Thursday, December 17, 2009

কয়েক টুকরো দিন যাপন আর একটা আলোচনা

ছোট শহরে থাকলে অনেক কিছুতেই সরাসরি অংশ গ্রহনের সুযোগ মিলে বা অনেক কিছুতেই জড়িয়ে পড়তে হয়। বুঝতে শেখার পর থেকে শহীদ মিনারে যাই। একটু বড়ো হয়ে রাতের প্রথম প্রহরে যেতে শুরু করেছি। তারপর কোন ফাঁকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সহায়তাকারী হয়ে গেলাম। হিসাব করলে দেখি সেও ১২ বছরের অধিক। গ্রুপের কাজ থাকে। সেসব নিয়ে বিস্তর দৌঁড়ঝাপ দিতে হয়। তাই কয়েকদিন ধরে সেভাবে নেটেই বসা হয় না। রাতে কিছু সময়ের জন্যে বসে শুধু চোখ বুলিয়ে যাওয়া।

অনেক বিষয় আসে, সেসব নিয়ে পড়তে বা বলতে চাই, কিন্তু সময়ের কারণে তা কুলায় না। গত চার/ পাঁচদিনে সচলে এমন কয়েকটি বিষয় এসেছে, তা নিয়ে কথা বলার ছিলো। কিন্তু বলতে পারিনি।
ষষ্ঠ পাণ্ডব লিখেছেন, ব্লগে বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা বা কারো কারো মতে লাফালাফি করা বিষয়ে। ব্লগ জীবনের শুরু থেকে এ বিষয়ে নসিহত পেয়ে আসছি। বন্ধুদেরকে, কমরেডদেরকে পেতে দেখেছি, আরো দেখবো, আরো উপদেশ পাবো সেটাই বলে রাখি। আমি মনে করি কান বন্ধ রেখে, নিজের কাজ করে যেতে হবে। মানে ব্লগে লাফাতে হবে। চিকা মারতে হবে, সময়মতো গদাম লাথিও মারতে হবে। শিকার করতে হবে। এবার আবার স্টিকার করবো আমরা। এ বিষয়ে কারো কোন উপদেশ (কেন এতো টাকা খরচ, কি হবে এসব করে... টাইপ) থাকলে দিতে পারেন। চোখ টিপি

স্টিকারের কথা যখন উঠলই তখন ফাঁকে এ নিয়ে কয়েকটা টুকরা ঘটনা বলি। আমার লেখার সাথে যারা টুকটাক পরিচিত তারাতো জানেনই আমি এক কথার ভেতরে আরেক কথা ঢুকিয়ে ফেলি। এটা তেমনই।
সচলদের করা স্টিকার নিয়ে এক বছরে নানান কাহিনী হয়েছে। গতমাসে সুন্দরবন থেকে ঢাকায় ফিরে বাস থেকে নেমেছি শ্যামলীতে। সেখানে বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখি তার দরজায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই দাবী নিয়ে করা কালো হলুদ স্টিকারটা সাটানো। কি আরাম লেগেছে চিন্তা করেন। সুজনদার ডিজাইন করা স্টিকারটা ছাপানোর পরেই প্রেস থেকে প্রায় হাজার খানেক স্টিকার নিয়ে যায় আমার এক ছোট ভাই। জুয়েল ওর নাম। খুবি বিরক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু গত সাত আট মাসে আমার সেই বিরক্তিভাব কেটে গেছে। শহরে এই ক'মাসে যতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হয়েছে সেখানেই গিয়েছে জুয়েল এবং অতি অবশ্যই স্টিকার বিলি করেছে। আজকে শহীদ মিনারের সামনে বিদ্যুতের খুটিতেও দেখি কয়েকটা সেটে রাখা। সম্ভবত জুয়েলেরই কাজ এটা। সেখানে লম্বা কালো হলুদ স্টিকারও দেখলাম দুইটা! কেমনে আসলো এক বছর পরে! গতরাতে শহীদ মিনারে যখন গেলাম, সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আফজাল ভাইর কাধে ঝুলানো ব্যাগে দেখি আনিস ভাই এর করা যুদ্ধ পাপীর শাস্তি চাই স্টিকার লাগানো। আমাকে দেখেই ব্যাগ দেখিয়ে বলেন, তোমার স্টিকার লাগানো আছে। তারপর ব্যাগ থেকে কয়েকটা স্টিকার বের করে কয়েকজনকে দিয়ে বল্লেন, শেষ। আরো দিও। বল্লাম, আবার ছাপা হোক পাবেন।

০২.
গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারের মতো ভিড় দেখিনি। শহীদ মিনারে মধ্যরাতে মানুষের ঢল নেমেছিলো। দিনে দিনে নাট্যকর্মীর সংখ্যা কমছে। তাই ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। শান্ত রাতের কথা বলতে গিয়ে জুতা নিয়ে বলেছে। মারামারির কথা সে বলেনি। বেশ ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। আর এবার সম্ভবত নিয়ন্ত্রনটা আগের মতো রাখা যায়নি। ধাক্কাধাক্কির কারণে বেদী থেকে কর্মীদেরকে দু'বার তুলে আনতে হয়েছে। সবচে বেশি সমস্যা করেছেন সংবাদ কর্মীরা। ফটুরে সাংবাদিকরা কাজের কোন শৃংখলাই মেনে চলে না এখন। এরা ভেজাল পাকায় বেশি। কালও পাকিয়েছে।

০৩
বিজয় দিবসের সকালটা এখন একটু দেরিতেই শুরু হয়। আগে মাঝরাতে ঘরে এসেও ভোরে আবার বেরিয়ে যেতাম। এখন বেরুতে বেরুতে দশ এগারোটা বেজে যায়। বাবাই মহা উৎসাহে আমাদের সাথে চললো। পতাকা আঁকা টি-শার্ট কিনে দেয়া হলো তাকে। হাতে পতাকাও তুলে দিতে হলো। খুব খুশি। মায়ের সাথে ঢ্যাং ঢ্যাং করে চলে গেলো ইউনিভার্সিটিতে। আমি একটু ঘুরলাম শহরে। তারপর গিয়ে জিন্দাবাজারে এক দোকানে বসে বসে আড্ডা পিটালাম গ্রুপের তিন বড় ভাইয়ের সাথে। কথা বলছি আমরা, এমন সময় সেখানে হাজির হলেন বাবাইর স্কুলের প্রিন্সিপাল। জামাত-শিবির বিজয় দিবসের মিছিল করেছে। সেটা নিয়ে তিনি উত্তেজিত। কি বলবো ঠিক ভেবে পেলাম না। মফস্বলের বোকা মানুষের মাঝে অধিকতর বোকা হন স্কুলের মাস্টাররা। আর সেই মাস্টার যদি মুক্তিযোদ্ধা হন, তাহলে তার মতো বোকা আর কে হতে পারে? ভদ্রলোক গলার রগ ফুলিয়ে সব দায় নিজেদের কাঁধে টেনে নিলেন। তাকে কি সব বলেছিলাম সে সময়। এখন সেসব মনে পড়ছে না, বা করতে চাইছি না।

বিকালে রিহার্সাল ছিলো। তাই বাবাইকে তার নানার বাসায় নিয়ে গেলাম। সকাল থেকেই খেয়াল করছিলাম, অনেক রঙিন হয়ে উঠেছে দিনটি। সম্ভবত আগে এমন ছিলো না। তুলিকে বল্লাম, সেও স্বীকার করলো কথাটা। নিজেদের মাঝে কথা বলে বের করলাম, দশ-বারো বছর বয়েসে আমরা যখন রাস্তায় নামতে শুরু করেছি তখনও বিজয়ের সাথে দগদগে হয়ে থাকতো স্বজন হারানোর ব্যাথা। উনচল্লিশ বছর পরে সেই বেদনাবোধ সম্ভবত আর নাই। আমার পরিবারে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এমন দিনগুলোতে তাদেরকে প্রায়ই হারিয়ে যাওয়া সহযোদ্ধা বা শহীদ স্বজনের কথা মনে করতে দেখেছি। এখন আর সেটা হয় না। দিনে দিনে বেদনাটুকু ঝরে পড়েছে, আনন্দটাই স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। আমরা বিজয় দিবসকে একটা পার্বন বা উৎসবেই পরিণত করছি। এই দিনের জন্যে নতুন কাপড় কেনা হচ্ছে। আমাদের প্রদর্শক পত্রিকা এমনকি খাবারেরও ডেকোরেশন করে পতাকার ডিজাইনে।

শহীদ মিনারের পাশে আগে অস্থায়ী মঞ্চ বানিয়ে অনুষ্ঠান করা হতো। এখন সেখানে স্থায়ী মঞ্চ করা হয়েছে। সন্ধ্যায় সেই মঞ্চে যাবার জন্যে ভীড় ঠেলতে ঠেলতে মনে হলো বড়ো বেশি অপরিসর হয়ে গেছে আমাদের শহীদ মিনার চত্বর। আরেকটু বড়ো যায়গা নিয়ে, আরো খোলামেলা শহীদ মিনার আমরা পেতে পারতাম। কিন্তু হবে না। এ শহরে প্রান্তিকের চত্বরে দেয়াল তুলে টুকরা টুকরা করে দেয়া হয়। এ শহরে শিরিষ বৃক্ষ কেটে বিশাল মসজিদের একশ হাত দুরে সুরম্য মসজিদ নির্মিত হয়। এ শহরে শুধু শহীদ মিনারের জন্যে কোন উদার প্রান্তর মেলে না... এই গল্প কি শুধুই এই শহরের? নাকি পুরোটা দেশেরই গল্প এটা?

০৪
অনুষ্ঠান শেষ করে ভিড় ঠেলে রাস্তায় উঠে এলে বাবাই বায়না ধরে রেষ্টুরেন্টে খাবে। এটা নতুন শিখেছে। বাইরে আসলেই রেষ্টুরেন্টে যাবার বায়না ধরে। খাবারের জন্যে গিয়ে দেখি রেষ্টুরেন্টময় ছড়িয়ে আছে থোকা থোকা উৎসব! পরিচিত অনেককেই পাওয়া যায় সেখানে। বাবাইকে নিয়ে বসেছি রেষ্টুরেন্টের ভেতরে। হঠাৎ রেষ্টুরেন্ট এর উঠোন থেকে উঠে এলেন আমার এক মামা। বল্লেন, একটু বাইরে আসো। গেলাম। বল্লেন, মাইকের আওয়াজ শুনছো? শহীদ মিনার থেকে ভেসে আসছে বিজয়ের অনুষ্ঠানের শব্দ। হ্যা বলতেই বল্লেন, এইমাত্র জাতীয় সংগীত গাওয়া হলো। এখানকার সবাই সেটা শুনেছে, কেউ দাঁড়ায়নি, সম্মান দেখায়নি। এটা কি ঠিক? কোন উত্তর দিতে পারলাম না। তিনি বল্লেন, সম্ভবত এটা ঠিক না। অনেকে বুঝবেই না দুর থেকে ভেসে আসা সুরে শ্রদ্ধা জানাতে হবে কী না। মাইক বন্ধ করে জাতীয় সংগীত গাওয়া উচিত মনে হয় । একবার বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বল্লেন তিনি... এরপর থেকেই সেটা ভাবছি। আপনারা কি ভাবছেন বিষয়টা নিয়ে? একটু বলুন দেখি

Monday, November 30, 2009

কয়েকছত্র প্রান্তিকপত্র

প্রান্তিক নিয়ে এতো লেখা হয়! ঘুরে ফিরে এই জায়গাটার কথা আসে। আসে স্বপনের চায়ের দোকানের কথা। সুনামগঞ্জের উদার হাওর আমার জীবনে যেমন জড়িয়ে আছে জননীর ওমের মতো, প্রান্তিকও বুঝি তেমনটাই!

বালক বয়েসে মেলায় যেতাম। কৈশোরে গেলাম নাটকের ঘরে। স্কুলঘরের মতো টিনের চালের ঘরটা কোন ফাঁকে এমন মায়ায় জড়ালো? কোন ফাঁকে মিশে গেলো এমন জীবনের গল্পে?

সেভাবে আমার সাথে প্রান্তিকের সম্পর্ক হওয়ার কথা ছিলো না। নিতান্তই এক কর্মী হিসাবে আমি সেখানে ছিলাম। কোনো গরম গরম ভাবনা ছিলো না মাথায়। দেশ সমাজ পাল্টে দেয়ার ধারণা নিয়ে সেখানে যাইনি। মঞ্চে উঠে কাঁপিয়ে দেবো, ফাটিয়ে দেবো তেমনটাও মাথায় ছিলো না। সম্ভবত জেনেটিক কারণে গিয়েছিলাম সেখানে! (এই জিন জিনিসটা কি???) বাপ এইসব করতেন বলে শুনেছি। ভাই আমার ঠিক আগে আগে সেখানে গিয়েছে।

এই জিন ভূত ছাড়া আর কি ছিলো তবে? সম্ভবত আড্ডা। সম্ভবত মানুষের টান।

প্রান্তিকের ভাঙা টিনের চালের নিচে এ নাটক করছে, তো ও করছে আবৃত্তি, আরেকজন হয়তো গান তুলছে গলায়... কী সরগরম সেখানে। তুমি যাও, মিশে যাও। মিশে যাও আনন্দ নগরে।

রাস্তার একদিকে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল, আরেকদিকে প্রান্তিক। প্রথম-প্রথম হোস্টেলের সামনের দোকান থেকে চা আনতে হতো। নাট্যকর্মী হওয়ার কঠিনতম পরীক্ষা শুরু হতো এই চা এনে। ফ্লাস্ক হাতে নিতে নিতে অনেকদিন শুনতে হয়েছে, যাও, এখনতো ফ্লাস্ক পাচ্ছো, আমরা কেটলি দিয়ে রিকাবীবাজার থেকে চা আনতাম! তবে সেই পরীক্ষা বেশিদিন দিতে হয়নি। স্বপন একটা চা এর দোকান খুলে বসলো বারান্দায়। প্রান্তিক তার পূর্ণতা পেলো বুঝি এই চায়ের দোকানের মাঝ দিয়ে।

নাটকের ঘরে কী হত? কথাকলি শুধু নাটক করতো না। কবিতা, গান সবকিছুই ছিলো সেখানে পাঠ্য। আমি নিতান্তই বেসুরা মানুষ। বাপ কি সাধে অসুর বলে ডাকে? আমি বসে বসে সেইসব জিনিসপাতি দেখি। গানের দলে লোকজনের পেছনে বা কবিতার কোরাসে মাঝে মাঝে শেষ মানুষটা হয়ে বসে থাকি। এ এমনি এক বসে থাকা যে, না বসলেও কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না কারো। এই করে করে আধা যুগ পার করেছি হে...

আমি এ ঘরে যাই, ও ঘরে যাই। প্রান্তিকের উঠানে পাঠক ফোরাম পরে বন্ধুসভার আড্ডা হয়। সেখানে গিয়ে বসি। কেউ চা খেলে, পাশে বসে থাকলে এক কাপ জুটে যায়। এই করে করে বেশ ছিলাম।

প্রান্তিকে যাওয়ার আরেকটা কারণ হলো, পাকে চক্রে যে কয়টা বন্ধু জোগাড় হয়েছিলো (এইটাও একটা আজব ঘটনা, অন্তত আম্মার কাছে, আমার বন্ধু হতে পারে এটা তিনি এখনও সেভাবে বিশ্বাস করেন না) সবকটাই এখানে আসতো। এক ঢিলে আসলে অনেক পাখিই মারা হতো সেখানে। নাটক হলো, কবিতা হলো, আড্ডা হলো, বন্ধু হলো, গুল্লি হলো, মাল হলো, কুলখানি হলো... কতো কতো হলোরে!

প্রান্তিকে আমরা কেউ সাইকেল চালিয়ে যেতাম, কেউবা মোটর সাইকেল করে। কেউ যেতো রিক্সা চড়ে আর কেউ কেউ পায়ে চড়ে। রাতে বাড়ি ফিরতে গেলে এ তাকে ও একে দিয়ে আসতো বাড়িতে। পরিচিতরা কোন কারণে আমাদের দরকার পড়লে সোজা প্রান্তিকে চলে আসতেন। এমনকি একবার আমার মা, অসুস্থ মামাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার আগে সোজা চলে এসেছিলেন প্রান্তিকে। কথাকলির রুমে একটা ইম্প্রোভাইজেশনের কাজ চলছিলো। সেখানে কোরাস থেকে প্রশ্ন আসছে কেমন আছেন... কেমন আছেন... বাইরে থেকে উত্তর আসলে, তোমরা কেমন আছো জানি না, তোমাদের মা ভালো নাই!!! মামাকে ডাক্তার দেখানো থেকে হাসপাতাল সবকিছুই করা হলো, করে দিলো কথাকলি'র মানুষজন। আমাদের জননীরা এমনি নিশ্চিত থাকতেন প্রান্তিক নিয়ে, এমনি নির্ভরতা ছিলো কথাকলি নিয়ে। (এখনও আছে)। আবারো বলি বেশ ছিলাম আমরা।

গত মাসে একজন রক্ত দরকার বলে ফোন করলো। টুকুদাকে ফোন দিলাম আমি। মিনিট পনেরোতে ব্যবস্থা হয়ে গেলো। রক্তের এই ব্যাংকটা প্রান্তিক থেকেই গড়ে উঠেছে। বিষয়টা এমন পর্যায়ে ছিলো যে, অনেকেই জেনে গিয়েছিলো সেটা। রক্তের দরকার হলে সন্ধানীর কাছে না গিয়ে প্রান্তিকে হাজির হতো!

