Friday, September 11, 2009

অবাক হওয়া রাত এবং অক্ষমতার গল্প

অবাক করা সব কাণ্ড ঘটতে থাকে। অন্তত আমি অবাক হই। রাত দুইটা খুব বেশি রাত নয় আমার জন্যে। গত দশ বছর ধরে এই সময়টার ধারে কাছে বাড়ি ফিরি। আজও ফিরেছিলাম। দরজা খুলে দিলো বউ। প্রথম অবাক করা ঘটনা হলো এটা। আমাকে কেউ দরজা খুলে দেয় না। একটা চাবি আছে আমার। সেটা দিয়ে সদর দরজা খুলি। আর ভেতর বাড়িতে তালা টালা দেয়ার নিয়ম নেই আমাদের। আজ সেই নিয়মের ব্যত্যয় হলো। আমাদের কোনো কথা হলো না, সাধারণত হয়ও না। আমি বউকে পাশ কাটিয়ে শোবার ঘরে চলে এলাম। বিছানায় আমার পাঁচ বছর বয়েসি মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে।

আমার কাঁধে একটা ব্যাগ থাকে সবসময়। এখন এই ব্যাগের কোনো দরকার নেই। তবু থাকে। অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে। মান্নাদা একবার বলেছিলো, এই ব্যাগ ছাড়া নাকি আমি অসম্পূর্ণ। আমারো তাই মনে হয়। দরজার ফাঁকে একটা তাক আছে। সেখানে ব্যাগ রেখে লুঙ্গিটা খুঁজি, সেটা নেই। লুঙ্গি খুঁজবো বলে ঘুরে দাড়িয়ে আমাকে দ্বিতীয় দফায় অবাক হতে হয়। বউ লুঙ্গি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণত আমি অবাক হই না। আমার সে ক্ষমতা লোপ পেয়েছে অনেক আগে। তবু আজ বার বার অবাক হতে হয় আমাকে।

গরম পড়েছে খুব। শরীর চ্যাটচ্যাটে হয়ে থাকে সবসময়। গোসল করতে হয় বাইরে থেকে ফিরে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি ঘরের বাতি তখনও জ্বলছে। বউ বিছানায় নেই। অন্যদিন এটা জ্বলে না। আমি ডিমলাইটের আলোতে পা টিপে টিপে খাবার টেবিলে যাই। সেখানে খাবার ঢাকা দেয়া থাকে। ঠান্ডা ভাত আর তরকারি গলায় সেধিয়ে দিয়ে আমি ঘুমের আয়োজন করি। আজকে সেসব কিছুই হলো না। টেবিলে ভাত বেড়ে বসে আছে রোমানা। আমি বসতেই প্লেটটা এগিয়ে দেয় সে। এসব দেখে আমার ভেতর ঢং ঢং করে কি একটা বাজনা বাজতে থাকে। ধ্রিম ধ্রিম করে কি একটা বাজনা বাজে আমার বুকে।

প্রায় নিঃশব্দেই খাবার শেষ করি। মাঝখানে রোমানা ডাল তুলে দিতে চাইলে আমি না বলায় খাবারের টেবিলটা মূলত নিঃশব্দ থাকে না। শোবার ঘরে ফিরে আমি ইতস্তত করি। আমার কেনো যেনো বার বার মনে হয়, আজ রাতটা অন্যরকম। আজ অন্যরাতের মতো নিঃশব্দে শুয়ে পড়া যাবে না। মায়াবীর পড়ার টেবিলে বসি আমি। রঙ-বেরঙের বই দিয়ে সাজানো মায়াবীর টেবিল। টেবিলের এক কোনায় নীল রং এর একটা টেডি বিয়ার বসে আছে। ওর প্রথম জন্মদিনে এটা পেয়েছিলো সে। শান্তনু দিয়েছিলো এটা। এর ঠিক পাশেই একটা মগ। সেখানে বন্ধুতা নিয়ে কী একটা কথা লিখা। এটাও জন্মদিনের উপহার। রূপা দিয়েছিলো। বিষয়টা মাথায় আসতেই হাসি পায় আমার। বাবা-মায়ের সাবেক প্রেমিক-প্রেমিকারা কেমন ভালোবাসে মায়াবীরে.. আমার হাসিটা মনে হয় ঠোঁটের কিনারায় অনেকক্ষণ লেগে ছিলো। আমি মনে হয় অনেক বেশি মৌনতায় ডুবে গিয়েছিলাম। তাই খেয়াল করিনি রোমানা ফিরেছে। হাসছো কেনো? প্রশ্নটা শুনে ফিরে তাকাই। রোমানা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি মাথা নাড়ি। এর কোনো মানে নেই। কোন উত্তরই বহন করে না এই মাথা নাড়াটায়। রোমানও সেটা বোঝে, সে কথা বাড়ায় না। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে, তারপরই বলে সেই কথাটা। যেটার অপেক্ষা করছি আমি- তোমার সাথে আমার কথা আছে...

