Tuesday, November 24, 2009

বড় লোভ হে ...

বাবার সাথে উপজেলা সদরে ঘোরার কালে আমি নিতান্তই বালক ছিলাম। থানার ভেতরে ছিলো সেসব বাড়ি।

সফেদ পাঞ্জাবী পরা পোষ্টমাস্টার বাবার ছেলে আমি অনেকবার থানার বাবুদের বাড়ির রঙিন উৎসব দেখেছি। দাদা কিংবা মা বলেছে, এবার নভেম্বরে আমাদের বাড়িতেও এমন উৎসব হবে। আমি খুশি হয়েছি, কিন্তু প্রতিবারই কোন না কোন ঝামেলায় ভেসে গেছে সেইসব নভেম্বর। পরের নভেম্বরের জন্যে আবার আমি মন বেঁধেছি।

মফস্বলি মধ্যবিত্তদের অনেক স্বপ্ন থাকে, তারচেয়ে বেশি থাকে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। প্রাপ্তিযোগের চে বেশি হয় অপ্রাপ্তির ফিরিস্থি।

নিতান্তই স্মৃতিভুক এক মানুষ। ভেতরে ভেতরে পুষে রাখি এক প্রত্ন মন। কবেকার কোন বেলাদি, প্রতিভোরে আমারে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিরাতে মহাদেব এসে স্বপনে গল্প বলে। নলজুর নদীর জন্যে তার মন কেমন করে, আমারেও সে সেই বেদনায় ভাসায়, আমি নলজুর থেকে পাল তুলে পাড়ি দেই কালনীর ঢেউয়ে। নলুয়ার হাওয়ের প্রবল আফাল উঠে আমার বুকে...

হাতের তালুর মতই পরিচিত আমার শহর সিলেট। এই শহর আমারে আগলে রাখে, এই শহর আমারে পোড়ায়, এই শহর আমারে অশ্লিল করে। তবু এই শহরেরই পথে পথে আমি ঘুরি, এই শহরের সব মোড়ে, সব সড়কে ছড়িয়ে আছে আমার তরুণ প্রভাত, উচ্ছল বন্ধুতা, সজিব বিকেল...

সৃষ্টিছাড়া মানুষ হতে চেয়েছি, তবু সেই পথে যাওয়া হয়নি আমার। গানের দলের সাথে মাইলের পর মাইল হেটেছি, তারপর ধুলোমাখা পা নিয়ে ফিরেছি বাড়ি। পুকুরের জলে ধুয়ে গেছে সেইসব ধুলো-বালি-কাদা। বুকের ভেতরে তবু রয়ে গেছে এক বাউল মন। আমি ঘরে ফিরি প্রতিবার এই তিরিশ পেরুনো সময়ে, ঘরেই ফিরি আমি, তবুও আমি ফিরি না ঘরে কিংবা আমি রয়ে যাই বাসুদেব বাড়ির বারুনির মেলায়।

জানি সকলি তবে ভন্ডামী আর আমিও বেজায় ভন্ড, তাই জনারণ্যে ভালো লাগে না আমার, তবু তিল তিল করে শুষে নেই জনারণ্য...
মানুষে বিশ্বাস হারায়েছি কবে তার নেই কোন নিকাশ, তবু মানুষেরই ভালোবাসায় ভিজতে ভিজতে পার করতে চাই এইসব রতিজাগা রাত।

০২.

পরশু একটা মেইল এলো। ফেইসবুকের নোটিশ ছিলো তাতে। বন্ধু গৌরীশ লিখেছে আমার চিকিৎসা দরকার। তার অভিযোগ, আমি শুভেচ্ছার কাঙাল, তাই নভেম্বর আসতেই ফেইসবুকে ঘন ঘন যাতায়াত করি! হাসি সেই অভিযোগ কিংবা খোচা খেয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে স্বিকার করে নেই, তুই ছাড়া আর কে এমন বুঝেছে আমায়...

০৩.

একবার চাচিআম্মা হুলস্তুল বাধিয়ে দিলো। মিষ্টি এলো, হালুয়া রাধা হলো। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে মানুষজন এলো। আব্বা বাজারে গেলেন... নতুন প্যান্ট আর শার্ট পরে শীতের বিকালটা ঘুরছি কালনীর পাড় ধরে... বড়ো বেশি উজ্জল ছিলো সে বিকেল। এখনও সেই বিকেলের উত্তাপ পাই বুকের ভেতর।

সেইসব হুলস্থলি বিকেল পেরিয়ে এসেছি কবে। ভালোবাসায় ভিজতে ভিজতে পার করে এসেছি দুরন্ত উনিশ। তবু নভেম্বর এলেই আমি বদলে যাই। লোভ এসে বাড়ি বাধে আমার ভেতরে। ভালোবাসার লোভ, বড় তীব্র নেশা জাগানিয়া লোভ...

শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেলে, জানলা খুলে দিই। দেখি নজরুল ভাই, দেখি হিমু। ঘুম জড়ানো চোখ আরো ঝাপসা হয়ে আসে। এমন লেখা পড়লে হাসি আসে, যার আসে না তার মানষিক স্বাস্থ্য প্রশ্নের মুখে পড়বে। হায় আমি কি সত্যি তবে হয়েছি বিভ্রান্ত? মনোবৈকল্য দেখা দিয়েছে আমার? সারাদিনমান আমি শুধু আপ্লুতই হলাম। এইসব রঙ ঢঙ এ কতোটা দুলে বুকের ভেতর, আলবাব ছাড়া আর কে বুঝেছে কবে?

অপ্রাপ্তির খাতায় টুকে রাখা শৈশবরে আজ সত্যি সত্যি ভেংচি কাটি, দেখ বেটা এখন, আজ কেমন ভালোবাসায় উপচে পড়ে আমার জীবন। এই যে মগ্ন সময় ভরে উঠে ভালোবাসায়, তবু মন ভরে না! লোভ বাড়ে, ভালোবাসার লোভ...

আজ, তারিখের ঘরে যখন বসেছে চার, বয়েস বেড়ে গেছে একদিন, তখন সবারে জানাই কৃতজ্ঞতা। আনত হই শুধু হে বন্ধুরা, আপ্লুত হই, লোভি হই। সকলি তোমাদের তরে, এতো ভালোবাসা দিতে হয় বুঝি?

আমি এক ক্ষুদ্র মানুষ। তুচ্ছ মানুষ। গৌণ মানুষ আমি। আমারে এতো ভালোবাসা দিতে নাই বন্ধুরা। ভালোবাসার বদলে ভালোবাসাও যে ফেরত দিতে পারি না আমি...

...................................
বিষণ্ণ মেঘের গান

স্থবির বিষণ্ণ এক মেঘখন্ড
বসে আছি, একা

চারপাশে দাড়িয়েছে দেয়াল অন্ধ বন্ধ
আমি নিঃশ্বাসে নিয়েছি বিষ মৌনতার

রাত, দিন, আলো ও অন্ধকার সবকিছু
একাকার হয়ে চেপে ধরেছে আমারে
আমারে নিংড়ে নিয়েছে বিষণ্ণ বাতাস

আমি বসে আছি, স্থবির হয়ে আছি, অপেক্ষায় আছি দমকা বাতাসের,
ঝরে পড়তেই জন্মেছিলাম, এই সত্য জেনেছি বলেই জলে দিয়েছি মন...


No comments:

Post a Comment