এইভাবে টুকরো টাকরা গল্প বলতে থাকলে বিশাল একটা কিছু দাঁড়িয়ে যাবে। সেটা করে লাভ কি? নাই, কোনো লাভ নাই। তাই একদিন হুট করে প্রান্তিক ভেঙে পড়ে, না ভেঙে পড়ে না, তারে চুরমার করে দেয়া হয়। ইঁট-কাঠের নির্মাণটা টুকরো টুকরো হয় আর সাথে আমাদের হৃদয়।

এই একটা ঘটনা সিলেটের সাংস্কৃতিক আন্দোলনরে কতটা নিয়ন্ত্রণ করেছে আর কতোটা পিছিয়ে দিয়েছে তার হিসাব দেয়ার ক্ষমতা আমার নাই। আমি শুধু আমারটাই জানি। আমি জানি এরপর থেকে রোজ বিকালে বসার একটা জায়গার জন্যে আমরা হন্যে হয়ে ঘুরেছি। নাটকের রিহার্সালের জন্যে একটা ছোট্ট খুপড়ি খুঁজতে খুঁজতে সিনিয়াররা ক্লান্ত হয়ে গেছেন। আমরা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়েছি, বিচ্ছিন্ন হয়েছি, একজন আরেকজনের কাছে শুধুই পরিচিত একজন হয়েছি...

আবার যখন ২০০৮ এ কথাকলি হাঁটি হাঁটি পা পা করে পুনর্যাত্রা করলো, তার আগে আমাদের অনেক কিছু বদলে গেছে। আমাদের কেউ এখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড়কর্তা, কেউ বড় ব্যাংকার, শেয়ারের বাজারে কারো কারো দেদার ইনকাম, শহরের কেউকেটা ঠিকাদার সেও আমাদেরই ঘরের মানুষ। বিকাল চারটায় রিহার্সাল, তাই সবকিছু ফেলে রেখে, সে হোক চাকরি, দোকানদারী বা প্রেমিকার সাথে ডেটিং... সব ফেলে রেখে আসতে হতো। চারটার পরে ২/১ মিনিট দেরি হলেও রুমে ঢোকা যেতো না। কোনদিন ঢুকে পড়লেও চোরের মতো বসে থাকতে হতো। সেইসব দিন আর নাই। এখন রিহার্সালের সময় দিতে হলে আগে কথা বলে নিতে হয়। আমাদের কেউ যাই সাতটায়, কেউ যায় সাড়ে সাতে আর কেউবা আটটায়। তাও সেটা যে নিশ্চিতই হবে তাও নয়। পাঁচ মিনিট আগে কিংবা একেবারে না জানিয়েও এখন আমরা অনুপস্থিত থাকতে পারি! ডিরেক্টর বসে থাকেন, আমরা আসি না! জীবন আমাদের এমনই ভাড়ুয়া বানিয়েছে অথবা নাটক আমাদের আর সেভাবে বুঝি টানে না!

পায়লট এর আসল নাম কি? না কেউ বলতে পারবে না। প্রান্তিকের কোন মানুষই সেটা জানে বলে মনে হয় না। যে কথাকলির মেম্বার সে, তারাই জানে না! হ্যা পায়লটের নাম আমরা কেউ জানি না, তাকে সবাই পায়লট ডাকে। স্টেডিয়াম মর্কেটের একটা ফ্রিজের দোকানের ঠেলা চালাতো সে। বয়েসী মানুষ। মাঝে মাঝে তাকে দিয়ে সেট বা এটা সেটা টানানো হতো। এখনও আমার চোখে ভাসে, পায়লটকে টানা হ্যাচড়া করছে শিপন, অডিটোরিয়াম নিয়ে যাবার জন্যে। আগের রাতে নাটক হয়েছে। সেট পড়ে আছে, সেগুলো প্রান্তিকে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু পায়লট যাবে না। নাটকের মাল টেনে পয়সা বেশি পাওয়া যাবে না। রিতিমতো চিল্লা ফাল্লা করছে সে। স্টেডিয়ামের দিকে পেতে রাখা স্বপনের বেঞ্চে বসে বসে আমরা মজা দেখছি। ফোড়ন কাটছি, জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে শিপন আর পায়লট আরো চেতছে। সম্ভবত ঠেলা ড্রাইভার হিসাবে তাকে পাইলট বলে ডাকা হতো ঢং করে, পরে সেটা পায়লট হয়ে যায়। এই কাজটা প্রান্তিকেরই করা অসংখ্য পুঙগাম্যানশনের একটা। তো সেই পায়লট কোন ফাঁকে ফ্রিজের দোকান ছেড়ে কথাকলির রুমে ঢুকে গেলো সেটা আমি অন্তত খেয়াল করিনি। আমাদের বাড়িতে কিভাবে সে ঢুকেছে তাও খেয়াল করিনি কেউ। শহর থেকে ৮ কিলোর বেশি দুরের গ্রামে থাকা আমার বাড়ি অব্দি সে এসে পড়ে। আব্বা, আম্মা সবার সাথে তার প্রবল খাতির। নাটক করতে লন্ডন যাওয়ার মতো অসম্ভব স্বপ্নের কথাও সে আব্বার সাথে গল্প করে!

প্রান্তিক ভেঙ্গে গেলে, তারও পরে স্বপন শহর সিলেট থেকে গ্রামে চলে গেলে কিংবা মরে গেলেও সেভাবে আমরা চায়ের অভাব অনুভব করি না। কারণ পায়লট আমাদের সাথেই থাকে। এখন যারা নাটক করতে আসে তাদেরকে ঘর ঝাড় দেয়ার কথা বা চা আনতে বলার মতো অবস্থা আর নাই। তাছাড়া আমাদের স্থায়ী কোন বসারই যায়গা নাই। তাই এসব কাজের জন্যে আমাদের আছে পায়লট। সে জানে কে কোন পান খাবে, চায়ের রং জানে সে, জানে সিগারেটের ব্র্যান্ড।

রিহার্সাল থাকুক বা না থাকুক প্রান্তিকের রুমগুলো সরগরম থাকতো। এখন সেরকম কিছু নেই। আমার মতো একেবারেই একলা মানুষ যারা আছে দু একজন। যাদের শেষ পর্যন্ত কোন বন্ধুতাই আর টিকে থাকে না। তারা সন্ধ্যার আবছায়া মিলিয়ে গেলে জড়ো হই পংকী ভাইর দোকানে। সে দোকানের কয়েকটা চেয়ার আমরা দখল করে চা গিলি, পান চিবুই, সিগরেট টানি। আর মাঝে মাঝে রিহার্সাল থাকলে চেয়ে চিন্তে ভিক্ষে করে পাওয়া মদন মোহন কলেজ কিংবা স্টেডিয়ামের কোন রুমে বসে গেজাই।

মাঝখানে কিছুই ছিলো না। এখন একটা দুটো করে সংসার আবার জুড়ছে আমাদের। হারমোনিয়ামটা টিকে ছিলো। নতুন করে বানাতে হয়েছে নাল, ঢোল আর একেবারেই নতুন যোগ হলো নাকাড়া। কর্তাল, মন্দিরাও জোগাড় হয়েছে। সবকিছু টানা হ্যাচড়া করে আমরা একবার যাই মদনে, তো আরেকবার যাই স্টেডিয়ামে। দু যায়গাই যখন হাতছাড়া হয়, তখন পায়লট সেসব নিয়ে যায় লিটন ভাইর বাসায়, আর আমরা আবার আসর পাতি পংকী ভাইর দোকানে। রিকাবী বাজার পয়েন্টে আবার হৈ হৈ জমে উঠে। যে আমরা চেয়ে চিন্তে চায়ের বিল জোগাড় করতাম, সেই আমরাই এরে তারে চা গিলাই। আর বিল দেয়ার সময় অবাক হয়ে দেখি আমাদের মাঝে সবচে ছোট যেজন, নয়ন (কলেজে সবে ভর্তি হয়েছে), সে বিলটা আগেই দিয়ে দিয়েছে!!!

কথাকলি কিংবা প্রান্তিকের রুমে ম্যাট বিছানো থাকতো। সেখানে ছড়িয়ে বসে, শুয়ে আমরা তাল ঠুকতাম আর অন্য কেউ একজন ধরতো গান। এখন সেটা হয় না। আমরা চেয়ারে সাহেব হয়ে বসি। আমাদের নরোম কাপড়ের দামি প্যান্ট যাতে নষ্ট না হয়, জুতোর পালিশটা যাতে ঠিক থাকে সেটা সবসময় খেয়াল রাখি। শামীম ভাই মুড ভালো থাকলে গান ধরে। চেয়ারে বসে বসে আমরা মাথা দুলাই, মাঝে মাঝে গলা মিলাই। মোবাইল ফোনে কথা বলি, এস এম এস পড়ি... আমাদের বিন্যস্ত করে কাটা চুল, আমাদের পরিপাটি শার্ট, তার কলারের নিচে বাঁধা টাই...। মাথা দুলাই তবু আর সেই ভাব আসে না।

প্রিয় প্রান্তিক, আমরা আর ভালো থাকি না সম্ভবত...


Tuesday, November 24, 2009

বড় লোভ হে ...

বাবার সাথে উপজেলা সদরে ঘোরার কালে আমি নিতান্তই বালক ছিলাম। থানার ভেতরে ছিলো সেসব বাড়ি।

সফেদ পাঞ্জাবী পরা পোষ্টমাস্টার বাবার ছেলে আমি অনেকবার থানার বাবুদের বাড়ির রঙিন উৎসব দেখেছি। দাদা কিংবা মা বলেছে, এবার নভেম্বরে আমাদের বাড়িতেও এমন উৎসব হবে। আমি খুশি হয়েছি, কিন্তু প্রতিবারই কোন না কোন ঝামেলায় ভেসে গেছে সেইসব নভেম্বর। পরের নভেম্বরের জন্যে আবার আমি মন বেঁধেছি।

মফস্বলি মধ্যবিত্তদের অনেক স্বপ্ন থাকে, তারচেয়ে বেশি থাকে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। প্রাপ্তিযোগের চে বেশি হয় অপ্রাপ্তির ফিরিস্থি।

নিতান্তই স্মৃতিভুক এক মানুষ। ভেতরে ভেতরে পুষে রাখি এক প্রত্ন মন। কবেকার কোন বেলাদি, প্রতিভোরে আমারে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিরাতে মহাদেব এসে স্বপনে গল্প বলে। নলজুর নদীর জন্যে তার মন কেমন করে, আমারেও সে সেই বেদনায় ভাসায়, আমি নলজুর থেকে পাল তুলে পাড়ি দেই কালনীর ঢেউয়ে। নলুয়ার হাওয়ের প্রবল আফাল উঠে আমার বুকে...

হাতের তালুর মতই পরিচিত আমার শহর সিলেট। এই শহর আমারে আগলে রাখে, এই শহর আমারে পোড়ায়, এই শহর আমারে অশ্লিল করে। তবু এই শহরেরই পথে পথে আমি ঘুরি, এই শহরের সব মোড়ে, সব সড়কে ছড়িয়ে আছে আমার তরুণ প্রভাত, উচ্ছল বন্ধুতা, সজিব বিকেল...

সৃষ্টিছাড়া মানুষ হতে চেয়েছি, তবু সেই পথে যাওয়া হয়নি আমার। গানের দলের সাথে মাইলের পর মাইল হেটেছি, তারপর ধুলোমাখা পা নিয়ে ফিরেছি বাড়ি। পুকুরের জলে ধুয়ে গেছে সেইসব ধুলো-বালি-কাদা। বুকের ভেতরে তবু রয়ে গেছে এক বাউল মন। আমি ঘরে ফিরি প্রতিবার এই তিরিশ পেরুনো সময়ে, ঘরেই ফিরি আমি, তবুও আমি ফিরি না ঘরে কিংবা আমি রয়ে যাই বাসুদেব বাড়ির বারুনির মেলায়।

জানি সকলি তবে ভন্ডামী আর আমিও বেজায় ভন্ড, তাই জনারণ্যে ভালো লাগে না আমার, তবু তিল তিল করে শুষে নেই জনারণ্য...
মানুষে বিশ্বাস হারায়েছি কবে তার নেই কোন নিকাশ, তবু মানুষেরই ভালোবাসায় ভিজতে ভিজতে পার করতে চাই এইসব রতিজাগা রাত।

০২.

পরশু একটা মেইল এলো। ফেইসবুকের নোটিশ ছিলো তাতে। বন্ধু গৌরীশ লিখেছে আমার চিকিৎসা দরকার। তার অভিযোগ, আমি শুভেচ্ছার কাঙাল, তাই নভেম্বর আসতেই ফেইসবুকে ঘন ঘন যাতায়াত করি! হাসি সেই অভিযোগ কিংবা খোচা খেয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে স্বিকার করে নেই, তুই ছাড়া আর কে এমন বুঝেছে আমায়...

০৩.

একবার চাচিআম্মা হুলস্তুল বাধিয়ে দিলো। মিষ্টি এলো, হালুয়া রাধা হলো। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে মানুষজন এলো। আব্বা বাজারে গেলেন... নতুন প্যান্ট আর শার্ট পরে শীতের বিকালটা ঘুরছি কালনীর পাড় ধরে... বড়ো বেশি উজ্জল ছিলো সে বিকেল। এখনও সেই বিকেলের উত্তাপ পাই বুকের ভেতর।

সেইসব হুলস্থলি বিকেল পেরিয়ে এসেছি কবে। ভালোবাসায় ভিজতে ভিজতে পার করে এসেছি দুরন্ত উনিশ। তবু নভেম্বর এলেই আমি বদলে যাই। লোভ এসে বাড়ি বাধে আমার ভেতরে। ভালোবাসার লোভ, বড় তীব্র নেশা জাগানিয়া লোভ...

শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেলে, জানলা খুলে দিই। দেখি নজরুল ভাই, দেখি হিমু। ঘুম জড়ানো চোখ আরো ঝাপসা হয়ে আসে। এমন লেখা পড়লে হাসি আসে, যার আসে না তার মানষিক স্বাস্থ্য প্রশ্নের মুখে পড়বে। হায় আমি কি সত্যি তবে হয়েছি বিভ্রান্ত? মনোবৈকল্য দেখা দিয়েছে আমার? সারাদিনমান আমি শুধু আপ্লুতই হলাম। এইসব রঙ ঢঙ এ কতোটা দুলে বুকের ভেতর, আলবাব ছাড়া আর কে বুঝেছে কবে?

অপ্রাপ্তির খাতায় টুকে রাখা শৈশবরে আজ সত্যি সত্যি ভেংচি কাটি, দেখ বেটা এখন, আজ কেমন ভালোবাসায় উপচে পড়ে আমার জীবন। এই যে মগ্ন সময় ভরে উঠে ভালোবাসায়, তবু মন ভরে না! লোভ বাড়ে, ভালোবাসার লোভ...

আজ, তারিখের ঘরে যখন বসেছে চার, বয়েস বেড়ে গেছে একদিন, তখন সবারে জানাই কৃতজ্ঞতা। আনত হই শুধু হে বন্ধুরা, আপ্লুত হই, লোভি হই। সকলি তোমাদের তরে, এতো ভালোবাসা দিতে হয় বুঝি?

আমি এক ক্ষুদ্র মানুষ। তুচ্ছ মানুষ। গৌণ মানুষ আমি। আমারে এতো ভালোবাসা দিতে নাই বন্ধুরা। ভালোবাসার বদলে ভালোবাসাও যে ফেরত দিতে পারি না আমি...

...................................
বিষণ্ণ মেঘের গান

স্থবির বিষণ্ণ এক মেঘখন্ড
বসে আছি, একা

চারপাশে দাড়িয়েছে দেয়াল অন্ধ বন্ধ
আমি নিঃশ্বাসে নিয়েছি বিষ মৌনতার

রাত, দিন, আলো ও অন্ধকার সবকিছু
একাকার হয়ে চেপে ধরেছে আমারে
আমারে নিংড়ে নিয়েছে বিষণ্ণ বাতাস

আমি বসে আছি, স্থবির হয়ে আছি, অপেক্ষায় আছি দমকা বাতাসের,
ঝরে পড়তেই জন্মেছিলাম, এই সত্য জেনেছি বলেই জলে দিয়েছি মন...


Monday, November 16, 2009

সপ্তাহান্তের কোমল ক্লাসরুম

তুমি রুটিন বেঁধে দিয়েছো। স্কুলের ধর্ম শিক্ষা ক্লাশের মতো।
সপ্তাহের ঠিক একটা দিন, আমরা একটা ক্লাশে ইচ্ছেমতো
হৈ হৈ করতে পারতাম, নিজেদের মতো গল্প হতো। তুমিও
ঠিক সপ্তাহান্তের এক কোমল ক্লাশরুম, যেমন ইচ্ছে তেমন।

এইসব নিয়ম, কথার মারপ্যাঁচে ফেলে গিলিয়ে দেয়া সময়
আমারে বিষণ্ণ করে, এ বিরহ বড়ো বেশি বুকে বাজে
আমাকে উদভ্রান্ত করে। মগ্ন কিশোরের মতো আমি রুটিনের
দিকে তাকিয়ে থাকি, হিসেব করি, আয়ুষ্কাল গুনি, দেখি
মাঝখানের ঘন্টাগুলো জীবন থেকে উধাও হয়ে যায়

তুমি কথা বল্লেই মনে হয় বেঁচে আছি, নিরবতায় নেমে আসে মৃত্যুর শীতলতা।


Monday, November 9, 2009

ভ্রমণ (আনন্দময়) হয়েছে (শেষ)

১০.

সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয় হয় এমন একটা সময়ে পৌঁছে গেলাম হিরণ পয়েন্টে। বিখ্যাত স্পট। বনবিভাগের বিশাল অফিস সেখানে। আছে নৌ-বাহিনী আর মংলা বন্দরের দুটো আস্তানা। আগেরবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা সুন্দরবন নিয়ে কি একটা প্রজেক্ট আর রামসার এরিয়া ঘোষণার জন্যে সেখানে গিয়েছিলেন। বিশাল একটা ফলক লটকে আছে সেখানে। আছে এই এলাকার একমাত্র মিঠাপনির পুকুর। জেটিতে বোট বেঁধে আমাদেরকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। যথেষ্ঠ মানুষের আনাগোনা সেখানে। তবু হরিণ দেখতে পেলাম। ঘুরছে রাতের আলোতে। শুনলাম বাঘও আছে আশেপাশে। বনকর্তা জানালেন একাধিক বাঘ নাকি সেখানে আছে। প্রচুর খাবার পাওয়া যায় বলেই হয়তো এটা ঘটেছে। কারণ এর আগে শুনেছি একটা নির্দিষ্ট এলাকায় কয়েকটা বাঘ সাধারণত থাকে না। খাবার পানির পুকুর পাড়ে বসে আছি। শান বাঁধানো ঘাট। বনবিভাগের এক অফিসার গল্প করছেন। নানান কিসিমের গল্প। এইবার আর মুস্তাফিজ ভাইকে বলতে হলো না। আমি নিজেই বুঝে গেলাম, চাপা... সবটা না হলেও অনেকটাই চাপা। (জেনারেল স্যার, আমি কি কিছু শিখলাম? চোখ টিপি )

টানা চারদিন কি দুদিনও আমি মাছ খেয়েছি কোন জনমে, এটা কেউ বল্লে, আমার মা বলবেন, আপনে ভুল করতেছেন। সে আমার ছেলে না, অন্যকেউ! কিন্তু ঘটনাটা ঠিকি ঘটেছে। টানা চারদিন মাছ খেয়েছি এই ভ্রমণে। এমনতরো নানা ঘটনাই আছে। মিহি মিহি সেইসব ঘটনা একটু একটু করে মনে পড়ে। বিচ্ছিন্নভাবে মনে পড়ে।

রাতে চাঁদ নেমে এসেছিলো হাতের তালুতে। হ্যাঁ, হাতের তালুতে, শরীরে জলের ধারার মতো টুপ টুপ করে পড়েছে চাঁদের আলো। নিলকমলের জেটিতে বসে ভিজতে ভিজতে আমাদের স্বাদ মেটে না। নৌকার ছাদে বসি। সেখানে আলোর সঙ্গে যোগ হয় কুয়াশা। আমরা ভিজতেই থাকি। যতক্ষণ না খলিল ভাতের গামলা ঠেলে দেয় ততক্ষণ চন্দ্রাহত হয়ে থাকি আমরা।

শেষ কবে নায়ে ঘুমিয়েছি ভুলে গেছি। বালক বেলার সেসব ঘটনা। আমাদের নানাবাড়ির টিলার মাঝখানে ছোট্ট একটা হাওরের মতো। পুব সিলেটের ভাষায় এরকম জায়গাকে গোল বলে। বর্ষায় সেসব গোলে পানি জমে। পাশের সুরমা নদীর সাথে মিশে যায় সেই পানি। আমরা শৈশবে সেই হাওরের মতো জলায় দাপাদাপি করতাম। সেই জলে কেউ কেউ নৌকা ভাসাতো। ছোট মামা রাত জেগে সেখানে মাছ ধরতো। তার সাথে এক দুবার আমি কিংবা আমরা গিয়েছি। সেই যাওয়ার সুবাদে রাত্রিযাপনও হয়েছে। হাতের আঙুল গুনে পায়েরও শেষ হয় তবু সেই পেছনের হিসাব করতে পারি না। আমি আবার নৌকায় ঘুমালাম। বাপ্পিদা যত্ন করে বানিয়েছেন তার এই বোট। আতিয়ার ভাই সেখানে বিছানা পেতে দেন। আমরা একজন আরেকজনের মাথায় মাথা লাগিয়ে শুয়ে পড়ি। জেনারেল থেকে আবার ভাইয়ে পরিণত হন বুড়াভাই। গল্প ঘুরতে থাকে সুন্দরবন থেকে স্পেন অব্দি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টেরও পাইনি।
পায়ের দিকের একটা জানালা খুলে রেখেছিলাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সেই জানলা গলে আসা কোমল রূপালী আলোকে খেলতে দেখি আমারই পায়ে! আস্তে আস্তে উঠে বসি। দরোজা খুলে বেরিয়ে আসি। বায়ে তাকাই, ডানে তাকাই... শিরশিরে বাতাসে শরীর কাঁপে। বনের ঘ্রাণ পাই। নীলকমলের আশেপাশে হালকা পায়ে ঘুরে বেড়ায় হরিণ। আবছায়াতে তাদের দেখি আবার দেখি না। মাথার উপর উদার আকাশ... নিজেরে বড়ো ক্ষুদ্র, বড়ো বেশি তুচ্ছ মনে হয়... আমি ছৈয়ের ভেতর ফিরে আসি। গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ি...

১১.

শনিবার সকালটা একটু আগেই শুরু হলো অরূপ এর জন্যে! এম্নিতে ওরে দুপুর ১২টায়ও হাতি লাগিয়ে টেনে তুলতে হয়। হিরণ পয়েন্টে সেটা হয়নি। হলে ভালোই হতো। হরিণ দেখতে পারতাম আরো নিবিড় ভাবে। বেটা যে ভাবে থপ্ থপ্ করে হাঁটে... পাতার নড়াচড়াতেই যে প্রাণী দৌড়ে পালায়, সে এহেন থপথপে কি করতে পারে চিন্তা করেন।

কেওড়াশুটি খালের পাড় থেকে কাঠের একটা ব্রিজ চলে গেছে বনের ভেতর। সামনে এমদাদুল ভাই, পেছনে রেজাউল। রাইফেল হাতে সাবধানী হয়ে হাঁটছেন। মাঝখানে আমরা ফিস ফিস করে কথা বলছি। হাত দশেক এগিয়েছি হয়তো, ব্রিজের পাশ ঘেঁষে ভেজা মাটিতে ভেসে উঠা বাঘের পায়ের ছাপ চোখে পড়লো। সেই পায়ের ছাপ ধরে হাঁটতে থাকি, একেবারে টাটাকা স্পর্শ... একসময় দেখা যায় মামুজি ব্রিজেও চড়েছেন! রেলিং এর পিচ্চি ফাঁক দিয়ে কেমনে ঢুকিলো?? এমদাদ ভাই প্রশ্ন শুনে বলেন, বনের সবচে বড়বাঘটাও নাকি আধা ফুট উঁচু বনের ঝোপে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে!!!

আমরা আরো এগোই। সামনে থেকে হাত তুলে থামতে বলেন এমদাদুল। তার পর ব্রিজের একপাশে সরে দাঁড়ান... ব্রিজ শেষে যে হালকা উঁচু রাস্তার মতো আছে, সেখানে দাড়িয়ে আছে একটা চিত্রল হরিণ... ফটুরেদের ক্যামেরা সচল ছিলো প্রথম থেকেই। বাঘের পায়ের ছাপ তুলে রাখা হয়েছে, এবার ক্যামেরায় জায়গা করে নেয় হরিণ। কিন্তু সময় বড়ো অল্প। মিনিটেরও কম সময় আমাদের দিকে তাকিয়ে, দ্রুত সরে যায় তরুণী চিত্রল।

কেওড়াশুটির ছবি দিয়েছেন মুস্তাফিজ ভাই। তার ফ্লিকারে আরো ছবি আছে, অরূপও চমৎকার কিছু ছবি তুলেছে। সুন্দরবনের এই অংশটাকে আমার সাজানো গুছানো পরিপাটি বলে মনে হয়েছে। মনে হয়েছে আমার গ্রামের বাড়ির আধা ঘন জঙ্গলের মতো। গাছ, গাছের ফাঁকে-ফাঁকে বেশ বড়ো বড়ো খালি যায়গা। মাঝখানে মিঠাপনির একটা পুকুর মতো আছে। কিন্তু খুবি অল্প সময় সেখানে থেকেছি আমরা। আমার তৃপ্তি মেটেনি। কথা ছিলো পরে আরেকবার যাবো সেখানে, কিন্তু আর যাওয়া হয়নি। কেওড়াশুটি থেকে ফিরে হিরণ পয়েন্টেও আরো কিছুক্ষণ ঘোরা হলো। তারপর দুপুরের ভাটা শুরু হতেই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এবারের গন্তব্য দুবলার চর।

১২.

সুন্দরবনে এই মনে হয় একমাত্র চর, যেখানে ইচ্ছেমতো হাঁটা যায়। জেনারেল মুস্তাফিজ রুলিং দেন না, বা এমদাদুল রেজাউলরা বন্দুক নিয়ে পাহারা দেন না। অসম্ভব কর্মব্যস্ত একটা দ্বীপ। পাঁচ মাসের জন্যে জেলেরা এখানে থাকতে আসেন। তাই অস্থায়ী ছাপড়া ঘরে ঠাসা। আমরা যেদিন গেলাম, তার ১৫/২০ দিন আগে থেকে জেলেরা আসতে শুরু করেছেন। তখনও ঘরদোর তৈরির কাজ চলছে। এরিমাঝে ট্রলার ভর্তি করে আসছে মাছ। শিশু কিশোরদের বেশ বড় একটা অংশ সেখানে কাজ করে। তাদের মাঝে একজনের সাথে কথা হলো। আব্দুল আহাদ নাম। বাপ আর ভাই এর সাথে এসেছে চরে। খাতির হয়ে গেলো। ঘুরতে ঘুরতে তাদের ডেরায় গেলাম। তিন মাথাওয়ালা একটা লাঠি দিলো সে আমাকে। পরের দুদিন যেটা অনেক কাজে এসেছে।

আমরা হাঁটতে হাঁটতেই শুনলাম, একজনকে সাপে কেটেছে। তাকে ওঝা ঝাঁড়ফুক দিচ্ছে। দ্রুত সেখানে গেলাম আমরা। ২০/২২ বছরের এক তরুণ। আগের রাতে সাপে কেটেছে। এরপর থেকে চলছে টোটকার চিকিৎসা। দুবলার চরে বেশ কয়েকজন ডাক্তারের পতাকা দেখেছি! হ্যা পতাকা। নিজেদের নাম লিখে ডেরার সামনে লম্বা বাঁশে সেটা টাঙ্গিয়ে রেখেছেন তারা। দেখে ভারি মজা পেয়েছি। তাদেরই একজন বাক্স হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখানে। কিন্তু চান্স পাচ্ছিলেন না। মুস্তাফিজ ভাই এক প্রকার জোর করেই সেই ডাক্তারকে কাজে লাগালেন। বিষক্ষয়ের ইনেজকশন পুশ করা হলো। আমরা আবার ঘুরতে গেলাম। ফেরার সময় দেখি সেই লোক আরেকজনের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। মুস্তাফিজ কবিরাজ কিছু পথ্য বাতলে দিলেন এইবার। হাসি

পূর্ণিমার আগের রাত, তাই সে রাতে চাঁদ আরো বেশি মোহনীয়তা নিয়ে জেগে ছিলো আমাদের সাথে। মধ্যরাত পর্যন্ত বোটের ছাদে আড্ডাবাজি হয়েছে। তবে গতভ্রমনের মতো আমরা কেউ কিছুই হারাইনি। সবার সবকিছু ঠিকমতোই ছিলো। হাসি

আগের রাতের মতো এ রাতেও ঘুম ভাঙলো। তবে মাঝরাতে নয়, শেষরাতে। জেগেই বুঝলাম, কেমন একটা অস্বাভাবিক অবস্থা। বাইরে বেরিয়ে দেখি ধারণা ঠিকি আছে। বাপ্পিদা সমানে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করছেন। আতিয়ার ভাই আর ওহাব ঠান্ডা কনকনে জলে দাপাদাপি করে সে গাল হজম করছে। ভাটির কারণে চরে উঠে পড়া বোট নিচে নামানোর চেষ্টা করছেন। অপূর্ব একটা চাঁদ আকাশে, তার আলো কুয়াশার চাদর মেখে আমাকে ডাকে। কিন্তু বাপ্পিদার চেচামেচির কারণে সে ডাকে সাড়া দেয়া হয় না।

সারারাত মাছ ধরে ভোরের আলোর সাথে সাথে ফিরে আসে সারি সারি ট্রলার। নির্জনতা খান খান হয়ে যায়। মানুষের কণ্ঠের নিচে চাপা পড়ে সমুদ্রের গম্ভীর গর্জণ। ফটুরেরা ফটুক তুলেই যাচ্ছেন। নিঃসঙ্গ আমি হাটতে থাকি সৈকত ধরে। আব্দুল আহাদকে খুঁজি। পাই না। হঠাৎ দেখি আতিয়ার ভাই লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্বীপের ভেতরের দিকে যাচ্ছেন। আমি সৈকত ধরে তেরছাভাবে হেঁটে হেঁটে তাকে ধরার চেষ্টা করি। পেছন পেছন হেটে প্রায় ধরে ফেলি। লম্বা মানুষ, ছ'ফুটের ওপরে হবে উচ্চতা। চোখের লেবেল ধরে তাকালে আমি তার বুকটাই দেখি শুধু। সেদিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করি, কই যান...? উল্টা প্রশ্ন আসে,- 'কি দিয়া আইছেন? নৌকা না নঞ্চ?' ধাম করে আমার মাথা উপর দিকে উঠে যায়। ঘাড় উচিয়ে মুখটা দেখেই বলি, 'নৌকা'... আমার কথা তার কানে যায় বলে মনে হয় না। মেলায় যাইবেন? ঘাড় নাড়ি, তার সাথে যাবার কথা বলে... আমি পিছিয়ে আসি। ফিরে আসি পাড়ে। দেখি রিফাত-১ এর ছাদে বসে আছেন আতিয়ার ভাই!

ফটুরেরাও ফিরে আসেন। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে আমরা দ্বীপের আরো ভেতরে ঢুকি খাল বেয়ে। মেজর জিয়া উদ্দিনের লিজ নেয়া অংশে যাই। সেখানে রাস উপলক্ষে মেলা বসেছে। দুর থেকেই দেখতে পাই কর্পোরেট দানব সেখানেও পৌঁছে গেছে। যে দ্বীপে ফোনের নেটওয়ার্ক নাই সেখান ফেস্টুনের মাধ্যমেই সেবা পৌছে দিচ্ছে মোবাইল ফোন কোম্পানি। মেলা ঘুরে দ্বীপের আরো ভেতরে চলে গেলাম। নিউমার্কেট নামের এক যায়গার কথা শুনছি তো শুনছিই। সেখানে যাওয়া হলো। হাঁটছি সবাই। ফটুক খিচা হচ্ছে। হঠাৎ দেখি আমার আতিয়ার ভাই শুয়ে আছেন এক দোকানে।

দুবলার চরের মেলা আমাকে হতাশ করেছে। এটা দেখে মনে হয়েছে,বাণিজ্য করার প্রাণান্তকর চেস্টা করছে কিছু মানুষ। তাই ফুলিয়ে ফাপিয়ে নানান কথা ছড়িয়ে দিচ্ছে মেলার ব্যাপারে। তবে রাশ উপলক্ষে হওয়া স্নানটা হয়তো অন্যরকই হবে। সেটা দেখিনি, তাই কিছু বলতে পারছি না। কারণ আমরা দুপুরেই ফিরে আসি দুবলার চর থেকে। আবার গন্তব্য হিরণ পয়েন্ট। যে বর্ণনা ইতিমধ্যে দিয়ে ফেলেছেন মুস্তাফিজ ভাই। আমি শুধু অরূপ কাগুর জন্যে একটু চোখের পানি ফেলি এখানে। বেচারা, এতো কাছে গিয়েও কিছুই দেখতে পেল না। শালার বস্তার মতো পেটই এইজন্যে দায়ী। এইটার জন্যেই এখন পর্যন্ত 'তোমরা বন বিড়ালের ডাক শুনে পালিয়ে এসেছো' এই কথা বলে মনে শান্তি পেতে চাইছে।

১৩.

