Thursday, June 21, 2007

:: হাবিব আলীর পতাকা পুরাণ ::


হাবিব আলীর শখটা অনেক দিনের। বুকের মধ্যে যত্নে লালন পালন করতে করতে পুষ্ট শখ কখনও পুরন হবে কিনা এই নিশ্চয়তা না থাকলেও হাবিব আলী স্বপ্ন দেখার হাল ছাড়েনি। সে স্বপ্ন দেখেই যায়। শখ পুরনের স্বপ্ন।মানুষের সকল ইচ্ছা পূর্ন হয়না। তবু মানুষ নতুন নতুন ইচ্ছা নিয়ে মেতে উঠে। অনেকেই পুরনো শখ ভুলে যায়। কিন্তু হাবিব আলী ভুলেনা। যতদিন যায় শখ বাড়তে থাকে, তাতে চেকনাই লাগে। শখের জেল্লা বাড়ে। শখ পুরনের ফন্দি ফিকির আবিস্কারে ব্যয় হয় হাবিব আলীর রোজকার কিছুটা সময়। কিন্তু সফল লভেদী বুদ্ধি আবিস্কার করা হয়ে উঠেনা।অবশেষে এল বুদ্ধি। শানদার এক বুদ্ধি। যখনই এই বুদ্ধিটা মাথায় আসল তখনই শুরু হল সমস্যা। নিজের মাথার চুল নিজেই ছেড়া শুরু করল হাবিব আলী। এই ব্যপারটা এতদিন ধরে ঘটছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আর তার মাথায় কিনা এতদিন পরে আসল! নিজেকে সে কুৎসিত ভাষায় গালি দিতে লাগল।
একসময় হাবিব আলীর মাথা ঠান্ডা হল। সে তার শখ, তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করতে বসল। কিন্তু সেটা মোটেই সহজ নয়। দিব্যওচাখে নিজেন স্বপ্নের রুপায়ন দেখে তার মনের ডুগডুগি অবিরাম বাজতে থাকায় মন ও মগজকে পুরুপুরি শিতল করা যায়না। অবশেষে অনেক চেষ্টায় হাবিব আলী তার কর্মপর্যায় নির্দিষ্ট করতে সম হল।
১৯৯৯ সালের পহেলা মে। সকাল দশটা। হাবিব আলী তার বাড়ির সামনে সাত হাত লম্বা, আড়াই হাত পেট মোটা লাল একটা ব্যানার টাঙ্গালো যাতে সাদা হরফে লেখা “বিশ্বকাপে বঙ্গশার্দুল”। মানুষজন এই ব্যানার দেখে পুলক অনুভব করল। বস্তুত: বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ খেলছে, দেশের প্রতিটি মানুষ এই কথা জানে। এবং এজন্য সবসময় মনে আনন্দ অনুভব করে। তার উপর হাবিব আলীর এই ব্যানার সবার কাছে আরামদায়ক নিঃশ্বাসের মত মনে হল। সেদিন বিকেলেই হাবিব আলী বাড়ির ছাদে বাংলাদেশের একটি পতাকাও উড়িয়ে দিল। মানুষের প্রিত অনুভব এতে আরও বেড়ে গেল। কিন্তু সেটা বিশ্বকাপ শুরুর দ্বিতিয় দিন পর্যন্ত! কারন তৃতীয় দিনেই অর্থাৎ ষোল মে সকালে হাবিব আলী তার দীর্ঘ দিন লালিত শখ পুরন করে ফেল্ল!
সেদিন ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং পাকিস্তানের খেলা। এই সুজুগে হাবিব আলী তার পেয়ারা পাকিস্তানের পতাকা বাংলাদেশের পতাকার ঠিক পাশেই উড়িয়ে দিল। বিদেশী পতাকা উড়ানোতে উস্তাদ মানুষের জন্য এই ঘটনা তেমন বিকারের নয়। কিন্তু এখানে এটি দৃষ্টি আকর্ষন করল। কারণ পাকিস্তানের পতাকার পাশে বাংলাদেশের পতাকা! তাও আবার প্রায় একহাত ওপরে থাকা পাকিস্তানী পতাকাটা দৃষ্টিকটুই ঠেকছিল।
হাবিব আলী পাকিস্তানী পতাকা ওড়ানোর পরেই প্রস্তুতি নিয়েছিল যেকোন রকম পরিস্তিতি মোতাবেলার। কিন্তু অবাক হয়ে গেল সে! পতাকার ব্যাপারে কথা বলার জন্য কেউ এলনা! দু’দিন পার হল, কেউ আসেনা। হাবিব আলী আবারও নিজেকে গালমন্দ করে। কেন সে এতদিন ভয় পেল! কেন ওড়ালোনা পেয়ারা পাকিস্তানের পতাকা!
বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে বেশ ক’দিন হয়ে গেল। বর্ষার বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে বাজে রঙে লেখা বিশ্বকাপে বঙ্গশার্দুল ব্যানার। বাংলাদেশের পতাকাও উড়ছে শোচনীয় অবস্থায়। আর কী আশ্চর্য পাকিস্তানী পতাকাটা এখনও টিকে আছে সকল সজিবতা নিয়ে! হাবিব আলী এখন এখন প্রায়ই উদাস হয়ে যায়। তার চেহারায় লেপ্টে থাকে বিষাদ। কিন্তু সেটা খুব বেশি সময়ের জন্য নয়। বিষাদমাখা মুখটায় হাসি ফুটে উঠে। হাবিব আলী অপার্থিব এক ভালোলাগায় নতজানু হয় চাঁদতারা খচিত পতাকার সামনে।


___________________________________________________________________
এই গল্পটা লিখেছিলাম ১৯৯৯ সালে। ছাপা হয়েছিল প্র।আ। বন্ধুসভায়। আরও অনেক লেখার মত এটিও হারিয়ে গিয়েছিল। পরশু রাতে পুরনো কাগজের স্তুপ থেকে এর মূল কপি বেরিয়ে আসে। পড়ে মনে হল এখনও এই গল্পের দিন শেষ হয়ে যায়নি। কিছুটা বদলে দিয়ে দিলাম।

Wednesday, June 20, 2007

:: ওতটা পুতুপুতু নাই আমার যে পথের কান্নায় বুক ভাসাব স্বপনের জন্য ::


আমার অনুভূতি অতটা পুতুপুতু নয়। যতটা হলে পথের কান্নায় বুক ভাসানো যায়। বেশ শক্ত ঘোচের মানুষ আমি থেতলে যাওয়া মানুষের সামনে বসে তারই স্বজনকে প্রশ্ন করতে পারি, মাথায় যখন গুলি লাগে তখন উনার হাতে একটা পিস্তল ছিল, সেটার মালিক কে জানেন? ক্রসফায়ারে মরা মোশারফের মাকে বলি, আছে আপনার ছেলে হাসপাতালে... আচ্ছা ওর কোন ছবি আছে আপনার কাছে। ত্রস্ত হাতে মোশারফের বোন পাসপোর্ট সাইজের ছবিটা বের করে দিলে আমি খুব দ্রুত চলে আসতে পারি। যদিও আসার আগে বলে আসি, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে যান। ওসমানীর ইমার্জেন্সিতে...

একসময়, কোন এক সময় নাটকের ঘরে আমিও ছিলাম। আমিও ছিলাম নতুন কবিদের ভিড়ে দাড়ানো এক পথিক। সেসব আর আমাকে এখন অতটা টানেনা। যতটা টানে বাদশাহ ফখরুদ্দিন। আমি আর সে পাড়াতে যাইনা। বালিকাগুলোকে বেশ্যা বলিনা যদিও নটী বলতে দোষ কী? আমি আর কবিতার পথে হাটিনা। অতটা দম আমার নেই যতটা দম থাকলে আবুল হাসান হওয়া যায়।

আমিও হয়ত ছিলাম স্বপনের পরিচিত তালিকার কোন এক মানুষ। মাঝে মাঝে খবর পাঠালে কিংবা কবিসুলভ বৃষ্টিতে ভিজে মাথা ধরালে আদা দিয়ে মগ ভর্তি চা আমাকেও দিয়েছে মমতায়, স্বপন মাহালি। স্বপন মাহালি কী ছিল আমাদেরই একজন। জানিনা। এসব আর খোঁজ রাখিনা। আমাদের পাইলট (নাটকের মাল টানতেন ঠেলায়, তাই পাইলট) বলে, আমি নাকি মুন্সি হয়ে গেছি। আমি শুধু দাত কেলাই আর বলি, বয়স হইছে, বেদাতি কাম ছাড় মিয়া। কিয়ের নাটক আর কিয়ের কী। তারচেয়ে আমার লগে আস। দাদারে বইলা চাইনিজে ঢুকায়া দেই। রোজ বিরিয়ানী খাইতে পারবা... পাইলট আমারে পাত্তা না দিয়া আমার বৌয়ের লগে খাতির জমায়!!!

