অভ্যস্থ পায়ে তরতর করে হেঁটে মেন্ডা গাছটার নিচে এসে দাঁড়াতে পারেন। রোজ বিকালে সেখানে তাকে দাঁড়াতে হয়। অভ্যাস। তার শরীর নদীর বাতাসে জুড়িয়ে যায়। তার মখমলের মতো সাদা দাড়ি বাতাসে উড়ে। ছানি পড়া চোখে তিনি অনুভব করেন ঠিক সামনে, চোখেন সীমানায় দাড়িয়ে আছে খাসিয়া পাহাড়, পাহাড়ের শরীর চিড়ে নেমে আসছে পাংথুমাইর ঝরণা। এই ঝরণায় জোয়ান বয়েসে হরদম গিয়েছেন তিনি। এখন আর যাওয়ার উপায় নেই। এলার্ট বলে এপার-ওপার দুপার থেকেই চিৎকার আসে, থেমে যেতে হয়। তিনি অনুভব করেন, দেখতে পান তার ডান পাশে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে জাফলং পাহাড়, কত অবাধ যাতায়াত ছিলো এই সবুজে, এখন সব অন্যের, কোন অধিকার নেই আর...
আজও হাঁটতে তার কষ্ট হয় না। তিনি সামনে একা হাঁটেন। তার হাতের লাঠিটা মাটিতে লাগে কি লাগে না, তিনি তরতর করে হাঁটেন। পেছন পেছন যারা আসে তাদের কথা তিনি বুঝেন না। বুঝবার দরকারও নেই। শুধু আজির উদ্দিন চেয়ারম্যান এর অনুরোধ তার কানে আসে। পাশাপাশি হাঁটছে সে, আর বলছে, ‘চাচা খইদেউকা, ই বয়েসো আপনার উপরে জুলুম ওউক ইতা আমার বালা লাগের না। আপনার হুরু পুয়া কই গেছে কইদেউকা, আপনার দায়িত্ব আমার। কেউ আপনারে কিচ্ছু খরতোনায়...’ এসব কথা শোনার কেনো মানে নেই। তিনি শোনেনওনা। তিনি তার প্রিয় মাঠ পেরিয়ে, মেন্ডা গাছটার নিচে দাঁড়ান, দাড়িয়েই থাকেন... তার ঝাপসা চোখের সামনে পিয়াইনের স্বচ্ছ জল বয়ে চলে, তার চোখের সামনে ঝর-ঝর করে ঝরতে থাকে খাসিয়া পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনার জল। পচানব্বই বছরের নরোম শরীর পিয়াইনের পানিতে ঝরে পড়ার আগে তার বুকে টকটকে লাল একটা পতাকা জেগে উঠে...

