Sunday, April 26, 2009

পুরনো গল্প ০৩

মা গুনে গুনে টাকা দিতো। ডানোর কৌটো থেকে বের হতো সেই টাকা। সাত টাকার ডাল, এক টাকার কাচা মরিচ... এভাবে টাকার অংক ধরে ধরে বাজারে পাঠাতো আমাকে। ততদিনে আমি জেনে গেছি, এভাবে হিসেব করেই বাজারে যেতে হয় আমাদের। এভাবে হিসাব করে বাজার করা যায় না তবু সেটা মেনে নিতে হবে। এও জেনেছি, সাত টাকায় এক পোয়া ডাল আর তেরো টাকায় আধা সের, এক টাকা বাচানোর এই হিসাবে আমরা যেতে পারবো না। আমাদেরকে রোজ আট আনা বেশি দিয়েই ডাল কিনতে হবে।

বাবা মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় বারান্দায় এসে দাড়াতো। সে বৃষ্টিই হোক আর শীত। বাজার থেকে ফিরে এসে দেখি বাবা বারন্দায়, সন্ধার আলো আলো অন্ধকারে বাবা আমার দিকে স্পষ্ট চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি সেটা দেখি, আবার নাও দেখি। কথা বলতো না। শুধু একবার, রাতে, মাঝরাত হবে হয়তো। কি একটা বই খুজতে বাবার ঘরে গেলে বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কিরে টুটুল তুই রোজ রোজ সাত টাকার ডাল কিনিস কেনো? আমি অবাক হয়ে বলি, তুমি জানলে কিভাবে? বাবা একটু থেমে আবার বলে তেরো টাকা দিলেতো আধাসের ডাল পাওয়া যায়। রোজ রোজ আট আনা বেশি দিস কেনো?

আমার মাথায় ঢং ঢং করে হাতুড়ির বাড়ি পড়ে। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার দিকে তাকানো চোখটায় পুরনো সেই শূন্যতা নেই। সেখানে বরং আছে হিসাব বুঝিয়ে দেয়ার এক আত্মতৃপ্তি। রোজ রোজ সাবান কিনে দেয়ার হিসেবটা বাবা আমাকে বুঝিয়ে দেয়। দাড়িয়ে থাকা আমাকে দেখে বাবার কি হয় জানি না। উঠে দাড়ায়। কাছে আসে, কাধে হাত রাখে আমার, টান দিয়ে বুকে নিয়ে বলে, এভাবেই রোজ রোজ আট আনা দিয়ে দিতে হয়রে টুটুল, এভাবেই রোজ রোজ আমাদের ঠকতে হবে। এভাবেই হিসেবহীন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে বাবা...

Tuesday, April 21, 2009

আলবাব'র সময় ০৫


একেকটা রাত মৃত্যুর মতো দীর্ঘ হয়ে আসে...

মানুষ মূলত মিথ্যুক জেনেও ভালোবাসা বিলায় প্রকৃতি।

এইসব প্রেম ও অপ্রেমে, করুণা ও কার্পণ্যে ভেজার সময় কোথায় বলো?

