Tuesday, February 12, 2008

আজ এইটুকুই সুখ সংবাদ

নিঃশ্বাস বুঝি আটকে যায়। বন্ধ হয়ে যায় একে একে সব চেনা দরজা, জানালা।


গতকাল সন্ধায় আবার নাটকের সভা হয়েছে

গরম চায়ে মজেছি আমরা পাগলের দল।

এইবার তবে মহড়া। ধুপ জ্বেলে পূনর্বার যাত্রা...


ইদানিং যিনি এই শহরের বারো জনের একজন

তিনি এসেছিলেন, নতুন গাড়ি তার ঝা চকচক

সংস্কৃতির এমন বেহাল দশায় তিনি ব্যাথিত, কান্না

পায় তার। আমরা আপ্লুত হই ভালবাসায়। ঝুলে

পড়তে ইচ্ছে করে গলায়। আপনি সংস্কৃতির আব্বা

হবেন এইবার। আসেন গলায় মালা পরেন জনাব বলে

নৃত্য করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কিছুই করা হয়না। শুধু

ডালপুরি চিবুই। শুধু চা গিলি আর আগামীকাল কফি পাওয়া

যাবে এই আশাবাদ শুনি। তিনি এই শহরের বারো জনের একজন

তাই তাকে গুরুত্ব দিতেই হবে। তার কথা মন দিয়ে শুনি।


যতযাই হোক, আসল কথা হল জানালা বন্ধের জামানা

এসে গেছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হলে হবে জানালা খোলা যাবেনা

দরজাটা একটু ফাঁক করে প্রয়োজন মতো শুধু বলতে হবে

ভাল আছি খুব, সুখে আছি। সময়মত টিভি ক্যামেরা

পৌছে যাবে আপনার দরজায়। শোক বলবেননা ভুলেও

পোষাক পরা ফেরেশতারাও কিন্তু বসে নেই।

Monday, February 11, 2008

বউ বাটা বলসাবান: বিস্মৃত বয়ান


বেশি বেশি ভাব বলে একটা কথা আছে। আমরা প্রায়ই এই কথাটা বলি, পাব্লিকের বেহুদা আচরনকে বুঝাতে। এই মূহুর্তে আমি সেরকম একটা বেহুদা আচরণ অর্থাত্ বেশি বেশি ভাবের কাজ করব।

কাজটা আসলে করার কোন কু-ইচ্ছা কখনই আমার ছিলনা। কিন্তু শিমুলিয় অনুরোধে এটা করতে বসলাম। তাছাড়া বেকার দ্যা গ্রেট হিসাবে একটা কাজ অন্তত পাওয়া গেল।

বিষয় হল
বউ বাটা বলসাবান নামের অতি ক্ষুদ্র গল্পের জন্ম কাহিনী।

সবকিছুর একটা সময় আছে। যার জীবনই পাকাপোক্ত হলনা তার আবার জীবনী কি? বউ বাটা বলসাবান কতটুকু গল্প হয়ে উঠতে পেরেছে এই প্রশ্নটারই কোন উত্তর আমার জানা হয়নি আর তার কীনা জন্ম কাহিনী! তবু লিখি। এইসব অবাধ লেখার স্বাধীনতা আছে বলেইতো ব্লগ।

হিসাব করলে দশ বছর হয়ে গেছে। এই মূহুর্তে ছাপানো কপিটা হাতের কাছে নেই। থাকলে সেই তারিখটা দেখে নিশ্চিত সময় বলতে পারতাম। সেইসময় সবে আমরা লেখা গুলে খাবার বয়েসে পৌছেছি। নিজেরাই লিখি, নিজেরাই খাই টাইপ অবস্থা। সিলেটে বেশ বড় একটা গ্রুপ আমাদের। আকাম কুকাম অনেক কিছুই করি আমরা। এর ফাঁকে কেউ নাটক করে, কেউ আবৃত্তি করে। আর সব বাঙালির কমন বদদোষ হিসাবে আমরা সাহিত্য চর্চ্চাও করি।

গৌরীশ দারুন প্রবন্ধ লিখত। তার পড়ার বিষয় ছিল, রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ। অর্নার কাজকারবার ছিল বৈদেশী সাহিত্যে। রাজু লিখত স্যাটায়ার। রানা সিরিয়াস গল্প। আমি লিখার চেস্টা করতাম কবিতা। আমাদের গ্রুপের সিনিয়ার ছিলেন আরিফ জেবতিক, হাসান মোরশেদ, রিপন চৌধুরী, উজ্জল রায় এরা। এদের উপরে লীলেন ভাই, জফির সেতু, মোশতাক আহমাদ দীন, শামীম শাহান।

আমি যে কারো অনুবাদ করা কিছু পড়ে একদম আরাম পাইনা। কারণ অর্নার মত এত চমৎকার অনুবাদ আর কেউ করেনা। রানা মেহের যেদিন তার গল্প এই ব্লগে পোস্ট করবে সেদিন বুঝবেন আলবাব কোন শ্রেণীভুক্ত কলমচি। জেবতিক রাজীবের স্যাটায়ার হত অসাধারণ। মান্নাদা কবিতা। হাসান মোরশেদ, আরিফ জেবতিক কিংবা মাহবুব লীলেন ভাইদের ব্যাপারে কিছুকি আমারে বলতে হবে? মনে হয়না। এই এদের মাঝে সবচে অনুজ্জল কেউ থাকলে সে আমি। মূলত ফিলার রাইটার হিসাবে আমার উৎপত্তি। ম্যাগাজিনের শেষ পৃষ্ঠাটা যখন দেখা যায় খালি থেকে যাচ্ছে সেখানেই অপুর যায়গা হয়। তবে একটা গোয়াড় টাইপের কথা বলে এই অধ্যায় শেষ করা যায়, আমার বন্ধুরা সবাই লেখা শুরু করলে, অন্য কারো কিছু না পড়লেও চলবে আমার। আসলে অন্য লেখা পড়ার সমই পাবনা আমি।

আহারে বউ বাটার কথা বলতে এসে এসব কি বলছি?

