Tuesday, August 18, 2015

বেয়াইপ্রজাতন্ত্র এবং একজন প্রবীর সিকদার

প্রবীর সিকদারকে জেলহাজতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ দশ দিনের রিমান্ড চাইলে সেই আবেদনের শুনানীর তারিখ নির্ধারণ করে তাঁকে জেলে পাঠান আদালত। আজ এই শুনানী হবে।
ইতোমধ্যে অনলাইনচারী সবাই প্রবীর সিকদারকে চিনে ফেলার কথা। ১৬ আগস্ট তাকে আটক করেছে ঢাকার ডিবি পুলিশ। আটক করার কয়েক ঘন্টা পর ফরিদপুরে দায়ের করা হয় মামলা। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আটক হওয়া সাংবাদিক প্রবীর ফেসবুক স্টেটাসের মাধ্যমে মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেনের সম্মানহানি করেছেন! এখানে লক্ষণীয় হলো, আমাদের দেশে যখন মামলা করেও আসামি গ্রেপ্তার করানো যায় না, যখন প্রকাশ্যে ব্লগাররা খুন হবার পরও খুনিদের না ধরে উল্টো ব্লগারদেরই দোষ খোঁজা হয়, ঠিক সেই সময়ে আগেভাগে আসামি আটক করে মামলা দায়ের একটি অভিনব ঘটনা।
প্রবীর সিকদার কে? তিনি একজন সাংবাদিক, এই তার পরিচয়। কিন্তু এসব ছাড়িয়ে গেছে যুদ্ধাপরাধ নিয়ে প্রবীরের আপোসহীন কর্মকাণ্ড। ব্যক্তিজীবনে তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাবাসহ পরিবারের ১৪ জনকে হারিয়েছেন প্রবীর। এমন একজন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ হয়ে কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তাই। টানা সেনাশাসন, জামায়াত-বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সময়ে যে কয়জন হাতেগোনা মানুষ যুদ্ধাপরাধ এবং অপরাধী নিয়ে বড় গলায় কথা বলেছেন, প্রবীর তাদের একজন। ফরিদপুরের মতো ছোট এক শহরে থেকেও তাই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন পুরো দেশে। মুসা বিন শমসের নামের আড়ালে যে এক কুখ্যাত রাজাকার নুলা মুসা লুকিয়ে আছে এই তথ্যটি সবার সামনে নিয়ে এসেছিলেন প্রবীর সিকদার। কিংবা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নামে টিভিতে ধর্মের বুলি আওড়ানো ভণ্ডটা আদতে বাচ্চু রাজাকার ছাড়া আর কেউ নয়, সেই সত্যটাও দেশের মানুষ জেনেছে উনার মাধ্যমে।
নুলা মুসা আর নুলা নাই। সে এখন আন্তর্জাতিক কেউকেটা। দুই টাকার কলম পেষা সাংবাদিককে সে সহ্য করবে কেন? তাই ২০০১ সালেই আক্রান্ত হন প্রবীর। বোমার আঘাতে হারান একটি পা। একটি হাতের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যায়। তখন ক্ষমতায় ছিলো আওয়ামীলীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ সহায়তায় বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে কৃত্রিম পা সংযোজন করেন প্রবীর সিকদার। কিন্তু নিজের শহর ফরিদপুরে আর ফেরা হয়নি। ঢাকাতেই থাকছেন গত ১৫ বছর ধরে। নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সোচ্চার আছেন। প্রতিদিন জ্যামিতিকহারে ক্ষমতাবান হতে থাকা মুসার বিরুদ্ধে, রাজাকারপুত্র এবং বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেনের নানা অপকর্ম নিয়ে খবর প্রকাশ করছিলেন। উল্লেখ্য মোশাররফ হোসেন ফরিদপুর থেকে নির্বাচিত সংসদসদস্য। এই মন্ত্রী ফরিদপুরের কুখ্যাত রাজাকার খোন্দকার নুরুল হোসেনের (নুরু রাজাকার) পুত্র। নিজে রাজাকার না হলেও মন্ত্রী হবার পর থেকেই পিতৃঋণ পরিশোধ করে চলেছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি-জমি দখল থেকে শুরু করে নানা প্রতিষ্ঠানে নিজের রাজাকার বাবার নাম সেঁটে দিচ্ছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এসবের প্রতিবাদ করছিলেন প্রবীর। পাচ্ছিলেন হুমকি। কিন্তু যে মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিবারের ১৪ জনকে হারিয়েছেন, রাজাকারদের মুখোশ খুলে দিতে গিয়ে যে মানুষটা পঙ্গু হয়েছেন, তাকে তো আর হুমকি দিয়ে আটকানো যাবে না। যায়ও নি।

