Saturday, October 30, 2010

চাঁদের ছায়া এ-পিঠ ও-পিঠ


অতঃপর নেমে আসে চাঁদ কেওয়াছড়ার মাঠে। সেখানে কুয়াশা জমে বিন্দু বিন্দু, আলোতে চিকিমিকি করে সবুজ চাদর। ছায়াবৃক্ষ পরস্পরে প্রেম বিলায় আর বাতাসে ডানা ঝাপটায় একাকী পেঁচা। আরেকটা নাম না জানা পাখি উড়ে যায় মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিরিষ ছেড়ে, সুভাষ সচেতন হয়, একটা বাজলো। কাঠালের নিচু ডালে বাঁধা প্রাচীন ঘণ্টায় আলতো ছোঁয়ায় হাতুড়ি, ঢঙ... রাত একটা বাজলো।

সুমনা আস্তে আস্তে নিজেরে ছাড়িয়ে নেয়, শ ...অতঃপর নেমে আসে চাঁদ কেওয়াছড়ার মাঠে। সেখানে কুয়াশা জমে বিন্দু বিন্দু, আলোতে চিকিমিকি করে সবুজ চাদর। ছায়াবৃক্ষ পরস্পরে প্রেম বিলায় আর বাতাসে ডানা ঝাপটায় একাকী পেঁচা। আরেকটা নাম না জানা পাখি উড়ে যায় মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিরিষ ছেড়ে, সুভাষ সচেতন হয়, একটা বাজলো। কাঠালের নিচু ডালে বাঁধা প্রাচীন ঘণ্টায় আলতো ছোঁয়ায় হাতুড়ি, ঢঙ... রাত একটা বাজলো।

সুমনা আস্তে আস্তে নিজেরে ছাড়িয়ে নেয়, শফিকুলের হাতটা এতক্ষণ তার পেটে চেপে ছিলো। শ্রান্ত হাত সরানোর সময় হয়নি, কখন ঘুমিয়েছে নিজেই টের পায়নি। সুমনাও ইচ্ছে করেই হাতটা সরায়নি। ঘুমোতে দিয়েছে। এখন যখন সুভাষের ঘণ্টায় বেজেছে একটা, তখন নিজেরে সে মুক্ত করে। বিছানার কার্নিসে বসে কিছুক্ষণ, না, শফিকুল ঘুমুচ্ছে। ও আর জাগবে না যতক্ষণ না সুভাষ ঘন্টায় ছয়বার হাতুড়ি পেটাবে। ততক্ষণ সুমনার ছুটি, ইচ্ছেমতো কাটাবার মতো এইটুকুনই সময়।

অক্টোবরের শেষেই এখানে অনেক ঠাণ্ডা পড়ে। কুয়াশার স্তরগুলো অনেক গাঢ়। বাগানবিলাসে সাজানো সদরের দরজাটা ঝাপসা দেখায়। ব্রিটিশ আমলের সাজানো বাংলো, সামনে এক মাপে ছেটে রাখা ঘাসের উঠোন। সুমনা নেমে আসে উঠোনে, কুয়াশায় জবুথবু দুর্বা ঘাস, পায়ে শিরশিরে ঠান্ডা লাগে, ডালিয়ার গাছটা বড় হচ্ছে, হালকা সবুজ পাতা এখন এই চাঁদের আলোতে কেমন ফ্যাকাশে দেখায়। উঠোনের এককোনে রাখা দোলনাটা দুলছে, মিহি বাতাসে দুলছে। সুমনা আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়, দুচালা ছোট্ট চালের নিচে সাদা রঙের দোলনা, দোল খেতে খেতে খেতে কোন সুদূরে হারায় সে।

স্কুল থেকে বাড়িটা কাছেই ছিলো। মাঝখানে একটা ছোট্ট পার্ক। সেই পার্ক রড দিয়ে ঘেরা। স্কুলের দিকের একটা রড কে যেনো ভেঙ্গে রেখেছিলো। সেই ফাঁক গলে অনায়াসে ঢুকে পড়তো সুমনা। তারপর তেরছা দৌড়ে পার্কের গেট পেরিয়ে বাড়ির সীমানা। একদিন অতি পরিচিত সেই ফাঁকায় কীভাবে যে আটকে গেলো সে, হাতের কাছে সাদা জামাটা ছিড়ে গেলো। এক হাতে সেটা ধরে আস্তে আস্তে ফিরে এলো বাড়ি। সেদিন পা'টা স্বতঃস্ফুর্ত ছিলো না। না ভয়, না লজ্জা, অন্য কী এক অনুভব ছিলো তার। পরিচিত রাস্তাটা বুঝি আজ থেকে বন্ধ হলো। বাড়িতে ঢুকতেই মা ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এলো। কিরে কী হয়েছে, উত্তর দেয়ার আগেই আবার বলে, যা দৌড়ে ঘরে যা, জামাটা বদলে নে। একটা শাড়ি পর। সে ভেবেছিলো জামার ছেড়াটা বুঝি মা দেখতে পেয়েছে। কিন্তু শাড়ি পরতে বলল কেনো? সাত-পাচ ভাবতে ভাবতে সে সত্যি সত্যি শাড়ি পরে ফেলে। তারপর আর ভাবনার সময় কোথায়? সাত দিনের মাথায় বিয়ে, তার দশ দিন পর এই নির্জনবাস।

প্রথম প্রথম মিশ্র এক অনুভূতি ছিলো। সারি সারি নির্জনতাটা সেভাবে বুঝতে পারতো না, আবার কখনো সখনো বড় তীব্র একা মনে হতো নিজেরে। সকালে একটু বেলা করে শফিকুল বেরিয়ে যেতো কাজে। ফিরেও আসতো বিকেল থাকতে থাকতে। নির্জনে রাত একটু আগেই আসে বুঝিবা। ভালোবাসার রকমফের তখনও করতে শেখেনি সুমনা, শুধু মনে হতো শফিকুল তারে বড়ো বেশি ভালোবাসে। মানবিক কিংবা পাশবিকের কোন পার্থক্য ছিলো না তার। নিজেও মেতে উঠতো মৌনতায়, যৌনতায়। এখন কেবলি মৌনতা টিকে আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় মৌনতাও নাই আর, সে কেবলই একখণ্ড মাংস।

শফিকুল এখন সকালে বেরোয়। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়, সন্ধ্যার আগেতো কখনই না। যেদিন সন্ধ্যায় আসে, সেদিন আবার বেরিয়ে যায় ক্লাবে। আর কোনো কোনো দিন ক্লাব ট্লাব সেরে তারপর আসে। নিয়মের মানুষ, সময় মেনে খাবে, অল্পক্ষণ টিভি দেখবে, তারপর বিছানায় যাবে, রোজ রোজ একইভাবে সুমনাকে কাছে টেনে নেবে, পরিশ্রান্ত হয়ে একইভাবে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়বে। নতুন কিছু নেই। কারখানায় বড় ঘন্টা আছে, সুভাষ সেখানে ঢং ঢং করে হাতুড়ি পেটাবে, সাড়ে ন'টায় বাড়ি ফেরা, দশটায় খাবার, তারপর টিভি, সাড়ে এগারোতে বিছানা, বারোটায় পাশ ফিরে শোয়া... এইতো।

