Monday, July 29, 2013

প্রবল বাবাভাব

বাবা ডাক শোনার জন্য আমার মনে হয় একটা ব্যপক আকুলি-বিকুলি ছিলো সেই গেদাকাল থেকে। অথবা আমার মাঝে বাবাভাব প্রবল! খালি বাপ হইতে মঞ্চায়। নিজের পোলা, ভাইয়ের পোলা মিলে ৩ টা শিশু সারাদিন আমারে বাবা-বাবা-বাবা বলে অস্থির করে ফেলে তবু আমার বাপ ডাক শুননের শখ মিটে না!!! এর বাইরে আরও কয়েকহালি বাবা ডাকনেওয়ালা আমি ফিটিং দিয়ে রেখেছি। এরা আমারে বাবা ডাকে, আমি মুগ্ধ হয়ে সেই ডাক হজম করি...
বাপ হওনের একটা সহজ পদ্ধতি আমার আছে। শিশুদের সাথে যেকোনভাবে দ্রুত খাতির করে ফেলতে পারি। (ইদানিং এটা করতে সমস্যা হচ্ছে, শরীরটা বাচ্চা হাতির মতো যবে থেকে হতে শুরু করেছে, শিশুরা ততো দুরে সরে যাচ্ছে, শিশুরা সম্ভবত দুর থেকেই হাতি দেখতে ভালোবাসে, কাছে আসে না।) তো খাতির হবার পর গল্প শুরু হয়। আমরা একে অপরের নাম জিজ্ঞেস করি, আর এই নাম জানাজানির সময়ই আমি বাবা বনে যাই! ৯ মাস ১০ মাস না, মাত্র ৯/১০ মিনিটে।
: নাম কি?
: মাটি
: বাহ সুন্দর নাম
: তোমার নাম কি?
: আমার নাম বাবা
: বাবা!
: হ্যা আমার নাম বাবা
: ...
: আসলেই আমার নাম বাবা
: তুমারে বাবা কাকু বলবো?
: নাহ্, কাকু বলার দরকার কি? তুমি আমারে নাম ধরেই ডাকো
: !!!
: হ্যা, তুমি আমারে বাবা বলবে, আমি বলবো মাটি
এর পর অনেকক্ষন আমার আর মাটির গল্প চলতে থাকলো। মাটি তার ছোট ছোট বই দেখায়, পুতুল দেখায়, গল্প করে, কুট কুট করে করা সেসব গল্পের লাইনে লাইনে সে বাবা ডাকে। সম্ভবত এত বড় একটা লোককে নাম ধরে ডাকার মজাটা নিতে চায়। মাটির তখন সাড়ে ৩ বছর বয়েস সম্ভবত। পাশের ঘর থেকে পলাশ (পলাশ দত্ত, মাটির বাবা, আমার বন্ধু) সেটা খেয়াল করে। তার ঘুম ভেঙে যায় কটাশ করে। হিড়িম্বার মতো খিকড়ানো চুলে দরজায় এসে দাড়ায়, এই তুই আমার মেয়েরে কি শিখাইছস? আমি উদাস হয়ে জানালার বাইরে তাকাই... পলাশ রেগে-মেগে বলে, হারামজাদা তোরে আইজ খাইছি...
নজরুল ইসলাম, মানে নজুভাই তেমন না। তাই নিধির সাথে সেই পদ্ধতিটা কাজে লাগালে তিনি রাগ করেন না। কিন্তু বিপদে পড়ে নুপুর বেগম। নিধি যখন বলে, ওই বাবাটা খুব বোকা, কিচ্ছু চিনে না... অবাক হবারও চান্স পাওয়া যায় না তখন।
জোর করেও বাপ ডাকাই মাঝে মাঝে! তুলির অফিসের এনাম ভাই এর মেয়েরে বলি, এই মেয়ে, বাপ ডাক, নয়তো তোর আব্বুর পেট ফাটায়া দেবো। সে ভয় ভয় চোখে একবার নিজের বাপরে দেখে আরেকবার দেখে হুমকিবাপরে। এনামভাই তারে বুঝায়, ডাকো মা, বাবা ডাকো। নয়তো আব্বুরে মারবে... সে বাবা বলে, সেটা শুনে বাকিরা হেসে উঠলে সেও কস্ট করে হাসে। কিন্তু বাবাই একদম খুশি হয় না। সে ঠোট ফুলাতে থাকে!
লুবাবা আমার তালতো বোনের মেয়ে। ইটালিতে ওর জন্ম। ৫ বছর পর্যন্ত সেখানেই ছিলো। বাবাই আর ও সমবয়েসি। দেশে আসার পর বাড়ির অন্য দুই পিচ্চির দেখাদেখি সেও বাবা ডাকতে শুরু করলো। আহা, না চাইতেই বৃষ্টির মতো বিষয়। ওর মা’তো গেলো ক্ষেপে, সে আমারে বলে, ওই বদ, তুই আমার মেয়েরে বাবা ডাক শিখাইলি ক্যান। আমি বলি তুমি না চিনলেও সে ঠিকই চিনতে পারে। দেঁতো হাসি