সহবাস বের হল। খুব বড় সাহিত্য আন্দোলন হবে, বিপ্লব হবে এমন কোন উচ্চাশা থেকে কাজটা করা হয়নি। আসলে নিজেদের লেখার একটা উদার জমি তৈরির জন্যই সহবাস এর জন্ম। দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে আমি কাজ শুরু করি। সেসময় বেশ কটা গল্প লিখে ফেলি। সবগুলোই এমন মাইক্রোস্কোপিক আকারের। যেগুলো ছাপা হয়েছে সেগুলো আছে এখনও। বাকিগুলো হারিয়ে গেছে।

গল্প লিখার ক্ষেত্রে কোন বিশেষ পরিকল্পনা করে কখনই এগুইনি। লিখতে বসেছি, লেখা হয়ে গেছে এই টাইপ। সিরিয়াস হয়ে, নাক মুখ খিচিয়ে মাথার চুল ছিড়ে চিন্তা করতে করতে কোনকিছুই কোনদিন আমি লিখিনি। যে শব্দটা আমি চিনি, নিত্যদিন ব্যবহার করি সেই শব্দটা বসিয়ে নিজের কথাই মূলত বলি আমি।

বিভিন্ন মিতভাষণ আর বউ বাটা বলসাবান দু দিনের ব্যধানে লিখা। লিখেছিলাম তিনটা। বিভিন্ন মিতভাষণ আর অন্য আরেকটা নিয়ে আমি হাসান মোরশেদ আর আসিফ মনি বসেছিলাম ইউনাইটেড ক্লিনিকের বারান্দায়। মোরশেদের বাবা অসুস্থ ছিলেন তখন। আমাদের আরেক বন্ধুজন আসিফ মনি আর মোরশেদ মিতভাষণটা মেনে নিলেও অন্যটায় একটু কাজ করতে বল্লেন। ঠিক হল দুটোই সহবাস এ দেয়া হবে। কিন্তু বাসায় ফেরার সময় সেই গল্পটা হারিয়ে যায়। মোটর সাইকেল চালাতে চালাতে ঠিক করা নবম পাঠের বছর নামটা ছাড়া আর কিছুই মনে নাই এখন। বিভিন্ন মিতভাষন ছাপা হয় সহবাস এ।

গিয়াস ভাই এর সাথে কথা হয় একদিন। লেখালেখির খবর নিয়ে হালকা একটা ঝাড়ি দেন তিনি। একি সময়ে লিখা বউ বাটা জেট পাঠালাম তার কাছে। এরপর ভুলে গেলাম। বন্ধুসভা তখন নিয়মিত পড়া হত। আড্ডার নিয়মিত সদস্য। একদিন গল্পটার কথা মনে হল। বন্ধুসভার গোষ্টি উদ্ধার করলাম। আল্লাই জানে সেই গরম খবর পেলেন কীনা গিয়াস ভাই! পরের বুধবার বন্ধুসভায় ছাপা হল গল্পটা। তবে একটা শব্দ বদলে। আমি লিখেছিলাম জেট পাউডার, গিয়াসভাই সেটারে বলসাবান করে দিয়েছেন। পরে বল্লেন অনুপ্রাস প্রিয়তায় এই নাম বদল। খারাপ লাগেনি আমার। ভালই লাগলো।

এরপর নিরবতা। অনেকদিন পর। কয়েকমাস হবে হয়ত। ঢাকায় গেছি নির্বাসনে। গিয়াস ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলাম। সুমন্ত আসলাম আমারে বলে 'কনগ্রাচুলেশন'। বুঝলামনা কেন বলে। গিয়াস ভাই জিজ্ঞেস করেন কিরে তুই পত্রিকা দেখিসনি? না বলতেই হাতে থাকা কাঠ ফাইলটা এগিয়ে দেন। আমি ভ্যাবলা হয়ে যাই...

এবং পুস্তক
এরপর কত বছর গেল। সব ভুলে গেছি। গৃহপালিত টাইপ একটা ভাব এসে গেছে। অন্য আরও অনেক চিন্তা মাথায়। সন্তান এবং সন্তানবতীদের নিয়ে নিত্য সংসার।

গতবার আরিফ ভাই একটা ইউ আর এল দিলেন। বল্লেন, সারাদিনতো নেটেই থাকিস। একবার ঢুকে দেখিস। বেশ ভালই লাগল। একটা বদ অভ্যাস আছে আমার। নেটে নিজের নাম সার্চ দেয়া!!! এখানেও দিলাম। আর অবাক হয়ে দেখলাম হাসান মোরশেদ তার একটা লেখায় বউ বাটা বলসাবান এর কথা লিখেছেন। হৃদয় খোঁড়ে যে সবসময় বেদনা জাগে তা নয়। মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসের মত আরামদায়ক কিছুও মিলে যায়...