আমারও ছিল এক বৈরাগীমন! সেই টানে এখনও মাঝে মাঝে ছাড়ি ঘর। এখনও আমারে ডাকে কোনকালে ঘর ছাইড়া আউলা হয়ে যাওয়া কোন কোন মানুষ। তাই নাগরীক জীবনের অনুষঙ্গ ক্রিকেট, আর দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠা বাংলাদেশ দলও আমায় ধরে রাখতে পারেনা। আমি উড়াল পাখি হয়ে ছুটে যাই যাদুকাটার তীরে। প্রেম জিনিসটা কঠিন বিষয়ে মন মজাই।

যাদুকাটার আশ্চর্য সুন্দর বালুচরে, হুহু বাতাসে দাড়িয়ে যখন আমি আর সংসারের কথা মনে করতে পারিনা তখনই বেজে ওঠে পকেটে। ধাতব শব্দে দুর হয়ে যায় মনের ভেতরের কুহু ডাক! চাররঙা স্ক্রিনে ভেসে ওঠে বাবু ভাইয়ের চেহারা। ফোন তুলে আওয়াজ দিই, বস আমি আর নাই। আমার মৃত্য হয়েছে। তিন আর আমার গলায় গলা মেলাননা। শুধু বলেন একটা খারাপ খবর আছে। ধাতস্ত হয়ে বলি, কি ব্যাপার বস...

আমার ভেতর কেমন এক আকুলি পাকুলি করে ওঠে। ঠিক তখনই যদি দুর পাহাড়েরর মাতাল বাতাস না আসত তবে কবি শামস শামীম, যে কীনা আমার নিষ্ঠুর আমাকেই চিনে সে হয়ত অন্য কিছু আবিস্কার করে ফেলত। রাতের জলসায় শুনা সকল গান আমাকে ছেড়ে পালিয়ে যায় অথবা আমিই তাদের আর ধরে রাখতে পারিনা! প্রেম জিনিসটা আমার কাছে সত্যি সত্যি কঠিন বিষয়ে পরিণত হয়।

স্বপনকে দেখিনা অনেক দিন। অনেকদিন তার কোন খবর নেয়া হয়না। তবু এইটুকু জানি, সে আছে তার বনানীতে, তার মত করে সে তাড়ির নেশায় কাটায় নিজের রচিত সময়। বাবু ভাই কেনযে আমায় এই খবরটা জানাতে গেল! আমি হয়ত অনেকটা বছর স্বপন আছে তার পৃথিবীতে এই ভুল তথ্যে কাটাতে পারতাম নির্ভার সময়। বেঁচে থাকা মানুষতো আর স্মৃতি খুঁজে বেদনা জাগায়না।

নতুন করে পুরনো শব্দ


আমাদের ঘরময় বাতাসের মত
টইটুম্বুর হয়ে ছিল বিষন্নতা
সেখানেই এলে তুমি, কাঁদলে, তাকালে, হাসলে, হাসালে
কোন ফাঁকে বিষন্নতা ছাড়ল
ঘর, টেরই পেলামনা। তুমি হাটলে, দৌড়ালে
আমরা ভুলেই গেলাম বিষন্নতা বলে একটি শব্দ আছে বাংলা অভিধানে


জ্বরগ্রস্ত তুমি যখন লাল চোখ নিয়ে বলো
কমলা রঙের ইঁদুরটা তোমার নীল জামা খামচে
খেয়ে ফেলছে! আমরা আঁতকে উঠি! ঝুপ
করে ঘরে ঢুকে পড়ে বিষন্নতার শকুন


তুমি এমন করে পুরনো ভুলে যাওয়া শব্দগুলো
আমাদের মনে করিয়ে দিওনা বাবাই...

৭ মার্চ

কি এক ঘোর লাগা কবিতা...
কি এক নেশা জাগানিয়া উচ্চারণ।
কি এক ভালবাসা খেলা করে
শব্দের পরতে, জেগে ওঠে জনমানুষ...

:: আমার কিছু এলোমেলো সরল মৌলবাদী ভাবনা ::

আমার কিছু সমস্যা আছে। অনেকেই বলেন। আমিও মাঝে মাঝে অনুভব করি। তবু সমস্যাগুলো পুষে রাখি। গোয়ার্তুমি ধরে রাখি।


আমার একটা গোয়ার্তুমি লোকগান বিষয়ক। বলা যায়, লোক কবি বিষয়ে। এদরকে যখন ভাংচুর করা হয়। তাদের গান চুরি করা হয় কিংবা একটু আধুনিক প্রলেপে হাজির করা হয়, আমার সেটা খারাপ লাগে। আমি অশ্লিল হয়ে উঠি।


মরমি সাধক হাছন রাজা। এ নামেই পরিচয়। আলাদা সূর আর ভাব নিয়ে তিনি বিরাজ করেন আমাদের গ্রাম্য জীবনে। মফস্বলি আমরা তাকে মনে করি আমাদের একান্ত মানুষ। যদিও তিনি ছিলেন জমিদার, রাজা রাজড়া, সামন্ত প্রভু। তবু ভাবের মানুষটা হয়ে যান আমাদের মতো প্রান্তজনদের।


আমরা শুনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুশিলের দরবারে (তখনও কী এভাবে সুশিল সমাজ বলে চিৎকার চলত ) হাছনকে পরিচিত করেছিলেন। আমার কেমন লাগে। কবি গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও মানতে পারিনা তার জবানিতে বলা পূর্ববঙ্গের গ্রাম্য কবি শব্দ গুলো। কেমন এক বেদনা জাগায় মনে। মন বলে, তুমি কি কবি আমার গ্রাম্যতাকে হেলা করলে।


অপ্রাসঙ্গিক হল কিনা বুঝতে পারছিনা। আমি শুধু আমার বোধের কথা বলি। ব্যক্তিগত বোধ।


একই ভাবে গায়কিতেও আনা হচ্ছে আধুনিকতা। হাছনের গানের প্রধান উপাদান হল একবারেই আঞ্চলিক কিছু শব্দের ব্যবহার। এই শব্দগুলোর উচ্চারনে হেরফের হলে অর্থই বদলে যায়!!! আমাদের শিল্পিরা, উর্দু হিন্দি, ইংরেজী গানগুলো গাইতে মাখরেজ আদায়ে চরম সতর্কতা নিলেও এমনতরো আঞ্চলিক গানগুলোতে তারা বড় বেশি নিরিক্ষক!!! নিরিক্ষার কবলে পড়ে গানগুলোর বারটা বাজে!!! দেশের সকল আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রেই এমনটা প্রযোজ্য।


আরও একটা কাজ হয় আমাদের এখানে। দেদারছে 'সংগ্রহ' বলে চালিয়ে দেয়া হয় লোক কবিদের রচনা। পলাশ নামের মহান গায়ক প্রবর কোন কালে লোক গীতির সংগ্রাহক ছিলেন আমার অন্তত জানা নেই। এটা আমার জানার সিমাবদ্ধতা হতে পারে। কিন্তু বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম এর গান তিনি সংগ্রহ বলে চালিয়ে দেন। মাকসুদ যখন গলায় ধারন করেন রবীন্দ্র সুর তখন জাত গেল বলে রব উঠে! কিন্তু প্রান্তবর্তি গানের মানুষ শাহ আব্দুল করিম বেঁচে থাকতেই যখন সংগ্রহের খাতায় চলে যান তখন কোন খানকির পোলা মাইয়াই কোন কথা বলেনা।


শাহ আব্দুল করিমের গান বিক্রি করে হুমায়ুনরা যখন টাকার সাথে মহান মানুষের তকমাটাও বাগিয়ে ফেলেন, করিম তখন সাদা জমিনের 280 টাকা দামের লুঙ্গি আর সফেদ পাঞ্জাবীর পেকেট ছেড়া ব্যাগে ভরে সিলেট রেল স্টেশনে নেমে পুত্র নূর জালালকে জিঙ্গেস করেন, বাবা রিক্সা ভাড়া আছেনি ফকেট, না আটিয়া যাওয়া লাগব...