আমাদের কথা হয় না কতদিন হয়ে গেলো। হ্যাঁ, কথা হয় না। আমরা সপ্তাহের দু’তিনদিন খুব প্রয়োজনে যেসব বাক্য বিনিময় করি, তাকে ঠিক কথা বলার পর্যায়ে ফেলা যায় না। সকালে আমি যখন বেরুই। সেটা ন’টা কিংবা দশটা হতে পারে। দশটা হলে আমাদের দেখাই হয় না। ততক্ষণে রোমানা অফিসে চলে যায়। ন’টা হলে আমাদের দেখা হয়। আমিও বেরোই, সেও বেরয়। ওর জন্যে একটা রিক্সা ঠিক করা আছে। সাড়ে আটটার পরে পরে চলে আসে। মায়াবীকে স্কুলে নিয়ে যায় ওর ছোট চাচা। স্কুলে দিয়ে সে ইউনিভার্সিটিতে চলে যায়। বাড়ী ভর্তি মানুষের সামনে অভিনয় করতে হয় তখন। সুখী দম্পতির মতো রিক্সায় চেপে বসতে হয়। আমি বাজার পর্যন্ত আসি। খুব কাজ আছে এমন ভান করে নেমে যাই। রোমানা মনে করিয়ে দেয়, বারটায় মায়াবীর স্কুল ছুটি হবে। আমি মাথা নাড়ি কোনোদিন, কোনোদিন মুখ খুলে বলি, সময়মতো পৌছে যাবো।

রোমানা কথা শুরু করে। কেমন আছো তুমি? একেবারে অপ্রাসঙ্গিক একটা প্রশ্ন। আমার ভালো থাকা কিংবা খারাপ থাকাতে তার কিছু আসে যায় না। একইভাবে তার বেলাতেও সেই কথা খাটে আমার কাছে। তবু সে প্রশ্নটা করে। আমি বুঝি ভেতরে ভেতরে অন্যকিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে রোমানা। কিন্তু বলার মতো পরিবেশ মনে হয় পাচ্ছে না। এটাও একটা অবাক করা বিষয়। আমাদের মাঝে কথা বলার এমন কোনো বাধা নেই। সম্পর্ক এমন কোনো আহামরি জায়গাতে লটকে নেই যে, তিতা মিঠা কিছু বলতে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবু রোমানাকে ইতস্তত করতে দেখি। কথা আছে বলেও সে কথা বলে না। মায়াবীর কাছে যায়। তার কোলবালিশটা ঠিক করে দেয়। কপালের অদৃশ্য ঘাম মুছে দেয়। আমি অপেক্ষা করি।

ঘরের দেয়ালে থাকা ঘড়িটা টিক টিক শব্দে জানান দেয়, সে চলছে। টিক টিক শব্দ জানান দেয়, আমাদের নীরবতায় ভারী হচ্ছে এই ঘরের পরিবেশ। ঘরময় আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে ঘড়ির টিক টিক শব্দ। আমি রোমানাকে দেখি। আরো উজ্জল হয়েছে তার গায়ের রঙ। মা এই রঙ কে বলেন দুধে আলতা। দুধে আলতা কি খুব সুন্দর কোনো কম্বিনেশন? রোমানাকে দেখলে তাই মনে হয়। কিন্তু দুধ সাদা টাইলস জুড়ে ছড়ানো আলতার মতো রক্ত দেখে আমার সেটা মনে হয়নি। এমন একটা দৃশ্য দেখেছিলাম শাহজালালের দরগাতে। গ্রেনেড চার্জ করে মানুষ মারা হয়েছিলো। নতুন বিছানো সাদা রঙের টাইলস জুড়ে ছিলো রক্ত আর রক্ত। বীভৎস... সেই রাতে অফিস থেকে ফিরেছিলাম জ্বরগ্রস্ত হয়ে। শরীর পুড়ে যায় যেনো। রোমানা সারারাত জেগে ছিলো। আশ্চর্য মোহন শরীরে সে আমারে জড়িয়ে ধরে রাত পার করে দিয়েছিলো। তখন আমরা একজন আরেকজনকে এভাবেই আঁকড়ে ধরে থাকতাম। আমরা নিজেদের পাঠ করতাম কবিতার মতো- প্রতিদিন, প্রতিরাতে।