আবারও পাগলামিতে পায়। আবারও উচাটন। কিবোর্ডে বসলে রাগ করে পালিয়ে যাওয়া শব্দগুলো হঠাৎ হঠাৎ ধরা দেয় ইদানিং। তাই একুশের বই মেলায় জন্ম নেয় বউ বাটা বলসাবান নামের ক্ষুদ্র এক গ্রন্থ।

Saturday, February 9, 2008

কয়েকটা দিন অন্যরকম-শেষ


রোববার, ৩ ফেব্রুয়ারি।
মেলা নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। শৈশবের বড় একটা সময় আমি মেলায় মেলায় ঘুরেছি। রঙিন সেইসব মেলা। ধল মেলা ( এই মেলাটা বাউল সম্রাট আব্দুল করিমের জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত), মাতারগাওয়ের মেলা, জগন্নাথপুরের বারুনি, ঢাকাদক্ষিনের রথের মেলা বা বারুনি (শ্রী চৈতন্যের স্মৃতি বিজড়িত) আরও কত। এই গতবারই ঘুরে এলাম পনাতির্থ থেকে। আমার জীবনটা নানা রঙে রাঙাতে এইসব মেলার ভূমিকা অনেকখানি।


গ্রামবাংলার চিরায়ত মেলা দেখে অভ্যস্তরা নগরের মেলায় কতটা আরাম পাবে? একদমইনা। তাই বাণিজ্য মেলা, তাত বস্ত্র মেলার মত নাগরিক ভিড় আমাকে কখনই টানেনা। আমি অভ্যস্থ পায়ে হাটতে পারিনা। দম বন্ধ হয়। এইসব মেলার রঙবাহার দেখলে আমার হাসি পায়। ঐতিহ্যকে দড়ি বেঁধে মেলার মাঠে দাড় করিয়ে রেখে কর্পোরেট বাণিজ্য। তবু যেতে হয়। বাধ্য হয়েই যাই।


ইদানিং কঠোরভাবে গৃহপালিত নজমুল আলবাব মেলায় যান। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। মা, বাচ্চা, বউ, ভাইয়ের বউ, মামু... বিশাল সে বাহিনি।


আমার ছেলেটাকি আমার মতই? কিছুটা মনে হয়। সেও আমার মতই খুব দ্রুত দলছুট হয়ে পড়ে। ভিড়বাট্টায় নিঃসঙ্গ হয়ে একা একা গুটি পায়ে হাটে। তাই বিশাল মেলা মাঠে ঢুকতে না ঢুকতেই আমরা বাপ ছেলে মূল দলের বেশ দুরেই পড়ে গেলাম। মেলার খেলনাগুলো তাকে বেশ টানছিল। তবে সেটা আর দশটা বাচ্চার মত নয়। যখনি তাকে বলা হল, এটাতো তোমার আছে। একটু ভেবে যখন দেখল সত্যিই বাসায় আছে, তখনই তার বায়না শেষ। এইসব করতে করতে একসময় আবিস্কার করলাম আমরা বাপ ছেলে বাটা কোম্পানির বানানো কৃত্রিম ফুল বাগানে বসে আছি! বেশিক্ষনতো আর বসা যায়না। তাই আবার দলের সাথে যোগ দিতে হয়। আবার দলছুট হই। মজোর স্টলটা করা হয়েছে বেশ অভিনব কায়দায়। সারাটা প্যাভিলিয়ন ঘিরে রেখেছে এ্যাকুরিয়াম দিয়ে। বাবাই খুব মজা পায়। দাড়িয়েই থাকে, দাড়িয়েই থাকে। ঘন্টা পেরিয়ে যায় তার দেখা শেষ হয়না। প্রথমে বাবা, পরে মা আর সব শেষে দাদুকে সঙ্গে নিয়ে সে রঙিন মাছ আর জলের খেলা দেখতেই থাকে। তারপর নানা ছলছাতুরি করে সরাতে হয়।


আগেই বলেছি, একদমই ভাল লাগেনা এইসব ভিড়বাট্টা। তাই বেশি মনে নেই। অথবা রাখিনি। অবশ্য খুব ভাললাগা সেইসব মেলার বর্ণনাও আমি দিতে পারবনা। কেন যেন গুলিয়ে যায় সব... তবু এই বেনিয়া মেলা আমার জন্য অন্যরকম ভাল লাগা নিয়ে আসে। মা কতদিন বলেন, তাকে নাকি একদম সময় দিইনা। বউ বাচ্চারও সেই অভিযোগ। কিছু করতে পারি আর না পারি ওদের সাথে সাথে ঘুরা ঘুরিতো হল...


সোমবার, ৪ ফেব্রুয়ারি
সকালটা অনেক দেরি করে শুরু হল। মেলা থেকে ফিরে অনেকক্ষন জেগে ছিল বাবাই। তাই সকালে তার ঘুম ভাঙেনা। প্রায় দুপুর গড়িয়ে যায়। খা খা দুপুর বলে যে কথাটা শামসুর রাহমান বলেছেন সেটা এসে সামনে দাড়ায়, যখন রিক্সা টেক্সি কিছুই মিলেনা। প্রায় আধা ঘন্টা রোদ খাবার পর একটা সি এন জি পাই। ধানমন্ডিতে হালকা ঘুরান্তি শেষে শাহবাগ। আজিজ মার্কেটটারে আমার নিজের বলে মনে হয় অনেক বছর ধরেই। শুদ্ধস্বরের অফিস। টুটল ভাই বসে বসে কাজ তদারকি করছেন। বই যাবে মেলায় অনেকগুলো। শেষ মূহুর্তের ব্যাস্ততা। নানা কথা হয়। ঘুরে ফিরে আসে ভার্চুয়াল জীবন। কেমন অভ্যস্থ হয়ে গেলাম আজিব এক সাইবার লাইফে, অথচ আগাগোড়া ননটেকি মানুষ এই আমি। শুদ্ধস্বর থেকে বেরিয়েই দেখা পাই কলি আপা আর ইরাজ ভাইয়ের। আমার দুজন প্রিয় মানুষ। একজন সংবাদ এর ফিচার পাতা দেখছেন এখন, আগে ছিলেন ভোরের কাগজ-এ। আর ইরাজ ভাই আমার মত সাংবাদিকতা থেকে বিতাড়িত অথবা পলাতক। নাইওরিতে বসে বসে আড্ডা হয়। কখন বিকাল হয়ে গেল তার কোন হদিসই থাকেনা। পুত্রধন ততক্ষণে ক্ষুধায় আক্রান্ত। আজিজ এর মিনি চায়নিজ নামক বস্তুতে বসে পুরত্রের উসিলায় নিজেদেরও পেটপূজা।