রোববার রাতে হিরণ পয়েন্টে থেকে, মাঝরাতেই আমরা চলতে শুরু করেছি। জোয়ারের সাথে সাথে ডাঙ্গায় ফিরতে থাকে বাপ্পিদার বোট। কিন্তু চলতে যেনো তার সমস্যা হচ্ছিল। একসময় ঘড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড় করে অদ্ভুৎ এক ধাতব শব্দ করে থেমে গেলো ক্ষরস্রোতা নদীতে। ততক্ষণে ভাটা শুরু হয়ে গেছে। অসিত গেরাফি (নোঙর) ফেলেও বোট আটকাতে পারে না। এরিমাঝে শুনি বাপ্পিদা কাকে যেনো বলছে, ট্রলার নিয়ে আসতে। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি তার কানে মোবাইল, পকেট থেকে বের করি সবাই প্রায় একসাথে... আবার শুরু হয় তবে যন্ত্রের জীবন।

শোনা যায় বাঘে নিয়ে যাওয়া এক মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে সেই ট্রলারের মাঝি, তাই আমাদের উদ্ধারে দেরি হচ্ছে। আমরা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা আসছে বলে বাপ্পিদাকে ক্ষেপাই একদিকে, আরেকদিকে এমদাদ ভাই মোবাইল ফোনে জানা ঘটনা যখন বর্ণনা করে, তখন ঝিম মারি। এমন সময় দুরে খুব দুরে দেখা যায় একটা বিন্দু। আমাদের দিকেই তাক করা তার মুখ। দ্রুত সেই বিন্দুটা রূপ নেয় একটা স্পিডবোটে। বনবিভাগের এসিএফ রাজেশ চাকমা এসে স্পিডবোট ভেড়ান। আগের দিনে ধুবলার চলে তার সাথে পরিচয় হয়েছিলো। দুর থেকে মনে হয়েছে আমরা কোন সমস্যায় পড়েছি, তাই এসেছেন। রিফাত নামের বোটে শেষবার খাবার খেলাম আমরা। ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছে অন্য ট্রলার। বাঘের ফেলে যাওয়া মাংশের টুকরা লুংগিতে পেচিয়ে হতভাগ্য পরিবারের কাছে পৌছে দিয়েছেন বনপ্রহরীরা। তাদের কাছ থেকে সেই গল্প শুনেছি, মোবাইলে তোলা ভিডিও দেখেছি, কিন্তু সেসব বলার ইচ্ছা আমার একেবারেই নাই।

শেষ

এসিএফ আমাদেরকে শ্যামনগরে পৌছে দেবেন বল্লেন, তিনি থাকলেন বোটে। তার স্পিডবোট আমাদের নিয়ে ছুটলো। পেছনে ফেলে এলাম চমৎকার কিছু মানুষকে। একেবারেই অন্যরকম কয়েকটা জীবন। বড়ো সরল, বড়ো বিশাল তাদের মন। সুন্দরবনের বিশালতাকে আমি ছুতে পেরেছি হয়তো, এইসব মানুষের পারিনি। মানুষ এমনই মনে হয়। কাছে গেলেও যায় না চেনা, ছোয়ে দিলেও হয় না ছোঁয়া...

Saturday, November 7, 2009

ভ্রমণ (আনন্দময়) হয়েছে

১.
আমাদের শহরে, নিজেদের লোক যারা আছে, এরা কথায় কথায় এই দেশ সেই দেশ মারে। আমরা দু ভাই। দাদাভাই দেশ শেষ করেছে তাও দেড় যুগ আগে। এখন ইউরোপ শেষ করার ধান্দায় আছে। আর আমার পাসপোর্টই নেই।

বালক বেলায় আমি অবাক হয়ে দেখতাম, দাদা ক'দিন পর পর এখানে যাচ্ছে, সেখানে যাচ্ছে। গাট্টি-বোচকা নিয়ে চলে যাচ্ছে জঙ্গলে থাকবে বলে। আমি লোভাতুর হয়েছি। কিন্তু কি এক মায়ার টানে ঘর ছাড়িনি। শহর ছাড়িনি। অথচ বছর দশেক আগেই আমার হয়ে গেছে স্লিপিং ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগসহ ভ্রমণের নানান জিনিসপাতি। দাদাভাই সেসব দেদারছে ব্যবহার করেছে। একবার হলো কি, সিলেট স্টেশনে এসে ঢাকার ট্রেন থামলো। আমি, দাদাভাই, আরিফ ভাই, রনি ভাই আর রাজু নামলাম ট্রেন থেকে। স্টেশনে নেমে দেখি বিরাট আয়োজন নিয়ে তাদের বন্ধুরা দাঁড়িয়ে। তাবু, লেপ-তোষক, ডেগ-ডেকচি। তারা ক্যাম্প করতে যাচ্ছে লাউয়াছড়া বা আরো কোন নির্জন জঙ্গলে। আমার বানর টুপি, মাফলার, স্লিপিং ব্যাগ মুহুর্তের মাঝে তিন বন্ধু ভাগ করে নিলো।

তখনতো মোবাইল ছিলো না। দাদাভাই স্টেশন থেকে ফোন করলো বাসায়। জিজ্ঞেস করলো আমি বাসায় পৌঁছেছি কী না। আম্মা না বলাতে, বল্লেন, পৌঁছে যাবো। রাজু আর আমি এক ট্রেনে যাচ্ছি, ইত্যাদি ইত্যাদি। আরিফ ভাইও একি কাজ করলো। শুধু আমার নামের যায়গায় রাজু আর রাজুর নামের যায়গায় আমার নামটা বসিয়ে দিলো। বাসার সবাই জানলো ওরা ঢাকায় রয়ে গেছে। কিন্তু তারা জঙ্গলবাসে চলে গেলো। আমরা দুই বন্ধু এক রিক্সায় বাসায় ফেরার সময় ওদের পুরা দলটারে অভিশাপ দিতে থাকলাম। তালতলায় নেমে যাবার আগে রাজু এমনভাবে কথা বল্লো, যেটার মর্মার্থ হলো, দেখিস একদিন আমরাও... আমাদের দেখা হয়নি কিছুই। আমরা বন্ধুরা মুড়ি মুড়কির মতো ছড়িয়ে পড়েছি সময় হওয়ার অনেক আগেই।

২.
এই বর্ষায় যখন মুস্তাফিজ ভাই সুন্দরবনে গেলেন, সে যাত্রার খবরে আমার ভারি লোভ হলো। ইশ আমিও যদি যেতে পারতাম...। আমার সেভাবে বেড়ানো হয়নি কখনো। সিলেটের বাইরে ঢাকাতেই যাওয়া হয় শুধু। তাও কাজের জন্যে যাই। সমুদ্রে গিয়েছিলাম বালক বেলায়, অথচ সমুদ্র ছোঁয়া হয়নি আমার। আরেকবার দাদা জোর করে নিয়ে গিয়েছিলো শহর চাঁদপুরে। বেড়ানো বলতে এই। তাই লোভে আর জেদে গলতে থাকি, পুড়তে থাকি। ঢাকায় ফিরে প্রথম আলাপেই মুস্তাফিজ ভাই বলেছিলেন, আরেকবার গেলে তোমাকে নিয়ে যাবো। কথা রেখেছেন আমার প্রিয় বুড়াভাই। আমি সুন্দরবন গিয়েছিলাম। দারুণ আনন্দময় এক ভ্রমণ শেষে ফিরে এসেছি নিজের শহরে।

৩.
এস এম এসটা এসেছিলো রাতে। সেটা দেখিনি। সকালে দেখলাম। ২৯ তারিখ রাতে যাত্রা, ফেরা হবে নভেম্বর ২ এ। সেই যাত্রা দুবার বাতিল হয়েও ঠিক থেকে গেলো। আর আমিও ২৯ তারিখ দুপুরে বাসে চেপে বসি। তার আগে আমাদের টিলার উপর সোলায়মান মিয়া যখন বেবিটেক্সি নিয়ে হাজির হয় তখনও বাড়ির কেউ হয়তো বিশ্বাস করেনি আমি চলেছি। চলেছি বনবাসে। তারা ভেবেছে কোন কাজে হয়তো ঢাকা যাচ্ছি। মোটা জ্যাকেট হাতে টেক্সিতে উঠার আগে ভাবী দৌড়ে এলো, তুমিতো ঢাকায় যাচ্ছো না, অন্যকোথাও! কই যাও! আমি হাসতে হাসতে বলি বনবাসে...

৪.
বাস সময়মতো পৌঁছলে সন্ধ্যা সাতটাতেই শ্যামলি যাবার কথা। কিন্তু বিশ্রি ঢাকা সেটা হতে দেয়নি। সাড়ে দশটার ঘর পেরোলে শ্যামলিতে গেলাম। তখনও মূল বাহিনী সেখানে যেতে পারেনি। একটু পর পর মুস্তাফিজ ভাই খোঁজ নিচ্ছেন, আমি বাস কাউন্টার খুঁজে পেলাম কি না। তিনিও আটকে ছিলেন যানজটে। রাত এগারোটায় সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস এর বাস ছাড়ার আগে আমরা সবাই দৌড়ে ঝাপটে পৌঁছে গিয়েছিলাম কাউন্টারে। আমরা বলতে, মুস্তাফিজ ভাই, অরূপ, ইউসুফ তুষার এবং জুবায়ের লোদি। শেষের দুজন দেশের দামি দুই তরুণ ফটুরে। আর প্রথম দুজনকেতো সবাই চিনেন। সাথে গ্যাটিস এবং শুধুই ভ্রমণের জন্য যাওয়া একমাত্র মাল, এই আমি ভ্যামতালা অপু।

বাস কাউন্টারের সামনে দাড়িয়ে আছি। মুস্তাফিজ ভাই আসলেন। তার পেছন পেছন দেখি লাল টি শার্ট পরা মধু পাগলা আসে। মধু পাগলার কথা কি মনে আছে আপনাদের? সেই যে আমাদের বালকবেলায় বিটিভিতে নাটক হতো, সময় অসময় নাম ছিলো। সেই নাটকে একটা পাগল ছিলো। নাম মধু পাগলা। সেই মধু পাগলা দেখেতো আমি প্রায় ভয়ই পেতে যাচ্ছিলাম। এই পাগলাকে কেন বুড়াভাই সাথে নিয়ে আসলো, সেটা মাথায় ঢুকছে না আমার। কাছে আসতেই ভুলটা ভাঙলো। এই জিনিস মধু পাগলা না। এটা হলো অরূপপাগলু। দেঁতো হাসি চুল কাটতে গিয়েছিলো। নাপিত নামের মহামানব এই অবস্থা করে দিয়েছে। না দেখা সেই নাপিতের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম। এই বেটা সমানে আমারে পাগল বলে যায়। অচেনা একটা নাপিত সেই সাজা তারে দিয়েছে। হে নাপিত তুমি মহান!

বাস ছাড়ার ঠিক আগ মূহুর্তে আমাদের এক বন্ধু ফোন করলেন। অরূপের সাথে তার কথা হলো। না যেতে পারার দুঃখ ছিলো তার কণ্ঠে। অরূপ বিষন্ন হলো। সেই বিষন্নতাটা আমার মাঝেও ছড়িয়ে দিলো সে। এইটা আমাদের সাথে ছিলো পুরো ভ্রমণের সময়টাতেই।

এই রাস্তায় সাভার পর্যন্ত গিয়েছি এর আগে। এরপরেই অচেনা সড়ক। রাতের বাস। আমাদের ঘিরে রেখেছে অন্ধ এক আলো। মাঝে মাঝে অন্যগাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো আমাদের চমকে দিচ্ছে। আমরা গল্প করছি টুকটাক। সুন্দরবন, সচল আর মানুষের কথা বলছি আমরা।

ফেরিঘাটে পৌছে বাস থেকে নামলাম। সুনামগঞ্জের হাওড় জনপদে কেটেছে আমার সোনালী শৈশব। আমি জল কাদার মায়ায় বেড়ে উঠা মানুষ। ডাবর এর ফেরিঘাট জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। ফেরিঘাট আর ফেরি, সেখানকার মানুষ আমার বড়ো প্রিয়। আমি মুগ্ধতা নিয়ে মানুষ দেখতে থাকলাম। ইতিমধ্যে অন্য দুই ফটুরের সাথে আলাপ হয়েছে। মানুষের সাথে সম্পর্ক হতে বেশ সময় লাগে আমার। এখানেও তাই লাগতো হয়তো। কিন্তু জুবায়ের ভাই সেটা হতে দিলেন না। আমার সাথে তিনিও হাঁটছেন। ছোট ছোট দোকান দেখছি আমরা। ব্যস্ততা দেখছি। বিজলি বাতির আলোয় সবকিছু চকমক করছে। তারপরও অন্যরকম একটা আলো খেলছে চারদিকে। সেই মায়াবী আলো আমাদের মুড়ে রেখেছে পরের চারটা দিন। আলোটা ছড়াচ্ছিল আকাশ থেকে। সে আলো ছিলো চাঁদের আলো।

৫.
শ্যামনগরে কয়েককটা দোকান আছে। ছাপটা দোকান। সকালে বাস থেকে নেমেই দেখি সেরকম এক দোকানের অপরিচ্ছন্ন কাচের শো-কেসে ডিশ ভর্তি করে রেখেছে ছোট ছোট মিষ্টি দিয়ে! আহা, এ যে আমার প্রিয় গুলগুলা মিষ্টি। (এই নামটা আমি দেই নাই। টুটুল ভাই দিছে)। মিষ্টির দিকে যখনই এগুচ্ছি, তখনই জেনারেল মুস্তাফিজ হুঙ্কার দিলেন। এই মিষ্টি না খাওয়ার দুঃখ আমি সারজীবনেও ভুলবো না। যদিও পনের মিনিট পরেই অন্য আরেকটা দোকানে গিয়ে আমাকে মিষ্টি খাওয়ানো হয়েছে। হাসি

সেই যে গফফটুরের দল গেলো সুন্দরবনে। ভিজতে ভিজতে আর হাগতে হাগতে তারা ফিরে এলো। আসা অব্দি বার বার শুনছি একটা নাম, বাপ্পিদা। সালাউদ্দিন বাপ্পি। আমাদের ট্যুর অপারেটর। বুড়ি গোয়ালিনীর ঘাটে গিয়ে তাকে পাওয়া গেলো। বিশাল মোটাশোটা লোক। এর অনেক গুন। কিন্তু জেনারেল মুস্তাফিজের কাছে সে নিতান্তই শিশু। তাকে দেখেই জেনারেল একটা ভেটকি দিলেন। এই মিয়া... হ্যান ত্যান বলে ছেড়াবেড়া অবস্থা। সেও দেখি মুহুর্তেই নেতিয়ে পড়লো। খুব অল্পক্ষনের মাঝেই রিফাত-১ নামের ছোট্ট বোটটাতে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থান হলো। জেনারেল সাহেব স্থলবাহিনী ছেড়ে জলবাহিনীতে চলে গেলেন। তিনি বোটের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব নিলেন। আমাদের সুন্দরবন যাত্রা শুরু হলো।

৬.
প্রবল মুগ্ধতায় আমি বোবা হয়ে যাই। আমার জীবনের সবচে রঙিন মুহুর্তগুলোর কথা আমি লিখতে পারিনি। দু একবার চেষ্টা করে পরাস্ত হয়েছি। এক আশ্চর্য সুন্দর বিকেলের কথা লেখা হয়নি। হবে না। ভয়, রোমাঞ্চ আর আকাঙ্খার এক সন্ধ্যায় বাবাই প্রথম কেঁদেছিলো। সেই মূহুর্তকে কোনভাবেই আঁকতে পারিনি আমি। এইটা এক ব্যর্থতাই হয়তো। তবু এই পরাস্ত হওয়াতে মজা আছে।

বোট চলতে শুরু করলে আমাকে সেই মুগ্ধতা চেপে ধরে। ক্রমশ পিছিয়ে যায় বুড়ি গোয়ালীনির ঘাট। পরিচিত হয়েছি ইতিমধ্যে আতিয়ার ভাই, ওয়াহাব ভাই, অসিত এবং খলিল এর সাথে। আমাদের সাথে আছেন বনপ্রহরী রেজাউল করিম। কলাগাছিয়া থেকে আরেকজন বনপ্রহরী আমাদের সাথে যোগ দেন। তিনি হলেন এমদাদুল। এদের সবার কথা এখানে বলে ফেলি। এরা এক কথায় চমৎকার মানুষ। খুবি চমৎকার। সারাজীবন মনে রাখার মতো একেকটা মানুষ।

আমার নামধাম মনে থাকে না। (লেখার সময় এদের নাম মনে করিয়ে দিলেন মুস্তাফিজ ভাই।) একটু পর পর তাদের নাম জিজ্ঞেস করেছি পরের চার দিন। এটাতে তারা খুবি মজা পেয়েছে। আর আমি পেয়েছি শরম! আমাদের এক ছোটভাই আছে। নাটক করে। এখন আমেরিকায় থাকে। করিম ওর নাম। ওর বন্ধুরা ওকে ডাকতো এল করিম বলে। পরে সবাইই তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করে। আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম এই 'এল' টা কি রে? সে আমার কাছে বসা ছিলো। দাঁড়ালো, একটু দুরে গেলো। আমি তাঁকিয়ে আছি তার দিকে। বল্লো, অপুভাই এল এর মানে কি বলতে পারি। তার আগে বলো, তুমি আমারে মারবা না। এই বানরগুলারে আমি অনেক বেশি আদর করি। তবু কোন এক আজব কারণে এরা আমারে খান্ডাল টাইপ কিছু একটা ভাবে। তাদের অনেকেই তুলিরে বুবু বলে ডাকে! ছোটভাইরা শ্বশুরবাড়ির লোক হয়ে গেলে কেমন কষ্ট হয় সেটা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। আমি বল্লাম, ঠিকাছে মারবো না, বল কি হয় এল দিয়ে। সে বল্লো এল দিয়ে লুচ্চা হয়... বলেই দৌড়, আমি স্বপনের দোকানে মুখ হা করে বসে থাকলাম। রেজাউল করিম এর নাম আমি ভুলিনি এই এল করিম এর সূত্র ধরে। তাকে করিম ভাই বলে ডেকেছি।

