Saturday, April 26, 2008

হাঁসফাঁস মানুষ ও টম এন্ড জেরি

নতুন কেনা ডিভিডি প্লেয়ারে টম এন্ড জেরির কার্টুন চলে। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ছেলে। ততোধিক মুগ্ধতা নিয়ে ছেলেকে দেখে আনোয়ার। ভাতিজার শখ মেটাতে প্লেয়ারের সাথে টম জেরির পুরো কালেকশন নিয়ে এসেছে শফিক । একটার পর একটা এপিসোড আসছে।
টিভি দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই ছেলের মুখটা করুণ হয়ে ওঠে। আনোয়ারের চোখ এড়ায়না। কিরে বাবা, কি হয়েছে, মন খারাপ করলো কেন, বলে সে আধশোয়া শরীরটা টেনে ছেলের কাছে নিয়ে যায়। বালিশে হেলান দিয়ে বসে থাকা ছেলে বাপকে জড়িয়ে ধরে, 'বাবা হাঁসের বাচ্চাটাকে কেন নিয়ে গেল... ' আনোয়ার টিভিতে চোখ রেখে বোঝে কার্টুন দেখেই ঘটনা ঘটেছে। একটা হাঁস ছানা সেখানে চেঁচামেচি করছে। রিউয়াইন্ড করে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করে সে। দুষ্টু টম জলার ধার থেকে হাঁসের ডিম চুরি করেছে, সেটা থেকে বাচ্চা ফুটেছে, তারপর বাচ্চাকে রোস্ট বানানোর ধান্দায় টমের নানা কিসিমের বিতঙ। হাসি আসার মতো কাণ্ড সব। আনোয়ার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেন, এইতো বাবা সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখ দুষ্টু টম কেমন জব্দ হয়, একটু অপেক্ষা করো। বাচ্চাদের রেসিপি বানানোতে ওস্তাদ কার্টুনওয়ালা ঠিকই হাসিয়ে দেয় চার বছরের অন্তুকে। সে ফোকলা দাঁত বের করে হাসতে থাকে আর বাবার উপর গড়িয়ে পড়ে। আনোয়ারের মন ভালো হয়। একইসাথে সে ছেলের মন নিয়েও চিন্তিত হয়। এত কোমল কেন এই ছেলে? এই অল্পতেই তার মন খারাপ করে। মা একটু বকা দিলেই জ্বর ওঠে। একদিন রাগের মাথায় একটা চড় দিয়েছিলো সুলতানা, পরের এক সপ্তাহ গিয়েছে জ্বরে। এখনও সেই চড়ের কথা মনে হলে ছেলেটা মনমরা হয়ে যায়। এই দেশে এত মন খারাপ করা ঘটনা ঘটে রোজ। ক'দিন পর এই নাজুক মন নিয়ে ছেলে পড়বে বিপদে। ভাবতেই আনোয়ারের মন খারাপ হয়।

শফিক অন্তকে কোলে নিয়ে পটিয়ে দু চারটা আদর খেয়ে নেয়। 'কি রে টম জেরি কেমন লাগে।' চাচার গালে চকাস করে আরেকটা আদর দিতে দিতে অন্তু হাসে, আরেকটা 'এনে দেবে চাচ্চু?' রাজি হয় শফিক, কিন্তু শর্ত জুড়ে দেয় গালে পঞ্চাশটা আদর দিতে হবে! তারপর প্রশ্ন করে, 'আচ্ছা অন্তু, টম না জেরি কারে তোর পছন্দ?' - 'হাঁসের বাচ্চাটাকে আমার পছন্দ।' অন্তুর উত্তর শুনে অবাক চোখে তাকায় শফিক। 'আরে ইঁদুর বেড়ালের মাঝে তুই হাঁস পেলি কই?' আনোয়ার যোগ দেয় তখন, 'আর বলিসনা কি একটা হাঁসের বাচ্চারে ধরে আনছে টম সেইটা দেখে বাবুর তো মন খারাপ। কান্না কান্না অবস্থা। কবি টবি হয় কিনা এই বেটা আল্লাই জানে' বলে হাসতে থাকে আনোয়ার। শফিকও সে হাসিতে যোগ দেয়।