দেয়ালের দাগ

দেয়ালের এক পাশে ছাপ্পান্ন নাম্বার দাগ দেওয়ার সময় দরজায় ঠক ঠক করে আওয়াজ হলো। দাগটা টেনে মতিন সাহেব দরজা খুলে দিলেন।'চাচা আমাকে চিনতে পারছেন? আমি সাইদ, রনজুর বন্ধু।'মতিন সাহেব কোনো কথা বললেন না। কিন্তু সেদিকে সাইদের খেয়াল নেই। সে নিজেদের পরিচয় দেওয়ায় ব্যস্ত_ 'আমার কথা কি আপনার মনে পড়ছে না? সিলেটে আপনাদের আর আমাদের বাড়ি ছিল পাশাপাশি। আমার বাবা তারাপুর চা-বাগানে চাকরি করতেন।'
তারাপুর চা-বাগান কথাটা মতিন সাহেবের মাথায় ঢুকেছে। এর আগে সাইদ যা বলেছে তিনি তার কিছুই শোনেননি। এমনকি তিনি ছেলেটাকে চিনতেও পারছেন না। হঠাৎ তার খেয়াল হলো_ তিনি ওর কথা যেমন শুনছেন না, তেমনি বলছেনও না কিছু। তাই প্রশ্ন করলেন_ 'তুমি এখন আসছ কোত্থেকে? প্রশ্নটা করে একটু অস্বস্থি হলো, তুমি বলাটা কি ঠিক হলো...!
'চাচা সিলেট থেকেই আসছি।'
মতিন সাহেবের অস্বস্তি কেটে গেল। চাচা বলছে যখন তখন ্তুমি বললে সমস্যা হবে না। আর অস্বস্তি কেটে যেতেই তিনি সাইদকে চিনতে পারলেন। সাইদ, রনজুর বন্ধু। গিয়াস উদ্দিন সাহেবের ছেলে। ওর মা, পারুল ভাবী। খুব সুন্দরী ছিলেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পায়েস রাঁধুনী। রনজু আর সাইদের খুব ভাব ছিলো। একবার এই ছেলে রনজুর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। সেই সাইদ, তার একমাত্র ছেলে রনজুর কিশোর বেলার বন্ধু। তাকে চিনতে এত দেরি...! ভেতরে ভেতরে মতিন সাহেব লজ্জায় নুয়ে গেলেন।
সাইদ কথা বলেই চলেছে। সে এসএসসি পাস করেই চলে গিয়েছিল সৌদি আরবে। চার বছরে চারবার হজ্ব করেছে। টাকা রোজগার করেছে বেশ ভালোই। একমাস আগে ছুটিতে এসেছে। খুব লজ্জা নিয়ে বলল। বিয়ে করে তারপর ফিরে যাবে। মতিন সাহেবের পাশে এখন মর্জিনা বেগম এসে বসেছেন। তিনিই কথা বলছেন সাইদের সঙ্গে। আরবের গল্প হচ্ছে।
'বুঝলেন খালাম্মা, হেরা গুহা হইলো আপনের পঞ্চাশ তলা বিল্ডিংয়ের চাইতেও উচায়। একেবারে খাড়াখাড়িভাবে উঠে গেছে। সেই খানে যাওয়া বিরাট কষ্টের কাজ। তাকত না থাকলে ওঠা সম্ভবই না। আমি আল্ল্লাহ-নবীর নাম নিয়ে একদিন ওঠা শুরু করলাম। ভাবলাম নবী করিম (সা।) রোজ রোজ উঠতে পারলে আমি তার উম্মত হয়ে ক্যান পারবো না। বিশ্বাস করেন খালাম্মা, আল্লাহ আমারে সেই খোশ নসিব দিলেন।'
সাইদ যা যা বলছে, মর্জিনা বেগম এর সবটাই জানেন। এসব কথা তিনি কতবার শুনেছেন! তবুও সাইদের মুখ থেকে শুনতে তার ভালো লাগছে। অন্য কেউ এ রকম কথা বললে সামনেই বসতেন কি-না সন্দেহ। বাচাল বলে হয়তো উঠে যেতেন। কিন্তু এখন তার উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এই ছেলেটাকে রনজুর মতো আদর করতে ইচ্ছে করছে। বার বার পুরনো কথা মনে পড়ছে। তিন বছর ছিলেন সিলেটে। তখনকার প্রতিবেশি সাইদরা। রনজু আর সাইদ এক সঙ্গে থাকত সারাদিন। কিন্তু দুজনের চরিত্র দু'রকম। রনজু মেধাবী, ধীর স্থির আর খুব লাজুক। সাইদ ঠিক উল্টো। হৈ চৈ করতেই ওস্তাদ, পড়ালেখায় তেমন মন ছিল না। কিছুটা মনভুলা আর পাগলাটেও ছিল। এখনো মনে হয় সে রকমই আছে। ভুলোমন, পাগলাটে, বাচাল। তবু মর্জিনা বেগম বিষণ্ন মুগ্ধতা নিয়ে সাইদকে দেখছেন। কাস এইট পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছে রনজু আর সাইদ। তারপরই বিচ্ছিন্ন। এরপর রনজু ভালো রেজাল্ট করে কলেজে গিয়েছে। সাইদ গিয়েছে সৌদি আরবে। সাইদ শরীরের চামড়া পুড়িয়েছে মরুভূমির তাপে। আর রনজু পুড়িয়েছে তার ভেতর, অন্য আগুনে। সাইদ হেরা পর্বতের চূড়ায় উঠে নিচের দিকে তাকিয়ে পিপড়ার মতো প্রায় অদৃশ্য মানুষ দেখেছে। আর মর্জিনা বেগম সমতলে থেকেও নিজের ছেলের কাছে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।
সাইদ চা খাচ্ছে আর তারাপুর বাগানের গল্প করছে। মতিন সাহেব খুব অবাক হয়ে গল্প শুনছেন। সাইদের জানার যেন আগ্রহ নেই। তার যত আগ্রহ সব বলতে। কোনো প্রশ্ন নেই। যেন সবকিছু তার জানা। মতিন সাহেব কিংবা মর্জিনা বেগম কাউকেই কোনো প্রশ্ন করেনি সে। এমনকি কোনো কুশল সংবাদও জানতে চায়নি। সবচেয়ে আশ্চর্য হলো, যে রনজুর পরিচয় নিয়ে সে এ বাড়িতে এসেছে তার কথা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করছে না। অবশ্য এজন্য মতিন সাহেব বেশ আনন্দিত। আগ্রহ, প্রশ্ন এসব কম থাকাটাই ভালো। রনজুর সঙ্গে সাইদের পার্থক্য এখানেই। রনজুর আগ্রহ যতটা উঁচু, প্রশ্ন ততটাই। সাইদ বড় ভালো, ওর ভেতরে প্রশ্ন কম।
মর্জিনা বেগম তাড়াহুড়া করে রেধেছেন। রনজুর পছন্দের খাবার তার বন্ধুর জন্য। চিংড়ি মাছ দিয়ে পুইশাক আর মোরগের মাংস। টেবিলে খাবার সাজিয়ে তিনি সাইদকে ডাকতে এলেন।
'খালাম্মা, দুইটা তো বেজে গেল। রনজু এখনো এল না? এক সঙ্গে বরং খাই।'মর্জিনা বেগম স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে গেলেন। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
সাইদ বোকা বোকা চোখে মতিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে। এখন সে শ্রোতা।'রনজু খুব ভাবত আর প্রশ্ন করতো। সব কিছু বদলে গিয়ে নতুনভাবে গড়তে চাইত। কিন্তু কীভাবে সেটা করতে হবে জানত না। তাই ছুটত ভাবনার পেছনে। মানুষের পেছনে ছুটত, ভুল মানুষের পেছনে। আমরা সেসব কিছুই জানতাম না। বুঝতাম না। শুধু রনজুকে ভুল বুঝলাম। তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম না। কিন্তু পরাজয় মানতে চাইনি কোনো দিন। তাই রনজু অভিমান করে চলে গেল। আজ থেকে ছাপ্পান্ন দিন আগে পাড়ার মোড় থেকে সে পালিয়েছে। দুটি সিসার পিণ্ড বুকের ভেতর রয়ে গিয়েছিল। তৃতীয়টা ফুসফুস ফুটো করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল...ঠিক ছাপ্পান্ন দিন আগে...।'
---------------------------------------------------------------------------------------------

জলজ বিষন্নতা

অনেকের মাঝে থেকেও
আমি ঠিক ঠিক একা হয়ে যাই
জলের মায়ায় বেড়ে উঠা জলজ বৃক্ষের মত
মাছেদের সাথে ভেসে থেকেও প্রজাতি ভিন্ন

বৃষ্টি অথবা তোমার বন্দনা

পেজা তুলোর মতো বৃষ্টি ঝরছিল
অথবা, মখমল বৃষ্টি...
অথচ আকাশের রঙ বৃষ্টিরঙা নয়
আশ্চর্য অন্য আলোয় রাঙা

বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি হাত বাড়ালে
সিঁড়ির ঠিক পাশে খুলে রাখলে স্যান্ডেল
কংক্রিটের উঠোনে হেটে গেলে কোমল পায়ে
একবারও আমার দিকে তাকালেনা

বৃষ্টির কণা স্পর্শ করছে তোমার চোখের আলো

...বড় ইচ্ছে হয় বৃষ্টি হতে...

...বড় ইচ্ছে হয় বৃষ্টি হই...