প্রতারিত আলবাব অভিমান ভুলেছে, বিশ্বাস হারিয়েছে মানুষে

সরল রেখার জীবন, এইবার তবে ছুটি নাও

Monday, April 20, 2009

পুরনো গল্প ২

বাবার একটা আলাদা রুম ছিলো। দাদাজান যখন বাড়ি বানান, বাবা তখন যুবক। ছেলের জন্যে আলাদা একটা রুম বানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সেই ঘর ঠাসা ছিলো নানান রকমের বই এ। বাবা সেই ঘরে ডুব দিলেন। বড়দা এক রাতে ট্রেন ধরার জন্যে যখন বাড়ি ছাড়ছিলো, তার আগে বাবার সাথে দেখা করার জন্যে গেলো সেই রুমে। বাবার সাথে কি কথা হয়েছিলো বড়দার সেটা আমরা জানি না। এই কথা শুধু মনে আছে, বড়দা বেরিয়ে এসে আর দাড়ায়নি। হন হন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। আমি পেছন পেছন সাইকেল নিয়ে বেরুলাম। দাদা সেটা চালিয়ে স্টেশনে গেলো। রাস্তায় কোন কথা হয়নি দু’ভাইয়ে। স্টেশনে ঢুকার মুখে, আমার হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট গুজে দিয়ে বল্লো, একটা পেডলক কিনিস সাইকেলের জন্যে। তারপর দু কদম এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে বল্লো, 'টুটুল, বাবাকে দেখে রাখিস সোনাভাই। বাবা খুব কষ্টে থাকেরে...' দাদার চোখে টলটল করছিলো পানি, সাইকেল চালাতে চালাতে মুছে ফেলছিলো যা, এইবার আর সেটা করলো না। টপ টপ করে গাল বেয়ে নেমে আসে ...
সাইকেলের প্যাডেল ঘুরাতে ঘুরাতে অবাক হই, সেই প্রথমবার আমি রাত দশটায় একা বাড়ি ফিরি। সেইদিন থেকে আমি বড়ো হতে শুরু করলাম।

Sunday, April 19, 2009

পুরনো গল্প

স্কুলের ইউনিফর্ম ছিলো সাদা শার্ট আর নেভি ব্লু পেন্ট। রোজ বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই শার্ট টা ধুয়ে দিতে হতো। সাদা শার্ট একদিনের বেশি পরা যায় না। আমার একটাই শার্ট। পরের দিন পরতে হলে আগের দিনে সেটা ধুয়ে দিতেই হয়।

বাবাকে দু'একবার বলেছি, বাবা আমাকে আরেকটা শার্ট কিনে দাও। দেয়নি বাবা। আসলে তার হাতেতো টাকা থাকতো না সেসময়। আমাদের টানাটানির সংসার ছিলো। বাবা বলতো, টুটুল একটু কষ্ট করে রোজ বিকালে শার্টটা ধুয়ে দিস বাবা। রোজ রোজ শার্ট ধুতে কার ভালো লাগে? এর মাঝে সাবান শেষ হয়ে গেলেও মায়ের সাথে রাগারাগি করতো বাবা। তাই আমি একদিন পর পর শার্ট ধুয়ার চেস্টা করতাম।

বাবাকে দু একবার বুঝাতে চেয়েছি, এই যে রোজ রোজ সাবান খরচা হয়, এই বাড়তি টাকাটা এক করলেই একটা শার্ট কেনা যাবে। বাবা আমার যুক্তি শোনে সাদা সাদা চোখ নিয়ে আমাকে দেখতো। কিছু বলতো না। দাত দিয়ে নিচের ঠোট কাটতো শুধু। এসব দেখতে আমার ভালো লাগতো না। আমি বাবার সামনে থেকে চলে যেতাম। বাবা তখন বেকার ছিলো। ইট ভাটার ম্যানেজারি করতো বাবা। মালিক সেই ভাটার যায়গায় হাউজিং এর ব্যবসা খুলে বসেছিলো। বাবা তাই বেকার। এই বেকারত্ব অবশ্য কোনোদিনই আর কাটেনি।
বড়দা যখন বি ডি আর এর চাকরিতে গেলো, তার বয়েস তখন মাত্র আঠারো বছর হয়েছে। টিঙটিঙা লম্বা। যে লোকটা লাইনে দাড়িয়ে মাপছিলো বুকের ছাতি সে বড়দার সামনে দাড়িয়ে কিছুই করেনি। সাদা গেঞ্জিতে শুধু একটা সিল মেরে বলেছিলো সামনের কাতারে যাও। সুরেষ স্যার বিকেলে আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে বল্লেন, কোনোভাবেইকি ছেলেটাকে পড়ানো যায় না? বাবা শূন্যের দিকে চোখ মেলে তাঁকিয়ে থাকলেন অনেক্ষণ। একসময় স্যারকে উঠোনে বসিয়ে রেখেই ঘরে ঢুকে গেলেন। বহু বছর বাবাকে ঘর থেকে বের করা যায়নি আর। এমনকি ঈদের নামাজেও নেয়া যায়নি তাকে।

