Monday, May 27, 2013

সিমন আমার ভাই

বাবাইর তখন তিন বছর। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি। ২ অথবা ৩ তারিখ হবে। শুদ্ধস্বর-এ বসে আমরা আড্ডা দিলাম। তারপর জ্যোতি, তারেক, আমি, তুলি, টুটুলভাইসহ কয়েকজন একসাথে বই মেলার পথ ধরলাম। আজীজ মার্কেট এর সোজা উল্টাদিকে রাস্তা পার হয়ে যাদুঘরের পাশের ফুটপাথে উঠতেই দেখি মন্থর গতিতে হাঁটছে, দেখে খুশি হবার বদলে আমার মুখটা শুকিয়ে গেলো। কারণ ঢাকায় যাবার কথা জানানো হয়নি। তার উপর সাথে বাবাইকে নিয়ে গেছি। আমাকে সে অবলীলায় পাশ কাটিয়ে গেলো। নিচের দিকে তার চোখ পড়ে না। পেছন থেকে ওর পিঠে খোঁচা মেরে থামালাম। ফুটপাথে অফিস ফেরত, মেলামূখী মানুষের ভিড়। সেসব কেয়ার না করেই জড়িয়ে ধরলো। ভাইজান বলে একটা চিৎকারও দিলো। একেবারে পিষে ফেলে পারলে। কোনমতো বল্লাম সাথে তোর ভাতিজা আছে দেখ। আমাকে ছেড়ে পাশে দাড়ানো বাবাইকে ছো মেরে কোলে তুলে নিলো। খবর দিলামনা বলে কোন অভিযোগ নেই,শুধু বল্ল, দেখলেন ভাইজান, আমারে খবর না দিলেও আমি ঠিক ঠিক খবর পেয়ে যাই। ফাঁকি দিতে পারবেন না। আমি লজ্জায় কিছু বল্লাম না... সিমন এমনই, সিমনের সাথে আমার এমনই সম্পর্ক।
মেলার সেই বিকেলটায় আর একবারও বাবাইকে কোলে নিতে হয়নি আমার। চারুকলার সামনে এসে যখন ভিড়ের কারনে দলছুট হয়ে পড়েছি। তুলি উদ্বিগ্ন মুখে নিজের ছেলেকে খুঁজছে। তখন অনেক দুরে ভিড়ের মাঝখানে একটা শক্ত কাঁধের উপর বসা বাবাইকে দেখিয়ে দিয়েছি। সেটা সিমনের কাঁধ। নির্ভরতার।
সিমনের সাথে আমার পরিচয় আরো আগে। ২০০৬ এর শেষ নয়তো ০৭ এর শুরুতে। সামহ্যোয়ার ইন ব্লগে। একটা টিভি স্টেশনের স্থানীয় অফিসে কাজ করি। ফুটেজ পাঠাতে হয় ইন্টারনেটে, তাই হাইস্পিড ইন্টারনেট কানেকশন সেখানে। সারাদিন নেটে থাকি। সামহ্যোয়ার ইন ব্লগের ভারি ইন্টারফেস যখন দেশের স্লো নেটে খুলতে অনেক সময় লাগে, তখন আমরা ধুমায়া কমেন্ট করি। সিমন সেটা দেখে অবাক। তখনকার ছাগু তাড়ানোতে সে বেশ এক্টিভ। আমার সাথে কাজ করতো মিঠু। কেমন করে যেনো তার সাথে সিমনের খাতির হয়ে গেলো। শাহেনশাহ ছিলো সিমনের ব্লগনাম। মিঠুর সাথে খুব বন্ধুত্ব তার। ফোনেও কথা হয়। একদিন আমার সাথেও কথা বল্ল। তারপর জিটকে এড করা হলো। তবে সামুর কমেন্টের ঘরেই বেশি আলাপ হয়। সেখানেই কোন এক ফাঁকে সে ভাইজান ডাকা শুরু করলো। যুক্তি ছিলো মিঠুর ভাইজান হলে তারও ভাইজান। আমি মেনে নেই। মিঠু ঢাকা আসলে তাদের আড্ডাও হয়। এরমাঝে একদিন সে সিলেটে হাজির। পরিচিত কার বিয়ে ছিলো। বিয়ের গাড়িতে উঠে সিলেটে চলে গেছে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য আমার সাথে দেখা করা!!! এইটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমার জন্য। আমি মরমে মরে গেলাম, তারচে বেশি অবাক হলাম। কি একটা রিপোর্টিং এর জন্য তখন শহরের বাইরে। সেটা শেষ না করে ফিরতে পারছি না। এদিকে বিয়ে শেষ করে ঢাকা ফিরে যাচ্ছে সবাই। সিমন যাবে না। সে একটা গাড়িই আটকে রাখলো। মিঠু সেই কথা ফোনে আমারে জানায়। আমি আরও অবাক হই। গাড়ি আটকে রাখা!!! কাজ অর্ধেক রেখেই ছুটে আসি। দশাশই শরীরের সিমনের সাথে আমার প্রথম দেখা হলো। গাড়িতে বসে থাকা কয়েকজন তরুন খুবই অবাক চোখে আমাকে দেখছিলো। সম্ভবত মেলাতে পারছিলো না। বিশেষ কোন কারণটার জন্য সিমনের মতো একটা ছেলে এভাবে নতজানু হয়ে বসে থাকবে, তা তারা বুঝতে পারছিলনা নিশ্চিত। আমি নিজেইতো বুঝতে পারছিলাম না।
