Saturday, May 16, 2009

খসড়া দিনলিপি

এই রাত, তার নগ্নতা। রতি ও শীৎকারে ভরপুর শহর,
এই শহরে আমি ভালো থাকি না।

তাহারা দয়ার্দ্র হয় না। মানবিক বেহিসাব নাই তাহাদের।
লীলাবতীরা নগ্ন রাতের মতোই।

যেন বা আমি খুব বেশি দাবী করি। যেন বা আমি
আশ্রয় খুজি রোজ রোজ, তারা পাত্তা দেয় না।
তারা বেজায় সাবধানী...

২.
একটা নদী আছে, জলে ধারণ করে নীলাকাশ
আমি বেদনায় নীল মানুষ এক। নারী তুমি কি নদী হবে?

এইসব নীল বেদনা ও ব্যাকুলতায় আমার কেন তোমাকেই মনে পড়ে...

Sunday, May 10, 2009

সকলি তবে অনুযোগে ভরপুর হে জননী আমার ...

মা ভেবেছিলেন সেবার তার মেয়ে হবে। জামা বানানো হয়েছিলো, সবাইকে তিনি আগাম বলে রেখেছিলেন তার মেয়ের কথা। কিন্তু সেই শীতে তার মেয়ে হয়নি। ধুন্দুমার বাঁধিয়ে, জীবন ও মৃত্যুর মাঝে তিনি এক ছেলেকে জন্ম দিয়েছিলেন। তার শারীরিক সকল সক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলো সেই শিশু। সেই থেকে সন্তান জন্মের ক্ষত ধারণ করতে হচ্ছে তাকে। সেই ধুন্দুমার লাগিয়ে, মাকে জন্মের মতো অসুখি করে পৃথিবীতে আসা শিশুটাই আমি।


গতকালকে হিসাব করে দেখি আবজাব নানান বিষয় নিয়া আমি লিখছি। তালছাড়া সব বিষয়। পত্রিকায় চাকরির জামানায় সম্পাদকীয় লেখার কাজ করছি যখন, তখনকার হিসাব ধরলে মাথা আউলে যায়। সেইসব সময়ে একবার মাত্র আমি মাকে নিয়ে লিখেছিলাম, মাত্র একবার, তাও ছদ্মনামে। পত্রিকার পাতায় নানান কিসিমের ফিচার ছাপাতে হয়, সেইরকম এক ফিলার ফিচার ছিলো সেটা। স্মৃতি ঘেটে দেখি সেই ফিচারে, সেই পাঁচশ শব্দে আমি আমার নিজের মায়ের কথা লিখিনি। একটা শব্দও সেখানে ছিলো না আমার মাকে নিয়ে। আমি মূলত মা দিবসের কিতাবি সওয়াল জওয়াবই বিবৃত করেছিলাম সেই লেখায়।


মা'কে নিয়ে আমি লিখিনি কেনো?


প্রশ্নটা মাথায় ঘুরে, ঘুরতেই থাকে। উত্তর খুঁজে পাই না। মায়ের সাথে কি আমার সম্পর্ক খারাপ? মাকে কি আমি পছন্দ করি না? মাকে নিয়ে কি আমার বলার কিছুই নেই? ভাবতেই থাকি। কিনারা পাইনা।

স্মৃতি ঘেটে দেখি সারাটা শৈশবে, মা আমার অসুখে অসুখে কাটিয়েছেন সেইসব সময়। আমার শিশুবয়েস থেকেই মা অসুস্থ। অনেক পরে জেনেছি সেই অসুখের কারণ আমি। আমাকে জন্মদিতে গিয়েই জরায়ুতে ক্ষত হয়েছিলো তার।

দুরাগত দিনপঞ্জির পাতা উল্টে দেখি, নানাবাড়ির টিলা ঘেসা হাওরে নৌকা চলে, সেই নৌকায় বড়মামা, আব্বা, লাল নানা মিলে মাকে তুলেন। ১০ তলা মাপের টিলা থেকে মাকে নামানো হয়েছিলো কিভাবে সেটা যদিও মনে পড়ে না। তবে নৌকা চলতে শুরু করার আগে খালামনি কিংবা মাসিকে আম্মা প্রায় নিস্তেজ গলায় বলে যাচ্ছেন, আমাকে দেখে রাখতে সে কথা আমার মনে পড়ে। সেইসব দিনে আমি মনমড়া হয়ে টিলার এষণা ধরে হেটেছি, পুবের ঘাটের জারুলের তলে বসে থেকেছি, সেইসব বিষন্ন দুপুর ও বিকেল আমাকে এখনও তাড়িয়ে নিয়ে যায়। আর কি আশ্চর্য মায়ের কথা ভাবতে গিয়ে আমি কেন বার বার নিজের বিষন্নতাতেই ডুবি? দয়াদ্র জননীর কোলের কথা কেনো আমার মনে থাকে না?