এ বাড়িতে আসার পর, মাসখানেক কেটে গেলে কিছুটা ধাতস্থ হচ্ছে যখন, তখন একবার শফিকুলকে জিজ্ঞেস করেছিলো, সারাদিন সে কী করবে? শফিকুল অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলেছিলো,কী করবে মানে? মেয়েরা ঘরে থেকে কী করে? সবাই যা করে তুমিও তাই করবে। কথা বাড়ানোর স্বভাব কখনই নেই ওর। তাই আর কথা বলেনি। কিন্তু কী করার আছে তার? সকালে রতন আসে পুরো বাড়ি ঝাড় দিতে, তার একটু পরে আসে শান্তিময়, বাগান করা তার দায়িত্বে, চন্দ্রনাথ আসে এদেরও আগে, একেবারে অন্ধকার থাকতে থাকতে সে হাজির হয়। সকালের খাবার তৈরি তার কাজ। সবকিছুই আসলে রুটিন বাঁধা। মা খালারা যেভাবে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন সুমনার সেরকম কিছু হয় না। তবু সে মানিয়ে নেয়। শান্তিময় নিজের মতো করে যে বাগান সাজাচ্ছিল এতকাল, সেখানে টুপ করে ঢুকে পড়ে সুমনা। বারান্দায় বসে বসে অনুচ্চকণ্ঠে সে শান্তিময়কে এটা সেটা বলে, খুব দরকার হলে নিজেই নেমে যায়, তখন মনমোহিনী ছাতা ধরে রাখে তার মাথায়। শফিকুলের অনেক খেয়াল, গায়ের রংটা যাতে এতটুকু ময়লা নাহয়, সেজন্য নিয়ম করে তাকে হলুদ মাখতে হয়। একেবারে প্রথম রাতেই পেটে হাত বুলাতে বুলাতে শফিকুল বলেছিলো, এখানে মাংসের দলা তৈরি করোনা কখনো লক্ষ্মীটি, তারপর শরীরের ইতি উতি নানান ভূমিতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলেছিলো প্লিজ... প্লিজ...প্লিজ... সুমনা সেসব ভুলেনি, ভুলবে না। তাই এখনও সন্তানবতী সুমনা সেই আগের মতোনই সমান প্রিয়দর্শিনী।

আজকের চাঁদের বয়েস কতো? পূর্ণিমার আগে পরে এখানে চাঁদ এতো বেশি কাছে আসে যে বয়েসটা ঠিক ধরা যায় না, অথবা সুমনা সেসবের হিসাব রাখতে পারে না। এ বাড়ির প্রথম রাতটাই ছিলো চাঁদ রাত। বিকেলের দিকে ওরা এসে পৌঁছেছিলো। শরীরটা জুড়িয়ে নিতে না নিতেই নেমে এলো অন্ধকার, আর একটু পরেই ঝুপ করে জেগে উঠলো আস্ত একটা চাঁদ। বারান্দায় বসে বসে দুজনে চা খচ্ছিলো তারা। এমন পাগল করা জোৎস্না দেখে সুমনা বসে থাকতে পারেনি। ছুটে এসেছিলো উঠোনে। দুহাত দু দিকে ছড়িয়ে দিয়ে কয়েকটা পাক খেলো সে, তার মনে হচ্ছিল চাদেঁর আলো বুঝিবা তারে ছুঁয়ে দিলো। শফিকুলও নেমে এসেছিলো একটু পরে, স্ত্রীর পাশে দাড়ালো কিছুক্ষণ, তারপর খুব আস্তে আস্তে সাবধানে বল্লো/বলল, একবার পেছনে তাকাও, দেখো দরজায় দাড়িয়ে আছে বাবুর্চি, আয়া, এদের সামনে এভাবে চলতে নেই। একটানা বাজতে থাকা রবীন্দ্রনাথের গান যেভাবে লোডশেডিং এ বন্ধ হয়ে যায়, সেভাবেই যেনো থেমে গিয়েছিলো সুমনা। তারপর কত চাঁদ নেমে আসে এই বনজ বৈভবে সুমনা তার খোঁজও রাখে না।

রাত বাড়ছে, কুয়াশা পড়ছে আরো ঘন হয়ে। রাতের কি আলাদা কোন ভাষা আছে? সেই ভাষা পড়া যায়? যায় বোধহয়। সুমনার সেসবে কোন আগ্রহ নেই। সে শুধু জানে, এই নির্জনের মাঝে আরো নির্জনতা আসে রাতের আঁধারে। সেই আঁধারে নিজেরে খুলে দেয়া যায় ইচ্ছেমতো, কেউ দেখবে না, খাবলে খাবে না। শুধু ছুঁয়ে দেবে, কোমল সে ছোঁয়া। সুমনা আলতো পায় হেঁটে যায়, বাংলোর পেছনে টলটলে পানির একটা পুকুর আছে, তার শানবাধানো ঘাটে বসবে বলে। এখানকার সবকিছুই গোছানো, ছবির মতো, নাটকের পাণ্ডুলিপির মতো। তবু রাতের এই সময়টাতে সবকিছুই অন্যরকম মনে হয়। অভ্যস্থ পায়ে সুমনা এগিয়ে যায়।

পুকুরে একসময় প্রচুর কচুরিপানা ছিলো। বছরখানেক আগে সেসব পরিস্কার করে মাছ ছাড়া হয়েছে, আফ্রিকান মাগুর। সুমনা চাইছিলো দেশী মাছ ছাড়তে, আর পুকুরের ঠিক মাঝখানে থাকবে শাপলা। কিন্তু শফিকুল সেসব হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে। আফ্রিকান মাগুর দ্রুত বাড়ে, বিশাল সাইজের হয় একেকটা, আর খাবার দাবারও দিতে হয় না তেমন। ঘাটের পাশে একটা গামলা রাখা। রাতে মোরগ জবাই করা হয়েছে, সেটার নাড়িভুড়ি, ডানা, ঠ্যাং এসব রাখা হয়েছে। সকালে এসেই চন্দ্রনাথের প্রথম কাজ এগুলো ছুঁড়ে দেয়া। ঘাটে বসতেই মাছগুলো যেনো তার ঘ্রাণ পেয়ে যায়। শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে ভাসতে থাকে ঘাটের আশেপাশে। সুমনা উঠে দাঁড়ায়। গামলাটা হাতে নেয়। চারটা মোরগের নাড়িভুড়ি, বেশ ভারী। দুহাতে ধরে গামলা উচিয়ে ছুঁড়ে মারে, ঝুপ করে নাড়িভুড়িগুলো পানিতে পড়ে। প্রচন্ড আলোড়ন তৈরি হয় পুকুরে। পুকুরের চারপাশ থেকে মাছগুলো ছুটে আসে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। উচ্ছিষ্টগুলো ছিঁড়ে ফেলছে যেনো, মনে হচ্ছে নিজেদেরই মাংস খেয়ে ফেলবে।চাঁদের আলোয় চিক চিক করে উঠে জলের উপর ভেসে উঠা কালো কালো চামড়া। কী বিশ্রি কামড়াকামড়ি। দেখতে দেখতে সুমনার মাথাটা কেমন আউলে যায়, কয়েক ঘণ্টা আগের নিজেকেই যেনো দেখতে পায় পুকুরে... সুমনা ভাসছে... সুমনা ডুবছে... তাকে খাবলে খাচ্ছে কালো কালো হাত, নখর, দাঁত...


(এই শিরোনামে আবুল হাসান এর একটা কবিতা আছে)

Thursday, July 22, 2010

ঘোষণাপত্র

নিতান্তই এক সরল মানুষ নজমুল আলবাব
মূলত সে দুঃখবোধ নিয়েই বেঁচে থাকে
এই পত্র মারফত সে জানান দিতেছে যে
সে মরেনাই, সে বেঁচে আছে...


