Monday, March 25, 2019

এলেবেলে দিনলিপি


দশ দিন আগে...

শীত চলে যাচ্ছে। দিন লম্বা হচ্ছে, রোদ উঠছে নিয়মিত তবু ঠান্ডা কমছে না। কারণ তীব্র বাতাস। সকালে উঠেই সেই বাতাসের আক্রমনে পড়লাম বাপ ছেলেতে। আবহাওয়া নিয়ে বাবাইর নিজের অনেক মতামত আছে। সিরি নামের এক মহিলার সাথে তার ব্যাপক খাতির। ওর কাছ থেকে এ বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করে তারপর নিজের মতামত যোগ করে। বেশিরভাগ সময় সেগুলো ঠিক হয়। মাঝে মাঝে বাঙ্গাল সূলভ বেশি কথা যদিও বলে, আমিও বাঙ্গাল সূলভ পিতাভাব ধরে সেগুলো এড়িয়ে যাই। গাড়িতে উঠতে উঠতে বলে, বাবা আজকে অনেক মেঘ হবে। ঝুম ঝুমায়া মেঘ পড়বে। তুফানও হবে। ওর কথা সত্যি হয়ে যায় মিনিট কয়েকের মাঝে। চারদিক ঝাপসা করে আসে, সাথে ঝড়ো বাতাস। বাবাই বলে, দেখলায়তো বাবা আমার কথা সত্যি হলো। আমি বলি, হু, তুমি হইলা আবহাওয়াবাবা। মাথায় একটা পাগড়ি বাইন্ধা দেই...

গতবার

কপাল যদি কারো থাকে সেইটা আমার পাশের বাড়ির মুহাম্মদের। রাস্তায় কাজ চলছিলো গতবার। বলা নেই কওয়া নেই কাউন্সিলের একটা গাড়ী এসে রাস্তার পাশে রাখা তিনটা গাড়িতে দিলো ঘষা। প্রথমে আমারটা, তারপর আরেকটা শেষটা মুহাম্মদের। শব্দ শুনে বাইরে আসতেই ড্রাইভার আগে থেকেই দুঃখ প্রকাশ করতে করতে এগিয়ে এলো। আমাকে কিছুই করতে হবে না। সে এরই মাঝে কাউন্সিলে ফোন করেছে, একজন অফিসার স্পটে আসছেন তিনি সবকিছু সামলাবেন।
গাড়ীটা যথেষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মুখে কিছু না বল্লেও মনে মনে কষ্ট পাচ্ছিলাম। আমি এবং অন্যজন তখন সেখানে ছিলাম কিন্তু মুহাম্মদের খবর নেই। বিকালে দেখলাম সে কোথায় গিয়েছিলো, গাড়ি পার্ক করছে এসে। জিজ্ঞেস করলাম, কাউন্সিলে ফোন করেছিলো কীনা? চোখ মুখ কুঁচকে প্রশ্ন করে, কেনো? আমিতো অবাক! গাড়ি চেক করেন নাই? আরো অবাক হয়ে বলে, কেনো? গাড়ির পেছনটা দেখালাম, এইযে দেখেন, সকালে কাউন্সিলের গাড়ী ধাক্কা দিয়েছিলো, সামনে টেপ দিয়ে কার্ড লাগিয়ে গেছে দেখেন নাই? সে যেনো সপ্তম আসমান থেকে মাত্রই দুনিয়ায় পতিত হয়েছে এমন একটা ভাব করতে থাকলো। দুপুরের পর থেকে গাড়ি চালাচ্ছে একটাবার খেয়াল করেনি আস্ত একটা কাগজ সাঁটা আছে সামনের কাঁচে! আমি তব্দা লেগে ঘরে ফিরে এলাম।
কাউন্সিল থেকে গাড়ী ঠিক করিয়ে বা টাকা দিয়ে দেবার প্রস্তাব এলো। আমি প্রথমটা নিলাম। দৃশ্যত গাড়িটা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও এটা চালালে কোন সমস্যা নেই বলে জানালো তদন্তে আসা লোকটা। এদিকে মুহাম্মদ কাউন্সিলের লোকটাকে পাত্তাই দিলো না। দুর থেকে দেখলাম হাত নেড়ে হাউকাউ করে ভুস করে কোথায় যেনো বেরিয়ে গেলো।
আমার গাড়ী যেদিন ঠিক করতে নিয়ে গেলো, সেই রাত থেকেই শুরু হলো প্রবল তুষারপাত। সবকিছু থেমে গেলো টাইপ অবস্থা। স্কুল বন্ধ, কাজ বন্ধ। আমরা ঘরে বসে বসে তিনদিন সিনেমা দেখলাম আর খিচুড়ি সাটালাম। এই তিনদিনে মেকানিকের ওখানে লাগলো লম্বা লাইন। ফোন করে বলে দিলো কমপক্ষে পনেরো দিন লাগবে। এটা অবশ্য কোন বিষয় না। ওরা এমনিতেই একটা গাড়ি দিয়েছে। সেটা আমারটার চেয়ে ভালো। গাড়ি আসতে দেরি হবে বলে আবহাওয়া ভালো হলে আমরা লন্ডনিস্তানে বেড়াতে যাবো বলে ঠিক করে ফেল্লাম। এরমাঝে মুহাম্মদের সাথে একবার দুর থেকে চোখাচোখি হয়েছে। গাড়ির দিকে ইশারা করে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছে।
সময়মতো গাড়ি ফেরত আসলো। পরেরদিন সকালেই মুহাম্মদ দৌড়ে আসলো, চোখে মুখে ‘ওই মিয়া করছটা কি ভাব’ নিয়া বলে আপনে গাড়ি বদলাননাই? আমি বল্লাম না, বদলাবো কেনো? আমার গাড়িটাতো ভালো। ওরা ঠিক করে দিয়েছে। সে বলে, ভাবলাম নতুন গাড়ি নিছেন, এখন দেখি আপনে একটা ভুদাই! সে নাকি আড়াই হাজার পাউন্ড নিয়েছে রাইটঅফ করে। তারপর আবার একশ পাউন্ড দিয়ে সেই গাড়িটাই কিনে নিয়েছে! আমারে ভুদাই বানায়া মাথা নাড়তে নাড়তে কোথায় যেনো চলে গেলো।
কপালের কথা ফেলে এখন বত্রিশ দাঁত নিয়া কিছু বলি। শুনেছি বত্রিশ দাঁত ওয়ালা মানুষ যা চায় ঠিক তাই হয়। সেলিনা তুলি তেমন একটা গোপন বত্রিশ দাঁত ওয়ালা মহিলা। সে যা যা বলে তাই হয় টাইপ অবস্থা। আড়াই বছর আগে যখন এখানে এলাম, একদম প্রথম দিন থেকে বাড়ির সামনের বড় দুইটা গাছ সেলিনা বেগমের দুই চোখের বিষ। এই গাছের কারণে ঘরে রোদ আসেনা, আলো পাওয়া যায়না এই হলো অভিযোগ। প্রতিদিন কমপক্ষে একবার করে হলেও সে গাছ গুলারে গালি দেয়!
আবার মুহাম্মদের কথায় ফিরে আসি। ওই ঘটনার পর থেকেই সে আমার দিকে নিয়মিত ‘ভুদাই লুক’ দিয়ে তাকায়। এরমাঝে এক রাতে কেউ একজন এসে আমার গাড়ীর কাঁচ ভেঙ্গে রেখে গেলো। মুহাম্মদ সেটা দেখেই বল্লো এটা টিলার উপরের যে পাব আছে সেই পাবের কারণেই হয়েছে। আমি যেনো পুলিশকে রিপোর্ট করি এটা। পাব কেমন করে মাঝরাতে গাড়ী ভাঙবে? সে বলে, ওই পাব থেকে মাতালরা বের হয়ে এসব মাতলামি করে, এই সুযোগে পুলিশ এবং ইন্স্যুরেন্স দুইটারেই আমার ধরা উচিত বলে সে মত দিলো। আমি বল্লাম, ইন্স্যুরেন্সওয়ালারা এসে গ্লাস বদলে দিবে বলেছে। পুলিশ বলেছে যেহেতু মাঝরাতের কান্ড, সিসি ক্যামেরা নেই, বৃষ্টি বাদলাও ছিলো, না আছে কোন ফুটেজ, না পাওয়া যাবে হাতের ছাপ তাই তারা খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। আমি যেনো সাবধানে থাকি। ওরাও নজর রাখবে। মুহাম্মদ এসব শুনে খুবই উত্তেজিত। আমার এপ্রোচে নাকি সমস্যা আছে। এই সুযোগে পাবটা বন্ধ করার একটা এপ্লিকেশন করা যেতো বলে তার ধারণা। সে আমার পূণঃভূদাইগিরিতে অত্যন্ত বিরক্ত হলো।