আমি প্রায়শ, মাকে বলি তোমারতো আমার জন্যে মায়া নাই। উদাহারণ টানি, একবার জ্বরের আমাকে ফেলে শহরে গিয়েছিলে। মা সেটা মেনে নেন। সেই ঘটনার, সেই ফেলে যাওয়ার গল্পটা টেনে নিয়ে দেখি মা সেদিন ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। আবার বলি, তুমি আমাকে ফাঁকি দিয়ে, গোলাপগঞ্জের খেয়া ঘাটে ফেলে রেখে শহরে গিয়েছিলে। মা মেনে নেন। সেই গল্পও টানি, টেনে দেখি সেদিনও মা ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। সেই গল্প টানতে টানতে দেখি, বন্ধ দরজার ওপরে লাল বাতি জ্বলে, ভেতর থেকে সাদা কাপড়ের মানুষরা বেরোয়। অনেকক্ষন পরে সেই ঘর থেকে আমার মাকেও বের করা হয়। মা ঘুমে, আমাদের দুই ভাইয়ের সামনে এনে একটুক্ষণ দাড়ায় সেই ট্রলি। নার্স মায়ের গালে হালকা নাড়াচাড়া করে চোখ মেলতে বলে। মা চোখ মেলে আমাকে দেখে, ভাইয়াকে দেখে। প্রায় নিশ্চল হাত বাড়ায়, আমাকে একটু ছুয়ে দেয়... এইসব কথা আমি মা কে বলি না। মাকে আমি বলি, তুমি টানা সাতদিন শহরে ছিলে, বাড়ির সবাই তোমাকে দেখতে গিয়েছে, আমাকে নিতে বলোনি তুমি। সেবার অপারেশনের দিনে নানি আমাকে নিয়ে গেলেন, গিয়ে দেখি পোস্ট অপারেটিভ থেকে মাকে নিয়ে আসা হয়েছে। ঘন্টাখানেক পাশে বসে থাকি। সাদা কাপড়ের মেয়েরা এসে আমাকে দেখে আর বলে তোমার মা বুঝি রোকেয়া আপা? আমি মাথা নাড়ি। তারা আমাকে আদর করে আর বলে, মা'তো সারাদিন তোমার কথা বলে। আমি সেইসব কথা শুনে কেঁদেছিলাম কিনা এখন আর মনে নাই, তবে একা একা দশফুটি ঘরে বসে যখন এইসব কথা মনে হয় আমি কখনই চোখে ভালো দেখি না। চশমাটা ঘসি, কুয়াশা কাটে না। তবু মাকে ভুলেও আমি বলি না, আমি জেনেছিলাম তার হাসপাতালবাসের উচাটনি ব্যথার কথা। খোটা দেই, সাতদিন দূরে থাকার কথা বলে।


এইসব অসুখি দিনে আমি মাকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম। জননীর কোলের অভাব অনুভব করেছিলাম। অথচ তারে কোনোদিনই বলিনি ভালোবাসার কথা। বার বার বলেছি অভাবের কথা। তাকে না পাওয়ার কথা, আদরহীন শৈশবের কথা বলি এই সময়ে এসেও।


তৃতীয়বার মাকে অপারেশন করানোর সময় আমি প্রাথমিকের শেষ ক্লাশে পড়ি। সেবার মা নিজেও ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। সেবার মা মৃত্যুর চিন্তা করেছিলেন। অপারেশনের আগের বিকেলে, সবাই বিদায় নিয়ে আসার সময়, মা আমার হাত ছাড়ছিলেন না। আমি মায়ের পাশ ঘেষে দাড়িয়ে ছিলাম। সবাই একে একে বাড়ি চলে গেলো, আমি থাকলাম হাসপাতালে! হাসপাতালের ছোট্ট বেডে মা আমাকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন সে রাতে। পরের সকালে, মা কে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার সময়ে দাদা আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো, দেখেই বুঝলাম, মার কাছে থাকতে না পারার ব্যথা সেই চোখে। মা আমাকে কেনো রেখেছিলেন নিজের কাছে? তিনি কি ভেবেছিলেন সেই বুঝি আমারে বুকে ধরে তার শেষ ঘুম।


আমি এইসব টুকরো টুকরো কথা কখনোই মাকে বলি না। মায়ের সাথে বার বার ঝগড়া করি। খুনসুটি করি। সুযোগ পেলেই বাড়ি ছেড়ে পালাই। আর বলি, মা আমাকে ভালোবাসো না কেনো? তাই মাকে নিয়ে কখনই কিছু লেখা হয় না।


সকলি তবে অনুযোগে ভরপুর হে জননী আমার ...

Wednesday, May 6, 2009

এই ুত...নিগুলা বাচ্চাদের পড়াতে আসে কেনো?