মায়াবী নড়ে চড়ে উঠে। রোমানা গালটা ছোঁয়ায় তার নাকে। তার পর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, মায়াবী, হিসু করবে, মায়াবী... মায়াবী ঘুমের মাঝেই শরীর মুচড়ে বলে, হ্যাঁ। রোমানা আমার দিকে তাকায়। আমি আস্তে আস্তে মায়াবীকে কোলে তুলি। বাথরুমে নিয়ে যাই। রোমানা ওকে কমোডে বসিয়ে ধরে থাকে। ঘুম জাড়ানো চোখে মায়াবী আমাকে দেখে। হাসে। আমি বলি, কিরে তোর দাত দেখি সব গেলো। মায়াবী আবার হাসে, জড়ানো কণ্ঠে বলে, তুমি আমার ছাতা চকলেট আনছো? আমি জিহ্বা অর্ধেক বের করে মাথায় হাত দিই। এইরে ভুলে গেছি। কাল ঠিক নিয়ে আসবো। মায়াবী রাগ করে। বলে, তুমি রোজ রোজ ভুলে যাও কেনো বাবা? তার ঘুম চলে গেছে। চোখ দেখে বুঝি, সেখানে জমেছে রাজ্যের বিষাদ। আমি আবার তার মন ভজানোর চেষ্টা করি। কালকে ঠিক ঠিক নিয়ে আসবো। একদম ভুল হবে না। মায়াবীকে আমার কোলে দিয়ে রোমানা বলে, যাও শুয়ে পড়ো তোমরা।

মায়াবী আমার বুকের ভেতর লেপ্টে থেকে বলে, বাবা তুমি কি একটা গবেট স্টুডেন্ট? আমি বলি, কেন রে? সে আবার আমার চোখে তাকায়, ডিমলাইটের আলোয় দেখি দুষ্টুমি ভরা চোখ, বলে, এই যে রোজ রোজ ভুলে যাও। আমাদের মিস্ বলেছেন, যারা সবসময় ভুলে যায় সবকিছু, তারা গবেট স্টুডেন্ট। আমি মায়াবীকে বুকে চেপে বলি, হ্যাঁ, তোর বাবা একটা গবেট, সে সবকিছু ভুলে যায়। তার মাথায় গোবর ভর্তি। মায়াবী হাসতে থাকে বুকের ভেতরে। আচমকা সেই হাসি থামে। মায়াবী আমার বুকে তার কোমল হাত বুলাতে বুলাতে বলে, বাবা সত্যি করে একটা কথা বলোতো, তুমি কি ভুলেই গেছো না তোমার পকেটে টাকা নেই? আমি কেঁপে উঠি। আমার চিন্তাশক্তি স্থির হয়ে যায় যেনবা। ভাঙা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করি, কেন রে, তোর এটা মনে হলো কেনো? মায়াবী আমার সেই প্রশ্নে উত্তর দেয় না। কুট কুট করে বলে, বাবা আমার মাটির ব্যাংকটা তোমাকে দিয়ে দেবো, তুমি সেটা নিয়ে যেও। ওতে অনেক টাকা আছে... আমার হু হু করে কান্না আসে, সেই কান্না চেপে রাখতে গিয়ে মায়াবীরে বুকের মাঝে চেপে ধরি আরো শক্ত করে। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখি রোমানা আমার দিকে জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। এই চোখটা আমি চিনি না। এই চোখের সাথে আমার পরিচয় হয়নি কোনদিন।