Sunday, June 16, 2013

আমাদের একা বাড়ি

বাড়িটা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে গেলো। বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ। গরমের ছুটি। বউগুলো ছানাপোনা নিয়ে তাই বাপের বাড়ি চলে গেলো। দাদাভাইও বাড়ি নেই। রাত ১০ টার পর ভাত খাবো কীনা জিজ্ঞেস করলেন আম্মা। বল্লাম একটু পরে খাবো। আম্মা ঠিকাছে বলে সাথে এও বল্লেন, ‘আজকে আমরা মা-পুত। একলগে খাই চলো!’ তখনই মনে পড়লো, এই শুনশান বাড়িটাতে, একা বাড়িটাতে আর কেউ নেই, আমি আর আম্মা শুধু! একটা অন্যরকম অনুভূতি। অনেক বছর পর, এরকম একা বাড়ি...
টেবিলের দু’পাশে বসে আছি আমি আর আম্মা। টুকটাক কথা বলছি। বেশিরভাগই খাবার নিয়ে। কোনটা নিচ্ছি, কোনটা নিচ্ছি না, সেটা দেখছেন আম্মা। বছর দেড়েক আগে আমি আর আম্মা মাসখানেক প্রবাসে ছিলাম। একসাথে বসে বসে মা ছেলে খেতাম। আমি কখনো দেশের বাইরে যাইনি। আম্মা আমাকে আগলে রাখার চেস্টা করতেন! তখন কিছুটা মনে হয় অস্বাভাবিকও ছিলাম আমি। মাথাটা ফাঁকা ছিলো... আজকে আবার বছর দেড় পর, আবার আমরা মা-ছেলে। দাদাভাইর খবর বলেন আম্মা, খুব বিখ্যাত কোন এক পাহাড়ের না উপত্যকার মাঝ দিয়ে বেড়াচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে কথা বলি আমরা, বউরা একসাথে বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেলো, সেটা নিয়ে আলাপ করি, গ্রামে রাতের পাহারা কিছুটা কম হচ্ছে সেটাও আসে আমাদের আলাপে। ইমাম সাহেব প্রায়ই রাতে ভাত খেতে আসেন না, আম্মা সেটা নিয়ে চিন্তিত।
এতো গরম পড়েছে, শরীর জ্বালা করে। বারান্দায় ফ্যান দাড় করিয়ে জানলায় দিয়ে ঘরের ভেতর ঠান্ডা বাতাস ঢুকালে বেশ শান্তি লাগে। প্রায় মাঝরাতে খেয়াল করি, আম্মা ঘুর ঘুর করছেন আমার আশেপাশে! আমি ঘুম ঘুম চোখে প্রশ্ন করি ঘটনা কি? জানালা দেখিয়ে বলেন পর্দাটা তুলে দিলাম। বাতাসের ঝাপটায় সেটা হয়তো পড়ে গিয়েছিলো। তুলে দিতে এসেছেন...
রাত জেগে থাকার অভ্যাসটা এসেছে সম্ভবত বই পড়া থেকে। তারপর ৭/৮ বছর পত্রিকায় কাজ করেছি। রাত জেগে থাকতে হয়েছে। এখন আর সহজে ঘুম আসে না। জেগে থাকি, জেগেই থাকি। তেমন আরেকটা অভ্যাস সোফায় শুয়ে থাকার। আগে পড়তে পড়তে একসময় সেখানে ঘুমিয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে দুস্টামিও করতাম। ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকতাম। আব্বার ঘুম ছিলো খুব পাতলা। শুয়ে পড়লেই ঘুমিয়ে পড়তেন, আবার মশা মারার শব্দে সেই ঘুম ভেঙে যেতো। রাতে একটু পর পর এ ঘর ও ঘর করাও ছিলো অভ্যাস। কে কেমন করে ঘুমালো, মশারী টানানো হলো কী না এসব দেখতেন। মাঝরাতে আব্বা ঘুম ভাঙিয়ে কাউকে দিয়ে মশারী টানাচ্ছেন, কাউকে দিয়ে কয়েল জ্বালিয়ে নিচ্ছেন... নিয়মিত ঘটতো এসব। ব্যতিক্রমটা শুধু আমার বেলায়। টেনে হিচড়ে কোলে করে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে চাকরী পাবার পরও। কতদিন বিছানায় শুইয়ে দেবার পর বিকট হাসি দিয়েছি, আব্বা কপট রাগ দেখিয়েছেন। তবু মন খারাপ করেননি। কলেজে পড়ার সময়ও অনেকদিন মনে আছে, ঘুমিয়ে গেছি ভেবে আব্বা কোলে নিয়েছেন আমাকে, পাজাকোলে শুয়ে আমি আব্বাকে বলছি, আজকে আপনার কাছে ঘুমাই আব্বা, আব্বা হয়তো বলতেন, আহা বিলাইর বাচ্চারে... তারপর নিজের বিছানায় শুইয়ে দিলেন... আমি আব্বার বুকের ভেতর ঢুকে বাকি রাত কাটিয়ে দিলাম।
তার অনেক বছর পর, ডিসেম্বরের কোন এক শীতে, হাসপাতালের সিসিইউ'র ছোট্ট বিছানায়, আমরা বাপ-ছেলে বিড়ালের মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকি। পাশের বেডের কেউ একজন চলে গেলে, সে খবর যাতে টের না পায় আমার বুড়ো শিশু, আমি মুখটা বুকে চেপে ধরি। কানের উপর আলতো করে হাতটা চেপে রাখি... সোফা থেকে বিছানায় যাবার পথে আমি চোখ মেলে জানিয়ে দিতাম ঘুমাইনি... আব্বা বাড়ি ফিরে সেরকমই সবাইকে জানিয়ে দেন, সব টের পেয়েছেন তিনি! তারপরও পরেরবার, আরও দু’তিনবার আমাদের হাসপাতালবাসে আব্বা রাতভর আমার বুকে মুখ গোজে থেকেছেন। আর বাড়ি ফিরে আমি সোফায় শুয়ে পড়লে কাছে এসে বলেছেন, ‘ও ফুয়া, উঠতে, বাফেনু আর কুলো নিতাম পারি না, উঠো... আও বাপ-পুত ঘুমাইযাই একলগে...
আম্মার কতো অভিযোগ। আমি তারে ভালোবাসি না। আমি আগে বাইরে গেলে ঘন্টায় ঘন্টায় আব্বার সাথে কথা বলতাম। এখন তার সাথে বলি না। রাগ করি সেসব কথা শুনে। আম্মার মনের ভুল বলি। তারে বলি এতো বয়েস হলে আর বাড়িতে বার বার ফোন করতে হয় না। আমি আর বাচ্চা নই, বাচ্চার বাপ... কিন্তু আম্মাকে বলা হয় না, আব্বা এতো বেশি ছায়াময় ছিলেন, আব্বা এতোবেশি জড়িয়ে রাখতেন, অসুস্থ দুর্বল আম্মার পক্ষে সেটা অতিক্রম করা সম্ভব না। এই যে, মাঝরাতে, আম্মা এসে জানালার পর্দা তুলে দেন বাতাস ঢুকবে বলে, আমার যে তখন আব্বার কথা মনে পড়ে যায়। খাবার টেবিলে এখন আর কেউ হাজার চেনা মাছটার ঠিকুজি বলে সেই মাছ পাতে তুলে দেয় না আম্মা। মাছ আমি খাইনা, এটা সবাই মেনে নিয়েছে, আর একটা মানুষ ৩৫ বছর ধরে যে কোনভাবে মাছ খাওয়াবার চেস্টা করেই গেলো... এমনকি শেষদিনে, শেষবেলাতেও...
আমার কোন দোষ নাই আম্মা। সব দোষ সেই কালো গাব্দা গোব্দা লোকটার