আমার বাবাই


সকাল আটটায় তুলি ডাক দেয়। চোখ টেনে মেলে দেখি সোঁনাজান মাথাটা মায়ের বুকে চেপে পা'টা তুলে দিয়েছেন বাপের উপর। আদর করতে ইচ্ছে করে। ঘুম মুখে এগিয়ে যাই। ফিরিয়ে দেয় তুলি। ইশারায় বলে ফিডারটা দাও... এটাই নিয়ম। রাজপুত্রকে ঘুমের ঘোরে না খাওয়ালে আর খাওয়ানো যাবেনা।

পা টিপে টিপে ডাইনিং রুমে যাই। কষ্ট করতে হয়না। আম্মা জেগে উঠেছেন আগেই। ... দাদু ভাইয়ের জন্য দুধ বানিয়ে দেন। কোনমতে মুখে পুরেদিই... তিনি টানেন ঘুমের ঘোরে। আমি আবারও তন্দ্রাচ্ছন্ন হই!

নয়টা তিরিশে আবারও ডাক পড়ে। ধুন্দুমারের শুরু। তাড়াহুড়োয় কাটে ১৫ মিনিট। পুত্র জেগে উঠেছেন ততনে। তিনি পরম মমতায় আচড়ে পাচড়ে মুখের দু এক যায়গায় জানান দিয়ে দেন। আমি শুধু আহাদিত হই আর বৌকে দেই তাড়া!

সোনাজান ইনিয়ে বিনিয়ে কত গল্প করতে চায়... আমার সময় নাই! বলি, বাবাসোনা দাদু তোমায় ডাকে। কিংবা দাদাভাইকে ডেকে বলি, ওরে একটু সামলাওতো। কেমন অভিমান নিয়ে সরে যায় সে। টোনা-টুনি বেরিয়ে পড়ি চুরি করে, ফাঁকি দেই বাবাইটারে...

ব্যাস্ত রাস্তায় ছুটে দুই চাকা... বৌকে নামিয়ে দিয়ে চল নিজের গন্তব্যে। শুরু হল যন্ত্রের জীবন।

নিউজপ্রিন্ট... কম্পিউটার... প্রেস... এ্যাসাইনমেন্ট... ফোন... প্রশংসা... হুমকি... মিটিং... মগ ভর্তি চা... প্রফেশনাল বজরং... খুনসুটি... সময় পেলে বৌকে ফোন... বাসায় লাইন লাগালে মায়ের বকুনি, আমাকে না দাও নিজের ছেলের জন্যতো কিছুটা সময় দিতে পারো! মাঝে মাঝে ছেলের হাতেই রিসিভার... আধো আধো বুলিতে... বাবা... আওওও... ভেতরে কেবল মুচড় লাগে। ফোন রেখে দিই। বৌকে ফোন দিই... যাবে? মন খারাপ করে বলবে, মিটিং করতে হবে, কিংবা ভিজিটর আসছে, নয়ত-রিসিপশনেই বলে দিল- ম্যাডামতো বোর্ডরুমে...

কোন কোন দিন হয়ত বৌই বল্ল চল বাসায় যাই... আমি তখন শহর থেকে ২০ কিলো দুরে নয়ত মাননীয় এসেছেন! তেনার গলাবাজী শুনছি!তবুও মাঝে মাঝে সময় করুনা করে... আমরা ছুটে যাই! সেকি উৎসব সেইসব দিনে!

ফিরতে ফিরতে সন্ধা। বৌ ফিরে স্থায়িভাবে, আমাকে আবারও ছুটতে হয়। প্রায়ই সন্ধায় বাবাই ঘুমাতে যায়। এমনটা হলে আর মিস্টি কথা কিংবা মুখের আশ্চর্য পবিত্র ঘ্রান নিতে পারিনা। মন খারাপ করে বেরিয়ে আসি। আর যদি ও জেগে থাকে... উফ... বর্নণা নাই...

তবে বেরুবার সময় জ্বালা... বলবে, বাবা যাইওনা, থাক আমার কাছে... ও মাগো কত আদর ঝরেগো... আমি কানে তুলো দিয়ে বেরিয়ে আসি।ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত।

--------------------------------------------------

আর পারছিনা লিখতে, মন খারাপ লাগছে, খুব বাজে মনে হচ্ছে নিজেকে।


লেখা হয়েছিল : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০০৭। সামহ্যোয়ার ইন ব্লগে।

Thursday, June 14, 2007

জ্বরগ্রস্থ বাক্যবিন্যাস

১.


কৈশোরের জ্বরে

মরে যাওয়ার ইচ্ছে হত।


এখন

শুধু তোমার কাছে

আসতে ইচ্ছে করে।



২.


যতই গভীরে যাই কোমল

কোমল কোমল পলি

আমি চাষে মাতি...


ফসলের ঘ্রানে মেতে উঠুক

উঠোন তোমার আমার




অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ০৮:২২:২০
দ্্বিতীয়?ভাল হইছে। চুপেচুপে আসেন আর গ্যাপে গ্যাপে দেখা হয়! ঘটনাটা কি?



নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ০৮:২৫:৩২
ধন্যবাদ,একটু সমস্যায় ছিলাম কৌশিক ভাই। ঝামেলাময় জীবনরে ভাই।


মাহবুব সুমন বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ০৮:২৬:০৪
ঘটনাটা কি ?ভাবীরে কয়া দিমু !


আলভী বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ০৮:২৬:০৬
জটিল হইছে ম্যান।


নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ০৮:৩১:৩৭
মাহবুব ভাই ডর দেখান কেনরে ভাই?আলভী: মানুষের চোইতেওকি বেশি জটিল?


অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১০:১১:৪৭
কঠিন................তয় মানুষের মত নয়......


নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১১:০৪:৪৭
ঘটনাটা কী? সবাই বলে কঠিন, জটিল...!এরচেয়ে সহজ আর কী হইতে পারে...ধন্যবাদ আবু সালেহ


অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১১:২৭:০৬
সেই যে নাই হইলেন আর দেখা মিললো এখন।পোলার কি অবস্থা?


নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১১:৩০:৩৯
ভাল এখন।আসলে বুঝলাম এখন কতটা জড়াইছি জীবনের প্যাচে!কেমন আছেন?


অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১১:৪০:১৭
ঐ আরকি!অল টাইম হিট...


অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১২:৫৫:৪৯
হুম!ঠিকাছে এখন?


নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১৩:০২:০২
হু


অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১৩:০৫:২২
ওকে , পরে কথা হবে বাকী সব ।


অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১৩:৫৩:০৫
লেমন জুস!


নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১৭:১৯:২০
লেমন জুস খুব পছন্দ করেন নাকি শিমুল? আমারও ভাল লাগে।



অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১৭:৩৮:৪৭
আদার জু্যস খাইছেন?



নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৩ ১৭:৪০:৫৬
খাই নাই তবে খাওয়াইছি অনেকরে।আরেকজনরে খাওয়ানোর প্রস্তুতি নিতেছি। @ ধুসর

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৪ ০৭:২৬:৫৭
পছন্দ মানে? হেভী জিনিস! খাঁ খাঁ গরমে বাসায় ফিরে...। আহ্!

নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৪ ০৭:৩৭:১৭
ধুসর বল্ল আদার জুসের কথা। কোন মন্তব্য আছে? @ শিমুল

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৪ ০৭:৪৪:১৬
যতটুকু জানি - বিভিন্ন সময়ে ধুসর আদাজল খেয়ে মাঠে নামতো। ঐটাই মনে হয় - আদার জুস! ঠান্ডার দেশে থাকলে ঐটা খাইতে হয়।আমার আর আপনার মতো নাতিশীতোঞ্চ দেশে থাকলে লেমন জুসই ভরসা!কী বলেন?

নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৪ ০৭:৪৬:৩৭
হা...হা...লাস্ট গল্পটা খুব ভাল লাগছে। দারুন লিখছেন।

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৪ ০৭:৫৭:১১
থ্যাংকস্!ওখানে আপনার কমেন্ট পড়ে আমি আবেগী হয়ে পড়েছি। ধন্যবাদ এখানে জানালাম, ওখানেও বলবো! ভালো থাকুন!

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৪ ০৭:৫৮:২০
ধুসর আসার আগেই এখান থেকে ভাগি, নাইলে আমাকে আদাজল খাইয়ে ছাড়বে!!!!!!!!!

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৪ ২১:০৪:২০
খবরদার ভাই...!!!এইসব কি হইতাছে শুনি?আমার জমিতে আপনি চাষ করবেন কেন?

নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৫ ১০:১১:০২
চাষতো চাষইতোমার আমারকীহে অনন্ত

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৫ ২২:৪০:৫৬
হে জ্বরগ্রস্ত বালক, সম্ভব হইলে জিমেইলে আইসো ।

নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৫ ২২:৪৮:২০
জ্বরগ্রস্ত বালক এখন জিমেইলে...