ওহাবকে সচলের সবার চেনার কথা। মাহবুব লীলেন সুন্দরবন থেকে ফিরে একটা গল্প লিখেছিলেন। বাঘ শিকারের গল্প। এর নায়ক সম্ভবত এই ওহাব। ওর সাথে কথা বলে সেই গল্পের অনেক টুকরো টাকরা জেনেছি আমি। ওহাব সুন্দরবনের সেইসব সাহসী মানুষদের একজন, যিনি বাঘের সাথে লড়াই করেন। আতিয়ার ভাইকেও আপনাদের চেনার কথা। তার ছবিও আছে সচলে। এই যে নামগুলো বলছি, এরা এমনই ব্যাপক জীবন ধারন করে আছে, যে এদের প্রত্যেককে নিয়ে কয়েকটা করে ব্লগ নামানো যাবে। আমি নিতান্তই এক ক্ষুদ্র মানুষ। তারচেয়ে ক্ষুদ্র এক লেখক। সেই দুঃসাহসের কাজটা আমি নাইবা করি। আমি বরং নিজের কথাই বলি, যেটা করে আসছি এতোকাল ধরে।

৭.
প্রজাপতি কতোটা রঙিন হয়? কতোটা মুগ্ধতা কেড়ে নিতে পারে সে? ছোট ছোট পাখায় কতো পথ পাড়ি দেয়ার শক্তি আছে তার? নদীতে ভাসার পর সবার আগে আমাকে অবাক করেছে সুন্দরবনের বর্ণিল প্রজাপতি। এরা নদীর এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে যাচ্ছে। মুস্তাফিজ ভাই বল্লেন, প্রজাপতিগুলো নাকি আত্মহত্যা করছে। আমি তর্কে মাতলাম। আমাকে সমর্থন দিলেন জুবায়ের ভাই। অরূপ নিয়ত করেই যাত্রা শুরু করেছিলো সবকিছুতেই আমার বিরুদ্ধে থাকবে, উল্টা পথে হাঁটবে। তাই সে আমার বিরোধীতা করলো। যদিও এজন্যে তাকে পরে পস্তাতে হয়েছে। আমি একদৃষ্টিতে প্রজাপতি দেখতে থাকলাম। একটাকে টার্গেট করলাম। সেটা যাচ্ছে... যাচ্ছে... যাচ্ছে... বিন্দু হয়ে টিকে আছে আমার চোখে। ধারাবর্ণনা দিয়ে যাচ্ছি। শেষ মুহুর্তে এসে আমার চোখটা ফিরিয়ে দিলেন জেনারেল মুস্তাফিজ। প্রজাপতিটা আর খুজে পেলাম না। মন খারাপ জেনারেলরা যে কতো বদ হয়...

বোট এগিয়ে যাচ্ছে। বাপ্পিদা নানান কিসিমের গল্প করছে। তার গল্পের প্রতিটা টার্নিং পয়েন্টে একবার করে ঝাড়ি দিচ্ছেন মুস্তাফিজ ভাই, বলছেন চাপা... চাপা... বাপ্পিদা চরম ধৈর্য্যের সাথে সেটা মোকাবেলা করে গল্প চালিয়ে যাচ্ছেন। হাত তুলে দেখালেন একটা সাদা কাপড় লটকে আছে। ১০/১৫ দিন আগে এখান থেকে একজনকে বাঘ তুলে নিয়ে গেছে। বছর পাঁচেক আগেও লোকটাকে বাঘ ধরেছিলো। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে রক্ষা পায়। তাকে উদ্ধার করেন বাপ্পিদা। এরপর সে বিয়ে করেছে, তার সংসার হয়েছে, সন্তানের পিতা হয়েছে সে। তারপরও নিয়তিকে হার মানাতে পারেনি। তার বউ এর আঁচল কিংবা ফুটফুটে দুই কন্যার মায়াবি হাতের বাঁধন তাকে ধরে রাখতে পারেনি। দুদিন পর গামছায় বেধে তার লাশ নামের অবশিষ্ঠ মাংশের খণ্ড গভীর বন থেকে নিয়ে এসেছেন বাপ্পিদা! সুন্দরবনের অসীম সাহসী লোকটাকে গল্প করতে করতে বেদনাহত হতে দেখি, দেখি তার চোখে ঝিলিক দেয়... তার সাথি আতিয়ার, যে কী না ভাবলেশহীন মুখে পরের চারটা দিন শুধু গালই খেয়ে গেছে, তাকেও দেখে মনে হয় বেদনায় আহত এক মানুষ। তবে সেটা মুহূর্তের জন্যই বুঝিবা। এক গল্প থেকে আরেক গল্পে দ্রুতই ঘুরে ফেরে বাপ্পিদার কণ্ঠ। আমি মুগ্ধ হই। মুস্তাফিজ ভাই মজা করেন।

৮.
নদীর জল কেটে এগিয়ে চলে বোট। গভীর বনে প্রবেশ করছি আমরা। দুপাশে সবুজ আর সবুজ। সেইসব গাছ কোথাও কোথাও একি মাপে নিচ থেকে ছেটে রাখা। মনে হয় কোন যত্নশীল মালি গাছগুলোকে সাজিয়ে রাখছে। না, সেরকম কেউ নেই এখানে। কাজটা করেছে হরিণ! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাছের যতটা উঁচুতে গলা তোলা যায় ততটাই সাবাড় করে দিয়েছে। তাতেই একরেখায় থেমে আছে পাতার সীমানা। সেইসব গাছের ফাঁকে হাঁটতে দেখা যায় হরিণের পালকে। যারা মাঝে মাঝে করুনা করে আমাদের দিকে তাকায়, নয়তো দৌড়ে ঢুকে যায় আরো গভীর বনে।

একের পর এক নদী খাল পেরোচ্ছি আমরা। সেসবের নামেরও নানা বাহার। কখন কোনটা পেরিয়েছি মনে নেই। একটু আগে মুস্তাফিজ ভাইর কাছ থেকে লিস্ট নিলাম সেসবের। নামগুলো দিয়ে দিই, বুড়ি গোয়ালনী, খোলপুকুর, শাকবাড়ীয়া, হংসরাজ, মাইট্যাভাড়ানী, কেওড়াশুটি আর বালির গাঙ। এরমাঝে দু একটা খালও আছে। তবে আমার সবগুলারেই নদী বলে মনে হয়েছে।

৯.
সূর্যটা প্রথম দিন কোন নদীতে ডুবলো? সে যে নদীই হোক, অপূর্ব ছিলো সেই দৃশ্য। সূর্য ডোবার নানান কিসিমের বর্ণনা আছে। ধপ করে ডুবে যাওয়া, যাচ্ছি যাবো করেও অনেকক্ষণ থেকে তারপরে ডুবে যাওয়া। আসলে এসব দৃশ্য এতো বেশি একরকম যে নতুন করে বলার কিছু নাই হয়তো। তবু সুন্দরবনে রোজ রোজ এমনভাবে সূর্য ডুবতো আর উদয় হতো সেটা শুধু দেখতেই হয়। কিছু বলা যায়না। বর্ণনা দেয়া যায় না। বর্ষায় সুন্দরবন থেকে ফিরে এল নজরুল ভাইরে জিগাইলাম কেমন দেখলেন, সে মহা উত্তেজিত হয়ে বল্লো, - 'এইটা বলা যাবে না। বলার মতো না। বলে কেউ শেষ করতে পারবে না। খালি অনুভব করতে হয়। আপনে না গেলে এইটা বুঝাইতে পারবো না।' তার কথাটা যে কতো সত্য সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে আমায় সুন্দরবনের জল ও প্রকৃতি। চাঁদ ও সূর্য। সূর্যের লালিমা দেখে আমি একটা এস এম এস লিখলাম। সেন্ড করলাম। অনেক্ষণ লাফালাফি করে মোবাইল একটা মেসেজ দিলো উল্টা, মেসেজ সেন্ড ফেইল্ড! স্ক্রিনে তাকালাম, সেখানে লেখা লিমিটেড সার্ভিস... এইবার তবে বনবাসই হলো আমার...

(চলবে)


Friday, September 11, 2009

অবাক হওয়া রাত এবং অক্ষমতার গল্প

অবাক করা সব কাণ্ড ঘটতে থাকে। অন্তত আমি অবাক হই। রাত দুইটা খুব বেশি রাত নয় আমার জন্যে। গত দশ বছর ধরে এই সময়টার ধারে কাছে বাড়ি ফিরি। আজও ফিরেছিলাম। দরজা খুলে দিলো বউ। প্রথম অবাক করা ঘটনা হলো এটা। আমাকে কেউ দরজা খুলে দেয় না। একটা চাবি আছে আমার। সেটা দিয়ে সদর দরজা খুলি। আর ভেতর বাড়িতে তালা টালা দেয়ার নিয়ম নেই আমাদের। আজ সেই নিয়মের ব্যত্যয় হলো। আমাদের কোনো কথা হলো না, সাধারণত হয়ও না। আমি বউকে পাশ কাটিয়ে শোবার ঘরে চলে এলাম। বিছানায় আমার পাঁচ বছর বয়েসি মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে।

আমার কাঁধে একটা ব্যাগ থাকে সবসময়। এখন এই ব্যাগের কোনো দরকার নেই। তবু থাকে। অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে। মান্নাদা একবার বলেছিলো, এই ব্যাগ ছাড়া নাকি আমি অসম্পূর্ণ। আমারো তাই মনে হয়। দরজার ফাঁকে একটা তাক আছে। সেখানে ব্যাগ রেখে লুঙ্গিটা খুঁজি, সেটা নেই। লুঙ্গি খুঁজবো বলে ঘুরে দাড়িয়ে আমাকে দ্বিতীয় দফায় অবাক হতে হয়। বউ লুঙ্গি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণত আমি অবাক হই না। আমার সে ক্ষমতা লোপ পেয়েছে অনেক আগে। তবু আজ বার বার অবাক হতে হয় আমাকে।

গরম পড়েছে খুব। শরীর চ্যাটচ্যাটে হয়ে থাকে সবসময়। গোসল করতে হয় বাইরে থেকে ফিরে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি ঘরের বাতি তখনও জ্বলছে। বউ বিছানায় নেই। অন্যদিন এটা জ্বলে না। আমি ডিমলাইটের আলোতে পা টিপে টিপে খাবার টেবিলে যাই। সেখানে খাবার ঢাকা দেয়া থাকে। ঠান্ডা ভাত আর তরকারি গলায় সেধিয়ে দিয়ে আমি ঘুমের আয়োজন করি। আজকে সেসব কিছুই হলো না। টেবিলে ভাত বেড়ে বসে আছে রোমানা। আমি বসতেই প্লেটটা এগিয়ে দেয় সে। এসব দেখে আমার ভেতর ঢং ঢং করে কি একটা বাজনা বাজতে থাকে। ধ্রিম ধ্রিম করে কি একটা বাজনা বাজে আমার বুকে।

প্রায় নিঃশব্দেই খাবার শেষ করি। মাঝখানে রোমানা ডাল তুলে দিতে চাইলে আমি না বলায় খাবারের টেবিলটা মূলত নিঃশব্দ থাকে না। শোবার ঘরে ফিরে আমি ইতস্তত করি। আমার কেনো যেনো বার বার মনে হয়, আজ রাতটা অন্যরকম। আজ অন্যরাতের মতো নিঃশব্দে শুয়ে পড়া যাবে না। মায়াবীর পড়ার টেবিলে বসি আমি। রঙ-বেরঙের বই দিয়ে সাজানো মায়াবীর টেবিল। টেবিলের এক কোনায় নীল রং এর একটা টেডি বিয়ার বসে আছে। ওর প্রথম জন্মদিনে এটা পেয়েছিলো সে। শান্তনু দিয়েছিলো এটা। এর ঠিক পাশেই একটা মগ। সেখানে বন্ধুতা নিয়ে কী একটা কথা লিখা। এটাও জন্মদিনের উপহার। রূপা দিয়েছিলো। বিষয়টা মাথায় আসতেই হাসি পায় আমার। বাবা-মায়ের সাবেক প্রেমিক-প্রেমিকারা কেমন ভালোবাসে মায়াবীরে.. আমার হাসিটা মনে হয় ঠোঁটের কিনারায় অনেকক্ষণ লেগে ছিলো। আমি মনে হয় অনেক বেশি মৌনতায় ডুবে গিয়েছিলাম। তাই খেয়াল করিনি রোমানা ফিরেছে। হাসছো কেনো? প্রশ্নটা শুনে ফিরে তাকাই। রোমানা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি মাথা নাড়ি। এর কোনো মানে নেই। কোন উত্তরই বহন করে না এই মাথা নাড়াটায়। রোমানও সেটা বোঝে, সে কথা বাড়ায় না। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে, তারপরই বলে সেই কথাটা। যেটার অপেক্ষা করছি আমি- তোমার সাথে আমার কথা আছে...

আমাদের কথা হয় না কতদিন হয়ে গেলো। হ্যাঁ, কথা হয় না। আমরা সপ্তাহের দু’তিনদিন খুব প্রয়োজনে যেসব বাক্য বিনিময় করি, তাকে ঠিক কথা বলার পর্যায়ে ফেলা যায় না। সকালে আমি যখন বেরুই। সেটা ন’টা কিংবা দশটা হতে পারে। দশটা হলে আমাদের দেখাই হয় না। ততক্ষণে রোমানা অফিসে চলে যায়। ন’টা হলে আমাদের দেখা হয়। আমিও বেরোই, সেও বেরয়। ওর জন্যে একটা রিক্সা ঠিক করা আছে। সাড়ে আটটার পরে পরে চলে আসে। মায়াবীকে স্কুলে নিয়ে যায় ওর ছোট চাচা। স্কুলে দিয়ে সে ইউনিভার্সিটিতে চলে যায়। বাড়ী ভর্তি মানুষের সামনে অভিনয় করতে হয় তখন। সুখী দম্পতির মতো রিক্সায় চেপে বসতে হয়। আমি বাজার পর্যন্ত আসি। খুব কাজ আছে এমন ভান করে নেমে যাই। রোমানা মনে করিয়ে দেয়, বারটায় মায়াবীর স্কুল ছুটি হবে। আমি মাথা নাড়ি কোনোদিন, কোনোদিন মুখ খুলে বলি, সময়মতো পৌছে যাবো।

রোমানা কথা শুরু করে। কেমন আছো তুমি? একেবারে অপ্রাসঙ্গিক একটা প্রশ্ন। আমার ভালো থাকা কিংবা খারাপ থাকাতে তার কিছু আসে যায় না। একইভাবে তার বেলাতেও সেই কথা খাটে আমার কাছে। তবু সে প্রশ্নটা করে। আমি বুঝি ভেতরে ভেতরে অন্যকিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে রোমানা। কিন্তু বলার মতো পরিবেশ মনে হয় পাচ্ছে না। এটাও একটা অবাক করা বিষয়। আমাদের মাঝে কথা বলার এমন কোনো বাধা নেই। সম্পর্ক এমন কোনো আহামরি জায়গাতে লটকে নেই যে, তিতা মিঠা কিছু বলতে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবু রোমানাকে ইতস্তত করতে দেখি। কথা আছে বলেও সে কথা বলে না। মায়াবীর কাছে যায়। তার কোলবালিশটা ঠিক করে দেয়। কপালের অদৃশ্য ঘাম মুছে দেয়। আমি অপেক্ষা করি।

ঘরের দেয়ালে থাকা ঘড়িটা টিক টিক শব্দে জানান দেয়, সে চলছে। টিক টিক শব্দ জানান দেয়, আমাদের নীরবতায় ভারী হচ্ছে এই ঘরের পরিবেশ। ঘরময় আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে ঘড়ির টিক টিক শব্দ। আমি রোমানাকে দেখি। আরো উজ্জল হয়েছে তার গায়ের রঙ। মা এই রঙ কে বলেন দুধে আলতা। দুধে আলতা কি খুব সুন্দর কোনো কম্বিনেশন? রোমানাকে দেখলে তাই মনে হয়। কিন্তু দুধ সাদা টাইলস জুড়ে ছড়ানো আলতার মতো রক্ত দেখে আমার সেটা মনে হয়নি। এমন একটা দৃশ্য দেখেছিলাম শাহজালালের দরগাতে। গ্রেনেড চার্জ করে মানুষ মারা হয়েছিলো। নতুন বিছানো সাদা রঙের টাইলস জুড়ে ছিলো রক্ত আর রক্ত। বীভৎস... সেই রাতে অফিস থেকে ফিরেছিলাম জ্বরগ্রস্ত হয়ে। শরীর পুড়ে যায় যেনো। রোমানা সারারাত জেগে ছিলো। আশ্চর্য মোহন শরীরে সে আমারে জড়িয়ে ধরে রাত পার করে দিয়েছিলো। তখন আমরা একজন আরেকজনকে এভাবেই আঁকড়ে ধরে থাকতাম। আমরা নিজেদের পাঠ করতাম কবিতার মতো- প্রতিদিন, প্রতিরাতে।