ফোন বাজে। আরিফ ভাই। খবর মিলে তীরন্দাজ বসে আছেন মেলায়। একটু পরে আবার ফোন, অয়ন। মেলায় এসে গেছে সেও। আমরা তাড়াতাড়ি ছুটি। সন্ধার ঠিক আগে আগে মিশে যাই বইয়ের রাজ্যে।

গোল্লায় যাও ভার্চুয়ালিটি
ভার্চুয়াল সম্পর্কগুলো কি রকম? কিবোর্ড, মাউস, ইন্টারনেটের মাঝেই কি এসব সীমাবদ্ধ থাকবে? যদি এই ধারনার উপর জগৎটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকে তবে সে বিরাট ভুল করেছে বাংলাদেশে এসে। এখানে তার সব ভাবই মৃত্যুবরণ করেছে। বাঙালিরা ভার্চুয়ালিটির খেতা পুড়ে এইটারে রিয়েল লাইফে ঠিকি টেনে এনছে। তাই একজন তীরন্দাজ সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে এসে খোঁজ করেন অনভ্যস্থ মানুষ নজমুল আলবাব এর, অয়ন নামের মেধাবী তরুন আচানক হয়ে উঠে বন্ধু। নিজের বইয়ের কাজ ফেলে লিটল ম্যাগ চত্বরে ছুটে আসে অমিত আহমেদ। মুজিব মেহেদীর দিকে হাত বাড়িয়ে নামটা বলতেই হালকা হাসি খেলে যায় তার মুখে। আড্ডা জমে উঠে, আর আমাদের দিকে অবাক চোখে মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকেন এক আশ্চর্য সুন্দর বিদেশীনি...( এই দিনের বর্ননাটা অনেক প্রানবন্তভাবে দিয়েছেন অমিত। http://www.sachalayatan.com/aumit/12194 আমি আর কস্ট করতে রাজি নই)

অতঃপর শেষদিন
বউ এর কামলা শুরু হবে ছয় তারিখ থেকে। তাই পাঁচ তারিখেই রওয়ানা দিতে হবে। আগের রাতে বই মেলা থেকে ফেরার সময় টিকিট কেটে নেই। দুপুরের বাস।


বছর কয়েক আগে পর্যন্ত আমার কাছের বন্ধুদের সবাই ঢাকার বাসিন্দা ছিল। এখন সবাই একসাথে টেমসের তীরে বসত গড়েছে। সেসময় আমার ভাইও ছিল ঢাকায়। কাজে অকাজে প্রায়ই তখন ঢাকায় যেতাম। বাস যোগাযোগ তখন এত ভাল ছিলনা। তাই ট্রেনে চড়ে যাওয়া হত। আমাকে ট্রেনে তুলে দিত দাদাভাই নয়ত গৌরিশ। ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পরও তারা অনেক্ষন দাড়িয়ে থাকত। জানলা দিয়ে তাকালেই তাদেরকে দেখতে পারতাম। আর আশ্চর্য ব্যপার আমার বুকের ভেতর কেমন হু, হু করে উঠত, কান্না পেত। সারা রাস্তা আমার মন খারাপ থাকত...


কিছু মানুষ আছে যারা খুব করে চাইলেও ভেজাল এড়িয়ে চলতে পারেনা। আমি সেই গোত্রের। সোহাগ এর বাস সার্ভিসের এত নামডাক। তারা কীনা আমাদের যে সিট দিল সেটার উপর এসির পানি টপ টপ করে পড়ে! আর এমন তাদের ভাব যেন কিছুই হয়নি। টিকিট কেটেছ যখন তোমাকে যেতেই হবে। আমার সাইজটাও এমন যে এই পাঁচ ফুটকে কেউ পাত্তা দিতে চায়না। আম্মা আমার উত্তেজনা দেখে বলেন, আমরা চল পরের গাড়িতে যাই... আমি কিচ্ছু বলিনা। টাকওয়ালা লোকটাকে আস্তে করে বল্লাম, ভাই এইখানে নামায়া দিতে পারেন ( বাস তখন চলতে শুরু করেছে। আমি অন্য সিট দখল করে রেখেছি। আর সেই সিটের লোকজন দাঁড়ানো!) ঢাকা শহরে কিচ্ছু করার নাই আমার। কিন্তু সিলেটে আপনার অফিসে বাসে মিলেও আমার ছেলেদের নাস্তা হবেনা ! লোকটা আমার দিকে একপলক তাকিয়েই দুরে চলে যায়। পনের মিনিট পরে সব ঠিক!!! আজিব দুনিয়া, বিনয়ে কাজ দেয়না আর ভাব নিয়ে কথা বল্লে বাপ ডাকতে এগিয়ে আসে!!! আমি সত্যিই মহা অবাক হয়ে সারাপথ বসে থাকি।
এই অবাক ভাব আসায় একটা লাভ হয়েছে আমার। কারওয়ান বাজারের মোড়ে দাড়ানো অয়নকে দেখে বুকে যে হু...হু... ভাবটা এসেছিল সেটা কেটে গেছে।
অয়ন তুই অফিস ফেলে বোকার মত ওই রাস্তায় দাড়ায়া ছিলি কেন তখন?