যারা যারা ভুলে বসে আছো বিষন্ন আলবাবকে
যারা ভেবেছো কান্নার সময় ফুরলো বলে
তাদের জন্য এই পত্র, হতাশ হতে হলো তোমাদের,
কেননা, আলবাবরা সহজে মরে না

Tuesday, July 13, 2010

হবে না

আমার কিচ্ছু হয় না, আমার কিচ্ছু হবে না,
এই কথা জেনেছি আমি আর আমার মা


ব্যর্থ মানুষেরও থাকে
হিসেবের  খাতা
আজন্ম বেহিসেবি আলবাবের তাও নেই

Saturday, July 10, 2010

এইসব উজ্জ্বল ভালোবাসা

আমি কথা বলা বন্ধ করে দিলেই তুমি বলতে, রাগ করেছি। তুমি কথা বলা বন্ধ করলেই আমি বলতাম, রাগ করেছো। তাই আমাদের কথা বলাবলি কখনো বন্ধ হতো না। অথবা রাগ হলে আমরা কথা বলা বন্ধ করেই তার জানান দিতাম।


আমরা কথা বলি না, সে অনেক দিন হয়ে গেলো। তুমি কেমন আছো তার খবর আমার কাছে নেই।, আমি কেমন আছি তার খবরও তোমার জানার দরকার পড়ে না।


এইসবব অভিমানে মিশে থাকা মৃত্যুর যন্ত্রনা থেকে আমাদের বুঝিবা আর মুক্তি নেই। কেননা আমরা জেনেছি, নিজেরে পুড়িয়ে জেনেছি সেই সত্য, ভালোবাসা মানেই কাছে থাকা নয়, প্রেম মানেই নিঃশ্বাসের দুরত্বে বসে থাকা নয়। বিরহে উজ্জ্বল হয় ভালোবাসা, এই বার্তাটারে আর কে এমন ধারণ করেছে বলো?

Thursday, June 24, 2010

লীলাবতীর কাছে খোলা চিঠি

এ অসুখ সারবে না লীলাবতী, বড়ো বেশি জীবনক্ষয় করে এ অসুখ সারে না বলে শুনেছি, হ্যাঁ, লোকে তাই বলে গতরাতে তোমার গান শুনতে শুনতে ঘুমাতে গেলাম তার আগের রাতেও বেজেছে এই গান, আজও বাজবে তোমাদের বাড়িতে নাকি রোজ সন্ধায় জোনাকীর মেলা বসে? আজ আকাশ কি তারায় ভরা? চাঁদের বয়েস কতো? তুমি কি আজ চাঁদ ছোঁবে, মাঝরাতে কি আকাশে তাকাবে? আমার হয়ে আকাশকে একটু ভালোবেসো তুমি লীলাবতী আরো অনেক দায় আমি তোমাকে দেবো, এই অসুখে দায় চাপাতে শেখায়, আমি নাহয় তোমার কাছেই হই দেনাদার এ অসুখ সারবে না লীলাবতী, এ অসুখ সারে না বলে শুনেছি।

Monday, June 21, 2010

ভ্রমণ (আনন্দময়) হয়েছে (শেষ)

১০.

সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয় হয় এমন একটা সময়ে পৌঁছে গেলাম হিরণ পয়েন্টে। বিখ্যাত স্পট। বনবিভাগের বিশাল অফিস সেখানে। আছে নৌ-বাহিনী আর মংলা বন্দরের দুটো আস্তানা। আগেরবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা সুন্দরবন নিয়ে কি একটা প্রজেক্ট আর রামসার এরিয়া ঘোষণার জন্যে সেখানে গিয়েছিলেন। বিশাল একটা ফলক লটকে আছে সেখানে। আছে এই এলাকার একমাত্র মিঠাপনির পুকুর। জেটিতে বোট বেঁধে আমাদেরকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। যথেষ্ঠ মানুষের আনাগোনা সেখানে। তবু হরিণ দেখতে পেলাম। ঘুরছে রাতের আলোতে। শুনলাম বাঘও আছে আশেপাশে। বনকর্তা জানালেন একাধিক বাঘ নাকি সেখানে আছে। প্রচুর খাবার পাওয়া যায় বলেই হয়তো এটা ঘটেছে। কারণ এর আগে শুনেছি একটা নির্দিষ্ট এলাকায় কয়েকটা বাঘ সাধারণত থাকে না। খাবার পানির পুকুর পাড়ে বসে আছি। শান বাঁধানো ঘাট। বনবিভাগের এক অফিসার গল্প করছেন। নানান কিসিমের গল্প। এইবার আর মুস্তাফিজ ভাইকে বলতে হলো না। আমি নিজেই বুঝে গেলাম, চাপা... সবটা না হলেও অনেকটাই চাপা। (জেনারেল স্যার, আমি কি কিছু শিখলাম? চোখ টিপি )

টানা চারদিন কি দুদিনও আমি মাছ খেয়েছি কোন জনমে, এটা কেউ বল্লে, আমার মা বলবেন, আপনে ভুল করতেছেন। সে আমার ছেলে না, অন্যকেউ! কিন্তু ঘটনাটা ঠিকি ঘটেছে। টানা চারদিন মাছ খেয়েছি এই ভ্রমণে। এমনতরো নানা ঘটনাই আছে। মিহি মিহি সেইসব ঘটনা একটু একটু করে মনে পড়ে। বিচ্ছিন্নভাবে মনে পড়ে।

রাতে চাঁদ নেমে এসেছিলো হাতের তালুতে। হ্যাঁ, হাতের তালুতে, শরীরে জলের ধারার মতো টুপ টুপ করে পড়েছে চাঁদের আলো। নিলকমলের জেটিতে বসে ভিজতে ভিজতে আমাদের স্বাদ মেটে না। নৌকার ছাদে বসি। সেখানে আলোর সঙ্গে যোগ হয় কুয়াশা। আমরা ভিজতেই থাকি। যতক্ষণ না খলিল ভাতের গামলা ঠেলে দেয় ততক্ষণ চন্দ্রাহত হয়ে থাকি আমরা।

শেষ কবে নায়ে ঘুমিয়েছি ভুলে গেছি। বালক বেলার সেসব ঘটনা। আমাদের নানাবাড়ির টিলার মাঝখানে ছোট্ট একটা হাওরের মতো। পুব সিলেটের ভাষায় এরকম জায়গাকে গোল বলে। বর্ষায় সেসব গোলে পানি জমে। পাশের সুরমা নদীর সাথে মিশে যায় সেই পানি। আমরা শৈশবে সেই হাওরের মতো জলায় দাপাদাপি করতাম। সেই জলে কেউ কেউ নৌকা ভাসাতো। ছোট মামা রাত জেগে সেখানে মাছ ধরতো। তার সাথে এক দুবার আমি কিংবা আমরা গিয়েছি। সেই যাওয়ার সুবাদে রাত্রিযাপনও হয়েছে। হাতের আঙুল গুনে পায়েরও শেষ হয় তবু সেই পেছনের হিসাব করতে পারি না। আমি আবার নৌকায় ঘুমালাম। বাপ্পিদা যত্ন করে বানিয়েছেন তার এই বোট। আতিয়ার ভাই সেখানে বিছানা পেতে দেন। আমরা একজন আরেকজনের মাথায় মাথা লাগিয়ে শুয়ে পড়ি। জেনারেল থেকে আবার ভাইয়ে পরিণত হন বুড়াভাই। গল্প ঘুরতে থাকে সুন্দরবন থেকে স্পেন অব্দি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টেরও পাইনি।
পায়ের দিকের একটা জানালা খুলে রেখেছিলাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সেই জানলা গলে আসা কোমল রূপালী আলোকে খেলতে দেখি আমারই পায়ে! আস্তে আস্তে উঠে বসি। দরোজা খুলে বেরিয়ে আসি। বায়ে তাকাই, ডানে তাকাই... শিরশিরে বাতাসে শরীর কাঁপে। বনের ঘ্রাণ পাই। নীলকমলের আশেপাশে হালকা পায়ে ঘুরে বেড়ায় হরিণ। আবছায়াতে তাদের দেখি আবার দেখি না। মাথার উপর উদার আকাশ... নিজেরে বড়ো ক্ষুদ্র, বড়ো বেশি তুচ্ছ মনে হয়... আমি ছৈয়ের ভেতর ফিরে আসি। গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ি...