Friday, June 7, 2013

মেঘবাড়ির মানুষেরা সব মেঘেতে লুকাই

তারপর ঝুম ঝুম করে মেঘ নেমে আসে। আমাদের ঘিরে ধরে। পর্দার পর পর্দা পড়তে থাকে। চোখের সীমানা ছোট হয়ে আসে। একটা হালকা স্বচ্ছ চাদরে ঢাকা পড়ে আমাদের চারপাশ। মেঘবাড়ির মানুষ আমরা, মেঘেতে হই মশগুল...
তারও আগে, ভোর হবার আগে আকাশ ভেঙে পড়ে বাড়ির ছাদে, পাশের টিলায়, ঝুম ঝুম শব্দ হয়। বারান্দায় দাড়িয়ে রাতের আলোয় দেখি সেই জলধারা। জঙ্গলযাত্রা শুরু করবো, অপেক্ষা।
এই পথে এর আগে যখন গিয়েছি, সেদিন রানা ছিলো। মাঝখানের দশকধরা বিচ্ছিন্নতার পর সেটা আমাদের লম্বাযাত্রা। এই সড়কটা প্রিয় আমার। দুপাশে বিস্তির্ন ধানক্ষেত, বর্ষায় জলে টইটম্বুর। সবুজ। একটা রেলপথ এই আসে, এই দুরে সরে যায়। সবুজ বাড়তে থাকে। ছোট ছোট টিলা, ঘন সবুজ, মাটির ঘ্রাণ, নাম না জানা বুনো ফুলের ঘ্রাণ, অচেনা মানুষের মুখ। মনে হয় এই বুঝিবা হারিয়ে যাচ্ছি, অথচ হারানো হয় না। পালাতে চাইলেও পালানো যায় না, তবু কিছুটা সময় গোপন থাকা যায় নিজের খোলসে। এবার এই পথে আমার সঙ্গি শাওন, সায়েম, শান্ত আর আরেকটা শাওন।
বাবাইকে নিয়ে আমি আর তুলি এই পথে ভুল করে একবার ঢুকে পড়েছিলাম বছর তিনেক আগে। হারাচ্ছি, হারাচ্ছি কিন্তু হারাচ্ছি না এমন একটা পথ, আঁকাবাঁকা। চায়ের ঘ্রাণ, ছায়া, প্রচ্ছায়া। অনেকটা পথ আমরা গিয়েছিলাম সেদিন। একেবারে ঘড়ি ধরে ২ ঘন্টা। হিসাবটা এমন, ২ ঘন্টায় যতটা যাওয়া যায় যাবো, তারপর আবার ফিরে আসবো... ভেতরে হারিয়ে যাবার তীব্র বাসনা তবু সংসারী মানুষের প্রগলভতা হয়তো। হাজার দিন পেরিয়ে গেছে তারপর। তবু আমরা এখনও সেই ৪ ঘন্টাকে প্রায়ই মনে করি। বাবাই বলে, বাবা আরেকদিন আমরা হারিয়ে যাবো... হয় না। কতকিছু যে হয়না...
এবার ঠিক উল্টোপথ ধরে সেই সবুজের কাছে ফিরে যাওয়া। সকালটা শুরু হয়েছে সিলেটের প্রেমময় ‘মেঘ’ দিয়ে। তারপর ঠান্ডা বাতাসে এগিয়ে চলা। আকাশে জমে থাকা কালনীর ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ে, সেই কালনী ভাসতে ভাসতে নিচে নেমে আসে, ঝর ঝর, ঝরে পড়ে...
আদিবাসী লোকটা চায়ের কাপগুলো ধুতে থাকে, ধুতে থাকে। একবার, দুবার, বার বার। কি যে যত্ন। মায়া হয়। লজ্জা হয়। আমরা এভাবে কারো যত্ন নিতে পারি না। আমরা গ্রামদেশ থেকে কত্তো দুরে চলে গেছি... তারপর সেই মানুষটা কেটলিতে প্রণাম ঠুকে ঢেলে দেয় অমৃত... আহ...
বন ঘন হবার মুখে, একটা ছোট্ট দোকান আগলে থাকেন আরেক আদিবাসী। শরীর থেকে পানির ছাট মুছতে মুছতে যখন প্রশ্ন করি, বসি এখানে? প্রান্তবর্তী সেই নারী সম্মতি জানান। অভ্যস্থ চোখে আমাদের দেখেন। নির্জনতার মানুষদের নির্জনতা আমরা ভেঙে দিচ্ছি রোজ। এখন আর তারা অবাক হন না। মনে মনে বিরক্তই হন হয়তোবা।
বন শেষে বন, চায়ের বাগান, তারপর ধান। বাঁক খেয়ে, পাক খেয়ে, কখনো সিথির মতো একহারা হয়ে রাস্তাটা শুধু এগিয়েই চলে। তারপর ঝুম-ঝুম, ঝুম-ঝুম, ঝুম-ঝুম... আমাদের ঘিরে ধরে। পর্দার পর পর্দা পড়তে থাকে। চোখের সীমানা ছোট হয়ে আসে। একটা হালকা স্বচ্ছ চাদরে ঢাকা পড়ে আমাদের চারপাশ। মেঘবাড়ির মানুষ আমরা, মেঘেতে হই মশগুল... আমাদের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে একটা যুবতি কদম্ববৃক্ষ। তার পাতার পরতে পরতে মখমলের মতো মোলায়েম পুষ্প ফুটিয়া আছে। অঝোরধারায় সেই পুষ্পের গায়ের ঘ্রাণ নেমে আসে মাটিতে। তার ছাট পড়ে চোখে, কেমন পাগল পাগল লাগে তখন...
এখানে মেঘ ইচ্ছে হলেই দলা পাকায়, এপাশ থেকে ওপাশে সরে যায়। ঝুপ করে নেমে আসে মাটিতে। ভেজা সড়ক ধরে এগুতে থাকি। আরও আরও সামনে যেতে হবে, হারিয়ে যেতে যেতে বাড়ির পথ ধরবো গৃহি মানুষেরা...
*আমরা, সিলেটের মানুষরা বৃষ্টি বলি না। বলি মেঘ। বলি ঝুম-ঝুম করে মেঘ পড়ে, তার আগে আকাশে জমে কালনি...

