Monday, November 19, 2007

কষ্ট জমাট বুকের ভেতর

২০০৪ সালের এপ্রিলে শেষ দিন। ইখতিয়ার ভাই ফোন দিলেন। তিনি সিলেটে এসেছেন। দেখা করার জন্য বল্লেন। এক ঘন্টার নোটিশ। দ্রুত গেলাম। রাজা ম্যানশনে ভোরের কাগজের অফিস। সেখানে গিয়ে দেখি সঞ্জিবদা। সাথে অন্য আরেকজন। ইখতিয়ার ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমিনুল এহসান, ডেমোক্রেসিওয়াচের মানুষ। দাদা’র সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলে বল্লেন, তারেত আমি চিনি, আমরার আরিফ’র ভাই নায়নি? তুমি আইলায় কোনদিনবা? আগের সপ্তাহেই মাসিক একটা পত্রিকার কাজের জন্য ঢাকা গিয়েছিলাম। শ্যামলদা’র সাইবার ক্যাফেতে দেখা হয়েছে। সাথে আরিফ ভাই ছিল। দাদা মিলিয়ে নিয়েছিলেন।

এর আগেও অনেকবার দেখা হয়েছে। ঢাকায়, সিলেটে। প্রথম পরিচয় প্রিয় প্রান্তিকে। স্বপনের চায়ের দোকানে। শেষ দেখাটা কবে হল এখন আর মনে পড়ছেনা। তবে বছর দেড়েক হবে এটা নিশ্চিত। তখন আমাদের সময়-এ কাজ করি। বলেছিলেন, ইন থাকি কিতা ওইব? নাইম ভাইয়ে টেকা দিতনায় জীবনে। এমনি আন্তরিক ছিলেন সঞ্জিবদা। অল্প পরিচিত এক তরুনকে নিয়েও তিনি ভাবতেন। গতবার সিলেটে একটা অনুষ্ঠানে হানিফ সংকেতকে আনার চেস্টা করেছিল আমার ভাই। সঞ্জিবদা শত ব্যাস্ততার মাঝেও সময় দিয়েছিলেন তাকে। হানিফ সংকেতের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। এসবি আমার একান্ত ব্যাক্তিগত কথামালা। কিন্তু আমার মত আরও অনেক তরুনের সাথে মিলিয়ে নিলে দেখা যাবে সঞ্জিবদার কাছে যারাই যেতে পেরেছিল তারাই পেয়েছে এমন ছায়া আর স্নেহ।

সেই এপ্রিলের কথাই আজ বারবার মনে পড়ছে। দুদিন মনে হয় ছিলেন সেবার। যেদিন সকালের কথা বল্লাম সেই সকালেই তিনি অসুস্থ হয়েছিলেন। মির্জাজাঙ্গাল পয়েন্টের কাছে হঠাৎ করেই প্রচণ্ড ব্যাথায় কুকড়ে উঠেন। ধনুকের মত বাঁকা হয়ে যান। পাশেরই একটি ফার্মেসিতে বসায় সঙ্গে থাকা একজন। এই মুহূর্তে নামটা ঠিক মনে পড়ছেনা। সম্ভবত ভোরের কাগজের সিলেট প্রতিনিধি বিনায়ক শুভ’র ভাই ছিল। সে ফোন করে ইখতিয়ার ভাইকে। আমরা তখনও রাজা ম্যানশনে। সবাই দৌড়ে গেলাম। একটা বেবিটেক্সি ডেকে তাকে তোলা হল সেখানে। কিন্তু হাসপাতালে যাওয়া হবে শুনে দাদা’র তীব্র প্রতিবাদ। তবু নিয়ে যাওয়া হল। ওসমানী হাসপাতালের ডাক্তাররা দেখেই ভর্তি করে নিলেন। দাদার সেকি রাগ। তবু কয়েক ঘন্টা রাখা হয়েছিল। দুপুরের পরেই নিজ দায়িত্বে হাটেলে চলে এলেন। ডাক্তাররা বার বার অনুরোধ করলেন একটা দিন অন্তত থাকার জন্য। কে শুনে কার কথা।পরদিন সকালে গেলাম দেখা করার জন্য। বসতে বলেই শুরু করলেন তার বয়ান, দেখতো কালকে এরা একটা কাজ করল? আমি বলি, কি দাদা? দাদা করুন গলায় বলেন, এইযে আমারে হাসপাতালে নিয়ে গেল। আমি কি বলব, তাকিয়ে থাকি তার মুখে। হঠাৎ করেই যেন তার মনে পড়ে আগের দিনের মুখ গুলো! রেগে গেলেন, আরে কালকেতো তুমিও ছিলে। ভাষা বদলে গেল- ‘মিয়া তোমরা খাইল ইতা কিতা খরলায়...’ ইত্যাদি, ইত্যাদি... ইখতিয়ার ভাই এসে আমাকে উদ্বার করেন...

হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে থাকা তরুন ডাক্তার বার বার বলছিলেন, দাদা একটু সাবধানে থাকবেন, রেস্ট নেবেন, আপনার শরিরটা বেশি ভালনা। সাড়ে তিন বছর আগের সেই কথাগুলো এখন খুব কানে বাজছে... দাদা একটু সাবধান হলে কি হত?