১১.

শনিবার সকালটা একটু আগেই শুরু হলো অরূপ এর জন্যে! এম্নিতে ওরে দুপুর ১২টায়ও হাতি লাগিয়ে টেনে তুলতে হয়। হিরণ পয়েন্টে সেটা হয়নি। হলে ভালোই হতো। হরিণ দেখতে পারতাম আরো নিবিড় ভাবে। বেটা যে ভাবে থপ্ থপ্ করে হাঁটে... পাতার নড়াচড়াতেই যে প্রাণী দৌড়ে পালায়, সে এহেন থপথপে কি করতে পারে চিন্তা করেন।

কেওড়াশুটি খালের পাড় থেকে কাঠের একটা ব্রিজ চলে গেছে বনের ভেতর। সামনে এমদাদুল ভাই, পেছনে রেজাউল। রাইফেল হাতে সাবধানী হয়ে হাঁটছেন। মাঝখানে আমরা ফিস ফিস করে কথা বলছি। হাত দশেক এগিয়েছি হয়তো, ব্রিজের পাশ ঘেঁষে ভেজা মাটিতে ভেসে উঠা বাঘের পায়ের ছাপ চোখে পড়লো। সেই পায়ের ছাপ ধরে হাঁটতে থাকি, একেবারে টাটাকা স্পর্শ... একসময় দেখা যায় মামুজি ব্রিজেও চড়েছেন! রেলিং এর পিচ্চি ফাঁক দিয়ে কেমনে ঢুকিলো?? এমদাদ ভাই প্রশ্ন শুনে বলেন, বনের সবচে বড়বাঘটাও নাকি আধা ফুট উঁচু বনের ঝোপে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে!!!

আমরা আরো এগোই। সামনে থেকে হাত তুলে থামতে বলেন এমদাদুল। তার পর ব্রিজের একপাশে সরে দাঁড়ান... ব্রিজ শেষে যে হালকা উঁচু রাস্তার মতো আছে, সেখানে দাড়িয়ে আছে একটা চিত্রল হরিণ... ফটুরেদের ক্যামেরা সচল ছিলো প্রথম থেকেই। বাঘের পায়ের ছাপ তুলে রাখা হয়েছে, এবার ক্যামেরায় জায়গা করে নেয় হরিণ। কিন্তু সময় বড়ো অল্প। মিনিটেরও কম সময় আমাদের দিকে তাকিয়ে, দ্রুত সরে যায় তরুণী চিত্রল।

কেওড়াশুটির ছবি দিয়েছেন মুস্তাফিজ ভাই। তার ফ্লিকারে আরো ছবি আছে, অরূপও চমৎকার কিছু ছবি তুলেছে। সুন্দরবনের এই অংশটাকে আমার সাজানো গুছানো পরিপাটি বলে মনে হয়েছে। মনে হয়েছে আমার গ্রামের বাড়ির আধা ঘন জঙ্গলের মতো। গাছ, গাছের ফাঁকে-ফাঁকে বেশ বড়ো বড়ো খালি যায়গা। মাঝখানে মিঠাপনির একটা পুকুর মতো আছে। কিন্তু খুবি অল্প সময় সেখানে থেকেছি আমরা। আমার তৃপ্তি মেটেনি। কথা ছিলো পরে আরেকবার যাবো সেখানে, কিন্তু আর যাওয়া হয়নি। কেওড়াশুটি থেকে ফিরে হিরণ পয়েন্টেও আরো কিছুক্ষণ ঘোরা হলো। তারপর দুপুরের ভাটা শুরু হতেই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এবারের গন্তব্য দুবলার চর।

১২.

সুন্দরবনে এই মনে হয় একমাত্র চর, যেখানে ইচ্ছেমতো হাঁটা যায়। জেনারেল মুস্তাফিজ রুলিং দেন না, বা এমদাদুল রেজাউলরা বন্দুক নিয়ে পাহারা দেন না। অসম্ভব কর্মব্যস্ত একটা দ্বীপ। পাঁচ মাসের জন্যে জেলেরা এখানে থাকতে আসেন। তাই অস্থায়ী ছাপড়া ঘরে ঠাসা। আমরা যেদিন গেলাম, তার ১৫/২০ দিন আগে থেকে জেলেরা আসতে শুরু করেছেন। তখনও ঘরদোর তৈরির কাজ চলছে। এরিমাঝে ট্রলার ভর্তি করে আসছে মাছ। শিশু কিশোরদের বেশ বড় একটা অংশ সেখানে কাজ করে। তাদের মাঝে একজনের সাথে কথা হলো। আব্দুল আহাদ নাম। বাপ আর ভাই এর সাথে এসেছে চরে। খাতির হয়ে গেলো। ঘুরতে ঘুরতে তাদের ডেরায় গেলাম। তিন মাথাওয়ালা একটা লাঠি দিলো সে আমাকে। পরের দুদিন যেটা অনেক কাজে এসেছে।

আমরা হাঁটতে হাঁটতেই শুনলাম, একজনকে সাপে কেটেছে। তাকে ওঝা ঝাঁড়ফুক দিচ্ছে। দ্রুত সেখানে গেলাম আমরা। ২০/২২ বছরের এক তরুণ। আগের রাতে সাপে কেটেছে। এরপর থেকে চলছে টোটকার চিকিৎসা। দুবলার চরে বেশ কয়েকজন ডাক্তারের পতাকা দেখেছি! হ্যা পতাকা। নিজেদের নাম লিখে ডেরার সামনে লম্বা বাঁশে সেটা টাঙ্গিয়ে রেখেছেন তারা। দেখে ভারি মজা পেয়েছি। তাদেরই একজন বাক্স হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখানে। কিন্তু চান্স পাচ্ছিলেন না। মুস্তাফিজ ভাই এক প্রকার জোর করেই সেই ডাক্তারকে কাজে লাগালেন। বিষক্ষয়ের ইনেজকশন পুশ করা হলো। আমরা আবার ঘুরতে গেলাম। ফেরার সময় দেখি সেই লোক আরেকজনের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। মুস্তাফিজ কবিরাজ কিছু পথ্য বাতলে দিলেন এইবার। হাসি

পূর্ণিমার আগের রাত, তাই সে রাতে চাঁদ আরো বেশি মোহনীয়তা নিয়ে জেগে ছিলো আমাদের সাথে। মধ্যরাত পর্যন্ত বোটের ছাদে আড্ডাবাজি হয়েছে। তবে গতভ্রমনের মতো আমরা কেউ কিছুই হারাইনি। সবার সবকিছু ঠিকমতোই ছিলো। হাসি

আগের রাতের মতো এ রাতেও ঘুম ভাঙলো। তবে মাঝরাতে নয়, শেষরাতে। জেগেই বুঝলাম, কেমন একটা অস্বাভাবিক অবস্থা। বাইরে বেরিয়ে দেখি ধারণা ঠিকি আছে। বাপ্পিদা সমানে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করছেন। আতিয়ার ভাই আর ওহাব ঠান্ডা কনকনে জলে দাপাদাপি করে সে গাল হজম করছে। ভাটির কারণে চরে উঠে পড়া বোট নিচে নামানোর চেষ্টা করছেন। অপূর্ব একটা চাঁদ আকাশে, তার আলো কুয়াশার চাদর মেখে আমাকে ডাকে। কিন্তু বাপ্পিদার চেচামেচির কারণে সে ডাকে সাড়া দেয়া হয় না।

