Saturday, February 9, 2008

কয়েকটা দিন অন্যরকম-শেষ


রোববার, ৩ ফেব্রুয়ারি।
মেলা নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। শৈশবের বড় একটা সময় আমি মেলায় মেলায় ঘুরেছি। রঙিন সেইসব মেলা। ধল মেলা ( এই মেলাটা বাউল সম্রাট আব্দুল করিমের জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত), মাতারগাওয়ের মেলা, জগন্নাথপুরের বারুনি, ঢাকাদক্ষিনের রথের মেলা বা বারুনি (শ্রী চৈতন্যের স্মৃতি বিজড়িত) আরও কত। এই গতবারই ঘুরে এলাম পনাতির্থ থেকে। আমার জীবনটা নানা রঙে রাঙাতে এইসব মেলার ভূমিকা অনেকখানি।


গ্রামবাংলার চিরায়ত মেলা দেখে অভ্যস্তরা নগরের মেলায় কতটা আরাম পাবে? একদমইনা। তাই বাণিজ্য মেলা, তাত বস্ত্র মেলার মত নাগরিক ভিড় আমাকে কখনই টানেনা। আমি অভ্যস্থ পায়ে হাটতে পারিনা। দম বন্ধ হয়। এইসব মেলার রঙবাহার দেখলে আমার হাসি পায়। ঐতিহ্যকে দড়ি বেঁধে মেলার মাঠে দাড় করিয়ে রেখে কর্পোরেট বাণিজ্য। তবু যেতে হয়। বাধ্য হয়েই যাই।


ইদানিং কঠোরভাবে গৃহপালিত নজমুল আলবাব মেলায় যান। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। মা, বাচ্চা, বউ, ভাইয়ের বউ, মামু... বিশাল সে বাহিনি।


আমার ছেলেটাকি আমার মতই? কিছুটা মনে হয়। সেও আমার মতই খুব দ্রুত দলছুট হয়ে পড়ে। ভিড়বাট্টায় নিঃসঙ্গ হয়ে একা একা গুটি পায়ে হাটে। তাই বিশাল মেলা মাঠে ঢুকতে না ঢুকতেই আমরা বাপ ছেলে মূল দলের বেশ দুরেই পড়ে গেলাম। মেলার খেলনাগুলো তাকে বেশ টানছিল। তবে সেটা আর দশটা বাচ্চার মত নয়। যখনি তাকে বলা হল, এটাতো তোমার আছে। একটু ভেবে যখন দেখল সত্যিই বাসায় আছে, তখনই তার বায়না শেষ। এইসব করতে করতে একসময় আবিস্কার করলাম আমরা বাপ ছেলে বাটা কোম্পানির বানানো কৃত্রিম ফুল বাগানে বসে আছি! বেশিক্ষনতো আর বসা যায়না। তাই আবার দলের সাথে যোগ দিতে হয়। আবার দলছুট হই। মজোর স্টলটা করা হয়েছে বেশ অভিনব কায়দায়। সারাটা প্যাভিলিয়ন ঘিরে রেখেছে এ্যাকুরিয়াম দিয়ে। বাবাই খুব মজা পায়। দাড়িয়েই থাকে, দাড়িয়েই থাকে। ঘন্টা পেরিয়ে যায় তার দেখা শেষ হয়না। প্রথমে বাবা, পরে মা আর সব শেষে দাদুকে সঙ্গে নিয়ে সে রঙিন মাছ আর জলের খেলা দেখতেই থাকে। তারপর নানা ছলছাতুরি করে সরাতে হয়।


আগেই বলেছি, একদমই ভাল লাগেনা এইসব ভিড়বাট্টা। তাই বেশি মনে নেই। অথবা রাখিনি। অবশ্য খুব ভাললাগা সেইসব মেলার বর্ণনাও আমি দিতে পারবনা। কেন যেন গুলিয়ে যায় সব... তবু এই বেনিয়া মেলা আমার জন্য অন্যরকম ভাল লাগা নিয়ে আসে। মা কতদিন বলেন, তাকে নাকি একদম সময় দিইনা। বউ বাচ্চারও সেই অভিযোগ। কিছু করতে পারি আর না পারি ওদের সাথে সাথে ঘুরা ঘুরিতো হল...