Monday, May 27, 2013

সিমন আমার ভাই

বাবাইর তখন তিন বছর। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি। ২ অথবা ৩ তারিখ হবে। শুদ্ধস্বর-এ বসে আমরা আড্ডা দিলাম। তারপর জ্যোতি, তারেক, আমি, তুলি, টুটুলভাইসহ কয়েকজন একসাথে বই মেলার পথ ধরলাম। আজীজ মার্কেট এর সোজা উল্টাদিকে রাস্তা পার হয়ে যাদুঘরের পাশের ফুটপাথে উঠতেই দেখি মন্থর গতিতে হাঁটছে, দেখে খুশি হবার বদলে আমার মুখটা শুকিয়ে গেলো। কারণ ঢাকায় যাবার কথা জানানো হয়নি। তার উপর সাথে বাবাইকে নিয়ে গেছি। আমাকে সে অবলীলায় পাশ কাটিয়ে গেলো। নিচের দিকে তার চোখ পড়ে না। পেছন থেকে ওর পিঠে খোঁচা মেরে থামালাম। ফুটপাথে অফিস ফেরত, মেলামূখী মানুষের ভিড়। সেসব কেয়ার না করেই জড়িয়ে ধরলো। ভাইজান বলে একটা চিৎকারও দিলো। একেবারে পিষে ফেলে পারলে। কোনমতো বল্লাম সাথে তোর ভাতিজা আছে দেখ। আমাকে ছেড়ে পাশে দাড়ানো বাবাইকে ছো মেরে কোলে তুলে নিলো। খবর দিলামনা বলে কোন অভিযোগ নেই,শুধু বল্ল, দেখলেন ভাইজান, আমারে খবর না দিলেও আমি ঠিক ঠিক খবর পেয়ে যাই। ফাঁকি দিতে পারবেন না। আমি লজ্জায় কিছু বল্লাম না... সিমন এমনই, সিমনের সাথে আমার এমনই সম্পর্ক।
মেলার সেই বিকেলটায় আর একবারও বাবাইকে কোলে নিতে হয়নি আমার। চারুকলার সামনে এসে যখন ভিড়ের কারনে দলছুট হয়ে পড়েছি। তুলি উদ্বিগ্ন মুখে নিজের ছেলেকে খুঁজছে। তখন অনেক দুরে ভিড়ের মাঝখানে একটা শক্ত কাঁধের উপর বসা বাবাইকে দেখিয়ে দিয়েছি। সেটা সিমনের কাঁধ। নির্ভরতার।
সিমনের সাথে আমার পরিচয় আরো আগে। ২০০৬ এর শেষ নয়তো ০৭ এর শুরুতে। সামহ্যোয়ার ইন ব্লগে। একটা টিভি স্টেশনের স্থানীয় অফিসে কাজ করি। ফুটেজ পাঠাতে হয় ইন্টারনেটে, তাই হাইস্পিড ইন্টারনেট কানেকশন সেখানে। সারাদিন নেটে থাকি। সামহ্যোয়ার ইন ব্লগের ভারি ইন্টারফেস যখন দেশের স্লো নেটে খুলতে অনেক সময় লাগে, তখন আমরা ধুমায়া কমেন্ট করি। সিমন সেটা দেখে অবাক। তখনকার ছাগু তাড়ানোতে সে বেশ এক্টিভ। আমার সাথে কাজ করতো মিঠু। কেমন করে যেনো তার সাথে সিমনের খাতির হয়ে গেলো। শাহেনশাহ ছিলো সিমনের ব্লগনাম। মিঠুর সাথে খুব বন্ধুত্ব তার। ফোনেও কথা হয়। একদিন আমার সাথেও কথা বল্ল। তারপর জিটকে এড করা হলো। তবে সামুর কমেন্টের ঘরেই বেশি আলাপ হয়। সেখানেই কোন এক ফাঁকে সে ভাইজান ডাকা শুরু করলো। যুক্তি ছিলো মিঠুর ভাইজান হলে তারও ভাইজান। আমি মেনে নেই। মিঠু ঢাকা আসলে তাদের আড্ডাও হয়। এরমাঝে একদিন সে সিলেটে হাজির। পরিচিত কার বিয়ে ছিলো। বিয়ের গাড়িতে উঠে সিলেটে চলে গেছে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য আমার সাথে দেখা করা!!! এইটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমার জন্য। আমি মরমে মরে গেলাম, তারচে বেশি অবাক হলাম। কি একটা রিপোর্টিং এর জন্য তখন শহরের বাইরে। সেটা শেষ না করে ফিরতে পারছি না। এদিকে বিয়ে শেষ করে ঢাকা ফিরে যাচ্ছে সবাই। সিমন যাবে না। সে একটা গাড়িই আটকে রাখলো। মিঠু সেই কথা ফোনে আমারে জানায়। আমি আরও অবাক হই। গাড়ি আটকে রাখা!!! কাজ অর্ধেক রেখেই ছুটে আসি। দশাশই শরীরের সিমনের সাথে আমার প্রথম দেখা হলো। গাড়িতে বসে থাকা কয়েকজন তরুন খুবই অবাক চোখে আমাকে দেখছিলো। সম্ভবত মেলাতে পারছিলো না। বিশেষ কোন কারণটার জন্য সিমনের মতো একটা ছেলে এভাবে নতজানু হয়ে বসে থাকবে, তা তারা বুঝতে পারছিলনা নিশ্চিত। আমি নিজেইতো বুঝতে পারছিলাম না।
সচল হবার বছরখানেক পর ঢাকায় একটা কাজে গেলাম। সাথে প্রেসের ম্যানেজার, মেশিনম্যান ছিলো। এদের একজনের বাড়ি বগুড়ায়, আরেকজন ময়মনসিংহের। কাজ শেষে দুজনেই ছুটি চাইলো। না করতে পারলাম না। কিন্তু আমি কি করবো। উদ্ধার করলো সিমন। ঝড়ের বেগে সে আমার কাজের জায়গায় হাজির। আসতে আসতেই খবর দিয়েছে এনকিদু আর বনিকরে। মিঠু ঢাকায়, তারেও জোগাড় করে ফেল্লো। বেইলি রোডে শুরু হলো আড্ডা। বসে থাকার আড্ডা শেষে হাঁটার আড্ডা। হাঁটতে হাঁটতে এরা একসময় নজরুল ভাই এর বাড়ির সামনে চলে এসেছে। সেই বাড়িতেই ঢুকে গেলো সবাই। আড্ডা দিতে দিতে আমার বাস মিস, হোটেলে যাবার সময়ও শেষ। এরমাঝে সেই বাড়ির চেয়ার ভেঙে ফেল্ল সিমন। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। বিব্রত হয়ে বসে আছি। সে অবস্থাতেই আমারে সেখানে ফেলে এলো! এর আগে যাদের সাথে সাইবার যোগাযোগ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না, সেই বাড়িতে আমাকে ফেলে এলো সারাটা রাতের জন্য। সে অন্য গল্প। অন্যসময় হয়তো হবে। আমি সিমনের কথা বলি আজ।
এরপর আমি যতবার ঢাকা গিয়েছি, প্রতিবার সিমনের সাথে দেখা হয়েছে। ঢাকা একটা অপরিচিত শহর। কিচ্ছু চিনি না সেখানে। সিমন দিনের পর দিন আমার কাজের জন্য ছুটি নিয়েছে। বাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকেছে। রাতে সিলেটের বাসে তুলে দিয়েছে। মন খারাপ হলে নিজেই সিলেটে চলে এসেছে। সিমনের দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠরা আমার কাছে সিমনের বিচার চেয়েছে। টুকরো টুকরো ছয়টা বছর এখন চোখের সামনে ভাসে... এই মাঝরাতে, একটু আগে ফোনে হুহু করে কান্নায় ভেঙে পড়েছে নজরুল ভাই। আমি একটা দুর্বল মানুষ। অতি ক্ষুদ্র। অল্পতেই সবকিছু গুলিয়ে ফেলি। এখনও তাই হয়েছে। সিমনের কথা বলতে গিয়ে নিজের কথাই বলছি শুধু। কিন্তু এটাও সত্যি সিমনকে আমি আমার মতো করেই চিনি।
সিমনের চওড়া কাধটা পরম নির্ভরতায় আঁকড়ে ধরা যায়। তুলি কখনই বাবাইকে আমার সাথে দিতে নিরাপদবোধ করে না। কিন্তু সিমনের কাধে চড়লে বাবাই নিরাপদ থাকবে এই বিশ্বাসটা ৬ বছর আগেই অর্জন করেছে সে। বাবাই সিমনের কাধে বসে ওর ঝাকড়া চুল মুঠিতে ধরে বই মেলায় যাচ্ছে এই দৃশ্যটা দু’দিন ধরে বার বার চোখে ভাসছে। আমার বাবাইটা এখনও কোলে চড়তে চায়, আমি ওরে কোলে নিতে পারি না। এতো বড়ো হয়ে গেছে। ওরে বলি, সিমন আসুক তোরে কোলে নেবে...
ওর বিয়ের কথাবার্তা পাকা হবার পর, ঢাকায় গিয়েছি। নজুভাই তখন কলাবাগানে থাকে। সন্ধ্যার পর সিমন হাজির। সাথে মিতু। বউকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। কতটা ভালোবাসা থাকলে এটা করা যায়? আমি তল খুজে পাই না এমন ভালোবাসার। একদম না। এরকম সময়ে শুধু কান্না আসে।
তান্তার জন্য তোর নিরাপদ কাধটা অনেক বেশি দরকার সিমন... তুই জেগে ওঠ... আমরা দুই ভাই মিলে তারেক, আকতার, বংকারে চল সুরমা নদীতে চুবায়ে আসি...

