Monday, April 1, 2013

৫৭ ধারা নামের কালো আইন

গ্রেফতারকৃত ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার অনলাইন এক্টিভিস্টরা। 'সকল' ব্লগারের মুক্তির দাবিতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার একটি আন্দোলন চোখে পড়ল। এর বাইরে একটা জিনিস আড়ালে পড়ে যাচ্ছে, সেটি হচ্ছে “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬” এর ৫৭ ধারা নামের কালো আইন।

২০০৬ সালে রাজনৈতিক ডামাডোলের ফাঁকে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এই আইনটি পাস করে ফেলেন। সেকালে বাংলা ব্লগের উন্মেষকালে অনলাইন কমিউনিটি এত বড় ছিল না, তাই আইনটি নিয়ে তেমন আলাপ হয়নি। দুঃখের বিষয়, পরবর্তীতে বাংলা ব্লগ একটু শক্তিশালী হওয়া শুরু হলেই ব্লগার নেতারা আরো জোরালো ও শক্তিশালী আইনের আশায় “সাইবার আইন” এর দাবিতে একটা ব্লগ দিবসও পালন করেছিলেন।
আমরা অনেকেই তখন এরকম কালো আইনের বিরোধিতা করেছিলাম। সেই বিরোধিতার কারণে “সাইবার আইন” এর আবদারকারীরা আমাদেরকে রুটিন মেনে দুইবেলা গালাগালি করেছেন। ইতিহাসের নির্মম কৌতুক এই যে সাইবার আইন আমাদের বিরোধিতায় নাড়াচাড়া হওয়া বন্ধ হলেও ঐ আইনের আবদারকারীদের এক সর্দার ব্লগারই এখন সাইবার আইনের পূর্বপুরুষ এই “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুিক্ত আইন, ২০০৬” এর ৫৭ ধারার বলে গ্রেফতার হয়েছেন। আপাতত আত্মগোপনে থাকা 'ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়ার' অভিযোগে সরকারের  লিস্টেড ব্লগারদের মাঝেও এই সাইবার আইনের ব্যাপারে মহা উৎসাহী হয়ে একেবারে প্রধানমন্ত্রী অফিসের কর্মকর্তাকে দাওয়াত করে নিয়ে আসা লোকজনও আছেন। আজ সাইবার আইন আসার আগেই এই অবস্থা, ঐ সময়ে সাইবার আইন আনতে পারলে আজকে দেশের বড় সংখ্যক ব্লগারই বোধহয় জেলের ঘানি টানতে টানতে কাঁধে কড়া ফেলে দিতেন।
এই মহাকৌতুক দেখে এখন একগাল হাসলেও কেউ দোষ দিতে পারবেন না নিশ্চয়ই, কিন্তু একথা ভুললে চলবে না যে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন দেখলে আলুপোড়া খাওয়ার সময় নেই, কারণ লাগোয়া চালে আগুন লাগলে নিজের বাড়িও পুড়বে।
এখন সময় হচ্ছে “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬” এর কালো ধারা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়া।
আইনে বলছে, “৫৭ (১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।” এই আইনের স্পষ্টিকরণ না হলে কালো আইন হিসেবে এর অপব্যবহার এখন ডালভাত হয়ে যাবে।
এই আইন দিয়ে দুনিয়ার যেকোনো জিনিসকেই অনলাইনে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। “দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন” এরকম কিছু প্রকাশ করা যাবে না মানে কী? যেকোনো ওয়েব প্রকাশনা দেখলে বা শুনলে আরেকজন যদি অসৎ হয়ে যায়, তাহলে এটার দায় কার? “যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়” ..এরকম ধরে ধরে মামলা করা শুরু হলে ব্লগ আর ফেসবুকে শিশুতোষ ছড়া ছাড়া আর কিছুই পোস্ট করা যাবে না।
“ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে” বিষয়টিও স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন। আমি মাজার সংস্কৃতিকে সমর্থন করি না, এখন এটা নিয়ে আলোচনা করলে যদি মাজার ফেডারেশনের ধর্মীয় অনুভূতি আহত হয়, বা কোনো বিশেষ পীরের মুরিদের ধর্মানুভূতি আহত হয় সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? “কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়”- হচ্ছে সবচাইতে মজাদার একটা বাক্যাংশ। এর প্রয়োগ শুরু হলে আপনি কোনদিনই বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত থেকে শুরু করে কোনো সংগঠনেরই সমালোচনা করতে পারবেন না। সেই সমালোচনা উস্কানি হিসেবে গন্য হতে পারে।
এই সব বিবেচনা করে আমার মনে হয় আমাদের সবার উচিত হবে “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬” নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা শুরু করা। সরকার ধর্মানুভূতি পুনরুদ্ধার কমিটিতে দুইজন আলেমকে রেখেছে যাঁরা কোনটাতে ধর্ম আহত হয় কোনটতে হয় না সে বিষয়ে মতামত দিবেন। কিন্তু এই কমিটিতে কোনো ব্লগ কর্তৃপক্ষকে রাখা হয়নি, ব্লগারদের প্রতিনিধি তো দূর অস্ত। এরকম গোলমেলে পরিস্থিতিতে একক ব্লগারদের মুক্তির আন্দোলনেই বিষয়টিকে দেখলে চলবে না, আমাদের উচিত হবে গোটা আইন আর প্রক্রিয়া নিয়ে জোরালো আলাপ শুরু করা। নইলে আগামীতে সকাল বিকাল ব্লগার গ্রেফতার হতেই থাকবে, তখন বাইরে দাঁড়িয়ে মুক্তি চাওয়ারও লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

No comments:

Post a Comment