Friday, October 7, 2011

অপার্থিব জানালার খোঁজে


তখন আমাদের কেরানির জীবন। বাবা পোস্টমাস্টার। কিন্তু আদতে সেটা কেরানিরই চাকরী। ভাই ঢাকায় একটা হাউজিং কোম্পানিতে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ। আজকাল সব অফিসে সবাই এক্সিকিউটিভ হয়। গালভরা নাম সব। আদতে সবাই কেরানি। আমি নতুন চাকরীতে। পত্রিকার ডেস্কে বসি, তাও এক ধরনের কেরানিরই কাজ। বাপ ছেলে তিনজন যখন কেরানিরই চাকরী করি তখন সেটারে কেরনির জীবন বলাটাই উচিত।

আব্বা শহর থেকে ১৫/১৬ কি. মি. দুরের একটা ছোট্ট পোস্ট অফিসে কাজ করেন তখন। চাকরীর শেষ ১৫ টা বছর তিনি শহরেই ছিলেন বেশিরভাগ সময়। মাঝখানে কিছুদিন বাইরের ছোট ছোট দুটি অফিসে কিছুদিন ছিলেন। বড় অফিসে যেতে চাইতেন না। কাজের চাপে হাপিয়ে উঠতেন। শহরের সবচে কাছের দুই ছোট অফিসে তাই থাকা।

ছোট্ট একটা বাজারের অফিস। টিনশেড একটা বাড়ি। সাকুল্যে তিন জন স্টাফ সেখানে। অফিসের সামনের দিকটায় পাকা সড়ক। আর পেছনে রেল লাইন। সিলেটে আসা কিংবা সিলেট থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো যখন ঝম ঝম শব্দে পাড়ি দিতো সেই বাজার, পুরনো বাড়িটা তখন যেনো কেঁপে উঠতো।

আব্বা অফিস ছাড়া কিছু বুঝতেন না। ঝড়-বাদল, হরতাল কিছুই তাকে আটকে রাখতে পারতো না। চাকরী জীবনের বেশিরভাগ সময় বাড়ি আর অফিস এক কম্পাউন্ডে থাকায় এটা বুঝতে পারিনি। কিন্তু যখন সিলেটে চলে এলাম উপজেলা সদরের পাট চুকিয়ে, তখন তার এই বিষয়টা ধরা পড়লো। হরতাল হলেই মোটর সাইকেল চালিয়ে দিয়ে আবার নিয়ে আসতে হতো। আব্বাকে নিয়ে মোটর সাইকেলে বসা বেশ একটা ঝক্কির। পেছন থেকে অনবরত ইনস্ট্রাকশন দেয়া। সামনে কিছু পড়লো, পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া যাবে, কিন্তু পেছন থেকে শিশুর মতো ঝাপটে ধরা। ব্রেক না করে উপায় নেই। তবুতো আমার কপাল ভালো। দাদাভাই যখন এরকম দিনে আব্বাকে নিয়ে যেতো, তখন তিনি এমনকি দাড়িয়েও যেতেন সমস্যা মনে হলে। একবার সামনে একটা গরু পড়েছিলো। দাদাভাই ব্রেক ধরেছে। আর আব্বা পেছনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। একেতো ব্রেক ধরা হয়েছে, তার উপর পেছন থেকে আব্বা দাড়িয়ে পড়ায় মোটর সাইকেল হঠাৎ পাতলা হয়ে ছিটকে পড়লো দাদাভাই সমেত! এরপর থেকে আর দাড়ানোর মতো বোকামী করেন নি। অবশ্য ড্রাইভার হিসেনে আব্বার আমাকে বেশি পছন্দ। কোথাও যেতে হলে গাড়ির চেয়ে আমার মোটর সাইকেলে চড়তেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন।