কানে বাজছে, গত সন্ধায় সেই রাজা ম্যানশনের সামনে দড়িয়ে তার এক চরম ভক্তের বলা কথাগুলো, অপু ভাই দেখবেন দাদা ঠিক ভাল হয়ে যাবেন... আবার গান গাইবেন... রুবেল তোর কথাটা সত্য হলনা কেনরে?


১৮ নভেম্বর ২০০৭। মধ্যরাত।

Thursday, November 15, 2007

লোকটা চাঁদকে বড় বেশি ভালবাসত...


সেটা আমার প্রথম সুনামগঞ্জ যাত্রা। বন্ধুরা মিলে গেলাম। বড়দের মাঝে ছিলেন নূর ভাই আর টুকু’দা। শহর সুনামগঞ্জে আমাদের দুঃসম্পর্কের কয়েকজন বন্ধু ছিল। যাদের কেউ কেউ এখন কাছের বন্ধু হয়ে গেছে।

সেদিন আমরা বসেছিলাম সুনামগঞ্জের পৌরসভা কার্যালয়ে। নির্দিষ্ট করে বল্লে পৌর চেয়ারম্যানের কক্ষে অবাক করার মত ঘটনা হতে পারত এটা। কারণ আমার বন্ধুরা কেউ রাজনৈতিক পান্ডা ছিলনা। ওরা ছিল কবিতার কামড়ে অস্থির তরুন-তরুনি। আর সেই শহরের চেয়ারম্যান ছিলেন মমিনুল মউজদীন। কবি পুরুষ। যিনি চাঁদের রাতে নিভিয়ে দিতেন শহর সড়কের সব বাতি। তাই চেয়ারম্যানের রুমে বসে সেদিন আড্ডা দেয়াটা স্বাভাবিক ছিল।কতবার নির্বাচিত হয়েছিলেন মউজদীন ভাই? তিনবার মনে হয়। হাছন রাজার প্রপৌত্র চাঁদকে যেমন ভালবাসতেন তেমনি ভালবাসতেন কবিতাকে আর অতিঅবশ্যই মানুষকে। আচ্ছা আমি এভাবে বাসতেন লিখছি কেন? হ্যা লিখছি, লিখতে হচ্ছে। কারণ মানুষটা আজ চলে গেছেন! চলে যেতে হয়েছে তাকে। স্বপরিবারে। জিবরান, মউজদীন ভাইয়ের ছেলে। কবির নামে নাম রেখেছিলেন, সেই জিবরানও চলে গেছে আর গেছেন মউজদীনের স্ত্রী। ঢাকা থেকে ফিরছিলেন। ব্্রাম্মন বাড়িয়ার কাছে সরাইলে ঘটেছে ঘটনাটা। বিপরিত থেকে আসা যাত্রিবাহী কোচের ধাক্কা।

জিব্রানকে আমি দেখেছি দশ বছর আগে। ১৯৯৭ সালে। শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত বাউল উৎসবে। সে উৎসবে মউজদীন ভাইয়ের সাথে হাছন রাজা নামের বানান নিয়ে সেকি তুমূল তর্ক...। প্রথম পরিচয়েই ঝগড়া। দু’বছর পরে মনে হয় গিয়েছিলাম সুনামগঞ্জে। ফিরে এসে ছোট একটা লিখায় লিখেছিলাম, মউজদীন লেজেহুমু’র মত রাজনৈতিক ধান্দাবাজ কবি নয়। তিনি প্রকৃতই কবি। আমার এই স্বিকৃতি তারজন্য গগুরুত্বপূর্ন কিছু নয়। তবু তিনি খুশি হয়েছিলেন খুব। আমাকে চিনতে পারেননি। তবু নিজের লেখা একটা কবিতার বই আমার জন্য পাঠিয়েছিলেন। আমার এক বন্ধুর কাছে দেয়া সেই বইটা কোনদিনই পাইনি যদিও তবু দারুন এক আরামবোধ ছিল সেই বই প্রাপ্তির খবর।

বছরখানেক পর আবার দেখা হল। পুরনো তর্কের মানুষ আর ক্ষুদ্র সেই লিখিয়ে একি মানুষ মেলাতে পেরে দারুন খুশি হয়েছিলেন। এরপর আর তেমন যোগাযোগ নেই। মাঝখানে দুবার আমার পত্রিকার জন্য লেখা চেয়ে আলাপ হয়েছিল। এই যা।

গত কয়েকদিন ধরে আবারও যোগাযোগের একটা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল। সুনামগঞ্জে বাউল উৎসব করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। যতদুর জানি তার পুরো প্রস্তুতিই সারা হয়ে গিয়েছে। এবারের ঢাকা যাত্রায় বড় ছেলেকে দেখার পাশাপাশি এই অনুষ্ঠানের অনেক কাজ করার কথা। তো উৱসবের খবর শুনেই ঠিক করেছিলাম যাব সেখানে। সহকর্মী সামস শামীম আমাকেও সম্পৃক্ত করার একটা ইশারা দিলেন। জানালেন, উৎসবের স্মরনিকাটা তিনি ছাপার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। তার সেই কাজে আমার সহযোগ দরকার। এই মূহুর্তে বেকার আমার জন্য এটা ছিল দারুন ব্যাপার... সেই দারুন ব্যপারটা মনে হয় আর ঘটলনা। মউজদীন ভাই চলে গেলেন। বড় অসময়ে, খুব বেশি অবাক করে দিয়ে... ভাল্লাগছেনা একেবারে। একবারেইনা...