কখন ঘুম জড়িয়ে আসে চোখে টেরও পাইনা। ঘামে শরীর ভিজে গেলে ঘুম ভাঙ্গে। ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে। রোমানা বসে আছে মায়াবীর পাশে। হাতে একটা পাখা। আমাকে বলে, তুমি ঘুমাও, আমি বাতাস করছি। ঘুম আর আসবে না। আমিও উঠে বসি। জিজ্ঞেস করি, কতক্ষণ ধরে গেছে? আধঘন্টা হবে বলে জানায় রোমানা। বিছানা থেকে নেমে জানালার পর্দা সরিয়ে দেই। ভারি পর্দা জানালা জুড়ে। ঘরে বাতাস আসে বাধা সরে যাওয়ায়। আকাশের রঙ পাল্টে যাচ্ছে। একটা সাদা সাদা ভাব তাতে। তারাগুলো মিটমিটে। ঘড়িতে তাকাই। সাড়ে চারটা বাজে। জানালায় দাঁড়ানো বলে বাতাস লাগে। ঘামে ভেজা শরীর শিরশির করে উঠে। তবু ভালো লাগে খুব। রোমানা কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো আমাকে, সেটা মনে পড়ে আমার। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই জিজ্ঞেস করি, তুমি কিছু একটা বলতে চেয়েছিলে আমায়... রোমানা কিছু বলে না। পাখা ঘোরার হালকা শব্দটা চলতেই থাকে। একটুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘুরে দাঁড়াই, তুমি কি এখন বলবে, কী যেনো বলতে চেয়েছিলে? রোমানা অস্ফুটস্বরে বলে, না। এখন আর বলবো না। কালকে কি তোমার সময় হবে সকালে? অফিস যাওয়ার সময় কি তুমি আমার সাথে বেরুতে পারবে? আমার কোনো সমস্যা থাকার কথা না। আধাঘন্টা পরে বা আগে বেরুলে আমার এমন কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয় না। তবু কথাটা এখনই শুনতে ইচ্ছে করে আমার। সেটা বলি রোমানাকে। এখনই বলো, আমি শুনতে চাই। রোমানা আবারও মানা করে,- থাক দরকার নেই। সকালেই বলবো। আমি বলি, না, এখনই বলো। তুমিতো রাতেই বলতে চেয়েছিলে। মায়াবী না উঠলে এতক্ষণে বলা হয়ে যেতো। বলে ফেলো। রোমানা বিব্রত হচ্ছে, স্পষ্টতই টের পাই। আমি আবারও অবাক হই। আমাকে কিছু বলতে সে বিব্রত হবে কেনো?

ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে। ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে ফ্যানের বাতাস। রোমানা উঠে এসেছে বিছানা ছেড়ে। আমার পাশে দাড়িয়েছে সে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। টুক টাক কথা হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না, রোমানা এতো সময় নিচ্ছে কেনো? তবু অপেক্ষা করি। এভাবে পাশাপাশি দাড়িয়ে থাকতে খুব একটা খারাপ লাগছে না। পরিচিত ঘ্রাণটা অনেক কাছে থেকে পাচ্ছি। এই ঘ্রাণ একসময় আমাকে পাগল করে দিতো!

তুমি কি মনে করো আমাদের জীবনটা এভাবেই, এই অস্বাভাবিকভাবে কেটে যাবে? রোমানার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আমার কাছে। সে তার অপেক্ষাও করে না। কথার পিঠে কথা বলে যায়, এভাবে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে অভিনয় করে যাওয়া খুব কষ্টকর। আমি তার কথা মেনে নেই মনে মনে। অভিনয় করাটা আসলেই কষ্টের। কিন্তু আমরা সেটাই করে যাচ্ছি দীর্ঘদিন ধরে। আমরা দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে যাই, যেটার খুব দরকার নেই। দরজার আড়ালে কিছু করার মতো জীবন আমাদের নেই। আমরা পাশের বাড়ির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে একসাথে যাই। পাশাপাশি বসি, হাসি, হাসাই। মায়াবীর স্কুলে প্যারেন্টস'ডে তে একসাথে গেলাম সেদিন। স্কুলের প্রিন্সিপাল আমাদেরকে আলাদা খাতির করলেন। রোমানার কাছ থেকে 'কার লোন' নেয়ার ব্যাপারে কি কি করতে হবে তা জেনে নিলেন। আমার সাথে বললেন রাজনীতি নিয়ে। কথা শেষে দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। একফাঁকে বললেন, আমাদের দুজনকে নাকি তিনি খুব পছন্দ করেন। দারুণ লাগে আমাদের জুটিকে। আমরা লজ্জা পাওয়ার চেষ্টা করলাম সেটা শুনে। মায়াবীকে নিয়ে সেদিন দুপুরে আমরা ভালো একটা রেস্টুরেন্টে খেলাম। তারপর রোমানা চলে গেলো অফিসে, আমি মায়াবীকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম। এক রিক্সায় চেপেই আমরা রোমানার অফিস অব্দি গেলাম। তাকে নামিয়ে দেয়ার আগে ব্যাগ থেকে একশ টাকার একটা নোট বের করে সে আমার হাতে দিলো, ভাড়া দিও। আমি বললাম, ভাড়া আছে আমার কাছে, তবু সেটা আমার হাতে গুজে দিতে দিতে বললো, থাকুক। কাজে লাগবে... এই, এই হলাম আমি। বাচ্চার রিকশা ভাড়ার টাকাও আমার কাছে থাকে না।