আব্বারও অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে ছিলো। মানে অফিসিয়ালি আমার আর দাদাভাই এর বাইরে। ধরে-বেধে-ঘুষ দিয়ে নানা কায়দায় আব্বা তার পুত্র-কন্যার সংখ্যা বাড়াতেন। এর মাঝে সবচে ছ্যাচড়া ছিলো ডালিম নামের একটা ছেলে। সে ডাক টিকিটের লোভে অ্যব্বা অ্যব্বা ডেকে পাড়া মাথায় তুলে ফেলতো। আমি তখন খুবই ছোট, গাব্দা গোব্দা নিরিহ। ডালিমরে দেখতে পারতাম না আব্বার উপর ভাগ বাসাবার জন্য, কিন্তু কিছু করার ছিলো না। শুধু আব্বার সাথে অভিমান করা ছাড়া। কিন্তু দাদাভাইর সেসব ছিলো না। ডালিমের মতো ছ্যাচড়ারে চান্স পেলেই সে আচ্ছা করে প্যাদাতো। যদিও ছ্যাচড়া ডালিমের মধ্যে বিড়ালভাব ছিলো প্রবল। বিড়াল যেমন ব্যথার যায়গা জিহ্বা দিয়ে চেটে-চুটে মারের কথা ভুলে যায়, সেও তেমন। আগের বিকালে মার খেলো, পরের সকালেই দেখা গেলো আব্বার চেয়ারের পাশে দাড়িয়ে অ্যব্বা অ্যব্বা ডেকে নতুন কোন ডাক টিকিট নিয়ে খুশি মনে বাড়ি যাচ্ছে।
দাদাভাইর মারে কাজ না হলেও আমারটা খুবই কার্যকর হতো। মানে যখন থেকে আমি গুন্ডামি শিখে ফেল্লাম, তখন থেকে আব্বার আলগা সন্তানলাভ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো। সুব্রত নামের একটা ছুকড়ারে খুব করে পেদাইছিলাম একবার। আমার কয়েক হালি মামাতো ভাই-বোন আব্বারে আব্বু ডাকতে শুরু করলো। কি যন্ত্রনা। কিছু বলতে পারি না। আবার সহ্যও করতে পারি না। দু-একবার হালকা ধুলাই দিয়েছি, যেমন কান ধরে উঠবস করানো। কাজ হয়নি। সাইকেল দিয়ে দুরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, চকলেট খাওয়ানোর মতো অনৈতিক কাজ দিয়েও এদের সামলানো যায়নি। এরা এখনও আব্বাকে আব্বু ডাকে। মন খারাপ সম্ভবত আব্বার কাছ থেকেই বাবা হবার এই গুনটা আমি পাইছি।
এইসব বাবা ডাকাডাকিতে বাবাই অবশ্য অভিমান করে, কিন্তু সেটা সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু আবির, মানে আমার ভাতিজা বেশ এটাকিং মোডের জিনিস। বাবাই মাঝে মাঝে এরে কাজে লাগায়। যেমন লুবাবার সাথে ঝগড়া হলেই, আবির ‘থ’ এর উপর বিশাল চাপ দিয়ে থাবড়া মেরে সব দাত ফেলে দেবার হুমকি দিয়ে বলবে, আমাদের বাবাকে বাবা ডাকলে একটা দাতও থাকবে না। এর বাইরে আমাকে বাবা ডাকতে পারে এমন শিশুদের বিষয়েও সে নির্দয়। বাবাইকে বলে দিয়েছে, কেউ যদি বাবারে বাবা ডাকে, সেইটারে সে থাবড়া দিয়ে বসায়া দিবে একদম!!!
আমার ছোট মামার ছেলে, বাবাইর বছর খানেকের ছোট হবে। একই গ্রামে থাকি। দু বাড়ির মাঝখানে ছোট একটা টিলার আড়াল। সরাদিনই এ বাড়ির পিচ্চিরা ও বাড়ি, ও বাড়ির পিচ্চিরা এ বাড়ি ঘুরে। আমাদের বাড়ির রাস্তাটা পাকা। বাচ্চারা সুপারির খোলে বসে ছড়-ছড় করে সেখান দিয়ে নেমে যায়, খেলে। ইদানিং দুই চাকার স্কুটি নিয়েও দৌড় হয়। সেদিন শুনলাম মামাতো ভাইটা বাবাইকে বাবা-বাবা ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে! ঘটনা জানতে গিয়ে দেখি বিরাট রাজনীতি। স্কুটি করে বাড়ি থেকে রাস্তা পর্যন্ত নামতে দেবে, এই শর্তে আমার পুত্রসাহেব ওরে বাবা ডাকতে বাধ্য করেছেন...
শালার ছিটগ্রস্থ পরিবার দেখি, সবকয়টায় বাপ হইতে চায় খালি

