Saturday, June 9, 2007

আপন ভূমিকা

এই লেখাটি পথ নামের একটি সাহিত্যপত্রে ছাপা হয় ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারীতে। কয়েকটা শব্দ বদলে পোস্ট করলাম।
এক.
মোনা হঠাৎ বলে উঠল 'রাজু তুই এত ভালো, তোকে আদর করতে ইচ্ছে করছে রে'। আমি 'থ' মেরে যাই। এই মেয়ে বলে কি! ও জানেনা বিশের যুবক যুবতি পরস্পরকে আদর করলে সে আদর কবিতা হয়ে যায়। মুখে কথা আসে না, পিট পিট করে তাকাই মোনা'র দিকে। মোনা হাসে, খিল, খিল,। গড়পড়তা বালিকার মতো মুখে অাঁচল নিয়ে হাসি থামায়। হাসি থামতে চায় না। বলে যায় মোনা। 'এই এমন তাকিয়ে আছিস কেন! তুই কি ভেবেছিস পুরুষ ভেবে তোকে আদর করব! আরে তুই আবার পুরুষ নাকি? দেখতে কেমন বাচ্চা লাগে!'আমি ঘোৎ করে উঠি 'মোনা কোন কাজটা করলে আমার ব্যাটাত্ব প্রমাণ হবে?' সে থেমে যায়। অনেকন হাসলে চোখের কোনো পানি জমে। তার দু-চোখের কোনো কুয়াশার মতো পানি।হাঁটতে থাকি। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো চকচকে গাড়ি। আয়নায় চেহারাটা দেখে নেই। ঠিক আছে সব কানের লতি পর্যন্ত জুলপি, গোঁফ, মাথাভর্তি কুকড়ানো ছেলেচুল।
দুই.
হাসান মিয়ার চায়ের দোকানে আমার দুর্দান্ত বন্ধুরা দাঁড়িয়ে। দেখেই হাঁক ছাড়ে 'আও ইয়ার, তুমি আজ আমাদের হিরো। এখন থেকে এই রাস্তায় যত মোয়ে যাবে সব তোমার।' অস্বস্থি নিয়ে ওদের পাশে দাঁড়াই। প্রথম রিকশা যায় আমি তাকাতে পারিনা। ওরা হাসে। দ্বিতীয়টা যায়... পা দিয়ে রাস্তায় অদৃশ্য আলপনা অাঁকি। তৃতীয়টা চলে গেলে জাকি টেনে টেনে বলে, 'কী গুরু ম্যান্দা মেরে গেলে নাকি, ব্যাটা হও গুরু, ব্যাটা হও।' দাদাজানের পেতলের গ্লাসটা মেঝেতে পড়লে যেমন ধাতব শব্দ হয়, তেমন ঝনাৎ করে উঠে আমার মাথার ভেতর, ব্যাটা হও... ব্যাটা হও... তখনই আসে রিকশাটা। অনেকদূর থেকেও চিনতে পারি মোনা।আমার ভেতরে ব্যাটাত্ব প্রমাণের মহড়া শুরু হয়। টান হয়ে দাঁড়েই। মোনা কি আমায় দেখতে পেয়েছে? ওই মুখে যেন এক চিলতে হাসি। অবজ্ঞার হাসি? আমি জেগে উঠি পুরোপুরি। নাগালে আসতেই হাঁক দেই, 'ওই মেয়ে, তোর...
তিন.
সাতদিন সময় কি অনেক? হয়ত হঁ্যা হয়ত না। বসি গোল হয়ে। মোরশেদ, ফয়সল, শাহানা, রোকন, মোনা, আমি। কথা বলি সবাই, কথা বলি একা। সবাই বক্তা, কেউ নেই শ্রোতা। ফিস্ ফিস্ করে বলি, 'মোনা বিশ্বাস কর হঠাৎ কেমন হয়ে গেলাম, মাথাটা ঠিক ছিলনা...' 'থাম্ রাজু, এমনতো কতই হয়।' বলার ভঙ্গি বরফ শীতল, কথা বলিনা। চোখের কোন দিয়ে তাকাই। গম্ভীর মোনা।
চার.
হাসান মিয়ার চায়ের দোকানটা কেমন যেন হয়ে গেছে। সবসময় জমজমাট, অথচ ফাঁকা। হাসান মিয়া বসে থাকে মরা মানুষের মতো। জাকি আসেনা। অনেকদিন। কাঁটাছেড়া শেষে তাকে রেখে দেয়া হয়েছে মাটির অন্ধকারে। বান্টি মোটা বুট সমেত পা-জোড়া একটা টেবিল তুলে দুধ চিনি বেশি দিয়ে চা গিলে আর ঝিমোয়। দেখলেই হাঁক ছাড়ে, 'রাজু আয় বাপ, একটা কবিতা শুনিয়ে যা।' বান্টির অনেক টাকা। না চাইতেই চা খাওয়ায়। হরদম জ্বালিয়ে দেয় নামি ব্রাণ্ডের সিগারেট। আমি বসে সিগারেট টানি। রিকশা গুনি। পুলিশ আসে, আবার চলেও যায়। চায়ের দোকানটার বয়স বাড়ে, বিশ বছর একদিন... দুইদিন... তিনদিন... মানুষ বিশবছরে যুবক হয়। চায়ের দোকান যুবক হয় কত বছরে...
পাঁচ.
শাহানা এসেছে চারমাস পর। পাক্কা তিনমাস আগে ওর বিয়ে হয়েছে। একমাস হলো শাহানার স্বামী রুটি সেঁকার জন্য আবার চলে গেছে ইউরোপ। কিছুদিন পর যাবে শাহানা। উৎপাদিত পণ্য নিয়ে যদি ফেরত আসে নিশ্চয়ই নাক উঁচু করে বলবে, 'এত ডার্টি, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।' শাহানা বসে মোনার পাশে। আগে পাশাপাশি বসত রোকন আর শাহানা। রোকন আসেনি আজ। বেশ কিছুদিন ধরেই আসছেনা, হয়ত আর আসবেও না। কোন চালের দোকানদারই এসময় দোকান ছেড়ে উঠেতে চায় না। মোনা'কে একটা কথা বলব। কিন্তু ও তাকায় না। আমি বসে থাকি। অপো করি তার দৃষ্টির।
ছয়.
সিগারেটে টানটা দিয়েছি সবে। বান্টি ওয়াক করে ওঠে। তাড়াতাড়ি করে ধরি। সিগারেটটা পড়ে যায়। বমিতে ভেসে যায় বান্টি। ভেসে যায় হাসান মিয়ার চেয়ার টেবিল। ধরাধরি করে বান্টিকে একটা টেবিলে শুইয়ে দিই। মেঝেতে চোখ পড়তেই দেখি সিগারেট ডুবে আছে। খেয়াল হয় শার্টে বমি লেগেছে।
সাত.
ঘরে পা রাখতেই চমকে উঠি। মোনা বসে আছি, পাশ জড়সড় শাহানা। ভূমিকা ছাড়াই একটা খাম এগিয়ে দেয় মোনা।... একটা ছবি... শাহানার বর... সোনালী চুলের মহিলা... পুতুলের মতো একটা বাচ্চা শাহানা মোনা কেউ কোনো কথা বলছে না...।
আট.
সব শালারাই বুঝি রুচি বদল করার জন্য বার বার ফিরে আসে।

No comments:

Post a Comment