ঢাকা যাবার জন্য দুপুরের ট্রেনটাতেই তখন বেশি চড়তাম আমরা। সকালে ঘুম থেকে উঠে ট্রেন ধরার ঝক্কি কিংবা রাতে ঘুমের সমস্যা করে কোথাও যাওয়ার কষ্ট করতে মন চাইতো না। দাদাভাই ১৫ দিন কিংবা মাসে একবার আসতো। সে আসতো সাধারণত রাতের ট্রেনে। অফিস শেষ করে ট্রেনে চড়ে সকালে পৌছা যেতো। কিন্তু ফেরার সময় দুপুরের ট্রেন ধরতো। যাবার দিন আব্বা সকালে বিদায় নিয়ে চলে যেতেন। মন খারাপ টারাপতো কখনো বুঝতে দিতেন না। সেটা খুজতেও যাইনি কখনও। শুধু বিকেলে ফিরে আসলে আম্মাকে বলতেন, ছেলে তিনটার দিকে আমার অফিস পেরিয়ে গেলো। আম্মা বলতেন, দেখা হইছে। আব্বা মাথা নাড়তেন। ট্রেন লাইনের পাশের সেই অফিসে যাবার কয়েকদিনের মধ্যেই প্রথম এটি শুনলাম। দেখা হবার বিষয়টি মাথায় ঢুকেনি তখন। কয়েকদিন পরেই কিসের জন্য যেনো হরতাল ডাকা হয়েছে। আব্বাকে নিয়ে গিয়েছি অফিসে। বিকেলে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবো,তাই থেকে গেলাম। সকালের দিকে কোন একটা লোকাল ট্রেন আসলো। দুর থেকে শব্দ শোনেই আব্বা পেছনের জানালা খুলে ট্রেন দেখতে বল্লেন। চাকরী করে এমন বয়েসের কোন ছেলেকে বাবা ট্রেন দেখতে বলছে শুনলে লোকে অবাক হবে হয়তো। কিন্তু আমরা এসবে অভ্যস্থ। চা বাগানের পাশ দিয়ে গেলে আব্বা ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে আমাদেরকে চা বাগান দেখাতেন। টিভিতে শিশুপার্ক দেখালে ডাকাডাকি হতো! টিভিতে লন্ডন শহর দেখাচ্ছে। প্রবল আগ্রহ নিয়ে তিনি রাণীর বাড়ির গল্প করতে লাগলেন, আর আমাকে বসিয়েই রাখলেন, লন্ডন যখন দেখাচ্ছে, রাণীর বাড়ি না দেখিয়ে পারে না, সেটা দেখানোরে জন্য।

আমি জানালা খুলে দাড়ালাম। দেখলাম হেলে দুলে ট্রেনটা পেরিয়ে গেলো পোস্ট অফিসের সীমানা। আব্বা পেছন থেকে ডেকে বল্লেন, মানুষ দেখা যায়? আমি হু বলতেই বল্লেন, টিপু যাবার সময় দরজায় দাড়িয়ে হাত নেড়েছে! এরপর যে কয়েকমাস ছিলেন আব্বা সেই অফিসে, প্রতিবার দাদাভাই যাবার সময় ট্রেনের দরোজা বা জানালা দিয়ে হাত নাড়তেন, আব্বা তার অফিসের জানালায় দাড়িয়ে ছেলেকে দেখতেন…

আমি রোজ শাহজালালের মাজারের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরি, শাহজালালের মাজারের পাশ দিয়ে ছেলের স্কুলে যাই, যতবার শহরে ঢুকি কিংবা ফিরে আসি, ততবারই মাজারের পাশের রাস্তাটা ব্যবহার করি। আব্বার কবরটা দেখা যায়। আমি কয়েক মূহুর্তের জন্য সেখানে দাড়াই…

কবরের কোন জানালা থাকে না। আব্বা আমাকে দেখার জন্য কোন জানালা ধরে দাঁড়ায় না কখনো…

Sunday, September 18, 2011

গল্প সংক্রান্ত অভিমান


বাবা অসম্ভব মজা করে কথা বলে। যে শুনে সেই হাসে। হাসতে হাসতে পেট ফুলে যায়। আমাদের বাড়িতে যেই আসে সেই বলে, বাবার মতো মজার মানুষ কোনদিন সে দেখেনি। বাবা এতো চমৎকার সব কৌতুক জানে, মুখ এমন ভেংচি কাটতে পারে, না দেখলে না শুনলে কেউ সেটা বিশ্বাস করবে না কিংবা বুঝতে পারবে না।

বাবার অনেক রাগ, সেটা কিন্তু কেউ তেমনভাবে বুঝে না। আমরা বুঝি, বড় চাচা বুঝে। আমার এখন বাইশ বছর বয়েস, বন্ধু ছাড়ারই সাহস নেই, কিন্তু বাবা সেই বাইশ বছর বয়েসে ঘর ছেড়েছে, আর যায়নি। চাচার সাথে কক্ষনো কথা বলেনি। চাচা প্রতি বছর রুটিন করে দু'বার আমাদের দেখতে আসে, কান্নাকাটি করে, বাবা সেটা আমলেও নেয়না। বাবা আর কোনদিন বাড়ি যাবে না। কী তীব্র অভিমান!