Tuesday, April 14, 2009

হালখাতা

সকালে, সেটা সাতসকাল ছিলো না। আবার রোদও কড়া হয়নি এমন সময়ে বাবাই আমার ঘড়িটা পরলো। বেশ দামি এই ঘড়িটা। বলাই বাহুল্য, এটা আমি কিনিনি। লিল্লাহ পেয়েছি। (এইটা কেনার মুরোদ আমার নাই।) আমি হালকা রা॥রা.. করলাম। সে রুম থেকে বেরিয়ে হেডকোয়ার্টারে আশ্রয় নিলো। চিফ অব ফ্যামেলির আশ্রয়ে থেকে একটা আছাড়া মারলো। শখের ঘড়ি গেলো...


সাত সকালে উঠতে হতো আগে। শহর যারা রাঙাতো আমিও তাদের একজন ছিলাম। এখন আর সেইসব দায় নাই। ইচ্ছে হলে ঘুরি, নাহলে ঘুমাই। শুনেছি আমাদের হাতে গড়া কলেজের উৎসব এখন মিলেঝুলে করা হয়। জিয়া আর মুজিবের সৈনিকেরা নাকি এককাতারে দাড়িয়ে বগল বাজায়। শুনতে খারাপ লাগে না। এই একটা উপলক্ষে কুকুরের চরিত্র ভুলে তারা গলাগলি করে এইটাইতো অনেক! তবু কিছুটা খচখচানি বুকের ভেতরে, খুব গভীরে করতেই থাকে।

এক ভদ্রলোক বিবাহ করছেন, নববর্ষের দিনে বউভাত হচ্ছে। ভুলেও ভাববেন না, বাঙালিয়ানার টানে এই তারিখ নির্ধারন। ছুটির দিনটা কাজে লাগানোই মূল উদ্দেশ্য। গোসল টোসল করে, মাকে নিয়ে, বউকে নিয়ে, ছেলেকে নিয়ে আমি চেপে বসি আমার প্লাস্টিকে। (ঢাকার লোকজনে এই জিনিস চেনার কথা) ভালই চলে বেটা। অনভ্যস্থ আমি হালকা চালে এগুতে থাকি। কিন্তু মিনিট পনেরো পরে একেবারে মাঝরাস্তায় আটকে যায় বেটা। নিউট্রাল করে কোনোমতে রাস্তার পাশে দাড় করাই। খেশ খেশ করে কাশতে থাকে, স্টার্ট হয় না। ইঞ্জিনিয়ারকে ফোন করে মা-বউ-বাচ্চাকে তুলে দিই বেবিটেক্সিতে। আমি রোদে দাড়িয়ে মেকানিকের অপেক্ষা করি। ঘটনা সেটাই ঘটে, ফোনে যা জেনেছিলাম। কি এক্টা বেল্ট ছিড়ে গেছে। সেটা এই দাঁড়ানোতে ঠিক হবার না। একটা টেম্পু ডেকে তার পেছনে বাধা হয় আমার সাধের মারুতিরে। আমি পেছন পেছন মোটর সাইকেলে টানি। প্রিয় মোটর সাইকেলের কাছে এই ফাঁকে ক্ষমাও চাই। এভাবে তারে ফেলে চারচাকায় চাপা যে বিরাট অন্যায় ছিলো সেটা স্বিকার করি।