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৫ ২৩:৪৫:২২
হাহাহা @ শিমুলনজমুল ভাইয়ের কী অবস্থা? কদম্ব তল হইতে রিট্রিট করেছেন নাকি?

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৫ ২৩:৪৮:৩৯
কোপানি হইছে বাক্যবিন্যাসগুলান!!!! পুরা কোপানি................................

নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৭ ০৬:৩৮:১১
কোপায়া যান দ্রোহী, ধুসর কদম্বতো ছাড়েনারে ভাই, বড়ই আজব নেশা

অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৭ ০৬:৪৮:৫২
হ্যাঁ.........যতদিন বাঁচবো, ততদিন কোপাবো।নাহলে জমি চাষ দিব কিভাবে?

নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৭ ০৬:৫১:৫৬
শুভকামনা দ্রেহীর জন্য
অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৭ ০৬:৫৩:৩২
জি্ব, ধন্যবাদ।
মাশীদ বলেছেন :
২০০৭-০২-০৭ ২২:৪৫:০৩
সবার সাথে সহমত।খুব, খুউব সুন্দর।
নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৭ ২৩:০৫:৫৮
ধন্যবাদ মাশীদ
অতিথি বলেছেন :
২০০৭-০২-০৯ ২১:২৩:৩৭
সুন্দর!
নজমুল আলবাব বলেছেন :
২০০৭-০২-০৯ ২৩:৩৩:৩৫
সাদিক : ধন্যবাদ

Monday, June 11, 2007

:: চন্দ্রাবতী বিষয়ক ::

রৌদ্র ছায়ায় এত খেলা আকাশে,
চন্দ্রাবতী তোমার আলো ছায়ায়
সব খেলা ম্লান।

কী করে বলো তুমি আসবেনা
আমার কাছে!
চোখে ঠিকই আদর ঝরে পড়ে
তোমার। মুখে বল 'না'।

চন্দ্রাবতী অতটা বেদনা
কীভাবে পোষ ভেতরে তোমার!
অমন বেদনাকীভাবে দাও আমায়!

তোমার নিরবতায়
আমাকে স্পর্শ করে মৃত্যুর শীতলতা।

::বউ, বাটা, বল সাবান::

সমস্যা শুরু হয়েছিল বিয়ের দিনেই। শ্বশুর বাড়ির লোকজন দাদাকে মাত্র এক হাজার টাকা নজরানা দিলো! খেপে গেলেন মা, বাবা, বড় চাচা...।
ভাবী যে শো-কেস এনেছে সেটার তাকগুলো কদম কাঠের। সোফার ফোম খুব বাজে, দুদিনেই বসে যাবে। ড্রেসিং টেবিলটার ডিজাইন সেই মান্ধাতা আমলের। আরো কতো ভেজাল যে আছে.....!
ভাবীর অনেক খুঁতও বেরুতে লাগলো। কথা বলে কেমন করে, তিন বাড়ির মানুষ শুনতে পায়!ঠা ঠা করে হাসে। বাপের বাড়ির এতো অপরাধের ব্যাপারেও তার কোনো বিকার নেই। এমন ভাব দেখায়...! যেন কিছুই হয়নি...
এরকম হলে কার না খারাপ লাগে! শরীর জ্বলবে না কার?
আর দাদাও এমন ভেড়ুয়া! বউ এতো বেহায়ার মতো চলে তবু কিচ্ছু বলবে না। যেন কিছুই হয়নি। বিয়েতে এতো অপমান, আর সে মিন মিন করে বলবে, 'থাক এসব নিয়ে কথা বাড়িয়ে আর লাভ কী!' কোনো আত্মসম্মান নেই। দু'দিনেই বউয়ের আঁচলের তলে ঢুকছে!
আমরা কেউ ভাবীকে পছন্দ করি না। আচরণেও সেটা বুঝিয়ে দেই। কিন্তু ভাবী সেটা গায়েই মাখে না। আর নিজেকে জড়াবে সবকিছুতে। আমরা হয়তো বসে গল্প করছি বা খেলছি, এসে বলবে_ 'আমিও খেলবো তোমাদের সঙ্গে...।
'বাবা বাটার জুতা পরেন। প্রাচীন ডিজাইনের ভোম্বল সাইজ জুতা পরছেন তো পরছেনই। দাদা কতোবার অন্য কোম্পানির জুতা এনেছেন, বাবা পায়ে দিয়েও দেখেননি।
আর মা বল সাবান না হলে কাপড় ধোয়াই বন্ধ করে দেন। কতো কতো নতুন ডিটারজেন্ট বেরিয়েছে, তাদের কতো বাহারি বিজ্ঞাপন! কিন্তু মা তার বল সাবান বদলাবেন না।
বাবা, মা, বড়চাচা_ সবারই এমন অনেক কিছু আছে, যা কখনো বদলানো হবে না। তিনজনই বলেন_ 'এসব বদলানোর প্রশ্নই ওঠে না।
'বল সাবান কিংবা বাটার জুতা বদলানো অসম্ভব। কিন্তু বউ বদলানো কোনো ব্যাপারই না। এটা আমরা সবাই জানি। মা বলছেন, দাদার বউ বদলে ফেলবেন।
.........................................................................................
যারা প্রথম আলো'র প্রথম দিকের পাঠক তাদেরও হয়ত নজরে পড়তে পারে গল্পটি। কারন প্রথম প্রকাশটা হয়েছিল 'বন্ধুসভায়'।

Saturday, June 9, 2007

ব্যক্তিগত ব্যাখ্যান

আমাদের সুসময়ে সহবাস নামের ছোট গল্পের একটা কাগজ বেরুত। হাসান মোরশেদ ছিলেন সম্পাদক। সাথে ছিলাম নিলাঞ্জন দাশ টুকু, আরিফ জেবতিক, আসিফ মনি, অর্জুন মান্না, সুরঞ্জিত সুমন, অর্ণা রহমান, জাকির আহমদ চৌধুরী, রিয়াদ আওয়াল এবং আমি। সহবাস এর চতুর্থ সংখ্যায় ছাপা হয় ব্যক্তিগত ব্যাখান। ছাপাখানা থেকে আসার পরই বড় ধরনের কয়েকটি অসংগতি আবিস্কার করি আমি। মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু কামান দাগা শেষ। তাই আর ঘাটাইনি বেশি। সাত বছর পর কিছুটা শুধরে নিলাম আজ।


;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;


প্রাইমারি স্কুলে একটা বিষয় ছিল ছবি আঁকার। বাংলা স্যার মাঝে মাঝে কিছু একটা আঁকতে বলতেন। আমরা আলতো হাতে তা আঁকতাম।ক্লাস বলতে এই পর্যন্ত। কিন্তু পরীক্ষার সময় ছবি আঁকার আলাদা পরীক্ষা ঠিকই হতো। পরীক্ষার দিনে ক্লাসের সবাই রঙ, রঙ পেন্সিল, তুলি, স্কেল কত কি নিয়ে আসতো। ...আমার সে সব নেওয়া হতো না। বড় আপা কচি সীমপাতা তুলে দিত বেশ কটা, সাথে বাবার লাল কালির কলম। আর আমার লেখার কলমটাতো থাকতই। এ জন্য আমার আঁকা ছবি সব সময়ই তিন রঙের হতো। কচি সীমপাতা সবুজ, লাল আর কালো নয়ত নীল এই তিন রঙা। শুধু একবার ছাড়া সেবার বড় আপা কিভাবে যেন দুটো রঙ পেন্সিল জোগাড় করেছিল। একটার রঙ গোলাপী অন্যটা খয়েরী।



সেই শৈশব থেকে তাই রঙ আর রঙ পেন্সিলের জন্য আমার মনে কিযে বেদনাবোধ। পেন্সিল দেখলেই বুকের ভেতর অপ্রাপ্তির ব্যাথা কেমন দলা পাকাতে শুরু করে। আমার তখন বড় আপার কাছে যেতে ইচ্ছে করে। মৃত্যুর মত শীতল হয়ে যায় আমার চারপাশ।



মন কেমন হয়ে যায় কদম দেখলেও। আকাশছুয়া এক সারি কদম গাছ পেয়েছিলাম শৈশবে। তার সোনালি ফুলের কোমলতায়, কাটিয়েছি অনেকটা সময়। রাতের আধারে সেখানটায় নেমে আসে রাজ্যের নিরবতা। সূর্যবিদায়ের পর তাই সেদিকটায় যাওয়াই হতো না। মাঝে মাঝে খুব দরকার হলে কদম সারির ওপাশে বেলাদির বাড়িতে যাওয়া হতো। তিনিও আসতেন কোন প্রয়োজন হলে। ...এক রাত। খুব গভীর নয়। দশ, এগার হবে। হঠাৎ কদমতলার দিক থেকে কি রকম এক গোঙানীর শব্দ শুনে বেরিয়ে এলাম সবাই। টর্চ লাইটের আলোয় দেখলাম বিভৎস এক দৃশ্য। বেলাদি বড় কদম গাছটার পাশে পড়ে আছে। উড়না দিয়ে বাঁধা মুখ...