রোমানা কথা বলতে বলতে মায়াবীর চেয়ারে গিয়ে বসেছে। ফ্যানের বাতাসে তার চুল উড়ছে। আগে অনেক লম্বা চুল ছিলো তার। কোমর পর্যন্ত যেতো। এখন সেটা ঘাড়ে এসে ঠেকেছে। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই। রোমানা এখন পর্যন্ত যা বলেছে তার বিরুদ্ধে দাড় করানোর মতো কোনো যুক্তিই আমি দিতে পারি না। আমার কাছে কোনো উত্তরই নেই, এমনই কঠিন সেইসব প্রশ্নমালা। 'তুমি বলতে পারো, এতো ভাব কেনো তোমার?' এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। আসলেইতো এতো ভাব হবে কেনো আমার? কোন শক্তিতে আমি ভাব ধরি? তিন বছর ধরে আমি বেকার, রোমানা নানা ভাবে আমাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে, তার সেই চেষ্টা সফল হয়নি। হতে পারেনি। কারণ আমি তাকে সেভাবে সহযোগিতা করিনি বা করতে পারিনি। তার ক্লায়েন্টদেরকে ধরে ধরে আমাকে এটা সেটা করার পথ বাতলে দিয়েছে। আমি সেইসব শেখানো পথে হাঁটিনি। স্বপনের চায়ের দোকানে বসে দুনিয়া উদ্ধার করেছি আমি। রাতের পর রাত আমি পড়ে থাকি পার্টি অফিসে। আমি মিছিল করি, মারামারি করি আর দুনিয়া ছাড়া ভেজাল নিজের কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরি। আমার জন্যে বাড়িতে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারে না রোমানা। নিজের অক্ষমতার কথা আমি ছাড়া আর কে জানে অধিক? জানে না, কেউ জানে না। রোমানা তবু বলে সে অনেক বেশি জানে আমাকে। সে বোঝে আমাকে দিয়ে আর কিছুই করা সম্ভব না। তার জীবনটা বিষিয়ে দেয়ার পর নাকি আমার আর কিছু করারও থাকতে পারে না। এইখানে আমারও কিছু বলার থাকতে পারে। আমি হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারি, যে জীবনটা কি একা তারই বিষিয়েছে নাকি আমিও এক বিষণ্ন জীবন পার করছি দীর্ঘ দিবস ও রজনী ধরে। আমাদের মাঝে যে দেয়াল, যে বিচ্ছিন্নতা তা একা আমি তৈরি করিনি... না সেসব কিছুই বলা হয় না। যেহেতু নিজেকে অক্ষম মেনেছি আমি, তাই সব দায় ও দেনা আমাকেই মাথা পেতে নিতে হয়। এটাই নিয়ম। আমি নিয়ম মেনে রোমানার কথা শুনে যাই।