সোমবার, ৪ ফেব্রুয়ারি
সকালটা অনেক দেরি করে শুরু হল। মেলা থেকে ফিরে অনেকক্ষন জেগে ছিল বাবাই। তাই সকালে তার ঘুম ভাঙেনা। প্রায় দুপুর গড়িয়ে যায়। খা খা দুপুর বলে যে কথাটা শামসুর রাহমান বলেছেন সেটা এসে সামনে দাড়ায়, যখন রিক্সা টেক্সি কিছুই মিলেনা। প্রায় আধা ঘন্টা রোদ খাবার পর একটা সি এন জি পাই। ধানমন্ডিতে হালকা ঘুরান্তি শেষে শাহবাগ। আজিজ মার্কেটটারে আমার নিজের বলে মনে হয় অনেক বছর ধরেই। শুদ্ধস্বরের অফিস। টুটল ভাই বসে বসে কাজ তদারকি করছেন। বই যাবে মেলায় অনেকগুলো। শেষ মূহুর্তের ব্যাস্ততা। নানা কথা হয়। ঘুরে ফিরে আসে ভার্চুয়াল জীবন। কেমন অভ্যস্থ হয়ে গেলাম আজিব এক সাইবার লাইফে, অথচ আগাগোড়া ননটেকি মানুষ এই আমি। শুদ্ধস্বর থেকে বেরিয়েই দেখা পাই কলি আপা আর ইরাজ ভাইয়ের। আমার দুজন প্রিয় মানুষ। একজন সংবাদ এর ফিচার পাতা দেখছেন এখন, আগে ছিলেন ভোরের কাগজ-এ। আর ইরাজ ভাই আমার মত সাংবাদিকতা থেকে বিতাড়িত অথবা পলাতক। নাইওরিতে বসে বসে আড্ডা হয়। কখন বিকাল হয়ে গেল তার কোন হদিসই থাকেনা। পুত্রধন ততক্ষণে ক্ষুধায় আক্রান্ত। আজিজ এর মিনি চায়নিজ নামক বস্তুতে বসে পুরত্রের উসিলায় নিজেদেরও পেটপূজা।


ফোন বাজে। আরিফ ভাই। খবর মিলে তীরন্দাজ বসে আছেন মেলায়। একটু পরে আবার ফোন, অয়ন। মেলায় এসে গেছে সেও। আমরা তাড়াতাড়ি ছুটি। সন্ধার ঠিক আগে আগে মিশে যাই বইয়ের রাজ্যে।

গোল্লায় যাও ভার্চুয়ালিটি
ভার্চুয়াল সম্পর্কগুলো কি রকম? কিবোর্ড, মাউস, ইন্টারনেটের মাঝেই কি এসব সীমাবদ্ধ থাকবে? যদি এই ধারনার উপর জগৎটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকে তবে সে বিরাট ভুল করেছে বাংলাদেশে এসে। এখানে তার সব ভাবই মৃত্যুবরণ করেছে। বাঙালিরা ভার্চুয়ালিটির খেতা পুড়ে এইটারে রিয়েল লাইফে ঠিকি টেনে এনছে। তাই একজন তীরন্দাজ সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে এসে খোঁজ করেন অনভ্যস্থ মানুষ নজমুল আলবাব এর, অয়ন নামের মেধাবী তরুন আচানক হয়ে উঠে বন্ধু। নিজের বইয়ের কাজ ফেলে লিটল ম্যাগ চত্বরে ছুটে আসে অমিত আহমেদ। মুজিব মেহেদীর দিকে হাত বাড়িয়ে নামটা বলতেই হালকা হাসি খেলে যায় তার মুখে। আড্ডা জমে উঠে, আর আমাদের দিকে অবাক চোখে মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকেন এক আশ্চর্য সুন্দর বিদেশীনি...( এই দিনের বর্ননাটা অনেক প্রানবন্তভাবে দিয়েছেন অমিত। http://www.sachalayatan.com/aumit/12194 আমি আর কস্ট করতে রাজি নই)