মায়াবী নড়ে চড়ে উঠে। রোমানা গালটা ছোঁয়ায় তার নাকে। তার পর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, মায়াবী, হিসু করবে, মায়াবী... মায়াবী ঘুমের মাঝেই শরীর মুচড়ে বলে, হ্যাঁ। রোমানা আমার দিকে তাকায়। আমি আস্তে আস্তে মায়াবীকে কোলে তুলি। বাথরুমে নিয়ে যাই। রোমানা ওকে কমোডে বসিয়ে ধরে থাকে। ঘুম জাড়ানো চোখে মায়াবী আমাকে দেখে। হাসে। আমি বলি, কিরে তোর দাত দেখি সব গেলো। মায়াবী আবার হাসে, জড়ানো কণ্ঠে বলে, তুমি আমার ছাতা চকলেট আনছো? আমি জিহ্বা অর্ধেক বের করে মাথায় হাত দিই। এইরে ভুলে গেছি। কাল ঠিক নিয়ে আসবো। মায়াবী রাগ করে। বলে, তুমি রোজ রোজ ভুলে যাও কেনো বাবা? তার ঘুম চলে গেছে। চোখ দেখে বুঝি, সেখানে জমেছে রাজ্যের বিষাদ। আমি আবার তার মন ভজানোর চেষ্টা করি। কালকে ঠিক ঠিক নিয়ে আসবো। একদম ভুল হবে না। মায়াবীকে আমার কোলে দিয়ে রোমানা বলে, যাও শুয়ে পড়ো তোমরা।

মায়াবী আমার বুকের ভেতর লেপ্টে থেকে বলে, বাবা তুমি কি একটা গবেট স্টুডেন্ট? আমি বলি, কেন রে? সে আবার আমার চোখে তাকায়, ডিমলাইটের আলোয় দেখি দুষ্টুমি ভরা চোখ, বলে, এই যে রোজ রোজ ভুলে যাও। আমাদের মিস্ বলেছেন, যারা সবসময় ভুলে যায় সবকিছু, তারা গবেট স্টুডেন্ট। আমি মায়াবীকে বুকে চেপে বলি, হ্যাঁ, তোর বাবা একটা গবেট, সে সবকিছু ভুলে যায়। তার মাথায় গোবর ভর্তি। মায়াবী হাসতে থাকে বুকের ভেতরে। আচমকা সেই হাসি থামে। মায়াবী আমার বুকে তার কোমল হাত বুলাতে বুলাতে বলে, বাবা সত্যি করে একটা কথা বলোতো, তুমি কি ভুলেই গেছো না তোমার পকেটে টাকা নেই? আমি কেঁপে উঠি। আমার চিন্তাশক্তি স্থির হয়ে যায় যেনবা। ভাঙা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করি, কেন রে, তোর এটা মনে হলো কেনো? মায়াবী আমার সেই প্রশ্নে উত্তর দেয় না। কুট কুট করে বলে, বাবা আমার মাটির ব্যাংকটা তোমাকে দিয়ে দেবো, তুমি সেটা নিয়ে যেও। ওতে অনেক টাকা আছে... আমার হু হু করে কান্না আসে, সেই কান্না চেপে রাখতে গিয়ে মায়াবীরে বুকের মাঝে চেপে ধরি আরো শক্ত করে। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখি রোমানা আমার দিকে জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। এই চোখটা আমি চিনি না। এই চোখের সাথে আমার পরিচয় হয়নি কোনদিন।

কখন ঘুম জড়িয়ে আসে চোখে টেরও পাইনা। ঘামে শরীর ভিজে গেলে ঘুম ভাঙ্গে। ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে। রোমানা বসে আছে মায়াবীর পাশে। হাতে একটা পাখা। আমাকে বলে, তুমি ঘুমাও, আমি বাতাস করছি। ঘুম আর আসবে না। আমিও উঠে বসি। জিজ্ঞেস করি, কতক্ষণ ধরে গেছে? আধঘন্টা হবে বলে জানায় রোমানা। বিছানা থেকে নেমে জানালার পর্দা সরিয়ে দেই। ভারি পর্দা জানালা জুড়ে। ঘরে বাতাস আসে বাধা সরে যাওয়ায়। আকাশের রঙ পাল্টে যাচ্ছে। একটা সাদা সাদা ভাব তাতে। তারাগুলো মিটমিটে। ঘড়িতে তাকাই। সাড়ে চারটা বাজে। জানালায় দাঁড়ানো বলে বাতাস লাগে। ঘামে ভেজা শরীর শিরশির করে উঠে। তবু ভালো লাগে খুব। রোমানা কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো আমাকে, সেটা মনে পড়ে আমার। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই জিজ্ঞেস করি, তুমি কিছু একটা বলতে চেয়েছিলে আমায়... রোমানা কিছু বলে না। পাখা ঘোরার হালকা শব্দটা চলতেই থাকে। একটুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘুরে দাঁড়াই, তুমি কি এখন বলবে, কী যেনো বলতে চেয়েছিলে? রোমানা অস্ফুটস্বরে বলে, না। এখন আর বলবো না। কালকে কি তোমার সময় হবে সকালে? অফিস যাওয়ার সময় কি তুমি আমার সাথে বেরুতে পারবে? আমার কোনো সমস্যা থাকার কথা না। আধাঘন্টা পরে বা আগে বেরুলে আমার এমন কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয় না। তবু কথাটা এখনই শুনতে ইচ্ছে করে আমার। সেটা বলি রোমানাকে। এখনই বলো, আমি শুনতে চাই। রোমানা আবারও মানা করে,- থাক দরকার নেই। সকালেই বলবো। আমি বলি, না, এখনই বলো। তুমিতো রাতেই বলতে চেয়েছিলে। মায়াবী না উঠলে এতক্ষণে বলা হয়ে যেতো। বলে ফেলো। রোমানা বিব্রত হচ্ছে, স্পষ্টতই টের পাই। আমি আবারও অবাক হই। আমাকে কিছু বলতে সে বিব্রত হবে কেনো?

ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে। ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে ফ্যানের বাতাস। রোমানা উঠে এসেছে বিছানা ছেড়ে। আমার পাশে দাড়িয়েছে সে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। টুক টাক কথা হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না, রোমানা এতো সময় নিচ্ছে কেনো? তবু অপেক্ষা করি। এভাবে পাশাপাশি দাড়িয়ে থাকতে খুব একটা খারাপ লাগছে না। পরিচিত ঘ্রাণটা অনেক কাছে থেকে পাচ্ছি। এই ঘ্রাণ একসময় আমাকে পাগল করে দিতো!

তুমি কি মনে করো আমাদের জীবনটা এভাবেই, এই অস্বাভাবিকভাবে কেটে যাবে? রোমানার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আমার কাছে। সে তার অপেক্ষাও করে না। কথার পিঠে কথা বলে যায়, এভাবে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে অভিনয় করে যাওয়া খুব কষ্টকর। আমি তার কথা মেনে নেই মনে মনে। অভিনয় করাটা আসলেই কষ্টের। কিন্তু আমরা সেটাই করে যাচ্ছি দীর্ঘদিন ধরে। আমরা দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে যাই, যেটার খুব দরকার নেই। দরজার আড়ালে কিছু করার মতো জীবন আমাদের নেই। আমরা পাশের বাড়ির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে একসাথে যাই। পাশাপাশি বসি, হাসি, হাসাই। মায়াবীর স্কুলে প্যারেন্টস'ডে তে একসাথে গেলাম সেদিন। স্কুলের প্রিন্সিপাল আমাদেরকে আলাদা খাতির করলেন। রোমানার কাছ থেকে 'কার লোন' নেয়ার ব্যাপারে কি কি করতে হবে তা জেনে নিলেন। আমার সাথে বললেন রাজনীতি নিয়ে। কথা শেষে দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। একফাঁকে বললেন, আমাদের দুজনকে নাকি তিনি খুব পছন্দ করেন। দারুণ লাগে আমাদের জুটিকে। আমরা লজ্জা পাওয়ার চেষ্টা করলাম সেটা শুনে। মায়াবীকে নিয়ে সেদিন দুপুরে আমরা ভালো একটা রেস্টুরেন্টে খেলাম। তারপর রোমানা চলে গেলো অফিসে, আমি মায়াবীকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম। এক রিক্সায় চেপেই আমরা রোমানার অফিস অব্দি গেলাম। তাকে নামিয়ে দেয়ার আগে ব্যাগ থেকে একশ টাকার একটা নোট বের করে সে আমার হাতে দিলো, ভাড়া দিও। আমি বললাম, ভাড়া আছে আমার কাছে, তবু সেটা আমার হাতে গুজে দিতে দিতে বললো, থাকুক। কাজে লাগবে... এই, এই হলাম আমি। বাচ্চার রিকশা ভাড়ার টাকাও আমার কাছে থাকে না।

রোমানা কথা বলতে বলতে মায়াবীর চেয়ারে গিয়ে বসেছে। ফ্যানের বাতাসে তার চুল উড়ছে। আগে অনেক লম্বা চুল ছিলো তার। কোমর পর্যন্ত যেতো। এখন সেটা ঘাড়ে এসে ঠেকেছে। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই। রোমানা এখন পর্যন্ত যা বলেছে তার বিরুদ্ধে দাড় করানোর মতো কোনো যুক্তিই আমি দিতে পারি না। আমার কাছে কোনো উত্তরই নেই, এমনই কঠিন সেইসব প্রশ্নমালা। 'তুমি বলতে পারো, এতো ভাব কেনো তোমার?' এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। আসলেইতো এতো ভাব হবে কেনো আমার? কোন শক্তিতে আমি ভাব ধরি? তিন বছর ধরে আমি বেকার, রোমানা নানা ভাবে আমাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে, তার সেই চেষ্টা সফল হয়নি। হতে পারেনি। কারণ আমি তাকে সেভাবে সহযোগিতা করিনি বা করতে পারিনি। তার ক্লায়েন্টদেরকে ধরে ধরে আমাকে এটা সেটা করার পথ বাতলে দিয়েছে। আমি সেইসব শেখানো পথে হাঁটিনি। স্বপনের চায়ের দোকানে বসে দুনিয়া উদ্ধার করেছি আমি। রাতের পর রাত আমি পড়ে থাকি পার্টি অফিসে। আমি মিছিল করি, মারামারি করি আর দুনিয়া ছাড়া ভেজাল নিজের কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরি। আমার জন্যে বাড়িতে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারে না রোমানা। নিজের অক্ষমতার কথা আমি ছাড়া আর কে জানে অধিক? জানে না, কেউ জানে না। রোমানা তবু বলে সে অনেক বেশি জানে আমাকে। সে বোঝে আমাকে দিয়ে আর কিছুই করা সম্ভব না। তার জীবনটা বিষিয়ে দেয়ার পর নাকি আমার আর কিছু করারও থাকতে পারে না। এইখানে আমারও কিছু বলার থাকতে পারে। আমি হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারি, যে জীবনটা কি একা তারই বিষিয়েছে নাকি আমিও এক বিষণ্ন জীবন পার করছি দীর্ঘ দিবস ও রজনী ধরে। আমাদের মাঝে যে দেয়াল, যে বিচ্ছিন্নতা তা একা আমি তৈরি করিনি... না সেসব কিছুই বলা হয় না। যেহেতু নিজেকে অক্ষম মেনেছি আমি, তাই সব দায় ও দেনা আমাকেই মাথা পেতে নিতে হয়। এটাই নিয়ম। আমি নিয়ম মেনে রোমানার কথা শুনে যাই।

এই সকালটা অন্যরকম। একেবারেই অন্যরকম। আজ আকাশে মেঘ জমেছে অনেক। আমার মনে হয় আকাশের আজ মন খারাপ। এটা একটা বেহুদা ভাবনা। আকাশের মন খারাপ হওয়ার কী কারণ থাকতে পারে? আমার সংসার ভেঙে গেলে আকাশের কী ঠেকা পড়েছে মন খারাপ করার? তবু আমার সেটাই মনে হয়। এই মনে করার মাঝে আমার একটা আরামবোধ আছে। রোমানা এটাকেই মনে হয় 'ভাব' বলে। কিন্তু এসব ভাবলে চলবে না। আজ আমার অনেক কাজ। আজ রোমানার সাথে বেরুতে হবে আমাকে। তাকে নিয়ে যেতে হবে মায়াবীর স্কুলে। সেখান থেকে টি.সি নিতে হবে। মায়াবী আর এ স্কুলে পড়বে না। সে তার মায়ের সাথে ঢাকায় চলে যাবে। আমি এটা মেনে নিয়েছি। না নিয়ে উপায় নেই। রোমানা বলেছে, মায়াবীর জীবন নষ্ট করার অধিকার আমার নেই। তাকে মানুষ করতে হলে রোমানাকেই করতে হবে। আমাদের পৃথকবাসের কথাও আমি মেনে নিয়েছি। এভাবে পাশাপাশি থেকে দারুণ মর্মযাতনায় বেঁচে থাকা যায় না। তারচে বরং দূরে থাকাই ভালো। আমার হেলাল হাফিজকে মনে পড়ে। প্রেম নাকি বিরহে উজ্জ্বল হয়। আমাদের দায়িত্বশীল সম্পর্কের মাঝে যদিওবা প্রেম ছিলো না তেমন, তবু এই লাইনটাই আমার মনে আসে রাতে। রোমানা খুব অবাক হয়, এভাবে আমি এক বাক্যে সব মেনে নিলাম বলে। সে হয়তো প্রতিরোধ আশা করেছিলো, তাই প্রথমেই বলে বসে, মায়াবীর জন্যে দরকার হলে সে আদালতে যাবে। আর সেখানে গিয়ে আমি হারবোই। কারণ, তিন বছরতক বেকার থাকা বাবার চেয়ে চাকরিজীবী মা অনেক বেশি নিরাপদ সন্তানের জন্যে। আমাকে সেসব না বললেও চলতো। আমি সেটা জানি। তাই কথা বাড়াইনি। মেনে নিয়েছি। সমস্যা ছিলো একটাই। মা। মাকে কীভাবে বিষয়টা জানানো যাবে সেটা নিয়ে আমি ভাবতে থাকি। রোমানাই আমাকে উদ্ধার করে। বলে, আগেই সে মাকে বলে রেখেছে, যে একটা ট্রেনিং এর জন্যে তাকে মাস তিনেকের জন্যে ঢাকা যেতে হবে। মায়াবীকে সাথে নিয়ে যাবে সে। মা সেটা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন। কাল বিকেলে তাই ট্রেনিং এর কথা বলাতে তিনি নতুন কোনো প্রশ্ন করেন নি। শুধু জিজ্ঞেস করেছেন, ঢাকায় গিয়ে রোমানা থাকবে কোথায়? মায়াবীর স্কুলেরই বা কি হবে। মুখস্থ বাক্যের মতো বুলি আউড়েছে রোমানা। বোনের বাসায় উঠবে। মায়াবীর স্কুলেও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এই বয়েসের বাচ্চাদের স্কুল ঢাকায় অনেক। সেটা নিয়ে বেশি না ভাবলেও চলে। আমার জন্যে তাই কোনো কষ্টই বাকি রাখেনি রোমানা।

মায়াবী রাস্তায় আমাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে। কেনো সে ঢাকা যাবে, কেনো দাদু তার সাথে যাবে না। কেনো বাবা এবার তাকে নিয়ে যাচ্ছে না... এমন হাজারো প্রশ্ন। আমি একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর দেই, হাঁপিয়ে উঠি সেসব উত্তর দিতে দিতে, তবু মায়াবীর প্রশ্ন শেষ হয় না। মায়াবী প্রশ্ন করে, এবার গেলে সে কবে ফিরে আসবে? স্কুল থেকে একেবারে নিয়ে এলাম কেনো। আমি এই প্রশ্ন দুটোর উত্তর দিতে পারি না। মেঘ জমা আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি শুধু বৃষ্টির জন্যে অপেক্ষা করি।

Tuesday, July 28, 2009

পাতা ঝরার আগের গল্প

জন্মের সময় ধুন্দুমার বাঁধিয়ে দিয়েছিলাম। মাকে নিয়ে জমে মানুষে টানাটানি। জম আর মায়ের মাঝখানে দাড়ালেন দুদু মই। নানা বাড়ির বুনিয়াদী ধাই। টেনে হিচড়ে বের করে নিয়ে আসা হল আমাকে। সাথে বেরিয়ে এল আরও কি সব যন্ত্রপাতি। মানুষ বানাবার কলঘরটা সেই থেকে নষ্ট। আমি বেড়ে উঠলাম অসুস্থ এক পরিবেশে। আম্মা কোন দিন আমারে শখ মিটায়া কোলে নিতে পারে নাই। বুঝতে শিখার পর থেকে আমি মা'র আশে পাশে ঘুরাফেরা করতাম। তার ঘ্রাণ নিতাম, কোলে চেপে বসতে চাইতাম। নেহার ফুপু আমাকে আগলে আগলে রাখতো। তাকে ফাঁকি দিতে পারলে মাঝে সাঝে মায়ের কোলে উঠা যেত। কিন্তু একটু লাফালাফি করে ফেল্লেই মা গলা ছাড়তো, ও নেহার কই গেলি, ময়না বাবুরে নিয়া যা।

মায়ের যেদিন শরীর বেশি খারাপ থকতো সেদিন খুব নিষ্ঠুরের মত বলতেন, নে'তো এই পান্ডারে। আমার জীবনটা নষ্ট করেও তার শখ মেটে নাই। এখন দরদ উঠা পেটে চাপ দেয় আবার। আমি মন খারাপ করে নেহার ফুপুর সাথে চলে যেতাম। পুকুর পাড় নয়ত পেয়ারা গাছের তলায় নিয়ে নেহার ফুপু আমারে মন ভুলানো কথা বলত। আমি সেইসব কথা শুনতে শুনতে কোন ফাঁকে মায়ের দেয়া কষ্টের কথা ভুলে যেতাম!

