Wednesday, July 8, 2015

নামাবলী

১৯৯১ সালে ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে বীর পূজারী মুসলিমদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষে পরিণত হন সাদ্দাম হোসেন! আরবের শাসকরা যতই সাদ্দামের বিরুদ্ধে থাকুক না কেনো, কিংবা আমাদের মতো দূরবর্তী দেশগুলোর শাসকরাও যুদ্ধে কুয়েতের পক্ষে অংশ নিক, সাধারণ মুসলমানদের মাঝে এই লোকটা ছিলো অসম্ভব প্রিয়। তখনকার বাংলাদেশে অনেক নবজাতকের নাম রাখা হয়েছে সাদ্দাম। আমার পরিচিত একজন শিক্ষিকা তার ছেলের নাম রাখেন সাদ্দাম!
ধর্মকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া উপমহাদেশীয় মুসলমানরা ভেবেছিলেন মুসলমানদের কথিত হারানো গৌরব আবার বুঝি ফিরে আসবে সাদ্দামের হাত ধরে! সম্ভবত আরবেও এরকম একটি ধারণা ছিলো। তারা আমাদের মতো হয়তো মুসলমান কেন্দ্রিক চিন্তা করতো না। সাদ্দামের মাধ্যমে আরব পূণর্জাগরণের একটা প্রচ্ছন্ন স্বপ্ন ছিলো আম আরবীয়দের। আমাদের মসজিদে তবলিগ করতে আসা কোন এক আরবদেশীয় তরুণ ভাঙা ভাঙা বাংলাতে সেই স্বপ্নের কথা আমাদের বলেছিলেন। যতটা মনে করতে পারি, তিনি একটিবারের জন্যও মুসলমানদের কথা বলেননি। বার বার বলছিলেন আরবের কথা। বাংলাদেশেই ডাক্তারি পড়তে থাকা সেই আরব বাগদাদের প্রাচীন সভ্যতার কথা বলেছিলেন, বাদশাহ হারুনুর রশিদের গল্পের ছলে যার অনেকটাই আমরা জানতাম। যতটা জানতে পেরেছি, সাদ্দাম শব্দটার অর্থ হলো যে বেশি বেশি আঘাত করে! অবশ্য এটা কিছুই না, আমরা হিটলার, ভুট্টো এসব নাম রাখতেও বেশ আগ্রহী!
ধুরন্ধর সাদ্দাম দেশের বাইরে যেতেন খুব কম। সেসময় সেটা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। তার হয়ে জাতিসংঘে গরম গরম বক্তব্য দিয়ে তখন সামনে চলে এলেন তারিক আজিজ। তখনকার ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যুদ্ধ নয় শান্তি চাই টাইপ বাণী আওড়ে যেসব ধর্মপ্রাণ সাদ্দাম বিষয়ে মিউ মিউ করতেন, ভাব নিতেন তারা এরকম যুদ্ধবাজকে পছন্দ করেন না, তারা নৃশংস সাদ্দামকে পাশে ঠেলে দিয়ে তারিক আজিজকে নিয়ে মেতে উঠলেন। দিনে দিনে মুসলিম সমাজে তারিক আজিজ সুশীল ভাবমূর্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেন।
তারিক আজিজকে প্রিয় তালিকাতে স্থান দেয়াদের মন ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিলো কিছুদিন পরেই। যখন আবিষ্কৃত হলো, এতো চমৎকার একটি নাম, গৌরবময় স্পেন বিজয়ের মহান সেনাপতির নামে যার নাম, সেই তারিক আজিজ আসলে মুসলিম নয়! তিনি খ্রিষ্টান। খ্রিষ্টান হবার আগে তিনি একজন গর্বিত আরব, তাই তার নামটাও আরবিতেই হয়েছে।
প্রথম ইরাক যুদ্ধ যখন শেষ হলো। স্বাধীন কুয়েতে গেলেন তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াকার বুশ। কুয়েতের শেখ সাবা আরবিয় কায়দায় বুশের গালে চুম্মা দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বুশকে দেয়া হলো ব্যাপক সম্মান। কুয়েতের নাগরিকত্ব দেওয়া হলো। বুশকে এজন্য একটি আরবিয় নামও দেওয়া হলো, আব্দুল্লাহ।