Monday, April 1, 2013

৫৭ ধারা নামের কালো আইন

গ্রেফতারকৃত ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার অনলাইন এক্টিভিস্টরা। 'সকল' ব্লগারের মুক্তির দাবিতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার একটি আন্দোলন চোখে পড়ল। এর বাইরে একটা জিনিস আড়ালে পড়ে যাচ্ছে, সেটি হচ্ছে “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬” এর ৫৭ ধারা নামের কালো আইন।

২০০৬ সালে রাজনৈতিক ডামাডোলের ফাঁকে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এই আইনটি পাস করে ফেলেন। সেকালে বাংলা ব্লগের উন্মেষকালে অনলাইন কমিউনিটি এত বড় ছিল না, তাই আইনটি নিয়ে তেমন আলাপ হয়নি। দুঃখের বিষয়, পরবর্তীতে বাংলা ব্লগ একটু শক্তিশালী হওয়া শুরু হলেই ব্লগার নেতারা আরো জোরালো ও শক্তিশালী আইনের আশায় “সাইবার আইন” এর দাবিতে একটা ব্লগ দিবসও পালন করেছিলেন।
আমরা অনেকেই তখন এরকম কালো আইনের বিরোধিতা করেছিলাম। সেই বিরোধিতার কারণে “সাইবার আইন” এর আবদারকারীরা আমাদেরকে রুটিন মেনে দুইবেলা গালাগালি করেছেন। ইতিহাসের নির্মম কৌতুক এই যে সাইবার আইন আমাদের বিরোধিতায় নাড়াচাড়া হওয়া বন্ধ হলেও ঐ আইনের আবদারকারীদের এক সর্দার ব্লগারই এখন সাইবার আইনের পূর্বপুরুষ এই “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুিক্ত আইন, ২০০৬” এর ৫৭ ধারার বলে গ্রেফতার হয়েছেন। আপাতত আত্মগোপনে থাকা 'ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়ার' অভিযোগে সরকারের  লিস্টেড ব্লগারদের মাঝেও এই সাইবার আইনের ব্যাপারে মহা উৎসাহী হয়ে একেবারে প্রধানমন্ত্রী অফিসের কর্মকর্তাকে দাওয়াত করে নিয়ে আসা লোকজনও আছেন। আজ সাইবার আইন আসার আগেই এই অবস্থা, ঐ সময়ে সাইবার আইন আনতে পারলে আজকে দেশের বড় সংখ্যক ব্লগারই বোধহয় জেলের ঘানি টানতে টানতে কাঁধে কড়া ফেলে দিতেন।
এই মহাকৌতুক দেখে এখন একগাল হাসলেও কেউ দোষ দিতে পারবেন না নিশ্চয়ই, কিন্তু একথা ভুললে চলবে না যে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন দেখলে আলুপোড়া খাওয়ার সময় নেই, কারণ লাগোয়া চালে আগুন লাগলে নিজের বাড়িও পুড়বে।
এখন সময় হচ্ছে “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬” এর কালো ধারা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়া।
আইনে বলছে, “৫৭ (১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।” এই আইনের স্পষ্টিকরণ না হলে কালো আইন হিসেবে এর অপব্যবহার এখন ডালভাত হয়ে যাবে।
এই আইন দিয়ে দুনিয়ার যেকোনো জিনিসকেই অনলাইনে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। “দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন” এরকম কিছু প্রকাশ করা যাবে না মানে কী? যেকোনো ওয়েব প্রকাশনা দেখলে বা শুনলে আরেকজন যদি অসৎ হয়ে যায়, তাহলে এটার দায় কার? “যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়” ..এরকম ধরে ধরে মামলা করা শুরু হলে ব্লগ আর ফেসবুকে শিশুতোষ ছড়া ছাড়া আর কিছুই পোস্ট করা যাবে না।
“ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে” বিষয়টিও স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন। আমি মাজার সংস্কৃতিকে সমর্থন করি না, এখন এটা নিয়ে আলোচনা করলে যদি মাজার ফেডারেশনের ধর্মীয় অনুভূতি আহত হয়, বা কোনো বিশেষ পীরের মুরিদের ধর্মানুভূতি আহত হয় সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? “কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়”- হচ্ছে সবচাইতে মজাদার একটা বাক্যাংশ। এর প্রয়োগ শুরু হলে আপনি কোনদিনই বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত থেকে শুরু করে কোনো সংগঠনেরই সমালোচনা করতে পারবেন না। সেই সমালোচনা উস্কানি হিসেবে গন্য হতে পারে।
এই সব বিবেচনা করে আমার মনে হয় আমাদের সবার উচিত হবে “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬” নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা শুরু করা। সরকার ধর্মানুভূতি পুনরুদ্ধার কমিটিতে দুইজন আলেমকে রেখেছে যাঁরা কোনটাতে ধর্ম আহত হয় কোনটতে হয় না সে বিষয়ে মতামত দিবেন। কিন্তু এই কমিটিতে কোনো ব্লগ কর্তৃপক্ষকে রাখা হয়নি, ব্লগারদের প্রতিনিধি তো দূর অস্ত। এরকম গোলমেলে পরিস্থিতিতে একক ব্লগারদের মুক্তির আন্দোলনেই বিষয়টিকে দেখলে চলবে না, আমাদের উচিত হবে গোটা আইন আর প্রক্রিয়া নিয়ে জোরালো আলাপ শুরু করা। নইলে আগামীতে সকাল বিকাল ব্লগার গ্রেফতার হতেই থাকবে, তখন বাইরে দাঁড়িয়ে মুক্তি চাওয়ারও লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