বাবাইর স্কুল ছুটির দশ মিনিট পর আমি গেটের ভেতর যাই। এর আগে গেলে সে রাগ করে, কারণ আমি গেলে তার খেলা হয় না। আজও সেইমতোই গেলাম। ছোট্ট কঙক্রিটের উঠোনে তারে খুজি। দৌড়াদৌড়িতে নাই। চোখ মেলে মেলে ধরি শেষে। এককোনায় দাড়িয়ে আছে। আমি এগিয়ে যাই। অন্যদিন আমাকে দেখেই ছোট্ট শরীরটা উড়িয়ে নিয়ে আসে। লাফ দিয়ে কোলে চড়ে। বাবা বলে চিৎকার করে। আজ সেসব কেছুই নাই! আমি বুঝি কিছু একটা হয়েছে। হাটুমুড়ে বসি সামনে, কি বাবা কি হয়েছে? সে মাথা নাড়ে, কিছু হয়নি তার। বলি বন্ধুরা মেরেছে? ক্যাপ নিয়ে গেছে? সেটাও নয়। তার পাশ থেকে একজন বলে, ‌মিস তারে পানিশমেন্ট দিয়েছে'। আমি বলি কি করেছো বাবা তুমি? বাবাই আমার বুকে ঢুকে গেছে ততক্ষণে। সেই একজনই বলে, বোর্ড এর লেখা মুছে দিয়েছিলো... আমার মাথাটা চিড়িক দিয়ে উঠে। বলি কি করেছেন মিস? এবার আর বাবাইকে প্রশ্ন করি না, করি সেইজনকেই। বলে কান ধরে উঠবস করিয়েছে। এটাও সে বলতে পারে না। জিনিসটা সে বুঝেই না। দেখিয়ে দেয় কিভাবে শাস্তিটা দেয়া হয়েছে। সিলেট শহরটা কাপে কিনা জানি না। আমি কেপে উঠি... বাবাইকে বুকে ধরে প্রিন্সিপালের রুমের দিকে হাটা দিলে, বাবাই কাকুতি করে বলে, বাবা ওইদিকে না। বাসায় চলো, আমি বলি না, প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে আসি। মনে মনে গালি দিতে থাকি বাবাইরে, হারামজাদা মিনমিনামি করবি না। তুই অপুর ছেলে, শক্ত হতে শিখ ভুদাইর বাচ্চা...


প্রিন্সিপাল আমাকে বুঝ দেন, বলেন, আপনি মার খান নাই? আমি বলি আমি সাত বছর বয়েসে স্কুলে গেছি। বিস্তর মার খেয়েছি। কিন্তু এই ছেলের বয়েস মাত্র ৪ বছর তিন মাস। তিনি আমাকে নানান কথা বলেন। তবু আমার মাথা ঠান্ডা হয় না। বলি, স্যার এই ছেলের বয়েস দশ হোক, তারপর তারে পিটান...


স্কুলের চেয়ারম্যানও মাথা ঠান্ডা করতে বলেন, পূর্বপরিচয়ের সূত্রে বলি, আমি কি ঠান্ডা নই? হাসি দিয়ে পরিবেশ হালকা করেন। প্রিন্সিপাল কোলে নিয়ে বাবাইকে নানান কথা বলেন। সে হাসে। অনেকক্ষণ পরে বাবাই আমার হাসে...


এই চুতমারানিরা মাস্টারি করতে আসে কেনো? শিশুদের মন বুঝে না যে সব ছাগুরা তাদেরকে কে আনে এইসবে? একটা বাচ্চা বোর্ডের লেখা মুছে দিয়েছে বলে তাকে শাস্তি দিতে হবে? কি এমন মহাকাব্য লিখেছিলো সে আমার জানতে মন চায়। আমি বড়ো বিক্ষিপ্ত মন নিয়া এই লেখাটা লিখতে বসছি। সবচে বড়ো কথা মেরেছেতো মেরেছে, বাচ্চাটার মন ভালো করে দেয়নি সে। এর উপর কতোটা মানষিক চাপ দিয়েছে সে সেই চিন্তাও তার নাই। এই বরাহ নন্দীনিরে আমার বড়ো চাবকাইতে মন চাইছে।


এইসব সময়ে আমার খুব গালি আসে। যা ইচ্ছা তাই গাইল দেই। আপনারা ক্ষমা করে দিয়েন প্লিজ।

Monday, May 4, 2009

লীলাবতীকাব্য

বৃষ্টির মতো বিনাশী বালিকা আজ ছুটি নিয়েছে। আজ রোদের দিন

আজ কৃষ্ণচুড়া আগুন ঢেলেছে এই পথে, প্রান্তরে, কংক্রিটের

উঠোনে। আজ জারুল মেলেছে পেখম গ্রামময় প্রান্তরে।

মন ভার করেছিলো, ...ইশ্বর, তুমি ছিলে বলে লাল হলো

কৃষ্ণচুড়া, জারুল মমতায় মেলেছে চোখ, সে হেসেছে

কৃষ্ণ হে, কোথায় তুমি? বাঁশি কি তৈরি?

লীলাবতী চোখ তুলেছে...