কয়েকটা দিন অন্যরকম-৩

অনেক আত্মীয় স্বজন আছেন যাদের সাথে কোন যোগাযোগই নেই আমার। কালেভদ্রে দেখা হয়। হাই হ্যালো পর্যন্ত সম্পর্ক। ঢাকায় গেলে হোটেল নয়ত বন্ধুর বাড়িতেই থাকতে অভ্যস্থ। কিন্তু এবার আম্মা সাথে। তাই অনেকের সাথেই দেখা হল। বারিধারার জনৈক অতি বড়লোক মামার বাড়িতে যেতে হল শুক্রবার রাতে।

বড়লোকদের বাড়িকি খুব ঠান্ডা হয়? আমার কেন যেন এইসব বাড়িকে অস্বাভাবিক শীতল মনে হয়। সারারাত প্রচন্ড শীতে আমি কাবু ছিলাম! তবে সকালটা বেশ ভাল লাগলো। সে বাড়িতে থাকা চমৎকার দুটো পিচ্চির সাথে দারুন সময় কাটলো।

দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার সময়ে শুদ্ধস্বরের টুটুল ভাইকে (আহমেদুর রশীদ) ফোন করলাম। বল্লেন, তোমার বইতো এসে গেছে অপু। স্টলে দিয়ে দেবো? না করার প্রশ্নই উঠেনা। বল্লাম, অবশ্যই। একটু পরেই আরিফ ভাইয়ের ফোন। কিরে আজও মেলায় যাবিনা নাকি? বলি, হ্যা যাব। তুমি কখন যাবে? বিকালে শুনে, সেইসময় যাওয়াটা ঠিক করি। ফোন রেখে দেয়ার আগে প্রশ্ন করেন, তোর বইয়ের খবর কি? বল্লাম স্টলে চলে গেছে। আরিফ ভাই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ঝাড়ি দেয়। তুই এত পাষাণ হলি কবে? বই মেলায় এসে গেছে আর তুই এখনও মামুর বাসায়? জলদি মেলায় আয়। আমি যাচ্ছি...

আগেই বলেছি ঢাকায় আমি অন্ধ মানুষ। ড্রাইভাররা আমার সাদা ছড়ি। মামার ড্রাইভার মফিক মেলায় নামিয়ে দেবার দায়িত্ব নেয়। গাড়িতে বসেই খেয়াল হল, দেখিনা আরিফ ভাই এখন কোথায়। আমি কোথায় আছি জেনে তিনি বলেন, মহাখালির ওভারব্রিজ পেরিয়ে নেমে যা। কিন্তু নামব কিভাবে? বাবাই ততক্ষনে আমার কোলে চেপে বসেছে। ফোনে কথা বলা শুনেই বুঝে গেছে আমি নেমে যাব। তাই আগেই প্রোটেকশন! ছয়মাস আগেও এমন টান ছিলনা আমার জন্য। বেকার হয়ে যাওয়ার পর বাধ্য হয়েই ঘরে অনেক্ষন থাকতে হয়। তাই পিতা পুত্রের এখন বেশ খাতির। গাড়ি থেকে নামতে তাই যুদ্ধ করতে হল।

আরিফ ভাই কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলেন। তার মাইক্রোতে চড়ে বই মেলা। গতবারের মেলার সাথে এবার বেশ পার্থক্য দেখলাম। লাইন ধরে ঢুকতে হলনা। মেলার মাঠে একেবারেই ধুলা নেই। প্রথম টার্গেট লিটল ম্যাগ কর্ণারের দিকে দ্রুত এগিয়ে গেলাম। কেমন একটা দুরু দুরু ভাব ছিল বুকের ভেতর। এইটারে মনে হয় শূন্যতাও বলা যায়। দুর থেকেই দেখলাম ছোট্ট বইটা শুয়ে আছে শুদ্ধস্বরের টেবিলে। সাদা মলাটটারে আমার সাদা টাওয়াল বলে মনে হল। তার ভেতর ছোট্ট একটা বাচ্চা! আরিফ ভাই গিয়েই হাতে নিলেন। একপ্রস্ত প্রশংসার পর হাতে দিয়ে বল্লেন, দে একটা অটোগ্রাফ দে! আমি আপ্লুত হই।

এই ফাঁকে ভাস্করদা আর মৌসুম এসে হাজির। দুজনেই প্রশংসা করেন। আমি ঠিক বুঝিনা, খুশি করার জন্য তারা বলছেন না সত্যিই ভাল লাগছে! তবু ভাল লাগে...

এরপর হাটা আর আড্ডা চলতেই থাকে। আমিও তাতে অংশ নেই। কিন্তু এখন আর কিছুই মনে করতে পারছিনা। শুধু মনে হচ্ছে আরিফ ভাইয়ের হাত থেকে বইটা হাতে নিয়ে একটু পর পর দেখছিলাম। ভাল লাগছিল। ঘোর লাগছিল। অখচ এমন হওয়ার কথা নয়। এই বইটার কোন কিছুই আমার কাছে নতুন নয়। প্রায় দশ বছর আগে থেকে শুরু করা ছোট কয়েক টুকরো গল্প। এইসব লেখার প্রকাশক পাওয়া যায়না। আমি সে চেস্টাও করিনি। যদিও আরিফ ভাই আর বন্ধু পলাশ দত্ত কিছু চেস্টা করেছিলেন। সে পর্যন্তই। আমি নিজের টাকায় বই ছাপার উদ্যোগ নিয়েছি। কেন নিয়েছি জানিনা। সে পর্যন্ত মনে হয় আবেগ ছিল। এরপর আর কিছু অনুভব করিনি। অন্য দশটা কাজের মতই এটাও একটা কাজ ছিল। বেশ খানিকটা কাজ হয়ে যাওয়ার পর আমার সহোদর এর টাকা যোগানদার হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। এর আগে আমার কৈশোরের এক বন্ধু প্রায় রোজ একবার করে টাকা দেয়ার চেস্টা করেছেন। আমি আসলে বেশ সৌভাগ্যবান। কেন যেন বন্ধুরা আর পরিবারের মানুষজন আমাকে একটু বেশিই ভালবাসে। প্রায় বাউন্ডুলে আমাকে নিয়ে তাদের অনেক চিন্তা। অনেক ভালবাসা।