এক সপ্তাহের মাথায় বেলাদিরা কাউকে কিছুনা বলে কোথায় যেন চলে গেল। চন্দন ভাইয়া বলেছিলো 'মালাউনরা' আর কোথায় যাবে। ইন্ডিয়াতেই গেছে। সত্য হতে পারে আবার মিথ্যাও। কিন্তু বেলাদি চলে যাবার পর থেকে কদম দেখলেই তার কথা মনে হয়। মাসিমার কথা মনে হয়। আর মনে হয় সেই রাতের কথা ...মনটা খারাপ হয়ে যায়। আর তাই, প্রতি বর্ষায় মুঠো মুঠো সোনা ছড়িয়ে যে কদম শোষে নিত বালক বেলার কষ্টগল্প। সে নিজেই আজ কষ্টের অংশ, রঙ পেন্সিলের মতো।



বড় আপা পেন্সিল কার কাছ থেকে পেয়েছিলো সেটা আমি পরে জেনেছিলাম। ওগুলো ছিল চন্দন ভাইয়ার।যে চন্দন ভাইয়া বেলাদিকে মালাউন বলত। দাবড়ে বেড়াত মোটরসাইকেল। আমাদের পাড়াতেই ওদের বাড়ি। যে সকালে বড় আপা বিছানা ছেড়ে উঠলোনা, যতক্ষণ না মা আর হাসু খালা তাকে পাটি বিছিয়ে উত্তর দক্ষিণ করে শোয়ালেন...। সেদিন আমি জেনেছিলাম পেন্সিলগুলো চন্দন ভাইয়ার। আমাকে কেউ বলে দেয়নি। তবু। আর বলবেই বা কী। এই যে আপা ইচ্ছে করে মরে গেল। মা, বাবা কিংবা দিদা কেউ সে কথাটা আমায় বলেনি। তবু বুঝেছি। আসলে তখন বুঝতে শিখছি অনেক কিছু।



কবিতার কামড়ে অস্থির হওয়ার তখন থেকেই শুরু। কবিতা! কবিতা আমাকে ছেড়ে যায়নি, আরও অনেকের মতো।



সমাজ বিজ্ঞান নবম শ্রেণীতে।
একসাথে কাস ছেলে মেয়েতে।
প্রথম দেখলাম শময়িতা...
বাদামী ত্বক, চিবুকে বিষন্নতা...

বুক জুড়ে ঝড়, শরীরে জ্বর ...
আকাশের বুকে দেখা তারাদের ঘর।
তারাদের আয়ু খুব বেশি ক্ষীন...
ফর্সা পৃথিবী, আলোতে রঙিন।
চোখ খুলি আলোয়।
শময়িতা নেই!

শময়িতা নেই...
সামনে মিছিল...
আলগোছে হয়ে গেলাম মিছিলের জন...



সে এক ঘোর লাগা সময়। কত স্বপ্ন, কত কথা, সমাজ বদলের কথা। তার আগে বদলে যাই নিজে। ইশতিয়াক, অর্জুন, জাফর আরো কতো নাম। সে নামের ভিড়ে আমিও মিশে যাই। সবার হাতে একেকটা চাবি। আকাশের নিচে যাব আমরা। যেতে হলে খুলতে হবে অনেক ফটক, অনেক তালা। ওগুলো খোলার চাবি আমাদের হাতে হাতে। আমরা চাবি নিয়ে ঘুরি। খুলে ফেলি একেকটা অদৃশ্য তালা। দ্রোহের আগুনে জ্বালিয়ে দিতে চাই পুরোটা বর্তমান।



...হঠাৎ আকাশ ঝরায় বৃষ্টি। অঝোরে ঝরে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে অর্জুন আর আমি ইশতির জন্য আফসোস করি। আফসোস করি জাফরের জন্য। ওরা যদি রক্ত স্নানের আগে একটিবার অন্ততঃ দাঁড়াতে পারত এই বৃষ্টি আকাশের নিচে...। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। আমি দৌড় দিই।



অর্জুনও দৌড়ায়। দৌড়? ওরতো মা নেই। মুহূর্তের সে ভাবনা। অন্য কেউ নিশ্চয় আছে, আরো জোরে দৌড়। হাত থেকে ছুড়ে ফেলি ভয়ংকর সেই চাবি। ভেজা শরীরেই জড়িয়ে ধরি মাক। হতচকিত হয়ে পড়েন মা। তারপর আঁচল শুষে নেয় মাথার জল।



এ আঁচলটা এমন কেন? এত মমতা মাখা! ছোট বেলায় ভাত খাওয়া হলে মা তাঁর আঁচলে মুখ মুছে দিতেন। আঁচলের সে ঘ্রাণ এখনও পাই। বাবা খুব মেরেছিলেন এক বিকেলে। অনেক রাত পর্যন্ত কেঁদেছিলাম মায়ের আচলের আশ্রয়ে। পরের দিনও খুব মন খারাপ। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে বাবা ডাকলেন। আস্তে গিয়ে পাশে দাঁড়ালাম। পেছনে বড় আপা, বাবা একটা প্যাকেট দিলেন, বড় আপা ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে খুলে ফেললো। বেরিয়ে এলো একটা শার্ট। নীল রং। বড় আপা বললো "আকাশী রঙের শার্ট! অপু এটা পরলে তুই আকাশের অংশ হয়ে যাবি! সেদিন থেকে আকাশ আর আকাশী রং আমার সবচেয়ে প্রিয়।



মানুষ মরে গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। আকাশ জানে নিশ্চয় প্রত্যেক তারার ঠিকুজী। এই যে আকাশ আমার এত প্রিয় তবু সে আমায় বলে না ঠিক কোন তারাটা বড় আপা!

...বড় আপা কেমন আছিস এখন?
বৃষ্টি ছিল তোর খুব প্রিয়।
এখন বৃষ্টিতে ভেজা হয়?
আকাশ থেকে আমাকে দেখা যায়?
...আমার খুব ছবি আঁকার শখরে আপা, অনেক ছবি, রঙে ভর্তি ছবি।
তার জন্য রং চাই, তুলি চাই, পেন্সিল চাই। অনেক রং...
অনেক তুলি...
অনেক পেন্সিল, রং পেন্সিল...
কে দেবে এতো কিছু?

বড় আপা, আয় না ফিরে। আমার সকল চাওয়া তোর জন্য তুলে রাখা বড় আপা। শুধু তোর জন্য। আসবিনা বড় আপা। না আসলে আমাকে নিয়ে যা তোর কাছে। তুই কাছে থাকলে আমার আকাশটা কত উজ্জ্বল হয়ে যাবে।


.............................................................................................

স্কেচ:নীলু সিনহা


;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;

গঙ্গাস্নান




আগুনে জল দেবার কেউ নেই,
নক্ষত্র রাতে তাই শুধু
আগুন জ্বলে যায়...



জ্বলে যায় আগুন
আলবাব পুড়ে...



চন্দ্রাবতী আমার, একবার
আমায় গঙ্গাস্নানে নিয়ে যাও।







বেহুলা হবে...



রাতের আকাশ তারা ভরা।

পাশে লাশ, একাকী বেহুলা।



নাচে কংকাল তা-ধিন-ধিন।

পরাণ বন্ধু বাজায় বীন।

বীনের সাথে বাজছে বাঁশি।

কিসের বাঁশি? হাড়ের তৈরি।



মাথার খুলি এসট্রে হলে,

ফিল্টার হবে হাতের হাড়ে।

আলবাব হলে লখিন্দর,

বেহুলা তবে কে? তুমি হবে?