সচল হবার বছরখানেক পর ঢাকায় একটা কাজে গেলাম। সাথে প্রেসের ম্যানেজার, মেশিনম্যান ছিলো। এদের একজনের বাড়ি বগুড়ায়, আরেকজন ময়মনসিংহের। কাজ শেষে দুজনেই ছুটি চাইলো। না করতে পারলাম না। কিন্তু আমি কি করবো। উদ্ধার করলো সিমন। ঝড়ের বেগে সে আমার কাজের জায়গায় হাজির। আসতে আসতেই খবর দিয়েছে এনকিদু আর বনিকরে। মিঠু ঢাকায়, তারেও জোগাড় করে ফেল্লো। বেইলি রোডে শুরু হলো আড্ডা। বসে থাকার আড্ডা শেষে হাঁটার আড্ডা। হাঁটতে হাঁটতে এরা একসময় নজরুল ভাই এর বাড়ির সামনে চলে এসেছে। সেই বাড়িতেই ঢুকে গেলো সবাই। আড্ডা দিতে দিতে আমার বাস মিস, হোটেলে যাবার সময়ও শেষ। এরমাঝে সেই বাড়ির চেয়ার ভেঙে ফেল্ল সিমন। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। বিব্রত হয়ে বসে আছি। সে অবস্থাতেই আমারে সেখানে ফেলে এলো! এর আগে যাদের সাথে সাইবার যোগাযোগ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না, সেই বাড়িতে আমাকে ফেলে এলো সারাটা রাতের জন্য। সে অন্য গল্প। অন্যসময় হয়তো হবে। আমি সিমনের কথা বলি আজ।
এরপর আমি যতবার ঢাকা গিয়েছি, প্রতিবার সিমনের সাথে দেখা হয়েছে। ঢাকা একটা অপরিচিত শহর। কিচ্ছু চিনি না সেখানে। সিমন দিনের পর দিন আমার কাজের জন্য ছুটি নিয়েছে। বাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকেছে। রাতে সিলেটের বাসে তুলে দিয়েছে। মন খারাপ হলে নিজেই সিলেটে চলে এসেছে। সিমনের দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠরা আমার কাছে সিমনের বিচার চেয়েছে। টুকরো টুকরো ছয়টা বছর এখন চোখের সামনে ভাসে... এই মাঝরাতে, একটু আগে ফোনে হুহু করে কান্নায় ভেঙে পড়েছে নজরুল ভাই। আমি একটা দুর্বল মানুষ। অতি ক্ষুদ্র। অল্পতেই সবকিছু গুলিয়ে ফেলি। এখনও তাই হয়েছে। সিমনের কথা বলতে গিয়ে নিজের কথাই বলছি শুধু। কিন্তু এটাও সত্যি সিমনকে আমি আমার মতো করেই চিনি।
সিমনের চওড়া কাধটা পরম নির্ভরতায় আঁকড়ে ধরা যায়। তুলি কখনই বাবাইকে আমার সাথে দিতে নিরাপদবোধ করে না। কিন্তু সিমনের কাধে চড়লে বাবাই নিরাপদ থাকবে এই বিশ্বাসটা ৬ বছর আগেই অর্জন করেছে সে। বাবাই সিমনের কাধে বসে ওর ঝাকড়া চুল মুঠিতে ধরে বই মেলায় যাচ্ছে এই দৃশ্যটা দু’দিন ধরে বার বার চোখে ভাসছে। আমার বাবাইটা এখনও কোলে চড়তে চায়, আমি ওরে কোলে নিতে পারি না। এতো বড়ো হয়ে গেছে। ওরে বলি, সিমন আসুক তোরে কোলে নেবে...
ওর বিয়ের কথাবার্তা পাকা হবার পর, ঢাকায় গিয়েছি। নজুভাই তখন কলাবাগানে থাকে। সন্ধ্যার পর সিমন হাজির। সাথে মিতু। বউকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। কতটা ভালোবাসা থাকলে এটা করা যায়? আমি তল খুজে পাই না এমন ভালোবাসার। একদম না। এরকম সময়ে শুধু কান্না আসে।
তান্তার জন্য তোর নিরাপদ কাধটা অনেক বেশি দরকার সিমন... তুই জেগে ওঠ... আমরা দুই ভাই মিলে তারেক, আকতার, বংকারে চল সুরমা নদীতে চুবায়ে আসি...

No comments:

Post a Comment