ছোটবেলা থেকে সবাই বলে আমি নাকি বাবার মতো। আসলেও তাই। বাবা মাত্র সাড়ে পাঁচ ফুটি একটা মানুষ। আমিও তাই। বাবা দেখতে মোটামতো, আমিও তাই। তবে লোকজন এসব কারনে আমাদের বাপ বেটার মিল খুজে না। তারা আমার মজা করে কথা বলার ক্ষমতাটার কথা বলে। আমি এটা ঠিক জানি না, বুঝি না বা সচেতনভাবেও করি না। এম্নিতেই আমার কথা কিরকম মজা মজা হয়ে যায়। এক দিক দিয়ে আমি বাবার চে এগিয়ে। শরীর দুলিয়ে, গলা মিলিয়ে আমি নানান অভিব্যক্তি করতে পারি। অবিকল না হোক মোটামোটি কাছাকাছি নকল করতে পারি যে কাউকে। সেটা সম্ভবত অনেক উপভোগ্য হয়। আমি দেখেছি লোকজন আমাকে এ ওর বিরুদ্ধে উসকে দেয়, চেষ্টা করে নকলামি দেখতে। ক্রিকেট খেলা হোক বা না হোক, আমাকে ক্রিকেটের ধারাভাষ্য দিতেই হয়! হরতাল না হলেও বিটিভির হরতালের খবর পড়ে শোনাতে হয়। আমর মজাই লাগে।

এম্নিতে আমাদের কোন অনুষ্ঠান থাকলে বাড়ির কিংবা বন্ধুদের, জমানো কিছু করতে হলে সবাই আমাকে মনে করে। আর কিভাবে কিভাবে যেনো আমি জমিয়েও তুলি আসর। এইতো সেদিন নাচের অনুষ্ঠানটায় যেতে পারলাম না। কাজ ছিলো। অনুষ্ঠান শেষ হতেই ফোন আর ফোন। এ একবার তো সে একবার। ভাংগা অনুষ্ঠানে গেলাম। জুইকে নিয়ে একটার পর একটা ফাজলামি করলাম। সে চেয়ারে বসে বসে হাসতেই থাকলো। নড়তে চড়তে পারে না। পেটে হাত দিয়ে বলে, ওই তুব থামবি! আমারতো ব্যাথা শুরু হয়ে যাচ্ছে... আমি দৌড়ে দরোজায় চলে এলাম, তরপর থেমে বল্লাম, নারে বাবা আর থাকা যাবে না, শহরের সব লেডি ডাক্তার ক্ষেপে যাবে। এভাবে অপারেশন ছাড়া বাচ্চা পয়দা হতে থাকলে তারা আমারে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে দেবে! মোটর সাইকেল স্টার্ট দিতে দিতে আমি শুনি, ভেতরে হাসির চোটে গমগম করছে, সবকিছু উড়ে যাচ্ছে।

আমাদের নাটকের দলে বাঘা বাঘা সব অভিনেতা। এরা মানুষকে হাসায়, কাঁদায়, রাগায়। একবার একটা নাটকে আমাকে দেয়া হলো ভাড়ের চরিত্রটা। নাটকের শুরু থেকে শেষ অব্দি নেচে গেয়ে ধুন্দুমার বাধিয়ে দিলাম। ডিরেক্টর বল্লেন ওরতো অভিনয় করতে হয়নি, ন্যাচারাল, একেবারে চাচার সবকিছু পেয়েছে। হয়তো সত্যি, কিন্তু আমি আসলে অভিনয়টা মন দিয়েই করেছি, সবচে বেশি রিহার্সাল করেছি আমি, নাটকটা নিয়ে আর সবার চেয়ে বেশি ভেবে থাকলে সেও আমিই ভেবেছি। এর পরের নাটকটাতে আমার একটা ছোট্ট চরিত্র। মিনিট কয়েক। খুব কষ্টের সেটা। রিহার্সালে মোটামোটি চালিয়ে নিলাম। সবাই বল্ল এতেই চলবে। যেদিন নাটক হলো, সেদিন জানি না কি হলো আমার, এর আগে একদিনও রিহার্সেলে যা হয়নি, সেদিন না চাইতেই সেটা হয়ে গেল। আমার চোখ দিয়ে কখন কিভাবে টপ টপ করে পানি আসলো সেটা নিজেই জানি না। নাটক শেষ হবার পরও আমি কাঁদছিলাম। কিন্তু নাটক শেষে গ্রুপের মূল্যায়ন সভায় বিষয়টা সবাই বেমালুম এড়িয়ে গেলো। একজন বরং বল্লেন, আগের নাটকে দীর্ঘ ভাড়ের চরিত্রটা আমার ভুলে যাওয়া উচিত, তাহলে এই নাটকে আরো ভালো কাজ করতে পারবো।

ভাড় তকমাটা লেগে গেলে মানুষের এমনই হয়। সবাই ভাবে এরে দিয়ে সিরিয়াস কিছু হবে না। সবাই ভাবে এর ভেতর কোন রাগ নেই, কোন অভিমান নেই। এর ভেতর জেদ বলতে কিছু নেই। মানুষটা খুবি সহজ, জলের মতো। হয়তো তাই। সবাইতো আর বাবাকে ভালো করে চিনে না। আমি জানি আমার বাবাকে, তাই জানি এই যাওটাই শেষ যাওয়া, আমি আর দেশে ফিরবো না। কোনদিন না...