সেই বইটা বেরিয়েছে। সাথে বন্ধু মাশার কবিতার বই 'এই মিছা কবি জীবন' । এই বইটা তিনি ঢাকা থেকেই বের করতে পারতেন। কিন্তু বন্ধু প্রকাশনা সংস্থা করছে, তাকে একটু সাহস দেয়া দরকার শুধুমাত্র এই বোধ থেকেই তিনি তার বইটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। জানিনা আমি তার বিশ্বাসের মূল্য দিতে পারলাম কীনা।

ওহহো কি বলতে কি বলা শুরু করলাম! বিয়ে বাড়ি থেকে ফোন আসতে শুরু করেছে। আরিফ ভাই বলে, আরে রাখ বিয়ে বাড়ি। তোর বই বড় না তালতো ভাইয়ের বিয়ে বড়। তবু যেতে হয়। বই মেলার গেট থেকে বিদায় নেন মৌসুম ভাস্কর দম্পতি। আমারা এগিয়ে যাই। এরি মাঝে ফোন। অমিত আহমেদ। তিনিও মেলায় এসেছেন। কিন্তু ততক্ষনে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। পরদিন দেখা হবে এই ভরসায় আর মেলায় ফেরা হয়না।

ছবির হাটে থামি। পুরনো বন্ধুদের অনেকেই এখানে আড্ডা দেন। মেসবাহ য়াযাদ দেখেই হাউকাউ করে উঠেন। কিরে কবে আসলি, কোন যোগাযোগ নাই কেন। নানা অভিযোগ তার। গিয়াস ভাই এর কথা জিজ্ঞেস করি। হাত তুলে দেখিয়ে দেন। দৌড়ে যাই। ছোটখাটো গড়নের গিয়াস ভাই ফুটপাতে দাড়িয়ে কথা বলছেন আরেকজনের সাথে। সেই পুরনো ভঙ্গি। আমাদের প্রিয় গিয়াস ভাই। দেখেই জড়িয়ে ধরেন। কতদিন পর দেখা। দুজনের উপর দিয়েই এর মাঝে নানা ঝড়ঝাপ্টা গিয়েছে। মোবাইল ফোন ছিল বলে সব খবরই রাখা হয়। শুধু দেখা হয়না। একপ্রস্ত আড্ডা চলে। উঠতে ইচ্ছে করেনা। তবু ফোনের ধাতানিতে বসা যায়না। গাড়ি চলতে শুরু করে মিরপুরের দিকে।

কয়েকটা দিন অন্যরকম-২

শুক্রবার। ফেব্রুয়ারির এক তারিখ। আমার বাবাইসোনার জন্মদিন। বারটা বাজতেই তুলির মোবাইলে মেসেজটোন। মিঠুর মেসেজ। অনন্তমৈথুন নাম দিয়ে সে ব্লগায়। প্রিয় বুলবুলিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। সে বাবাইকে বুলবুলি বলবে। আর বাবাই তাকে বলবে বন্ধু। ফোন হাতে নিয়ে যখন মেসেজ পড়ছি, বাবাই আগ্রহ নিয়ে জিঙ্গেস করে কে ফোন করেছে বাবা? আমি বলি তোমার বন্ধু তোমাকে হেপি বাড্ডে বলেছে সোনা। সে হাততালি দিয়ে নিজেই বলে উঠে, হেপিবাড্ডে তু ইউ, হেপি বাড্ডে ডিয়ার তমাল, হেপি বাড্ডে তু ইউ... সবাই হেসে উঠেন। বাবাই শরম পায়।
শুক্রবার সকালটা সবসময়ই অন্যরকম। কেমন এক অলস ভাললাগা ব্যাপার। ঢাকায় এই একটা সময়ই শুধু আমি কিছুটা উপভোগ করি। বাকিটা...


বউ বাচ্চা নিয়ে বেরুলাম। গন্তব্য ধানমন্ডি। ফুপু শ্বাশুড়ির বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। বাবাই মহা উৎসাহ নিয়ে রাস্তা দেখা শুরু করল। নানা প্রশ্ন আর আলাপে মুখে যেন খই ফুটছে তার।

ধানমন্ডির ঠান্ডা ঠান্ডা সেই বাড়িটায় বিকেল হয়ে যায়। আরিফ ভাই ফোন করেন। কিরে মেলায় যাবিনা। কোথায় আছি জেনে বলেন, ঠিক আছে, এ বাড়ি বেড়ানো শেষ করে বলিস, একসাথে যাব। কিন্তু শেষ আর হয়না। ভাবির ফোন। তোমরা আসনা কেন? বরযাত্রি যাবার সময় হয়ে যাচ্ছে। নিসঃঙ্গ এক মায়াবতী জননীকে রেখে আমরা মিরপুরের দিকে রওয়ানা হই...

ঘরে ঢুকতেই আম্মা আস্তে করে বলেন, কিরে তুই আমার দাদুটার জন্য কিছু আনলিনা? আজনা তার জন্মদিন। আমি অপরাধীর চোখে তাকাই। কষ্ট লাগে। ওর প্রথম জন্মদিনে আমি শহরের বাইরে ছিলাম। কি এক এ্যসাইনমেন্টে। দ্বিতীয় জন্মদিনে তুলির বাসায় একটা বাজে সমস্যা হয়েছিল। তখন ভেবে রেখেছিলাম তৃতীয়টা খুব ধুমধাম করে পালন করা হবে। এইসব লৌকিককতায় খুব একটা মন নেই আমার, কিন্তু ছেলে যখন প্রশ্ন করে বাবা আমার হেপিবাড্ডে কবে তখন মন বলে, এইবার একটু লৌকিক হই...