কুরাইশরা যখন ক্বাবা’র সংস্কার করেন, তাদের কাছে পুরো ঘর নির্মাণের মতো টাকা ছিলো না। ক্বাবার মূল সীমানা চিহ্নিত করে অপেক্ষাকৃত ছোট মাপের ঘর তৈরি হয়। বাড়তি যে অংশটা রয়ে গেলো, সেটুকুকে হাতিম বলা হয়। মুসলমানদের কাছে খুবই সম্মানিত এই অংশ। মূল ক্বাবায় রাজা-বাদশাহ ছাড়াতো কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। সাধারণ মানুষ এই হাতিমে নামাজ আদায় করেন। হাতিম মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি প্রচলিত নাম। আমাদের সিলেটে একজন আওলিয়া ছিলেন, হাতিম আলী। বিশাল মাজার আছে এখনও। উনার নামে স্কুল আছে, একটা পাড়ার নাম হাতিমবাগ। দাতা হাতিম তায়িতো প্রবল জনপ্রিয় এক চরিত্র। আরবের এই দানশীল ব্যক্তিকে সম্মান করা হয়। তায়ি গোত্রের নেতা এই মানুষটি কবিও ছিলেন। আরব্য রজনীর গল্পেও আছে হাতিমের কথা। ইনি খ্রিষ্টান ছিলেন।
মহা নবীর বড় দুঃখগুলোর একটি ছিলো প্রিয় চাচা আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণ না করা। তিনি পৌত্তলিক হিসাবেই মৃত্যুবরণ করেন। আমার দুঃসম্পর্কের এক বন্ধুর নাম ছিলো তালেব। ক্লাস নাইনে রেজিস্ট্রেশনের সময় সেই নামকে তালিব বানিয়ে দিলেন ধর্মশিক্ষা স্যার। বললেন, নবীর চাচার নাম, অশুদ্ধ করে কেনো লিখো? আমরা এরপরেও ওকে তালেব বলেই ডাকতাম।
সিলেটে পীর আওলিয়াদের ছড়াছড়ি। এক শাহজালালের সাথেই এসেছেন ৩৬০ জন। বেশিরভাগেরই আরবি নাম। কিন্তু কাজল শাহ, সুন্দর শাহ কিংবা শাহ পরাণের নাম নিয়ে খটকা লাগে। ইয়েমেনে এই নাম কেমন করে গেলো? বিশেষ করে কাজল নামের খাঁটি ‘মালাউনি’ নাম! সুন্দর, পরাণ এসবও-তো বাংলা নাম, যেটাকে হিন্দুয়ানী বলতেই লোকজনে পছন্দ করে। আরবি ভাষা-সাহিত্য নিয়ে পড়ালেখা করা একজন শাহ পরাণের নামের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এটা নাকি পরাণ নয়। উনার নাম ছিলো ফারহান বা ফরহান। সিলেটী বাংলার প্রভাবে ফরহান একসময় ফরাণ এবং পরে পরাণ হয়ে যায়। (এটা হওয়া সম্ভব। শাহ পরাণ সিলেটের যে দিকটায় আছেন, মানে শহর সিলেটের পূর্বদিক। এই দিকের মানুষ নাম বিতলানোতে উস্তাদ। আমার জন্ম এর পাশাপাশি এক এলাকায়, সেই গ্রামে সিরাজ নামের এক লোককে সিরাই বলা হতো। একজনের নাম রুবেল, রু উচ্চারণের পর হালকা একটু থেমে বাকিটা বলার যে স্টাইল... আর কোথাও সেটা শুনিনি।) প্রথমে ভাষাতাত্বিক উত্তর ভেবেছিলাম। উনি বললেন তার বলাটাই সত্যি। যেহেতু ইনি শাহজালালের ভাগ্নে ছিলেন, তাই উনার নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। যেমন নাসিরুদ্দিনের পরিচয় পুরোটাই পাওয়া যায়। বাকি অনেকেরই সেভাবে পাওয়া যায় না। তাই কাজল বা সুন্দর শাহর আসল নামগুলো আর জানা হয় না। অবশ্য এমনও হতে পারে, এরা আদতে ভারতীয়। সিলেটে আসার পথে কোন একসময় শাহজালালের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। আরবের শাহজালাল তাদের নাম বদলানোর প্রয়োজন মনে করেননি। যেমন করে মহানবীও এসব নিয়ে মাথা ঘামাননি। তাই মক্কা বিজয়ের পরে কুখ্যাত আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহন করলেও তার নাম বদলানো হয়নি। নামটাও খারাপ কিছু না। আমাদের কলেজে শিবিরের এক নেতার নাম ছিলো সুফিয়ান। ইসলামের সৈনিক নিশ্চয় খারাপ নাম হলে সেটা বদলে ফেলতো। আমার আপন মামার নাম একেবারে খাপে খাপে আবু সুফিয়ান। উনারে মাঝে মাঝে সুফিয়ানের বাপ বলি আমরা। তিনি হাসেন। অবশ্য আমার সব মামা কারো না কারো বাপ হন। সবার নামের আগে একটা করে আবু লাগানো!