Friday, September 2, 2011

শূন্যতার ঈদ যাপন


চাঁদের খবর নিতে হয় না। চাঁদ এসে নিজেই ঢুকে পড়ে মোবাইলে, ফেসবুকে, ই-মেইলে। ঈদ আসছে টের পাই তাই চাঁদ ওঠার অনেক আগে। তখনও রাস্তায়। আকাশটা যথেষ্ট ফরসা, তবু আজান শোনা যায়। ফোনে মেসেজ টোন শুনি, রিং টোন নেই। এই যে ইফতার হলো, রাস্তায় পড়ে আছি, তবু ফোনটা বাজে না। বাজবে না। আর বাজবে না। কখনই বাজবে না। সে তুমি রাত তিনটাতেই বাড়ি আসো, ইফতার পেরিয়ে যাক, তবু ফোন বাজবে না সেই পুরনো নাম্বার থেকে। এই হলো নিয়ম, এভাবেই সব পাল্টে যায়।

কনফু একটা এস এম এস দিলো। ইংরেজী দুইটা অক্ষর সেখানে। ই এবং এম। ইহজনমে এমন কিপ্টামি সমৃদ্ধ শুভেচ্ছা আমি পাইনি। এটা শুভ বার্তার মাঝ প্রহরের কথা। তার আগে প্রথম এস এম এস টা আসলো রুমনের কাছ থেকে। আমরা এক সাথে এক অফিসে কাজ করতাম। আমাদের চে অনেক নিচের সারিতে ছিলো তার অবস্থান। সেই অফিসে আমার খুব কাছের লোকজন ছিলো। তারা আর এখন খোঁজ নেয় না। আমিও নেই না। শুধু রুমন নিয়ম করে আমাকে দেখতে আসে খুপড়িতে। এস এম এস পাঠায়। ভালোবাসা বড় বিচিত্র জিনিস।

সিলেট শহরটা অলস। সন্ধ্যাতেই ঘুম জড়ো করে চোখে আর এগারোটা বাজার আগেই সব সুনশান করে দেয়। ব্যতিক্রম শুধু ঈদের সময়। রোজার শেষ দশটা রাত সে ঘুমায় না। আমরা বড় হয়েছি জিন্দাবাজারকে ঘিরে। ঈদের আগের রাতে মাঝরাত না হলে বাড়ি ফেরা হতো না। বাড়ি থেকেও কিছু বলা হতো না। সবাই সবাইক চিনি, সবাই সবার পরিচিত এমন একটা ভাব ছিলো। স্কুলের বড় ক্লাসে পড়ার সময় জিন্দাবাজারে একটা নিয়মের মতো ছিলো মারামারি। আমাদের পাড়ার ছেলেরা গিয়ে একেবারে শহরের মাঝখানটাতে ধাম ধুম করে এই সেই ফুটিয়ে ভু ভু করে ফিরে আসতো। এখন সেসব হয় না। জিন্দাবাজার পয়েন্টে দাড়িয়ে দল বাধারও কোন সম্ভাবিলিটি নেই এখন। ঈদের বাজার ছড়িয়ে পড়েছে। কুমারপাড়া আর নয়াসড়কের নিস্তরঙ্গতা ভেদ করে জেগে উঠেছে শপিং মল। মির্জাজাঙ্গালের অপ্রশস্থ সড়কেও এখন কাপড়ের বিকিকিনি। তবু জিন্দাবাজার তার কৌলিন্য হারায়নি। এখনও সেখানে রাজ্যের ভিড়, হট্টগোল। রাত দুটোয় যখন জিন্দাবাজর পয়েন্ট পাড়ি দিচ্ছি, বিস্তর ভিড় সেখানে। তবু কি এক শূন্যতায় হাহাকার করে উঠে বুকের ভেতরটা। এ শহরে আমার আর কোন বন্ধু নেই। আমি আর দল বেঁধে এ শহরে ঈদের বাজার করি না। আমাদের সঙ্ঘ ভেঙে গেছে, এখন আমরা নিতান্তই কাটা ঘুড়ি একেকজন। কেউ উড়ি ওয়াশিংটনে কেউ লন্ডনের স্যাতস্যেতে বাংলা টাউনে, ঢাকা কিংবা চট্টলার ভিড়ে মিশে আছে কেউ কেউ। আর কেউ আরো দুরের স্কটল্যান্ডে। এই-ই নিয়ম। আমরা নিয়মকে মেনে নিই নিয়তি বলে।