১ নাম্বার থেকে ছোট একটা কেক নিয়ে যখন ঘরে ফিরি সন্ধ্যা হয়েছে ততক্ষনে। বিয়ে বাড়ির তুমুল ব্যস্ততা। এরমাঝে কেক কাটবে কে? ফ্রিজে রেখে দেয় ভাবী। রাতে ফিরে কাটা যাবে। আমি আস্তে আস্তে নিচে নেমে যাই। মোবাইলে টাকা নেই। কার্ড কেনার জন্য যে দোকানটায় যাই সেখানেই দেখি নেট ইউজের ব্যবস্থা আছে। বাহ্ দারুন বলেই বসে পড়লাম একটা বুথে। বাবাইয়ের ভার্চুয়াল গিফটের ব্যবস্থা করি। আমারতো আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই এখন। ওর ভার্চুয়াল (সত্যিইকি সব হাওয়ার মানুষ আমরা? হাওয়াই মিঠাই এই আমাদের সম্পর্ক? বাতাসে মিলাবে যখনতখন?) চাচা ফুপুরা কিছু করে কীনা দেখি...

এমদাদুল ফোন করে। আমার পার্সেন্টিজ খাওয়া ম্যানেজার। ভাই বই রেডি... আমি কেঁপে উঠি। প্রায় কাঁপা গলায় বলি, কোন সমস্যা হয়নিতো এমদাদুল? সে নির্ভয় দেয়, না, সমস্যা হবে কেন? ভাল হইছে সব। আর কবিতার বইটা? (মাশার বই, এই মিছা কবি জীবন) জ্বি সেটাও ভাল হয়েছে। আগে কবিতার বই শেষ করেছি পরে আপনারটা। এইমাত্র বাঁধাই কমপ্লিট হল। আমি বলি ঠিক আছে এমদাদুল, তুমি পঞ্চাশটা করে বই শুদ্ধস্বরের ঠিকানায় পাঠাও। আমি পরে তোমার সাথে কথা বলব। কেমন বোকা বোকা লাগে, বইটা শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল...

ফোন রেখে দেই। ঘড়িতে তাকাই, সাতটা বেঁজে পাঁচ মিনিট। ২০০৫ সালের এক ফেব্রুয়ারী প্রায় একি সময়ে বাবাই প্রথম কেঁদেছিল। বোকা বোকা চোখে আশ্চর্য সুন্দর সেই শিশুর দিকে তাকিয়ে আমি বলে উঠেছিলাম, ও তুমি...

কয়েকটা দিন অন্যরকম-১

৩০ জানুয়ারি দুপুরের দিকে মাইক্রোবাস কনফার্ম করেছিলাম। ৩১ এর দুপুরে বাসায় যাবে এমন কথা ছিল ড্রাইভারের সাথে। সেই কথা সে বেমালুম চেপে গেল পরদিন দুপুরে। ১ টায় গাড়ি থাকবে বাসার সামনে। আর আমি ফোন করলাম সোয়া ১ টায়। সে তখনও স্ট্যান্ডে দাড়িয়ে। বাড়ি নাকি চিনতে পারছেনা। কি আর করা, দৌড়ালাম। সামনে পেয়ে অন্যকথা বলে। তার ঢাকায় যেতে সমস্যা!!! মাথা ভন ভন করে উঠে। কদাচিৎ গালমন্দের দরকার পড়ে। নয়ত এখন ঝদ্রস্ত জীবনই বলা যায়। ভদ্রতায় ছেদ পড়ল। কষে থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে হলেও সে পর্যন্ত আর যাওয়া হলনা। তাজুল মিয়া নামের জনৈক ড্রাইভার উদয় হলেন ঘটনাস্থলে। তাকে পথ দেখিয়ে দেখিয়ে আমি আমার সিডি ৮০ তে টান দিলাম।
দুপুর একটায় বেরুব কথা ছিল, সেই যাত্রা শুরু হল আড়াইটায়। দেড়ঘন্টার এই দেরিটার জন্য মাথায় রক্তচাপ বেড়েছে দ্বিগুন। গাড়িতে বসেই আবার ফোন দিলাম মান্যবর ড্রাইভারকে। আরেকপ্রস্ত অমৃত বর্ষন করলাম তার কানে।

তিন বছর হল বাবাইর। এই প্রথম সে আমার সাথে কোথাও যাচ্ছে! মনে হতেই কেমন কেমন লাগা শুরু হল। গাড়িতে ধুমাধুম চক্কর দিচ্ছে সে। একবার মায়ের কাছে বসেতো আরেকবার দাদুর কোলে। আরেকবার ডাক্তার দাদার কাছে (আমার মামা)। আমাকেও বঞ্চিত করছেনা। আহারে, ছেলেটা কি হমৎকার কান্ডকারখানা করে, আর আমি তা থেকে নিয়মিত বঞ্চিত হই...