মেকানিকের হাতে গাড়ি সপে দিয়ে এইপাশ ওইপাশ ঘুরি। কারখানায় যাই। সেখানে আল্লার নাম ছাপায় আমার মেশিনম্যান। অন্যছাপার বেলায় যে অনায়াস ভঙ্গি থাকে, সেটা নাই তার। মাঝখানে ইম্প্রেশনে ইম্প্রেশনে একেকটা দোয়া দরূদ ফুটে উঠে আর সুলতান (কোনো মূলকের সুলতান নয় এ বেটা, জিহ্বা খাটো স্রেফ এক অফসেট মেশিনম্যান, ঘটাঙ ঘটাঙ কর্ড মেশিন চালায় যে) আরো আড়ষ্ঠ হয়। কাগজের মাঝখানে আর হাত দেয় না। গ্রিপার মার্কের বাইরের সাদা অংশে আঙুলে টিপ দিয়ে ধরে ছাপা পরীক্ষা করে। বেরিয়ে আসি, ফোন করি, মা তাড়া দেন, গাড়ি ঠিক না হলে হোক, তুমি খেতে আসো, বউ ফোন করে, তুমি মোটরসাইকেল নিয়েই আসো। বিয়ের আসরে গিয়ে দেখি যে যার মতো চলে গেছে, মা গেছেন তার বোনের বাড়ি, আমার ছেলে খেলছে, দৌড়াচ্ছে, লাল পাড়ের সাদা শাড়িয়াল মেয়েরা পরিশ্রান্ত হয়ে চেয়ারে বসে বসে কলবল করছে, এদের দু একটাকে আমি কোলে নিয়েছি। আজকাল প্রায়ই এমনটা হচ্ছে। যেখানেই যাই, দেখি পিচ্চিগুলো বড়ো বড়ো হয়ে উঠছে। নাকি আমি বুড়ো হচ্ছি? আমাদের বুড়ো আক্তার ভাই এর বিয়েতে গিয়ে একসাথে পেলাম তিন ভাগ্না ভাগ্নিকে। একেকটা পুরা মুরুব্বি। সবচে ছোট যেটা ছিলো, সেটা নাকি ব্যবসা করে! মনে হয় এই সেদিন বেটা হিশু করে পেন্ট ভিজিয়ে ক্যাকু-ক্যাকু করছে, আর আমি নেঙটা করে তারে ছেড়ে দিয়েছি। এর বড়োটা বিদেশে থাকে, আর ভাগ্নি তার পিচ্চিটারে কোলে দিয়ে বলে, অপু মামা দেখো, বিয়ে না করলে আমার মেয়ের সাথে তুমি গুডু মারতে পারতে। আমি বিচ্ছিরি ঠা ঠা হাসি দিয়ে বলি, আমি কি বুড়া হয়ে গেলামরে লুবনা? হাসি ফেরত দিতে দিতে বলে, কি যে বলো মামা, আসলে তুমি আগের মতোই আছো, আমরাই বরঙ বড়ো হয়ে গেছি।

আমার উনিশ বছরি মোটর সাইকেল, বিশ্বস্থ বাহন নিয়ে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে কেন যে থামলাম... এই ফাঁকে গরম ইঞ্জিনে পা লাগিয়ে ছ্যাকা খায় বাবাইটা। কিন্তু কিছুই বলে না, এমনকি কাঁদেও না। শুধু ঘাবড়ে যাওয়া চোখ নিয়ে তাঁকায়। আমি তার চেহারায় আতঙ্ক দেখি, কান্না দেখি, বলি কি হইছেগো বাবা, সে বলে কিছু হয় নাই। পা তুলে খুঁজেও পাইনা কিছু। তবু মনটা খারাপ হয়। ফিরে চলি। তারপর রাতের শুরুতে বাবাই তার নানার বাসার সোফায় ঘুমিয়ে পড়লে দেখি পায়ের পাতায় টসটস করছে একটা ফোস্কা...


আমার সোনাবাবাই তুমি এমন হচ্ছো কেনো? এতো চাপা কেনো? এখনই, এই চারবছর বয়সেই এতো এতো বেদনা ভেতরে চাপতে শিখেছো কেনো সোনা বাবা আমার? একটু চেচালে, একটু কাঁদলে, একটু ঠোট উল্টালে কি হতো? তুমি কি বাবাকে ভয় পাও, নাকি এই বয়েসেই বুঝে গ্যাছো, এই লোকটাকে, এই কালো লোকটার ভেতরে থাকা টিপটিপ করা হৃদয়ে ধাক্কা দেয়ার কোনো দরকার নাই। দুর্বল চিত্তের বাবার সন্তানেরা বুঝি এমনই হয়?