স্কেচ:নীলু সিনহা


আপন ভূমিকা

এই লেখাটি পথ নামের একটি সাহিত্যপত্রে ছাপা হয় ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারীতে। কয়েকটা শব্দ বদলে পোস্ট করলাম।
এক.
মোনা হঠাৎ বলে উঠল 'রাজু তুই এত ভালো, তোকে আদর করতে ইচ্ছে করছে রে'। আমি 'থ' মেরে যাই। এই মেয়ে বলে কি! ও জানেনা বিশের যুবক যুবতি পরস্পরকে আদর করলে সে আদর কবিতা হয়ে যায়। মুখে কথা আসে না, পিট পিট করে তাকাই মোনা'র দিকে। মোনা হাসে, খিল, খিল,। গড়পড়তা বালিকার মতো মুখে অাঁচল নিয়ে হাসি থামায়। হাসি থামতে চায় না। বলে যায় মোনা। 'এই এমন তাকিয়ে আছিস কেন! তুই কি ভেবেছিস পুরুষ ভেবে তোকে আদর করব! আরে তুই আবার পুরুষ নাকি? দেখতে কেমন বাচ্চা লাগে!'আমি ঘোৎ করে উঠি 'মোনা কোন কাজটা করলে আমার ব্যাটাত্ব প্রমাণ হবে?' সে থেমে যায়। অনেকন হাসলে চোখের কোনো পানি জমে। তার দু-চোখের কোনো কুয়াশার মতো পানি।হাঁটতে থাকি। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো চকচকে গাড়ি। আয়নায় চেহারাটা দেখে নেই। ঠিক আছে সব কানের লতি পর্যন্ত জুলপি, গোঁফ, মাথাভর্তি কুকড়ানো ছেলেচুল।
দুই.
হাসান মিয়ার চায়ের দোকানে আমার দুর্দান্ত বন্ধুরা দাঁড়িয়ে। দেখেই হাঁক ছাড়ে 'আও ইয়ার, তুমি আজ আমাদের হিরো। এখন থেকে এই রাস্তায় যত মোয়ে যাবে সব তোমার।' অস্বস্থি নিয়ে ওদের পাশে দাঁড়াই। প্রথম রিকশা যায় আমি তাকাতে পারিনা। ওরা হাসে। দ্বিতীয়টা যায়... পা দিয়ে রাস্তায় অদৃশ্য আলপনা অাঁকি। তৃতীয়টা চলে গেলে জাকি টেনে টেনে বলে, 'কী গুরু ম্যান্দা মেরে গেলে নাকি, ব্যাটা হও গুরু, ব্যাটা হও।' দাদাজানের পেতলের গ্লাসটা মেঝেতে পড়লে যেমন ধাতব শব্দ হয়, তেমন ঝনাৎ করে উঠে আমার মাথার ভেতর, ব্যাটা হও... ব্যাটা হও... তখনই আসে রিকশাটা। অনেকদূর থেকেও চিনতে পারি মোনা।আমার ভেতরে ব্যাটাত্ব প্রমাণের মহড়া শুরু হয়। টান হয়ে দাঁড়েই। মোনা কি আমায় দেখতে পেয়েছে? ওই মুখে যেন এক চিলতে হাসি। অবজ্ঞার হাসি? আমি জেগে উঠি পুরোপুরি। নাগালে আসতেই হাঁক দেই, 'ওই মেয়ে, তোর...
তিন.
সাতদিন সময় কি অনেক? হয়ত হঁ্যা হয়ত না। বসি গোল হয়ে। মোরশেদ, ফয়সল, শাহানা, রোকন, মোনা, আমি। কথা বলি সবাই, কথা বলি একা। সবাই বক্তা, কেউ নেই শ্রোতা। ফিস্ ফিস্ করে বলি, 'মোনা বিশ্বাস কর হঠাৎ কেমন হয়ে গেলাম, মাথাটা ঠিক ছিলনা...' 'থাম্ রাজু, এমনতো কতই হয়।' বলার ভঙ্গি বরফ শীতল, কথা বলিনা। চোখের কোন দিয়ে তাকাই। গম্ভীর মোনা।
চার.
হাসান মিয়ার চায়ের দোকানটা কেমন যেন হয়ে গেছে। সবসময় জমজমাট, অথচ ফাঁকা। হাসান মিয়া বসে থাকে মরা মানুষের মতো। জাকি আসেনা। অনেকদিন। কাঁটাছেড়া শেষে তাকে রেখে দেয়া হয়েছে মাটির অন্ধকারে। বান্টি মোটা বুট সমেত পা-জোড়া একটা টেবিল তুলে দুধ চিনি বেশি দিয়ে চা গিলে আর ঝিমোয়। দেখলেই হাঁক ছাড়ে, 'রাজু আয় বাপ, একটা কবিতা শুনিয়ে যা।' বান্টির অনেক টাকা। না চাইতেই চা খাওয়ায়। হরদম জ্বালিয়ে দেয় নামি ব্রাণ্ডের সিগারেট। আমি বসে সিগারেট টানি। রিকশা গুনি। পুলিশ আসে, আবার চলেও যায়। চায়ের দোকানটার বয়স বাড়ে, বিশ বছর একদিন... দুইদিন... তিনদিন... মানুষ বিশবছরে যুবক হয়। চায়ের দোকান যুবক হয় কত বছরে...
পাঁচ.
শাহানা এসেছে চারমাস পর। পাক্কা তিনমাস আগে ওর বিয়ে হয়েছে। একমাস হলো শাহানার স্বামী রুটি সেঁকার জন্য আবার চলে গেছে ইউরোপ। কিছুদিন পর যাবে শাহানা। উৎপাদিত পণ্য নিয়ে যদি ফেরত আসে নিশ্চয়ই নাক উঁচু করে বলবে, 'এত ডার্টি, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।' শাহানা বসে মোনার পাশে। আগে পাশাপাশি বসত রোকন আর শাহানা। রোকন আসেনি আজ। বেশ কিছুদিন ধরেই আসছেনা, হয়ত আর আসবেও না। কোন চালের দোকানদারই এসময় দোকান ছেড়ে উঠেতে চায় না। মোনা'কে একটা কথা বলব। কিন্তু ও তাকায় না। আমি বসে থাকি। অপো করি তার দৃষ্টির।
ছয়.
সিগারেটে টানটা দিয়েছি সবে। বান্টি ওয়াক করে ওঠে। তাড়াতাড়ি করে ধরি। সিগারেটটা পড়ে যায়। বমিতে ভেসে যায় বান্টি। ভেসে যায় হাসান মিয়ার চেয়ার টেবিল। ধরাধরি করে বান্টিকে একটা টেবিলে শুইয়ে দিই। মেঝেতে চোখ পড়তেই দেখি সিগারেট ডুবে আছে। খেয়াল হয় শার্টে বমি লেগেছে।
সাত.
ঘরে পা রাখতেই চমকে উঠি। মোনা বসে আছি, পাশ জড়সড় শাহানা। ভূমিকা ছাড়াই একটা খাম এগিয়ে দেয় মোনা।... একটা ছবি... শাহানার বর... সোনালী চুলের মহিলা... পুতুলের মতো একটা বাচ্চা শাহানা মোনা কেউ কোনো কথা বলছে না...।
আট.
সব শালারাই বুঝি রুচি বদল করার জন্য বার বার ফিরে আসে।

আমাদেরও ছিল সুসময়

এই লেখাটা মানসম্মত নয়। অবিন্যাস্ত এবং অসম্পূর্ণ। অনেক কথা, অনেকের কথা বলার ছিল, বলা হল না। আসলে এখন আর আগের মত বলতে পারিনা, যতটা কথা আছে বুকের ভেতর। তাই প্রথমেই দুঃখপ্রকাশ, মা প্রার্থনা করজোড়।