নুরু রাজাকারের নামে ফরিদপুরে রাস্তার নামকরণ হয়েছে
হুমকি পেয়ে প্রবীর সিকদার থানায় গিয়েছেন, অভিযোগ জানাতে গিয়ে ফিরে এসেছেন। পুলিশ সে অভিযোগ নেয়নি। সেই কথা তিনি ফেসবুক স্টেটাসে জানিয়েছিলেন। সেই স্টেটাসে উল্লেখ করেছেন, তার যদি কিছু হয় তাহলে এর জন্য মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, রাজাকার নুলা মুসা ওরফে মুসা বিন শমসের এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক বাচ্চু রাজাকার ওরফে আবুল কালাম আজাদ দায়ি থাকবে।
১৬ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ঢাকায় প্রবীর সিকদারের অফিস থেকে সেই বিষয়ে কথা বলার জন্যই থানায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলো পুলিশ। অন্তত তাই বলেছিলো তারা। পরে আর থানায় যায়নি, গিয়েছে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে। মধ্যরাত পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি।
প্রবীর সিকদারের একটি পা নেই। তিনি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে বা একঠায় বসে থাকতে পারেন না। এই তথ্য জানিয়ে বাবার জন্য একটু ভালো বসার জায়গা চেয়েছিলেন সুপ্রিয় সিকদার। যাতে মাঝে মাঝে তিনি গা এলিয়ে দিতে পারেন। দেয়া হয়নি। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে টানাহ্যাচড়ার মধ্যে থাকা প্রবীরকে মধ্যরাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ফরিদপুরে। সকালে কোর্টে নিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালত যার ফয়সালা করবেন আজ।