সড়কবাতিগুলো ঠিকমতো জ্বলে না। খানাখন্দকে ভর্তি রাস্তা। আমাদের গ্রামে বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোতে টিম টিম করে জ্বলে কম ভোল্ডেজের বাতি। বাকিটা ভরে থাকে নিকষ অন্ধকার। বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা হয়ে গেছে পুরোটা গ্রাম। পকেটে রাখা চাবিটা ঘুরিয়ে গেট খোলার সময় এ বাড়িটাও ঘুমিয়ে আছে। ঘুম… ঘুম… ঘুম… রাত তিনটায় গভীর ঘুম...

তিনি কখন ঘুমাতেন আর কখন জেগে থাকতেন তার কোন হিসাব আমি পাইনি। একসময় যখন আরো বেশি মফস্বলে ছিলাম, যখন বাড়িতে কিংবা বাড়ির পাশেই একটা পুকুর থাকতো, নয়তো নদী। তখন অন্ধকার মিলিয়ে যাবার আগে উঠতে হতো। সেই ঘুম ভাঙানোর মজাটা মিইয়ে গিয়ে বিরক্তি ভর করেছে কতবার। এবার সেখানে শুধুই শূন্যতা। কেউ ডাকেনি, কেউ ডাকবে না। কেউ বলেনি গরম পানি আছে, কেউ আর বলবে না, কোনদিন না। আমি শাওয়ার ছেড়ে ভিজতে থাকি, ভিজতেই থাকি। তারপর, যখন সফেদ হবে হবে করছে আকাশ, স্টোভে পানি গরম করতে দিয়ে ডাকি, বাবাই ওঠো, গরম পানি আছে…

দুনিয়াটা নাকি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। মানুষের মাঝে নাকি দুরত্ব কমছে দ্রুত। কে বলে এ কথা? যত্তসব ফাইজলামি। আমরা ভাই-বোনরা একসাথে বেড়ে উঠেছি যারা, তারা কেউ আর দেশে থাকে না। দুনিয়ার এ মাথা ও মাথায় ছড়িয়ে গেছে। এবার তাদের একজন এসেছে বিয়ে করবে বলে। আমেরিকায় থাকতে ওর সাথে প্রায় রোজই কথা হতো ফেইসবুকে। দেশে আসার পর সেটাও আর নেই। ঈদের সকালে সে ফেইসবুকে আমারে ঈদ মোবারক বলে, আমি বলি তুই কই? আসলি না যে? আমি না দেখেও দেখতে পাই, আড়মোড় ভাংতে ভাংতে সে বলছে, ভাই সন্ধ্যার পরে আসি… এখন শহরে বন্ধু বলতে কাছের জন হলো শাওন। পাশাপাশি বিল্ডিং এ আমরা বসি। পুরা রোজার মাস গেলো, ওর সাথে আমার মাত্র একদিন দেখা হলো। বাদ বাকি সবদিন ফেসবুকে। পাশাপাশি রুমে বসি আমি আর মনির ভাই। ষাটোর্ধ যুবক। মুক্তিযোদ্ধা। ফেসবুকে ঈদ শুভেচ্ছা দিলেন। দুনিয়া আসলে কাছে আসছে না বা ছোটও হচ্ছে না। সে ভার্চুয়াল হচ্ছে আর আদতে আমরা দুরেই সরে যাচ্ছি পরস্পরের, দুরে, দুরে এবং দুরে…

ঈদে বেড়ানো হলো না। সকাল থেকে পিচ্চিরা আসছেতো আসছেই। প্রথমদিকে তুলি গুনতে চেষ্টা করতো। এখন আর করে না। আমাদের গ্রামটা ছোট। কয়েকটা মাত্র বাড়ি। কিন্তু এ গ্রামের মেয়েদের রি-প্রোডাক্টিভ হেলথ্ ইর্ষা করার মতো। একেকটা ঘর থেকে ৪ জন ৫ জন করে আসছে! কেউ কেউ সালামী নেবার সময় বলছে, তার আরেকটা পিচ্চি ভাই আছে বাড়িতে, তার জন্য সালামী দিতে হবে! এবার তাদের সালামী কমে গেছে। এ বাড়ি থেকে আগে আরেকজন সালামী দিতেন, এবার সেটা নেই।