Tuesday, July 16, 2013

তিনি বৃদ্ধ ছিলেন

চোখে ছানি পড়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। সে বছর দশেক হবে কম করে হলেও। চোখেরইবা কি দোষ। বয়েসতো কম হলো না। বড় মেয়ের ঘরের নাতির বিয়ে হয়েছে ৭ বছর আগে। আর বড় ছেলে তার মেয়ের বিয়ে দিয়ে ৩ নাতির নানা বনে গেছে। চোখের ছানি নিয়ে তাই কোন অভিযোগ নেই তার।
এখানে, এই সবুজ গ্রামের পাশে যে নদী বয়ে গেছে, সেই নদীর পাড়, শান্ত মাঠ, সবই তার চেনা। তিনি ছানিপড়া চোখে সেই নদীর পাশ দিয়ে অবলীলায় হাঁটতে পারেন। নদীর সাথে লাগোয়া মাঠ, সেই মাঠের এক পাশে দাড়িয়ে থাকা মেন্ডা গাছ, সব তার মুখস্থ। তিনি তার অভ্যস্থ পায়ে তরতর করে হেঁটে মেন্ডা গাছটার নিচে এসে দাঁড়াতে পারেন। রোজ বিকালে সেখানে তাকে দাঁড়াতে হয়। অভ্যাস। তার শরীর নদীর বাতাসে জুড়িয়ে যায়। তার মখমলের মতো সাদা দাড়ি বাতাসে উড়ে। ছানি পড়া চোখে তিনি অনুভব করেন ঠিক সামনে, চোখেন সীমানায় দাড়িয়ে আছে খাসিয়া পাহাড়, পাহাড়ের শরীর চিড়ে নেমে আসছে পাংথুমাইর ঝরণা। এই ঝরণায় জোয়ান বয়েসে হরদম গিয়েছেন তিনি। এখন আর যাওয়ার উপায় নেই। এলার্ট বলে এপার-ওপার দুপার থেকেই চিৎকার আসে, থেমে যেতে হয়। তিনি অনুভব করেন, দেখতে পান তার ডান পাশে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে জাফলং পাহাড়, কত অবাধ যাতায়াত ছিলো এই সবুজে, এখন সব অন্যের, কোন অধিকার নেই আর...
আজও হাঁটতে তার কষ্ট হয় না। তিনি সামনে একা হাঁটেন। তার হাতের লাঠিটা মাটিতে লাগে কি লাগে না, তিনি তরতর করে হাঁটেন। পেছন পেছন যারা আসে তাদের কথা তিনি বুঝেন না। বুঝবার দরকারও নেই। শুধু আজির উদ্দিন চেয়ারম্যান এর অনুরোধ তার কানে আসে। পাশাপাশি হাঁটছে সে, আর বলছে, ‘চাচা খইদেউকা, ই বয়েসো আপনার উপরে জুলুম ওউক ইতা আমার বালা লাগের না। আপনার হুরু পুয়া কই গেছে কইদেউকা, আপনার দায়িত্ব আমার। কেউ আপনারে কিচ্ছু খরতোনায়...’ এসব কথা শোনার কেনো মানে নেই। তিনি শোনেনওনা। তিনি তার প্রিয় মাঠ পেরিয়ে, মেন্ডা গাছটার নিচে দাঁড়ান, দাড়িয়েই থাকেন... তার ঝাপসা চোখের সামনে পিয়াইনের স্বচ্ছ জল বয়ে চলে, তার চোখের সামনে ঝর-ঝর করে ঝরতে থাকে খাসিয়া পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনার জল। পচানব্বই বছরের নরোম শরীর পিয়াইনের পানিতে ঝরে পড়ার আগে তার বুকে টকটকে লাল একটা পতাকা জেগে উঠে...