এতবছর ধরে ঢাকা যাই, তবু শহরটা আমার কাছে চরম অচেনা, বিরক্তিকর। টেক্সিওয়ালা আর রিকশাওয়ালা না থাকলে সেখানে চলা আমার জন্য দুস্কর। এই আমাকে যদি মাঝপথে এসে শুনতে হয় টঙ্গি হয়ে শহরে ঢুকতে হবে, তখন কেমন লাগে? কাজটা করলেন আমার ভাই। মোবাইলে তিনি ইনস্ট্রাকশন দিলেন, মেলার কারনে বিজয় স্মরনিতে মহা জ্যাম। মিরপুর যেতে যেতে রাত ১২টা বেজে যাবে। টঙ্গি হয়ে যেন গাড়ি যায়। আমি বল্লাম রাস্তা আমি চিনিনা। সে বলে তোর চেনার দরকার নাই ড্রাইভার চিনবে। ওরে ফোন দে। সে ড্রাইভারের সাথে কথা বলে। আম্মা, তুলি, মামা সবাই বলে রাস্তাটা নাকি তারা চেনে। আগেও গিয়েছে। সমস্যা নাই। কি আর করা, চলুক গাড়ি...

নানা রাস্তা পেরিয়ে মিরপুরের রুপনগরে যখন পৌছলাম রাত তখন এগার। সাথে থাকা তিন পিচ্চি ঘুমের কোলে। নিজের শরিরটাও বেশ দুর্বল।

শুভ জন্মদিন বাবাইসোনা

সেদিন প্রকৃতি আমাকে রেখেছিল নিরাপদ দুরত্বে। আমি কিছুই টের পাইনি, অন্তত শরিরে। সত্যিইকি তাই? একেবারেইকি টের পাইনি? মনে হয় পেয়েছিলাম। কেমন এক দুরু দুর বুক প্রতিক্ষা ছিল সেদিন সন্ধায়। বাবার সামনে আমি হাটছি, আধো অন্ধকার হাসপাতালের করিডোর। বাবার সামনে আমি! আমিও বাবা হব! কেমন এক অনুভূতি। শীত ছিল তবু ঘামে ভিজে জবুথবু ...
আজ তিন বছর হল। এখনও চোখ বুজলে সেদিনটা মনে ভাসে। এখনও যখন আধো আধো বুলিতে তুমি ডাক দাও ‘বাব’ কেমন অবাক লাগে। আমিও তবে বাবা হলাম। আমাকেও কেউ একজন বাবা বলে ডাকে!
শুভ জন্মদিন বাবাই সোনা। শুভ জন্মদিন।
তুলিকে অশেষ ধন্যবাদ, সব কষ্ট নিজে সয়ে আমাকে এমন চমৎকার উপহার দেয়ার জন্য। তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।


লেখা হয় সচলায়তনে। ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮
http://www.sachalayatan.com/albab/12117

শুভ জন্মদিন রনি ভাই

আমার দেখা হল কবে তার সাথে? ১৯৯৪/৯৫ সাল মনে হয়। তবে শীতের দিন, না রাত ছিল সেটা। এবং রোজা ছিল। ঈদের আগের রাত। বন্দরবাজারের আলুপটলময় জঙলায়।
দাদাভাই আমারে নিয়া গেছে জুতা কিনা দিতে। ঈদের জুতা। সেই এলাকায় তখন সিলেটের বিখ্যাত করিম উল্লাহ সু স্টোর।
আতকা দেখি পান্ডামত এক পোলা সেখানে হাজির। ইয়া লম্বা। কালো একটা লেদার জ্যাকেট গায়ে। সেই জ্যাকেটে আবার দুনিয়ার ট্যাগ, ব্যাজ এইসব লাগানো! দেখেই আমার একটা বদ ধারণা হল। সে দেখি আবার কথা বলে দাদার লগে কথা বলে, ওই টিপু কই আইছস! আমি কই হালার দাদায় দেখি ইদানিঙ পান্ডাগো লগে চলে! জুতা কিনা দিতে গেছে শুনে বলে, এই তুই জলদি মধুবনে যা, সুন্দর জুতা নিয়া আসছে একটা দোকানে। আমি কই আরে বেটায় দেখি আবার খবরও ফেরি করে! তবে কন্ঠটা বেটার গোন্ডাপান্ডা টাইপ না :) বাচ্চা বাচ্চা...
আমরা দুই ভাই মধুবনে যাই। দাদারে জিজ্ঞেস করি এইটা কে? সে পাল্টা জিগায়, কেন? আমি বলি পান্ডাদের মত লাগে! দাদা শুধু হাসে...
এই পান্ডা লোকটার লগে আমার পরে খাতির হয়ে গেল। মহা খাতির। এমনকি দাদাভাইয়ের চাইতেও বেশি কোন কোন ক্ষেত্রে! আমারে তিনি বড়ভাই ডাকা শুরু করলেন! আমিও তারে বড়ভাই ডাকি। উচ্ছাসের বৈশাখী আয়োজনে তার সঙ্গে সঙ্গে থাকি। প্রান্তিকের নাটকের ঘরে তার সাথে কথা হয়। যেখানেই দেখা হয় আগলে রাখেন।
আঙুলে হিসাব করলে ১৪ বছরের পরিচয়। ১৪ বছরের গল্প। কত কত গল্প। এই গল্পগুলো আমাদের। আমাদের ভাই এবং বন্ধুদের। আমার অনেক প্রিয় ভাই আছেন। যারা আমাকে আগলে আগলে রাখছেন। কেউ চাকরির খোজ দেন। কেউ ব্যাবসার ধান্দা দেন। কেউ সময় দেন যখন আমি বিষন্ন থাকি। ওভারসিজ কল করে বলেন, ভাল থাকিস, চিন্তা করিসনা, আমরা আছি।
তাদের মাঝে একজনের কথা বল্লাম এখানে। আজ ১৪ই জানুয়ারি যার জন্মদিন। আপনারা তাকে শুভ জন্মদিন বলুন, শুভ জন্মদিন রনি ভাই, শুভ জন্মদিন



লেখা হয়েছিল ১৪ জানুয়ারি ২০০৮। সচলায়তনে প্রকাশিত।
http://www.sachalayatan.com/albab/11399