আমরা দু'ভাই বাজারের গলিতে গলিতে হাটতাম। স্কুল শেষে অথবা স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাজারে হাটাই ছিল আমাদের রোজকার কাজ। রবিবার ছিল হাটবার। সেদিন বন্যার পানি এলে হাওর যেমন ফুলে যায় সেরকম বাজারও ফুলে যেত। ভীড় বাট্টার মাঝে আমরা হারিয়ে যেতাম, আবার ফিরে পেতাম নিজেদের, আবার হারাতাম...

শারিবাদি শালসার বিক্রি দেখতাম দাড়িয়ে দাড়িয়ে। হেন অসুখ নাই যা ভাল হয় না এই অব্যার্থ ওষুধ খেলে। লোকটার মনোহর বর্ণনা শুনে রোজ ভাবতাম পরের হাটবারে দশ টাকা জমা করে, নিয়ে আসব একটা বোতল। কত হাটবার যায়, আমার আর দশ টাকা হয় না। দুই ভাই মিলে ঝুলে একবার সাত টাকা জমাতে পেরেছিলাম। তারপর সারাদিন সেই ক্যানভাসারের দোকানের সামনে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার বয়ান শুনেছি। দুপুরের দিকে যখন একটু ফাঁকা হলো সেই যায়গা, লোকজন খেতে গেল হয়ত। ক্যানভাসার লোকটাও উঠল। লাল টিনের বাক্সে তালা দিতে দিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে বল্ল, 'কিরে তোগো কোন কাম নাই? ইস্কুল নাই? কি করস এইখানে? 'আমার দু'ভাই অবলীলায় মিথ্যা বল্লাম। স্কুল নাই সেদিন। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, 'এই ওষুধ খাইলে পেটের বেদনা ভালা হয়?' লোকটা পাল্টা প্রশ্ন করে, 'তোর পেটে বেদনা? 'আমি বলি না, 'আমার মায়ের। 'কেমন একটা চোখ করে তাকায় সেই মানুষ। 'তোর মায়ের পেট কি ফোলা, অনেক মোটা হইছে? 'আমি মাথা নাড়ি। 'তাইলে? কয়দিন থাইকা বেদনা?'বড় ভাই কথা বলে, 'ওর জম্মের পর থাইকা আম্মার বেদনা'। লোকটা আবার কি যেন ভাবে। তারপর বলে, 'ওষুধ নিবি? 'আমরা দু'ভাই জমানো টাকা তুলে দেই তার হাতে। লাল বোতল নিয়ে যখন ঘুরে দাড়াই তখন আবার পেছন দিক থেকে ডাক শুনি। 'এই শুইনা যাও...' ময়লা পাঁচ টাকার নোট টা ফিরিয়ে দিয়ে সে বলে, 'নাও, খালি বোতলের দাম রাখলাম, তোমরা ছোট মানুষ। মা, ভাল হইলে আমার লাইগা দোয়া কইর। 'ঘোর লাগে আমাদের। আমরা ভুলে যাই পাঁচ টাকায় আল-আমিন কোম্পানির বিস্কুট পাওয়া যায়। দু'ভাই সামনে যেতে যেতে পেছনে ফিরে সেই লোকটাকে দেখি কয়েকবার।

আব্বা প্রথমেই ক্ষেপে যায় এইজন্য, যে সারদিন স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমরা বাজারে ঘুরেছি। টাকা কোথায় পেলাম সে জন্যও সে ক্ষেপে। আর সবচে বেশি ক্ষেপে, বাজারে গিয়ে ক্যানভাসারদের কাছে বসে থাকি এটা জানতে পেরে। আম্মাও রাগ করে। নেহার ফুপুর হাতে বোতলটা দিয়ে বলে, এটা যেন সে রান্নাঘরের পেছনের দিকে ফেলে দেয়। আব্বা আমাদের পিঠে ইচ্ছেমতো বেত ভাঙ্গে। বেতের বাড়িতে আমি হউমাউ করে কাঁদি। ভাইয়া আমারে আগলাতে যায় আর আহ, উহ করে। নেহার ফুপু দুর থাইকা দাড়িয়ে দাড়িয়ে চোখ মুছে। সেই সময় বড় আপা স্কুল থেকে না ফিরলে, তার পাট কাঠির মত নরম হাতে আমাদের আগলে না ধরলে আর একি সময়ে আম্মার কান্না গলায় মিনতি না ঝরলে সেদিন আমাদের হয়ত মেরেই ফেলত আব্বা। পরদিন থেকে আমাদের আর স্কুল ফাঁকি দেয়া হয় না। আমরা আর বাজারের গলিতে হাটতে পারিনা। আমার সেই ওষুধের জন্য মন খারাপ করে। বার বার মনে হয়, ওষুধটা খেলে আম্মা হয়ত ভাল হয়ে যেতেন। ক্যানভাসার লোকটাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করতো আমার।

নেহার ফুপুর বিয়ের রাতে হ্যাজাকের বাতি আনা হয় বাড়িতে। চারটা হ্যাজাক জ্বলে সবুজ কাপড়ে বাঁধা প্যান্ডেলের ভেতর। কালো কুচকুচে বরটা বার বার জিহ্বা দিয়ে তার ঠোট ভিজায় আর এই দিক সেই দিক তাকায়। মাঝে মাঝে চালের বস্তার ফাঁকে ইদুর যেমন মাথা বের করে, আবার ঢুকায়, সেরকম একটা ভাব যেনো। নেহার ফুপুর জামাইরে দেখে আমার শুধু ইদুরের কথা মনে হয়। আম্মা সেদিন নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছিল। বড় আপা পরেছিল জরি বসানো একটা জামা। হ্যাজাকের আলোয় সেই জরি বার বার চকমক করছিল। আমার চোখ ঝলসে উঠেছে অনেকবার। সেই ঝলসানো চোখে আমি দেখেছি কবির ভাই বড় আপাকে টানতে টানতে দেউড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বড় আপা অস্বস্থিতে একবার বল্ল আহা, ছাড়তো, আমি আসছি, তুমি যাও...

ভোর রাতে আব্বা কোলে করে নিয়ে গেল আমাকে একেবারে সদর দরজা পর্যন্ত। নেহার ফুপু জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠে। আব্বা অনেক কষ্টে, এমনকি একটা ধমক দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে বিদায় করে। লাল দাদা নেহার ফুপুরে পালকিতে তুলে দেয়। পালকি চলতে থাকলে, আমার চোখও ভিজে যায়। আব্বা আমারে বড় আপার কোলে দিয়ে উঠানের কাজে লেগে পড়ে।

ফুপু চলে গেলে পরে আমাদের বাড়িতে রোদ কেমন ম্রিয়মান হয়ে যায়। পুকুর পাড়ে কিংবা পেয়ারা তলায় আমার আর যাওয়া হয় না। বড় ভাই রোজ বিকালে ফুটবল খেলতে যায়। আমারে দু'একদিন যেতে বলেছে। যাইনি। এখন আর বলে না। আমি ঘরে বসে বসে মায়ের যন্ত্রনাক্লিষ্ট মুখ দেখি। বড় আপার সেলাই দেখি। সাদা রুমালে বড় আপা ছোট ছোট পাতার নকশা ফুটিয়ে তুলে। বিস্ময় নিয়ে আমি সেই কারুকাজ দেখি। কিন্তু রুমালটা তৈরি হয়ে গেলে আর খুঁজে পাই না। কোথায় সেটা লুকিয়ে ফেলে বড় আপা।

মাঝে মাঝে দুপুরের পর বেলাদি বেড়াতে আসে আমাদের বাড়ি। বেলাদি বেলি ফুলের তেল দেয় মাথায়। পাশে গেলেই সেই ঘ্রাণ পাওয়া যায়। ঘরে এলেই মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তার হাতটা কেমন তুলতুলে, নরম, মখমলের মত। বেলাদি এলে আমি তার পাশে পাশে ঘুর ঘুর করি। কিন্তু বেশি সময় থাকতে পারি না। বড়আপা বলবে, কিরে তুই আমাদের মাঝে কি করিস? যা এখান থেকে, খেলতে যা। আমি বলি, একা যাব কীভাবে? বড়ভাইতো চলে গেছে। বেলাদি বলে, কেনরে, সজল তোকে নেয়না সাথে? আমি মিথ্যে মিথ্যে মাথা নাড়ি। আপা ধমক দেয়, আরে রাখ, এই ছেলে ঘরকুনো, যেতেই চায় না। এই যা ভাগ, মায়ের কাছে যা। আমার মাথায় ঢুকে না, কি এমন কথা আছে তাদের যা আমি শুনতে পারব না? বেলাদি আমায় বলে, তুই বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসিস। কনক, রাজুদের সাথে খেলবি।

বেলাদির মাথায় একরাশ ঘনকালো চুল । রাজ্যের বিস্ময় মাখানো একজোড়া চোখ ছিল তার। তখন অবশ্য অতটা বুঝতামনা। শুধু চোখ গুলো দেখতে আমার ভিষন ভালো লাগত।

আমাদের বাড়ির উত্তর সীমানায় ছিল একসারি কদম গাছ। তার পরই শুরু বেলাদিদের বাড়ি। সীমানা থেকে ঘর অবধি যেতে বেশ লম্বা একটা ফাঁকা যায়গা ছিল। মখমলের মত বিছানো সবুজ সবুজ সেই ঘাসের মাঝখানে ছিল বেশ বড় একটা পাথর। অনেকটা বেদীর মত। সাদা রঙের সেই পাথরে বসে রোজ বিকেলে বেলাদি রবীন্দ্রনাথের বই পড়ত। মাঝে মাঝে সুনীল।
আমরা সব বালকের দল সেই ফাঁকা যায়গায় খেলা করতাম। গোল্ল্লাছুট খেলা হত। পাথরের সেই বেদীটাকে কেন্দ্র ধরে আমরা ঘুরে ঘুরে ছড়া বলে একসময় দিতাম ভু দৌড়। আমরা আসলে বেলাদিকে ঘিরেই ছড়া কাটতাম।

ওই বয়েসে আমরাতো আর দুরে কোথাও যেতে পারতামনা। তবে আস্তে আস্তে আমাদের দৌড় বড় হতে থাকে। বেলাদিকে ঘিরে ছড়া বলার সময় ফুরুতে থাকে। গ্রামের শেষে যে মাঠ, তারও পরে যে পরিত্যাক্ত জমিদার বাড়ি। সেইসব গলিঘুপচিতে ভাগ হতে থাকে আমাদের শৈশব।

কনক, নিলু, রাজু সবাই খুব সহজেই রোজ রোজ চলে যেত সেইসব অচেনাকে চিনতে। আমার যাওয়া হতনা। কি এক পিছুটানে আমি রোজ বেলাদির উঠোনে ঘুর ঘুর করতাম। আমার শুধু মনে হত আবার আমার বন্ধুরাসব ফিরে আসুক সবুজ এই মখমলে। আমরা লোকুচুরি খেলায় মাতি। হাতের বইটা পাশে রেখে বেলাদি আমাদের মাঝে যে চোর হল তার চোখটা চেপে ধরুক। (হাতের ছোঁয়া পাব বলে আমিই হতাম নিয়মিত চোর।) অথবা আমরা তাকে ঘিরে আবার ছড়া আউড়াতে থাকি। কেউ সে মনোডাকে সাড়া দেয়না! আমি থাকি সেই ছোট্ট মাঠে।

আমাকে ঘুরতে দেখে বেলাদি মাঝে মাঝে বলে, কিরে তোর খেলা নাই? আমি মাথা নাড়ি। বেলাদি হাসে। মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকি। হাত ইশারায় কাছে ডাকে বেলাদি। আস্তে আস্তে এগিয়ে যাই। মাথার চুলগুলো বিন্যস্ত করতে করতে বেলাদি বলে, যা খেলতে যা। সন্ধায় ঘরে যাওয়ার সময় আমাকে দেখে যাবি!

আমি দৌড় দিই। বেলাদি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই আমি আতরের ঘ্রান পেয়েছি। সেই ঘ্রানটা সঙ্গি করে আমি দৌড়াই।
(এই লেখার অংশ বিশেষ কারো কারো পড়া থাকতে পারে। সচলে আমার ব্লগের প্রথম দিকে তোলা আছে। বাকিটা নতুন। ইদানিঙ লিখতে পারি না। হাপিয়ে উঠি। অভিমান করে পালিয়ে যাওয়া শব্দদেরকে বশ মানানোর চেষ্টা করছি।)

Monday, July 20, 2009

মিহিদানা

১.
বোধের জ্বালামুখে কড়িকাঠের আদর দিতে নেই
অগ্নুৎসব শুরু হয় তাতে, অভিমানে গলে যেও না।
এইসব ভড়ং তোমাকে বিভ্রান্ত করার কৌশল ছাড়া
আর কিছুই নয়।


২.
কারো কারো মন খারাপেরও অধিকার নেই,
কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাসের জন্যেও কাঙাল থাকে।


৩.
আধার হলেই আদরে ধরে, নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ নিতে ইচ্ছে হয়...

Saturday, June 27, 2009

বন্ধ্যাসময় ১

আঙুলের টোকায় জেগে ওঠা অক্ষর
আর শব্দে পরিণত হয় না। সকলি তবে
গরলে ভেসেছে। আলবাব মৃত আজ, কবিতা
কিংবা সংসার সবখানে বেজেছে ছুটির ঘন্টা,
অকপট বাক্যবন্ধুরা পালিয়েছে, মদেমত্ত হয়ে
তুলেছে সুর মৃদঙ্গে,
আমি সকল সুর হতে বিচ্ছিন্ন আজ,
মৃত মাছের মতো আকাশ দেখি...

Saturday, June 13, 2009

উপসংহার

একজন বল্লেন সকল দায় তোমার,

একজন কথা বলা বন্ধ করে দিলেন,

বাজারে ছড়ালেন নানান বদনাম।

অন্য আরেকজন বল্লেন, তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না,

অথর্বরা কিছুই করতে পারে না জীবনে।

আমি দেখলাম, জানলাম, ব্যবহার শেষে মানুষ

ময়লার ঝুড়িতে ফেলে ন্যাপকিন, অবহেলায়।

তারচে বেশি ঘৃনা নিয়ে মানুষ, মানুষকে ছুড়ে ফেলে প্রয়োজন শেষে।

Saturday, May 16, 2009

খসড়া দিনলিপি

এই রাত, তার নগ্নতা। রতি ও শীৎকারে ভরপুর শহর,
এই শহরে আমি ভালো থাকি না।

তাহারা দয়ার্দ্র হয় না। মানবিক বেহিসাব নাই তাহাদের।
লীলাবতীরা নগ্ন রাতের মতোই।

যেন বা আমি খুব বেশি দাবী করি। যেন বা আমি
আশ্রয় খুজি রোজ রোজ, তারা পাত্তা দেয় না।
তারা বেজায় সাবধানী...

২.
একটা নদী আছে, জলে ধারণ করে নীলাকাশ
আমি বেদনায় নীল মানুষ এক। নারী তুমি কি নদী হবে?

এইসব নীল বেদনা ও ব্যাকুলতায় আমার কেন তোমাকেই মনে পড়ে...

Sunday, May 10, 2009

সকলি তবে অনুযোগে ভরপুর হে জননী আমার ...

মা ভেবেছিলেন সেবার তার মেয়ে হবে। জামা বানানো হয়েছিলো, সবাইকে তিনি আগাম বলে রেখেছিলেন তার মেয়ের কথা। কিন্তু সেই শীতে তার মেয়ে হয়নি। ধুন্দুমার বাঁধিয়ে, জীবন ও মৃত্যুর মাঝে তিনি এক ছেলেকে জন্ম দিয়েছিলেন। তার শারীরিক সকল সক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলো সেই শিশু। সেই থেকে সন্তান জন্মের ক্ষত ধারণ করতে হচ্ছে তাকে। সেই ধুন্দুমার লাগিয়ে, মাকে জন্মের মতো অসুখি করে পৃথিবীতে আসা শিশুটাই আমি।


গতকালকে হিসাব করে দেখি আবজাব নানান বিষয় নিয়া আমি লিখছি। তালছাড়া সব বিষয়। পত্রিকায় চাকরির জামানায় সম্পাদকীয় লেখার কাজ করছি যখন, তখনকার হিসাব ধরলে মাথা আউলে যায়। সেইসব সময়ে একবার মাত্র আমি মাকে নিয়ে লিখেছিলাম, মাত্র একবার, তাও ছদ্মনামে। পত্রিকার পাতায় নানান কিসিমের ফিচার ছাপাতে হয়, সেইরকম এক ফিলার ফিচার ছিলো সেটা। স্মৃতি ঘেটে দেখি সেই ফিচারে, সেই পাঁচশ শব্দে আমি আমার নিজের মায়ের কথা লিখিনি। একটা শব্দও সেখানে ছিলো না আমার মাকে নিয়ে। আমি মূলত মা দিবসের কিতাবি সওয়াল জওয়াবই বিবৃত করেছিলাম সেই লেখায়।


মা'কে নিয়ে আমি লিখিনি কেনো?