ঈদের আগের রাতে অরূপের সাথে কথা হলো, অনেকক্ষণ। ঈদের রাতে আবার। দেশে থাকলে ফোনে কথা বলাটা অন্তত হয়। যেমন ঈদের আগের রাতে, মাঝরাত তখন, বুড়াভাইকে ফোন দিতে পারলাম। প্লেনের অপেক্ষায় তখন। কি করছেন জিজ্ঞেস করতেই বল্লেন, ওরা কান্নাকাটি করে এখন শান্ত… তিনি কি করছেন সেটা বল্লেন না, বলার প্রয়োজন নেই। ঢাকা আমার জন্য অনাত্মীয় একটা শহর। মুস্তাফিজ ভাই সে শহরটাকে আরেকটু বেশি অনাত্মীয় করে চলে গেলেন।

এক বন্ধু ঈদের বিকেলে এস এম এস পাঠালো। বাবা ছাড়া প্রথম ঈদটা যেনো অন্যদের নিয়ে ভালোভাবে কাটানোর চেষ্টা করি। একটা জীবন কাটিয়ে দিলাম বাবাকে ঘিরে, আরেকটা জীবন কেমন করে কাটবে জানি না। মানুষ মূলত একা এই সত্য জানি, তবু কেন যে এইসব সঙ্ঘপ্রীতি আসে, কেন যে নিজের ভেতর গড়ে উঠে ভালোবাসা, নির্ভরতা। কেন বিচ্ছেদে বিষণ্ণতা ভর করে জীবনে, কেন উৎসবের রং বারবার ফিঁকে হয়ে যায়। জানি না, কিচ্ছু জানি না। প্রকৃতি আমাদের সবকিছু জানতে দেয় না।

Monday, August 22, 2011

সন্তাপ ০১


সকাল সকালেই আসে রোজ, ঠিকমতো
ঘড়িটা ঘুরছে পুরনো নিয়মে, এই মেঘ
এই রোদ, এই ঝরে বৃষ্টি, সকলই নিয়মবদ্ধ
এই ভুলে যাওয়া, এই দৈনন্দিনতা সেও
নিয়ম, ব্যত্যয় ঘটে না কখনো, সবাই
মানিয়ে নেয়, মেনে নিতে হয়...

আমি বুঝিনা, আমি আসলেই বুঝি না
শুধু রোজনামচার খাতা হাতড়ালে দেখি
বিস্তর সাদা পাতা, বিরাট শূন্যতা

Tuesday, August 9, 2011

পুলিশ কি করলো? তারে বরখাস্ত করে কেনো?

পুলিশ তাদের গাড়ি থেকে একটা কিশোর অথবা তরুণকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো, চিৎকার করে বল্ল এরে মেরে পিটাও, এ হলো ডাকাত। বীর বাংগালের সকল বীরত্ব জেগে উঠলো, সে পিটাতে শুরু করলো, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো, পেটাতে পেটাতে যখন বুঝলো কাজ শেষ, তখন ক্ষান্ত দিলো। পুলিশ সেই লাশ উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো। কি অসাধারণ দৃশ্য। টিভিতে এটি দেখানো হয়েছে, পত্রিকার অনলাই এডিশনে ভিডিও ক্লিপটি জুড়ে দেয়া হয়েছে। এবং এজন্য দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এক দারোগা আর দুই সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মাশাল্লাহ।

Thursday, July 7, 2011

সন্তাপ


২/৭/১১

জীবন ছড়িয়ে আছে তোমার
এখানে সেখানে
জন্মমাত্রই পিতৃহীন, তারপর
জননীও দিয়েছেন পাড়ি অন্যভূবণে

মামা, চাচা, ভাই, কোথায়
না আশ্রয় খুঁজেছ তুমি! তোমার
স্মৃতিগুলো মুড়কির মতো
ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। আর
আজ সকল দুঃখবোধ জড়ো
হলো এই একাকী বাড়িতে…

পিতা আমার, চিরকালিন শিশু আমার
এইবার তবে বিদায়, অথবা চীর বসবাস
আমার বুকে, নিভৃতে…



২.
তেষট্টি বছরের পিতৃশোক!
কতটা ভার বুকে নিয়ে তুমি
কাটালে জীবন তোমার?
আব্বাগো, এতো দীর্ঘ দম আমার নাই।
অত লম্বা সময় আমি কষ্ট পোষতে পারবো না
আমারও চাই দীর্ঘ যতিচিণ্হ





৯/৭/১১

প্রথম ঘন্টায় হিসেবে মিলেছে গত ঘন্টার কণ্ঠস্বর
দ্বিতীয় দিনে বলেছি গতকাল, এভাবে প্রতিদিন
পূর্ববর্তি দিনকে টেনে এনে বলেছি আব্বা…
অষ্টম দিবসে এসে আর গত বলতে পারি না
বলতে হয় গত বৃহস্পতির আগের বৃহস্পতিবার!
হায়, এত দ্রুত তুমি দুরে সরে যাও
হায়, এত দ্রুত তুমি স্মৃতি হও!



