Wednesday, March 25, 2015

অপ্রস্তুত ব্লগরব্লগর

কয়েকদিন আগে ফেসবুকে কেউ একটা গান শেয়ার দিলেন। চকমকে শাড়ি পরা এক নারী গান গেয়ে, মোবাইলে রেকর্ড করে আপ করেছিলেন। সেই গান ঘুরছে এর তার দেয়ালে। গানের গুণে নয়। শিল্পী এখানে মূল লক্ষ্য। মজা হচ্ছে সেটা নিয়ে। মিনিটখানেক শুনে নিজেও তাতে যোগ দিলাম। আমার এক বোন তার ‘প্রেন্ড’ হবার আগ্রহ জানিয়ে স্টেটাস দিলো। শব্দটা দেখে বুঝলাম এরকম কিছু একটা উচ্চারণ করেছেন তিনি। তার ফেসবুক একাউন্ট বের করলাম। তারপর হু হু করে উঠলো ভেতরটা...
খুব কাছের মানুষজন বিদেশে থাকেন। সিলেটি হিসাবে বিলাতে থাকেন বড় একটা অংশ। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে। যারাই যেখানে থাকুন, বিলাতের নতুন প্রজন্ম ছাড়া প্রায় সবাই শ্রমিক। কারখানা-রেস্টুরেন্ট হয়ে সেখানকার প্রজন্ম মোটামুটি একটা স্থির অবস্থানে পৌঁছেছেন। কিন্তু যারা মধ্যপ্রাচ্যে আছেন, তাদের কষ্টের জীবন।
খুব কাছে থেকে সেইসব মানুষদের দেখেছি। কঠিন, কঠোর পরিশ্রম করা একেকটা প্রিয় মুখ আমার। তাঁদের চিঠির ভেতরের দীর্ঘশ্বাস, তাঁদের বাড়ি ফেরার আকুতি, দীর্ঘ বছর কষ্টের কাজ করে বিধ্বস্ত শরীর এবং মন নিয়ে ফিরে আসা সেইসব মানুষকে নিয়েই আমাদের পরিবার। এই জীবনের কথা, কষ্টের কথা জানা ছিলো। একটা ধারণা তৈরি হয়েছিলো গল্প শুনে, পত্রিকা বা টিভি দেখে। কিন্তু সেই জানা আর গল্প যে কিছুই না। বাস্তব যে আরো কঠিন, কঠোর সেটা জেনেছি অনেক পরে।
বাহরাইনের মানামা বিমানবন্দরের ভেতর নির্মাণকাজ চলছিলো। সবকিছু উল্টাপাল্টা অগোছালো হয়ে আছে। মধ্যরাত। আম্মা চা-কফি কিছু একটা চাইলেন। কোথায় পাবো সেটা বুঝতে পারছি না। কোনো সাইন নেই, কাউকে জিজ্ঞেস করবো সেটাও পাচ্ছি না। হঠাৎ একজন ছোটখাটো মানুষ সামনে এলেন। হাতে মেঝে পরিষ্কার করার সরঞ্জাম। দেশি সম্বোধন করে আধা আঞ্চলিক উচ্চারণে তিনি বললেন, কোনো সাহায্য লাগবে কি না। সেই প্রথম গরিব বাংলাদেশ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। দেশি, ছোট্ট একটা শব্দ। কথিত শহুরে মানুষের জন্য আনস্মার্ট হয়তবা। কিন্তু বুকে টোকা দিলো। পরের প্রায় মাসাধিককাল এই শব্দটা ঘুরেফিরে শুনেছি। আপ্লুত হয়েছি, বেদনায় নীল হয়েছি, আক্রান্ত হয়েছি তীব্র লজ্জায়।
বড় বিপণীবিতানের মেঝে মোছা, ডাস্টবিন পরিস্কার করা কিংবা অন্য যেকোনো কাজ, যাকে শিক্ষিত প্রবাসীরা অড জব বলেন, সেটা দেশের বিশাল সংখ্যক মানুষই করেন। বাড়িতে, অফিসে, রাস্তায়। রিকশা নামের পাশবিক একটা যানবাহনে চড়ে আমরা অভ্যস্ত। আলাদা কোনো ভাবনা তৈরি করে না। কিন্তু মধ্যরাতের সেই দেশি ভাই আমাকে কাতর করেন। যদিও এর ঘণ্টাকয়েকের মাঝেই তাকে অনেক বেশি ভাগ্যবান বলে মনে হয়েছে আমার। সপ্তা পেরুবার আগেই মনে হয়েছে তিনিই প্রবাসে সবচেয়ে ভালো থাকাদের একজন। ততদিনে আমি দেখে ফেলেছি হলুদ কাপড় পরা সৌদি আরবের বলদিয়া বা পৌর কর্তৃপক্ষের কর্মীদের। যাদের সবচে বড় অংশ আমারই ভাই, বন্ধু, পরিজন।
সব মানুষের কিছু অক্ষমতা থাকে। বেদনাকে বোনের মতো যদিও ভালোবাসি, সাথে রাখি বন্ধুর মতো। কিন্তু সবকিছু বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নাই। আমার দেশকে পরিশ্রমে নুয়ে পড়তে দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরমে, সৌদি আরবের বর্বরদের নির্যাতনে কাতর বাংলাদেশকে দেখেছি সেখানে। মক্কায় একে সত্তুর নেকি মেলার গল্প জানি। তার হিসাব আমি রাখি না। রাখা হয় না। কিন্তু তার পথে ও প্রান্তরে ছড়ানো ছিটানো দেখি খাবারের স্তূপ। যাতে আমার ভায়ের শ্রম লেগে আছে, লেগে আছে তার রক্ত। আনোয়ার নামের এক পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সাথে পরিচয় হয়। প্রায় প্রতি বিকালে দেখা হয়েছে। খাবার ভাগ করে খেয়েছি। কখনোই মনে হয়নি, মধ্যবিত্তসুলভ এসব খাবার তিনি নিয়মিত খেতে পারেন।