শওকত নিজের টেবিল থেকেই হাঁক ছাড়েন, 'ওই আনোয়ার ভাই আপনে বলছিলেন মোটর সাইকেল কিনবেন, পাইছি একটা, লাগবো?'ফাইল থেকে মাথা না তুলেই আনোয়ার জবাব দেন, 'লাগবে তো বলছিলাম, কিন্তু তেলের দাম নাকী আবার বাড়াবে।'- 'আরে সেই চিন্তা করলে হবে নাকী। তেলের দাম বাড়লে সব কিছুর দামই বাড়বে। রিকশা ভাড়াও তখন বাড়বে। কিনতে চাইলে বলেন।'- 'ঠিকাছে লাঞ্চের সময় কথা বলবো।'

আশি সিসির সাইকেল। এটাই আনোয়ারের পছন্দ। সে ছোটখাটো মানুষ। বড় সাইকেলে তার পোষাবেনা। তবে জাপানি না, এটা চায়নিজ। শওকত বুঝ দেয়, 'কী যে বলেন ভাই, সেই দিন আর আছে নাকি? জাপানি সাইকেল নাই। এখন সব ইন্ডিয়া নয়তো চায়না। আর সার্ভিসতো খারাপ না। আমি একবছর ধরে চালাচ্ছিনা?' সেটাও ঠিক। আর কথা বাড়ায়না সে। যা বলার শওকতই বলে। পঁচিশ হাজার টাকায় রফা হয়। এখনই মোটর সাইকেল নিয়ে নেয়া যাবে। টাকা দিতে হবে এক সপ্তার মধ্যে।

কলেজে পড়ার সময় আনোয়ার মোটর সাইকেল চালানো শিখেছিল। বন্ধুদের সাইকেল ছিল। তারাই শিখিয়েছে। মাঝে মাঝে চালানোও হতো তখন। মোটর সাইকেল কেনার চিন্তা মাথায় আসার পর একবার শওকতের সাইকেলে উঠেছিলো, কিন্তু সামলে উঠতে পারেনি। আজ শওকতের উৎসাহে মোটর সাইকেল নিয়ে নিলেও সেটা এখনই কিভাবে চালাবে সে চিন্তায় বেশ বিব্রত হয়ে পড়লো আনোয়ার। এবারও ত্রাতা হয়ে এলো শওকত। 'বিসমিল্লা বলে কিক মারেন আনোয়ার ভাই। আমি আপনার সাথে সাথে বাসা পর্যন্ত যাবো। কিনে ফেলেছেন, এখনতো চালাতেই হবে। নেন শুরু করেন।'শওকত ঠিকই বলেছে, চালাতে তো হবেই। স্টার্ট দিলো। হালকা পাতলা সাইকেল। পুরনো চালানোর কথা স্মৃতিতে এনে আস্তে আস্তে এগুতে থাকলো আনোয়ার। অনেকটা ঘোড়ায়ও চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিল টাইপ...

সুলতানা অবাক হয়ে তাকায় আনোয়ারের দিকে! সত্যি বলছেতো এই লোক। সে মোটর সাইকেল কিনেছে! আনোয়ার তাকে টানতে টানতে নিয়ে আসে। শওকত তখনও উঠানে নিজের মোটর সাইকেলে বসে। সুলতানাকে দেখে বিকট হাসি দিয়ে উঠে, 'ভাবী আপনার জামাই শেষ। সে ঘুষ খাওয়া ধরছে। দেখেন আস্তা একটা মোটর সাইকেল নিয়া আসছে।' সুলতানা হাসতে থাকেন। ‌‌‌' কে দিলো এই ঘুষ শওকত ভাই?'- আমি দিলাম, আপনে যাতে দ্রুত একটা বউ খুঁজে দেন আমারে এজন্য এই ঘুষ।- তাইলেতো ঘুষটা সে খায় নাই। আমি খাইলাম...- শওকত আবারো হাসি দেয়। ততক্ষণে বেরিয়ে আসে অন্তু। লাল রঙের সাইকেলটা দেখে সেও ফোকলা দাঁত বের করে।