অতঃপর শেষদিন
বউ এর কামলা শুরু হবে ছয় তারিখ থেকে। তাই পাঁচ তারিখেই রওয়ানা দিতে হবে। আগের রাতে বই মেলা থেকে ফেরার সময় টিকিট কেটে নেই। দুপুরের বাস।


বছর কয়েক আগে পর্যন্ত আমার কাছের বন্ধুদের সবাই ঢাকার বাসিন্দা ছিল। এখন সবাই একসাথে টেমসের তীরে বসত গড়েছে। সেসময় আমার ভাইও ছিল ঢাকায়। কাজে অকাজে প্রায়ই তখন ঢাকায় যেতাম। বাস যোগাযোগ তখন এত ভাল ছিলনা। তাই ট্রেনে চড়ে যাওয়া হত। আমাকে ট্রেনে তুলে দিত দাদাভাই নয়ত গৌরিশ। ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পরও তারা অনেক্ষন দাড়িয়ে থাকত। জানলা দিয়ে তাকালেই তাদেরকে দেখতে পারতাম। আর আশ্চর্য ব্যপার আমার বুকের ভেতর কেমন হু, হু করে উঠত, কান্না পেত। সারা রাস্তা আমার মন খারাপ থাকত...


কিছু মানুষ আছে যারা খুব করে চাইলেও ভেজাল এড়িয়ে চলতে পারেনা। আমি সেই গোত্রের। সোহাগ এর বাস সার্ভিসের এত নামডাক। তারা কীনা আমাদের যে সিট দিল সেটার উপর এসির পানি টপ টপ করে পড়ে! আর এমন তাদের ভাব যেন কিছুই হয়নি। টিকিট কেটেছ যখন তোমাকে যেতেই হবে। আমার সাইজটাও এমন যে এই পাঁচ ফুটকে কেউ পাত্তা দিতে চায়না। আম্মা আমার উত্তেজনা দেখে বলেন, আমরা চল পরের গাড়িতে যাই... আমি কিচ্ছু বলিনা। টাকওয়ালা লোকটাকে আস্তে করে বল্লাম, ভাই এইখানে নামায়া দিতে পারেন ( বাস তখন চলতে শুরু করেছে। আমি অন্য সিট দখল করে রেখেছি। আর সেই সিটের লোকজন দাঁড়ানো!) ঢাকা শহরে কিচ্ছু করার নাই আমার। কিন্তু সিলেটে আপনার অফিসে বাসে মিলেও আমার ছেলেদের নাস্তা হবেনা ! লোকটা আমার দিকে একপলক তাকিয়েই দুরে চলে যায়। পনের মিনিট পরে সব ঠিক!!! আজিব দুনিয়া, বিনয়ে কাজ দেয়না আর ভাব নিয়ে কথা বল্লে বাপ ডাকতে এগিয়ে আসে!!! আমি সত্যিই মহা অবাক হয়ে সারাপথ বসে থাকি।
এই অবাক ভাব আসায় একটা লাভ হয়েছে আমার। কারওয়ান বাজারের মোড়ে দাড়ানো অয়নকে দেখে বুকে যে হু...হু... ভাবটা এসেছিল সেটা কেটে গেছে।
অয়ন তুই অফিস ফেলে বোকার মত ওই রাস্তায় দাড়ায়া ছিলি কেন তখন?

No comments:

Post a Comment