সারারাত মাছ ধরে ভোরের আলোর সাথে সাথে ফিরে আসে সারি সারি ট্রলার। নির্জনতা খান খান হয়ে যায়। মানুষের কণ্ঠের নিচে চাপা পড়ে সমুদ্রের গম্ভীর গর্জণ। ফটুরেরা ফটুক তুলেই যাচ্ছেন। নিঃসঙ্গ আমি হাটতে থাকি সৈকত ধরে। আব্দুল আহাদকে খুঁজি। পাই না। হঠাৎ দেখি আতিয়ার ভাই লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্বীপের ভেতরের দিকে যাচ্ছেন। আমি সৈকত ধরে তেরছাভাবে হেঁটে হেঁটে তাকে ধরার চেষ্টা করি। পেছন পেছন হেটে প্রায় ধরে ফেলি। লম্বা মানুষ, ছ'ফুটের ওপরে হবে উচ্চতা। চোখের লেবেল ধরে তাকালে আমি তার বুকটাই দেখি শুধু। সেদিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করি, কই যান...? উল্টা প্রশ্ন আসে,- 'কি দিয়া আইছেন? নৌকা না নঞ্চ?' ধাম করে আমার মাথা উপর দিকে উঠে যায়। ঘাড় উচিয়ে মুখটা দেখেই বলি, 'নৌকা'... আমার কথা তার কানে যায় বলে মনে হয় না। মেলায় যাইবেন? ঘাড় নাড়ি, তার সাথে যাবার কথা বলে... আমি পিছিয়ে আসি। ফিরে আসি পাড়ে। দেখি রিফাত-১ এর ছাদে বসে আছেন আতিয়ার ভাই!

ফটুরেরাও ফিরে আসেন। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে আমরা দ্বীপের আরো ভেতরে ঢুকি খাল বেয়ে। মেজর জিয়া উদ্দিনের লিজ নেয়া অংশে যাই। সেখানে রাস উপলক্ষে মেলা বসেছে। দুর থেকেই দেখতে পাই কর্পোরেট দানব সেখানেও পৌঁছে গেছে। যে দ্বীপে ফোনের নেটওয়ার্ক নাই সেখান ফেস্টুনের মাধ্যমেই সেবা পৌছে দিচ্ছে মোবাইল ফোন কোম্পানি। মেলা ঘুরে দ্বীপের আরো ভেতরে চলে গেলাম। নিউমার্কেট নামের এক যায়গার কথা শুনছি তো শুনছিই। সেখানে যাওয়া হলো। হাঁটছি সবাই। ফটুক খিচা হচ্ছে। হঠাৎ দেখি আমার আতিয়ার ভাই শুয়ে আছেন এক দোকানে।

দুবলার চরের মেলা আমাকে হতাশ করেছে। এটা দেখে মনে হয়েছে,বাণিজ্য করার প্রাণান্তকর চেস্টা করছে কিছু মানুষ। তাই ফুলিয়ে ফাপিয়ে নানান কথা ছড়িয়ে দিচ্ছে মেলার ব্যাপারে। তবে রাশ উপলক্ষে হওয়া স্নানটা হয়তো অন্যরকই হবে। সেটা দেখিনি, তাই কিছু বলতে পারছি না। কারণ আমরা দুপুরেই ফিরে আসি দুবলার চর থেকে। আবার গন্তব্য হিরণ পয়েন্ট। যে বর্ণনা ইতিমধ্যে দিয়ে ফেলেছেন মুস্তাফিজ ভাই। আমি শুধু অরূপ কাগুর জন্যে একটু চোখের পানি ফেলি এখানে। বেচারা, এতো কাছে গিয়েও কিছুই দেখতে পেল না। শালার বস্তার মতো পেটই এইজন্যে দায়ী। এইটার জন্যেই এখন পর্যন্ত 'তোমরা বন বিড়ালের ডাক শুনে পালিয়ে এসেছো' এই কথা বলে মনে শান্তি পেতে চাইছে।

১৩.

রোববার রাতে হিরণ পয়েন্টে থেকে, মাঝরাতেই আমরা চলতে শুরু করেছি। জোয়ারের সাথে সাথে ডাঙ্গায় ফিরতে থাকে বাপ্পিদার বোট। কিন্তু চলতে যেনো তার সমস্যা হচ্ছিল। একসময় ঘড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড় করে অদ্ভুৎ এক ধাতব শব্দ করে থেমে গেলো ক্ষরস্রোতা নদীতে। ততক্ষণে ভাটা শুরু হয়ে গেছে। অসিত গেরাফি (নোঙর) ফেলেও বোট আটকাতে পারে না। এরিমাঝে শুনি বাপ্পিদা কাকে যেনো বলছে, ট্রলার নিয়ে আসতে। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি তার কানে মোবাইল, পকেট থেকে বের করি সবাই প্রায় একসাথে... আবার শুরু হয় তবে যন্ত্রের জীবন।

শোনা যায় বাঘে নিয়ে যাওয়া এক মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে সেই ট্রলারের মাঝি, তাই আমাদের উদ্ধারে দেরি হচ্ছে। আমরা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা আসছে বলে বাপ্পিদাকে ক্ষেপাই একদিকে, আরেকদিকে এমদাদ ভাই মোবাইল ফোনে জানা ঘটনা যখন বর্ণনা করে, তখন ঝিম মারি। এমন সময় দুরে খুব দুরে দেখা যায় একটা বিন্দু। আমাদের দিকেই তাক করা তার মুখ। দ্রুত সেই বিন্দুটা রূপ নেয় একটা স্পিডবোটে। বনবিভাগের এসিএফ রাজেশ চাকমা এসে স্পিডবোট ভেড়ান। আগের দিনে ধুবলার চলে তার সাথে পরিচয় হয়েছিলো। দুর থেকে মনে হয়েছে আমরা কোন সমস্যায় পড়েছি, তাই এসেছেন। রিফাত নামের বোটে শেষবার খাবার খেলাম আমরা। ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছে অন্য ট্রলার। বাঘের ফেলে যাওয়া মাংশের টুকরা লুংগিতে পেচিয়ে হতভাগ্য পরিবারের কাছে পৌছে দিয়েছেন বনপ্রহরীরা। তাদের কাছ থেকে সেই গল্প শুনেছি, মোবাইলে তোলা ভিডিও দেখেছি, কিন্তু সেসব বলার ইচ্ছা আমার একেবারেই নাই।

শেষ

এসিএফ আমাদেরকে শ্যামনগরে পৌছে দেবেন বল্লেন, তিনি থাকলেন বোটে। তার স্পিডবোট আমাদের নিয়ে ছুটলো। পেছনে ফেলে এলাম চমৎকার কিছু মানুষকে। একেবারেই অন্যরকম কয়েকটা জীবন। বড়ো সরল, বড়ো বিশাল তাদের মন। সুন্দরবনের বিশালতাকে আমি ছুতে পেরেছি হয়তো, এইসব মানুষের পারিনি। মানুষ এমনই মনে হয়। কাছে গেলেও যায় না চেনা, ছোয়ে দিলেও হয় না ছোঁয়া...

Sunday, June 13, 2010

পুনর্বার কয়েক টুকরো দিন যাপনের গল্প...