প্রশ্নটা মাথায় ঘুরে, ঘুরতেই থাকে। উত্তর খুঁজে পাই না। মায়ের সাথে কি আমার সম্পর্ক খারাপ? মাকে কি আমি পছন্দ করি না? মাকে নিয়ে কি আমার বলার কিছুই নেই? ভাবতেই থাকি। কিনারা পাইনা।

স্মৃতি ঘেটে দেখি সারাটা শৈশবে, মা আমার অসুখে অসুখে কাটিয়েছেন সেইসব সময়। আমার শিশুবয়েস থেকেই মা অসুস্থ। অনেক পরে জেনেছি সেই অসুখের কারণ আমি। আমাকে জন্মদিতে গিয়েই জরায়ুতে ক্ষত হয়েছিলো তার।

দুরাগত দিনপঞ্জির পাতা উল্টে দেখি, নানাবাড়ির টিলা ঘেসা হাওরে নৌকা চলে, সেই নৌকায় বড়মামা, আব্বা, লাল নানা মিলে মাকে তুলেন। ১০ তলা মাপের টিলা থেকে মাকে নামানো হয়েছিলো কিভাবে সেটা যদিও মনে পড়ে না। তবে নৌকা চলতে শুরু করার আগে খালামনি কিংবা মাসিকে আম্মা প্রায় নিস্তেজ গলায় বলে যাচ্ছেন, আমাকে দেখে রাখতে সে কথা আমার মনে পড়ে। সেইসব দিনে আমি মনমড়া হয়ে টিলার এষণা ধরে হেটেছি, পুবের ঘাটের জারুলের তলে বসে থেকেছি, সেইসব বিষন্ন দুপুর ও বিকেল আমাকে এখনও তাড়িয়ে নিয়ে যায়। আর কি আশ্চর্য মায়ের কথা ভাবতে গিয়ে আমি কেন বার বার নিজের বিষন্নতাতেই ডুবি? দয়াদ্র জননীর কোলের কথা কেনো আমার মনে থাকে না?

আমি প্রায়শ, মাকে বলি তোমারতো আমার জন্যে মায়া নাই। উদাহারণ টানি, একবার জ্বরের আমাকে ফেলে শহরে গিয়েছিলে। মা সেটা মেনে নেন। সেই ঘটনার, সেই ফেলে যাওয়ার গল্পটা টেনে নিয়ে দেখি মা সেদিন ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। আবার বলি, তুমি আমাকে ফাঁকি দিয়ে, গোলাপগঞ্জের খেয়া ঘাটে ফেলে রেখে শহরে গিয়েছিলে। মা মেনে নেন। সেই গল্পও টানি, টেনে দেখি সেদিনও মা ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। সেই গল্প টানতে টানতে দেখি, বন্ধ দরজার ওপরে লাল বাতি জ্বলে, ভেতর থেকে সাদা কাপড়ের মানুষরা বেরোয়। অনেকক্ষন পরে সেই ঘর থেকে আমার মাকেও বের করা হয়। মা ঘুমে, আমাদের দুই ভাইয়ের সামনে এনে একটুক্ষণ দাড়ায় সেই ট্রলি। নার্স মায়ের গালে হালকা নাড়াচাড়া করে চোখ মেলতে বলে। মা চোখ মেলে আমাকে দেখে, ভাইয়াকে দেখে। প্রায় নিশ্চল হাত বাড়ায়, আমাকে একটু ছুয়ে দেয়... এইসব কথা আমি মা কে বলি না। মাকে আমি বলি, তুমি টানা সাতদিন শহরে ছিলে, বাড়ির সবাই তোমাকে দেখতে গিয়েছে, আমাকে নিতে বলোনি তুমি। সেবার অপারেশনের দিনে নানি আমাকে নিয়ে গেলেন, গিয়ে দেখি পোস্ট অপারেটিভ থেকে মাকে নিয়ে আসা হয়েছে। ঘন্টাখানেক পাশে বসে থাকি। সাদা কাপড়ের মেয়েরা এসে আমাকে দেখে আর বলে তোমার মা বুঝি রোকেয়া আপা? আমি মাথা নাড়ি। তারা আমাকে আদর করে আর বলে, মা'তো সারাদিন তোমার কথা বলে। আমি সেইসব কথা শুনে কেঁদেছিলাম কিনা এখন আর মনে নাই, তবে একা একা দশফুটি ঘরে বসে যখন এইসব কথা মনে হয় আমি কখনই চোখে ভালো দেখি না। চশমাটা ঘসি, কুয়াশা কাটে না। তবু মাকে ভুলেও আমি বলি না, আমি জেনেছিলাম তার হাসপাতালবাসের উচাটনি ব্যথার কথা। খোটা দেই, সাতদিন দূরে থাকার কথা বলে।


এইসব অসুখি দিনে আমি মাকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম। জননীর কোলের অভাব অনুভব করেছিলাম। অথচ তারে কোনোদিনই বলিনি ভালোবাসার কথা। বার বার বলেছি অভাবের কথা। তাকে না পাওয়ার কথা, আদরহীন শৈশবের কথা বলি এই সময়ে এসেও।


তৃতীয়বার মাকে অপারেশন করানোর সময় আমি প্রাথমিকের শেষ ক্লাশে পড়ি। সেবার মা নিজেও ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। সেবার মা মৃত্যুর চিন্তা করেছিলেন। অপারেশনের আগের বিকেলে, সবাই বিদায় নিয়ে আসার সময়, মা আমার হাত ছাড়ছিলেন না। আমি মায়ের পাশ ঘেষে দাড়িয়ে ছিলাম। সবাই একে একে বাড়ি চলে গেলো, আমি থাকলাম হাসপাতালে! হাসপাতালের ছোট্ট বেডে মা আমাকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন সে রাতে। পরের সকালে, মা কে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার সময়ে দাদা আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো, দেখেই বুঝলাম, মার কাছে থাকতে না পারার ব্যথা সেই চোখে। মা আমাকে কেনো রেখেছিলেন নিজের কাছে? তিনি কি ভেবেছিলেন সেই বুঝি আমারে বুকে ধরে তার শেষ ঘুম।


আমি এইসব টুকরো টুকরো কথা কখনোই মাকে বলি না। মায়ের সাথে বার বার ঝগড়া করি। খুনসুটি করি। সুযোগ পেলেই বাড়ি ছেড়ে পালাই। আর বলি, মা আমাকে ভালোবাসো না কেনো? তাই মাকে নিয়ে কখনই কিছু লেখা হয় না।


সকলি তবে অনুযোগে ভরপুর হে জননী আমার ...

Wednesday, May 6, 2009

এই ুত...নিগুলা বাচ্চাদের পড়াতে আসে কেনো?

বাবাইর স্কুল ছুটির দশ মিনিট পর আমি গেটের ভেতর যাই। এর আগে গেলে সে রাগ করে, কারণ আমি গেলে তার খেলা হয় না। আজও সেইমতোই গেলাম। ছোট্ট কঙক্রিটের উঠোনে তারে খুজি। দৌড়াদৌড়িতে নাই। চোখ মেলে মেলে ধরি শেষে। এককোনায় দাড়িয়ে আছে। আমি এগিয়ে যাই। অন্যদিন আমাকে দেখেই ছোট্ট শরীরটা উড়িয়ে নিয়ে আসে। লাফ দিয়ে কোলে চড়ে। বাবা বলে চিৎকার করে। আজ সেসব কেছুই নাই! আমি বুঝি কিছু একটা হয়েছে। হাটুমুড়ে বসি সামনে, কি বাবা কি হয়েছে? সে মাথা নাড়ে, কিছু হয়নি তার। বলি বন্ধুরা মেরেছে? ক্যাপ নিয়ে গেছে? সেটাও নয়। তার পাশ থেকে একজন বলে, ‌মিস তারে পানিশমেন্ট দিয়েছে'। আমি বলি কি করেছো বাবা তুমি? বাবাই আমার বুকে ঢুকে গেছে ততক্ষণে। সেই একজনই বলে, বোর্ড এর লেখা মুছে দিয়েছিলো... আমার মাথাটা চিড়িক দিয়ে উঠে। বলি কি করেছেন মিস? এবার আর বাবাইকে প্রশ্ন করি না, করি সেইজনকেই। বলে কান ধরে উঠবস করিয়েছে। এটাও সে বলতে পারে না। জিনিসটা সে বুঝেই না। দেখিয়ে দেয় কিভাবে শাস্তিটা দেয়া হয়েছে। সিলেট শহরটা কাপে কিনা জানি না। আমি কেপে উঠি... বাবাইকে বুকে ধরে প্রিন্সিপালের রুমের দিকে হাটা দিলে, বাবাই কাকুতি করে বলে, বাবা ওইদিকে না। বাসায় চলো, আমি বলি না, প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে আসি। মনে মনে গালি দিতে থাকি বাবাইরে, হারামজাদা মিনমিনামি করবি না। তুই অপুর ছেলে, শক্ত হতে শিখ ভুদাইর বাচ্চা...


প্রিন্সিপাল আমাকে বুঝ দেন, বলেন, আপনি মার খান নাই? আমি বলি আমি সাত বছর বয়েসে স্কুলে গেছি। বিস্তর মার খেয়েছি। কিন্তু এই ছেলের বয়েস মাত্র ৪ বছর তিন মাস। তিনি আমাকে নানান কথা বলেন। তবু আমার মাথা ঠান্ডা হয় না। বলি, স্যার এই ছেলের বয়েস দশ হোক, তারপর তারে পিটান...


স্কুলের চেয়ারম্যানও মাথা ঠান্ডা করতে বলেন, পূর্বপরিচয়ের সূত্রে বলি, আমি কি ঠান্ডা নই? হাসি দিয়ে পরিবেশ হালকা করেন। প্রিন্সিপাল কোলে নিয়ে বাবাইকে নানান কথা বলেন। সে হাসে। অনেকক্ষণ পরে বাবাই আমার হাসে...


এই চুতমারানিরা মাস্টারি করতে আসে কেনো? শিশুদের মন বুঝে না যে সব ছাগুরা তাদেরকে কে আনে এইসবে? একটা বাচ্চা বোর্ডের লেখা মুছে দিয়েছে বলে তাকে শাস্তি দিতে হবে? কি এমন মহাকাব্য লিখেছিলো সে আমার জানতে মন চায়। আমি বড়ো বিক্ষিপ্ত মন নিয়া এই লেখাটা লিখতে বসছি। সবচে বড়ো কথা মেরেছেতো মেরেছে, বাচ্চাটার মন ভালো করে দেয়নি সে। এর উপর কতোটা মানষিক চাপ দিয়েছে সে সেই চিন্তাও তার নাই। এই বরাহ নন্দীনিরে আমার বড়ো চাবকাইতে মন চাইছে।


এইসব সময়ে আমার খুব গালি আসে। যা ইচ্ছা তাই গাইল দেই। আপনারা ক্ষমা করে দিয়েন প্লিজ।

Monday, May 4, 2009

লীলাবতীকাব্য

বৃষ্টির মতো বিনাশী বালিকা আজ ছুটি নিয়েছে। আজ রোদের দিন

আজ কৃষ্ণচুড়া আগুন ঢেলেছে এই পথে, প্রান্তরে, কংক্রিটের

উঠোনে। আজ জারুল মেলেছে পেখম গ্রামময় প্রান্তরে।

মন ভার করেছিলো, ...ইশ্বর, তুমি ছিলে বলে লাল হলো

কৃষ্ণচুড়া, জারুল মমতায় মেলেছে চোখ, সে হেসেছে

কৃষ্ণ হে, কোথায় তুমি? বাঁশি কি তৈরি?

লীলাবতী চোখ তুলেছে...

Sunday, April 26, 2009

পুরনো গল্প ০৩

মা গুনে গুনে টাকা দিতো। ডানোর কৌটো থেকে বের হতো সেই টাকা। সাত টাকার ডাল, এক টাকার কাচা মরিচ... এভাবে টাকার অংক ধরে ধরে বাজারে পাঠাতো আমাকে। ততদিনে আমি জেনে গেছি, এভাবে হিসেব করেই বাজারে যেতে হয় আমাদের। এভাবে হিসাব করে বাজার করা যায় না তবু সেটা মেনে নিতে হবে। এও জেনেছি, সাত টাকায় এক পোয়া ডাল আর তেরো টাকায় আধা সের, এক টাকা বাচানোর এই হিসাবে আমরা যেতে পারবো না। আমাদেরকে রোজ আট আনা বেশি দিয়েই ডাল কিনতে হবে।

বাবা মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় বারান্দায় এসে দাড়াতো। সে বৃষ্টিই হোক আর শীত। বাজার থেকে ফিরে এসে দেখি বাবা বারন্দায়, সন্ধার আলো আলো অন্ধকারে বাবা আমার দিকে স্পষ্ট চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি সেটা দেখি, আবার নাও দেখি। কথা বলতো না। শুধু একবার, রাতে, মাঝরাত হবে হয়তো। কি একটা বই খুজতে বাবার ঘরে গেলে বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কিরে টুটুল তুই রোজ রোজ সাত টাকার ডাল কিনিস কেনো? আমি অবাক হয়ে বলি, তুমি জানলে কিভাবে? বাবা একটু থেমে আবার বলে তেরো টাকা দিলেতো আধাসের ডাল পাওয়া যায়। রোজ রোজ আট আনা বেশি দিস কেনো?

আমার মাথায় ঢং ঢং করে হাতুড়ির বাড়ি পড়ে। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার দিকে তাকানো চোখটায় পুরনো সেই শূন্যতা নেই। সেখানে বরং আছে হিসাব বুঝিয়ে দেয়ার এক আত্মতৃপ্তি। রোজ রোজ সাবান কিনে দেয়ার হিসেবটা বাবা আমাকে বুঝিয়ে দেয়। দাড়িয়ে থাকা আমাকে দেখে বাবার কি হয় জানি না। উঠে দাড়ায়। কাছে আসে, কাধে হাত রাখে আমার, টান দিয়ে বুকে নিয়ে বলে, এভাবেই রোজ রোজ আট আনা দিয়ে দিতে হয়রে টুটুল, এভাবেই রোজ রোজ আমাদের ঠকতে হবে। এভাবেই হিসেবহীন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে বাবা...

Tuesday, April 21, 2009

আলবাব'র সময় ০৫


একেকটা রাত মৃত্যুর মতো দীর্ঘ হয়ে আসে...

মানুষ মূলত মিথ্যুক জেনেও ভালোবাসা বিলায় প্রকৃতি।

এইসব প্রেম ও অপ্রেমে, করুণা ও কার্পণ্যে ভেজার সময় কোথায় বলো?

প্রতারিত আলবাব অভিমান ভুলেছে, বিশ্বাস হারিয়েছে মানুষে

সরল রেখার জীবন, এইবার তবে ছুটি নাও

Monday, April 20, 2009

পুরনো গল্প ২

বাবার একটা আলাদা রুম ছিলো। দাদাজান যখন বাড়ি বানান, বাবা তখন যুবক। ছেলের জন্যে আলাদা একটা রুম বানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সেই ঘর ঠাসা ছিলো নানান রকমের বই এ। বাবা সেই ঘরে ডুব দিলেন। বড়দা এক রাতে ট্রেন ধরার জন্যে যখন বাড়ি ছাড়ছিলো, তার আগে বাবার সাথে দেখা করার জন্যে গেলো সেই রুমে। বাবার সাথে কি কথা হয়েছিলো বড়দার সেটা আমরা জানি না। এই কথা শুধু মনে আছে, বড়দা বেরিয়ে এসে আর দাড়ায়নি। হন হন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। আমি পেছন পেছন সাইকেল নিয়ে বেরুলাম। দাদা সেটা চালিয়ে স্টেশনে গেলো। রাস্তায় কোন কথা হয়নি দু’ভাইয়ে। স্টেশনে ঢুকার মুখে, আমার হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট গুজে দিয়ে বল্লো, একটা পেডলক কিনিস সাইকেলের জন্যে। তারপর দু কদম এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে বল্লো, 'টুটুল, বাবাকে দেখে রাখিস সোনাভাই। বাবা খুব কষ্টে থাকেরে...' দাদার চোখে টলটল করছিলো পানি, সাইকেল চালাতে চালাতে মুছে ফেলছিলো যা, এইবার আর সেটা করলো না। টপ টপ করে গাল বেয়ে নেমে আসে ...
সাইকেলের প্যাডেল ঘুরাতে ঘুরাতে অবাক হই, সেই প্রথমবার আমি রাত দশটায় একা বাড়ি ফিরি। সেইদিন থেকে আমি বড়ো হতে শুরু করলাম।