হোটেলের বেয়ারা ছিলেন একজন। আলাউদ্দিন ভাই। সুনামগঞ্জে বাড়ি। ভয়ঙ্কর সব গল্প করতেন। অবলীলায় বলে যাওয়া সেসব গল্প শুনে আম্মার সে কী কান্না। ফেসবুকে-ইউটিউবে সৌদি শেখদের হাতে নির্যাতনের যেসব ভিডিও মাঝেমাঝে দেখতে পাই আমরা, সেইসকল গল্প। কী অমানবিক-পাশবিক সেইসব ঘটনা। মানুষ হিসাবে নিজেরে বড় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ মনে হতো তখন। কান্না পেতো দেশের জন্য।
ঢাকার বস্তি দেখে অভ্যস্ত চোখ। তবু শিউরে উঠেছি শ্রমিকদের থাকার জায়গা দেখে। বস্তিতে যেকোনো সময়, যে কেউ ঢুকতে পারে। থাকতে পারে। এই স্বাধীনতাটুকুও নাই সেখানে। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে সেখানে যাবার জন্য। লম্বা লম্বা শেড। একেকটা রুমে তিনতলা খাট পাতা রয়েছে ৪টা করে। মাঝখানে হয়ত কোনোমতে দুটো টি-টেবিল রাখার মতো জায়গা আছে। আশেপাশের রুম থেকে দেশি কুটুমের সাথে বুক মেলাতে আসে একেকটা বাংলাদেশ। আমি নুয়ে পড়ি, লজ্জিত হই, অক্ষমতায় কুঁকড়ে যাই। বাটি ভরে একেকজন একেকটা তরকারি নিয়ে আসেন। মোটা চালের ভাত বলে নয়, বেদনায় ভারী হয়ে সেই খাবার আমার গলায় দলা পাকায়... রাতে ফিরে এলে আম্মা জিজ্ঞেস করেন, কী দেখে এলে? উত্তর দিতে পারি না। নবী হোসেনের কণ্ঠ কানে লেগে আছে, ভাই, বাড়িত গিয়া এইসব গল্প বইলেন না। আম্মায় কষ্ট পাইবো...
পারভীনের গান শুনতে গিয়ে যতটা মজা লাগে, গানের শেষে তার বলা কথায় সেইসব ধুয়ে মুছে যায়। ৩ বছর আগের সেই হুহু করা সময়টা ফিরে আসে আবার। পারভীন বলেন, তিনি সৌদি আরবে থাকেন। তার গান গাওয়ার বড় শখ ছিলো। পরিবার সামলাতে গিয়ে সেই শখ ডানা মেলেনি। কাজ করে অবসর সময়ে তাই গান গেয়ে ফেসবুকে দেন। আট বছর ধরে তিনি দেশে আসেননি। মন খারাপ হলে গান করেন। যারা তার গান শুনেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানান... তার কোনো ক্ষতি যাতে কেউ না করেন সেই নিবেদন করেন। সহজসরল তার বাক্যগঠন। শহুরেদের জন্য একটু ভদ্রস্থ করতে গিয়ে সেই ভাষা হয়ত কিছুটা হাস্যকর হয়ে উঠে। নীল সামিয়ানার নিচে বসে তিনি গাইছেন, কথা বলছেন। খেয়াল করে দেখি সেটা সামিয়ানা নয়, শাড়ি। দোতলা খাটের রেলিংয়ে শাড়ি বেঁধে তার নিচে বসে গাইছেন। এ কোনো আয়োজন নয়। খাটের কোনায় জমে থাকা পুঁটলিটা, মেলে দেয়া কাপড়টা আড়াল করেছেন এই শাড়ি দিয়ে। আমি দেখে এসেছি তার ঘরে এই খাট ছাড়া, খাটের মাপের বাইরে আর কোনো নিজের জায়গা নেই নিজের জন্য। সিথানে মূল্যবান যা কিছু, হয়ত দুটো টাকা, কিছু গহনা, সেসবের পোঁটলা। গাট্টি বানিয়ে কাপড়চোপড় রেখেছেন পায়ের কাছে... সবই আমার দেখা...
শেষাংশ
উপরের লেখাটুকুন গান শোনার পরপর লিখেছিলাম, আগাতে পারিনি। এসব লেখার জন্য যে শক্ত মন দরকার, কলমের যে জোর দরকার, তার কোনটাই আমার নাই। এটা ব্লগে দেবারও কোনো ইচ্ছা ছিলো না। আজ হঠাৎ করে দেখি তৃষিয়া ইউটিউব থেকে উনার গান আবার শেয়ার করেছে। পারভীনের সাথে আলাপ করতে চাচ্ছে। তাকে ফেসবুক লিংক দিতে গিয়ে আর খুঁজে পাই না। মনে হলো, তিনি আর ফেসবুকে নেই। বাঙ্গাল ফেসবুকারদের মাঝে টিকে থাকা হয়ত সম্ভবও হয়নি। পরে দেখলাম, উনি ফেসবুকে আছেন। তার যে গানের লিংকটা কপি করে রেখেছিলাম, সেটা কোনো কারণে হয়তো মুছে দিয়েছেন। তাই পাচ্ছিলাম না। আধা ঘণ্টা পরে, এখন ডেস্কটপ থেকে সার্চ দিয়ে পেলাম। সম্ভবত আমার ল্যাপটপে কোনো সমস্যার কারণে সার্চ করে পাইনি।
আপনি ভালো থাকবেন পারভীন। ক্ষমা করবেন আমাদের।