কল লিস্ট থেকে তোমর নামটা উধাও
শেষবার দেখেছি ১৩৪ টা মিস্ড কল
৩২ টা কল আর ডায়াল লিস্টে কিছুই নেই!

হু, কিছুই নেই, আমি তোমাকে ফোন করিনি
ইদানিংকালে, কোনদিনই না মনে হয়, ঘন্টায়
ঘন্টায় উল্টোদিক থেকে কথা বলা হলে এপাশ
থেকে কি সেরকম টান থাকে? থাকে না বোধয়

১৩৪ টা মিস্ড কল মানে কমপক্ষে তিরিশটা সকাল,
বিশটা দুরের যাত্রা, কমপক্ষে বিশবার তোমাকে উপেক্ষা!
সবকিছু মনে পড়ে না, মনে পড়বে না। শুধু শেষবার
জীবনের শেষবার, চলে যাবার ঠিক আগে আগে একেবারে
স্বাভাবিক কণ্ঠে যখন বল্লে, ‘শরীরটা খারাপ লাগছে
একটু আসো,’ এই কথাটা ভুলবো না। কল লিস্ট থেকে
তোমার নাম মুছে গেছে, আরো অনেক লিস্ট থেকে কাটা
পড়বে তোমার নাম, শুধু খুব গোপনে গভীরে আমার কানে
বাজবে, শরীরটা খারাপ লাগছে, খারাপ লাগছে, খারাপ লাগছে…
অক্ষম পুত্র তোমার, সেই ডাকেও সাড়া দিতে পারে না!

কি অপার শূন্যতায় ফেলে গেলে আমায়, তা কি বুঝ তুমি?

Wednesday, April 27, 2011

আমাদের গল্প আর এ সংক্রান্ত বিষণ্নতা


মা শৈশবে খুব দুরন্ত ছিল। তার দুরন্তপনার নানান গল্প ছড়িয়ে আছে গ্রামে। নানিজীর মুখে সেসব শুনেছি আমরা। গ্রামের বড়রা গল্প করতো, মা নিজেও বলে। অন্যদের মুখে শোনার চেয়ে মায়ের নিজের বলাটা শুনতে বেশি ভালো লাগে। তার গল্প বলার এমন চমৎকার ভঙ্গি, এমন জমিয়ে গল্প করে, আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার শৈশব গিলতে থাকি। দম ফাটানো হাসি, রুমাঞ্চ কিংবা কান্নার গল্পগুলো। মা খুব বুদ্ধিমান, কোন গল্পটা শুনলে আমাদের মন খারাপ হয়, কোনটা শুনলে মজা পাই এটা বুঝতে পারে। তাই মজাদার সব গল্পই আমাদের বলে।

আমার মা খুব মেধাবী। তার সাথে যারা পড়তো, এই এত্তোবছর পরেও আমাদেরকে দেখলে সেই কবেকার স্কুলের গল্প বলে। মায়ের অসম্ভব মেধার বয়ান শুনি তাদের কাছে। তখনকার বিজাতীয় জাতীয় সংগীত গ্রামের কোন শিশুই ভালো করে শিখতে পারতো না। মা নাকি সেটা মুখস্ত করে ফেলেছিলো। রোজ সকালে পতাকার সামনে দাড়িয়ে সেই গান গাইতো মা, আর তাতে গলা মেলাতো স্কুলের অন্যরা।