আবু’র কথা আসাতে মনে পড়লো ইবনের কথা। ইবনে মিজান নামের একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন। তখন রেডিওতে নাজমুল হোসেইন আর গাজী মাজহারুল আনোয়ার সিনেমার বিজ্ঞাপন করতেন। তারা গমগমে গলায় বলতে ইবনে মিজানের সম্পূর্ণ রঙ্গিন সিনেমা... সেটা ইকো করতো। ধুন্ধুমার অবস্থা। আমাদের ক্লাসের মিজান সেসব শুনে তার নামের আগে একটা ইবনে লাগিয়ে নিলো! হাফিজুর স্যার ওরে জিজ্ঞেস করলেন, ওই, তোর বাফর নাম কিতা? সে বলল আব্দুল কুদ্দুস। স্যার সবার খাতা দেখা শেষ করে ওর খাতাটা তুলে নিয়ে বললেন, তোরে যদি আল্লায় ছেলের বাপ বানায়, তাইলে সেই ছেলের নাম হবে ইবনে মিজান, মানে মিজানের পুত্র। কিন্তু তুই হবি ইবনে কুদ্দুস... স্যার এরপরে আর কি বলছেন মনে নাই, আমরা ব্যাপক বিক্রমে মিজানরে এরপর থেকে চান্স পেলেই ইবনে কুদ্দুস ডাকতাম।
ইবনে শব্দটার মাঝে মুসলমান গন্ধ নিয়া পুলকিত হবার কিছু নাই। এটা আরবিয় রীতি। তারা অমুকের পুলা তমুক বলে পরিচিত হতে এবং দিতে পছন্দ করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ উহুদের যুদ্ধে কুরাইশদের হয়ে মুসলমানদের কি মাইরটাইনা দিলেন। পরে মুসলমান হয়ে সেই খালিদ বিন ওয়ালিদই রয়ে গেলেন তিনি। নাজরানের খ্রিস্টানদের সাথে মহানবী যে চুক্তি করেছিলেন তাতে উনার নাম লেখা ছিলো মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব আর বিপক্ষের নাম ছিলো সাইদ ইবনে হারিত ইবনে ক্বাব। আরবদেশে গিয়ে উমর কিংবা ওসমান বললে কেউ চিনবে না। উমর বিন খাত্তাব আর ওসমান বিন আফ্ফান বলতে হবে। আলীর নামের সাথে উনার পৌত্তলিক পিতা আবু তালিবের নাম জুড়ে দেয়া থাকে সবসময়।
আমার নিজের একটা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি টাইপ নাম ছিলো। বৃত্ত ভরাটের ঝামেলা আর পরে লেখক জশোন্মুখতায় সেসব কালের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছে। আম্মার এক চাচাতো ভাইয়ের নামও লেখক হবার ফেরে পড়ে হারিয়ে যায়। তিনি পরে সাংবাদিক হন। প্রেসক্লাবের আড্ডায় উনারে তার হারানো নাম বলতে বললাম, অনেক কসরত করেও সেটা মনে করতে না পেরে বললেন, দুঃখজনক!
পাশের বাড়ির ‌‌‍'নাজমার'মা' চাচীরে আমাদের ছেলেরা 'নাজমার'মা' দাদী ডাকে। আম্মা ডাকেন 'নাজমার'মা'... উনার নামটা জানা হলো না কোনদিন!