কুখ্যাত রাজাকার, দণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীকে ছাতা মাথায় জামাই আদরে নেওয়া হয়, আর শহীদপুত্র, বেয়াই অপমানের মামলায় অভিযুক্ত প্রবীর সিকদারের আহত হাতে থাকে হাতকড়া
বেয়াইপ্রজাতন্ত্রী দেশ
ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশাররফ হোসেন সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম কোনো রাজনৈতিক সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, যিনি দলের কোনো পদে নেই। যার সাথে সারা দেশের আওয়ামীলীগ কর্মীদের যোগাযোগ থাকা তো দূরের কথা, নিজের জেলার আওয়ামীলীগের সাথেই কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ শান্তিকমিটির সদস্য, নুরু রাজাকারের ছেলে খোন্দকার মোশাররফকে ধারণ করার জন্য ফরিদপুর আওয়ামীলীগ রাজি ছিলো না কখনো। কিন্তু দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজের এই তুতো ভাইকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে কঠিন শপথ নিয়েছিলেন। আর সবচে বড় কথা হলো পুরনো সম্পর্ক ছাপিয়ে উঠেছিলো নতুন সম্পর্ক। খোন্দকার সাহেব প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই হন যে! একমাত্র কন্যা সায়মা ওয়াজেদের শশুর হলেন এই মন্ত্রী।
মুসা বিন শমসের। বিতর্কিত এই ব্যবসায়ী এবং রাজাকারও শেখ পরিবারের পরমাত্মীয়। আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী শেখ সেলিমের বেয়াই! শেখ সেলিমের আরেক বেয়াইও বিখ্যাত মানুষ। বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিদ্যুত মন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু।
অবাধ্য প্রবীর সিকদার এই দুই বেয়াই-এর বিরুদ্ধেই একের পর এক নিউজ করে যাচ্ছিলেন। সর্বশেষ ফেইসবুকে স্টেটাস দিয়ে সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ করলেন।
বেয়াই বিষয়ে আরো দু একটা তথ্য দেওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর চাচাত ভাই শেখ হেলাল। তিনি দলীয় এমপিও। সোহেল তাজ এর মন্ত্রীত্ব ছাড়ার পেছনে যাকে দায়ি করা হয়। এই শেখ হেলালের বেয়াই হলেন, পতিত স্বৈরশাসক এরশাদের চোর ক্যাশিয়ার নাজিউর রহমান মঞ্জু। জি, ঠিক ধরেছেন, ব্লগারদেরকে প্রকাশ্যে পেটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন যিনি, যিনি এই সেদিন আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে পেটানো জায়েজ বলে ফতোয়া দিয়েছেন, যিনি বিএনপি-জামায়াত জোটের অন্যতম শরীক বিজেপির চেয়ারম্যান, সেই আন্দালিভ রহমান পার্থ জাতীর পিতার নাতিন জামাই হন! এরকম বেয়াই আরো খুঁজে বের করা যাবে।
উচ্চ ভাসুরের নাম নিতে মানা
আর কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রবীর সিকদারকে আদালতে নেয়া হবে। ফরিদপুরের কোনো আইনজীবী প্রবীরকে আইনি সহায়তা দেবেন না। স্বপন কুমার পাল নামের যে আওয়ামী উকিল মামলা করেছেন, তিনি আবার ফরিদপুর বারের আইনজীবী। নিজেদের উকিলের দায়ের করা মামলায় সেই বারের উকিলরা মামলা লড়েন না! এরপরেও কেউ কেউ প্রবীর সিকদারের পক্ষে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। ক্ষমতাধর মন্ত্রীর চ্যালারা তাতেও বাধা দিয়েছে। আইন ও সালিসকেন্দ্র আইনজীবী পাঠাবে বলেছে। দেখা যাক কী হয়। ভয়ঙ্কর সিকদারকে আদালত কতদিনের জন্য রিমান্ডে পাঠান দেখার বিষয়।
ইদানীং নানা বিষয়ে ফতোয়া দেখা যায়। স্বপ্রণোদিত হয়েও মাঝে মাঝে ফতোয়া আসে। কিন্তু কেনো যেন প্রবীর টাইপ বিষয় তাঁরা দেখেন না। আমরাও ভয়ে কথা বলি না। কখন আবার কোন বিপদে পড়ি। “উচ্চ ভাসুরের নাম” মুখে নিতে তো মানা আছে।
কাক কাকের মাংস খায় না
একবার শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম জরিপ করতে। জামায়াতের আব্দুর রবকে সেখানকার ভিসি করার পাঁয়তারা চলছিলো। এটা নিয়ে প্রশ্ন করছিলাম কয়েকজন মিলে। হঠাৎ সেখানে উদয় হলো ইত্তেফাকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নুরুল আমিন। সে ডেকে নিয়ে আসলো শিবিরের চ্যলা চামুণ্ডা। জোর করে কাজ করা যেত, কিন্তু অফিস সেটা চাইলো না। সিলেটে ইত্তেফাকের নিজস্ব প্রতিবেদক ছিলেন আব্দুল মালিক চৌধুরী। নির্বিরোধী মানুষ। টেক্সটবুক ধরে রিপোর্ট লিখেন। লাশ দেখেন ১০টা, ডিসিকে জিজ্ঞেস করলে জানা যায় ৮টা লাশ। তিনি খবরে ৮টা লিখেই পাঠিয়ে দেন! তো সেই মালিক ভাইকে আমাদের সম্পাদক ফোন করে বল্লেন পুরো ঘটনা। তিনি আবার একটু গুন্ডা প্রকৃতির সম্পাদক, বল্লেন নুরুল আমিনকে শহরে দেখলেই পেটাবেন! মালিক ভাই হায় হায় করে উঠলেন, না না, এটা করতে হয় না। কাক কখনো কাকের মাংস খায় না...!
হ্যা, কাক কখনো কাকের মাংস খায়না। মিথ্যাচারের বরপুত্র মাহমুদুর রহমানকে আটক করার পর সেই সত্যতা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সব বড় বড় সাংবাদিক এর প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছে। এখনও দেয়। কিন্তু প্রবীর সিকদারের বিষয়ে অল কোয়ায়েট অন দ্যা সাম্বাদিক ফ্রন্ট! সম্ভবত প্রবীর সিকদার ভালো কাক হয়ে উঠতে পারেন নি।
এবং ৫৭

৫৭ ধারা
 নিয়ে আলোচনা চলছে ২০১৩ থেকে। নতুন করে যুক্ত হতে চলেছে “সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০১৫”। ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি করছেন মুক্ত মত প্রকাশের পক্ষের মানুষেরা। বাংলাদেশে আরেকটি ধারা কিন্তু আছে। সেটা হলো ৫৪ ধারা। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই ধারাটি কার্যকর। রাষ্ট্রযন্ত্র ইচ্ছামতো এই ধারার ব্যবহার করেছে। সেখানে ৫৭ কিংবা সাইবার নিরাপত্তা আইন নতুন পালক হিসাবেই যুক্ত হয়েছে। আর কিছু নয়। তো এই আইন বাতিল করলে আসলে কোনো লাভ নাই। রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিকই আপনাকে আটক করতে পারবে, লটকে দিতে পারবে যদি চায়। শাসকের মাথার ভেতর থেকে ৫৪, ৫৭ নামের ধারাগুলো যতদিন বিলুপ্ত না হবে, যতদিন বেয়াইপ্রজাতন্ত্রী থেকে প্রকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ গড়ে না উঠবে ততদিন “আকাশের যত তারা পুলিশের তত ধারা” মেনে নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।
প্রথম ছবিটি সাংবাদিক উজ্জ্বল দাশ এবং দ্বিতীয়টি ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের ফেসবুক পোস্ট থেকে।