দশদিন আগে

বাবাইকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে বাড়ির সামনে এসে চক্ষু চড়ক গাছ। একটু আগের ঝড়ে বাড়ির সামনের গাছ দুটোর একটার বড় ডালটা ভেঙ্গে রাস্তায় পড়েছে। রাস্তা ব্লক। ডালের একটা অংশ খুবই হালকাভাবে মুহাম্মদের গাড়ীতে ছুঁয়ে দিয়েছে। সেসব দেখার সময় নেই, দৌড়ে বাড়িতে এলাম। তুলি ঘুমে ছিলো। গাছ পড়ার শব্দে ভয়টয় পেলো কিনা... ওমা সে দেখি বিছানায় হেলান দিয়ে বিগলিত জাহ্নবি হয়ে স্যুপ খাচ্ছে! হাসি হাসি মুখ নিয়ে বল্লো, দেখো গাছের ডাল পড়ে যাওয়ার ঘরে কেমন সুন্দর আলো আসছে!
মিনিট বিশেকের মধ্যে ডোরবেল বাজলো। কাউন্সিলের লোকজন চলে এসেছে। তারা গাড়ীর ড্রাইভার খুঁজছে! (যথারীতি মুহাম্মদ জানেওনা তার সোনার ডিম পাড়া গাড়ীর ঘটনা।) মুহাম্মদ সোমালিয়ান লুঙ্গি পরে উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে এলো। গেলোরে গেলো টাইপ একটা ভাব। গাছের ডাল লেগে তার বিশাল ক্ষতি হয়েছে সেটা বের করে ফেল্লো মিনিটের ভেতর। যে লোকটা আমাকে ডাকতে এসেছিলো তাকে জিজ্ঞেস করলাম এখন কী হবে। সে খুব সিরিয়াসলি বল্লো, কাউন্সিল অবশ্যই মুহাম্মদের বিষয়টা দেখভাল করবে আর এই গাছটাও কেটে ফেলবে যাতে আর কোন দূর্ঘটনা না ঘটে!

সপ্তাহান্তে

মুহাম্মদ তার সিলভার কালারের টয়োটা আজো চালাচ্ছে। এদিকে সেলিনা বেগম তুলি বিছানায় বসে বসে রোজ রোদ পোহায় আর এসপ্যারাগাসের স্যুপ টানে। মাঝখান থেকে আমার গাছটা গায়েব...