এই সকালটা অন্যরকম। একেবারেই অন্যরকম। আজ আকাশে মেঘ জমেছে অনেক। আমার মনে হয় আকাশের আজ মন খারাপ। এটা একটা বেহুদা ভাবনা। আকাশের মন খারাপ হওয়ার কী কারণ থাকতে পারে? আমার সংসার ভেঙে গেলে আকাশের কী ঠেকা পড়েছে মন খারাপ করার? তবু আমার সেটাই মনে হয়। এই মনে করার মাঝে আমার একটা আরামবোধ আছে। রোমানা এটাকেই মনে হয় 'ভাব' বলে। কিন্তু এসব ভাবলে চলবে না। আজ আমার অনেক কাজ। আজ রোমানার সাথে বেরুতে হবে আমাকে। তাকে নিয়ে যেতে হবে মায়াবীর স্কুলে। সেখান থেকে টি.সি নিতে হবে। মায়াবী আর এ স্কুলে পড়বে না। সে তার মায়ের সাথে ঢাকায় চলে যাবে। আমি এটা মেনে নিয়েছি। না নিয়ে উপায় নেই। রোমানা বলেছে, মায়াবীর জীবন নষ্ট করার অধিকার আমার নেই। তাকে মানুষ করতে হলে রোমানাকেই করতে হবে। আমাদের পৃথকবাসের কথাও আমি মেনে নিয়েছি। এভাবে পাশাপাশি থেকে দারুণ মর্মযাতনায় বেঁচে থাকা যায় না। তারচে বরং দূরে থাকাই ভালো। আমার হেলাল হাফিজকে মনে পড়ে। প্রেম নাকি বিরহে উজ্জ্বল হয়। আমাদের দায়িত্বশীল সম্পর্কের মাঝে যদিওবা প্রেম ছিলো না তেমন, তবু এই লাইনটাই আমার মনে আসে রাতে। রোমানা খুব অবাক হয়, এভাবে আমি এক বাক্যে সব মেনে নিলাম বলে। সে হয়তো প্রতিরোধ আশা করেছিলো, তাই প্রথমেই বলে বসে, মায়াবীর জন্যে দরকার হলে সে আদালতে যাবে। আর সেখানে গিয়ে আমি হারবোই। কারণ, তিন বছরতক বেকার থাকা বাবার চেয়ে চাকরিজীবী মা অনেক বেশি নিরাপদ সন্তানের জন্যে। আমাকে সেসব না বললেও চলতো। আমি সেটা জানি। তাই কথা বাড়াইনি। মেনে নিয়েছি। সমস্যা ছিলো একটাই। মা। মাকে কীভাবে বিষয়টা জানানো যাবে সেটা নিয়ে আমি ভাবতে থাকি। রোমানাই আমাকে উদ্ধার করে। বলে, আগেই সে মাকে বলে রেখেছে, যে একটা ট্রেনিং এর জন্যে তাকে মাস তিনেকের জন্যে ঢাকা যেতে হবে। মায়াবীকে সাথে নিয়ে যাবে সে। মা সেটা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন। কাল বিকেলে তাই ট্রেনিং এর কথা বলাতে তিনি নতুন কোনো প্রশ্ন করেন নি। শুধু জিজ্ঞেস করেছেন, ঢাকায় গিয়ে রোমানা থাকবে কোথায়? মায়াবীর স্কুলেরই বা কি হবে। মুখস্থ বাক্যের মতো বুলি আউড়েছে রোমানা। বোনের বাসায় উঠবে। মায়াবীর স্কুলেও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এই বয়েসের বাচ্চাদের স্কুল ঢাকায় অনেক। সেটা নিয়ে বেশি না ভাবলেও চলে। আমার জন্যে তাই কোনো কষ্টই বাকি রাখেনি রোমানা।

মায়াবী রাস্তায় আমাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে। কেনো সে ঢাকা যাবে, কেনো দাদু তার সাথে যাবে না। কেনো বাবা এবার তাকে নিয়ে যাচ্ছে না... এমন হাজারো প্রশ্ন। আমি একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর দেই, হাঁপিয়ে উঠি সেসব উত্তর দিতে দিতে, তবু মায়াবীর প্রশ্ন শেষ হয় না। মায়াবী প্রশ্ন করে, এবার গেলে সে কবে ফিরে আসবে? স্কুল থেকে একেবারে নিয়ে এলাম কেনো। আমি এই প্রশ্ন দুটোর উত্তর দিতে পারি না। মেঘ জমা আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি শুধু বৃষ্টির জন্যে অপেক্ষা করি।

No comments:

Post a Comment