Tuesday, April 14, 2009

হালখাতা

সকালে, সেটা সাতসকাল ছিলো না। আবার রোদও কড়া হয়নি এমন সময়ে বাবাই আমার ঘড়িটা পরলো। বেশ দামি এই ঘড়িটা। বলাই বাহুল্য, এটা আমি কিনিনি। লিল্লাহ পেয়েছি। (এইটা কেনার মুরোদ আমার নাই।) আমি হালকা রা॥রা.. করলাম। সে রুম থেকে বেরিয়ে হেডকোয়ার্টারে আশ্রয় নিলো। চিফ অব ফ্যামেলির আশ্রয়ে থেকে একটা আছাড়া মারলো। শখের ঘড়ি গেলো...


সাত সকালে উঠতে হতো আগে। শহর যারা রাঙাতো আমিও তাদের একজন ছিলাম। এখন আর সেইসব দায় নাই। ইচ্ছে হলে ঘুরি, নাহলে ঘুমাই। শুনেছি আমাদের হাতে গড়া কলেজের উৎসব এখন মিলেঝুলে করা হয়। জিয়া আর মুজিবের সৈনিকেরা নাকি এককাতারে দাড়িয়ে বগল বাজায়। শুনতে খারাপ লাগে না। এই একটা উপলক্ষে কুকুরের চরিত্র ভুলে তারা গলাগলি করে এইটাইতো অনেক! তবু কিছুটা খচখচানি বুকের ভেতরে, খুব গভীরে করতেই থাকে।

এক ভদ্রলোক বিবাহ করছেন, নববর্ষের দিনে বউভাত হচ্ছে। ভুলেও ভাববেন না, বাঙালিয়ানার টানে এই তারিখ নির্ধারন। ছুটির দিনটা কাজে লাগানোই মূল উদ্দেশ্য। গোসল টোসল করে, মাকে নিয়ে, বউকে নিয়ে, ছেলেকে নিয়ে আমি চেপে বসি আমার প্লাস্টিকে। (ঢাকার লোকজনে এই জিনিস চেনার কথা) ভালই চলে বেটা। অনভ্যস্থ আমি হালকা চালে এগুতে থাকি। কিন্তু মিনিট পনেরো পরে একেবারে মাঝরাস্তায় আটকে যায় বেটা। নিউট্রাল করে কোনোমতে রাস্তার পাশে দাড় করাই। খেশ খেশ করে কাশতে থাকে, স্টার্ট হয় না। ইঞ্জিনিয়ারকে ফোন করে মা-বউ-বাচ্চাকে তুলে দিই বেবিটেক্সিতে। আমি রোদে দাড়িয়ে মেকানিকের অপেক্ষা করি। ঘটনা সেটাই ঘটে, ফোনে যা জেনেছিলাম। কি এক্টা বেল্ট ছিড়ে গেছে। সেটা এই দাঁড়ানোতে ঠিক হবার না। একটা টেম্পু ডেকে তার পেছনে বাধা হয় আমার সাধের মারুতিরে। আমি পেছন পেছন মোটর সাইকেলে টানি। প্রিয় মোটর সাইকেলের কাছে এই ফাঁকে ক্ষমাও চাই। এভাবে তারে ফেলে চারচাকায় চাপা যে বিরাট অন্যায় ছিলো সেটা স্বিকার করি।