২৩ নভেম্বর ১৯৯৭। শীতের সন্ধ্যা। সিলেট শহরের সবচেয়ে কাছের একটি গ্রাম। প্রায় নিঃসঙ্গ তরুণ বসে আছে লন্ঠনের আলোয়। কিছুটা বিষন্ন। প্রায়ান্ধকার সেই সময়ে তালপাতার সেপাই এর কন্ঠ। বারান্দায় বেরিয়ে আসে বিষন্ন তরুণ। অন্ধকারে দাঁড়ানো অবয়ব দেখে বিস্ময়ে প্রশ্ন করে তুমি! উত্তরে বলা হয়_'শুভ জন্মদিন'। বিষন্নতা কেটে যায়। মন ভালো হওয়া কান্না গলায় দলা পাকায়। বোকা বোকা আবেগ নিয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ বলে কীরে আমাকে ঘরে যেতে দে। ঠান্ডা লাগছে। সেদিনের সেই বিষন্ন তরুণ হলাম আমি আর বোকার মত ভালবাসা ধারণ করা লম্বা লোকটার নাম রিপন চৌধুরী। সেবারের সেই জন্মদিনে এই একজনই আমাকে শুভ কামনা জানিয়েছিল। আর শুভেচ্ছা জানাতে রিপন দা প্রায় চার কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে গিয়েছিল। চার কিলোমিটার সাইকেল চালানো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সাইকেলটিতে কোনোদিন তেল-গ্রিজ যদি না দেওয়া হয়? সাইকেল চালিয়ে রিপন দা ঘেমে নেয়ে গিয়েছিল। এমনই ছিল আমাদের বন্ধন। এমনি জড়াজড়ি করে বেড়ে উঠেছি আমরা ক'জন তরুণ-তরুণী। একই শহরে একই সময়ে প্রায় একই রকম স্বপ্ন নিয়ে আমরা বেঁচেছিলাম অনেকদিন। হঁ্যা ছিলাম। এখন আর নেই। ছিটকে পড়েছি। সময় এবং স্বপ্ন থেকে।আমরা একাট্টা হয়েছিলাম কবে? সম্ভবত ১৯৯৬ এর শেষ অথবা ১৯৯৭ সালের প্রথম দিকে। দশ বছর। এই সময়ের মধ্যেই আমরা সাধারণ থেকে স্বপ্নবাজ হয়েছি। তবে স্বপ্নবাজ থেকে আর সাধারণে ফিরে যেতে পারিনি। অন্য কেমন এক অসামাজিক জীবে পরিণত হয়েছি। তাই প্রিয় রিপন দা'র বিয়েতে যেতে পারেনা অপু। 'রাজাকার অপুর' ছেলেকে দেখতে যায়না রিয়াদ।আজ কোন্ গল্প লিখব? আমাদের সেই সময়ের কথা, যেসময় ছিল বড় বেশি সুসময়। না এই আজকের কথা, যখন বিষন্ন বিচ্ছিন্ন জীবনই রোজনামচার শেষ কথা।সকাল, সে সকাল শুরু হত কখন! দশ না এগার। শুধু মনে আছে দিনের সূচির শুরুটা হতে হবে রামকৃষ্ণ মিশন থেকে। গৌরিশ ছিল সেখানে। তারপর... বর্ণনা নেই। সেসব সময়ের কোনো বর্ণনা দেওয়া যায়না। [আলুরতল, কানিশাইল, সুরমা নদী, রাজু, রানা, চেরী....।] শুধু এই বলা যায়, প্রতিদিন দেখা হতে হবে বিনয় দা'র সাথে, চলন্তিকায়। উজ্জ্বল দা মিউনিসিপ্যাল মার্কেটের চারতলা। রিপন দা টেকনিক্যাল রোড কিংবা ব্রহ্মময়ী বাজারে। রিয়াদকে পাওয়া যেত কলেজে। রিয়াদ মনে আছে 'ফিফ্টি সিসি' ভ্রমণ? ওই মেয়েটার নাম কী ছিল রিয়াদ? রোজ সকাল 11টায় এমসি কলেজের কমনরুম থেকে বেরিয়ে কেমিস্ট্রি পর্যন্ত ছিল সরল গতিপথ। দিঘিরপারে তুই। কোনোদিন কথা বলা হলনা! শহীদ মিনারে ছিল প্রথম নিবাস। শুক্রবারের বিকাল। আমরা সবাই, বিনয় দা'র নাড়ু, হিমেল দা'র জিলেপি, মদের বোতলে গৌরিশের মদরঙ জল... অর্না এল সেখানে। তার আগে শাম্মি, পরে রানা। স্থান বদল, প্রান্তিক চত্বর। বাপ্পার মাথায় কমিটির চিন্তা। ম্যাগাজিন, কবিতা, ফিচার, ছোটগল্প, দেশময় ছড়িয়ে পড়ে কথার মায়া। আসলেই সে সময় ছিল বড় বেশি সুসময়। আরিফ জেবতিক, হাসান মোরশেদ, ( এই দুজনই আবার আমার ব্যক্তিক সম্পর্কের মোড়কে বাধা। তাই এখনও টিকে আছে সম্পর্কের চিকন সুতা।) মনি, আমাদের সেই মানুষটা নিলাঞ্জন দাশ টুকু, টুকু দা। কোন ফাঁকে এসে জুটেছিল মোনা, সুমি, চেরী, জাকির, রাজু। শুরু থেকেই ছিল সাইফ সেলিম। আমাদের স্বপ্নের সঙ্গি হল নীলু, দিপক... কোথায় সবাই এখন, কোথায়? একটু আওয়াজ দাও, আমার এখন বড় একা লাগে। বড় একা। একা হলেই আমি ভয় পাই।কী এক নির্বাচন হল একবার বন্ধুসভায়। বড় লজ্জায় পড়লাম আমি। সেই নির্বাচনে বিজয়ীদের তালিকায় যে আমিও আছি। আমি লজ্জা পেলে কী হবে বন্ধুরা যে রাজ্য পেল! ট্রেনের কামরা রিজার্ভ করে চল, চল, ঢাকা চল। চন্দন দা'র ভিডিও ক্যামেরাটা কোথায় গেল এখন? সেই ক্যাসেটটা কী আছে? রিপন'দা 'হা' মেলে ঘুমিয়েছিল ট্রেনে। মান্নান'দা পানির বোতলের মধ্যে কী যেন একটা পাগলা পানি টাইপের নিয়ে এসেছিল। মোরশেদ তখন ভদ্র। টুকু দা যে সাথে! ট্রেনের কামরায় যত মানুষ ছিল তারা কী কোনোদিন ভুলতে পারবে রাতজাগা প্রাণোচ্ছল একদল পাগল তরুণের কথা। সেবার আমাকে ঢাকায় থাকতে হয়েছিল। বন্ধুদের ধারণা হল আমি বুঝি আর সিলেটে ফিরবো না। ঢাকায় থেকে যাবো। টুকু'দাকে কোনো এক ফাঁকে সেটা তারা জানিয়েও দিল। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার আগ মুহূর্তে টুকু'দা হাত চেপে ধরে বল্লেন, কোনোমতেই ঢাকায় থাকবি না। কাজ শেষ হলেই সোজা চলে আসবি। টুকু'দা আমি এখনও সিলেটেই আছি। কেন কীভাবে সেটাওতো আপনার জানা। আমাদের ছিল কত আয়োজন। সুনামগঞ্জে এসিড সন্ত্রাস হল। আমাদের সবচেয়ে মোটাজন চন্দন'দা, আর সবচেয়ে ছোটজন আমি অপু। মেয়েটিকে নিয়ে ঢাকায় গেলাম। সাদা একটা কাগজে এক গাদা টেলিফোন নাম্বার লিখে বুক পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন চন্দন দা। যদি হারিয়ে যাই তখন কাজে লাগবে। কতদিন সেই কাগজটা আমি যত্নে রেখে দিয়েছিলা। কতটা আদরে আমাকে আগলে রাখত অর্না। এখনও আমি রয়েছি সেই আগের মত ওর কাছে। ঢাকায় গেলে মান্না'দা যেন হাতে চাঁদ পায়। সাথে নিয়ে ঘুরে এখানে সেখানে। আর একটু পরপর অর্নার ফোন_'তুই এখন কই?' রাতে মশারি টানিয়ে বলে যায়, সকালে উঠার দরকার নেই। ১২টার বাস ধরবি। আমার চোখে পানি চলে আসে। আসলেইরে অর্না অনেকদিন ধরে ঘুম হয়না। ১০টার তাড়ায় ৯টায় ঘুম ভাঙে। আবার মেরুদন্ড সোজা করতে করতে রাত ৩টা।উজ্জ্বল'দা, রিপন'দা এখনও সেই আগের মতই অভিমানভরা কন্ঠে বলে_তুই আর আগের মত নাই। মুখে বড় বড় কথা বলে ওদেরকে উড়িয়ে দিলেও ভেতরে ভেতরে আমি কতটা বদলে গেছি সেতো জানি শুধুই আমি।উজ্জ্বল'দা, আমি এখন ছেলের বাপ, সময় আমাকে শুষে নিয়ে ছ্যাবড়া বানিয়ে ফেলছে। আমি শুধু পিষ্ট হই সময়ের। শুক্রবারের বিকেলটায় এখনও বুকের বামপাশে কেমন যেন করে। কিন্তু আমাকে ছুটতে হয় অন্য আঙ্গিনায়। আমি আর আমার আঙ্গিনায় দেবু-রাসেলদের মত প্রাণ খুলে কথা বলতে পারি না। উসখুস করি, ঘড়ি দেখি, মোবাইল বাজে। নিজেকে বেমানান মনে হয়।তবুও হঠাৎ কোন এক আবেগী কন্ঠ চিৎকার করে পেছন থেকে ডাক দেয় অপু। শব্দেরা কানে ঢুকেই জানান দেয় এ তোমার আলগা হয়ে যাওয়া কিশোর বেলার সপ্নসঙ্গি। আমি আপ্লুত হই...

দুই কাল


১.

নিঃশ্বাসের খুব কাছাকাছি
মলাট বিহীন তুমি আমি।


২.
আজ তবে ইচ্ছাবিরহ
স্পর্শের দূরে নিঃশ্বাস
গ্রহনের কাল শেষে
পূর্ণিমা রাতে হবে
জোনাকীর সহবাস।

Monday, June 4, 2007

লিরিক


জলের সীমানায় আকাশ নদী ছোঁয়া
জলের মানুষ অপু কখনই তা ছুঁতে পারেনা।



সামহ্যোয়ারে দিয়েছিলাম ২০০৬ সালের ৯ ডিসেম্বর।