Friday, March 1, 2013

শাহবাগ আন্দোলন ও ধর্ম

শাহবাগ আন্দোলন কী, কেন, এবং কাদের দ্বারা সংগঠিত, আন্দোলন শুরুর এতদিন পর সেটা আলোচনা করার আর তেমন প্রয়োজন নেই। নিকট অতীতের রাজনৈতিক পর্যালোচনায় খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা কিংবা কোন ধরনের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ছাড়া লক্ষ লক্ষ মানুষ যে শুধুমাত্র দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসায় দিনের পর দিন শান্তিপূর্নভাবে দাবি আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারে, তা সত্যিই অভুতপূর্ব, অসাধারন। কে নেই সেই আন্দোলনে - নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, ছাত্র-মজুর, শিল্পপতি-ভিক্ষুক - তিরিশ লক্ষ মানুষ হত্যার বিচার নিয়ে সবার পথ আজ শাহবাগ। এই আন্দোলনে শরীক প্রতিটি মানুষ কোন না কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতে পারেন, কিন্তু নিজের আত্মা বিকিয়ে দেয়া চাটুকার নন।
আন্দোলন শুরুর কয়েকদিনের ভিতরেই জনগনের অবস্থান বুঝতে পেরে আওয়ামীলীগ ও কয়েকটি বাম দল আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। দ্বিধায় পড়ে যায় বিএনপি। তারা তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলাম-কে ছেড়ে আসতে পারে না। একদিকে বিএনপি'র সাদেক হোসেন আন্দোলনকারীদের প্রতি সন্মান জানান, অন্যদিকে হান্নান শাহ এটাকে সরাসরি সাজানো নাটক বলে অভিহিত করেন। তবে আন্দোলনকারীরা কোন নির্দিষ্ট দলের প্রতি প্রেম বা বিরাগ প্রদর্শন না করে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা দারুন বিচক্ষনতার পরিচয় দেন। তবে আন্দোলনে সারাসরি আঘাত আসে যুদ্ধাপরাধীদের মুল আস্তানা জামায়াতে ইসলাম এবং তাদের সমমনা কয়েকটি ইসলামী দল থেকে। ১৫ ফেব্রুয়ারী নিজ বাসার সামনে খুন হোন ব্লগার রাজিব হায়দার যিনি থাবাবাবা নিক নিয়ে ব্লগে লেখালেখি করতেন। বিভিন্ন কমিউনিটি ব্লগে কিছু ব্লগারের ধর্ম বিরোধী লিখার অংশ বিশেষ অথবা কোন কমেন্টের স্ক্রীণ শট নিয়ে লিফলেটে ছাপিয়ে জামাতের কর্মীরা শাহবাগ আন্দোলনের প্রতিটা ব্লগারকে ইসলাম অবমাননাকারী নাস্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালায়। নিজেদের পিঠ বাঁচাতে দেশের সাধারন ধর্মপ্রান মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তারা আবারও বেছে নেয় তাদেত বহুল ব্যাবহৃত ব্যবসায়িক অস্ত্র - ইসলাম।
ধর্মকে ব্যবহার করে আধিপত্যবাদী অপশক্তির নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা আমাদের উপমহাদেশে নতুন কিছু নয়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পাকিস্তানের শাসকরা আমাদের উপর যখন বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দূ ভাষা চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করে হয়, তখনও বলা হয়, বাংলা হচ্ছে হিন্দুয়ানী ভাষা। আসল মুসলামানের ভাষা হচ্ছে উর্দূ। এমনকি আরবী হরফে বাংলা লিখা চালু করারও একটা চেষ্টা করা হয় তখন। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র সফল হয় না। রক্তের বিনিময়ে বাঙ্গালী তাদের মাতৃভাষার সন্মান রক্ষা করে। ১৯৭১-এ আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকে ইন্ডিয়ার হিন্দুদের দেশ ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। ইন্ডিয়ার হিন্দু আর বাংলার 'কাফির' হয়ে যাওয়া মুসলমানদের হাত থেকে ইসলামকে রক্ষা করার জন্য এদেশীয় কিছু বেঈমানকে সাথে নিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা-লুন্ঠন-ধর্ষন জায়েজ করার চেষ্টা চালায়। গণীমতের মাল বলে আমাদের মা-বোনদের পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেয় রাজাকার, আল বদরেরা। ১৯৯০ সালে তীব্র গণআন্দোলন নস্যাত করার জন্য স্বৈরশাষক এরশাদ সামনে নিয়ে আসে ধর্ম কে। ৯০-এর ৩০ অক্টোবরে ভারতের বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার জন্য মিছিল করে ভারতের হিন্দু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। পুলিশের বাঁধার মুখে ঐদিন মৌলবাদীরা সফল হতে পারেনি। ৩১ অক্টোবর এরশাদের প্রাক্তন মন্ত্রী রাজাকার মাওলানা মান্নানের দৈনিক ইনকিলাবে বড় হেডিং-এ ছাপা হয় বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার মিথ্যে সংবাদ। সেই সাথে তীব্র উস্কানীমূলক বক্তব্য। সুযোগসন্ধানী মৌলবাদীশক্তি ভাংচুর করে ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ হিন্দুদের বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এতো কিছুর পরও শেষ রক্ষা হয়না এরশাদের। মাত্র এক মাসের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক ধর্মভীরু, কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়। ধর্মকে ব্যবহার করে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় হয়তো সাময়িক বিভ্রান্ত হয়, কিন্তু শেষপর্যন্ত কোন ষড়যন্ত্রই সফল হয়না। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে যে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, সেদেশে এতো চেষ্টা আর বিনিয়োগের পরও জামাত-শিবিরের ভোট ব্যাংক তাই নগন্য।
২০১৩ ফেব্রুয়ারীতেও তাই রাজাকারগোষ্ঠী নিজেদের রক্ষায় আবারও বেছে নিয়েছে ধর্মকে। ধর্মের অপব্যাক্ষ্যা দিয়ে, দৈনিক সংগ্রাম, নয়া দিগন্ত, দিগন্ত টেলিভিশন-এর মতো দলীয় মুখপাত্র-কে কাজে লাগিয়ে তারা শাহবাগের আন্দোলনকে ইসলামের বিরুদ্ধে নাস্তিকদের আন্দোলন হিসেবে চালিয়ে দেবার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিএনপিপন্থী পত্রিকা দৈনিক আমার দেশও সরাসরি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষাবলম্বন করেছে। ২২ ফেব্রুয়ারী দৈনিক আমার দেশ পাঁচজন ব্লগারের ছবি ছাপিয়ে তাদের ধর্মদ্রোহী হিসাবে আখ্যায়িত করে। এ সংক্রান্ত খবরে কিন্তু স্বঘোষিত নাস্তিক আসিফ মহিউদ্দিন ছাড়া অন্যকোন ব্লগারের ইসলাম বিদ্বেষী কোন লেখাই প্রমান হিসাবে উপস্থাপন করতে পারে না। মিডিয়া মালিকানার জোরে একজন মুসলিম ব্লগারের ধর্মবিশ্বাসকে হেয়প্রতিপন্ন করা আমার দেশ এবং তার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে অমি রহমান পিয়াল তার ফেসবুক ষ্ট্যাটাসে উনার ব্লগ থেকে যেকোন একটি ইসলাম বিরোধী লেখা দেখানোর চ্যালেঞ্জ দেন। সেইসাথে তিনি আরো বলেন, যদি উনার ইসলাম বিরোধী অবস্থানের কোন প্রমান দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা রাজাকার গোলাম আযমের আপন সন্তান হিসাবে গন্য হবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৈনিক আমার দেশ বা তার সহযোগীরা এরকম কোন প্রমান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। সাংবাদিকতার নূন্যতম এথিকস ব্যবহার করে আমার দেশের পক্ষ থেকে ঐসব ব্লগারদের সাথে যোগাযোগের কোন চেষ্টাই করা হয় নি। অথচ একট মনগড়া সংবাদ পরিবেশন করে কয়েকজন ব্লগারকে কাফির নাস্তিক উপাধি দিয়ে দেয়া হলো।
এতো গেলো ঢাকার হিসাব। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্নপ্রান্তে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চকেও একই কায়দায় টার্গেট করা হয়েছে। ধর্মই হলো মূল বিষয়। সিলেটের কথা ধরলেই দেখা যাবে এখানকার মঞ্চের প্রধান সংগঠকদেরকে নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে পত্রিকায় চিঠি পাঠিয়ে তাদেরকে কাতল করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফেইসবুকের বিভিন্ন পেইজে এদের ছবি দিয়ে নাস্তিক হিসাবে ক্যাপশন সেটে দিয়েছে।
একই ভাবে চারজন ব্লগারের ছবি ছাপিয়ে তৌহিদী জনতার ব্যানারে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে মিছিল করে সাম্প্রদায়িক শক্তি। মিছিলপূর্ব এক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন হাটহাজারী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের (?) মুহাদ্দিস জনাব শামসুল আলম। শাহবাগে বিচারের নামে ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদে সমাবেশে আরও অনেক মাওলানা বক্তব্য রাখেন। অথচ শাহবাগে কোন বক্তা কোনদিন তার বক্তব্যে ইসলাম অবমাননা করেছেন তার কোন স্পেসিফিক প্রমান তারা দেখান নি। হ্যা, শাহবাগে জামায়াতে ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়, এটা সত্য। এখন প্রতিবাদ সভার ঐ মাওলানাদের কাছে যদি জামায়াতে ইসলাম আর কোটি মানুষের ধর্ম ইসলাম সমার্থক হয়, তাহলে আমার কিছুই বলার নেই।
কোন মুসলিম-কে নাস্তিক বলা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর স্পষ্ট নির্দেশ - 'যদি একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমকে কাফির বলে, অথচ যদি সে তা না হয়, তবে সেটা যে ডাকলো তার উপর চলে যাবে (সহীহ বুখারী)'। ''কেউ যদি একজন বিশ্বাসীকে অবিশ্বাসী (কুফর) হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে সে একজন খুনীর সমান অপরাধ করলো'' (তীরমিযী)। তাহলে বিনা প্রমানে, কোন ধরনের নিয়মনীতির বালাই না রেখে যেসব মিডিয়া ও রাজনৈতিক দল মুসলমান ব্লগারদের ঢালাওভাবে নাস্তিক বলে আন্দোলন বানচালের চেষ্টা করছে, পবিত্র হাদিস অনুসারে তাদের প্রকৃত চেহারা কী?