মেকানিকের হাতে গাড়ি সপে দিয়ে এইপাশ ওইপাশ ঘুরি। কারখানায় যাই। সেখানে আল্লার নাম ছাপায় আমার মেশিনম্যান। অন্যছাপার বেলায় যে অনায়াস ভঙ্গি থাকে, সেটা নাই তার। মাঝখানে ইম্প্রেশনে ইম্প্রেশনে একেকটা দোয়া দরূদ ফুটে উঠে আর সুলতান (কোনো মূলকের সুলতান নয় এ বেটা, জিহ্বা খাটো স্রেফ এক অফসেট মেশিনম্যান, ঘটাঙ ঘটাঙ কর্ড মেশিন চালায় যে) আরো আড়ষ্ঠ হয়। কাগজের মাঝখানে আর হাত দেয় না। গ্রিপার মার্কের বাইরের সাদা অংশে আঙুলে টিপ দিয়ে ধরে ছাপা পরীক্ষা করে। বেরিয়ে আসি, ফোন করি, মা তাড়া দেন, গাড়ি ঠিক না হলে হোক, তুমি খেতে আসো, বউ ফোন করে, তুমি মোটরসাইকেল নিয়েই আসো। বিয়ের আসরে গিয়ে দেখি যে যার মতো চলে গেছে, মা গেছেন তার বোনের বাড়ি, আমার ছেলে খেলছে, দৌড়াচ্ছে, লাল পাড়ের সাদা শাড়িয়াল মেয়েরা পরিশ্রান্ত হয়ে চেয়ারে বসে বসে কলবল করছে, এদের দু একটাকে আমি কোলে নিয়েছি। আজকাল প্রায়ই এমনটা হচ্ছে। যেখানেই যাই, দেখি পিচ্চিগুলো বড়ো বড়ো হয়ে উঠছে। নাকি আমি বুড়ো হচ্ছি? আমাদের বুড়ো আক্তার ভাই এর বিয়েতে গিয়ে একসাথে পেলাম তিন ভাগ্না ভাগ্নিকে। একেকটা পুরা মুরুব্বি। সবচে ছোট যেটা ছিলো, সেটা নাকি ব্যবসা করে! মনে হয় এই সেদিন বেটা হিশু করে পেন্ট ভিজিয়ে ক্যাকু-ক্যাকু করছে, আর আমি নেঙটা করে তারে ছেড়ে দিয়েছি। এর বড়োটা বিদেশে থাকে, আর ভাগ্নি তার পিচ্চিটারে কোলে দিয়ে বলে, অপু মামা দেখো, বিয়ে না করলে আমার মেয়ের সাথে তুমি গুডু মারতে পারতে। আমি বিচ্ছিরি ঠা ঠা হাসি দিয়ে বলি, আমি কি বুড়া হয়ে গেলামরে লুবনা? হাসি ফেরত দিতে দিতে বলে, কি যে বলো মামা, আসলে তুমি আগের মতোই আছো, আমরাই বরঙ বড়ো হয়ে গেছি।

আমার উনিশ বছরি মোটর সাইকেল, বিশ্বস্থ বাহন নিয়ে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে কেন যে থামলাম... এই ফাঁকে গরম ইঞ্জিনে পা লাগিয়ে ছ্যাকা খায় বাবাইটা। কিন্তু কিছুই বলে না, এমনকি কাঁদেও না। শুধু ঘাবড়ে যাওয়া চোখ নিয়ে তাঁকায়। আমি তার চেহারায় আতঙ্ক দেখি, কান্না দেখি, বলি কি হইছেগো বাবা, সে বলে কিছু হয় নাই। পা তুলে খুঁজেও পাইনা কিছু। তবু মনটা খারাপ হয়। ফিরে চলি। তারপর রাতের শুরুতে বাবাই তার নানার বাসার সোফায় ঘুমিয়ে পড়লে দেখি পায়ের পাতায় টসটস করছে একটা ফোস্কা...


আমার সোনাবাবাই তুমি এমন হচ্ছো কেনো? এতো চাপা কেনো? এখনই, এই চারবছর বয়সেই এতো এতো বেদনা ভেতরে চাপতে শিখেছো কেনো সোনা বাবা আমার? একটু চেচালে, একটু কাঁদলে, একটু ঠোট উল্টালে কি হতো? তুমি কি বাবাকে ভয় পাও, নাকি এই বয়েসেই বুঝে গ্যাছো, এই লোকটাকে, এই কালো লোকটার ভেতরে থাকা টিপটিপ করা হৃদয়ে ধাক্কা দেয়ার কোনো দরকার নাই। দুর্বল চিত্তের বাবার সন্তানেরা বুঝি এমনই হয়?

No comments:

Post a Comment