নানাবাড়ি আয়তনে বিশাল। বাড়ির এ মাথা থেকে ও মাথা দেখা যায় না। ইচ্ছে করলে নানাজান একটা স্টেডিয়াম বানাতে পারবে। সেই বাড়িতে, মা-মামারা যখন ছোট তখন অনেক গরু ছিলো। হাস-মুরগ ভর্তি ছিলো সে বাড়ীতে। এর মধ্যে মায়ের মালিকানা ছিলো শুধু ছাগলে। মালিকানা দেখানোর জন্য নানান কাণ্ড করতো সে। সকালে হয়তো, বাড়ির কাজের লোক ছাগল মাঠে নিচ্ছে, মা সেখানে হাজির হয়ে বলবে, আজকে অনেক রোদ উঠবে, মাঠে গেলে ছাগলের কষ্ট হবে। এদেরকে আজ বের করা যাবে না। বাড়ির পুরনো লোকটা জানতো কিভাবে মেঝো আম্মাকে বসে আনতে হয়। সে সাথে সাথে নির্দেশ মেনে নিতো। পরে, মা যখন স্কুলে চলে যেতো, তখন কাজটা করে ফেলতো। কিন্তু অন্য যারা ছিলো, বিশেষত নতুন কেউ আসলে প্রথম প্রথম এসব ধরতে পারতো না, তাই সমস্যা পাকিয়ে ফেলতো। যেমন, এক সকালে ছাগল আটকে রাখার ইচ্ছে হলো তার। সেদিন নতুন একজনের দায়িত্ব পড়েছে ছাগল মাঠে নিয়ে যাবার। পুচকে একটা মেয়ের কথা শুনতে সে প্রস্তুত না। তাছাড়া সকাল সাতটায় দুপুরে অনেক রোদ হবে এটা কেমনে বুঝলো এই পুচকা। সে বলে, জিনা মেঝো আম্মা, ছাগলরে বাড়িতে রাখা যাবে না, মাঠে না গেলে এরা ঘাস খেতে পারবে না। তখন গোস্ত কমে যাবে। সাথে সাথে উত্তর, তুমি ছাগলের জন্যে ঘাস কেটে নিয়ে আসো। লোকটা ভাবে এতো মহা মুসিবত, সে বলে, আম্মা, ছাগলতো কাটা ঘাস খায় না। কাটা ঘাসতো গরুর জন্য আনা হয়... কে শুনে কার কথা? নিজেই ঘাস কাটতে চলে যায়  আম্মা! এ কথা বলেই আম্মা তার বাম হাতের তর্জনিটা তুলে দেখায়, এই দেখ কাটা আঙ্গুল, সেদিন ঘাস কাটতে গিয়ে এটা কেটেছিলাম!

মায়ের আরো দস্যিপনা ছিলো। সে গাছে গাছে চড়ে বেড়াতো সবসময়। গ্রামের কোন বাড়িতে আম পাকলো, কোন বাড়ির কাঠাল বেশি মিস্টি এটা মায়ের মুখস্ত ছিলো। নানী বলেন, গাছের নিচে কাঠালের বিচি পাওয়া যেতো, কোন ফাঁকে দস্যি মেয়ে গাছে চড়েছে আর কাঠাল সাবাড় করেছে, কেউ টেরই পেতো না।

বর্ষার শুরুতে, হাওরে যখন পানি আসতো তখন সবাই রাতে শিকার করতে বেরুতো। মাছ শিকারে। কেউ হাওরের পাড়ে পাড়ে ঘুরতো চোঙা বাতি হাতে। ছোট ছোট জিয়ল মাছ ধরতো ওরা। মা নাকি প্রায়ই ছোট মামাকে নিয়ে মাছ ধরতে চলে যেতো। মা এসব গল্প বলে হাসতে হাসতে, আর নানী এই গল্পগুলো বলার সময় ভয় ভয় মুখ করে থাকেন। যেনো সেই সময়েই ফিরে গেছেন তিনি।

বাড়িতে আমরা যখন একসাথে বসি, হয়তো খেলা দেখছি, অথবা নাস্তা করছি, গল্পের মাঝখানে এই গল্প ঢুকে যায়। মা তার কিশোরীবেলার গল্প বলেন, আমরা শুনতে থাকি। বাবাও মুগ্ধ হয়ে সেইসব গল্প শুনে। মা বলতেই থাকে, বলতেই থাকে। সেইসব গল্পের সাথে আমরা নিজেদের গল্প মেলাই।

রুমঝুম মাঝে মাঝে বাবার শৈশবের গল্প শুনতে চায়। বাবা কেমন বিব্রত হয় ওতে। বোকার মতো হাসতে থাকে। হাত দিয়ে মাছি তাড়াবার মতো করে বলে, ধুর আমার ওসব মনে নাই, তোদের মায়ের মতো গল্প বলার ক্ষমতাও আমার নাই। আমি বা মা এসময় কথা বলি না। মা হয়তো অন্য কোন গল্প শুরু করে রুমঝুম এর মনোযোগ ফিরিয়ে নেয়। বাবা বিষণ্ন হয়ে বসে থাকে, নয়তো উঠে যায়।

বাবার শৈশবের কোন গল্প নেই। বাবা অনাথ ছিলো। বাবা এতিমখানায় বড় হয়েছে।