পানি বাড়ছে রোজ। সকালে একবার করে নদীর পারে যাই। পানি দেখি, হু হু করে বাড়ছে। রোজ বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি ছাড়া কোন ২৪ ঘন্টা পাচ্ছি না। কোন কারণে দিনে রোদ দিতে হবেই এমনটা হলে, সকালটা ভিজিয়ে যাচ্ছে! আর সারাদিনের রোদ এর শোধ তুলে রাতে। আমার সবচে প্রিয় বাহন মোটর সাইকেল। ১৬ বছর ধরে টানা চালাচ্ছি। তবু শখ মেটে না। বৃষ্টির কারণে এটা চালাতে পারছি না। দারা-পুত্র নিয়ে চলতে হয়, আমার ভেজার শখ তাদের উপর দিয়ে চালালেতো হবে না। তাই বাক্সোবন্দি হয়ে চলাফেরা করি।

প্রায় তিনটা মাস ধরে মহা বিশ্রি এবং বাজেভাবে সময় কাটাচ্ছি। আব্বা আম্মা দুজনেই দেশের বাইরে, বাড়িটা পাহারা দিয়ে রাখতে হচ্ছে। সন্ধ্যা হলো, হাস মুরগি ঘরে তোলো, এই বাক্যের সাথে নিজেরে মিলিয়ে দিতে হয়েছে এতদিন। তার উপর রোজ বাবাইকে তার নানার বাসায় রেখে আসতে হয়েছে সকালে, আবার বিকালে নিয়ে আসো। এজন্যই মূলত নদীর সাথে নতুন করে প্রেম প্রেম একটা ভাব হয়েছে।

আমি নদীবর্তী মানুষ। হাওর-নদীর জলজ পরিবেশ ও প্রকৃতিকে সঙ্গী করে বড়ো হয়েছি। নাগরিক হয়ে উঠিনি তবু নগরেই থাকি, তাই এখন জলের গভীরে আর যেতে পারি না। বৃহস্পতিবারে সুরমা পাড়ি দিতে হলো। ক্বীন ব্রিজের উপর থেকে দেখলাম খেয়া নৌকা। কালিঘাটের দিকে ভিড়ছে। যেখানে ভিড়ছে সেই যায়গাটা চিনি। কিসমত ট্রেডার্সের বারান্দা সেটা। আমাদের অসংখ্য পাগলামির সাক্ষি এই কিসমত ট্রেডার্স। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ফেরার সময় খেয়া নৌকায় নদী পাড়ি দেবো।

বাজারে এখন এক টাকার কয়েনের আকাল। টাকার বদলে দোকানদার চকলেট ধরিয়ে দেয়। পকেট ভর্তি হয়ে যায় কোন কোন দিন। আশ্চর্য বিষয় হলো, দোকানিরা আপনাকে চকলেট ধরিয়ে দিচ্ছে ঠিকই। কিন্তু আপনি দিতে গেলে সেটা কিন্তু রাখছে না! এ নিয়ে কয়েক দফা ঝগড়া করে ফেলেছি। আমি দরবারী (ঝগড়াটে) মানুষ, তাই লোকজনে বেশি পাত্তা দেয় নাই। খেয়া নৌকায় উঠে দেখি সেখানে বিস্তর ভাংতি পয়সা। আট আনা (পঞ্চাশ পয়সা) দিতে হয় নৌকায়, ঘাটে আরো আট আনা। টাকা দিলে সিলমারা টোকেনও দিচ্ছে! এই ভরা সুরমা এক টাকায় পারাপার! এতো সস্তা হলোতো বেশি বেশি হয়ে যায়।

সুরমার পানি এখনও বেশ ভালো। শীতের সময় পানিপ্রবাহ কমে গেলে সেখানে অনেক ময়লা দেখা যায়। তবে এখনতো ভরাট যৌবন। বাজি ধরে এই নদী সাতরে পাড়ি দিয়েছি। দশ টাকার জন্যে হাতের মুঠোয় নিয়েছি জীবন! লাখ টাকাতেও কি এখন এই মোটা পেট নিয়ে সেই সাহস দেখাবো? মনে হয় না। সাথে থাকা এক ছোটভাই ক্যাট ক্যাট করে সেটাই বুঝিয়ে দিলো। নৌকা ডুবার চান্স নাই। তবু বলে, পড়ে টড়ে গেলে সাতার দিয়েন না। যাস্ট ভেসে থাকবেন, তাইলেই তীরে পৌছে যাবেন। বেটারে আর বলা হয় না, নলুয়ার হাওরে সাতার শিখেছিরে বেটা, আর ১৭/১৮ বছর আগে এই নদী আরো অনেক বেশি চওড়া ছিলো...

টুকুদা আমাকে দেখে বেশ অবাক। নদীর দিক থেকে এসেছি বলে। আগের কিছুই নেই আর। একা একা বসে আছেন, ব্যবসা নাকি নাই। ঘর ভর্তি পেয়াজ রসুনের বস্তা পড়ে আছে, ক্রেতা নাই। পানি বাড়ার কারণে লোকজন আসছে না। তাই পাইকারি বাজারের এই দশা। এই গদিতে বসে দিনের পর দিন আমরা আড্ডাবাজি করেছি। ঢাকা হোটেল থেকে ভাত আসতো। তারপর শুরু হতো ভয়ঙ্কর খানাদানা। আমার জীবনে এমন নিয়মিত খাদকাড্ডা আর কখনো দেখতে পাবোনা সম্ভবত। আট বছর আগে নাকি ঢাকা হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে! এর মানে কি? গত আট বছর আমি বেখবর হয়ে আছি! হায় সময়! কিভাবে সম্ভব হয় এসব?


২.

সিনেমা দেখা আমার তেমন হয় না। টিভিও না। মাঝে মাঝে খবর দেখি, কিন্তু ছেলের সাথে যুদ্ধে বেশিক্ষণ টিকতে পারি না। নেটস্পিডও ইদানিং এতো কম পাই, পংকি ভাইর দোকান কিংবা রিহার্সাল কিছুতেই যাওয়া হয় না। তুলি প্রায় প্রতিদিন একটা করে সিনেমা নিয়ে আসে। বসে বসে সেটা দেখি। আমার সিনেমা দেখার তরিকাতে সমস্যা আছে। একটা সিনেমা অসঙখ্যবার দেখি। একেবারে ছ্যাবড়া বানিয়ে ফেলি মাঝে মাঝে। বাবাই নিজেও এই পদ্ধতি পছন্দ করে। মুন্নাভাই সিনেমাটা তার ভালো লাগলো, শুরু হলো দেখা। রোজ রোজ দেখা হচ্ছে বলে আমি গুনতে শুরু করলাম, ৭০/৮০ বার গুনার পর বাদ দিয়েছিলাম। অবস্থা এমন হলো যে, দৃশ্য আসার আগেই বাবাই সেটা বলে দিচ্ছে, আমিও বলে দিতে পারি! জ্যাকি চ্যান এর একটা সিনেমা সম্ভবত ফরবিডেন কিংডম। বাবাই এটা দেখেই চলেছে, থামছে না। ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে থ্রি ইডিয়টস। এখনও চলছে। আমার ভাতিজাকে ভাত খাওয়ানোর সময় এটা ছাড়তে হয়! হি ইজ সিমলা এই একটা দৃশ্য এতোবার টানা হ্যাচড়া হয়েছে তার জন্যে যে, সিডিতে সম্ভবত স্ক্রেচ পড়ে গেছে। এখন সে আমার উপর হামলা করে। হার্ড ডিস্কে রাখা আছে, সেটা সে দেখে, আর কিবোর্ডের উপর খিচুড়ির বন্যা বইয়ে দেবে। এতবার দেখলে যেটা হয়, নানান ছোটখাটো ভুল চোখে পড়ে, সিনেমাটায় দশ বছর আগের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এরা দেখা যায় ক্যানভাসের জুতা পরে ঘুরে। ক্যানভাসের জুতা পরার ফ্যাশনতো তখন ছিলো না। তার উপর আবার দশ বছর পরে রাজু সেই একি রকমের জুতা পরছে। তিন বন্ধু নানান আকাম করে পানির ট্যাংকির উপর। সেটা প্রথম থেকেই ছিলো। কিন্তু চতুর যেদিন বাজি ধরলো আমিরের সাথে, সেদিন দেখালো পানির ট্যাংকির কাচা সিমেন্ট। সেই সিমেন্ট এ দাগ কেটে তারিখ লিখলো চতুর। ক্যামনে কি? দাদাভাই অবশ্য বলছে, তখন পানির ট্যাংকির সংস্কারের কাজ চলছিল। তারপর সুহাসের মতো একটা প্রাইজট্যাগ টাইপ লোক দশ বছর বসে থাকবে নায়িকার জন্যে, একিন হয় না। তবু এদের অভিনয়, এক কথায় অসাধারণ। ছোটখাটো দৃশ্যগুলো্ও চিন্তা করে তৈরি করে বলেই মনে হয়। রাজুর বউ ব্যায়াম করছে, সে প্যান্ট ছাড়াই বাইরে যাচ্ছে, একটা ছোট দৃশ্য, কয়েক সেকেন্ড এর মামলা, তারপরও কতো মন দিয়ে কাজটা করলো। ভাইরাস বক্তব্য দিচ্ছে, সেটা কপি করছে মিলিমিটার, তার হাতের ফাঁক দিয়ে আউট অব ফোকাসে দেখা যাচ্ছে ভাইরাস হাত নাড়ছে। কিঙবা আমির খান নিজের ক্লাস থেকে বেরিয়ে অন্য ক্লাসে গিয়ে যখন ঢুকলো, তখন সেটা খেয়াল করে সিনিয়ারদের চোখাছোখি, কত যত্ন থাকলে এসব করা যায়। আমাদের সিনেমাওয়ালারা এসব যদি করতো।