কথিত আছে, একবার যুদ্ধের ময়দানে একজন সাহাবীকে তার বিপক্ষ দলের একজন সালাম দেন। কিন্তু তারপরও ঐ সাহাবী সালামদানকারী ব্যাক্তিকে হত্যা করেন। রাসূল (সাঃ) যখন এই ঘটনা শোনেন, তখন তিনি ঐ সাহাবীকে ডেকে হত্যার কারন জিজ্ঞেস করেন। সাহাবী উত্তরে বলেন, তাঁর মনে হয়েছে নিহত ব্যাক্তি নিজেকে বাঁচানোর জন্য মুসলিম সাজার ভান করছিলো। রাসূল (সাঃ) রাগতঃস্বরে বলেন, তুমি কী তার হৃদয় ছিড়ে দেখেছো তার ভিতরে কী আছে? পবিত্র কোরানে মহান আল্লাহ নির্দেশ দেন - “তোমরা যারা বিশ্বাস কর, তারা যখন আল্লার পথে যুদ্ধে যাও, তখন সতর্ক থাকবে। এবং কেউ যদি তোমাকে সালাম দেয়, তাকে বলোনা 'তুমি বিশ্বাসী নও', শুধুমাত্র পার্থিব সম্পদের আশায়, আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য আছে অনেক পুরষ্কার। তোমরাও তো আগে এরকমই ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি সদয় হয়েছেন। তাই সতর্ক হয়ে যাও। নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের সবকিছুর ব্যাপারে অবগত'' (৪:৯৪)। যুদ্ধের মতো ভয়ংকর সময়েও যখন শুধুমাত্র একটি সালাম একজন ব্যাক্তিকে মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য যথেষ্ঠ, তখন বর্তমান সময়ে, ইসলামের কোন নির্দেশে, বিনা সাক্ষ্য-প্রমানে আমরা একজন আরেকজনকে অবিশ্বাসী নাস্তিক আখ্যা দেই? উপরের আয়াত কিংবা হাদিসগুলো কী তাহলে তৌহীদি মাওলানারা জানেন না? কিভাবে সম্ভব? তারা তো একেকজন একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (?) শিক্ষক। নাকি তারা জানেন, অথচ মানেন না? ইসলামকে অন্তর দিয়ে উপলন্ধি করেন না? আল্লাহ আদেশ দেন, '' হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মান্য কর, এবং যখন রাসূলের কথা শুনছ, তখন বিমুখ হয়ো না। তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হইয়ো না যারা বলে 'আমরা শুনেছি', অথচ তারা শোনে না। সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহতালার কাছে তারাই সবচেয়ে নিম্নস্তরের, যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে মূক ও বধির, যারা উপলন্ধি করে না'' (সূরা আনফাল)।
তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নেই ব্লগাররা নাস্তিক, তাহলে কী ৭১ এর ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী অযৌক্তিক হয়ে যায়? না কী বাংলাদেশে শুধুমাত্র আস্তিকরাই কথা বলার অধিকার রাখে? ৪/৫ জন ব্লগারের ধর্ম বিশ্বাসের দায় কী সারা বাংলাদেশের লক্ষাধিক ব্লগারের উপর চাপিয়ে দেয়া যায়? শাহবাগবিরোধী মাওলানাদের কথামতো যদি সব ব্লগারই নাস্তিক হয়ে যায়, তাহলে মাওলানা নিজামী কিংবা মাওলানা সাঈদীর মতো উনাদের সবাইকে রাজাকার হিসাবে আখ্যায়িত করা যাবে? আমার পরিচিত এক হুজুর গতকাল ব্লগারদের নাস্তিকতা নিয়ে খুব লেকচার দিচ্ছিলেন। উনাকে এই প্রশ্নটা করা মাত্রই উনার মনে পড়ে যায় যে উনার আসরের নামাজের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে। আমার প্রশ্নের উত্তর পাই না। নিজেকে শান্তনা দেই যাক আমার জন্য হুজুরের নামাজটা মিস হয়নি।
শাহবাগ আন্দোলনকে নাস্তিকদের আন্দোলন আখ্যা দিয়ে যে ফায়দা লোটার প্রক্রিয়া শুরু করেছে জামায়াত তার সবচেয়ে বড় ফল তারা তুলেছে ২২ ফেব্রুয়ারী। মহান ভাষা দিবসের ঠিক পরেরদিন দেশের আনাচে কানাচে তারা তান্ডব চালিয়েছে শহীদ মিনারে। খেয়াল করে দেখুন বিষয়টা, নাস্তিক ব্লগারদের কথা বলে তারা টার্গেট করেছে শহীদ মিনারকে। আমাদের ভাষা শহীদ, স্বাধীণতা যুদ্ধের তিরিশ লাখ শহীদের স্মৃতি ধারণ করা শহীদ মিনার, আমাদের স্বার্বভৗমত্বের প্রতিক শহীদ মিনারকে কারা টার্গেট করতে পারে। এর উত্তর পানির মতো সহজ। যারা একাত্তুরে এই এই দেশকে অস্বিকার করেছে, যারা অবলিলায় দেশের মানুষকে খুন করেছে, যারা এই চার দশক পরেও স্বিকার করে না বাংলাদেশকে, তারাই হামলা চালিয়েছে শহীদ মিনারে। এই হামলার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে, ধর্ম রক্ষা কিংবা নাস্তিক বিরোধী আন্দোলন মূলত তাদের ক্যামেফ্লেজ। তারা আসলে এর আড়ালে আমাদের স্বাধীণতার চেতনাকেই হত্যা করতে চায়।