রাত নয়টায় শহরের ভিড় কমে যায়। রাস্তাগুলো ফাঁকা হয় হয় একটা ভাব। এমন সময়টায় বেশ একটা দুঃস্বাহসের কাজ করে ফেলে আনোয়ার। বিকেলে পাড়ার ফাঁকা মাঠে ঘন্টা খানেকের প্র্যাকটিস সম্বল করে মোটর সাইকেলের পেছনের সিটে বউ আর পেট্রল টেঙ্কির উপর ছেলেকে বসিয়ে সে শহর দেখতে বেরিয়ে পড়ে।শহর অনেক বদলে গেছে। আগের সেই ছোট ছোট রাস্তা নেই। ডিভাইডার বসানো, নিয়ন বাতির বড় সড়ক। মোড়ে মোড়ে ফোয়ারা। সুলতানা ঘনিষ্ঠ হয়ে স্বামীর পেট পেঁচিয়ে বসে থাকে। স্বভাব বিরুদ্ধভাবে লাগাতার কথা বলে সে। কথা বলে আনোয়ারও। মোটর সাইকেল চালাতে চালাতে শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে চলে যায় আনোয়ার। কলেজ ক্যাম্পাসে। এই ক্যাম্পাসেই সে মোটর সাইকেল চালানো শিখেছিলো। দশ বছর পর মোটর সাইকেলের মালিক হয়েছে, তাই জানাতে যেন সে ক্যাম্পাসের পাশের রাস্তাটা দিয়ে চক্কর দেয়। আগে রাত দিন চব্বিশ ঘন্টা কলেজের ফটক খোলা থাকতো। এখন দিনেও সব ফটক খোলা হয়না। কত পরিবর্তন। এখনকার স্টুডেন্টরা এই বন্ধ ফটক কিভাবে সহ্য করে আল্লাই জানে। ঘোরাঘুরি শেষ করে ঘরে ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটা বেজে যায়। এতক্ষনে অন্তুর ঘুমিয়ে যাবার কথা কিন্তু মোটর সাইকেলের উত্তেজনায় সেটা উধাও।

মোটর সাইকেলটা আনোয়ারের রুটিনই বদলে দিয়েছে। আগে সন্ধ্যার পর ঘরে বসে টিভি দেখা নয়ত ছেলের সাথে খুনসুটিতেই কাটতো তার সময়। এখন প্রায় রোজই বেড়াতে বের হতে হয়। বউ খুঁজে খুঁজে আত্মীয়স্বজন বের করছে যেন। সপ্তায় সপ্তায় সেইসব আত্মীয়স্বজনের বাসায় যাওয়া হচ্ছে। এতে অবশ্য খারাপ লাগেনা আনোয়ারের। সবার সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। ছেলেও আত্মীয়স্বজনদের চিনতে পারছে এতেই সে সন্তুষ্ট। মাঝে মাঝে ছেলেকে নিয়েও বেরুতে হয়।

শফিক খুব ব্যাস্ত। ভাটির দিকে একটা বাঁধের কাঁজ পেয়েছে। পাথর ফেলার কাজ। রোজ সকালে উঠে ৫০/৬০ মাইল দুরের সেই বাঁধে যেতে হয়। ফিরতে ফিরতে রাত ১২টা ১টা বাজে। অন্তুর ডিভিডি কেনা তাই আর হয়না। চাচা ভাতিজার মাঝে সম্পর্কটাও খারাপ হতে চলেছে এই নিয়ে। শুক্রবারের সকালে সে আর চাচার সাথে কথা বলেনা। শফিক অনেক চেস্টা করে খাতির লাগায়। তারপর ভাইয়ের সাথে পড়ে। ও ভাইজান তুমি অন্তুরে একটা ডিভিডি এনে দেওনা ক্যান? এখনতো মোটর সাইকেলও আছে তোমার। কথাটা শুনে আনোয়ারেরও মনে হয়, তাইতো, ডিভিডিটা তো সেই আনতে পারতো। সুলতানাও বলে, ঠিকই তো শুধুতো ছেলে দেখেনা, তুমিও তো তাল মিলিয়ে ইঁদুর বিড়ালের দৌড় দেখ। তাইলে আনার বেলায় এত আলস্য কেন...

শনিবার আধা ছুটির দিন। ব্যাংক, সরকারি অফিসগুলো বন্ধ থাকলেও বেসরকারি অফিস খোলা থাকে। আর কাজও যেন একটু বেশিই হয় সেদিন। ছেলেকে কথা দিয়েছিলো আজ টম জেরির ডিভিডি নেবে, কিন্তু কাজের চাপে সেটা বেমালুম ভুলে যায় আনোয়ার। ঘরে আসতে আসতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। কিন্তু ছেলে তার আব্দারের কথা ভোলেনা। বাপ ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই শুরু হয় নাকি কান্না। কাপড় আর ছাড়া হয়না। ছেলেকে বলে, চল বাপ বেটায় গিয়া সিনেমা নিয়া আসি। কান্না ভেজা চোখ মুছতে মুছতে অন্তু যেভাবে তাকায় তাতেই আনোয়ার গলে যায়। এই না হলে ছেলে। মন ভালো করে দেয় নিমিষে।