হিন্দি বুঝিনা। চে এর সাথে বে মিলিয়ে ধরে নেয়া টাইপ বুঝদারি ছিলো। এখন সেটা একটু উন্নত হয়েছে। তবু সবতো আর বুঝি না। থ্রি ইডিয়টস এর গানগুলো ভয়ংকর মনে ধরছে। প্রথম গানটা শুনেতো আমি পাংখা। ভাবলাম বাতাসে উড়ে যাওয়া পাতার কথা বলতেছে, পরে শুনি এই পাতাং পাতা নয়, এইটা বুঝি ঘুড়ি। তবে বাবাইর এতসব জানার দরকার নাই। সে নিজের মতো করে গান বুঝে নিচ্ছে। যেমন জুবিডুবি জুবিডুবি টাইপ একটা গান আছে আমির কারিনার। সেটা দেখে সে নিজেও গাইতে শুরু করলো। সেই গানের একটা লাইন শুনে আমি বিমোহিত, .... রামপাপা, পাগল সুলেমান...


৩.

আলমগীর মাস্টার দেশে আসছেন। পাশের বাড়িতেই থাকেন বলা চলে, কিন্তু ব্যাপক ঘরকুনো মানুষ। এরসাথে হবে না এইটা বুঝে গেছি। তারে বাইর করতে দড়ি দিয়ে টানতে হবে সম্ভবত। সেই হিসাবে আমাদের বুড়াভাই জোসসসসস। ১১ তারিখে তার সিলেটে আসার কথা। শুক্রবার। বেশ রোদ টোদ আছে। আমি হিসাব করে দেখলাম, বুড়াবেডা বারোটার দিকে সিলেটে আসবে। দিলাম ফোন, কোথায় আছে সেটা জানতে। ওমা সে দেখি আরো দুই ঘন্টা আগেই সিলেটে পৌছে গেছে! সাড়ে তিন ঘন্টায় এই লম্বা রাস্তা পাড়ি দিয়েছে। আল্লাহ তুমি এই জিনিসরে হেফাজতে রাখো। উজানগাঁ ছিলো তার সাথে। আরো যোগ হলো মোনায়েম ভাই, সিলেটের প্রিয়মুখ এই ফটুয়াল। আরেকজন ছবিয়াল আতাও যোগ দিলেন আমাদের সাথে। তারপর চলো জাফলং...

জাফলং নামের অতি রূপবতী এলাকাটারে আমরা ইচ্ছামতো খাচ্ছি। যতভাবে খাওয়া যায় ততভাবেই খাচ্ছি। ছোটবেলায় যে জাফলং দেখেছিলাম, এখন তার ১০ ভাগও নাই। তবু ভালো লাগে জায়গাটারে। বছরে কয়েকবার যাই। প্রায় নিয়মিত। এমন যাওয়ায় যেটা হয়, প্রকৃতির বদলে যাওয়াটা সেভাবে আলাদা করে ধরা পড়ে না। কিন্তু জাফলংরে এমন উথাল পাথালভাবে এরা ধর্ষণ করছে যে, প্রতিবার গিয়েই দেখি আরো ব্রিশ্রি হচ্ছে, আরো বেশি শ্রীহীন হচ্ছে। তবু ভালো লাগে, আমি বার বার জাফলং এ ফিরে যাই, আর ওপারের বিন্যস্থ পাহাড়-ঝর্ণা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, বলি- সমৃদ্ধির শেষ যেখানে, সেখান থেকেই তোমার শুরু প্রিয় বাংলাদেশ।

Saturday, May 22, 2010

অক্ষমের চিঠি


আমার ভেতরে বড়ো বেশি উচাটন। অকারণে পেছনের কথা ও সময়কে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকি।
যেদিন সবুজ বাতিটা জ্বলা বন্ধ হলো, যেদিন জানলাম আপনি অসুস্থ, সেদিন থেকে রোজ একটু পর পর দেখতে থাকি বাতিটা জ্বলে কী না। না, জ্বলেনি। আর জ্বলবে না। তবু আমি রোজ রোজ একবার করে কন্টাক্ট এর লিংক ধরে সেই নামটা দেখি... না, জ্বলে না।

গতমাসে একদিন সকালে উঠে সোজা বসলাম পিসিতে। জিমেইলে ঢুকে প্রথমেই দেখি সেই বাতিটা ধুসর হয়েই আছে। দেখি মাসুদ ভাই এর নামটা সবুজ হয়ে আছে। আমি তারে বলি, ভাই একটা কথা শুনবেন, একটা জিনিস দরকার, দেবেন? তিনি বলেন, কি? আমি বলি, জুবায়ের ভাই এর একটা ছবি দেন...
জুবায়ের ভাই এভাবেই আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখেন, সবসময়। এই দীর্ঘ সময়ে একটা দিনের জন্যেও তাঁকে ভুলতে পারলাম না।

আমার নোটবুকে একটা ঠিকানা লেখা। কথা ছিলো এই ঠিকানায় একটা ক্ষুদ্র পুস্তক যাবে। আমাকে নিয়ে এমন আগ্রহ কে কবে দেখালো আর?