ছেলেকে বুকে পিষে ফেলতে ফেলতে আনোয়ার মোটর সাইকেলে বসে। সুলতানা পেছন পেছন এসে বার বার বলে, সাবধানে চালাবা, দেইখ আমার ছেলের যেন না লাগে। আনোয়ার হাসে। ছেলে বলে ওঠে মা আমি বড় হইছিতো, আমার লাগতনা... স্বামী স্ত্রী দুজনেই হেসে ওঠে। পেট্রল টেংকের উপর শক্ত হয়ে বসে অন্তু।

মোটর সাইকেল স্টার্ট দিয়ে পিকআপ নেয়ার আগে আনোয়ার হেলমেট খুলে দেয় সুলতানার হাতে। আমার ছেলে মাথা খুলে যাবে আর আমি হেলমেট পরে, এইটাতো হতে পারেনা।
- কিরে অনু আইসক্রিম খাবি?- না, মায় না করছে- তোর মা'তো নাই। বাসায় গিয়ে বলবোনা। খাবি কি না বল।ছেলে খুশি মনে মাথা দোলায়। এই যে মাথা দোলালো এতে অবশ্য কিছু যায় আসেনা। ঘরে গিয়ে প্রথম যে বাক্য বলবে অনু, সেটা হলো, আমি 'আইসকিম' খাইসি... সাথে সাথে শুরু হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ...

চার রাস্তার মাথায় বেশ একটা জটলা। দুর থেকেই দেখা যায়। কাছে গিয়ে দেখে গাড়ি চেক করা হচ্ছে। আনোয়ার আস্তে আস্তে মোটর সাইকেল চালিয়ে পাশ কাটাচ্ছিলো। কালো পোষাকের একটা লোক তাকে থামায়। হাতের লাঠিটা দিয়ে রাস্তার পাশের নির্দিষ্ট যায়গাটা দেখিয়ে দেয়। হালকা পাতলা গড়নের এক তরুণ সেখানে দাঁড়িয়ে। বয়েসে আনোয়ারের কয়েক বছরের ছোটই হবে। বাজখাঁই গলায় বলে সাইকেলের কাগজপত্র বের করেন। সাথে আনোয়ারের খেয়াল হয় অফিসের ব্যাগের ভেতর রয়ে গেছে কাগজপত্র...। এদের ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছে। বুকের ভেতর দ্রিমিক দ্রিমিক আওয়াজ শুনে সে। হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকে। মুখে কথা আসছেনা। ধমক দিয়ে উঠে সেই লোক। কথা কানে যায়না? কাগজপত্র বের করেন। আর হেলমেট নেই কেন? হড় হড় করে কথা বলে আনোয়ার, ‌‌'আসলে সব কাগজই আছে, অফিসের ব্যাগে রাখা। ছেলে এমনভাবে ধরলো যে বাসায় ঢুকে ব্যাগটা রেখেই আবার বেরিয়ে এসেছি ওকে নিয়ে। আলাদা করে মোটর সাইকেলের কাগজটা আর আনা হয়নি... কথা আর শেষ করতে পারেনা আনোয়ার, ডান গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দেয় স্মার্ট তরুণ। শালা বাঞ্চোতের বাচ্চা বেইমান, ছেলেকে নিয়েও মিথ্যা বলিস, লজ্জা নাই তোদের। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় আনোয়ার, গালটা গরমে ফেটে যায়... চোখ বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা, বাধাহীনভাবে টপ টপ করে ছেলের মাথায় পড়ে কান্না... লোকটা আবার গলা ঝাড়ে, এই বেটা যা, ছেলের জন্য ছেড়ে দিলাম। আরেকদিন যদি পাই জন্মের মতো মিথ্যা বলা ভুলিয়ে দেব।

অনু মাথা ঘুরিয়ে একবার বাবাকে দেখে, আরেকবার দেখে সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে। বাবার গালে আচমকা হাত বুলিয়ে বলে, চলো বাবা বাসায় যাই। আমার টম জেরি লাগতনায়। টম ভালোনা, সে হাঁসের বাচ্চারে কষ্ট দেয়... বিধ্বস্ত হতবাক আনোয়ার বাড়ির পথে ঘোরায় মোটর সাইকেল

1 comment:

  1. টম এন্ড জেরি আমার সবচেয়ে প্রিয় কার্টুন ভাইয়া।আর খুব শখ ছিল যে মোটরসাইকেল চালানো শিখব।এখানে ঝক্কি একটু বেশি এটা চালানো শেখা।র‌্যাবদের অত্যাচার মনেহয় বাড়ছেই।কাজের চেয়ে এরা অকাজ করে বেশি।

    ReplyDelete