আমার এক পরিচিতজন বলেন, ইনি কে ছিলেন? সচলের সবাই তাঁর প্রতি এতো অনুরক্ত কেনো? আমি বলি, ইনি কি ছিলেন না সেটা জিজ্ঞেস করেন। তিনি আবার প্রশ্ন করেন, তাঁর মেয়ের চিঠিটা পড়েও আপনারা কিছু বুঝতে পারলেন না? সেই চিঠির পরতে পরতেইতো ছড়িয়ে আছে তার অন্তিম রোগের কথা... না আমরা বুঝতে পারিনি। আমাদের বুঝতে দেননি। জুবায়ের ভাই, আপনি হরদম নিজেরে গোপন করেছেন আমাদের কাছ থেকে, তারচেয়েও বেশি গোপন থেকেছেন নিজের কাছে নিজেই।


গল্পদাদু ছিলেন আপনি। আমাদের গল্পদাদু। কত যে আব্দার করেছি। সেইসব আব্দার এর একটা বিষয় ধরে আপনি একটা সিরিজ শুরু করলেন, আমাদের বাতিঘরগুলি নিয়ে। আর কি আশ্চর্য আপনি নিজেই মিশে গেলেন সেইসব বাতিঘরের ভিড়ে, হারিয়ে যেতে চাইলেন যেনবা। কিন্তু আপনি কি জানেন, হারাতে পারবেন না আপনি। কোনমতেই না। আমাদের মন অবচেতনে হলেও আপনাকে মনে রাখবে।


আমার ছেলেটাকে নিয়ে অনেকবার কথা হয়েছে আপনার সাথে। ওর কুটুস কুটুস গল্পগুলো শুনে দারুণ মজা পেতেন। আপনি জানেন জুবায়ের ভাই, ও এখন দুইটা ক্লাস শেষ করে তিন নাম্বার ক্লাসটার অর্ধেক শেষ করে ফেলছে। ও বড় হয়ে যাচ্ছে...। ? আপনি কি জানেন স্কুলে ওর নিকনেইম কি? প্রথম যেদিন সেটা আমি জেনেছিলাম, কেঁপে উঠেছিলাম... কেনইবা কাঁপবো না? ওকে যে ওর বন্ধুরা, ওর টিচাররা গল্পদাদু বলে ডাকে!

আজ আপনার জন্মদিন। আপনাকে শুভকামনা জানাতে পারছি না। না দেখা একটা মানুষ আপনি, আপনার চলে যাওয়ায় এভাবে আক্রান্ত হই কেনো আমি, আমরা। এর নাম কি? জানি এইসবের কোন ব্যাখ্যা হয় না। এসবের জবাব আপনি নিজেও দিতে পারতেন না।

ভালো থাকবেন প্রিয় জুবায়ের ভাই। খুব ভালো

Friday, April 9, 2010

মাথেল মাথা থেকে নেজ বলো কলে ফেলেছি... এ্যা... এ্যা...

আমাকে তিনি গল্প বলেন। ছবি দেখান। সম্ভবত সেটা এক বছর বয়েসের ছবি। সাদাকালো ছবি। একই বয়েসের দুজনের দুটি ছবি। কিন্তু পোষাক একি। একজনের সাত বছর পর আরেকজনের ছবি তোলা হয়েছে। প্রথম ছবিটা তুলে যত্ন করে তুলে রাখা হয়েছিলো পোষাকটা। ছবির নিচে লেখা আছে এপ্রিলের ৯ তারিখ... এটা ভুলও হতে পারে আমার।

আরেকটা ছবি রঙিন। বিখ্যাত আলোকচিত্রি আমানুল হক এর তোলা। প্রাণখোলা হাসিমাখা সেই ছবিটা। ছবির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, এসব কাপড় ছবিয়ালের নিজের। ছবি তোলা শেষ হলে আবার খুলে নিয়ে যেতেন! সাথে একটা মজার ঘটনা বল্লেন, একবার উপর থেকে গাছের নিচে দাঁড়ানো বাচ্চার ছবি তোলার প্ল্যান করে তিনি এলেন। এসে সেই মডেলকে পাঠালেন নিচে আর তিনি উপর তলার জানালা দিয়ে ক্যামেরা ধরে বসে থাকলেন। হঠাৎ সেই মডেল কানে হাত দিয়ে আজান দেয়া শুরু করে। ডানপিটে মডেলের কারণে ছবিটাই আর তোলা হলো না।

আমরা আসলে গল্প করছি এই মডেলকে নিয়ে। ছবিয়াল আসলেন তার কথা বলতে গিয়েই। আর গল্প করছেন মডেলের জননী নিজেই। পুরো একটা দিন যিনি আমাকে পরম মমতায় কাছে বসিয়ে নানান বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। আর ফাঁকে ফাঁকে বলেছেন মডেলের গল্প।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার গল্পটাও মজার। সেখানে একেকজনকে একেকভাবে যাচাই করা হচ্ছিল। পরীক্ষা শেষে তিন বছরের গ্যাদার সে কি কান্না। মা কোন মতেই থামাতে পারেন না। একসময় একটু যখন কান্নার গমক থামলো, তখন জানা গেলো, সে একটা মাছ এঁকে দিয়ে এসেছে। যেটার শরীরের চে লেজটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে! তাই এতো কান্না।

ছবি আঁকায় সে বরাবরই সিরিয়াস। এই কাজ করেই সে একটা চমৎকার মেয়েকে সেই নাবালক বয়েসে পটিয়ে ফেলে। যে এখনও তার সাথে লেপ্টে আছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তাকে এই গুনটা তিনি দিয়েছিলেন বলেই কপালে এমন চমৎকার মেয়েটা জুটলো। নয়তো...

আমানুল হক এর মডেল ছেলেটা কিন্তু পরে নিজেই হয়ে গেছে ফটুয়াল। তার তোলা চমৎকার সব ছবি আমি দেখেছি। আপনারাও দেখে থাকবেন অনেকেই। তার করা অসাধারণ ব্যানারে সচল হয়েছে সচল।

আমি জানি আপনারা ধরে ফেলেছেন কার কথা বলছি। অরূপ এর কথাই বলছি। পাগলা অরূপ। আজ ওর জন্মদিন। শুভ জন্মদিন অরূপকথার রূপকারকে।

Sunday, March 7, 2010

পতঙ্গের জীবন


সূর্যটা কমলা রং এর হতে না হতেই তুমি প্রস্তুত।
একবার বাবাকে, একবার মা'কে আরেকবার দাদাকে
তারপর দাদু। সবার কাছে একটাই প্রশ্ন, দেরি হলো?



তোমার কোমল শরীরটা দাঁড়াতে চায় না। তোমার পিচুটি
জড়ানো চোখে জলের ঝাপটা দিতে দিতে, ফোকলা দাঁতে
ব্রাশ ঘষতে ঘষতে, তুমি জিজ্ঞেস করো, আজও কি লেইট?



তুমি চলতি পথে বার বার প্রশ্ন করো, আজও কি শুনতে হবে
লেইট মর্নিং? নাকি আজ গুড মর্নিং এখনও রয়েছে? লাল দালানে
ঢোকার আগে আমি তোমাকে দেখি না। দেখি না তোমার দুরুদুরু বুক
করুণ চোখ, তুমি ত্রস্ত পায়ে ভেতরে যাও, ফিরে তাকাও, হাত নাড়ো।



বাবাই, তোমার স্কুলের গেটে দাড়িয়ে থাকা দারোয়ানকে আমার বড়ো
বেশি ভাগ্যবান মনে হয়। প্রতি ঘন্টায় তুমি যখন একবার করে ব্যালকনিতে
দাঁড়িয়ে আকাশ দেখো, তখন সে তোমাকে দেখতে পায়। আমি দেখি না...

Tuesday, February 23, 2010

সরীসৃপ


রোদ ম্রিয়মান হলে এ শহর নিজেরে ঢেকে দেয় কুয়াশার কাফনে
ফুটপাত ধরে হেঁটে যাই, কনকনে বাতাস, মিহি থেকে তীব্র হয়
আমাদের চেনা এ পথে এখন সকলই অচেনা মুখ, অচেনা সুর
সড়ক দ্বীপে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশই শুধু চেনা জানা
কেননা সেই পুরনো পোষাকেই দাড়িয়ে থাকে সে, তোমার
আমার মতো বারবার পাল্টায়না খোলস।



নীল পোষাক, সাদা পোষাক, খয়েরি পোষাক তোমার...
স্লাইড শোর মতো একটার পর একটা ছবি দ্রুত মিলিয়ে যায়
আমি পাল্টাই, তুমি পাল্টাও, ঘেন্না হয় এই সাপের জীবন।